short-story-sohaag-raat

সোহাগ-রাত

শুভমানস ঘোষ

সি বিচ থেকে সোহাগ হোটেলে এসে রুমে ঢুকতেই আনন্দে চিৎকার করে উঠল স্কিনা। বেশ সুন্দর নরম মুখ-চোখ স্কিনার। ব্যাঙ্ককের পাটায়া বিচ লোভনীয় রমণীদের স্বর্গরাজ্য। এমন সুসভ্য-আন্তরিক ভাবে পুরুষদের হাতছানি দেয়, কাছে গেলে যে-মধুর ভাষায় অভ্যর্থনা করে, সাড়া না দিয়ে পারা যায় না। তবে সমস্যা একটাই। সকলে তত ভাল ইংরাজি জানে না। ভাঙা ভাঙা ইংরাজি ও কখনও কখনও গুগুল ট্র্যানস্লেটার দিয়ে কাজ চালাতে হয়। সেদিক থেকে স্কিনা নির্ঝঞ্ঝাট। মুখে ইংরাজির খই ফুটছে। এক-আধখানা ভারতীয় হিন্দি বুলিও রপ্ত করেছে।

প্রথম যৌবনে বেকার অবস্থায় অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে দাঁড়িয়ে একবারই প্রেম করেছিল সোহাগ। তাতে শোচনীয় ভাবে ধাক্কা খেয়ে বিয়েই করেনি। টুরিস্ট কোম্পানি খুলে এখন লোককে দেশ-বিদেশ ঘোরায় আর নিজে ঘণ্টামাপা প্রেমে বুঁদ হয়ে থাকে।

প্রেমিকা সুগন্ধার কবেই বিয়ে গেছে। কিন্তু সুখ সুগন্ধার কাছে অধরা। ঘুমন্ত স্বামীকে লক্ষ করে “ওয়ার্থলেস!” উচ্চারণ করে ছাদে চলে যায়। কাঁদে আর ফোনে আকুল ভাবে সোহাগকে ডাকে।

সোহাগ ঠেকে-শেখা ঘরপোড়া গোরু। “হুঁ-হাঁ!” দিয়ে কাজ সারে। ব্যাঙ্কক, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম জিন্দাবাদ! হলই বা নগদে কেনা ঘণ্টা, তাদের দেশের মনোরম রাত-পরিরাই জানে, পুরুষকে কী পবিত্র ভাবে ভরিয়ে দিতে হয়। প্যানপ্যানে ও অতৃপ্ত-ক্ষুব্ধ বাঙালি প্রেমে আর রুচি ওঠে না তার।

সে যে-ট্যুরিস্ট পার্টিকে গাইড করে এনেছে, ওয়াকিং স্ট্রিটে একটু ঘুরিয়ে দিয়ে তাদের ট্যাক্সিতে তুলে হোটেল পাঠিয়ে একাই চরতে বেরিয়েছিল সোহাগ। ইরোটিক মিউজিকে রঙিন ভোগের সাম্রাজ্যে ঘুরে-বেরিয়ে, ড্যান্স বারে শরীর সেঁকে, সি বিচে এসে সার দিয়ে দাঁড়ানো মেয়েদের মধ্যে স্কিনাকে দেখে চমকে গেছিল।

আরে সুগন্ধা না? ছোট থেকেই চোখে গোল চশমা তার। এরও তাই। সেই রকম হৃষ্টপুষ্ট চেহারা! হাত নেড়ে তার দিকে চেয়ে মধুর হাসছে! হাসিতেও ঠিকরে পড়ছে সুগন্ধা। ফোনে তার ডাক পেয়ে এত দিন মুখ ফিরিয়ে ছিল। আজ কি তবে সাড়া দেওয়ার দিন? তাকে দুঃখ দিয়ে বড় চাকুরের গলায় ঝুলে পড়ে হাত কামড়াচ্ছে! স্কিনাকে দিয়ে তার প্রতিশোধ তোলার এত বড় সুযোগ দু’পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সামনে!

চিৎকার শেষ। থ্রি স্টার হোটেলের সাদা ধবধবে বেডে ঝাঁপিয়ে পড়ে মনের আনন্দে একটু লাফালাফি করে স্কিনা গলা জড়িয়ে ধরেছে সোহাগের। আদর করতে করতে বলছে, “ইউ আর সো সো কিউট গাই! আই লাভ ইউ জান!”

জান! সোহাগ হা-হা করে হেসে হাত টানল স্কিনার। ইংরাজিতে বলল, “চলো আমায় স্নান করিয়ে দেবে।”

“রাইট। বাথ ফার্স্ট। ও কে হানি!” স্কিনা নেমে পড়ল। বেদম উত্তেজিত, “তোমাকে আমার ভীষণ ভীষণ পছন্দ হয়েছে। টল, স্ট্রং, হ্যান্ডসাম গাই! সারারাত একসঙ্গে থাকব, ওয়াও!”

ক্ষণিক মিলনে বিজনেসকে থোড়াই কেয়ার, এমন প্রেমকাতর নারী মেলা ভার। এমনি এমনি পুরুষ পতঙ্গের মতো দল বেঁধে ছুটে আসে এখানে! অতি সামান্য অর্থের বিনিময়ে অসামান্য আনন্দ আর কোথায় মিলবে? এরা কিন্তু শুধু অর্থকে নয়, পুরুষকেও ভালবাসে। ভালবাসায় যাতে কম না পড়ে, কাস্টমার ফুল স্যাটিসফায়েড হলে তবেই রিসেপশন কার্ড ছাড়ে তাদের। কোনও অভিযোগ এলেই সঙ্গে সঙ্গে কড়া ব্যবস্থা।

স্কিনার খুশি-চকচকে মুখের দিকে তাকাল সোহাগ। পুরুষের প্রথম স্পর্শে সুগন্ধাও এভাবেই তাকিয়েছিল। তাও তাকে ফেলে বিয়ের পিঁড়িতে গিয়ে উঠে পড়েছিল! চোয়াল শক্ত হয়ে এল তার। স্কিনাকে পরম মমতায় জড়িয়ে ওয়াশ রুমে চলে গেল।

গরম জলে তৃপ্তি করে স্নান করে চলে এল বিছানায়। সে শুয়ে আছে। স্কিনার গায়ে নরম টাওয়েল। তাকে যত্ন করে সুগন্ধি তেল মাখাচ্ছে। টাওয়েল থেকে থেকে খসে পড়ছে। দুষ্টু হেসে চট করে তুলে ঢেকে ফেলছে শরীর! ঝলসে যাচ্ছে চোখ, আরামে বুজে আসছে, মোবাইলের শব্দে বিরক্ত হল।

এমন সুখের মুহূর্তে কোন বেরসিক? নির্ঘাত টুরিস্ট পার্টি। বিদেশে পা দিয়েই সব হাত-পা পেটের ভেতর ঢুকিয়ে ফেলে। “এটা করো সোহাগ! সেটা এনে দাও!” সে যেন চাকর। কিন্তু ঘাঁটানোও যায় না। কাস্টমার ফসকে যাবে।

“হুঁ দ্য ভেভিল ইজ দেয়ার?” চোখ খুলে গেল সোহাগের।

পাশে-রাখা সোহাগের জীবন্ত মোবাইলের স্ক্রিনে চেয়ে স্কিনা টেনে টেনে বলল, “সুগন্ধা! ইওর ওয়াইফ?”

বাঁচা গেল! মুচকি হেসে সোহাগ বলল, “নো ইয়ার! সাইলেন্ট করে দাও! বাজুক!”

সুগন্ধা জেনেছে, সোহাগ ব্যাঙ্ককে এসেছে। রোজ নিয়ম করে ফোন করছে। বেশি চঞ্চল হতে বারণ করছে। শরীরের দিকে নজর দিতে বলছে।

বউ তো হল না। এখনও শরীরের দিকে নজর! ধরলেই কেঁদে পড়বে, “তাড়াতাড়ি ফের সোহাগ! ওখানে আর থাকিস না! একবার আয় লক্ষ্মীটি। আমি যে পারছি না! কেন পড়ে আছিস ওখানে? কত বার বলেছি, আমায় ক্ষমা কর! ক্ষমা কর না বাবা!”

যতই বাবা-বাছা করো, করছে ক্ষমা! বড্ড অসহ্য সুখ! তেলের বোতল কেড়ে টাওয়েল ছুড়ে ফেলে স্কিনাকে বুকে টেনে নিল সোহাগ। প্রতিশোধ! প্রতিশোধ!

স্কিনা যেন তারই আকুল অপেক্ষায় ছিল। “ওহ্ গড!” বলে শীৎকার দিয়ে তৈলাক্ত বুকে মুখ গুঁজে দিল সোহাগের।

কেটে গেল আধঘণ্টা। আবার ফোন বাজল‌। বেরসিক নারী! এবার নিজেই হাত বাড়িয়ে থাবড়া দিয়ে মোবাইলের টুঁটি চেপে লাইন অফ করে আনন্দে মেতে উঠল সোহাগ!

অনেক ভারতীয় নারী নেহাতই দয়াভরে আনন্দকে পুরুষের গ্রহণের সামগ্রী করেই রেখে দেয়। এ মেয়ে হাত পেতে মুঠো মুঠো গ্রহণ করে দ্বিগুণ করে ফিরিয়ে দিচ্ছে। এমন অপরিমেয় সুন্দর মুহূর্তে কেন বার বার জ্বালাচ্ছে সুগন্ধা! মায়া-দয়া কি কোনও কালেই হবে না তার?

কেটে গেল আরও অনেকটাই সময়। ইয়াং রাত সোহাগ-রাত হয়ে এল। খাঁজ-বাঁক, সটান হয়ে জেগে-ওঠা উপত্যকা-অববাহিকাময় অপ্রতিরোধ্য নারীতে বদলে এল। তখনই তাল কাটল। একেবারে আচমকা।

“ইউ রাস্কেল!” বলে স্কিনা তাকে ঠেলে ধড়মড়িয়ে উঠে বসল। তার মুখের দিকে চেয়ে আনন্দ আতঙ্কে পরিণত হল সোহাগের। কাকে দেখছে সে? সুগন্ধা! অবিকল সুগন্ধা! এত ক্ষণ চোখ ছিল ঢুলু ঢুলু। ভাব বদলে গেছে স্কিনার। কটমট করে তাকাচ্ছে। এরা কি বাংলাও জানে! পরিষ্কার বাংলায় বলছে, “এত করে ডাকছি! ফোনও ধরলি না? তুই মর শয়তান!”

“মাই গড!” বলে বেড থেকে ছিটকে গেল সোহাগ। চিৎকার করে পালাতে যাবে, ঝড়াং করে মোবাইল বাজতে শুরু করল।‌ সঙ্গে সঙ্গে নর্মাল হয়ে গেল স্কিনা। চেপে ধরল সোহাগের হাত, “হোয়াট হ্যাপেন্ড জান? এনিথিং রং? মাই হাজব্যান্ড লেফট মি ফর এভার! টু-ডে ইজ মাই সেকেন্ড হানিমুন নাইট! কাম অন! এনজয় টিল দ্য লাস্ট ড্রপ!”

তখনও হাত-পা কাঁপছে সোহাগের। কুঁকড়ে গেছে শরীর। প্রাণ বাঁচাতে মোবাইলটাকেই কুটোর মতো আঁকড়ে ধরল। সুগন্ধা নয়। আননোন নাম্বার। বিস্ফারিত চোখে স্কিনার দিকে চেয়ে লাইন নিয়ে গলা কাঁপছে তার, “হ্যা-হ্যালো?”

উত্তরে ও-প্রান্ত থেকে যে-উত্তর এল, অকল্পনীয়। সুগন্ধা যেখানে থাকে, সেখানকার থানার আই সি ফোন করেছেন। সুগন্ধা বাড়ির ছাদ থেকে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করেছে। তার লাস্ট কলে সোহাগের নাম। সে কোথায়? এখনই তাকে আসতে হবে। সুগন্ধার মৃত্যুর তদন্তে তাকে এখনই জেরা করতে চায় তারা।

চরম বিপদ ঘাড়ে এসে পড়েছে! তাও ভারী অদ্ভুত, সোহাগের ভাবান্তরই হল না। সে ব্যাঙ্ককে, হাতে ভারতীয় পুলিশের অ্যাক্টিভ এত্তেলা— সব ভুলে গেছে। বেশ বুঝতে পারছে, বাড়ির ছাদ থেকে মরেই সুগন্ধা সোজা এসে ভর করেছে স্কিনার ওপর। আবার যদি সে সুগন্ধা হয়ে যায়, থর থর করে কাঁপছে। “নো! নো!” করে স্কিনার হাত ছাড়িয়ে হুড়মুড় করে কার্পেটে মুখ গুঁজে পড়ল।

“হ্যালো! হ্যালো!” হাত থেকে ছিটকে-যাওয়া মোবাইলে সোহাগ রাতের কর্কশ বার্তা ভাসছে। ভাসছে! একটানা!

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *