short-story-de-force

ডি ফোর্স
মাহাবুবা লাকি


‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে’

এই গানটি খুব পছন্দের অর্কের। স্কুল কলেজ পেরিয়ে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, তখন একই ডিপার্টমেন্ট-এর অর্ণির সাথে প্রথম পরিচয় হয়। পরিচয়ের গন্ডি ধরে দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় একদিন অনুভব করে অর্ণি ছাড়া তার একদিনও চলবে না। কোথায় যেন সে অর্ণির জন্য একটা বিরহ অনুভব করে।

কালের আবর্তে দিন যেতে যেতে একদিন সাহস করেই বলে ফেলে অর্ণি তোমাকে আমার খুব পছন্দ। তুমি কি ভালবাস আমায়? সেদিন লজ্জারাঙা ঠোঁটে কিছু বলেনি অর্ণি। কারণ সময়ের পথ ধরে অর্কের জন্য তারও একটা টান কোথাও যেন আছে।

ঘটনা প্রবাহে দুজন দুজনের বেশ কাছে চলে আসে। ইতিমধ্যে দীর্ঘ আট বছরের প্রেম বসন্ত গায়ে লাগিয়ে দুজন পার করেছে অনেক আনন্দ ও সুখের সময়। অর্ণির লেখাপড়া প্রায় শেষের দিকে। প্রত্যেক বাবা মা তার কন্যা সন্তান বড় হবার সাথে সাথে বিয়ের চিন্তা করে। তার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। একেবারে উঠে পড়ে লেগেছে জামিল সাহেব মেয়েকে বিয়ে দেবেন বলে। মিনা বেগম অবস্থা বেগতিক দেখে স্বামীকে.বুঝাতে চাইলেন। দিনবদলের সাথে সাথে মানুষের চিন্তা চেতনার বদল হয়েছে। তুমি মেয়েটিকে একবার জিজ্ঞেস করো, তার কোনও পছন্দ আছে কি না।

কথাটি শুনে রেগে আগুন হয়ে যায় জামিল সাহেব। পছন্দ মানে কী? আমরা যা সিদ্ধান্ত নেবো সেটাই হবে। অর্ণি বাবা মায়ের কথা আড়ালে বসে শুনছিল। অগত্যা পরেরদিন বিশ্ববিদ্যালয় গিয়ে সব ঘটনা খুলে বলে অর্ককে। হুট করেই দু’জন বলে চলো বিয়েটা করে ফেলি, এরপর একটা কিছু হবে। যেই কথা সেই কাজ। বিষয়টা আপাতত বন্ধুদের ভেতর গোপন রইলো। কয়েকদিন দুই বন্ধুর ভাড়া বাসায় সময় কাটালো। এরপর পলাশিতে একটি এক রুমের বাসা ভাড়া নেয় তারা। বন্ধুবান্ধব সবাই কিছু কিছু হেল্প করে। কেউ প্লেট, কেউ কড়াই, কেউ মাদুর। এভাবে তাদের ছোট সংসারে বেশ প্রাণবন্ত সময় পার করে। হঠাৎ জামিল সাহেবের কানে খবরটি ঠিক পৌঁছে যায়। তিনি মিনা বেগমকে সাফ জানিয়ে দেন এই বাসার ত্রিসীমানায় যেন তোমার মেয়ে না আসে।

বাতাসের কানে কানে কথাটি আর গোপন রইলো না। আত্মীয় স্বজনরা কী করলো কী করলো বলেই খ্যান্ত দিলেন না। মামা কাকারা বলেই দিলেন একবছরের বেশি এই বিয়ে টিকবে না। তখন তোমার মেয়ের কী হবে? এখনও সময় আছে মামলা করে বিয়েটা ভেঙে দাও।. কত আশা ভরসা করে দুজন বাড়ির অমতে বিয়ে করে সংসার পেতেছিলো। এই যুগের শিক্ষিত ছেলেমেয়ে দুজনের বোধবুদ্ধি কম নয়। তারা ভেবেছিলো দুঃসময় একদিন কেটে যাবে। দুইপরিবার মিলেও যাবে। তাছাড়া চাকরিবাকরি হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু কিছু ঠিক তো হলোই না। পাছে দুজনের জীবনধারণ ও পড়ালেখা চালানোই দায় হয়ে পড়ে। কথায় বলে না, টাকা আর ক্ষমতা না থাকলে, ভালোবাসা বেড়ার চিপা দিয়ে পালায়।

নয় মাসের সংসার জীবনের মধ্যে প্রথম দুই মাস মধুময় ছিল। ধীরে ধীরে অভাব আর টানাপোড়েনের মধ্যে থেকে দুজনার মধ্যে অজানা দ্বন্দ্ব আর অর্থহীন ভুল বোঝাবুঝি গ্রাস করতে থাকে এই বিশ্বস্ত প্রেমের দেওয়ালটাকে।

এভাবে আরও কিছুদিন যেতে থাকে। অর্ক খুব চেষ্টা করে একটি কাজের। টিউশনি দিয়ে সংসার চলে না। গোপনে তার মা কিছু টাকা সাহায্য করেন। কিন্তু সেটা পরিমাণে অল্প। সামান্য কথায় দুজনের এখন ঝগড়া হয়, অথচ তারা জেনে বুঝেই এই পথে এগিয়েছিলো। কথা দিয়েছিল সুখে দুঃখে পাশাপাশি থাকবে। আজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরেই অর্ণির ভেতর একপ্রকার মেজাজ চড়াই বলা যায়। অর্ক ঘরে ঢুকতেই এটা নাই, ওটা নাই বলেই চিৎকার চেচামেচি শুরু করে। অনেক বুঝাতে চাইলো অর্ক, কিন্তু সে থামে না। বিচ্ছেদের দড়ি যেন ছিঁড়েই যায় এমন অবস্থা। অনেক বুঝাতে চাইলো এমন দিন থাকবে না, একটু ধৈর্য ধর সব ঠিক হয়ে যাবে।

কিছুতেই কিছু হলো না। অবশেষে সিদ্ধান্ত হয় দুজন আলাদা হয়ে যাবে। নরকময় এই জীবন তারা চায় না। নিজেরা একা একা বিয়ে করলো আবার কারো সাথে আলাপ না করেই আলাদা হবার আয়োজন করে ফেলে। বন্ধুবান্ধব যারা ছিলো, অনেকেই বুঝালো কাজ হলো না।

অবশেষে তারা দুজনেই কোর্টে একে অপরকে দেওয়া মিউচুয়াল ডিভোর্সের ফাইলে সই করলো। শেষে দুজনেই কোর্টের গেটে পৃথক গন্তব্যের বাসের জন্য অপেক্ষায় রইলো। ক’মাসের ছোট এই সংসারের কথা কারো মনেই দাগ কাটল না। মনে হয় বেঁচে গেছে দুজন। সংসার যে নরকময় স্থান এটাই আঙুল তুলে দেখালো তারা।

এদিকে ঘর ভাড়াও বাকি ছিলো, কাজেই ওই ঘরে ফেরার ইচ্ছা আর নেই। কাছে কোথাও যেন সাংস্কৃতিক প্রোগ্রাম চলছে। মাইকে একের পর হেমান্ত মুখর্জির গান বেজে চলেছে। ‘আমি দূর হতে তোমারেই দেখেছি, আর মুগ্ধ হয়ে চোখে চেয়ে থেকেছি’। দুজনের কাছেই আজ যেন সেই প্রিয় গানটি বড্ড অস্বস্তিকর লাগছে।

সময় যেন আজ কিছুতেই পার হচ্ছে না। দুটি মানুষ কিছুক্ষণ আগেও কত আপন ছিল। অথচ আজ যেন অস্বস্তিকর এক অচেনা মানুষ মনে হচ্ছে। অর্ক ভাবছে বাবার অমতে মা’র অমতে বিয়ে করে কী ভুল করলাম। মা যদিও পরে মেনে নিয়েছিলেন। বারবার বলেছেন। খোকা ঘরটাকে ভাঙতে দিস না। সহ্য করে ধরে রাখিস। আজ ঘরে ফিরে মাকে কী জবাব দেবে। লজ্জা পাচ্ছে ছোট ভাই বোনের কথা ভেবে। তারা ভাববে দাদা হেরে গেল জীবনের কাছে।

এমনি সময়ে ছোট একটি বালিকা, যাকে বইমেলায় কয়েকবার দেখেছে। কথাও হয়েছে। সে বেলি ও বকুলের মালা বিক্রি করে। একবার ওর থেকে মালা কিনে অর্ণির খোঁপায় বেঁধে দিয়েছিলো। আজ কোনও মালা হাতে নেই, দেখে জানতে চাইলো, আপা আসে নাই ভাইজান। ওই পারে অর্ণি দাঁড়ানো খেয়াল করেনি। খুব করুণ ও ক্ষুধার্ত মনে হলো। কিছু টাকা চাইলো বললো মা অসুস্থ। দুই দিন হলো কাজে যেতে পারে না। তেমন কিছু খাবার ঘরে নেই, বিশ্বাস করেন ভাই। আমার খিদে তেমন লাগে না… কিন্তু মা আর ভাইবোন দুটির খিদের জ্বালা সইতে পারি না।

ওর কথা শুনে অর্ক বলল, তোমাদের বাড়ি যেন কোথায়?

মেয়েটি বলে বাড়ি মুন্সিগঞ্জ! কয়েকবছর আগে, বাপে আর একটা বিয়ে করেছে, এর নতুন বউ ঘর থেকে আমাদের বের করে দিয়েছে। মা আমাদের লইয়া যাত্রাবাড়ী ধনির পাড়ে বস্তিতে উঠলো খালার কাছে। এরাও গরীব। মাইন্সের বাসায় কাম করে খায়। মারে দুই বাসায় কাজ দিছে। আমি রোজ এই পাড়ার রেহানার সাথে বাসে চেপে শাহবাগ আসি। ওদের সাথে ফুল বিক্রি করে যা পাই তা নিয়েই আবার সন্ধ্যায় মা’র কাছে ফিরে যাই। আজ ফুল বিক্রি হয় নাই যদি কোনও কাজ পাইতাম করতাম। ছোট মানুষ বলে কেউ কাজ দিচ্ছে না।

লিমার সাথে কথা বলতে বলতে পকেটে হাত দেয় অর্ক। কিন্তু পকেটে যে ক’টা সামান্য টাকা ছিল সব শেষ। আজ থেকে নিজেরই কোন কাজ নাই, ঘর নাই, গাছতলাতেই থাকতে হবে হয়তো। দেব দেব কত লাগবে? বেশী না ভাইজান চল্লিশটা টাকা দিলেই হবে।

মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে শেষ চল্লিশটা টাকা ওর হাতে দিয়ে পথের দিকে তাকায় কখন মিরপুরের বাস আসবে।

ততক্ষণে অর্ণিরও বাসায় ফেরার কোন বাস আসছে না। ইতিমধ্যে কয়েকবার দুজনার চোখাচোখি হলো। কিন্তু সেই চাহনিতে না ছিলো কোনও প্রেম, না ছিলো হারানো বিরহ। একটা সিগারেট ধরায়ে অর্ণিকে ভুলে থাকার চেষ্টা করছে অর্ক। কিন্তু কিছুতেই পারছে না ভুলে যেতে। হঠাৎ তার চোখ পড়লো শেরাটন হোটেলের শেষ দেওয়াল ও রমনা পার্কের দেওয়াল সংলগ্ন কোনায় এক পা হারানো একজন আধা বয়সী লোক হুইল চেয়ারে বসা দু’পা অবস হয়ে যাওয়া এক নারীকে মুখে তুলে কিছু মাখানো ভাত খাওয়ায়ে দিচ্ছে। অবাক বিস্ময়ে অর্ক কাছে এগিয়ে যায়। কিছু দূরত্বে দাঁড়িয়ে দেখে কত ভালবাসা দুটি অচল মানুষের মধ্যে। খাবার শেষ হতেই মুখ মুছিয়ে নোংরা বোতলে ভরা পানি খাওয়ায়ে দিলো। এদিকে মহিলাটি পলিথিন থেকে একটা পান সুপুরি দিয়ে সাজিয়ে মুড়ে লোকটির গালে তুলে দেয়।

অর্কের দু’চোখের কনা বেয়ে ঝর ঝর করে পানি বের হয়। আর একটু কাছে গিয়ে জানতে চায় চাচা! আপনার এক পা কীভাবে হারালো?

হেসে বলে সে অনেক কথা বাবা!

বলেনই না। আজ আমার মন খুব খারাপ, বলেন শুনি।

সে বেশ কিছু আগের কথা। আমি বাবার বড় ছেলে ছিলাম। গ্রামের স্কুলে পড়তাম ক্লাস নাইনে। ওই সময় তোমার চাচীও একই স্কুলে পড়তো। তারা গরীব মানুষ ছিলো। এর মা মাইনসের বাড়ি কাজ করতো। সেই তুলনায় আমার বাপের জমি জিরাত অনেক আছিলো। এসএসসি পাস দিলাম। তারে অনেক ভালবাসতাম, সেও খুব ভালবাসতো। একদিন পরিবারে অমতে তাকে বিয়ে করে এলাকা ছাড়লাম। সেই যে বের হলাম আর ঘরে ফিরিনি কোন সময়। শুরু হলো জীবন যুদ্ধ। এমন কি কাজ নেই যা করিনি। প্রথম দুইদিন কমলাপুর রেল স্টেশনে বসে কাটাইছি। ওখানে একজনের সাথে পরিচয় হবার পর বস্তিতে একটা ঘর ভাড়া লই। দিনে এদের সাথে মাল টানি। ভালই চলছিল দুজনের জীবন। কিছুদিন যেতেই একটা রডের কারখানায় দারোয়ানের চাকরি পাই। আল্লাহর রহমতে আমার অবস্থার পরিবর্তন আসে। আমি তোমার চাচিরে লইয়া একটা ভাল জায়গায় চলে আসি। ঘর আলো করে আমার তিন ছেলের জন্ম হয়। আল্লাহ চাহেতো তারাও দিন দিন বড় হতে থাকে। কষ্ট হলেও তাদের লেখাপড়া শিখাইলাম। হঠাৎ একটা এক্সিডেন্ট আমার জীবন বেঁচে গেলেও শেষমেশ একটা পা বাঁকা হয়ে যায়। এই পা নিয়েই কোনওরকমে বাজারে মানুষের টুকিটাকি কাজ করে দুজনের জীবন চলে। দিনবদলের পালায় সংসারে অশান্তি আর অভাব জেকে বসে। তোমার চাচীর চেহারা ভাল না কালো মানুষ, তবুও এরে আমি কখনও খারাপ রাখি নাই। সুখে দুঃখে পাশাপাশি ছিলাম। বড় পোলা বাসা ছাইড়া গেলো গা। বাকি দুজন যার যার ইচ্ছা মত বিয়ে করলো। আমরা সবার বোঝা হয়ে গেলাম। তোমার চাচি মাইনসের বাসায় কাম করে খাবার আনতো তাই দুজনে খেতাম। এভাবে কিছুদিন যেতেই বাকি যে কষ্ট ছিলো আল্লাহ সেটাও আমার উপর নাজিল করলো। তোমার চাচী কাজ করতো সারাদিন। একদিন ঘরে ফেরার পথে নানান কথা ভাবতে ভাবতে পাশের ড্রেনে পড়ে যায়। কেউ তাকে টেনে তোলে নাই। পড়ে গিয়ে মাজায় প্রচন্ড ব্যথা পায়। পরেরদিন পথচারীদের সাহায্যে হাসপাতালে স্থান হয়। দীর্ঘ একমাস পঙ্গু হাসপাতালে অবস্থানের পর ডাক্তার বলে টাকা লাগবে অনেক। কোথায় পাবো এতো টাকা? ছেলেরা ধার ধারে না। প্রতিদিন ঝগড়া সংসারে আমাদের নিয়ে। কেউ খাওয়াতে পারবে না, থাকতে দিতে পারবে না। কী আর করা, রাতের আঁধারে তোমার চাচীরে লইয়া সেই রেল স্টেশনে আবার স্থান নেই। এই জীবন। কিছু টাকা সাহায্য লইয়া ওরে একটা হুইল চেয়ার কিনে দেই। এখন বুড়া হইছি কী খাবো, কোথায় টাকা পাইবো। তাই দুজন ভিক্ষা করি। ওরে সাথে সাথে রাখি। তার খাওয়ানো, উঠানো, নামানো সবই আমি করি। এভাবে আমরা ভাল আছি বাবা। দু’জন দু’জনের প্রতি একরত্তি ভালবাসা এখনও কমে নাই। আল্লাহর কাছে শেষ মিনতি, তিনি যেন আমাদের একসাথে মরণ দেন। তিনটি ছেলে আর কোনওদিন খবর নেয়নি। আমরা বেঁচে আছি কি নাই। তবুও দোয়া করি এরা ভাল থাকুক শান্তিতে থাকুক।

অর্কের এগিয়ে যাওয়া এবং পথের ধারে দুজন অসহায় মানুষের কাছে বসে কথা বলা দেখে অর্ণিও এগিয়ে আসে। পেছনে দাঁড়িয়ে তাদের জীবনের গল্পকথা শুনছিল। সেখান থেকে ছুটে গিয়ে কাওরান বাজারের খুপরি হোটেল থেকে কাচ্চি কিনে নিয়ে ওদের খেতে দেয়। রাত তখন প্রায় নটা বাজে। অর্ক অবাক ও বিস্মিত তাকে দেখে। খাবার দেখে দুজনের চোখে পানি আসে। বৃদ্ধ খাবার খায় ও বউকে গালে তুলে দেয়। শেষে বোতল থেকে পানি নিয়ে মুখ ধুয়ে তাকে গ্যাসের ওষুধ দেয়। এই দৃশ্য দেখে অর্ণি ও অর্কের চোখে পানি এসে যায়। টাকা পয়সা, ঘর বাড়ি, কিছুই নাই। নিঃস্ব দুটি মানুষের আছে শুধু প্রাণভরা ভালবাসা। থমকে যায় অর্ক অর্ণি, দুজনের অমূল্য প্রেমের ইতিকথা শুনে। এও কি সম্ভব? তাদের হৃদয়ের চোখ খুলে যায়। কী ভুল কাজটাই না করতেছিলো।

নিজেদের জন্যও দুটি নিয়েছিলো অর্ণি। দুজনেই তাদের কাঁপা কাঁপা হাতে দুজনকে খাইয়ে দিতে ব্যস্ত হয়ে যায়। একজন ওরনার আঁচল দিয়ে অন্য জনের ঘাম মুছিয়ে দেয় তো আরেকজন

পানি খাইয়ে দেয়। পথের ধারের কড়াই গাছটির নিচে যেন অকাল প্রেমের স্বর্গ নেমে আসে। কিছু কিছু পথচারী আড় চোখে দেখে, কেউ কেউ বলে দুনিয়াটা আজব কারকাখানা।

ঘটনার শেষ এখানেই নয়, তারা দুজনকে বলে, দেখুন, আপনারা এখন অচল। যদি চান আমরা একটা বৃদ্ধাশ্রমে থাকার ব্যাবস্থা করে দিতে পারি। কথাটা শুনে বিষাদে ভরা পান্ডুর মুখখানি থেকে এক ফালি আনন্দের হাসি বের হয়। দুজনেই বলে বাবা তা হলে তো ভাল হয়। একটা আশ্রয় হয়। আল্লাহ তোমাদের ভাল রাখবেন। একদিন অনেক বড় হবা তোমরা।

অর্ক ওর চেনা এক বন্ধুর মারফত একটা বৃদ্ধাশ্রমের সাথে ফোনে যোগাযোগ করলো। ট্যাক্সি নিয়ে দুজনে বৃদ্ধ দম্পতিকে নিয়ে ওই বৃদ্ধাশ্রমের উদ্দেশে রওনা হলো। অর্ক ও অর্ণি এত কর্মকাণ্ডের মধ্যে ভুলেই গেছে যে একটু আগেই ওদের ডিভোর্স হয়ে গেছে। এখন চাইলে আর কেউ কাওকে হাতটিও ধরতে পারছে না। অবশেষে তারা ‘শেষবেলা’ নামক বৃদ্ধাশ্রমে এসে পৌঁছাল। দু’জনকে নিজেদের দায়িত্বে সেখানে স্থিত করার পর ওরা যখন বেরোতে যাবে, ঠিক সেই মুহুর্তে বৃদ্ধটি হেসে বললেন, অনেক অনেক বছর এভাবেই একসঙ্গে হাসিখুশি থেকো তোমরা। সুখে দুঃখে পাশাপাশি থেকো। জীবনের মানে শুধু টাকা আর বাড়ি-গাড়ি নয় বাবা। সংসার হলো সেক্রিফাইসের উঠোন। এখানে যত বেশি ব্যালেন্স করবে সুখ তত বেশি। টাকার প্রয়োজন আছে কিন্তু ভালবাসাটা বেশি দরকার। তবে আমার মামনিকে খুশিতে রেখো বাবা! তুমিও স্বামীকে বুকেই রেখো, দেখবে দুনিয়ার সব শান্তি তোমার ঘরে। খুব ভালো থেকো মা!

বৃদ্ধাশ্রমের বাইরে কাছাকাছি কোথাও একটি মেলা বসেছে। সেখানেও বাজছে গান। হেমন্তের সেই বিখ্যাত বিরহের গানটি ‘আজ দুজনার দুটি পথ ওগো দুটি দিকে গেছে চলে’।

অর্ক অর্ণিকে বলল, বলছি ডিভোর্সের পর সেই বউকে যদি না ছাড়তে চাই তাহলে কি আবার নতুন করে বিয়ে করতে হবে?

অর্ণি বলে আইন তো তাই বলে শুনেছি। তবে ফতোয়া আইনে কী জানি একটা আছে। হিল্লা বিয়ে।

অর্ক বলে যাবে নাকি তাহলে?

অর্ণি বলে কোথায়?

একজন উকিলের সাথে আলাপ করে রেজিস্ট্রি অফিসে!

অর্ণি কেঁদে জড়িয়ে ধরলো অর্ককে… কাঁদতে কাঁদতে কাঁপা গলায় অর্কের টিশার্টটা খামচে ধরে বললো এখন একমাস তো নোটিশ দেবে। অতঃপর বিরহ নিয়ে অপেক্ষা করতে হবে।

তবে দুজন থাকবো কোথায়?

অর্ক আলতো করে অর্ণির ঠোঁটে চুমু দিয়ে বলে, নিজের বউকে নিয়ে না হয় একটা মাস লিভ টুগেদারই করলাম। কী বলো… আপত্তি নেই তো! শোন, সমাজের বাঁকা চোখ সারাজীবন থাকবে। তার জন্য জীবন থেমে থাকবে না। এটাই প্রকৃতির নিয়ম।

অর্ণি বলে, আর তোমার বাড়িওয়ালা মামা?

অর্ক বলে, আরে ধুর, মামা কি জানে যে আমাদের ডিভোর্স হয়েছে। আবার বিয়েও করেছি। তাছাড়া ওই সব তামাদি বিধান আমি এমনিও মানি না।

অর্ক আর অর্ণি ট্যাক্সি ডেকে পলাশির দিকে যাওয়ার জন্য উঠে বসলো। ট্যাক্সি স্টার্ট দিলো, ক্যান্টমেন্টের পাশ দিয়ে এগোতেই কানে ভেসে আসছে, ‘তুমি যে আমার কবিতা…

আমারও গানের রাগিনী’।

এই পৃষ্ঠাটি লাইক এবং শেয়ার করতে নিচে ক্লিক করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *