অনিকেত সন্ধ্যা
ছন্দা বিশ্বাস
উদবিগ্ন মনে মেসেঞ্জার খুলে বসে ছিল ঋষাণ। সন্ধ্যের পর থেকে একবারের জন্যেও অনলাইন হতে দেখা যায়নি স্বচ্ছতোয়াকে। কপালে ভাঁজ পড়ল, কোথায় যেতে পারে? অস্থির পায়ে ঘর-ব্যালকনি-ঘর করতে লাগল। আর ঘন ঘন মোবাইল চেক করতে লাগল, দেখি কোনো সাড়া শব্দ পাওয়া যায় কিনা।
কয়েক মাস হল স্বচ্ছতোয়ার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে ঋষাণের। শহরের একটা অনুষ্ঠানে স্বচ্ছতোয়া এসেছিল আমন্ত্রিত হয়ে। ফটোগ্রাফি ওর প্যাশন। দেশ বিদেশের সুন্দর সব জায়গার নজর কাড়া ছবিগুলোর বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছে। পুরস্কার এবং প্রশংসার অভিলাষী নয় সে। তবু আমন্ত্রণ উপেক্ষা করা তার কাছে অভব্য মনে হয়েছে আর সেই কারণেই সে ছুটে এসেছে।
ঋষাণ এর আগে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় মেয়েটির পাঠানো ছবি দেখেছিল, নাম শুনেছিল আগেই। ওর লেখা ভ্রমণ-কাহিনি পড়ে মুগ্ধ হয়েছে। সেদিন চাক্ষুষ দেখা হল। নেভি ব্লু শর্ট লেন্থ স্কার্ট আর মেরুণ রঙ্গের টপ পরা ছিল। সানগ্লাশটা মাথার উপরে তোলা, ঠোঁটে হাল্কা লিপস্টিক, চোখে কাজল, ডান হাতে ঘড়ি আর চোখের কোণে মিষ্টি হাসি লুকানো ছিল।
২
আপনি আমাকে আগে থেকেই চিনতেন?
ঋষাণ আলতো মাথা নাড়ে, চিনতাম।
এর আগে আমায় কোথায় দেখেছেন বলুন তো? জেরা নয়, নিতান্ত কৌতুহলী স্বচ্ছতোয়া। মৃদু হাসি চোখের পাতায়।
এর আগে? দাঁড়াও, এক মিনিট, ওহ, মনে পড়েছে সেদিনের অনুষ্ঠানে। আমি অডিটোরিয়ামের ভিতরে দূরবর্তী কোণে কথায় ব্যস্ত ছিলাম। বহুদিন বাদে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়েছে। কথার ভিতরেই দূর থেকে শুনতে পাচ্ছিলাম কী সুন্দর বক্তব্য রাখছে একজন মহিলা।
স্বচ্ছতোয়ার দুটি চোখে অনাবিল হাসি। তবে আপনি মানে রিপোর্টারেরা একটু বাড়িয়ে কথা বলেন। সরি, কিছু মনে করবেন না। অকপটে সত্যিটা বলে ফেললাম।
কোনটা বলত? ঋষাণের উজ্জ্বল চোখ দুটোতে হঠাৎ সামান্য বিমর্ষতা। তাকিয়ে আছে স্বচ্ছতোয়ার মুখের দিকে, কাজল কালো চোখ দুটোর দিকে। চোখের তারায় পড়ার চেষ্টা করছে ওর মুখের আর চোখের ভাষা একই কিনা।
এই তো সেদিন আপনার একটা লেখা পড়লাম আপনি যুদ্ধ বিধ্বস্ত আফগানিস্তান থেকে কীভাবে পালিয়ে এসেছেন তার রোমহর্ষক বর্ণনা দিলেন। সত্যি কি আপনি সে সময় ওখানে ছিলেন? যেমন ভয়ংকর সব বিবরণ তুলে ধরেছেন, সত্যি কি আপনার জীবনে ওরকম সব ঘটনা ঘটেছিল? ঋষাণ সরু চোখে তাকিয়ে থাকে স্বচ্ছতোয়ার দিকে।
আস্তে আস্তে ঋষাণের মুখের জ্যামিতিক রেখা বদলে যায়। ঠোঁট চেপে রাখে। দুটি চোখে ধূসর ছায়া পড়ে। ঝকঝকে আকাশের বুকের আলতো মেঘের পরশ। আসলে সে ফিরে গেছে সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোতে। গলার স্বরে বিষণ্ণতা। ধীর গলায় বলে, তাহলে কীভাবে কথাগুলো বললাম বলে তোমার মনে হয়েছে? এদেশে বসে দূর আফগানিস্তানের লোকের মুখে শুনে শুনে?
কথা বলার ভঙ্গী শুনে মনে হল ঋষাণ কিছুটা হলেও আহত হয়েছে। গলার স্বরে বিমর্ষতার ছাপ স্পষ্ট। সকলেই জানে ঋষাণ অসমসাহসী একজন সাংবাদিক। এর আগেও দুর্গম জায়গা থেকে সে খবর সংগ্রহ এনেছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছুটে গেছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। ওর প্রতিটি প্রতিবেদন মানুষ মুগ্ধ হয়ে পড়ে।
গলার স্বর খাদে নামিয়ে বলে, কী করে বুঝলে সত্যি আমি সেখানে যাইনি?
স্বচ্ছতোয়া সেই স্বর শুনে চুপসে যায়। ঋষাণের মুখের দিকে তাকিয়ে থমকে যায়। খুব সামান্য সময়ের ভিতরে নিজেকে সামলে মুখে মৃদু হাসি নিয়ে বলে, ওদের হাতে পড়লে কি আর আমার সামনে দাঁড়িয়ে এখন কথাগুলো বলতে পারতেন? যা খতরনক ওরা। যা সব দেখি এবং শুনতে পাই।
ঋষাণ ক্ষণেক নীরব থাকে।
আমি বোধহয় আপনাকে না বুঝে আঘাত করলাম। তাই না?
নাহ, ঠিক তা নয়। হঠাৎ গম্ভীরতা মুছে ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসির রেখা ফুটে ওঠে।
স্বচ্ছতোয়া বুঝতে পারে। তারপরেই রিন রিন সুরে হেসে ওঠে।
ঋষাণ ডানে বায়ে ঘাড় ঘোরায়।
কিছু খুঁজছেন?
হ্যাঁ,
কী বলুন তো?
ঝর্ণার জলের শব্দ শুনতে পেলাম। কিন্তু ঝর্ণাটা কোথায় সেটাই খুঁজছি।
খুঁজতে থাকুন, পেলে আমায় জানাবেন।
প্রাক সন্ধ্যায় পশ্চিমাকাশে তখন রঙ্গের প্রলেপ লেগেছে। একটা উঁচু টিলার উপরে দুইজনে সেদিন দাঁড়িয়েছিল। সেদিন অনুষ্ঠানে দেখার পরে আজ প্রথম দেখা করল এই জায়গায়। লাল ফুলে ভরা রুদ্র পলাশ গাছের নীচে দাঁড়িয়েছিল দুজনে। আকাশের সোনা রং ছুঁয়ে দিল স্বচ্ছতোয়ার মুখে চিবুকে। ওর মোম শরীরে পিছলে যাচ্ছে বিকেলের মায়াবী আলো। ঋষাণ ভাবালু দৃষ্টিতে দেখছিল স্বচ্ছতোয়াকে। সৃষ্টিকর্তার কী নিখুঁত সৃষ্টি। মনে মনে তারিফ করল।
সেদিনের পরিচয়ের পরে আজ প্রথম একান্তে দেখা করল, কথা হল বহুক্ষণ। একটু একটু করে দুজনের কথায় গভীর আন্তরিকতা প্রকাশ পেল। এরপরে খুব স্বাভাবিক ভাবে যে ভাবে আর পাঁচটা প্রেমিক-প্রেমিকার জীবন কাটে তেমনি চলছিল। দুই জনের কাজের শিডিউল থেকে সময় বের দেখা সাক্ষাৎ সবই স্বাভাবিক ভাবে চলছিল। এই কয়েক মাসে ওরা দুইজনে পরস্পরের কাছাকাছি চলে এলো। মনের কাছাকাছি তারপরে। কবেই যেন স্বচ্ছতোয়া ঋষাণের মন বাউলের একতারাটি হয়ে গিয়েছিল।
৩
সারাটা রাত মোবাইল অন ছিল। চোখ ছিল ম্যাসেঞ্জারে। পাশে খুলে রাখা ল্যাপটপে কাজ করছিল আর ঘন ঘন মোবাইল দেখছিল। কোনোদিন কাজের চাপ বেশী থাকলে সন্ধ্যের সঙ্গে সঙ্গে বসে পড়ে। দশটার ভিতরে লেখা কমপ্লিট করে জমা দিয়ে তবে ডিনার সারে। তারপরে নিজের লেখা লিখতে বসে। মাঝে মাঝে বন্ধুদের কথার উত্তর দেয় মেসেঞ্জারে। রাতে স্বচ্ছতোয়ার সঙ্গে মেসেঞ্জারে কথা হয়।
খুব বেশী দেরী করলে আবার স্বচ্ছতোয়ার অভিমান হয়। অফ লাইন হয়ে যায় স্বচ্ছতোয়া, মোবাইল সাইলেন্ট মোডে রাখে। ইচ্ছা করেই যেন ঋষাণকে চাপে রাখে। ওর ভালোবাসার পরীক্ষা নেয়। ওর উদ্বেগ দেখলে স্বচ্ছতোয়া যেন খুশিই হয়। মজা পায়। এও যেন এক রকম খেলা। প্রেমিকের সঙ্গে লুকোচুরি খেলা।
ঋষাণ স্বচ্ছতোয়াকে ফোনে না পেয়ে পাগলের মতো ঘরময় পাক খায়। ঘর অন্ধকার করে জানালার সামনে এসে দাঁড়ায়। পশ্চিমের চাঁদ মধ্যগগন পেরিয়ে পূবের দিকে চলতে শুরু করেছে। ঘড়িতে দুটো পেরিয়ে গেছে। বড্ড অস্থির লাগছে, কিছুতেই ঘুম আসছে না স্বচ্ছতোয়ার সঙ্গে কথা বলতে না পারলে। কী হল মেয়েটার একবার জানতে হবে তো। ফোনেও পাচ্ছে না। আউট অফ রীচ শোনাচ্ছে। কোথায় গেল? এক সময়ে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল। সেদিন অনেক রাতে টুং করে শব্দ হতেই চোখ চলে যায়। মেসেঞ্জারের লেখাটা ফুটে ওঠে। দ্রুত হাতে ঋষাণ টাইপ করে, কোথায় গেছ?
নেপালে।
নেপালে? কই আমায় বললে না তো?
হঠাৎই এই অ্যাসাইনমেন্টটা হাতে এলো। আর আমাকেই সিলেক্ট করেছে দেখলাম।
তোমায় কত বার ফোন করেছিলাম জানো? সুইচড অফ জানাল। কখনও আউট অফ রীচ বলছে।
ওহ, সরি। তাই নাকি? আসলে আমার ফোনে চার্জ ছিল না। তা ছাড়া এখানে নেট ওয়ার্কের খুব সমস্যা। হোটেলে পৌঁছতে পৌঁছতে অনেক রাত হয়ে গেল। এখানে চেক ইন করে তারপরে চার্জ দিলাম।
পাওয়ার ব্যাংক ছিল না সঙ্গে?
ছিল তো। তারও চার্জ খতম।
বাহ, চমৎকার।
আমিও তো তোমাকে ফোন করে করে ফ্যাটিগড হয়ে গেলাম। কী হয়েছিল তোমার বলো তো?
সরি, এক্সট্রিমলি সরি। পি এমের সঙ্গে বৈঠক ছিল। গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। যাক, বলো কবে ফিরছ?
এক সপ্তাহ তো লাগবেই।
এক সপ্তাহ। কত জায়গা কভার করতে হচ্ছে। এতো এতো দেখবার জায়গা আছে। সব জায়গায় কি আর যেতে পারব? কী সুন্দর সব ভিউ, উফ, তোমায় না দেখালে স্বস্তি পাচ্ছি না।
আমিও তো স্বস্তি পাচ্ছি না তুমি না ফেরা পর্যন্ত। ওই সব পাহাড়ি পথে ঘুরে বেড়াও, আমার যে কি টেনশান হয়।
টেনশান মাত কিজিয়ে হুজুর।
মন তো মানে না। সত্যি এরপর আর তোমাকে দুর্গম জায়গায় যেতে দেব না কিছুতেই।
বলছ? তাহলে তো আমার প্রফেশান, হবি সব জলাঞ্জলি গেল।
যায় যাক। অনেক হয়েছে এবারে থিতু হও।
আমিও তো সেই একই কথা বলতে পারি। কেমন? তুমিও যে সব জায়গায় যাও আমার তো ভয়ে হাড় হিম হয়ে আসে।
কী করব, সাংবাদিকতা করব আবার স্পটে যাবো না তা কী করে হয়?
আমিও একই কথা বলছি, এবারে থিতু হও।
তোমার কোলের ভিতরে নীলকন্ঠ হয়ে শুয়ে থাকব বলছ?
ইউ আর ভেরি নটি। স্বচ্ছতোয়ার চোখে মুখে লাজুক হাসি ছড়িয়ে পড়ল। এই এবার অফলাইন হতে হবে, লট অফ ওয়ার্ক টু বি ডান…
৪
টুং করে শব্দ হয় মেসেঞ্জারে। পূষণ লিখেছে, এই ঋষাণ?
বল?
শুনেছিস?
কোন ব্যাপারে?
নেপালের খবর কিছু শুনিসনি?
কই না তো? কী হয়েছে?
দ্যাখ নিউজ ইলেভেন-এ পেখম পুরকায়স্থর এক্সক্লুসিভ ফুটেজ-
ঋষাণ টিভি সুইচ অন করে। চ্যানেল বাটন প্রেস করে নিউজ ইলেভেন ওপেন করতেই চোখে পড়ে বিভীষিকাময় দৃশ্য। গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। আবার ভয়ংকর ভূমিকম্প নেপালে। তবে এবারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পোখরা। পোখরা থেকে আরো কিছুটা দূরে। রিখটার স্কেলে ফাইভ পয়েন্ট নাইন। কেঁপে উঠেছে কাঠমান্ডুর ললিত পত্তন শহর। গতবারের প্রবল ভূমিকম্পে বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী স্থ্যাপত্য এবং অট্টালিকা প্রায় সমস্ত ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। এবারেও কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাটন দরবার, মন কেমনা মন্দির, জানকী মন্দির সহ অসংখ্য মন্দির। তবে পোখরার বীভৎসতা সব কিছুকে ছাপিয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা একশো ছাড়িয়েছে। ক্রমে বাড়ছে নিহতের সংখ্যা। আহত হয়েছেন হাজারের উপরে মানুষ। নিহতের সংখ্যা আরো বাড়বে। পাহাড়ি দুর্গম অঞ্চলে সেই ভাবে উদ্ধার কাজ করা সম্ভব নয়। অনেক জায়গায় পথ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ভূমিকম্পের ফলে মাউন্ট এভারেস্টে যে তুষার ধস হয় তার ফলে এভারেস্ট ক্যাম্পে মারা যান বেশ কিছু পর্বত আরোহী। অনেকে গুরুতর আহত হয়েছেন। ঋষাণের হ্রিদ স্পন্দন বাড়ছে। শুনতে পাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী নেপালের ভূমিকম্পের সংবাদ শোনা মাত্র সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। ত্রাণ, ওষুধ পত্র সেনা চিকিৎসক দল পাঠানোর কথা ঘোষণা করেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ সাহায্যের জন্যে এগিয়ে আসছে। কী আশ্চর্য এত বড়ো বিপর্যয় ঘটে গেছে অথচ ও কিছুই জানতে পারেনি।
টি ভি চ্যানেলে একের পর এক খবর দেখিয়ে চলেছে। বাকী কথাগুলো ঋষাণের কান পর্যন্ত পৌঁছেও ফিরে আসে। মস্তিষ্কে কোনোরকম সংকেত পৌঁছায় না। ও যুদ্ধকালীন তৎপরতায় পিঠের ব্যাগে চটপট দরকারী কিছু জিনিসপত্র ভরে নেয়। ওদের অ্যাপার্টমেন্টের উল্টো দিকে এ টি এম থেকে চটপট বেশ কয়েক হাজার টাকা তুলে গুছিয়ে নেয়। অন্য সময় এ টি এমে ভরসা থাকলেও এখন সম্ভব নয়। দ্রুত হাতে সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে ও বেরিয়ে যায়। সোজা এয়ারপোর্টে। গাড়িতে আসার পথে মোবাইল চেক করতে গিয়ে নজরে পড়ে। গতকাল ফোনের লাইন না পেয়ে মেসেজ করেছিল স্বচ্ছতোয়া। কাজের চাপে দেখা হয়নি। গতকাল কাঠমান্ডু থেকে ও পোখরার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল। আজ সকালে পুন হিল যাওয়ার কথা। মেসেজটা দেখে ঋষাণের শরীরে হাজার ওয়াটের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ল। মাথার ভিতরে সুনামীর তান্ডব চলছে। সংবাদে তো দেখাচ্ছে বিধ্বংসী অবস্থা পোখরাতেই। পশ্চিমের কয়েকটা জায়গা একেবারে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। কিচ্ছু মাথায় কাজ করে না ঋষাণের। কয়েক জায়গায় ফোন করে নিজের পরিচয় দিয়ে একটা সেনা বাহিনীর হেলিকপ্টারে চেপে বসে। মোবাইল খুলে আবার দেখে। হোয়াটসঅ্যাপে শুধু একটা কথাই লেখা আছে, পুন হিল।
ঋষাণ জানে গোরে পানির কাছে একটি পাহাড় চূড়া এই পুন হিল। তবে কি ও পুন হিল গিয়েছে নিসর্গের ফটো তুলতে। ঋষাণ জানে পুন হিলের অবর্ণনীয় সৌন্দর্যের কথা। পুরোটাই ট্রেকিংয়ের পথ। বেশ দুর্গম পথঘাট। এখান থেকে হিমালয়ের অন্নপূর্ণা এবং ধবলগিরি রেঞ্জ খুব সুন্দর দেখা যায়। ৩২১০ মিটার উঁচুতে। সেদিন স্বচ্ছতোয়া যখন পোখরা যাবার কথা লিখেছিল ট্রেকিং করতে, ঋষাণ শুধু বি কেয়ারফুল, তোয়া লিখেছিল। এর বেশী কিছু লিখতে পারেনি। এটা ওর প্রফেশান। ওর প্যাশান ফটোগ্রাফি। কোনো দুর্গমতাই বাধা হতে পারে না সেটা ঋষাণ ভালোই জানে। এতো এতো জায়গায় ও যাচ্ছে। খুবই সাবধানী স্বচ্ছতোয়া এই কয়েকমাসের পরিচয়ে বুঝতে পেরেছে।
বেশ কয়েকবার ফোন করল। বাজছে, বেজেই চলেছে অথচ ধরছে না। কেন? কপালের ভাঁজ দৃঢ় হচ্ছে। কয়েকটা কথা মেসেজ করে রাখল। জানে না কোথায় আছে। কী অবস্থায় আছে। কারো কাছ থেকে জানারও উপায় নেই। ঋষাণ নেপালে যাচ্ছে শুনে বন্ধুরা অনেকেই নিষেধ করেছিল, যাস না, গেলেও পৌঁছুতে পারবি না। ওদিকের পথ ঘাট সব বিপর্যস্ত। বিশাল ধ্বস নেমে পথের কিছুই অবশিষ্ট নেই। সে কারো নিষেধ বা অনুরোধ রাখেনি। কীভাবে যাবে, কখন সেখানে পৌঁছবে সেটাই মাথার ভিতরে চক্কর দিয়েছে। একটা চিল ধূ ধূ মরুবুকে পাক খাচ্ছে। ঋষাণ হেলিকপ্টার উঠে এর ভিতরে বেশ কয়েকবার জলের বোতল খুলে কয়েক ঢোক জল খেয়ে নিল। ওর মোবাইলে স্বচ্ছতোয়ার কিছু কথা রেকর্ড করা ছিল। একটা রবীন্দ্র সঙ্গীত। যেটা ওর রিং টোন ছিল। গতকাল রাতে স্বচ্ছতোয়ার সেই কথাগুলো মোবাইল খুলে দেখেছে আর বুকের ভিতরটা শূন্য হয়ে গেছে ঋষাণের। চোখ বন্ধ করতেই স্বচ্ছতোয়ার সেই অনাবিল হাসি ভেসে উঠল চোখের সামনে। ঝর্ণার জলের মতো স্বচ্ছ সেই হাসি।
৫
সেনাদের সহযোগিতায় ঋষাণ চলেছে পুন হিলের দিকে। মোট পাঁচজন। প্রায় সাড়ে ছয় হাজার ফিটের উপরে এই পুন হিল। ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত শহরগুলো দেখতে দেখতে উপরে উঠছে। যে দেশটা তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বিশ্বের নজর কেড়েছিল হিমালয়ের মানস কন্যা বলা হত যাকে, সেই দেশটার এমন ধ্বংস স্তূপের ছবি সত্যি অনেকের মতো ঋষাণও নিতে পারছিল না। সেবার সার্ক সম্মেলনে কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে কাঠমান্ডুতে এসেছিল। এমন ঠাসা প্রোগ্রাম ছিল যে তেমন ভাবে জায়গাগুলো ঘোরা হয়নি। তাই কাঠমান্ডুতে পা রেখে স্বচ্ছতোয়া যখন ভিডিও কলিং করল ও অবাক হয়ে দেখতে লাগল। এক সময়ে বলল, সাবধানে ঘোরো আমি তোমার চোখে নেপাল দর্শন করব। সেই রাতে দুইজনে বহুক্ষণ চ্যাট করল। তার পরেরদিন থেকে আর লাইনে পাওয়া গেল না স্বচ্ছতোয়াকে। ঋষাণের চাপ ছিল, এক দুইবার ভাবেনি তা নয় মনে মনে বলেছে হয়তো রিমোটে গেছে নেট ওয়ার্কের প্রবলেম হতেই পারে।
ডিজাস্টার টিম প্রচন্ড তৎপরতার সঙ্গে কাজ করছে। কিন্তু এতো দুর্গম জায়গা যে প্রতি মুহূর্তে তারা অসহায় বোধ করছে। পাহাড়ি পথ সব ভেঙ্গে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেছে। বিশাল আকৃতির বোল্ডার ছড়িয়ে আছে চারিদিকের কোথাও কোনো প্রাণের চিহ্ন মাত্র নেই। প্রকৃতির এই ভয়াল বিধ্বংসী রূপ দেখে বাক্যহারা হয়ে গেছে। নটরাজের প্রলয় নৃত্য আরো একবার প্রত্যক্ষ করল নেপাল।
ধ্বংস স্তূপের ভিতরে দাঁড়িয়ে আছে ঋষাণ। দূরে তুষারাবৃত অন্নপূর্ণা আর ধৌলাগিরি পর্বতমালা। এখান থেকে গোরে পানি যাওয়ার কথা ছিল। পুরোটাই ট্রেকিং করতে হবে জানিয়ে দিয়েছিল। ঋষাণ দেখল সেনারা দারুণ তৎপরতার সঙ্গে প্রকান্ড পাথরের তলা থেকে টেনে বের করে আনছে এক একটা মৃতদেহ। বীভৎস এবং কদাকার। ঋষাণ এক নজর তাকিয়েই মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে।
ঋষাণ পোখরাতে ফিরে আসে। সন্ধে পেরিয়ে গেছে বহুক্ষণ। যে হোটেলে স্বচ্ছতোয়া উঠেছিল সেই হোটেলেই উঠেছে। বাড়ি থাকতেই হোটেলের ঠিকানাটা নোটবুকে টুকে রেখেছিল। এখানে মোবাইল কাজ করবে না জানে। হোটেল অর্কিডের রেস্ট্যুরেন্টে বসেছিল। তিন তলায় যে রুমে উঠেছিল সেই রুমটা বন্ধ দেখে এসেছে। রিসেপশানে গিয়ে জানতে পেরেছে আজ সকালেই বেরিয়ে গেছে। কিছু জিনিসপত্র রাখা আছে। ফিরে দুইদিন থাকবে বলে গেছে। আনমনে কফির কাপ হাতে বসেছিল ও।
হঠাৎ কানে আসে,-
আমি চঞ্চল হে আমি সুদূরেরও পিয়াসী…
ঋষাণ চমকে ওঠে। এটাই তো স্বচ্ছতোয়ার রিং টোন। কোথায় বাজছে! পাগলের মতো ছোটে সেই শব্দের অন্বেষণে। একজন হোটেল কর্মী হাত দিয়ে তার গতি রোধ করলেন। যাবেন না স্যার।
কেঁপে উঠল হোটেল অর্কিড। আবার হুড়োহুড়ি চীৎকার শুরু হল। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগল। পড়িমড়ি করে নামতে গিয়ে অনেকেই হুমড়ি খেয়ে পড়ল। হোটেল ম্যানেজার উপরে উঠে সকলে শান্ত হতে বল্লেন। কয়েক সেকেন্ড মাত্র। কাঁপুনি থেমে গেল।
ঋষাণ শুনতে পাচ্ছে, – দিন চলে যায়, আমি আনমনে তারি আশা চেয়ে থাকি বাতায়নে…
৬
স্বচ্ছতোয়া সেদিন ভুল করে মোবাইলটা হোটেলের রুমে ফেলে রেখে যায়। সেটাই বাজছে-
ঋষাণ সেদিনের পর থেকে পোখরাতেই থেকে যায়। ওর তো তেমন কোনো পিছুটান ছিল না। বাবা মারা গেছেন ছেলেবেলায়। মা তার পরপরেই। টানাপড়েনের জীবন ছিল। অনেক ঘাত প্রতিঘাতের ভিতর দিয়ে আজ এই জায়গায় এসে পৌঁছেছে। ঋষাণ যখন একলা থাকে তখন কত কী ভাবে। অতীতের কথা, বর্তমানের কথা। জীবন পদে পদে ওকে বঞ্চনা করছে। ঈশ্বর বারংবার কেন যে ওকে রিক্ত করছেন কে জানে। সামান্যতম সুখের হদিস পেতে না পেতেই দুঃখের অমানিশায় ডুবে যেতে হল। জানালা দিয়ে বরফাবৃত হিমালয়ের দিকে তাকিয়ে ভাবে, এ কী খেলা খেলছ তুমি সম্রাট!
যখন খুব একা লাগে তখন ওর মোবাইল থেকে স্বচ্ছতোয়ার ফটো বের করে দেখে। যাকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেছিল। কে জানত এতো বড়ো বিপর্যয় ঘটে যাবে। কে জানত সব কথা চাপা পড়ে যাবে ধ্বংস স্তূপের তলায়। ওই দুই চোখে আর কখনো আলো জ্বলবে না। ঝর্ণার মতো স্বতোৎসারিত হাসি আর কোনোদিন শুনতে পাবে না। বড়ো একা লাগে আজকাল, ভীষণ একা। বিষাদের চাদরে মুড়ে যায় চারিধার। ঋষাণ আকন্ঠ পান করে এলিয়ে পড়ে সোফায়। কিছুই ভাল লাগে না আজকাল। সব কিছু শূন্য মনে হয়।
তবু কোন এক অমোঘ টানে বিকেল হলেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। ও যেখানে থাকে তার থেকে মিনিট পাঁচেক দূরে একটা ভিউ পয়েন্ট আছে। তিন দিক পাহাড় দিয়ে ঘেরা। পাইনের সারি নীচ থেকে উপর পর্যন্ত যেন সার বেঁধে প্রার্থনায় রত। অনেক উপরে একটি গুম্ফা আছে। তার সোনালী চূড়ায় যখন বিকেলের অস্তগামী সূর্যের আলো এসে পড়ে তখন বড্ড মায়াবী মনে হয়। রামধনু রঙ্গের গোধুলি আকাশ বারে বারে তার কথা মনে পড়ায়। মনে হয় স্বচ্ছতোয়া যেন এই আকাশেই কোথাও লুকিয়ে আছে। এই রঙ্গের ভিতরে মিশিয়ে দিয়েছে তার সমস্ত সত্তা। নীল অম্বরে লীন হয়ে আছে।
পশ্চিম আকাশে সেই সময়ে লেখা হতে থাকে বিষণ্ণ বিধুর কাব্য। একটা লাফিং থ্রাশ ডেকে যায় অবিরত। পাহাড়ের পিছনে একটু একটু করে সূর্য অস্ত যায়। অনিকেত সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে।
