short-story-babar-cycle

বাবার সাইকেল
রাখাল রাহা


বাবার একটা সাইকেল ছিল। সাইকেলটানা চলতে চলতে মোটর সাইকেল হয়ে যেতো! বাবা কেন যে বুঝতে পারতেন না, তা আমি বুঝতাম না। ভয়ে কিছু বলতেও পারতাম না। যেমন করে উঠোনে ভোলাকে দেখলে মেনিটা রান্নাঘরের বারান্দার একেবারে বেড়া ঘেঁসে পালিয়ে যায়, তেমন করে আমরাও দূর দিয়ে সরে সরে যেতাম। একটু ঘেউ শব্দ শুনলেই সে যেমন লাফ মারতো, আমরাও তেমনি হঠাৎ ডাক পড়লেই চমকে উঠতাম – এই বুঝি কি ভুল করেছি! কিন্তু মাঝে মাঝে তিনি আমাকে তার হাতের লেখার মতোই সুন্দর নরম করে বলতেন, “আমিনুল, গোসল করে রেডি হয়ে নাও।”

আমার অনেকগুলো নাম ছিল – কটা, মুটু, ধলা, রহমান, গাধা – অনেকগুলো। কিন্তু বাবা আমাকে সবসময় আমিনুল নামেই ডাকতেন। আর কাউকে কখনো এই নামে ডাকতে শুনিনি। কেন ডাকতো না, তা আমি বুঝতাম না। আমার মনে হতো, বাবা যেমন আলাদা, তেমনি তার ডাকা নামও আলাদা হতে হবে। আর-কেউ সেটা ব্যবহার করতে পারবে না।

আমার প্রথম শেখা ইংরেজী শব্দ কোনটা ছিল আমি তা মনে করতে পারি না, তবে মনে হয় “রেডি” ছিল। আর বাড়িতে আমাদের যে বড়ো বড়ো গোল ভলিউমওয়ালা একটা রেডিও ছিল, যেটা ঘুরালেই ভম করে জোরে একটা আওয়াজ হয়েই গান শুরু হয়ে যেতো, তার সঙ্গে “রেডি” শব্দের একটা অদ্ভুত মিলের আনন্দ যেন তখন সারা শরীর জুড়ে খেলে যেতো। আমি বুঝতে পারতাম, আজ বাবা আমাকে নিয়ে যাবেন। সেই যে অনেক মাঠ, অনেক গ্রাম, অনেক বিল আর অনেক নদী পার হয়ে তার যে একটা অফিস আছে, যেখানে তাকে মাঝে মাঝেই যেতে হয়, আর সেখানে যে শহর আছে – সেখানে। চারপাশে দেয়াল দিয়ে ঘেরা পাকা বাড়ি, আর তার সামনে লাগানো গাছভর্তি গোলাপী রঙের কাগজের মতো ফুল একেবারে মাটি থেকে ছাদের উপর পর্যন্ত উঠে গেছে – শহর মানে তো সেটাই! এরকম কোনো বাড়ি গ্রামে কোথাও দেখলেই তাই আমরা ভাবতাম, সেটা শহর হয়ে গেছে!

আমার মনে হতো বাবার জন্যই আমাদের বাড়িতে কেউ আসতো না। সবাই বাবাকে ভয় পেতো। কিন্তু এমন দিনে আমাদের বাড়িতে পরীরা আসতো! শীত-গ্রীষ্ম যেটাই হোক, আমাকে তাদের পাখনায় করে নিয়ে পুকুরে ঝুপ করে গোসল করিয়ে তেল পাটপাট চুলে চিরুনী দিয়ে জামা-কাপড় পরিয়ে একবারে রান্নাঘরের বারান্দায় পিঁড়ের উপর বসিয়ে দিতো। মা গরম ভাতের উপর ঝোল-তরকারী আর শোল মাছের টুকরো দিলে ওরা আমাকে খাইয়ে দিতো। আমি সবসময় নিজে নিজেই খেতাম। মা কখনো আমাকে খাইয়ে দিয়েছে এমনটা মনে পড়ে না। মা নিজে কখন খেতো তাও দেখতে পেতাম না। আমাদের মনে হতো, মা-দের খেতে হয় না। তবে পরীদের কথা খুব মনে পড়ে। যখনই একা হতাম ওরা আসতো, যখনই খুশী হতাম ওরা আসতো। ওরা কি এখনো বেঁচে আছে? নাকি আমার মতোই মরে গেছে!

বাবা তখন ও-ঘর থেকে সাইকেলটা বের করে মায়ের ছেঁড়া লাল ব্লাউজটা নিয়ে মুছতে বসতেন। কোনো কিছু মোছার জন্য আমরা আমাদের ঘরের গাব-লাগানো মিষ্টি রঙের বাঁশের বেড়ায় বাদুড়ের পাখার মতো করে গুঁজে রাখা মায়ের এই ছেঁড়া ব্লাউজগুলোই পেতাম। শাড়িগুলো ছিঁড়ে গেলে কি হতো তা বুঝতে পারতাম না। কিন্তু অনেকদিন পর কোনো এক বৃষ্টিভেজা সিঁয়াটাপড়া রাতের ব্যাঙ-ডাকা ঘুম শেষে উঠে দেখতাম সেগুলোর মতোই নরম একটা কাঁথা আমাদের গায়ের উপর নদীর শেওলা ভাসা জলের মিষ্টি গন্ধ হয়ে যেন লেপটে আছে। শাড়িটা কেমন করে কাঁথা হলো তা বুঝতে পারতাম না। তবে কি মার সঙ্গেও পরীরা থাকে! যাদের সঙ্গে পরীরা থাকে তাদের মনে হয় বাবা পছন্দ করেন না। তাই মাকেও মনে হতো বাবার থেকে সরে সরে থাকেন।

বাবার সাইকেলটার মাটিতে বাধানোর কোনো পায়া ছিল না। উঠোনের শিম অথবা লাউ অথবা পুঁইয়ের বানের সঙ্গে হেলান দিয়ে বাবা প্রথমে সিট আর হ্যাণ্ডেল মুছতেন। তারপর তিনকোণা পাইপের ফ্রেমটা ভালো করতে মুছতে মুছতে নীচের দিকে আগাতেন। আমি দেখতে দেখতে অস্থির হয়ে ঘরে গিয়ে ফ্রেম-খুলে-যাওয়া মায়ের ছোট্ট কাচের আয়নায় আবারও মাথাটা পরিপাটি করে আঁচড়িয়ে মুখটা অনেকক্ষণ ধরে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে ফিরে এসে দেখতাম বাবা তখনও বেশী নীচে নামতে পারেননি। মাত্র সাইকেলের হাত দুটো মুছছেন।

সাইকেলের সামনের চাকার দু’পাশের চিকন দুটো বাঁকানো পাইপকে আমার কাছে হাতের মতো মনে হতো। ঠিক দু’পাশ থেকে যেন কনুই বাঁকিয়ে আঙুল দিয়ে চাকাটাকে ধরে রেখেছে। বাবা সেটা শেষ করে ব্লাউজটা চাকার কেন্দ্রে ঢুকিয়ে দুটো হাতা ধরে দু’পাশ থেকে উপর-নীচে দ্রুত টানতেন। এতে মাঝের ছোট্ট লোহার পাইপটা এতো চকচকে হতো যে আমি প্রত্যেকবার এর জন্য অপেক্ষা করতাম। আমি যখন ঝুঁকে হাত দিয়ে চকচকা পরখ করতাম, তখন বাবা চাকার উপরে বাঁকানো টিনের মাঠঘাট মুছতেন। বড়ো হয়ে যখন মরে গেছি, তখন বুঝেছি ওটা মাঠঘাট নয়, মাডগার্ড। কিন্তু আমাদের কাছে মাঠঘাটই সঠিক ছিল। কারণ বাবার সাইকেলটা রাস্তা নয়, শুধু যেন মাঠঘাটের মধ্য দিয়েই ছুটে চলতো।

মাঠঘাট মুছে বাবা পেছনের চাকায় যেতেন। আমি বুঝতাম এটাই হবে সবচেয়ে দীর্ঘ পথ। এখানে এলেই প্রতিবার সেই সুন্দর সকালটা যেন থেমে যেতো। পরীরা তখন কে কোথায় পালাতো বুঝতে পারতাম না। শুধু কানে আসতো চেইন ঘোরানোর একটানা র্ঘ্রর্ র্ঘ্র্রর শব্দ। মাথায় চিকন নলের মতো প্যাঁচ লাগানো টিনের একটা ছোট্ট চ্যাপ্টা কৌটায় নারিকেলের তেল চাকার কেন্দ্রে আর চেইনে লাগিয়ে মাঝে মাঝে সাইকেলের পিছনটা উঁচু করে ধরে বাবা ডাক দিতেন, আমিনুল, প্যাডেলটা ঘোরাও তো দেখি।

আমি উৎসাহে এতো জোরে প্যাডেল ঘুরাতাম যে মনে হতো ছেড়ে দিলে আমাদের-স্কুল তো আমাদের-স্কুল, একবারে মিয়া ভাইদের হাইস্কুলের বড়ো মাঠটা পার হয়ে সেই নদীর ধারে চলে যেতে পারবে!

এরপরই বুঝতে পারতাম বাবার সাইকেল রেডি করা প্রায় শেষ। এখন প্যাডেলে একটু তেল দিয়ে সেটাকে বন বন করে পা দিয়ে খানিক ঘোরাবে, আর সাইকেলটাকে একটু উপরে তুলে কয়েকবার আছাড় দেবে। এই আছাড় দেওয়ার মানেটা আমরা ভালোভাবে বুঝতে পারতাম না। ভাবতাম আমাদের যেমন মারতে হয়, তেমনি সাইকেলটাকেও মাঝে মাঝে আছাড় মারতে হয় – না হলে ওটা ঠিকমতো কথা শোনে না।

এরপর বাবা সাইকেলটি নিয়ে যখন উঠান থেকে দেউড়ি হয়ে খোলাটের দিকে যেতেন, মনে হতো সাইকেলটা আগের চেয়েও আজকে অনেক বেশী মোটর সাইকেল হয়ে যাবে। খোলাটের নারিকেল গাছ, জামরুল গাছ, আতা গাছ – সব গাছ পার হয়ে একেবারে শেষ মাথায় একটা কার্পাস গাছের সঙ্গে বাবা সাইকেলটা হেলান দিয়ে রাখতেন। এরকম কার্পাস গাছ গ্রামে আমরা আর কোথাও দেখতাম না। আমরা সেই গাছে মাঝে মাঝে উঠতামও। গাছটায় সারাবছর কুঁড়ি আসতো – হালকা সবুজ ভেজা পাতলা কাপড়ে মোড়ানো যেন সেই কুঁড়ি – ফুল ফুটতো, বোঠনো হয়ে ধবধব করতো, আবার কুঁড়ি আসতো। মা সারা বছর ধরে গাছ থেকে সেই ধবধবে সাদা ফুল কোটা দিয়ে পাড়তেন। আমরা সেগুলো থেকে খুবলে খুবলে তুলা তুলতাম। মা আমাদের সেই তুলা দিয়ে ছোট ছোট বালিশ বানিয়ে দিতেন। মাঝে মাঝে মনে হতো বাবার সাইকেলের মতো যেমন আর কোনো সাইকেল নেই, তেমনি মার তুলা গাছটার মতোও আর কোনো তুলা গাছ নেই। দুজনই খুব একা আর আলাদা। দীর্ঘক্ষণ ধরে ওরা তাই একা একা দাঁড়িয়ে থাকতো। ওরা কি কথা বলতো? আমারও তখন খুব একা লাগতো। আমি একা একাই মায়ের একা-গাছে হেলান দিয়ে আর বাবার একা-সাইকেলে হাত রেখে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতাম।

বাবা তখন গোসল করতেন। গোসল সেরে হেঁশেলের বারান্দায় পাটির উপর কুটুম হয়ে বসে খেতে বসতেন। মা শুধু বাবাকেই খাওয়াতেন। আমাদের খাবার দিয়েই কোথায় কোন গোয়ালে আর কোন চাতালে চলে যেতেন! কিন্তু বাবা খেতে বসলে সারাক্ষণ বসে থাকতেন। আর বাবা খেতে বসলেই মার মুরগীগুলো যেন সব উঠানে এসে জড়ো হতো। উঠানে হাগু করে করে ভরে ফেলবে বলে মা ওদের তাড়াতে বললে আমরা পাটকাঠি দিয়ে তাড়িয়ে তাড়িয়ে খেদিয়ে দিতাম। কিন্তু ওরা বোধহয় বাবার আসকারায় গোয়ালঘর, ঢেঁকিঘর, কলতলা আর কানছি-কোণায় কোথায় গিয়ে লুকিয়ে থাকতো। আর বাবা খাওয়া শেষ করে মুখভর্তি পানি নিয়ে জোরে জোরে কুলকুচ করে যেই উঠানে ছুড়ে মারতেন, অমনি মুরগীগুলো চারদিক থেকে ছুটে এসে সেখানে হামলে পড়তো – খুঁটে খুঁটে কি যেন খেতো। আমার মনে হতো বাবা ইচ্ছে করেই প্রতিদিন মুখের মধ্যে খাবার রেখে কুলকুচ করে ছিটিয়ে দিতেন, আর মায়ের মুরগীগুলোকে ডেকে আনতেন।

মা তখন কিছুই বলতেন না। মা কি রাগ করতেন? কিন্তু মা বাবার মতো নয়। তার রাগ আমরা কখনো দেখতে পেতাম না, কান্নাটাই শুনতাম – চুলার আগুন নিভে এলে যেমন ভাতের ফেন উঠে উঠে নেমে যায়, তেমন করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না। কখনো দুধের বলগের মতো হঠাৎ উথলিয়ে ছড়িয়ে পড়া কান্না কাঁদতে আমরা তাকে দেখিনি। বাবা কি কাঁদতেন? আমরা বাবার কান্না কখনো শুনিনি। তবে আমার মনে হয় বাবা সাইকেলের কাছে কাঁদতেন। কারণ বাবা শুধু সাইকেলটাকেই ভালোবাসতেন। আর সেই সারস ডাঙার বিশাল ধূ ধূ মাঠের মাঝ দিয়ে যাওয়ার সময় সাইকেলের রডের উপর বসে অনেকবারই মনে হতো আমার পিঠে কোথা থেকে যেন টপ টপ করে গরম পানি পড়ছে। চোখের পানি গরম হয় আমরা মাঝে মাঝেই বাবার মার খেয়ে কেঁদে কেঁদে জানতাম।

সাদা পাঞ্জাবী আর সাদা ঢলঢলে পায়জামা পরে একটা চামড়ার ব্যাগ চটের ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে বাবা যখন ঘর থেকে বের হতেন তখন মনে হতো, চামড়ার ব্যাগটা সুন্দর রাখার জন্যই বাবা এই চটের ব্যাগটা সঙ্গে করে নেন। কিন্তু তাতে যে বাবা নিজেই অসুন্দর হয়ে যান, তা তিনি বুঝতে পারতেন না। আর বাবা অসুন্দর হয়ে গেলে আমাদেরও অসুন্দর মনে হতো। কিন্তু কথাটা কখনো তাকে বলতে পারতাম না।ব্যাগ হাতে করে ঘর থেকে বের হয়েও বাবা অনেকক্ষণ ধরে উঠানে দাঁড়িয়ে বানের জাংলাগুলোকে, খুঁটিগুলোকে কিংবা শিম, লাউ বা পুঁইয়ের ডগাগুলোকে নেড়ে নেড়ে দেখতেন। কোনোটা ধরে উপরে তুলতেন, কোনোটা টেনে নীচে নামাতেন – তখন যেন তার অনেক কাজ পড়ে যেতো। পকেট থেকে ছোট্ট ডায়েরীটা বের করে কচি ধানের শীষের মতো জোড়া জোড়া সুন্দর অক্ষরে কি সব লিখতেন।

আমি অস্থির হতে থাকতাম। মা তখন এক মগ পানি এনে বাবার সামনে দাঁড়াতেন। বাবা সবসময় বসে পানি খেতে বলতেন, গরুর মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পানি খাওয়ার তুলনা দিতেন। কিন্তু তখন তিনি নিজেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পানি খেয়ে আস্তে আস্তে সাইকেলের কাছে গিয়েও কি যেন ভাবতেন। এরপর ব্যাগের ভিতর থেকে কিছু পুরনো কাপড় বের করে সাইকেলের রডের উপর পেঁচিয়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে বলতেন, উঠে বসো।

আমি প্যাডেলে পা দিয়ে লাফ মেরে রডের উপর বসে দু’পাশে পা ঝুলিয়ে দিতাম। বাবা পা দুটো সামনের চাকার উপরে যেখানে দু’পাশ থেকে সাইকেলের হাত দুটো শুরু হয়েছে সেখানে তুলে দিয়ে বলতেন, চুপ করে বসে থাকবা, পা যেন নীচেয় না নামে। তাহলে চাকার ভিতর ঢুকে যাবে।

আমি দুই হাঁটু এক করে হ্যা-েল ধরে চুপ করে রডের উপর বসে থাকি। বাবার সাইকেল চলতে শুরু করে। গ্রামের পথ পার হয়ে ক্রমশ মাঠের খাদরো-বাদরো পথ ধরে। দু’পাশের ধান, পাট, আখ, কলাই, তিল, মরিচ আর হলুদের ক্ষেতের মাঝ দিয়ে গ্রামের পর গ্রাম পার হয়। কিছু উঁচু, কিছু নীচু, কোথাও কাদা, কোথাও ধুলোর মধ্য দিয়ে আমরা এগিয়ে যাই। পাছার নীচের কাপড় ভেদ করে রডের সঙ্গে লেগে লেগে আমার দু’পাশে ব্যথা করতে থাকে। প্রতিবার কাপড় বেঁধে গদি বানিয়ে দিলেও কিছুদূর যাওয়ার পরই মনে হতে থাকে গদিটা শুকিয়ে একেবারে খটখটে বরইচরার মাঠ হয়ে গেছে। ওখানে কেউ জমি চষে না, ফসলও হয় না। তবু সাইকেলটা আজ মোটর সাইকেল হতে পারবে কিনা সেই উত্তেজনাই আমাকে ঘিরে রাখে। আমি ব্যথা ভুলে সামনের চাকায় এক ধেয়ানে চোখ রেখে চলি।

চাকা ঘুরছে … ঘুরছে, আমিও ঘুরছি। গরু-মোষের গাড়ি চলা সারস ডাঙার ধূ ধূ পথ, কোন দূরের গ্রামে মিশে গেছে। পথটা ঘাসহীন, মসৃণ – কিন্তু দুপাশটা উঁচু ঢিবি হয়ে ঘাসে ছাওয়া। পথ আর ঢিবি মিলেমিশে যেন সোজা রেললাইন। ভাবি, এই বুঝি এক পাশের ঢিবিতে প্যাডেল বেঁধে আমরা হুড়মুড় করে পড়ে যাবো। কিন্তু অদ্ভুতভাবে দেখি, বাবার সাইকেল কখনো বেঁধে যায় না। ঠিক ঠিক সরু পথ দিয়ে সোজা চলতে থাকে। বাবা কখনো একহাত ধরে চালান, কখনো দু’হাত। কখনো ডানে তাকান, কখনো বাঁয়ে! আমার মনে হয় সাইকেলটা বাবা কি চাইছেন তা বুঝতে পারতো, কিন্তু বাবাই বুঝতে পারতেন না সাইকেলটা কি চাইছে। সাইকেলের মতোই বাবা আমাদের কথাও বুঝতে পারতেন না।

আজ কি বাবা বুঝতে পারবেন সাইকেলের মনের কথা? সারস ডাঙ্গার ধূ ধূ মাঠটা ছাড়িয়ে আমি অপেক্ষা করি সেই শুকানো বিলটার পাশ ধরে যাওয়া রাস্তাটার, যেখানে আসলেই বাবার সাইকেলটা মোটর সাইকেল হয়ে যাবে। তার আগে আসবে বিশাল বড়ো একটা বটগাছ – যার মোটা মোটা গুঁড়ির মাঝে গোলাঘরের মাঁচার নীচের মতো এমন অন্ধকার যে ওখানে এলেই আমি প্রতিবার চোখ বন্ধ করে ফেলি। তারপর এক মরা পাকুড় জড়িয়ে ধরে ওঠা কি এক লতানো গাছ! পাকুড়টা কি লতাকে বাঁচায়, নাকি লতাগাছটা পাকুড়কে – তা আমি বুঝতে পারি না। প্রতিবার ভাবি বাবাকে জিজ্ঞেস করবো, কিন্তু করা হয় না। তারপর এক নেড়া তালগাছ, ওটাকে দেখলেই আমার খুব হাসি পায়। ফি বছর যখন আমাদের একবার করে নেড়া করে দেওয়া হয় তখন আয়নায় নিজেকে দেখে কান্না পেলেও গাছটাকে দেখে কেন হাসি পায় তা আমি বুঝতে পারি না। তারপর আসবে শুয়ে পড়া এক জোড়া খেঁজুর গাছ – মনে হয় আমি এক দৌড়ে ওর মাথা থেকে খেঁজুর পেড়ে আনতে পারবো। তারপর বিশাল এক পুকুর, যার উপরে যেন ঘন সবুজ সর-পড়ে আছে। এর নীচে পানি আছে, নাকি নেই – তা আমি বুঝতে পারি না। কাউকে কখনো গোসল করতেও দেখি না। শুধু দূরের উঁচু পাড়ির দিকে জটাধারী এক পাগলকে সবসময় বসে থাকতে দেখি। পুকুরটা কি দোষোন্তরে? ওখানে দ্যাও-দানব আছে? পাগলটা কি তার পাহারাদার? আমার গা ছম ছম করে। আমি ঘুরে বাবার মুখের দিকে তাকাই। মনে হয় তিনি যেন তখন কোথাও নেই। সামনে একটা সুন্দর রাস্তা এগিয়ে আসছে, দু’পাশে সাজানো বাবলা গাছের সারি, যেন মাথার উপর ছাতা ধরে আছে, তিনি যেন তারই প্রতীক্ষা করছেন। মাঝ দিয়ে আঁকানো-বাঁকানো ঢালু পথটা আস্তে আস্তে একটা শুকানো বিলের দিকে চলে যাবে। এবং যেতে যেতেই কখন সাইকেলটা মোটর সাইকেল হয়ে যাবে।

আমি টান টান হয়ে বসি। আমার সমস্ত অন্তঃকরণ দিয়ে চাইতে থাকি বাবার সাইকেলটা আজ যেন মোটর সাইকেল হয়েই থেকে যায়। বাবার যেন আর কষ্ট না হয়। বাবা সেখানে এসে প্রতিদিনের মতো আজও একটু জোরে চালিয়েই প্যাডেলের উপর চুপ করে পা দিয়ে বসে থাকেন, আর একটানা র্ক্র্্র্্ শব্দ করে করে সাইকেলটা ছুটতে থাকে। আমি চিৎকার করে বলতে চাই, বাবা, সাইকেলটা মোটর সাইকেল হয়ে গেছে, আর চালাতে হবে না! কিন্তু বলতে পারি না। তাই আল্লাকে ডাকি, বাবা যেন আর প্যাডেল না ঘোরায়। কারণ প্রতিবার দেখেছি যেই বাবা প্যাডেল ঘোরায় অমনি সাইকেলটা আবার মোটর সাইকেল থেকে সাইকেল হয়ে যায়। আমি চোখ বন্ধ করে হ্যাণ্ডেলের উপর ঝুঁকে পড়ে সমস্ত শক্তি দিয়ে মোটর সাইকেলকে রক্ষা করতে চাই। সাইকেলটা ছুটছে, ছুটছে। ঢালু পথটা যেন একটু সমান হয়ে আসছে। আর ঠিক সেই সময়ই বাবা প্রতিদিনের মতো আবারও একই ভুল করে বসেন, এবং প্যাডেল ঘোরাতে শুরু করেন। আমার বুকটা ধড়ফড় করতে থাকে, মনে হয় পথটা তখন হঠাৎই অনেক খাড়া হয়ে যায়, এবং বুঝতে পারি বাবা অনেক চেষ্টা করেও সাইকেলটা আর জোরে চালাতে পারছেন না। আমি পেছন ঘুরে বাবার মুখটা দেখার চেষ্টা করি। সারা মুখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে। বাবা কি কাঁদছেন? আমি সামনে তাকাই। কিন্তু সাইকেলটা আজও প্রতিদিনের মতো থেমে যায়। আমার তখন নদীর চরে খেলতে গিয়ে সেই যে নীল চক্রবক্রা লাটিমটা হারিয়ে ফেলেছিলাম, তার মতো খারাপ লাগতে থাকে। মায়ের নিভে যাওয়া চুলার এলানো ভাতের মতো কান্নার অনুভূতি আসে।

বাবা তখন নেমে পড়ে সাইকেলটাকে একটু ঠেলে একটা মসজিদের পাশে রাখেন। আমাকে ধরে নামিয়ে দিয়ে বলেন, চলো বসি।

আমি আর বাবা মসজিদের পাশে চাঙের উপর বসি। বসে বসে আমি বাবাকে দেখতে থাকি। তার হাত-মুখ-গলা যেটুকু শরীর উদোম সব লাল টকটক করছে। গলার মার্বেলের মতো ফোলা অংশটা যেন চামড়া ফুঁড়ে বের হয়ে আসবে। হাতের রগগুলো এমনভাবে উঁচু হয়ে আছে যেন আমি এক-একটা দড়ির মতো টেনে ধরে বের করতে পারবো। একটু বসে বাবা কল চেপে পানি নিয়ে ওজু করেন। আমাকেও ওজু করিয়ে নামাজে দাঁড় করিয়ে দেন। বাবার সুরেলা আর ভরাট কণ্ঠস্বরে চারপাশ গম গম করে ওঠে!

আমি শুধু বাবার মতো করি। বাবা হাত তোলেন, আমিও হাত তুলি; বাবা হাত বাঁধেন, আমিও হাত বাঁধি; বাবা সেজদা করেন, আমিও সেজদা করি; বাবা মুনাজাত করেন, আমিও মুনাজাত করি। কি মুনাজাত করেন বাবা আমি তা বুঝতে পারি না। আমার মায়ের কথা মনে হয়, সত্যিকারের মুনাজাত আল্লা কবুল করেন। আমি সত্যিকারের মুনাজাত করি – বাবার যেন আরেকটু বুদ্ধি হয়, তিনি যেন বুঝতে পারেন সাইকেলটা মোটর সাইকেল হয়ে যাওয়ার পর ওটা আর চালাতে হয় না। তাহলে বাবার আর কষ্ট হবে না।

কিন্তু আমি জানি, আল্লা বাবার চেয়েও অ-নে-ক অ-নে-ক বড়ো। ছোটদের কথা বড়োরা শোনেন না, আমার মুনাজাতও আল্লা কবুল করবেন না। তাই বাবারা আমাদের কথা কখনো বুঝতে পারেন না, তাদের কষ্টও তাই জীবনভর যায় না।



এই পৃষ্ঠাটি লাইক এবং শেয়ার করতে নিচে ক্লিক করুন

1 thought on “short-story-babar-cycle

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *