পরশপিপুল
রাখী নাথ কর্মকার
একতাল থকথকে গোবর দিয়ে ধ্যাবড়া অলক্ষ্মীর মূর্তি তৈরি করেছে বাগদি বাড়ির বৌটা। ছেঁড়াখোঁড়া চুল জড়ানো পাকানো গোবরের তালে ড্যাবা ড্যাবা কড়ির চোখ! কাত্তিকের হিম হিম সাঁঝবেলায় চৌকাঠের বাইরে সেই অলক্ষ্মীর অছেদ্দার আসনে বাঁহাতে ফুল ছিটাতে ছিটাতে বিড়বিড়িয়ে পুজোর মন্তর আওড়াচ্ছে সে…! ঐ তো, আখের ডান্ডা দিয়ে কুলো পিটিয়ে কলার পেটোয় করে অলক্ষ্মী বিদায় করতে বেরিয়েছে বৌটার কাঁচা মেয়েদুটো। বাতাসে রোল উঠেছে – ‘অলক্ষ্মী তুই হ বিদায়, ঘরের লক্ষ্মী ঘরে আয়’! তেমাথার মজা পুকুরপাড়ে আঁড়া তালগাছের তলায়, জংলা ঝোপের মাঝে রেখে গেল ওরা সেই হতকুচ্ছিত গোবরের তালটাকে। গেঁয়োপথের আঁধার চিরে ফুটফাট জ্বলে যাচ্ছে পাটকাঠির তোড়া…
ভাঙা জানালার ফাঁক দিয়ে চাতক নয়নে উঁকি মেরে দেখছিল তুলসী। আজ তো আর ওর কোনও বাঁধন নেই, গোয়ালে আটকে রাখার গরু খুঁটান নেই, মেটে দুয়ারে কোনও লক্ষণ রেখা আঁকা নেই! ইচ্ছে করলে কি ও পা বাড়িয়ে দিতে পারে না যে দিকে দুচোখ চায়? দুইহাত মেলে ঘন নীল আকাশটার নিচে দাঁড়িয়ে কি দু’দন্ড সোয়াস্তির শ্বাস নিতে পারে না? পারে না অদূরের ওই ময়নাজুড়ির মাঠের নরম ঘেসো মাটিতে পা ডুবিয়ে বসে থাকতে সারাটা দিন? কিন্তু কই, তা আর ও পারছে কই! পা দুখানি ওর কখন যেন দশ মণি শিলের মতো ভারি হয়ে গিয়েছে! মজা পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে ঐ যে মেয়েগুলো আপনমনে সুখদুখের কথা কইছে…তুলসী জানে, অন্যদিন ওকে দেখলেই ছিটকে ভিতরঘরের দিকে সরে যেত ওরা। আজ কিন্তু সুযোগ পেলেই ওর মতো নষ্ট মেয়েমানুষকে ওরা অলক্ষ্মীর তালটার মতোই বাঁশের ডগা দিয়ে পিটিয়ে ফেলে দিয়ে যাবে মজা পুকুরের গভীরে! ওর মতো মেয়েমানুষ গাঁয়ে থাকলে গাঁয়ের পক্ষে তা অশুভ বইকি! এতদিন মিনসেটা ছিল বলেই কেউ ওকে কিছু বলার সাহস করত না। শয়তানটাকে অনেকেই ভয় পেত। মারামারি, গুন্ডামি, মাতলামি…হেন কিছু বাকি রাখেনি পিরখচ্চরটা! কাল রাতে, বটতলার ওদিকে কোথায় যেন পচা লাশ পাওয়া গেছে শয়তানটার। আর হঠাৎই সেই লোহা কঠিন কবচটা তুলসীর গা থেকে খসে পড়ে গিয়েছে! অথচ অবাক কান্ড দেখো, আজ এতদিন বাদে আগলমুক্ত হয়েও ডানা ভারী পাখির মতোই বাইরের দুনিয়াটাকে সহজ চোখে দেখতে পারছে না তুলসী! আঁধারে থাকতে থাকতে যেন আলোয় চোখ মেলতেই ভুলে গিয়েছে ও!
হঠাৎই, কাত্তিকের উত্তুরে শুখা বাতাসে তুলসীর বুকের মধ্যেটা কেমন হু হু করে ওঠে! বাপটা মরার পর থেকেই তুলসীকে বিদায় করার জন্যে উঠেপড়ে লেগেছিল ওর কুঁদুলি সৎমাটা। তুলসীর তখন কতই বা বয়েস, চোদ্দ কি পনেরো হবে! ঘরে তখন তুলসীর আরও এক ছোট বোন আর ছয় বছরের সৎ ভাই! আদ-ধুমসো মিনসেটা প্রায়ই ওদের পোড়ো ভিটাতে আসত। ভিটা বলতে তো ওই বাঁশের বাতা দিয়ে বেড়া বাঁধা। তার ওপরেই গোবরমাটি লেপে বানানো মেটে দেওয়াল আর খড়ের চালের একটা ঘরে গুঁতোগুঁতি করত ওরা ক’জন! মিনসেটা বড় গলা করে সৎমাকে বলত, দখিন পানে নাকি রয়েছে ওর নিজের ঘর, শহরের কাছেই! তুলসীকে দেখলেই ব্যাটা দাঁত কেলিয়ে হাসত! কিন্তু পিরখচ্চরটার যে অন্য মতলব ছিল সেটা কি করে বুঝবে ও? তখন কি আর ও বুঝেছিল ছাই, বিয়ের ছলে সারাটাজীবন এই বিভুঁইয়ে রেকনি করে রাখবে ওকে মিনসেটা! আরো আরো দখিনের একটা অজ পাড়াগাঁয়ে, এই পোড়ো, ভাড়া ঘরটায় যেদিন নাবালিকা তুলসীকে এনে তুলেছিল বদমাইশটা, বোকা তুলসী সেদিন বুঝেছিল, এক সাগর নোনা কষ্টের কাছ থেকে আর ওর পালাবার পথ নেই! লড়ঝড়ে ঘরটার মাথায় ফাটা টালির চাল! ইশনের মেঘ ভেঙে জল এলে থই থই ঘরে বোঝা দায় ও পাঁকডোবায় বসে রয়েছে নাকি ঘরের ভিতরে! ওর বুকের মধ্যে গুব গুব করে বেড়ে ওঠা স্বপ্নের ফানুসগুলো তিলে তিলে চুপসে যেতে শুরু করেছিল। ফাঁটাছেঁড়া ভোকাট্টা ঘুড়ির কি স্বপ্ন থাকতে আছে?
এখানে এসে ওঠার কিছুদিন পরেই, হাতের লাল সুতোটা ছেঁড়ার আগেই পিরখচ্চরটা ওর ভাঙা ঘরে মাথাঠারো না-মুনে ঢোকাতে শুরু করেছিল! রক্তসন্ধের আলো আঁধারিতে সে সময় অসহায় কচি মেয়েটা দাঁতে দাঁত চেপে শক্ত কাঠের মতো শুয়ে থাকত। একটা সময় ভোর রাতে দুয়ারে তালা দিয়ে চলে যেত শয়তানটা। কখনও পেটের মধ্যে বনগাঁদা ফুটলে কোয়াকের কাছে ধরে নিয়ে যেত মিনসেটাই। বেশ কয়েকবার! পর পর তিন বার তুলসী পালিয়ে যাবার চেষ্টা করেছে, কিন্তু প্রতিবারই কীভাবে যেন শয়তানটা ঠিক খবর পেয়ে যেত। তারপরের ক’টা দিন আর মারধোরের মাবাপ থাকত না! তাছাড়া, তুলসী ততদিনে এটুকু বুঝে গিয়েছিল, পালিয়ে যাবার কোনও নিরাপদ জায়গা নেই! যেখানেই যাবে, সেখানেই শয়তানটার মতো হাজার হাজার না-মুনে ওঁৎ পেতে বসে আছে!
আচ্ছা, ওর মায়ের পেটের কচি বোনটারও কি একই দশা করেছে একলষেঁড়ে মাগিটা? জেনেশুনে এমনতর সব্বোনাশ করতে পারল ওদের? আর…তারপর…তারপর থেকে যত যতবারই পরজ্বালানি সৎমাটার কথা মনে পড়েছে তুলসীর, ততবারই বুকের মধ্যে দাউ দাউ আগুন জ্বলে উঠেছে ওর। সে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে বছর চোদ্দর কচি মেয়েটা, ঘুলি ঘুলি আঁধারের মধ্যে জেগে থেকেছে শুধু অলক্ষ্মীর পোড়া তালটুকু!
আজ হঠাৎই খাঁচার সেই কঠিন, লোহার শিকলখানা না হয় খুলে গিয়েছে, কিন্তু মনের যে শিকলটা ফাঁসের মতো তুলসীর গলায় চেপে বসতে শুরু করেছে, তার কী করা যাবে? এ বাঁচা কি বাঁচা? সত্যি বলতে কী গত কয়েকদিন ধরেই একটা ভয়ংকর বাসনা ওর মনের মধ্যে ভুসভুসিয়ে উঠছিল। পাড়ার ভুষাদিকে পটিয়েপাটিয়ে লুকিয়েচুরিয়ে নিয়ে আসা ইঁদুর মারার বিষটা মিনসেটার জলের বোতলে মিশিয়ে দিয়ে ভেবেছিল নিজের ভাতের থালাতেও…
কিন্তু একটা সব্বোনেশে আগুন ইচ্ছে যে আজও ধিকি ধিকি করে জ্বলে চলেছে তুলসীর বুকের মধ্যে!
এইমুহূর্তে চোয়াল শক্ত করে জানালার কপাটটা টেনে দেয় তুলসী। এক তীব্র বিষের অসহ্য জ্বলুনি ওর গলার কাছে পাকিয়ে পাকিয়ে উঠতে শুরু করেছে! তুলসী বেশ বুঝে গিয়েছে এ জ্বলুনি অত সহজে থামবার নয়। নাহ, এ ভুবনপারের মায়া ছেড়ে একেবারে যদি চলে যেতেই হয়, তবে ও একা যাবে না। সঙ্গে করে আরেকজনকেও নিয়ে যাবে! নিজের গলায় ঢালার আগে ওর আর ওর কচি বোনটার জীবনটাকে তছনছ করে দিয়েছে যে লকলকে জিভের লোভী মাগি…তার গলাতেও সেই বিষের মোড়কটা খুলে ঢেলে দিয়ে আসবে…
২
আজন্মের ধুলো উড়িয়ে লড়ঝড়ে বাসটা হুড়মুড়িয়ে ছুটে গেল শহরের দিকে। কমবয়সী কন্ডাক্টরটা তুলসীকে গঞ্জের মাঝখানটিতে নামিয়ে দিয়ে জানিয়ে গেল, এখান থেকে চড়কতলা হেঁটে যেতে হবে। লাল মেঠো পথে বাস যায় না। ভ্যান, টোটোও নয়। মাথার ঘোমটাটা আলগোছে নামিয়ে ফেলেছে তুলসী। এখানে ওকে আর কেউ চিনবে না। ডুরে সুতির শাড়ির আঁচল বেমক্কা হাওয়ায় উড়ছে।
হাঁটতে হাঁটতে কতটা পথ হেঁটে এসেছে জানে না তুলসী। মেঠো পথের প্রান্তে গঞ্জের রঙ বদলেছে, পার হয়ে এসেছে তুলসী মাঠের পর মাঠ, দিগন্তজুড়ে ফুটে থাকা সোনালি ধান ক্ষেত, আঁকাবাঁকা আলপথ। কিন্তু এতটা পথ হেঁটে এসেও হাঁপিয়ে ওঠেনি তুলসী। দুপুর গড়িয়ে এসেছে। এই সময় রোদ্দুরের তাপ মরে এসেছে, তবে এতক্ষণ একটানা হেঁটে এসে প্রবল জলতেষ্টায় ওর ছাতি ফেটে যাচ্ছিল, সামনে বিরিক্ষি বটের ছায়ায় মাধবীলতায় ঘেরা একটা মাটিসুড়কির ছোটখাটো রাধামাধবের মন্দির দেখে মন্দিরের চাতালে এসে বসে পড়ে তুলসী। মন্দিরের ভিতরে ঘিয়ের পিদিম জ্বলছে টিম টিম করে। চারপাশে ভুর ভুর করছে ধূপের গন্ধ। বৈকালিক পূজার তোড়জোড় চলছে। মন্দির লাগোয়া ছোট্ট একটা আশ্রম। মাটির ঘর, খড়ের চাল। মন্দিরের ঠাকুর মশাই এক বয়স্ক মানুষ, মাথা ন্যাড়া, টিকিতে ফুল গোঁজা, কপালে টানা তিলক কাটা, গলায় কন্ঠী, পরনে সাদা ধুতি। জনা কয় বোষ্টমা-বোষ্টমীকে কী যেন পড়ে শোনাচ্ছিলেন মানুষটা। ক্লান্ত-বিধ্বস্ত তুলসীকে দেখে মমতাভরে প্রশ্ন করেন ঠাকুর– “কোত্থেকে এসেছ মা? যাবেই বা কদ্দূর?”
ঠাকুরের প্রশ্ন শুনে তুলসী চমকে ওঠে! কত শত যুগ পরে বোধহয় জন্মের ওপার হতে ওকে কেউ ‘মা’ বলে ডাকল! ওকেও যে কেউ ‘মা’ বলে ডাকতে পারে, তা এত দিনে ভুলতেই বসেছিল ও!
তুলসীর অসহায়, নিরাসক্ত চোখদুটির দিকে চেয়েই বোধহয় কিছু বুঝতে পারেন ঠাকুর। কথা না বাড়িয়ে তিনি হাঁক পাড়েন–“ওরে কে আছিস, দুটো বাতাসা আর এক ঘটি জল নিয়ে আয় কেউ আমার মায়ের জন্যে…”
তুলসী এবার সঙ্কোচে কুঁকড়ে যায়। জীবনে এই প্রথম নিজেকে বড় অশুচি মনে হতে থাকে ওর। শীতল এক ঘটি জলের মায়া ত্যাগ করে তড়িঘড়ি উঠে পড়ে ও! এ জায়গা ওর মতো নষ্ট মেয়েমানুষের জন্যে নয়!
ওকে দুড়দাড়িয়ে উঠে পড়তে দেখে স্নেহময় ঠাকুর মুচকি হাসেন, মমতাঝরা সুরে বলে ওঠেন–“হরি বোল, হরি বোল! ওরে মা, পূর্বাশ্রমের কথা আমরা সবাই ভুলে গেছি রে। আমরা গরিব ভক্ত রে মা, মাধুকরী করে খাই, আর হরিনাম করি! এখানে আমরা জানতেও চাই না কী তোর নাম, কী তোর ধাম। ঈশ্বরের চরণে শরণ নিলে আর চিন্তা কী! সেই পরম করুণাময়ের কাছে যে কোনও ভেদাভেদ নেই রে, মা!”
তুলসী থমকে যায়। কেউ যেন অদৃশ্যে পায়ে বেড়ি পরিয়ে দিয়েছে ওর। এক কমবয়সী বোষ্টমী একটা মাটির গেলাসে জল আর কলা পাতায় দুকুচি ফল, বাতাসা নিয়ে এগিয়ে আসে তুলসীর দিকে। বোষ্টমীর মাথায় চুড়ো করে বাঁধা চুল, কপাল পর্যন্ত টানা তিলক, গাছ কোমর করে পরা কমলা পাড় সাদা শাড়ি, গলায় তুলসীর মালা, চোখে অদ্ভুত প্রশান্তি। চোখে চোখ পড়লেই যেন মনে হয় মন-প্রাণ সব শীতল হয়ে গেল!
কোত্থেকে যেন ভেসে আসছে এক মায়াময় বাঁশির সুর। সে সুর যে ওর মনের কোথায় গিয়ে বাজল তা বুঝতে পারল না তুলসী। শুধু মনে হল, জগতসংসারে এমন নিরাপদ স্থান বোধহয় আর নেই, যেখানে অমৃতের বদলে ভেসে ওঠা বিষের ধারও ভোঁতা হয়ে যায়! তুলসী মুগ্ধ হয়ে শোনে ঠাকুর দর দর বিগলিত ধারায় গদ গদ চিত্তে বলে চলেছেন–“ভগবানের কাছে সন্তানের কোনও বাছবিচার নেই রে মা। কৃষ্ণভজনে নাহি জাতিকুলাদি বিচার…!”
ঠাকুরের কথার সব অর্থ বুঝতে পারে না তুলসী। শুধু এটুকু বুঝতে পারে, এই সম্পূর্ণ ভিন্ন, আলো আলো অচেনা জগতটা তাকে যেন চুম্বকের মতো টানছে! পুরনো অন্ধকার জগতটাকে এই মুহূর্তে যেন গভীর দুঃস্বপ্নের মতো মনে হয় তুলসীর মনে হয় এই বাস্তবটুকুই শুধু সত্যি, বাকি সব মিথ্যে! আহা, ‘মা’ ডাকের মায়া যে বড় মায়া!
কিন্তু নাহ, সবার আগে, যে কাজের জন্যে ও এসেছে সে কাজটা শেষ করতে হবে ওকে! নাহলে যে ওর মরেও শান্তি নেই!
৩
পথ চলতে চলতে অবাক হয় তুলসী। এ কয় বছরে কত কিছু বদলে গিয়েছে। গাঁয়ের কোল ঘেঁষে মায়ের লাল সিঁথার মতো সরু রাস্তা। দুধারে ছোট ছোট খড়ের বাড়ি। টালির বাড়ি। গেরস্তর নিটোল সংসার। বাড়ির সামনে লাউমাচা। লকলকিয়ে ওঠা পুঁইলতা। গোবরলেপা তুলসীতলা।
ঐ তো…কোনও এক আদেখলা ঝড়ে ভেঙে পড়া শালগাছটার নিচে সেই চির পরিচিত খড়ের চালের মাটির ঘরটা! ঘরটার একদিকের দেওয়াল ধ্বসে পড়েছে, খড়ের চালেরও অর্ধেকটা উড়ে গেছে কবে জানি। চারিপাশে জংলা ঝোপ হয়ে রয়েছে। ডোবার ধারে বুড়ো পরশপিপুল গাছটা আলো করে হলুদ ফুল ফুটে আছে। পাতার ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে কয়েকদিনের বাসী, গোলাপী ফুল সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই যে ফুলের রং বদলে যায়! ছোটবেলায় তুলসীরা সকাল-বিকেল-সন্ধে গাছটার তলায় হাঁ করে বসে থাকত, ফুলের হলুদ আভা কখন টুপ করে বদলে যায় গোলাপী সুখে সে অদ্ভুত ঘটনা নিজের চোখে চেয়ে চেয়ে দেখবে বলে…
চারপাশে উদভ্রান্তের মতো তাকায় তুলসী। কেউ কি থাকে না এখন এখানে? কতগুলো বছর? কতগুলো বছর পার করে ও এখানে এল?
ছেঁড়া শাড়ি পরা এক পাড়াগাঁয়ে মা, কাঁখালে বাচ্চা পিছন থেকে হাঁক পাড়ে– “কাকে খুঁজতেছ লা?” তুলসীর কাছ থেকে কোনও উত্তর না পেয়ে বেমক্কা কেঁদে ওঠা বাচ্চাকে সামলাতে ব্যস্ত হয়ে সরে পড়ে বউটা। ওটা কী? ভাঙা ঘরটার ভিতর থেকে একটা গোঙ্গানির ক্ষীণ আওয়াজ ভেসে আসছে না? তুলসী যেন চড়াম বেতের চাবকানিতে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। জংলা জমি, আগাছা আর বুনো লতার ঝোপ পেরিয়ে ধুপধাপিয়ে এগিয়ে যায় ভাঙা ঘরটার দিকে। ও কে? ঘরের ভিতর মেঝেতে শুয়ে শুয়ে কোঁকাচ্ছে ও কে? ছেঁড়াখুঁড়ো, মলিন থান পরা এক কঙ্কালসার বিধবা, উলোঝুলো চুল, সারা শরীরে বলিরেখা…এই কয়েকটা বছরেই যেন বয়স বেড়ে গেছে দুই কুড়ি…
– “জল…এট্টু জল”
যে শয়তান মেয়েমানুষটার জন্যে সারাটা জীবন ছারখার হয়ে গেছে তুলসীর, যার ওপর ভয়ানক রাগে রাতের পর রাত নরকের গন গনে আগুনে জ্বলেছে তুলসী, যাকে দুবেলা শাপশাপান্ত করে প্রতিটা দিন কেটেছে ওর, যার জন্যে বুকের মধ্যে জমিয়ে নিয়ে এসেছে বিষের পুঁটলি সেই কুচুন্ডেকে আজ এই অবস্থায় দেখে কেমন যেন চুপসে যায় তুলসী! কী আশ্চয্যি! অত্যন্ত অবাক হয়ে অনুভব করে তুলসী, এই মুহূর্তে ওর বুকের গভীরের সেই হলদে পরশপিপুলের গন গনে আঁচটা থিতিয়ে গিয়ে কেমন এক অচেনা করুণার গোলাপী বোধ চারিয়ে যেতে শুরু করেছে সমস্ত শরীরের আনাচেকানাচে!
তড়িঘড়ি দাওয়ায় পড়ে থাকা একটা মাটির ভাঁড়ে করে তুলসী পাশের দামপানায় ভর্তি ডোবা থেকেই জল তুলে আনে। ভাঙাচোরা দাওয়া পেরিয়ে ঘরে ঢুকে বুড়ির গা ছুঁয়ে দেখে তুলসী, জ্বরে যেন গা পুড়ে যাচ্ছে! কেমন ঘোরের মধ্যে জলের শেষ কুচিটুকুও ঠোঁটের আগা থেকে চেটে নিয়ে সেই সব্বোনাশি কাঁপা কাঁপা স্বরে প্রশ্ন করে– “কে লা মা তুই?”
‘মা!’ অস্ফুটে শব্দটা উচ্চারণ করে তুলসী ফিক করে হেসে ফেলে!
জ্বরের ঘোরে হলেও কিন্তু সে বাঁকা হাসির শব্দ কুটিলার কানে গিয়ে বাজে! মরা মাছের মতো ফ্যাকাশে চোখে ঘরের আলোআঁধারিতে কাউকে যেন খুঁজতে থাকে সে। তারপর হঠাৎই তুলসীকে অবাক করে দিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে কুঁদুলি বিধবা! তুলসীকে চিনতে পেরেছে সে! সেই কান্নার সুর ছিঁড়েখুঁড়ে দিচ্ছে পড়ন্ত বিকেলের নিঝুম বাতাস। কান্নাভেজা খনখনে গলায় সে গুমরিয়ে গুমরিয়ে বিলাপ করে চলেছে…আর পাশে বসে তুলসী একটু একটু করে উদ্ধার করে চলেছে তার ফেলে আসা জীবনের বারোমাস্যা…
তুলসীর পরে বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ওর বোনটারও নাকি একই দশা করতে গিয়েছিল সে, কিন্তু তার আগেই, পাড়ার একটা ছেলের সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিল মেয়েটা। কি ভাগ্যি ওর বোনটার…সে ছেলেটা আর যাই হোক, ঠকায়নি মেয়েটাকে। সুখে না থাকলেও হাভাতের সংসারে বেঁচেবর্তে আছে বোনটা! আর সব্বোনাশির নিজের ছেলে? মরণ রোগ বাসা বেঁধেছে মায়ের শরীরে জানতে পেরেই ছেলে তার অসুস্থ মাকে ফেলে রেখে শহরের নিষিদ্ধ নেশায় ঘর ছেড়েছে বছরখানেক হল সেই থেকে তার কোনও পাত্তা নেই!
বিকেলের কমলা সুয্যিটা ডুব মেরেছে পাশের জঙ্গলের ওপারে। কাত্তিকের পড়ন্ত বিকেলের মরা আলোয় কেমন এক ঝিম ধরা ভাব। দূরের মেঠো পথে কোন এক আপনভোলার গান ভেসে আসছে.. “ওহিরে সবঅ পরব ঘুরি ফিরি আওবে, মানুয়া মরলে নাহি আওবে…!” তাই তো! সমস্ত পরব ঘুরে ফিরে আসবে, কিন্তু মানুষ মরলে তো আর ফিরে আসবে না!
তুলসী গা ঝাড়ি দিয়ে উঠে পড়ে। আর বসে থাকলে চলবে না। আজ রাতের মধ্যেই যে ওদের আশ্রমে পৌঁছতে হবে। মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে থাকা হাড্ডিসার শরীরটাকে দুই হাতে টেনে তোলার চেষ্টা করে তুলসী, শান্ত স্বরে বলে–“ওঠো দিকিনি। আমার ভর করে এট্টু ওঠো! অনেকটা পথ এবার পেরোতে হবে আমাদের!”
বিধবার দুটি ঘোলাটে আকাট আশ্চয্যি চোখে খাবি খেতে থাকে! কিন্তু একবারটির জন্যেও কোনও প্রশ্ন করে না সে, নিতান্ত বাধ্য মেয়ের মতো হাঁকুপাঁকু করে তুলসীকে আঁকড়ে ধরে কাঁপা কাঁপা শরীরে উঠে দাঁড়ায়। এই মুহূর্তে তুলসী বেশ বুঝে গেছে, বাঁচার সুখটুকু পাওয়ার জন্যে ওকে আজ মরতেই হবে! নাহ, ও এখন আর ডানা মেলতে ভয় পায় না! ভয় পায় না সোজা চোখে চাইতে, ভয় পায় না আলোর পথে হাঁটতে…
আজ অনেক অনেক দিন পরে চিটচিটে আঁধারের আগল ভেঙে বৃষ্টিমেঘহীন এক ঝকঝকে আকাশের সন্ধানে হাঁটা দেবে তুলসী!
