micro-story-twince

টুইন্স

রুচিরা মুখোপাধ্যায় দাস

 স্কুল থেকে ফিরে গম্ভীর হয়ে আছে টুকু। যেন কোনো কঠিন অঙ্কের হিসেব মিলছে না তার। মা জিজ্ঞেস করলেও বারবার এড়িয়ে গেছে। আসলে টুকু খুব চাপা স্বভাবের। এইটুকু বয়সেই জীবনের সব হিসেব যেন একাই মেলাতে চায় সে। টুকুর মা স্বাগতা ভেবেছিল, নিশ্চয়ই স্কুলে কিছু হয়েছে। যাই হোক না কেন, রাত পোহালেই টুকুর জন্মদিন। জন্মদিনের আনন্দে নিশ্চয়ই টুকুর মন ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু না। আজ জন্মদিনেও টুকু অন্যমনস্ক। দুপুরে টুকু যা-যা ভালবাসে, ছুটি নিয়ে নিজে হাতে সব রান্না করেছে স্বাগতা। টুকুর ইচ্ছে মত হোটেল ভাড়া করে সন্ধ্যায় বার্থডে-পার্টির আয়োজন করেছে টুকুর বাবা সৌমেন। কিন্তু তবুও টুকুর কোঁচকানো ভুরু সোজা হচ্ছে না কিছুতেই। দুপুরের খাবারও ঠিক মত খেলো না। অবশেষে মাকে সবটা বলেই ফেলল সে,

– ” জানো মা, আমাদের স্কুলের পাশের ফুটপাথে ঠিক আমার মতই দেখতে একটা মেয়েকে কাল দেখলাম। নিজেকে যেন আয়নায় দেখছি। এত মিল! কেমন করে সম্ভব? আমি তো জানতাম শুধু টুইন্স হলেই ….”

 ‘ টুইন্স ‘ শব্দটা শুনে চমকে উঠল স্বাগতা। মনে পড়ে গেল, এগারো বছর আগের আজকের দিনটা। জন্মেছিল টুকু। সাথে যমজ বোন। হাসপাতালে অনডিউটি নার্স স্বাগতার কানে এসেছিল টুকুর জন্মদাতার গর্জন,

– “আবার মেইয়ে। দূর হ। আর তোকে ঘরে নিবো না। যে চুলোয় পারিস-গে থাক…”

দেখেছিল টুকুর জন্মদাত্রীর চোখের জল। নিঃসন্তান স্বাগতা দত্তক নিয়ে সেদিন থেকে হয়ে উঠেছিল টুকুর মা। মায়ের স্নেহে টুকুকে বড় করতে করতে সে যেন ভুলেই গেছিল গত এগারো বছর আগের আজকের দিনটা। টুকুই যেন মনে করিয়ে দিল আবার! কিন্তু আজ হঠাৎ টুকুর মনে এমন প্রশ্ন কেন! বুকটা যেন কেঁপে উঠল স্বাগতার। একরাশ ভয় মুহূর্তে ঢেকে দিল টুকুর জন্মদিনের আনন্দ। কিন্তু টুকুর জন্মদাত্রী যে কথা দিয়েছিল সেদিন, যে সে কোনদিন টুকুর জীবনে ফিরে আসবে না! তাহলে? টুকু কী সত্যিই সব জেনে গেল? টুকুর আসল মা কে? তার একজন যমজ বোনও আছে! সৌমেন বহুবার স্বাগতাকে বলেছিল, টুকুকে সত্যিটা বলে দিতে। কিন্তু স্বাগতা সেটা চায় নি। মন থেকে সে যেন কোনোভাবেই কোনোদিনও ভাবতে চায়নি যে টুকুকে সে জন্ম দেয়নি। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেছে তার। এক মুহূর্ত আর অপেক্ষা না করে সে ছুটে গেল সৌমেনের কাছে। সৌমেন তখন হোটেলে যাবার জন্য রেডি হচ্ছে। কোনো ভূমিকা না করেই স্বাগতা এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলল সব। অবাক হয়ে সৌমেন বলল,

– “তাহলে কী লক্ষ্মী টুকুর স্কুলের পাশের ফুটপাথে… ভেবোনা। আমি কিছু একটা ব্যবস্থা করব। এখন যাও। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও। গেস্টরা এসে যাবে।”

স্বাগতা অস্ফুটে বলল,

– ” তুমি টুকুকে নিয়ে এগোও। আমি আসছি।”

          বার্থডে-পার্টি শুরু হয়েছে। এবার কেক কাটতে হবে। কিন্তু স্বাগতা যে এখনও আসেনি! টুকু মাকে ফোন করলেও ফোন ধরছে না মা। মায়ের জন্য বহু অপেক্ষার পর টুকু কেক কাটতে এগোলো। ছুরিটা হাতে নিতেই সবার ‘ হ্যাপি বার্থডে ‘ বলার আগে হঠাৎ ভেসে এলো স্বাগতার গলা,

– “দাঁড়াও টুকু। আজ তোমার সাথে তোমার টুইন্সও কেক কাটবে।”

টুকুর মত একই চেহারার আরও একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্বাগতার হাত ধরে। তফাৎ শুধু পোশাকে। সবাই হতবাক। একদৃষ্টিতে অবাক চোখে তাকিয়ে রইল টুকু তার টুইন্সের দিকে। অজান্তেই তার হাত থেকে পড়ে গেল ছুরিটা। স্বাগতা এগিয়ে এসে ছুরিটা তুলে দিলো দুই বোনের হাতে। জন্মদাত্রী লক্ষ্মীকে দাঁড় করালো টুকুর পাশে। একসাথে কেক কাটলো দুই বোন। এগিয়ে এলো সৌমেন। ফিসফিসিয়ে দাঁতে-দাঁত চেপে স্বগতাকে বলল,

– “ভুলে যেও না, আমাদের স্ট্যাটাস কিন্তু আলাদা।”

মুচকি হেসে স্বাগতা বলল,

– “তুমিও ভুলে যেও না, যশোদা-দেবকীর স্নেহ কিন্তু আলাদা নয়…”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *