novel-lal-tara

লাল তারা

সাগরিকা রায়

অনেকদিন পরে আজ রোদ উঠেছে। বর্ষার মেঘ পুরো সরে গিয়েছে এমন নয়। তবু, রোদ দেখে বিষণ্ণ চেনা দুনিয়াটাই যেন পালটে চনমনে হয়ে উঠেছে। দেবযানী কলেজ থেকে বেরিয়েছে একটু আগেই। সিতুপিসির বাড়িতে যাবে বলে বউবাজারের বাস ধরেছে। বিকেল হয়নি এখনও। কিন্তু কলকাতা দুপুরের ঝিমুনি থেকে উঠে চোখে মুখে জল দিয়ে ফ্রেস মুডে জানালায় এসে দাঁড়িয়ে শহরটাকে দেখছে।

দেবযানী বাসের জানালার ধারে সিট পেয়ে অপ্রত্যাশিত খুশিকে ব্যাগে পুরে রাখল। সিতুপিসি কেন হঠাৎ করে ডাকল বাড়িতে, এটা ভেবে টেনশন হচ্ছে না এমন নয়। সিতুপিসের দূর সম্পর্কের কে একজন আছে, যার সঙ্গে দেবযানীর বিয়েটা দেবে বলে বদ্ধপরিকর পিসি। দেবযানী আশঙ্কা করছে, সেই নবগোপালটি পিসির কাছে বেড়াতে আসেনি তো? দুজনের মুখোমুখি মুলাকাৎ করতে চেয়ে আচমকা দেবযানীকে বাড়িতে ডেকে পাঠিয়েছে পিসি! আশঙ্কার ওপরে ভর দিয়ে চললে হবে না। বাড়িতে মা চাইছে না দেবযানী এখন বিয়ে করুক। বস্তুত, মা চাইছেই না যে দেবযানী জীবনে বিয়ে করুক। মা একা হয়ে পড়বে। সঙ্গে অর্থনৈতিক দিকটাও ভাবছে মা। কলেজে চাকরি করা মেয়েকে অন্যের বাড়িতে পাঠাবে কেন? এই মেয়েকে মা বড় করেনি?

এসব কথার জবাব নেই দেবযানীর কাছে। আজ পিসি যদি বিয়ে নিয়ে কিছু বলে বা দেবযানী যে আশঙ্কার কথা ভাবছে, তেমন হলে সরাসরি বিয়েতে অনীহা জানিয়ে আসবে। পিসি রাগ করবে, পিসে বোঝাতে আসবে। সব বোঝে দেবযানী। কিন্তু এভাবে নিজের কথা ভাবলে স্বার্থপর মনে হয়। সে পারবে না ও কিছুতেই। ফোন বাজছে। অন্যমনস্ক ছিল বলে শুনতে পায়নি। হাতে রাখেনি ফোন। ব্যাগ থেকে ফোন বের করে চমকে উঠল দেবযানী। স্মরণ ফোন করেছে। এত দিন পরে? মনে হলো ফোন রিসিভ করবে না। কিন্তু স্মরণকে চেনে ও। স্মরণ বার বার ফোন করে মাথা খারাপ করে দেবে ওর। কিন্তু ফোন রিসিভ করলেও একই সমস্যায় পড়তে হবে। জুলুম করে স্মরণ, প্রচন্ড। সেই জন্যই রিলেশন থেকে সাত মাস আগে বেরিয়ে এসেছিল দেবযানী। কিন্তু এত দিন পরে রিলেশনটা ঝালাই করতে ফোন করেছে কি স্মরণ?

এক মুহূর্ত জানালার বাইরের কলকাতাকে দেখল দেবযানী। এই কলকাতার অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়িয়েছে স্মরণের সঙ্গে। বইমেলা, নন্দন, নান্দীকার ঘুরে ঘুরে নিজেদের চিনতে চেয়েছিল। কিন্তু স্মরণ দেবযানীকে ভেবেছে ব্যক্তিগত সম্পত্তি। চূড়ান্ত পুরুষ তান্ত্রিকতার মধ্য দিয়ে দেবযানীকে কন্ট্রোল করছিল স্মরণ। শেষ দিকে ওর আচরণ চরম আকার নিতেই দেবযানী ডিসিশন নিয়ে নিল। স্মরণ দেবযানী কোন সিনেমা দেখবে,সেটাও যখন ঠিক করে দিত, আর দেরি করেনি দেবযানী। তবে পালিয়ে আসেনি। রীতিমতো বলেকয়ে এসেছে। স্মরণ বীতশ্রদ্ধ চোখে দেখছিল ওকে। কথা বলেনি, অনুরোধ দূরের কথা।

দেবযানী ভয় পাচ্ছিল স্মরণ মেনে নেবে কিনা ভাবতে। ভেবেছিল,হয়তো প্রবল রেগে হাত মুচড়ে দেবে দেবযানীর। কিন্তু কিছু হলোই না। রেস্তরায় বসে চিলি চাউমিন খেতে খেতে দেবযানী অদ্ভুত শান্তি অনুভব করছিল। মনে হচ্ছে, এত শান্তি পায়নি বহুদিন! স্মরণ হেসে বলেছিল, “তোমার চিঠিফিটিগুলো আছে। থাকুক। দরকার হতে পারে কখনও।”

দেবযানী বুঝেছে স্মরণ কোন দরকারের কথা বলছে। ওর ভয় নয়, হাসি পেয়েছিল। মায়ের কথা মনে করে ওর হাসি পাওয়ারই কথা। স্মরণ ভাবছে দেবযানী অন্য কোথাও বিয়ে করবে, আর সেদিন স্মরণ ওকে লেখা দেবযানীর চিঠি নিয়ে বরপক্ষকে দেখাবে। বিয়ে ভেঙ্গে যাবে। তখন স্মরণ ছাড়া গতি নেই বলে স্মরণের সঙ্গে বিয়ে হবে দেবযানীর। আর বিয়ে না-ও করতে পারে স্মরণ তখন। বিয়ে ভেঙ্গে দিয়ে হাসতে হাসতে বেরিয়ে যাবে! কিন্তু ও জানে না, দেবযানীর বিয়েই হবে না কোনদিন। ওর মা মেয়েকে বিয়ে দেবে না। আর চিঠি! ফোন থাকতে চিঠি কেন লিখেছিল দেবযানী? স্মরণই চিঠি লিখতে বলতো। ওর নাকি চিঠি পড়তে ভাল লাগে। অগত্যা লিখেছিল দেবযানী। সেই চিঠি যে স্মরণের হাতের তাস হয়ে দাঁড়াবে,একেবারেই ভাবেনি দেবযানী। কোনভাবেই ভাবেনি। ও তো বিশ্বাস করেছিল স্মরণকে! একবার স্মরণ ওকে দেখা করতে বলেছিল চুঁচুড়ায় বন্ধু শুভর বাড়িতে। দেবযানী বিশ্বাস করেই গিয়েছিল। বন্ধুর বাড়ি মানেই বন্ধু শুধু নয়,তার আত্মীয় স্বজনের কেউ না কেউ থাকবেই। কিন্তু গিয়ে হতাশ হয়েছিল। বন্ধু শুভ গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে দীঘা বেড়াতে গিয়েছে। সঙ্গে নাকি শুভর মা, বাবাও গিয়েছে। এই মেয়ের সঙ্গেই শুভর বিয়ের কথা। রেজিস্ট্রি হয়ে গিয়েছে।

নির্জন বাড়িতে স্মরণ প্রবল পাগলামি করেছে সেদিন। জাপটে ধরে কিস পর্ব যে এমন মারাত্মক হতে পারে, দেবযানী চিন্তাতে আনেনি। সে কী উন্মাদনা স্মরণের।

দেবযানী ভেসে যায়নি সেদিন। আরেকদিনের কথা বলে সেদিন নিস্তার পেয়েছিল। পরে আরেকদিনের জন্য হন্যে হয়ে গিয়েছিল স্মরণ। দেবযানী আর স্মরণের ফাঁদে পা দেয়নি। ওর বিশ্বাস ছিল না স্মরণের প্রতি? ছিল। কিন্তু ভাগ্যের চাকাটাকে ইচ্ছেমতো গড়াতে দেয়নি দেবযানী। যা ঘটবে, ওর জীবনেই ঘটবে। স্মরণের কিচ্ছু যাবে আসবে না, ভেবেছিল বলেই স্মরণ দ্বিতীয়বার নিজের যৌন আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করতে দেবযানীকে কাছে পায়নি।

এরপর স্মরণ মল্লিকবাজারের সুমনা নামের মেয়েটির প্রেমে পাগল হয়ে গেল। দেবযানীর খুব খারাপ লাগেনি কেন সেদিন, ভেবে অবাকই হয়েছে দেবযানী। তাহলে কি স্মরণকে ও ঘেন্না করছিল ভিতরে ভিতরে? ভাল বাসেনি? হয়তো!

আস্তে আস্তে দুজনে দুজনের থেকে অনেক দুরত্বে চলে গিয়েছে। দেখা সাক্ষাৎ তো দূরের কথা, মেসেজ চালাচালিও নেই। তা হবে বছর দুই। দেবযানী চাকরি পেয়েছে শুনেছে বোধহয় স্মরণ। সেই কারণে ফের নক করছে। পুরনো প্রেম জাগিয়ে যদি চাকুরিরতাকে হাতে নেওয়া যায়, তাহলে ভবিষ্যত উজ্জ্বল স্মরণের। বরাবরের অলস স্মরণ তাহলে নিশ্চিন্তে বউএর পয়সায় জীবন চালিয়ে নেবে রসে বশে। এসব বোঝে না দেবযানী? বেশ বোঝে! জীবন কম শিখিয়েছে ওকে?

বাস থেকে নেমে পিসির বাড়ির দিকে পা বাড়াল দেবযানী। মিনিট দশেকের পথ। হেঁটেই যাবে ভেবেও কেন যেন হাঁটতে ইচ্ছে করছিল না। একটা রিকশ নিল ও। রিকশর হুড টেনে দিয়ে বসল। বসেই ফের স্মরণের কথাই মনে এল। স্মরণ একটি ক্ষতিকারক পদার্থ। জীবনটা তছনছ করতে চেয়েছিল। পারেনি বলে পিছু ছাড়ছে না।

যোগাযোগ তো রাখেনি দেবযানী। তবু ফোন নাম্বার ডিলিট করেনি কেন, কে জানে। ডিলিট না করে ভালই করেছে।নইলে আজই এই নাম্বারের ফোন ও রিসিভ করে ফেলতো! আজই নাম্বারটা ব্লক করে দেবে।

ভাবতে ভাবতে স্মরণের নাম্বার ব্লক করতে যাচ্ছে, অমনি স্মরণের মেসেজ এল, “পাত্তা দিচ্ছ না? নাকি নয়া প্রেমিক পেয়ে গেছ? আমি কিন্তু তোমাকে ভুলিনি দেবী। আমার হাত থেকে পিছলে যেতে পারবে না তুমি। ছায়ার মত লেগে আছি। মনে আছে? সব মনে আছে?”

খানিক পরেই একটা ভয়েস মেসেজ পাঠাল স্মরণ। ওর মাদকতাময় কন্ঠ পছন্দ ছিল দেবযানীর। স্মরণ সে কথা ভোলেনি।আর,সেই জন্যই ভয়েস মেসেজে দেবযানীর প্রিয় কবির প্রিয় কবিতা আবৃত্তি করে পাঠিয়েছে, “একটা বিচ্ছেদ থেকে পরের বিচ্ছেদে যেতে যেতে/ কয়েকটি দিন মাত্র / মাঝখানে পাতা আছে / মিলনের সাঁকো / মেঘ করে আসবেই / পথ ঝাপসা হবে বৃষ্টিতে / পা পিছলে তলিয়ে যাবে / তার আগে যতক্ষণ পারো / আঙুলে আঙুল / আঁকড়ে রাখো।” চমকে উঠল দেবযানী। এ যে সরাসরি ব্ল্যাকমেইল করছে স্মরণ! ও বুঝিয়ে দিচ্ছে, সব আঁকড়ে আছে ও। সহজে ছেড়ে দেবে না।  

রিকশ খেলার মাঠের পাশ দিয়ে যাচ্ছে, দেবযানী রিকশ থামাল। এখানেই দুটো গলি পরে সিতু পিসির বাড়ি। হেঁটে হেঁটে চলে যাবে।

পিসি ওর জন্যই যেন বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। ওকে দেখেই হাত বাড়িয়ে দিল, “আয়। একটু জল খেয়ে আমার পাশে ব’স।”

জল মানে লুচি, রাবড়ি। খেয়ে হাসি মুখে দেবযানী বলল, “বল কী বলতে ডেকেছ এখানে!”

পিসি বলল, “আজ এখানে আমাদের পারিবারিক পুরোহিতমশাই আসবেন রে। উনি মুখ দেখে ভবিষ্যত বলে দেন। তুই একটু ব’স মা। রাগ করিস না। উনি ভালো মানুষ।অনেকদিন থেকে চিনি। সাধনা করেছেন এক কালে। এখন কী করেন, জানি না। কিন্তু ঠাকুরের কৃপাধন্য মানুষ।”

দেবযানী আশ্চর্য হয়ে গেল, “এই ভবিষ্যত জানার জন্য আমাকে এত দূরে টেনে আনলে? উফ, তুমি পারও। কখন আসবেন উনি? আমাকে তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে কিন্তু।”

বলতে বলতেই ডোর বেল বেজে উঠেছে। দেবযানী পিসির দিকে তাকাল, “উনি এসে গেছেন? পিসে কোথায়?”

“তোর পিসে আসবে এখনই। ফল আনতে পাঠিয়েছি। তুই ফল ভালবাসিস। বাড়িতে কলা ছাড়া ফল নেই। তুই তো কলা ভালবাসিস না।”

“উফ পিসি! এখন বাজারে পাঠালে তো পিসেকে!”

“তোর জন্য এটুকু করব না? তুই তো আমাদেরও সন্তান! দাঁড়া, দেখি, পুরোহিতমশাই এলেন নাকি?” পিসি দরজা খুলে হেসে বললেন, “আসুন,আসুন।আপনার জন্য বসে আছি।”

পিসি সরে জায়গা করে দেওয়ায় উনি ঘরে ঢুকলেন। দেবযানী এতদিন ধরে আসছে, পিসেদের ফ্যামিলি পুরোহতকে দেখেনি কেন, কে জানে! শুনেছিল যে একজন আছেন, যিনি পিসের পরিবারের পুজোয়াচ্ছা করেন।তা তাঁকে দেখার সৌভাগ্য আজই হলো দেবযানীর।

তিনি দেবযানীর দিকে সুস্মিত চোখে তাকালেন, “এস মা। বস এখানে।”

“ঠাকুরমশাই, আপনি ওর হাতটা একটু দেখুন। বিয়ে কবে হবে?” পিসি জানতে চাইল।

দেবযানী রুষ্ট চোখে পিসির দিকে তাকাতে যাচ্ছে, তখন ঠাকুরমশাই বললেন, “বিয়ে! এই মেয়ের বিয়েতে ঝামেলা আছে। ওর বন্ধু এখন শত্রুর চেহারা নিচ্ছে। খুব বড় লড়াই দেখতে পাচ্ছি। মেয়ে জিতে যেতে পারে, যদি সব সামলে নিতে পারে। একজন বন্ধু আসবে ওর জীবনে। সে ওর ভালো করবে। ভবিষ্যতের দিকে নজর দাও মা। সব হবে।”

দেবযানী চমকে গিয়েছে। উনি ঠিক কথা বলেছেন।কী করে জানলেন! স্মরণ সত্যিই শত্রু হয়ে উঠেছে।দেবযানীকে ঝামেলায় ফেলতেই তো চাইছে স্মরণ! লড়াই! কী হবে এবারে!

“এর প্রতিকার কী ঠাকুরমশাই? আপনি একটা উপায় বলুন।” পিসি হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে আছে।

“তুমি মা, লাল তারার উপাসনা করতে পারো। লাল তারা তোমাকে শক্তি দিন। বড় ভয়ানক দেবী। তোমার দিকে শুদ্ধ দৃষ্টি ফেলে তাকালে,তুমি সব বাধা ঠেলে ফেলে উঠতে পারবে। ভয় নেই। তোমার পিছনে যে লেগেছে,সে চেষ্টা করবে প্রেত লেলিয়ে দেওয়ার। মানে খারাপ করতে চাইবে আর কি! তবে আমি তোমাকে মন্ত্র লিখে দিচ্ছি। জপ করো।”

একটা হলদে কাগজের মধ্যে লাল কালিতে লাল তারার মন্ত্র লিখে দিলেন উনি। দেবযানীকে একটি টাকা দিতে বললেন। টাকাটা দক্ষিণাস্বরূপ রইল তাঁর কাছে।

“তুই একটা পুজো দে। ঠাকুরমশাইকে টাকা দিয়ে রাখ। উনি তোর হয়ে পুজো দিয়ে দেবেন।” পিসি পরামর্শ দিল, “উনি পুজো দেন অনুরোধ করলে। মন দিয়ে পুজো করেন। চিনি অনেকদিন থেকে তো।”

দেবযানীর সন্দেহ হয়নি। উনি যা বললেন, তা থেকে ওঁর প্রতি অবিশ্বাস আসতে পারে না দেবযানীর মধ্যে। ও ব্যাগ থেকে একটি দুশো টাকার নোট বের করে দিল ঠাকুরমশাইয়ের হাতে। উনি দেবযানীর নাম, গোত্র লিখে নিলেন।

দেবযানী বেরিয়ে এল সন্ধের পরেই। ঠাকুরমশাই বেশিক্ষণ থাকেননি। ঠাকুরপুকুরে যেতে হবে তাঁকে। তাই উনি তাড়াহুড়ো করেই বেরিয়ে গেলেন। পিসি বেশ করে খাইয়ে দিয়েছে। ঠাকুরমশাইকে বাড়ি ফিরে আর না খেলেও চলবে।

উনি চলে যাওয়ার পরে পিসি বলল, “বড্ড ভালো মানুষ। কেউ নেই। সবাই মরে হেজে গিয়েছে। একা মানুষ। দেখাশোনার কেউ নেই।”

মনটা খারাপ নিয়েই বাড়িতে ফিরছিল দেবযানী। বাস থেকে নেমে লম্বা রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছে, অমলতাস গাছের কাছাকাছি এসেছে কি স্মরণের ফোন এল।

স্ক্রিনে স্মরণের নামটা দেখে গা ঘিন ঘিন করে উঠেছে দেবযানীর। এরা কি মানুষ নাকি প্রেত? দেবযানীকে প্ল্যান করেই বশ করতে চেয়েছিল। ওর লক্ষ্য দেবযানীর টাকা। ধনী বাবার একমাত্র মেয়ে। চাকরি করে। এমন পাত্রীকে হাত থেকে যেতে দেবে কেন স্মরণ? বিয়ের পরে অন্য রিলেশনকে রেখে দেবে যত্ন করে। এতে অসুবিধেটা কোথায়?

ফোন রিসিভ না করেই হাঁটছে দেবযানী। তখন আচমকা মনে হলো, কেউ ওর পিছনে হেঁটে আসছে! পায়ের শব্দ পাচ্ছে ও। বড় বড় পা ফেলে কেউ আসছে।

কে?

ভয়ে ভয়ে পিছনের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে গিয়ে অবাক হয়ে গেল দেবযানী। কেউ নেই তো! পুরো ফাঁকা রাস্তাটা হাঁ করে পড়ে আছে। ছায়াচ্ছন্ন পথের দুইপাশ জুড়ে বড় বড় গাছ ছায়া বিস্তার করে রাখে সারাদিন। রাতে পাখির ডাক শুনতে পায় দেবযানী। কলকাতাতে এমন সুন্দর পরিবেশ আর কোথাও আছে কিনা ও জানে না। মেট্রো থেকে নেমে যখন হেঁটে আসে, মনে হয় স্নিগ্ধ হয়ে যাচ্ছে।

এত লম্বা রাস্তাতে কেউ এত দ্রুত লুকিয়ে পড়তেও পারবে না। এখন পায়ের শব্দ নেই। তার মানে ও ঠিক শুনেছে। ভ্রম নয়। আচ্ছা, ফের দেখা যাক।

দেবযানী সোজা হাঁটতে শুরু করতেই পিছনে পায়ের শব্দ পেল। কান খাড়া করে শব্দটা শুনল দেবযানী। কেউ বা কিছু একটা ওকে টার্গেট করে আসছে। নইলে ও তাকালেই শব্দটা হারিয়ে যাচ্ছে কেন? কিন্তু শব্দ হচ্ছে কী করে? কোথায়? কে করছে? একটু দাঁড়াল দেবযানী। আজ অদ্ভুত কিছু ঘটনা ঘটছে। পুরোহিত মশাইকে দেখে ওর প্রথমে অদ্ভুতই লেগেছিল। এসে উনি শান্ত ভাবে বসলেন। তাঁকে দেখে মোটেই ভক্তি হয়নি দেবযানীর। অত্যন্ত সাধারণ পোশাক আশাক, খানিকটা ময়লাও। ধুতি কবে যে শেষবার কাচা হয়েছে, কেউ বলতে পারবে না। চুল কাঁচাপাকা। চোখের চশমাও মান্ধাতা আমলের। সবচেয়ে যেটা দেখার, তা হলো ভদ্রলোক বড্ড অন্যমনস্ক। এইরকম লোকটি কিন্তু পরে দেবযানীর মন জিতে নিলেন। উনি যা যা বলেছেন, সবই মিলে যাচ্ছে। কিন্তু একটা কথা বলে ফের ঘুরিয়ে নিয়েছেন, সেটা কী বলতে চাইছিলেন? কেউ চেষ্টা করছে তোমার পিছনে প্রেত লেলিয়ে দেওয়ার! আবার বলেছেন, একজন বন্ধু আসবে ওর জীবনে। সে ওর ভালো করবে। এর অর্থ?

দেবযানী পিছনের দিকে বার বার ঘুরে ঘুরে তাকাতে তাকাতে বাড়ির দিকে আসছিল। পিছনে কাউকে দেখতে পায়নি। পায়ের আওয়াজও পায়নি আর। বাড়ির গেটের কাছে এসে হাস্নুহানা গাছের দিকে তাকাতেই মনে হলো, কেউ নীচু হয়ে লুকিয়ে পড়ল। এবারে খুব ভয় পেয়ে গেল দেবযানী। কে ওখানে?

দেবযানী গেটের সামনে থেকে সরে গিয়ে রাস্তার ওপরে দাঁড়াল। এই এলাকায় কেউ রাস্তায় দাঁড়িয়ে গল্প করে না। মোটামুটি পশ এলাকায় বাস করা অনেকটা অসুবিধেরও। এখন যেমন পুরো রাস্তা ফাঁকা পড়ে আছে। যখন ওরা জলপাইগুড়িতে থাকতো,তখন রাতের দিকেও রাস্তায় পাড়ার ছেলেদের পাওয়া যেত। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ক্যারম খেলছে, এরকম দৃশ্য হরদম দেখেছে দেবযানী। পুজোর সময় সারারাত জেগে থাকা পাড়াকে মিস করে দেবযানী। এখানে চলে এসে নামি কলেজে পড়াশোনা করতে পেরেছে। উন্নতির সিঁড়ি সামনে পেয়েছে।কিন্তু এখন জলপাইগুড়ির মামাবাড়ি, ওর ছোট্ট সাজিয়ে রাখা ঘর, মামীদের আদর সব মিস করে। মামিরা এলেও খুব কম যাতায়াত এখন। মাঝে মামা এসেছিল। এসেই যাই যাই করে কেন বোঝে দেবযানী। মন টেনে না এখানে। আসলে সেই আন্তরিকতা নেই যে!

মন কুডাক দিচ্ছিল। ইদানিং যা সব ঘটছে চারপাশে! ভূতপ্রেতের থেকে সেদিকে ভয় বেশি। কেউ হয়তো একা মেয়ে দেখে ফলো করছে। বাড়ির ভিতরে হাস্নুহানা গাছের নীচে ওটা কী ঢুকে পড়ল?

মাকে ফোন করল দেবযানী। ফোন বেজে যাচ্ছে। দেবযানী আতঙ্কিত। মা কী করছে? ফোন তুলছে না কেন?

বাবাকে ফোন করল এবারে। বাবার ফোনও বেজে যাচ্ছে। দেবযানী কী করবে বুঝতে পারছে না। মাথা ঠান্ডা করে অপোজিট বাড়ির চক্রবর্তীদাকে ফোন করল।

চক্রবর্তী ফোন রিসিভ করতেই দেবযানী বলল, “দাদা, বাড়িতে আছেন? একটু বাইরে এসে দাঁড়াবেন? মা, বাবা কেউ ফোন তুলছে না। আমি বাড়িতে ঢুকতে ভয় পাচ্ছি। প্লিজ”

চক্রবর্তী দ্রুত নীচে নেমে বাইরে এলেন। দেবযানী এগিয়ে গেল, “বারবার ফোন করছি। কেউ ফোন তুলছে না। এদিকে আমাদের বাড়ির ওই গেটের সাইডের হাস্নুহানা গাছের নীচে কেউ আছে। আমি দেখেছি আমাকে দেখে ঢুকে পড়েছে গাছের আড়ালে!”

চক্রবর্তী চমকে গেলেন, “বলছেন কী? দাঁড়ান।” বলে ক্লাবের ছেলেদের ডেকে পাঠালেন উনি। ক্লাবের ছেলেরা এসময় কেউ অফিস থেকে ফিরছে, কেউ এখনও আসেনি। তবু, কাছাকাছি যারা ছিল, সব এল। গেটের ভিতরে ঢুকে হাস্নুহানা গাছের তল খুঁজে দেখা হলো। কিছু নেই।

বাইরে থেকে ডাকাডাকি হলো। দেবযানীর বাবা, মা কেউ জবাব দিচ্ছে না।

চক্রবর্তী এগিয়ে গিয়ে ডোর বেল বাজাতে কেউ একজন এগিয়ে এসে দরজা খুলছিল। দেবযানী বিহ্বল চোখে দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। দরজা খুলে যে দাঁড়াল, তাকে দেবযানী আগে দেখেনি। কে এ?

“আপনারা?” মহিলা জানতে চাইছেন।

“আমি এই বাড়ির মেয়ে। আপনি কে?” দেবযানীর গলার স্বর কাঁপছে।

“ওহো! আপনার জন্যই অপেক্ষা করে আছি আমি। আপনার বাবার শরীর খারাপ হয়েছে হঠাৎ করে। তাই আমাকে বলে রেখেছে, আপনি এলেই যেন আমি গিয়ে দরজা খুলে দিই। আমি আজই এসেছি। আমার নাম যমুনা। আপনার বাবার মাসির মেয়ে। এলাহাবাদে থাকি।”

দেবযানী শ্বাস ফেলে, “বাবা কোথায়? কী হয়েছে?”

“বিশেষ কিছু নয়। গ্যাস হয়েছে। ডাক্তার ডেকেছিলাম। ওষুধ দিয়েছেন ডাক্তার। এখন ঘুমোচ্ছেন। আসুন ভিতরে।” যমুনা সরে দাঁড়ালেন।

চক্রবর্তী দেবযানীকে দূরে নিয়ে বলল, “দেবযানী, আমরাও ভিতরে যাব। সব স্বাভাবিক লাগছে না। এই মহিলার নাম শুনেছেন আগে?”   

“হ্যাঁ। শুনেছি। উনি আসবেন,শুনেছি। আজ আসবেন, জানতুম না। আপনারা আসুন ভিতরে। আমারও স্বাভাবিক লাগছে না।”

সকলে ভিতরে ঢুকেছে। দেবযানীর মা ভিতরের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে, “তুই এসে গিয়েছিস? আর বলিস না। তোর বাবার শরীর হঠাৎ করে খারাপ হলো। তখনই যমুনা এসেছে। সে ডাক্তার ডেকে সুস্থ করে তুলল দাদাকে। তোকে ফোন করতে গিয়ে করিনি। আজ তোর সতুপিসির কাছে যাওয়ার কথা। তাই…। আসুন, আপনারা বসুন। একটু চা খান।”

“না। আসলে দেবযানী আপনাদের বারবার ফোন করে সাড়া পাচ্ছিল না। তাই আমাকে ফোন করেছিল। আমিও আপনাদের ফোন করেছি।ফোন তোলেননি কেন?”

“ফোন? দেখুন কান্ড। ফোন তো এখানেই আছে। ওহো, সাউন্ড ভলিউম কমিয়ে রেখেছি।”

“কেন কমিয়ে রেখেছ? আমি বলেছি, আমি বাইরে থাকলে, ফোন হাতের কাছে রাখবে। তাহলে?” দেবযানী রেগে যাচ্ছিল।

“হুম। সে ঠিক। কিন্তু, কখন যে ফোনের ভলিউম কমিয়ে রেখেছি! আমি তো এরকম করি না। আসলে তোর বাবার শরীর খারাপ হওয়াতে মাথা ঠিক ছিল না।”

চক্রবর্তী বিদায় নিল। যাওয়ার আগে বলে গেল,দরকার পড়লে অবশ্যই যেন তাঁকে ডাকা হয়। দেবযানীর একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। যমুনা নামে কে একজন আসবে শুনেছে। সে এসেছে, অথচ মা জানালো না! সম্পর্কে দেবযানীর পিসি হয় এই যমুনা। মহিলাকে ভালো করে দেখাও হয়নি। দূরে দাঁড়িয়ে আছেন মহিলা।

এবারে মহিলার দিকে তাকিয়ে দেবযানীর মনে হলো ও ভুল ভেবেছে হয়তো। মহিলাকে সাদাসিদে দেখতে। বয়স হয়েছে। সাধারণ একটি তাঁতের শাড়ি পরে আছেন। হাতে সোনার চুড়ি একগোছা। কপালে লাল সিঁদুরের বড় গোল টিপ। দেবযানীর দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে আছেন এই মহিলা। কেন! 

হেসে মহিলা বললেন, “কিছু খাবে তো মা। ফ্রেশ হয়ে এস।”

ভারি স্নিগ্ধ, নরম কন্ঠস্বর মহিলার। গলার স্বর শুনেই মনটা ভালো হয়ে গেল দেবযানীর। ও পাড়ার লোকদের হাসিমুখে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বিদায় জানালো। ওয়াশরুমে ঢুকে দেখল, ওর তোয়ালে পরিপাটি করে রেখেছে মা। হাউসকোটও এনে রেখেছে। বাড়িতে ফিরে স্নান করে দেবযানী। আজও স্নান করে নিল হালকা গরম জলে। স্নানের পরে বেশ ভালো লাগছিল। মায়ের পাশে বসে যখন গরম কফিতে চুমুক দিচ্ছে তখন মনে হলো বাবার শরীরের দিকে কড়া নজর রাখতে হবে। হঠাৎ করে শরীর খারাপ হয়ে গেলে মা একা কী করবে!

কফি বেশ কড়া। মা কেন কফি করতে গেল! রেস্ট পায়নি মোটে। বাবাকে নিয়ে ব্যস্ত ছিল। কফি তো দেবযানী নিজেই করে নিতে পারতো!

যমুনা পিসি খানিক দূরে বসে বললেন, “আজ তোমার সঙ্গে একজন সাধকের দেখা হয়েছে! ভালো হয়েছে। নইলে একটু সমস্যার মধ্যে পড়তে হচ্ছিল তোমার।”

চমকে উঠেছে দেবযানী। যমুনা পিসির তো এসব জানার কথা নয়! উনি কী করে জানতে পেরেছেন?

“আমি জানি। বুঝতে পারি। আসলে উনি যার ভক্ত, আমিও তাঁরই সাধিকা। এসব বাইরে বলা ঠিক নয়। উনি তোমার সম্পর্কে সঠিক বলেছেন। মেনে চলো ওঁর কথা! এতে ভাল হবে তোমার!” যমুনা পিসি পান বের করলেন ছোট রূপোলি কৌটো থেকে। জর্দা পানের গন্ধে ঘর ভুরভুর করতে লাগল। এই গন্ধটা গোপাদির গায়ে পেতো দেবযানী। গোপাদি জলপাইগুড়ির মেয়ে। দেবযানীর বান্ধবী জুঁইয়ের দিদি। সে কবেকার কথা। ওরা কেমন আছে কে জানে। যোগাযোগ নেই বহুদিন। পানের গন্ধে ওদের মনে পড়ে গেল!  

যমুনাপিসি বললেন, “তুমি একটু সাবধানে থেক। কেউ তোমার ক্ষতি করার চেষ্টায় মেতেছে। আমি কাল পুজো করে একটা তাবিজ দেব, তুমি স্নানের পরে পরে নিও।”

দেবযানীর মনে পড়ল পুরোহিতমশাইয়ের দেওয়া তাবিজের কথা। ও সেকথা বলতে যমুনাপিসি খুশি হলেন, “বেশ। কাল ওটাই পরে নিও। সময় ভাল নয় তোমার।”

এসব শুনে দেবযানীর মা কেঁদে ফেলে প্রায়, “এসব হচ্ছেটা কী? কে তোর ক্ষতি করতে চায়?” দেবযানী বলে, “চিন্তা করো না মা। আমি সাবধানেই আছি।একজন খুব ভাল সাধকের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। সতুপিসির বাড়িতে। উনি আমাকে তাবিজ দিয়েছেন। সেই তাবিজ হাতে ধারণ করলে আর ভয় নেই। কেউ আমার ক্ষতি করতে পারবে না। পুরোহিতমশাই বলেছেন,

“দেবযানীর মা স্বস্তি পেলেও ভয় যাচ্ছে না চেহারা থেকে।” যমুনা পিসি বললেন, “বউদি, তোমার মেয়ে এমন একজন মানুষের হাতে পড়েছে, সে ভালো বৈ খারাপ করে না। আমি তাঁকে বহুদিন চিনি। কিন্তু, তাঁর জীবনটা কেমন এক রহস্যে ভরা। উনি বাড়িতে ডাকেন না। কিছু বলেন না নিজের সম্পর্কে। এটা আমার বড্ড অদ্ভুত মনে হয়। কী জানি, কী রহস্য আছে!”

দেবযানী রাতে সামান্য কিছু খেতে চেয়েছিল। পিসি ছাড়লেন না। নিজের হাতে বাঁধাকপি পোস্ত করেছেন। চিংড়ি দিয়ে। শুনে খেতে হলো। সত্যি ভালো রাঁধুনি পিসি।

রাতে নিজের ঘরে শুয়ে ঘুম আসছে না। মা, বাবা দুজনেই ঘুমিয়েছে। দুপুরে রেস্ট হয়নি ওঁদের। রাতে ঘুমিয়েছে। পিসি মা,বাবার পাশের ঘরে ঘুমিয়েছে। ওটা গেস্ট রুম। দেবযানী উঠে ডাইনিং হলে গিয়ে জল খেল। কোথাও কেউ কিছু বলছে যেন! আস্তে আস্তে হেঁটে মায়ের ঘরে গেল দেবযানী। না। এ ঘরে নয়।বাবা, মা ঘুমোচ্ছে। তাহলে কথা বলছেন পিসি? কার সঙ্গে কথা বলছেন?

দেবযানী আস্তে আস্তে এগিয়ে পিসির ঘরের সামনে গেল। ঘরের দরজা ভেজিয়ে রাখা। দরজায় হাত দিতে দরজা খুলে গেল অল্প। সেই অল্প ফাঁক দিয়ে ভিতরে চোখ যেতেই অবাক হয়ে গেল দেবযানী। পিসি কী করছে?

রক্তলাল কাপড় পরেছে পিসি। গলায় চার প্যাঁচের রুদ্রাক্ষের মালা। কপালে সিঁদুর লেপে রাখা। বিড়বিড় করে মন্ত্রোচ্চারণ করছেন পিসি। উনি সাধিকা। তন্ত্র সাধিকা। পুজো করছেন গভীর রাতে! পিসি পিছন ফিরে ওকে দেখলেন। হাতের ইশারায় ঘরের ভিতরে ডেকে নিলেন। দেবযানী ঘরে ঢুকতে উনি বললেন, “আয়, আমি রাতে রক্ততারার পুজো করি।”

“উনি কি তন্ত্র দেবী পিসি?” দেবযানী ছোট একটি কালো পাথরের মূর্তি দেখল লাল শালু কাপড়ের ওপরে বসানো।

“তন্ত্র! হ্যাঁ। তন্ত্র হলো হিন্দুধর্মেরই শাখা। অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে তন্ত্র রচিত হয়েছে। বীজমন্ত্র সকলে পায় না। পেলেও কীলক মন্ত্র একমাত্র গুরুমহারাজই দিতে পারেন। আমাকে কীলক মন্ত্র দিয়েছেন তোমার চেনা পুরোহিতমশাই। উনিই আমার গুরু। আমি রক্ততারার সাধিকা।” পিসি একটু থেমে বললেন “তুমি যদি চাও, আমি তোমাকে তন্ত্র সাধনায় দীক্ষা দেব। তবে তার আগে তোমাকে শুদ্ধ করে নিতে হবে। এখন নয়। পরে। তুমি ঘুমোও। জানি মনে অনেক চিন্তা ঘুরছে। তবে আমি এসেছি। আর চিন্তা নেই। আগামীকালই আমি চলে যাব ঠাকুরপুকুরে। সেখানে গুরুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কথা বলব।”

পিসির ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরের দিকে যেতে যেতে ওর ঘরের দরজায় কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল দেবযানী। একটা লম্বা বিরাট ছায়া দুলছে অল্প অল্প! আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে গেল দেবযানী। নড়াচড়া করতে পারছিল না। শ্বাস রোধ করে রইল। এখন না পারছে পিছনে ফিরে যেতে। না পারছে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে।

চোখ বুজে এসেছে ওর। শরীরে বল নেই। একটু পরে সচেতন হয়ে উঠতেই চোখ খুলে গেল। ফের সব স্বাভাবিক লাগছে। ওর দরজায় ছায়াটা? না। কিছু নেই! দরজার পর্দাটা দুলছে। ও কি পর্দাটাকেই ছায়া ভেবেছে? নাকি পুরোহিতমশাইয়ের কথা সত্যি? দেবযানীর পিছনে প্রেত পাঠিয়ে দিয়েছে কেউ?

 

 

স্বপ্নের মধ্য দিয়ে তিনি এলেন! সমস্ত শরীর টকটকে লাল রঙে রাঙানো। চোখের মণি নেই। পুরো সাদা অংশ দিয়ে চোখ ভরিয়ে রাখা হয়েছে। মূর্তিটা প্রথম দেখি ঠাকুরপুকুরে। পুরোহিত রমেশ ভটচাজের ঠাকুরঘরে গোটা দশেক দেবদেবীর মূর্তি থেকে খানিক তফাতে একটি ছোট বেদির ওপরে রয়েছে মূর্তি। লাল শালু কাপড় পরিপাটি করে পেতে তার ওপর মূর্তিটি বসানো হয়েছে। জ্বলজ্বলে চোখ নিভে যাওয়া কাঠের উনুনের মধ্যে থাকা দু’টুকরো আগুনের মত, যেন বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে ভক্তের চোখে আগুন ধরে যাবে।

ভটচাজ আমাদের পারিবারিক পুরোহিত। ফ্যামিলি ফিজিশিয়ানের মত ফ্যামিলি পুরোহিতও হয়। ভটচাজকে বলা উচিত মাইনে করা পুরোহিত। বছরে একবার উনি আসেন। মে মাসের ঠিক পনের তারিখে আসেন আমাদের চিংড়িঘাটার বাড়িতে। শীর্ণ চেহারায় আরোপিত গাম্ভীর্য নিয়ে তিনি যখন বাড়িতে ঢোকেন, কেন জানি না, জেঠামশাইয়ের মত রাশভারী মানুষও তটস্থ হয়ে পড়েন। সিঙ্গল সোফার ওপরে বসে ডান হাত মুঠো করে থুতনির নীচে রেখে মৌন হয়ে থাকতেন। মাঝে মাঝে সরু ছোট ছোট চোখের পলক পড়তো। আর তখনই আমরা ভাবতাম ভটচাজ এখন কথা বলবেন। যেন ঠোঁট ফাঁক করলেই হিরে মুক্তোর বৃষ্টি শুরু হয়ে যাবে।

জেঠিমা, জেঠামশাই তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন। বসেন না। জেঠামশাই হাতজোর করে, “খবর সব ভাল তো?” বলার পরে উনি সামান্য নড়ে ওঠেন, তারপর চোখ বন্ধ করে খুব মেপে “ভাল” শব্দটা উচ্চারণ করেন। যেন প্রতিটি শব্দের জন্য তাঁকে প্রচুর মূল্য দিতে হয়। ঠোঁট চেপে চেপে অল্প অল্প শব্দ দিয়ে বাক্যালাপ সেরে নেন। এভাবে তাঁর প্রতি একটা সম্ভ্রম জাগাতেন। এত সবের মধ্যেও আধ ময়লা চকোলেট কালারের পুরনো হয়ে যাওয়া পাঞ্জাবি, ঘরে কাচা অনুজ্জ্বল সাদা ধুতি ভটচাজের আর্থিক সংগতির পরিচয় বাইরে পৌঁছে দিত। একটা ঝোলা থেকে প্রায় পাঁচ বছর কি তারও আগের একটি ডায়েরি বের করে যজমানদের নামের ভেতর থেকে স্মৃতি রঞ্জন দত্ত নামটা খুঁজে বের করেন। ওটা জেঠামশাইয়ের নাম। নামের পাশে টাকার অঙ্ক বসান। পুরো বছরের পুজো দেওয়া বাবদ একটা নির্দিষ্ট টাকা নিতে আসেন। ওঁর ঠাকুরঘরে উনি যজমানদের জন্য পুজো দেন। তাদের শুভ কামনা  করেন। এর তো একটা খরচ আছে। তাছাড়া যজমানরা নিশ্চিন্ত, ঝাড়া হাত পা হয়ে থাকেন। তাদের পুজোটুজো দেওয়া নিয়ে ভাবতে হয় না। কোথায় ঠাকুরপুকুরের এক ভটচাজ তাঁদের হয়ে ভাবছেন। তাঁদের জন্য কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করছেন! ভাবা যায়? তো, তাঁকে জ্যাঠামশাই, জেঠিমা সমীহ করবেন না কেন? এটাই আমার মনে হয়েছিল, যখন ওঁকে আমি প্রথম দেখি। বছর দুই আগে।

এখানে প্রশ্ন আসবে। প্রথম এবং বছর দুই আগে কেন? তার আগে কেন দেখিনি!

আসল কথাটা হল, আমি জীবনের ষোলটা বছর উত্তরবঙ্গে কাটিয়েছি। সেখানে প্রাইমারি থেকে মাধ্যমিক পাস করার পরে কলকাতায় চলে এসেছি। জেঠিমা বলে রেখেছিলেন, বাকি পড়া তাঁর কাছে থেকেই করতে হবে। আমিও এ সুযোগ ছাড়তে চাইনি। তাছাড়া, সবচেয়ে যেটা বড় কথা, সেটা হল, আমার বাবার প্রমোশন হল কলকাতায়। ভবানীপুরে। পুরো পরিবার একবারে গুছিয়ে ট্রেনে চেপে বসলাম। উত্তরবঙ্গে আমাদের ছোট্ট বাড়িটি রয়ে গেল। দেখাশোনার জন্য রইল নোটনকাকু। এখন ভটচাজের সঙ্গে আগে দেখা হওয়ার সুযোগ হল। মাত্র দু’বছর আগে আমার সঙ্গে ভটচাজের ফার্স্ট মুলাকাত হল।

আমার কিন্তু সন্দেহ হত। যতই ভাব নিয়ে থাকুন না কেন, উনি যজমানদের ঠকাচ্ছেন বলেই মনে হয় আমার। উনি যে সত্যিই পুজো দেন, তার প্রমাণ কোথায়? মুখের কথাই সব। কে আর দেখতে যাচ্ছে ঠাকুরপুকুরে গিয়ে? এসব সন্দেহ টন্দেহের কথা কাউকে তো বলার উপায় নেই। কিছু বেকায়দার কথা বলতে গেলে ঝামেলা আছে। অপছন্দের কথা শুনলে খেয়ে ফেলবে সবাই। পুরোহিতের নিন্দে করা? বাপ রে! যেন ধর্মগ্রন্থ ছিঁড়ে ফেলতে যাচ্ছি। এভাবেই চলছিল। মাঝে মে মাসে উনি এসে টাকা নিয়ে চলে গেলেন। আমি প্রণাম করে বেরিয়ে এসেছি বাইরে। জেঠামশাইকে দেখলাম কী সব আলোচনা করছেন। এর মধ্যে অসুখবিসুখের কথা ছিল।

ভটচাজ চোখ বুজে আশ্বাস দিচ্ছেন, “হয়ে যাবে। সব হয়ে যাবে।”          

হয়ে তো যাবে, সেটা নাহয় বুঝলাম। অথচ, কী হয়ে যাবে, সেটা কিন্তু বুঝলাম না। কিন্তু, রহস্যের ছিঁটেফোঁটা আমার কানে লেগে রইল। কিসের কথা হচ্ছিল যা আড়ালে গিয়ে বলতে হল জ্যাঠামশাইকে? আবার ওদিকে দেখি আরেক কান্ড। জেঠিমা লালপেড়ে তাঁতের শাড়ির আঁচলে সমানে গিঁট দিয়ে চলেছেন। চোখ ছলছলে। মুখে বিড়বিড় করে মন্ত্রপাঠ করছেন বলে মনে হল আমার। এসব দেখে কালী চক্রবর্তীর কথা মনে হয় আমার। সেই উত্তরবঙ্গের কালী চক্রবর্তী, যাঁর বাড়িতে কালীপুজো হত। সে কী সাড়ম্বরের পুজো! তিনদিন ধরে ঢাকবাদ্যির আওয়াজে কান পাতা দায় হয়ে পড়তো। পাড়ায় খোকন সাহা নামের একটি লোক ছিল। তার বাড়ি বিখ্যাত ছিল ভাড়াটে বসানোর জন্য। প্রায় বড় সাইজের চৌবাচ্চার মত ঘরে একটি করে পরিবার থাকত। তেমনই একটি ঘরে থাকত সুশান্ত। তারই ছেলে সানু। চক্রবর্তীর বাড়িতে কালী পুজোর দিন সারাদিন ঢাক পিটিয়েছিল সানু। নাওয়া খাওয়া নেই। এদিকে গরমের দিন। রোদে ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। পুজোর শেষে দোল খেলা হত।সেও ঢাকঢোল পিটিয়ে।

সানু অনুষ্ঠানের পরে, সন্ধের দিকে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। সানুর মা আতঙ্কে চেঁচাচ্ছে, কাঁদছে, বুক চাপড়াচ্ছে। আমাদের বাড়ির পাশের কাকিমা মাকে ডেকে সানুর কথা বলাতে আমি গিয়েছি দেখতে। যদি কোনরকম সাহায্য করতে হয়, তাই গিয়েছি। গিয়ে অদ্ভুত কান্ড দেখেছিলাম। যার কোনও ব্যাখ্যা নেই আমার কাছে। সেই কেমন এক ঘোর লাগা সন্ধের ছায়ায় আবৃত হয়ে আছে পুরো বাড়ি। কারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, তাদের মুখ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি না। ছায়া ছায়া কারা সব! যেটুকু বোঝা যাচ্ছে তাদের, চিনতে পারছি না। এরা আমাদের পাড়ার কেউ নয়। যেন অন্য কোনও এক রহস্যের মায়াঘেরা জায়গা থেকে তারা এসেছে! ঠিক তখন, সানুর সামনে দাঁড়িয়ে কালী চক্রবর্তীর বউ একমনে লালপেড়ে তাঁতের শাড়ির আঁচলে একটার পর একটা গিঁট দিয়ে চলেছে।

 জেঠিমা মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছেন ভটচাজের সামনে। মাকেও দেখলাম ম্লান মুখে ভটচাজের জন্য দুধ, ফল নিয়ে সামনে রাখছে। আজ কিছু ব্যাপার হয়েছে নাকি? জ্যাঠামশাইয়ের পায়ে একটা প্রবলেম হচ্ছে কিছুদিন ধরে। উনি হাঁটতে পারছেন না ভাল করে। পা মাটিতে ভর দিয়ে রাখতে অসুবিধে হচ্ছে। একটা ওয়াকার নিয়ে এসেছে বাবা। ভটচাজের কাছে বলার আগেই চিকিৎসা শুরু হয়েছে। ফিজিওথেরাপি চলছে ডাক্তারের পরামর্শে। এই অবস্থা যখন চলছে ঠিক তখনই ভটচাজ এসেছে ঠাকুরপুকুর থেকে। জেঠামশাই প্রবল ভরসা করেন ভটচাজকে। অসুবিধের কথা বলছেন, আর ভটচাজ গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ছেন, “বেশ, বেশ, আচ্ছা।”

আমার একটুও ভাল লাগছে না এই ভড়ং দেখতে। বড় ডাক্তারকে দেখানো দরকার। তা না, কোথাকার এক পুরোহিতকে ভরসা করে রোগটাকে বাড়তে দেবেন। আমার কী করার আছে? ভটচাজ কারও বাড়িতে অন্ন গ্রহণ করেন না। উনি টাকাপয়সা বুঝে চলে যাওয়ার আগে বলে গেলেন, “আগামী কৃষ্ণপক্ষে্র অমাবস্যায় উনি ওষুধ দেবেন। কাউকে গিয়ে সেই ওষুধ নিয়ে আসতে হবে।” জেঠামশাই সঙ্গে সঙ্গে পঞ্জিকা বের করে দিনক্ষণ মেপে নিয়ে আমার দিকে তাকালেন, “তাহলে তুমি ভোরে উঠে আগামি বুধবার ঠাকুরপুকুরে চলে যাবে। ঠাকুরমশাইয়ের থেকে জেনে নাও কিভাবে বাসস্ট্যান্ড থেকে বাড়িতে যেতে হবে। নাকি ক্যাব বুক করে যাবে?  যেটাই হোক, বাড়ির এড্রেস জেনে রাখ। আর ফোন নাম্বার নিয়ে রাখ।”

জেঠার কথা মত যা যা করার করে রাখলুম। ভটচাজ বেরিয়ে গেলেন। নেক্সট বুধবারে আমি যখন বাস থেকে নেমে অটো ধরেছি, নামল তুমুল বৃষ্টি। রাস্তার যা অবস্থা, তা চোখে না দেখলে বর্ণনা করা যাবে না। মাঝে একবার অটো থেকে নেমে এক হাঁটু নোংরা জলের ভেতর দিয়ে খানিকটা এগিয়ে যেতে হল। অটো আস্তে আস্তে আসছিল। গাড্ডায় পড়লে মহা ঝামেলা হয়। ড্রাইভার বিড়বিড় করে গালাগালি করে যাচ্ছে কাকে। সত্যি, কলকাতায় বর্ষাকালের ছবিটা বাইরে না বের হলে বোঝা দুষ্কর। জল নিকাশি ব্যবস্থা এত খারাপ! 

ফের অটোতে উঠে খানিক যাওয়ার পরে মধুময় মিষ্টান্ন ভাণ্ডার দেখেই অটো থেকে নেমে পড়লুম। এখান থেকে ডান হাতি গলিতে ঢুকেই ব্যানার্জিপাড়া লেন। এখানেই তিন নাম্বার গলির ছয় নাম্বার বাড়িটি হল ভটচাজের।

বর্ণনা মত পৌঁছে গিয়ে হতাশ হলুম। কী অবস্থা বাড়ির! ইঁটের ওপরে সিমেন্টের পলেস্তারা পড়েনি কোনকালে। এখানে পরপর সব বাড়িরই একই দশা। কোন এক বাড়ির ভেতর থেকে পেঁয়াজ ভাজার গন্ধ আসছিল। রাস্তার দুধারে কাঁচা ড্রেন। সবজির খোসা ভাসছে নোংরা জলে। কাঁচা রাস্তায় জল জমে কাদা হয়ে আছে। গা ঘিন ঘিন করছিল আমার। ছয় নাম্বার বাড়ির কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে কটাং কটাং আওয়াজ এগিয়ে আসতে লাগল সদর দরজার দিকে। কেউ দরজা খুলতে আসছে মনে হচ্ছে। অবশেষে আমার চোখের সামনে দরজাটা খুলে গেল। আমি ভটচাজকে দেখতে পেলুম। একটা লালপেড়ে শাড়িকে ধুতি আকারে পরে, পায়ে খড়ম পরে কপালে সিঁডুরের লম্বা টিপ পরে ভটচাজ আমার মধ্যে যথেষ্ট ভক্তি জাগিয়ে তুলতে খামতি রাখেননি। ঠোঁট চিপে “এস” বলে আমাকে ভেতরে ঢুকতে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন। দেখছি একটা সরু প্যাসেজ চলে গিয়েছে দুটো বন্ধ ঘরের সামনে দিয়ে। গিয়ে একটি ছোট্ট ঘরের সামনে থেমেছে প্যাসেজটা। স্যাঁতসেঁতে আনহাইজিনিক বাড়িতে দিনের বেলাতেই সন্ধে নেমে এসেছে যেন। বাড়িতে কারও সাড়া পেলুম না। একটা বাসন কোসনের আওয়াজ পর্যন্ত নেই। কেউ নেই ভটচাজের? পরিবার বলতে যা বোঝায় আর কি! পরিবারের আটপৌরে গন্ধ থাকে। সেটা এক্কেবারে ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছে।হয়তো ছিলই না কখনও।

“এস। কথা বলবে না। নিঃশব্দে এস।” আমাকে অবাক করে ভটচাজ এগিয়ে যাচ্ছেন প্যাসেজের শেষের ছোট ঘরের দিকে। খড়মের কটাং কটাং ছাড়া অন্য শব্দ নেই। আমার খুব কৌতূহল হচ্ছিল। ছোট ঘরটিতে কী আছে চিন্তা করে। ঘরের সামনে পৌঁছে প্রণাম করে নিলেন ভটচাজ। কাকে প্রণাম? ভেতরে কি ঠাকুর রয়েছে নাকি? এটা ভটচাজের বিখ্যাত ঠাকুরঘর? এখানেই যজমানদের বাড়ির পুজো হয়ে থাকে?

ভটচাজ দরজা হাতের চাপে খুলে ফেললেন। ভেতরে অল্প লালচে আলো। প্রদীপ জ্বলছে। আলো অন্ধকারে দেওয়ালে অদ্ভুতুড়ে ছায়া নড়ছে প্রদীপের শিখার কেঁপে কেঁপে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে। উঁকি দিলুম ভটচাজের পিছন থেকেই। অনেক দেবদেবী বড় একটি কাঠের আসনের মধ্যে পাশাপাশি রয়েছেন। খানিক দূরে একটি আলাদা আসন। সেখানে লাল শালু কাপড়ের ওপরে জবা ফুলে সজ্জিত একটি দেবীমূর্তি। ছোট মূর্তি। কিন্তু এই মূর্তি আমার অচেনা। কখনও এই ধরনের মূর্তি আমি দেখিনি। অল্প আলোর মধ্যেও মূর্তির শরীরের টকটকে লাল গাত্রবর্ণ দেখা যাচ্ছে। উগ্র চেহারা। মাথার ওপরে অজস্র সাপ কুন্ডলি পাকিয়ে রয়েছে। কেউ কেউ নেমে আসার ভঙ্গিতে রয়েছে। দুটো হাত ছড়িয়ে আছে। ভটচাজ হাতজোড় করা অবস্থায় চোখ বুজে দাঁড়িয়ে আছে কেন, সেটাও বুঝতে পারছি না। দেবীমূর্তির চেহারা আমাকে ভীষণভাবে আকর্ষণ করছিল। পরনে কোমর ঘিরে একটি বস্ত্রখন্ড। উন্মুক্ত পদযুগল বাহনের ওপর থেকে নেমে এসেছে। বাহন কে? বোঝা যাচ্ছে না। সিংহ কি?

“এই, কী দেখছ? সাবধান!” এমন ভাবে হিস হিস করে উঠেছেন পুরোহিত মশাই, মনে হল আজ আমার রক্ষে নেই।উনি কাঁপছেন, “তুমি এগিও না। দূরে থাক। ওই দেবীর চোখ যেন তোমার দিকে না পড়ে। শেষ হয়ে যাবে।”

আমি চমকে উঠেছি। কী বললেন ভটচাজ? দেবীর চোখ আমার ওপরে যেন না পড়ে? মানে? দেবী কি জেগে আছেন? সোজা কথায় জ্যান্ত? বলছেন কী ভটচাজ?

ভটচাজ ইশারায় আমাকে বাইরে দাঁড় করিয়ে পুজোর ঘরে ঢুকে গেলেন। মিনিট দশেক পরে বেরিয়ে এলেন একটি ঘন রঙের শিশিতে তরল কোন পদার্থ নিয়ে। বাইরে থেকে দরজা টেনে দিলেন। আমার হাতে শিশিটা দিলেন, “জেঠাবাবুকে দেবে। এই তরলটি পায়ের পাতায় আলতো করে মাখাতে হবে। যে মাখাবে, যে মাখবে, দুজনকেই শুদ্ধবস্র পরে কাজটা করতে হবে। দিনে দুবার।”

আমি বুঝতে পারছি, এবারে আমাকে চলে যেতে হবে। কিন্তু এত প্রশ্ন জমে আছে যে, আমি নড়তে পারছি না। উনি কোন দেবী? ভয়ঙ্কর মূর্তি!

“আমি যে ভুল করেছি, তুমি সেটা করো না। এস। আমার সঙ্গে। “বন্ধ ঘরের একটির দরজা খুলে আমাকে নিয়ে ঢুকলেন ভটচাজ। ঘরে ভ্যাপসা গন্ধ। তেলচিটে বিছানা। খুদে জানালা দিয়ে বাইরের দিনের আলো এক ছটাক এসে পড়েছে ঘরে। একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে নিজে বিছানায় বসলেন ভটচাজ, “এই দেবীকে তুমি কেন, আমাদের কেউই চেনে না। ইনি বৌদ্ধতান্ত্রিক দেবী। তারা মায়ের আরেক রূপ। রক্ততারা। শুনেছিলাম দুর্লভ মূর্তি। অভাবিত ক্ষমতার অধিকারি হওয়া যায় এর প্রসন্নতায়। লোভ হয়েছিল বুঝলে? অর্থকষ্ট বরাবরই আছে। লোভে পড়ে গেলুম। নিজের পরিবারকে স্বাচ্ছন্দ্যে রাখতে কে চায় না বল? এক তীর্থ স্থানে গিয়েছিলুম। সে বড় দুর্গম জায়গা। তবু কষ্ট করে গেলুম। মন্দিরে পুজো দিয়ে ফেরার সময় একটি লোকের সঙ্গে দেখা হল। সে বলল, “প্রসাদ পেয়েছ?”

বললুম, “না।”

সে তখন ইশারায় ফলো করতে বলল। মন্দিরের পিছনদিকে একটি জনহীন স্থানে লম্বাটে ঘর। ঢোকার জন্য দুটো দরজা। আমরা ঢুকতে ওখানে মেঝেতে বসিয়ে আমাকে ফলমূল,আর লাড্ডু খেতে দিল। খেয়ে তৃপ্তি হল। ফিরে আসতে গিয়ে দেখি অনেকটা নীচে একটা ছোট মন্দির। জিগ্যেস করায় ওরা সব গম্ভীর হয়ে গেল, “ওটা একটা গুম্ফা। বৌধ মন্দির। মনে কর ওই মন্দির দেখনি। ভুল করেও ওই মন্দিরে ঢুকবে না। তোমার সব শেষ হয়ে যাবে। দেবী যদি চান, ভাল হবে। যদি না চান, তোমার দিকে দৃষ্টি পড়লে আর রক্ষে নেই। বাড়ি ফিরে যাও বাছা।” শুনে সব কথার ভেতর থেকে “দেবী যদি চান ভাল হবে” বাক্যটা মাথার ভেতরে গুনগুন করে যাচ্ছিল। আমি সবাইকে লুকিয়ে নীচে নেমে গেলুম। ভারি জঙ্গুলে পথ। খুব নির্জন বললেও কম বলা হয়। গুম্ফার কাছে একটিও মানুষকে দেখতে পেলুম না। আস্তে আস্তে ঝোপঝাড়ের মধ্য দিয়ে মন্দিরের কাছাকাছি হতেই দেখি, একটি বামন, মাত্র আড়াই ফুট লম্বা হবে, রক্তাম্বর পরনে, আমার দিকে আঙুল তুলে দাঁড়াতে বলল, “কেন এসেছিস? কুরুকুল্লা কুরুকুল্লা…!” ভাষা বুঝিনি। কিন্তু শরীরের ভাষা বলছে সে আমাকে অপছন্দ করছে। ভয় পেয়েছি। কিন্তু দেবী দর্শনের লোভ ছাড়িনি। আর দেবী তুষ্ট হলে সব পাওয়া যায় কথাটা ভুলিনি। বামনকে দেখিয়ে ব্যাক করেছি। যেই না বামন সরে গেল, আমি মন্দিরে ঢুকে লাল কাপড়ের ওপরে দেবীকে দেখে আত্মহারা হয়ে গেলুম। আশ্চর্য মূর্তি। ঠিক এই রকম মূর্তি সম্পর্কে আমি শুনেছি। চর্মচক্ষে প্রথম দেখলুম। দুর্লভ মূর্তি। এই মূর্তির দাম না জানি কত হবে! আসন থেকে মূর্তি তুলে ঝোলায় ঢুকিয়ে চুপিসাড়ে বেরিয়ে এলুম। সোজা কলকাতায়। এই ঘরে। মূর্তিটি ঠাকুরঘরে গুছিয়ে রাখলুম। মন বলছে এখানেই প্রতিষ্ঠা করব দেবীকে। সেই রাতে টায়ার্ড ছিলুম। ভয়ে দরজা জানালা বন্ধ করে ঘুমোতে গেলুম। কেবলই মনে হচ্ছিল কেউ আসবে আমাকে মেরে ফেলতে চেয়ে। অসম্ভব অস্থির লাগছে আমার। রাতে স্বপ্ন দেখলুম। সেই বামন চিৎকার করে বলছে, “দেবী তোর দিকে দৃষ্টি দিয়েছে। দেবীর মাথার সর্পকুল নড়ে উঠেছে। কোথায় পালাবি?” জেগে উঠে সারারাত বসে কাটিয়ে দিলুম। কি ভয়ঙ্কর স্বপ্ন। সাপেরা জেগে উঠেছে! দেবী আমার দিকে দৃষ্টি দিয়েছে! মন্দিরের সেবাইতেরাও বলেছিল, দেবী দৃষ্টি দিলে খারাপ হতে পারে। ভালও। কিন্তু আমার জন্য ভাল অপেক্ষা করে নেই, সেটা ভালই বুঝতে পারলুম।

তারপরেই শুরু হল অঘটন। আমার বৌ মরে গেল হঠাৎ করে। দুই মেয়ে অ্যাকসিডেন্টে পঙ্গু হয়ে থেকে বছর দুই হল মারা গেল। আমি বুঝেছি,দেবী তুষ্ট নন। আমি যে অন্যায় করেছি, তার জন্য উনি তুষ্ট নন। এই দেবী নিয়ে জানার চেষ্টা করেছি। জেনেছি উনি বৌদ্ধতান্ত্রিক দেবী। যেটা জানতুম না, সেটা জানতে পেরেছি কিছুদিন আগে। দেবীর মধ্যে চৌম্বক ক্ষমতা আছে। যার মধ্যে ভাল কিছু দেখবেন, চুম্বকের মত টেনে নেবেন। পদ্মসম্ভব নামে একজন বৌদ্ধতান্ত্রিক ছিলেন। তিনিই তারা-কে আরাধনা করতে শুরু করেন প্রথম। পরে ইয়েকো সোগ্যালকে রক্ততারার পূজাপদ্ধতি, অনুশীলন পদ্ধতি শিখিয়ে যান। এই বিষয়টা গুপ্ত রাখা হয়। তিব্বতই বৌদ্ধধর্মের কদমপা শাখার প্রতিষ্ঠাতা অতীশ দীপঙ্কর তারার একটি স্তোত্র ও তিনটি তারাতন্ত্র রচনা করেন। বজ্রযান বৌদ্ধধর্মের নাম শুনেছ? এই ধর্মে “তারা” এক গুরুত্বপূর্ণ তান্ত্রিক দেবী। তারার যে বিষয়টা আমি জানতে পারিনি, সেটা হল ভাল কিছুর ওপর দৃষ্টি পড়লে চুম্বকের মত টেনে নেন তিনি। এটা জানলে এই মূর্তি চুরি করতুম না। আমার পরিবার শেষ হয়ে গিয়েছে। সারারাত ঘুমোতে পারি না। এই ঘরে নেমে আসে দেবীর মাথার সাপেরা। সারা ঘরময় ঘুরে বেড়ায়। তাদের নিঃশ্বাসের শব্দে আমার দম আটকে আসে। আমার শরীর পেঁচিয়ে ছোবল দিতে থাকে। অথচ আমার মৃত্যু হয় না। কিছু করার নেই।আমৃত্যু চলবে এমন। পাপের ফল।”

“আমাকে এসব বললেন কেনঁ?”

“আমার মনে হচ্ছে কাউকে বলা দরকার। আমি আর বেশিদিন নেই। দেবীর ক্ষমা পেলুম না। নিজের পাপ কারও কাছে স্বীকার করে যাই।”

আমার মাথা বনবন করছিল। এই ঘরে সাপ আসে? চেয়ারের অপরে পা তুলে নিলুম, “আপনি মূর্তি কোনও মন্দিরে দিয়ে রাখতে পারেন। তারা মায়ের মন্দিরে যান। তারাপীঠে।”

দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ভটচাজ, “গিয়েছিলুম। সেখানে, অন্যান্য মন্দিরেও গিয়েছিলুম। দেবী রক্ততারাকে রেখে এসে বাড়িতে ঢুকে দেখি, নিজের জায়গায় অটল হয়ে রয়েছেন। যাননি। ফিরে এসেছেন। চলে গেলে যে আমাকে শাস্তি দেওয়া অসম্পূরণ রয়ে যায়।”

আমি স্তব্ধ হয়ে রইলুম। রক্ততারা দেবীর রোষ থেকে মুক্তির উপায় কী ভটচাজের? যে মন্দির থেকে দেবীকে নিয়ে এসেছিলেন, দেবী কি সেখানেই যেতে চান? 

“সেখানে? আমি সেখানে গেলে আর প্রাণ নিয়ে ফিরে আসতে পারব না। মন্দিরের নিয়ম হল,দ্বিতীয়বার মন্দিরের ভেতরে পা রাখলে আর মন্দির থেকে বেরিয়ে আসা যায় না। স্বর্গ বা নরকের দরজায় ঢুকে পড়তে হয়। ধর, এসব কল্প কথা। কিন্তু যদি সত্যি ফিরে আসা না যায়, তার অর্থ হল, দ্বিতীয়বার ঢুকলে এমন কিছু হয়, যে ঢুকেছে সে আর বেঁচে থাকে না!”

আচ্ছা, এমন একটা বিষয়ের মধ্যে জড়িয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে খুব। আমি কি যাব সেই মন্দিরে? দেবীকে পুনর্স্থাপন করে আসব? মৃত্যু? আমার মৃত্যু হবে কেন? আমি দেবীকে ফিরিয়ে দিতে চাই। শুধু মন্দিরটি যেখানে, সেখানে আমাকে নিয়ে যেতে হবে।

ভটচাজ চমকে উঠেছেন, “কী বলছ? সেখানে বিপদ পদে পদে! আমাকে চিনে ফেলবে ওরা। সেই বামনের দৃষ্টি তুমি দেখনি। অন্তরাত্মা পর্যন্ত দৃষ্টি চলে তাঁর। আর তোমাকে সেখানে নিয়ে যাব? তোমার বিপদ হলে স্মৃতিবাবুকে কী জবাব দেব?”

“কিন্তু অন্য উপায় নেই যখন, ট্রাই করে দেখি চলুন। আমি বাড়িতে যা বলার বলব। কবে যাবেন, জানাবেন। মনে হয় দেরি না করাই ভাল।”

 

 

দেবযানীকে নিয়ে বেহালার ঠাকুরপুকুরে গিয়েছিল যমুনা পিসি। ঠাকুরমশাই দরজা খুলে ওদের দেখে খুশি হলেন বলে মনে হলো না মুখ দেখে। খানিকটা বিরক্তি খানিকটা রাগ মিশিয়ে বললেন, “এ সময়ে তোমরা? কেন? খবর দিয়ে আসতে হয় যমুনা! এই মেয়েকে নিয়ে এসেছ কেন এখানে? এ জায়গা কি ভাল?”

যমুনা পিসি একটু ইতস্তত করে বলল, “আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। তাই ভেবেছি, দেবযানীকেও নিয়ে আসি। ওর গুরু তো আপনিও একরকম। ওকে সাবধান করেছেন। আমিও সাহায্য করতে চাই। সেই ব্যাপারে পরামর্শ নিতে এসেছি গুরুদেব।”

একটু শান্ত হলেন ঠাকুরমশাই। একটু সরে গিয়ে ওদের ভিতরে ঢুকতে দিলেন। ওরা ভিতরে ঢুকতেই সদর দরজা বন্ধ করে দিলেন উনি।

দেবযানী কিছু দেখতে পাচ্ছিল না। বেশ অন্ধকার বাড়ির ভিতরটা। একটা সরু প্যাসেজ চলে গিয়েছে অনেকটা দূর পর্যন্ত। ডানহাতে দুটো ঘরের দুটোই তালা দেওয়া। সরু প্যাসেজ দিয়ে দিয়ে গিয়ে একটি দরজার সামনে শেষ পা ফেলতে হবে। দরজার ও পারে কী আছে?

ঠাকুরমশাই শেষ পর্যন্ত গেলেন না। দুটো ঘরের একটির দরজা খুললেন পকেট থেকে চাবি বের করে। গুমোট গন্ধ বাড়িময় ছড়িয়ে আছে। যেন দীর্ঘদিন আলো, বাতাস ঢোকেনি এই বাড়িতে।

ঘরের দরজা খুলে ঠাকুরমশাই বললেন, “যাও। যমুনা, ঘরে গিয়ে ব’স। আমি আসছি।” বলেই উনি হনহন করে সোজা হেঁটে গেলেন প্যাসেজ শেষের দরজার দিকে। দেবযানী কৌতূহল সামলাতে পারছিল না। ওদিকে কী আছে? কেন ওদের ওদিকে নিলেন না ঠাকুরমশাই?

যমুনা পিসি চুপ করে একটা কাঠের চেয়ারে বসে আছেন। দেবযানী ওর পাশের একটা প্ল্যাস্টিকের স্টুলে বসেছে। ঘর একেবারেই অপরিচ্ছন্ন। বিছানা রয়েছে একধারের দেওয়াল ঘেঁষে। তেলচিটে বিছানার বালিশের একই অবস্থা। কেউ নেই বাড়িঘর পরিষ্কার করার মতো? একজন কাজের লোক লাগাতে পারেন তো ঠাকুরমশাই। এভাবে কেউ কি থাকতে পারে? রান্না করেন কোথায়?

যমুনা পিসি মুখে কিছু বলছেন না বটে, মনে মনে অনেক কথা যে বলছেন, সেটা দেবযানী বেশ বুঝতে পারছে। একটু পরেই ঠাকুরমশাই এসে ঘরে ঢুকলেন, “হ্যাঁ, বলো! কী জন্য এসেছ এখানে?”

যমুনা পিসি খুলেই বলল সবটা। ইদানিং দেবযানীর সঙ্গে কিছু অলৌকিক কান্ড ঘটেছে। সেই ব্যাপারে দেবযানী ভয় পাচ্ছে। যমুনা পিসি গুরুদেব কোনও উপায় বলবেন কিনা, সেটাই জানতে এসেছেন।

ঠাকুরমশাই বললেন, “আমি কিছুদিনের জন্য বাইরে যাচ্ছি। অকাজেই যাচ্ছি। ফিরে এসে দেখব। তবে ভয়ের কিছু নেই আপাতত। দেবযানী মাকে আমি তাবিজ দিয়েছি। মন্ত্র দিয়েছি। সেই মন্ত্র জপ করে যাও, ভালো ফল পাবে। তোমার পিছনে প্রেত লেগেছে, এটা বলেছিলাম, মনে আছে? সেটাই হচ্ছে। আঘাত করতে পারবে না। ভয় দেখাবে শুধু। বাড়িতে যাও। পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখবে না।”

যমুনা পিসি উঠে বলল, “একবার কি মায়ের দর্শন হবে না?”

বিরক্তি নিয়ে ঠাকুরমশাই বললেন, “মায়ের দর্শনের কথা বললে না বলতে পারি না। চল, দেখে এস। তবে ভিতরে ঢুকবে না। দরজার সামনে থেকে দেখবে।”

দেবযানী দেখল, প্যাসেজের শেষাংশে একটা সরু ড্রেন রয়েছে। হয়তো ঠাকুরঘরের লাগোয়া এই ড্রেন। পুজোর জল বেরিয়ে যায় এই ড্রেন দিয়ে। সেই ড্রেনের মধ্যে শুয়ে আছে দুটো লিকলিকে সাপ। পিঠে কমলা দিয়ে চক্কর বক্কর আঁকা।  

ওদের সাড়া পেয়ে সাপদুটো মাথা তুলে ঘুরে দেখল। ফের শুয়ে পড়ল।

“বিষাক্ত নাকি?” ভয়ে গলা দিয়ে আস্তে স্বর বেরিয়ে এল দেবযানীর।

“বিষ থাকে তো নিজেকে বাঁচাতে। আছে বিষ। তাতে কী?” ঠাকুরমশাই বন্ধ দরজাটা খুলে দিলেন।

দেবযানী দেখল, দরজার ভিতরে অদ্ভুত ঘোলাটে আলো আর অন্ধকার মিলেমিশে মায়াছায়া খেলা খেলছে। ঠাকুরমশাই বললেন, “ঢুকবেন না। সাবধান। এ দেবী বড় নির্মম। ভক্তি, ভয় কিছুই দেখানোর দরকার নেই। বাড়িতে চলে যান। আর এদিকে আসবেন না।”

বলতে বলতেই দেবীর সামনের তেলের প্রদীপ দপ দপ করে উঠেছে। সেই লালচে আলোতে দেবযানী দেখল দেবীর মুখ। সরোষে দেখছেন দেবী ওকে! চোখে তীব্র রোষ যেন!

ভয়ে দেবযানী স্তব্ধ হয়ে গেল। নড়াচড়া করতে পারছিল না। পিছন থেকে সভয়ে মন্ত্র উচ্চারণ করে উঠেছেন ঠাকুরমশাই, “ওঁম তারে তম স্বাহা! ওঁম তারে তম স্বাহা ওঁম তারে তম স্বাহা…!” ঠাকুরমশাই মন্ত্র পাঠ করেই চলেছেন। হাতের ইশারায় আভূমি প্রণাম করতে বলছেন দেবযানীকে।

দেবযানী মাটিতে লুটিয়ে পড়ে প্রণাম করল। মাথা তুলতে ভয় হচ্ছে ওর। যমুনা মাসি কোথায় আছে! দেবযানী চাইছে মাসি এসে ওকে উদ্ধার করুক।

কিছুক্ষণ যেন জ্ঞান ছিল না দেবযানীর। এক সময় ঠাকুরমশাইএর গলা পাচ্ছিল না দেবযানী। মাথা আস্তে তুলে দেখল, ঠাকুরমশাই লুটিয়ে আছেন ঠাকুরঘরে, দেবীর সামনে।

ঘরে লালচে আলোটা নেই।

যমুনামাসি এসে দেবযানীকে তুলে একটি ঘরে নিয়ে গিয়ে বসিয়েছেন। দেবযানীর মনে হচ্ছে, এখান থেকে বেরিয়ে অনেক দূরে কোথায় যেন ওকে যেতে হবে। সে অনেক দূরে। যেখানে ওর জন্য কেউ একজন অপেক্ষা করে আছে। একমাত্র সেখানে যাওয়ার জন্যই যেন ওর জন্ম হয়েছে! মাথাটা ভার ভার ঠেকছে। জ্বর আসছে নাকি! যমুনা মাসিকে কিছু বলতে ইচ্ছে হলো না। একবার চোখ খুলে তাকিয়ে দেবযানী দেখে ওর সামনেই দেওয়ালের সঙ্গে ঝুলে আছে একটি বড় লম্বাটে আয়না। আয়নায় ওকে দেখা যাচ্ছে। যমুনা মাসিকেও দেখতে পাচ্ছে ও। স্পষ্ট।

দেবযানী যমুনা মাসির দিক থেকে চোখ সরাতে গিয়েও আটকে গেল। অদ্ভুত লাগল। যমুনা মাসি একদৃষ্টে ওর দিকে ঝুঁকে আছেন! কেন? এভাবে আছেন কেন?

আয়নার দিকে থেকে চোখ সরিয়ে ঘুরে মাসির দিকে তাকিয়েই অবাক হয়ে গেল দেবযানী। মাসি চোখ বুজে সোজা হয়ে বসে আছেন! আরে! এইমাত্র যে অন্যরকম ভঙ্গিতে মাসিকে বসে থাকতে দেখেছে, তার অর্থ কী? মাসি কি ওকে অন্যরকম বোঝাচ্ছে? মাসি আসলে কে? মাসি কি সত্যিই ওর শুভার্থী? কিছু বুঝতে তো পারছে না!

ওকে নজর রাখতে হবে যমুনা মাসির দিকে। মাসিকে বুঝতে না দিয়ে!

দেবযানী ফের চোখ বুজে ফেলেছে। মনে মনে এক থেকে পাঁচ পর্যন্ত গুনে আস্তে একটা চোখ খুলেছে। দেখে, ঠিক আগের মতো ভঙ্গিতে মাসি ঝুঁকে আছে ওর দিকে। ওর মাথার দিকে। কী চায় মহিলা? ও কি দেবযানীর মনের কথা পড়ছে এভাবে বসে থেকে? যদি সেটাই হয়, তাহলে দেবযানীকে মনের কথা মনের অন্তস্থলে রেখে দিতে হবে।

মাসিকে দেখতে পাচ্ছে সোজা হয়ে চোখ বুজে থাকতে। মাসি ধ্যানে বসে ওকে খুলে দেখছে! দেবযানী ভাবতে শুরু করছে। যমুনা মাসি খুব ভাল। মাসির কথামতো চলতে হবে।

“দেবু মা? শরীর ঠিক আছে তো?” যমুনা মাসি নরম সুরে ডাকছেন। দেবযানী মন দিয়ে অনুভব করল, দেবযানীর মন পড়েছে মাসি। তাই জেনেছে যমুনা মাসি সম্পর্কে দেবযানীর ধারণা। দেবযানী অন্য চিন্তা থেকে বিরত হল। এখন শুধুই মাসির কথা ভাবতে হবে। মাসি খুব ভাল। মাসি ওর দেখাশোনা করে। মাসির কথা শুনে চলবে ও…!

মাসি ওকে ধরে ওঠালো, “চলো মা। এবারে বাড়ির দিকে যাওয়া যাক। ঠাকুরমশাই, এদিকে আসুন। আমরা একবার সেখানে যাব। মা লাল তারা যেখানে লুকিয়ে আছেন, সেখানে। ব্যবস্থা করুন। সঙ্গে আমার এক ভক্তও যাবে।”

ঠাকুরমশাই এসে দরজায় দাঁড়িয়েছেন। কেমন ঘোলাটে চোখ তাঁর। দেবযানী বলল, “জল খাবেন ঠাকুরমশাই?”

উনি মাথা নাড়লেন। না। খাবেন না।

মাসি বলল, “তাহলে চলুন। একবার সেখানে যাই। আপনি ছাড়া সে জায়গা আমি চিনতে পারব না। দেবুমাকে নিয়ে যাবো।”

“সঙ্গে কে যাবে? কে সেই ভক্ত?” পুরোহিত মশাই জানতে চান।

“সে আছে একজন। ভারি ভালো মানুষ। তার অনুরোধেই আমি সেখানে যেতে চাইছি। চলুন। যাই।”

“বেশ। যাব। আমারও এক ভক্ত আছে। সে যেতে চায়। তাকেও নেব তাহলে।”

“বেশ। বেশ। যাবে বৈকি! লাল তারা মা যাকে যাকে ডাকবেন, তাকে তাকে যেতেই হবে। কেউ নেই আটকাতে পারে। তাই না ঠাকুরমশাই?” মাসি বিগলিত হাসি হাসেন।

“তুমি কেন যাবে যমুনা? কেন এত তাড়া?” পুরোহিতমশাই ঘোলাটে চোখে মাসির দিকে সোজা তাকিয়ে আছেন।

“আমি? মানে, আমি চাই মা লাল তারার পায়ে নিবেদন করতে। পুজো নিবেদন। মা ডাকছেন যে!”

“বেশ। যাবে। তৈরি থেকো। যে কোনদিন,যে কোনও সময়ে রওনা হতে হবে। তখন কিন্তু পিছিয়ে আসতে পারবে না!” ঠাকুরমশাই স্থির চোখে মাসিকে দেখছেন। উনি কি মাসিকে বুঝতে চেষ্টা করছেন নাকি? দেবযানী ভাবছিল। 

“কিন্তু, আমার এক ভক্ত যাবে। দেবুকেও নেব। ওর বড্ড টান লাল তারা মায়ের প্রতি।”

“না। না। ও কেন যাবে? এখনও সময় হয়নি ওর। ও বাড়িতে থাকবে। ওর সংসার হবে। ওকে এসবের মধ্যে টেনে নিয়ে যেও না।”

“তা বললে হয়? ও যাবে। আমি বলছি। মা ডাকছেন। ও শুনতে পাচ্ছে, আমি জানি। তাই ও যাবে।”

ঠাকুরমশাই চুপ করে গেলেন।

সেদিন থেকে দেবযানীর মনে যমুনা মাসিকে নিয়ে ভয় ধরে গেল। দেবযানী স্থির করেছে, মাসিকে চোখে চোখে রাখতে হবে।

বাড়িতে ফিরেছে প্রায় রাত পৌনে দশটার সময়। মা, বাবা চিন্তা করছিল। তবে, সঙ্গে যমুনা মাসি আছে বলে ভয় পায়নি। দেবযানীকে দেখে মা বলল, “গরম গরম ভাত খেয়ে নিয়ে রেস্ট নে। আমি সব করে নিয়েছি। চিন্তা করিস না।”

খেয়ে শুয়ে পড়েছে দেবযানী। রাত চুপচাপ হতেই উঠে যমুনা মাসির ঘরের কাছে গিয়ে বন্ধ দরজায় কান পেতেই চমকে উঠেছে। মাসি হাসছে কেন? এমন পাগলের মতো হাসছে কেন?   

দরজার গায়ে ভালো করে কান পাততেই শুনল, ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলতে বলতে হাসছে মাসি, “কেল্লা ফতে! কেল্লা ফতে! আমি কাজটা করে ফেলতে পারব। আমার হাতে সব চলে এসেছে! সব!” বলে উঠল।

দেবযানী ভয়ে কেঁপে উঠেছে। কী বলছে মাসি? কেল্লা ফতে মানে? কোন কেল্লা দখল করেছে মাসি?

কাল, মাসিকে ফলো করবে দেবযানী। কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে, কে সেই ভক্ত, ওকে জানতে হবে।

সকাল হতেই দেবযানী তৈরি হয়ে শুয়ে রইল। চাদরের নীচে শুয়ে থেকে ঘুমের ভান করে আছে। একটু পরেই দেখল, ওর ঘরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে যমুনা মাসি উঁকি দিয়ে ওকে দেখছে। দেবযানী যে জেগে আছে, সেটা বুঝতে পারেনি। মুচকি হেসে সরে গেল মাসি।

দেবযানী উঠে পড়ে। দ্রুত পার্সটা হাতে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল। রাস্তায় বেরিয়েই দেখল, অটোর লাইনে দাঁড়িয়ে আছে মাসি। দেবযানী গাছের আড়ালে লুকিয়ে দেখল, মাসির অটো বেরিয়ে গেল।

দেবযানী দ্রুত গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে সামনের প্যাসেনজারকে জিজ্ঞাসা করল, “এই মাত্র যে অটো বেরিয়ে গেল, সেটা কোথায় যাচ্ছে?”

“গড়িয়াহাট।” লোকটি বলল।

মাসি গড়িয়াহাটে যাচ্ছে? সেখানে কী আছে? যাই হোক, দেবযানী দেরি করল না। যে অটো গড়িয়াহাটে যাচ্ছে, সেটায় উঠে বসল। দুটো অটোর পরে ওর অটো। মাসি অনেকটা আগেই পৌঁছে যাবেন। কিন্তু, গড়িয়াহাটেই যে যাবেন, তার কি মানে? মাঝপথে অন্য কোথাও নেমে যেতে পারেন না কি?

দুশ্চিন্তা না করেই রাস্তার দিকে চোখ রেখে গেল দেবযানী। কিন্তু ব্যর্থ হলো আজকের অভিযান। গড়িয়াহাটে গিয়ে মাসিকে আশেপাশে কোথাও দেখতে পেল না। স্বাভাবিক। মাসি নিশ্চয় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে ওকে দেখা দেওয়ার জন্য নেই! ফিরে এল দেবযানী। বাড়িতে ফিরে নজর রাখল মাসি কখন ফেরে দেখবে আজ। ঘন্টাখানেক পরেই ফিরে এলেন যমুনা মাসি। দেবযানী চা খেতে খেতে অবাক হয়ে বলল, “কোথায় গিয়েছিলে মাসি?

যমুনা মাসি হেসে বললেন, “এক মন্দিরে। সেখানে গিয়ে বসলাম। ভাল লাগে।”

“মন্দিরে? আমাকে নিয়ে গেলে না কেন?”

“যাব। নিয়ে যাব তোমাকে। বলব তার আগে।” মাসি ঠোঁটের মধ্যে হাসি ঝুলিয়ে রেখে নিজের ঘরের দিকে যেতেই দেবযানী টুক করে উঠে মাসির ঘরের দিকে গেল। মাসি ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন।

দেবযানী এগিয়ে গিয়ে দরজার গায়ে কান পাততেই শুনল মাসি কাউকে বলছেন, “সময় এগিয়ে এসেছে। অমাবস্যার আগেই পৌঁছতে হবে। আমি ভোগ নিয়ে রওনা হবো।”

ভোগ? মাসি কোথায় যাবেন? সময় মানে? দেবযানী অস্থির হয়ে উঠছিল। এ কে এসেছে ওদের বাড়িতে? মা ঠিকঠাক চেনে কিনা মাসিকে, সেটাও সন্দেহ আছে দেবযানীর। মা একটু ভুলো মনের মানুষ। মাসি যা বুঝিয়েছেন, মা হয়তো সেটাই বিশ্বাস করে আছে! আসলে মাসি কি সত্যিই মায়ের কাজিন? নাকি, অন্য কেউ এসে উঠেছে এই বাড়িতে?

তাহলে, যমুনা মাসি কে? কেন এসেছে দেবযানীর সংস্পর্শে? কী চায়?

দিন চারেকের মধ্যে কিছু ঘটল না। দেবযানী একটু দুশ্চিন্তা, একটু ভয় নিয়েই ছিল। এর মধ্যে কিছু না ঘটাতে সাহস পেল, এমন নয়। বরং চিন্তা বেড়ে গেল। সবদিক শান্ত হয়ে গেলে ভয় হয়, এই নিস্তরঙ্গ জীবনের তলে কোন অশুভ ছায়া ঘুরে বেড়াচ্ছে!

দেবযানী কলেজ থেকে বেরিয়ে বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিল বাসের অপেক্ষায়। কেউ একজন পাশে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে। কিছু কিছু কথা ভেঙ্গেচুরে কানে আসছে। একসময় বাসের দেখা পাওয়া যেতেই দেবযানী তৈরি হলো বাসে ওঠার জন্য। ঠিক সেই মুহূর্তেই ফোনালাপের অংশ ছিটকে কানে এল। “অমাবস্যার আর সাতদিন বাকি।”

কথাটা কানে নিয়েই বাসে উঠেছে দেবযানী। বাসে উঠে বসেছে। গুছিয়ে বসে বাসের জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাতেই ফোনালাপের অংশ ওর মাথায় এল। অমাবস্যার আর দিন সাতেক বাকি! অমাবস্যার কথা যমুনা মাসি বলছিলেন সেদিন রাতে। কাউকে বলছিলেন। আচ্ছা, কাকে বলছিলেন? অমাবস্যার আগেই ভোগ নিয়ে রওনা হবে যমুনা মাসি! খুবই ধোঁয়াটে অবস্থার মধ্যে আছে দেবযানী। কিছু বুঝতে পারছে।কিছু নয়। সব মিলেমিশে একটা মোহাচ্ছন্ন অবস্থা।

রাতে মা তারার ধ্যান করছিল দেবযানী। কোনও মন্ত্র জানে না, নিয়ম নিষ্ঠা জানে না। তবু প্রাণভরে ডাকল মাকে। সেই রাতে ভালো ঘুম এল। ঘুমের অতলে তলিয়ে যাচ্ছিল যখন, অনেক দূর থেকে কেউ চেঁচিয়ে ডেকে উঠল, “কুরুকুল্লা! কুরুকুল্লা!”

ঠিক পরের দুদিন যমুনা মাসি ব্যস্ত রইল। নাকি মন্দিরে যাচ্ছে। দেবযানী একদিন ফলো করে মাসিকে মন্দিরে যেতে দেখল বটে। কিন্তু মন্দিরে গিয়ে মাসি বাস্তবিক কী করছেন, সেটা জানতে পারল না দেবযানী। মন্দিরের ভিতরে ঢুকতে সাহস পেল না। পাছে, মাসি ওকে দেখে ফেলেন, সে ভয় ছিল। একদিন সিতুপিসির বাড়িতে গিয়ে পুরোহিতমশাইয়ের খোঁজ করেছে দেবযানী। সিতুপিসি বলেছে পুরুতমশাই এখন অনেকদিন আসেননি। দেবযানীর অস্বস্তি হচ্ছে ইদানিং। কী যে হচ্ছে, কী যে হবে, মাথায় আসছে না। এর মধ্যে, একদিন, যখন অমাবস্যার আর তিনদিন বাকি। মাসি এসে বললেন, “মন্দিরে যেতে চেয়েছিলে, চলো যাই। ঘুরে আসি। মন ভালো হয়ে যাবে।”

দেবযানী রাজি হলো। যাবে। যমুনা মাসির স্বরূপ জানতে হবে ওকে। মাকে বলতে মা রাজি। বাবাকে ইচ্ছে করেই কিছু জানানো হলো না। বাবা আজকাল বড্ড চুপচাপ থাকেন। কী দরকার বিব্রত করে! ঠিক পরের দিনই ব্যাগ গুছিয়ে ফেলল দেবযানী। জামাকাপড়ের নীচে যত্ন করে লংকার গুঁড়োর পাউচ নিল। বরাবর যেমন নেয়। আর নিল কিচেনের ফলকাটার ছুরিটা। জামাকাপড়ের নীচে গুছিয়ে রাখল। বাইরে যেতে হচ্ছে। অবিশ্বাসী মন নিয়ে যাচ্ছে। সঙ্গী কেউ থাকুক নিজের জন। গয়া যাবে, আজ সকালে শুনেছে। কিছু বলেনি দেবযানী। ভটচাজমশাই বলেছিলেন “জীবনে ভয় আসবে। কিন্তু সে হেরে যাবে।” ভরসা সেই কথাগুলোই। ভটচাজ বলেছিলেন, “প্রেত তাড়া করবে।” করছে, জানে দেবযানী। রাতে ওর মুখের ওপরে ঝুঁকে থাকে যে লোলচর্ম বৃদ্ধ, সে কে! দেবযানী ভরসা করেই তো বেঁচে আছে! (যমুনা মাসি চায় দেবযানীকে বলি দিতে। তাহলেই তার মনের বাসনা পূর্ণতা পাবে। সেই অনুযায়ী সেই মন্দিরে নিয়ে যাবে। সেখানে উত্তম পুরুষের সঙ্গে দেখা হবে। বলির মুহূর্তে দেবযানীকে বাঁচাব। তাকে নিয়ে কলকাতায় আসব। মাসি আর পুরোহিতমশাই সেই মন্দির থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। তারা ভোগ গ্রহণ করেছেন।”)

 

 

গয়া পৌঁছেছি আমরা। আমরা মানে আমাদের সঙ্গে যাচ্ছেন ভটচাজের এক যজমানের মেয়ে আর বয়স্কা শ্যালিকা। ট্রেনে ওঠা পর্যন্ত ভটচাজ গুম মেরে আছেন। তাঁর ঝোলায় সুন্দর করে প্যাক করা আছে দেবী রক্ততারার মূর্তি। একসেট ধোয়া পোশাক রাখা আছে মন্দিরে ঢোকার জন্য। শিয়ালদা থেকেই গুম হয়ে আছেন ভটচাজ। ফল্গু নদীর তীরে সীতাকুন্ড দর্শন করে ভটচাজ বললেন, “এবারে আমাদের যেতে হবে বুদ্ধগয়ার দিকে।”

আমরা মূলমহাবোধি মন্দিরের দিকে যাচ্ছি। সন্ন্যাসী উপগুপ্তের তত্ত্বাবধানে এই মন্দির তৈরি হয় বলা হয়। মন্দিরে ঢুকলুম না। বোধিবৃক্ষের কাছে গিয়ে খানিক দাঁড়িয়ে ভটচাজ অস্থির ভাবে হাঁটতে শুরু করলেন। আমার কিছু করার নেই। ভটচাজের পিছন পিছন অমিমেষ লোচনের দিকে যাচ্ছি। বোধি লাভের পর যেখানে বসে ধ্যান করেন, সেখানে গিয়ে দেখি সরোবরের মাঝে কুন্দলীকৃত সাপের শরীর বুদ্ধের মূর্তিকে জড়িয়ে রেখে ফণা বিস্তার করে আছে দুর্যোগ থেকে বুদ্ধকে রক্ষা করতে। সাপ দেখেই আমার দেবীর মূর্তির কথা মনে পড়ল। ভটচাজ হেঁটে লম্বা রাস্তায় গিয়ে টাঙায় উঠবেন বললেন। দুজনে একটা টাঙায় চেপে সোজা রাস্তায় গিয়ে বাঁ দিকের সরু রাস্তা ধরলুম। অন্য টাঙ্গায় সেই অল্পবয়সী মহিলা দেবযানী, আর তাঁর মাসি যমুনা। টাঙাওলা কাঁচা রাস্তায় বেশিদূর যেতে রাজি হল না। একবার আমাদের জিগ্যেস করে ফেলল, “আপলোগ গুম্ফামে যাওগে ক্যা?”

ভটচাজ মাথা নাড়লেন, “না, না। নেহি যায়গা।”

“মত যাও। উঁহা যানা মানা হ্যায়।” আমাদের একটা গাছের নীচে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল টাঙাওলা। আমার মনে হল, গুম্ফা নিয়ে ভীত বলেই লোকটা এগোতে চায়নি। কাঁচা রাস্তার কথাটা অজুহাত মাত্র। চারপাশে তাকাতেই মনে হল এমন নিঝুম, অস্বস্তিকর পরিবেশ কোথাও দেখিনি। সব সময় মনে হচ্ছে অলক্ষ্যে থেকে কেউ আমাকে লক্ষ্য করে চলেছে। ভয় ভয় করছিল, সেকথা অস্বীকার করতে পারব না। ভটচাজ এখন কোনদিকে যাবেন? দুজন মহিলাও চিন্তিত মনে হচ্ছে।

ভটচাজ সতর্ক চোখে এদিক ওদিক তাকাচ্ছেন। তারপর ইশারা করে ওঁকে অনুসরণ করতে বললেন। ভদ্রলোক দ্রুত হাঁটছেন। আমরা এই মুহূর্তে একটা ছায়াচ্ছন্ন জায়গায় এসে পৌঁছেছি। জঙ্গুলে জায়গা। ভটচাজ বললেন, “এখানে একটা সুঁড়িপথ ছিল। এখনও আছে নিশ্চয়। ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে গা ঢেকে সোজা এগিয়ে একটা ঢালু পথ পাবে। নেমে যাবে। সেখান থেকে খানিকটা ডানহাতে দেখবে গুম্ফাটা। এরপরে যা করার তুমি নিজে ভেবেচিন্তে কর। মনে রেখ, সুস্থ শরীরে তোমাকে তোমার বাড়িতে পৌঁছে দিতে চাই আমি।নিজেকে সামলে রেখ। আমি আর যাব না। এখানে অপেক্ষা করছি। আর যমুনা, তুমি দেবযানীকে নিয়ে পুজো দিতে সামনের  দিকে যাও। মন্দিরের প্রবেশপথের দিকে।”

“না। আমরাও এই ছেলেটির পিছনে যাব। মন্দিরে সরাসরি ঢুকতে দেয় না। আপনি তো জানেন।” যমুনার গলায় কাঠিন্য।

ভটচাজের কথামত নিজেকে লুকিয়ে রেখে এগিয়ে গেলাম। দূরে যখন ঘন্টার আওয়াজ পেলাম, বুঝেছি আমরা পৌঁছে গিয়েছি। ঢং ঢং শব্দে ঘন্টা বাজছে। একটা ঝ্যমর ঝম ঝম শব্দ হচ্ছে। আর সমস্বরে ওম মণিপদ্মে হুম ধ্বনি আসছে। অনেক মানুষ আছে কি? আমি আগে আগে যাচ্ছি। পিছনে বাকিরা। কেউ আমাকে দেখে ফেলবে না তো?

নিজেকে লুকিয়ে ফেলা যে কী কষ্ট, সেটা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছি। বুঝতে পারছি আমি গুম্ফার পিছনদিকে এসে পৌঁছেছি। একটা ছোট দরজা দেখতে পাচ্ছি। কাউকে দেখা যাচ্ছে না। আস্তে আস্তে দরজা লক্ষ্য করে এগিয়ে যাচ্ছি। দরজা বন্ধ। খুলব কী করে? গুম্ফার ভেতরে নিশ্চয় লোকজন রয়েছে। ধরা পড়লে বেঁচে ফিরব না সেটা নিশ্চিত।

দরজায় আস্তে চাপ দিতে দরজাটা খুলে গেল। অল্প ফাঁক হল। আমি ভেতরে চোখ রেখে কিছু দেখতে পাচ্ছি না। অন্ধকার ঘাপটি মেরে বসে আছে। প্রদীপ জ্বলছে। চড়া ঘিয়ের গন্ধ আসছে। বুদ্ধের বিশাল মূর্তি। দুপাশে অজানা কিছু ভয়ঙ্কর চেহারার মূর্তি রয়েছে। একটু দূরে একটা শূন্য বেদী। রক্ততারার আসন? সকলে প্রার্থনায় ব্যস্ত। সুযোগ ছাড়লুম না। সুট করে বুদ্ধদেবের মূর্তির পিছন দিয়ে ঢুকে অন্ধকারে মিশে শূন্য বেদীর কাছে পৌঁছে ঝোলা থেকে দেবীর মূর্তি বেদীতে স্থাপন করতেই চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেল আমার। মনে হল, আমি চেতনা হারিয়ে ফেলছি। আকাশ বাতাস থেকে, পুরো পৃথিবী জুড়ে কারা একযোগে বলে উঠেছে, “ওম তারে তু তারে তুরে স্বাহা…!” অজস্র সাপ হিল হিল করে ছুটে আসছে। আমার শরীরে সাপেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি দেখতে পাচ্ছি রক্তাক্ত শরীর নিয়ে কটিতে কৃষ্ণবস্ত্রখন্ড নিয়ে দুহাতে অস্ত্র, রক্ততারা আমার দিকে ঘুরে তাকাল।

নিজেকে আবিষ্কার করলুম। একটা গাছের নীচে। ভটচাজ আমার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁপছে। আমার শরীর টলছিল। কিভাবে স্টেশনে পৌঁছেছি,মনে নেই। শিয়ালদায় যখন এসে পৌঁছেছি, তখন সন্ধে নেমে এসেছে। আলো ঝলমল শিয়ালদা দেখে সেই গুম্ফা, নির্জন রাস্তা সব মিথ্যে মনে হল। আচ্ছা, আমি ফিরে এসেছি। কিন্তু সেই দুজন মহিলার কী হলো? আমাকে জানতে হবে। তাঁরা কি ফিরে আসতে পেরেছিল?

ভটচাজের বাড়িতে গিয়ে দেখা করে সেই দুই মহিলার কথা জানতে চাইলাম। ভটচাজ বিমূঢ় চোখে তাকালেন, “আমি তো তাঁদের দেখিনি! তাঁরা আমার সঙ্গে যাবে বলে বাড়ি থেকে বের হয়নি। আমি তাঁদের খোঁজ রাখি কী করে? তবে, আমি তাঁদের সত্যিই দেখিনি। গতপরশু আমরা এসেছি। এর মধ্যে তাঁরা যদি ধরাও পড়ে যায়, বাঁচার আশা কম। পরশুই অমাবস্যা। বড় ভয়ংকর সময় সেদিন। মন্দিরের ধারেকাছে কেউ যেতে চায় না অমাবস্যা, পূর্ণিমায়। কী করব?”

“আমি যাব। যদি আপনি যেতে না চান, আমাকে যেতে হবে। দুজন অসহায় মানুষকে ফেলে দেব কী করে?”

সেদিনই আমি একাই রওনা হয়ে গেলাম। এক সময় আমি এসে পৌঁছেছি সেই সুড়ঙ্গপথের কাছে। আজ অমাবস্যা। মন্দিরের ভিতর থেকে কেমন একটা বাজনার আওয়াজ আসছে। ঢুরুম ঢুরুম ঢম ঢম! বাজনার মধ্যে এমন একটা সাস্পেন্স-এর টাচ আছে, আমার নিজেরই ভয় করতে লাগল। এই বাজনা যেন বলে দিচ্ছে, এখানে আজ মহোৎসব আছে।কাছে এস না কেউ!

অন্ধকার সুড়ঙ্গপথে ঢুকে এগিয়ে যাচ্ছি। চারপাশে মাখন পোড়া গন্ধ আসছে। আমি জানি, মন্দিরের ভিতরে বিশাল বিশাল প্রদীপের মধ্যে দলা দলা মোষের দুধের মাখন রাখা হয়। সেই প্রদীপ জ্বলে উঠলে এরকম গন্ধ বের হয়। ভটচাজ সঙ্গে থাকলে এই প্রদীপের বিশেষত্ব নিয়ে কিছু হয়তো বলতেন।

এগিয়ে গিয়ে সেই বন্ধ দরজার কাছে এসে থমকে দাঁড়ালাম। কেউ কথা বলছে, না? মহিলার গলা পাচ্ছি তো! কলকাতার চলতি বাংলায় সে কাউকে নির্দেশ দিচ্ছে, “ভোগ এসে গেছে। আজ মন্দিরে লাল তারা রক্ত ভোগ নেবেন। আমাকে লাল তারার কাছে নিয়ে চলো। দেখব।”

আমি চমকে উঠেছি। এই কথাগুলো থেকে ভালো কিছু নয়, খারাপ কিছুরই ইঙ্গিত পাচ্ছি আমি।

পা বাড়িয়ে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। একটা ছোট গোল ঘরের মধ্যে এসে পড়েছি। ঘরের মধ্যে লাল তারা-স্বমহিমায় বিরাজ করছেন। সামনে বড় পেতলের প্রদীপে আগুন জ্বলছে। চড়া মাখন পোড়া গন্ধে ঘর ভরে আছে। দুজন ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে দরজার দিকে পিছন দিয়ে। সামনে একজন শুয়ে আছে। ছায়ামূর্তির দুজনের মধ্যে একজনের হাতে কাটারি বা দা জাতীয় কিছু আছে। অল্প অল্প আলোতে ভালো বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু, সবটা মিলিয়ে যা বুঝতে পারছি, তাতে বিপদের ইঙ্গিত পাচ্ছি। আর কিছু নয়। গোলঘরের মধ্যে বিশ্রী গন্ধ। শুঁটকি মাছের মতো, কিন্তু চারশো গুণ বেশি সেই গন্ধে পাগল পাগল লাগছে আমার।  

আমি কী করব এখন? কে মেঝের ওপরে শুয়ে আছে? আমার পক্ষে কি সেখানে যাওয়া উচিত? একটু এগিয়ে গেলে সবটা ভাল করে দেখতে পেতাম। কিন্তু, হঠাৎ করে যাব? আমাকেই না বিপদে পড়তে হয়। হঠকারিতা মোটেই ভাল নয়, কে না জানে! ফিস ফিওস। খিস খিওস! কাপড়ের আওয়াজ। কেউ আসছে যেন! আমি থামের পিছনে সরে গেলাম চট করে। কেউ একজন ঘরে ঢুকছে। আমার পাশ দিয়েই ঘরে ঢুকল।আমাকে কেন দেখতে পেল না? আমাকে কি দেখা যাচ্ছে না? এই গোলঘরের চারপাশ একটা গোপনীয়তার মধ্যে অবস্থান করছে মনে হচ্ছে! আমি শুনেছিলাম, তিব্বতীয় লামারা নাকি এক শূন্যস্থানের মধ্যে বাতাসের তৈরি ঘরের ভিতরে গিয়ে আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি করে আসেন। এটাও কি সেরকমের কোনো ঘর, যাকে বাইরে থেকে দেখা যায় না?

প্রশ্ন হলো তেমন হলে, আমি কী করে দেখতে পাচ্ছি? দেবী লাল তারা কি আমাকে সে শক্তি দিয়েছেন? নিশ্চয় সেটাই হয়েছে।

হঠাৎ শুনতে পেলাম তিনজন মিলে কিছু বলছে।

কা! কা! বা! বা!

আমি চমকে উঠেছি। এরা কি মমিফিকেশনে ব্যস্ত? শুয়ে আছে যে, সে কি মৃত? তাকে মমি বানানো হবে এই ঘরের মধ্যে? এই কা কা, বা বা শব্দ উচ্চারণ মমিফিকেশনের কথাই মনে করায়। আমি জানি, আধ্যাত্মিক বিশ্বাস অনুযায়ী মনে করা হয়, প্রতি জীবের মধ্যে আত্মা রয়েছে। যা “কা” নামে পরিচিত। যেটা জীবের মৃত্যুর পরে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। এটিতে রয়েছে মানুষের মাখাযুক্ত পাখি। এই পাখি মৃত্যুর পরে আত্মার গতিশীলতা প্রকাশ করে থাকে। মৃত্যুর পরে “কা”-এর খাদ্যের প্রয়োজন। “বা” হলো মৃত্যুর পরেও একজন ব্যক্তি একটি দেহের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। নতুন জীবন লাভ করতে চেয়ে প্রতি রাতে ফিরে আসবে।

এই ঘরে হঠাৎ করে সুগন্ধ ছড়িয়ে গেল। ক্রমেই সুবাস বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই শুঁটকি পচা গন্ধ ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছিল।

উকি দিয়ে দেখি, চারটি ছোট কফিনের মতো দেখতে জারের মধ্যে কিছু রাখা হচ্ছে। জারগুলো এক একটি এক এক রকমের দেখতে। বেবুনের মতো মাথাযুক্ত ঢাকনাওলা জারের মধ্যে কী রেখেছে? চারটি জারের চেহারা চার রকমের। একটি বেবুনের মাথাওলা। একটি মানুষের মতো মাথাওলা, শেয়ালের মাথাযুক্ত ঢাকনা, শেষেরটি ফ্যালকন মাথাযুক্ত জার। এসবের মধ্যে কী রেখেছে?

আস্তে আস্তে ওদের কথার টুকরো অংশ শুনতে পাচ্ছিলাম। ওরা বলছে বেবুনের মাথাযুক্ত ঢাকনাওলা জারে রাখা আছে ফুসফুস। এই জারকে বলছে হ্যাপি। মানুষের মাথাযুক্ত জার যাকে বলছে ইমসেট, লিভার রাখা আছে। শেয়াল মাথাযুক্ত জার ডুয়ামুটেফে পাকস্থলী আর ফ্যালকন মাথাযুক্ত জার কেবেহসেনেয়ুফে অন্ত্র রাখা আছে। এই জারগুলোকে বলে ক্যানোপিক? এরা তাই বলছে! এখানে কী হচ্ছে? মমিকরন তো হয়েই গিয়েছে মনে হচ্ছে! কার মমি করা হয়েছে? এইসময় পিছনের দিক থেকে দুজন আরও লামা এল। তারা প্রচুর গজ লিনেন নিয়ে এসেছে। সেগুলো দিয়ে মৃতিদেহকে মুড়িয়ে ফেলা শুরু হচ্ছে।

আমার শরীর কাঁপতে শুরু করেছে। এখানে কারা মমি বানাচ্ছে? এভাবে মমি বানানো কি বেআইনি নয়? সবচেয়ে বড় কথা হলো, দেবযানী কোথায়?

আমি একটি ঘরে ঢুকে পড়েছি। কার ঘর জানি না। দেখতে পাচ্ছি, ঘরে লামার পোশাক রয়েছে দেওয়ালের হুকের সঙ্গে। আমি চট করে লামার পোশাক পরে নিয়েছি। একজন বামন রয়েছে। তাঁকে কেন দেখতে পাচ্ছি না? সে কি আড়ালে থেকে আমাকে লক্ষ্য করে চলেছে?

লামার পোশাক পরে একটা সরু গলিপথ দিয়ে যাচ্ছি,দেখতে পাচ্ছি সরু পথের দুদিকের কমলাটে দেওয়ালের পলেস্তরা খসে পড়ছে। আমার হাতে একটি প্রদীপ। তার আলোতে হাঁটছি। আমার উল্টোদিক থেকে দুজন লামা আসছে। তারা আমাকে দেখে চেয়ে দেখল। কিন্তু মাথায় বোধহয় কিছু আসছে না। তাই তারা আমাকে কিছু না বলে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। তাদের হাবেভাবে আমার মনে হচ্ছে, তারা স্পেশাল কোন কাজ নিয়ে যাচ্ছে।তাদের হাতে তীক্ষণ ছুরি দেখতে পেয়েছি আমি।

কোনদিকে না তাকিয়ে যেদিক থেকে দুজন লামা আসছিল, সেদিকে রওনা হলাম। ওদিকেই কিছু হচ্ছে বলে আমার মনে হচ্ছে।

কিছুদূর যাওয়ার পরে একটি ঘরের মধ্য থেকে কান্নার আওয়াজ পাচ্ছি। নারীকন্ঠে কেঁদে কেঁদে কেউ বিচার চাইছে।

কে? কে আছে ভিতরে?

আমি আস্তে আস্তে ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ঘরের দরজা বাইরে থেকে শিকল টেনে দেওয়া আছে। আমি শেকল খুলে দরজা ঠেলতে যাচ্ছি,অমনি কারা যেন আসছে বলে মনে হলো। এখানে কোথায় লুকোব? চারপাশে আড়াল করার মতো কিছু নেই। অগত্যা নিরুপায় আমি ঘরের ভিতরে ঢুকে পড়ে ভিতর থেকে দরজা দিয়ে দিয়েছি।এই ঘরেই কেউ কাঁদছিল বলে মনে হয়েছে। দেখা যাক। কেউ এসে আমার এই ঘরের দরজা খুলল না।আজ যেন বেশ ব্যস্ততা রয়েছে এখানে। এই সময় মনে পড়ল, কেউ কাঁদছিল। সেটা এই ঘরেই তো?

ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি, ঘরের মধ্যে অল্প আলো জ্বলছে। বেঁটে মোটা মোমবাতি রয়েছে মেঝের ওপরে। মোমবাতির থেকে কয়েক হাত দূরে একজন মহিলা হাঁটুতে মাথা রেকেহ বসে আছে।আমাকে কি দেখেছে? মাথা তুলছে না কেন?

আমি আস্তে ডাকলাম, “শুনছেন?”

মহিলা মাথা তুলতেই আমি বিস্ময় লুকোতে পারলাম না। বলে উঠেছি, “আপনি? আপনার মাসি কোথায়?”

“জানি না। আমাকে এদের কাছে রেখে মাসি কোথায় গেছে। আমাকে ভোগ বানিয়ে দেবীর কাছে উৎসর্গ করা হবে। আজই।”

“এটা হতে দেবেন কেন? চলুন আমার সঙ্গে।” আমি দরজা খুলেছি। শব্দ না করে সময় নিয়ে দরজা খুলেই বাইরের দিকে উঁকি দিয়ে দেখছি। কেউ আশেপাশে আছে কি?

এই মহিলার মাসি নিশ্চয় আশেপাশেই রয়েছে। আমাদের এখনই পালাতে হবে।

মহিলাকে সঙ্গে নিয়ে আমি পালালাম। কত যে গলিঘুঁজি রয়েছে এই মন্দিরের মধ্যে! কেউ টের পায়নি যে পাখি উড়েছে! জানতে পেলেই আমার দশা খারাপ হয়ে যাবে। সঙ্গে এই মেয়েটিরও। পালাতে পালাতে একটা জায়গায় এসে দাঁড়াতেই দেখতে পেলাম, নীচে একটা উপত্যকা রয়েছে। এটাই কি সেই উপত্যকা, যেখান দিয়ে আমরা এই মন্দিরে এসে ঢুকেছি?

 নিশ্চয় সেই উপত্যকা। কিন্তু যাব কী করে?

 পিছনে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে।চমকে তাকাতেই বামন কালো আলখাল্লা নাড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “কুরুকুল্লা! কুরুকুল্লা!”

সঙ্গে সঙ্গে ওপর থেকে ঝাঁপ দিলাম। সঙ্গিনীকে নিয়েই ঝাঁপ দিয়েছি। এ ছাড়া বেঁচে ফেরার উপায় ছিল না। বামনের চিৎকার কানে আসছে, “যা। ভোগ আজ পাবেই লাল! পাবেই।”

আমি বুঝতে পারছি। দুজন এসেছিল এই মন্দিরে ভোগ দেবে বলে। একজন পালালে অসুবিধে নেই। নিয়ম অনুযায়ী আরেকজনকে ভোগ বানিয়ে দেবে ওরা!

মহিলাকে বললাম, “ছুটুন। যত শক্তি আছে, সব নিয়ে ছুটুন। ওরা ধরতে পারলে এ জন্মে আর এখান থেকে বের হতে পারবেন না। মমি হয়ে থাকতে হবে ছোট ছোট কুঠরির মধ্যে। আমি দেখেছি। যারা ভোগ হয়েছে, তারাই মমি হয়ে রয়েছে! আপনার বিশ্বাসঘাতক সঙ্গিনীকেও মমি করা হবে। আমি দেখেছি,মমি করার প্রসেস চলছে একটি ঘরের মধ্যে।জানি না,সেটাই আপনার মাসির শরীর কিনা! তবে, এটাই তার নিয়তি। কিছু করার নেই। এ বড় অশুভ জায়গা!”

আমরা লাফিয়েছি। চোট পেয়েছি প্রচুর। কিন্তু স্থানীয় দুটো লোক উপত্যকায় ঘাস কেটে নিতে এসেছিল গৃহপালিত পশুদের জন্য।তারা আমাদের উদ্ধার করে নিরাপদে ওই এলাকা থেকে বাইরে বের করে দিয়েছে। বিদায় দেওয়ার আগে তারা বলেছে, “জানি না, আপনারা ওই মন্দিরের এলাকা থেকে কী করে বেরিয়ে এসেছেন! যে যায়, সে আর কখনও সেখান থেকে বের হয়ে এসেছে,এরকম আমরা শুনিনি। দেখিনি। কুরুকুল্লা বামন শয়তান।সে মানুষকে পুতুল বানিয়ে রাখে। পুরনো পুতুলগুলোকে নিজে হাতে রেঁধে খায় বলে শুনেছি। আপনারা আর এদিকে আসবেন না। যান। পিছনের দিকে একবারের জন্যেও তাকিয়ে দেখবেন না!”

ওদের নির্দেশ মতো এসেছি। আমি দেবযানীকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে এসেছি। তারপরে ওর বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছি। এখন আমরা ভালো আছি। আশা করছি, খুব শীঘ্রই দেবযানীর সঙ্গে আমাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক তৈরি হবে।

 

 

জেঠামশাই আশ্চর্যজনক ভাবে সুস্থ হয়ে গিয়েছেন। ভটচাজের দেওয়া ওষুধে কাজ হচ্ছিল না বলে ইউজ করা বন্ধ করেছিলেন। কিন্ত ইদানিং সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গিয়েছেন। রক্ততারা আমার দিকে তাকিয়েছিলেন। সেটা কি খুশি হয়ে? তার ফলেই কি জেঠামশাই সুস্থ আজ? 

গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায় রোজ। এক অন্ধকার ঘরে অল্প অল্প প্রদীপের আলো, বেদীর ওপর দাঁড়িয়ে রক্ততারা দু হাত উঁচু করে আছেন। মাথার ওপরে সাপেরা নড়াচড়া করছে দেখতে পাই। এক বামন আঙুল তুলে চিৎকার করে ওঠে, “কুরুকুল্লা…কুরুকুল্লা…!”  

আমি জেনেছি। রক্ততারার আরেক নাম কুরুকুল্লা। কিন্তু আমি কেন এসব দেখি? গভীর ঘুমের মধ্যে ডাক শুনতে পাই। আমাকে কুরুকুল্লা ডাকছে।

একদিন ভটচাজের বাড়িতে গিয়েছিলুম। দরজা খুলে বললেন, “বাড়ি ভরে গিয়েছে সরু সরু সাপে। চলে যাও অংশুমান। আর এস না।” দরজা বন্ধ করে দিলেন।

ফিরে এসে ফোন করেছি। জবাব নেই। নেক্সট উইকে ফের গেলুম। মন টানছিল খুব। দরজায় তালা। পাশের বাড়ির বউটি বেরিয়ে এসে বলল, “উনি তো গত সপ্তাহে মারা গিয়েছেন।”

মারা গিয়েছেন? কী হয়েছিল?

“ভদ্রলোককে সাপ কামড়েছিল। অন্ধকারে কলতলায় গিয়েছিলেন। তখনই…। এতদিন আছি, কখনও সাপ দেখিনি। কী অবস্থা হল!”

বাসে উঠে বসেছি। কোথা থেকে শব্দ ভেসে আসছে, ওম মণি পদ্মে হুম…! একটানা শব্দ হচ্ছে। চমকে তাকিয়ে দেখি বাসের ঘজ ঘজ ঘোওও শব্দটা আমার কানে অন্যভাবে আসছে।

সোজা হয়ে বসতে যাচ্ছি। কোথায় অনেক কন্ঠ কোরাস গাইছে, “ওম,তারে তু তারে তুরে স্বাহা…!”

রমেশ ভটচাজ নামে একজন ছিলেন। আজ আর তাঁর অস্তিত্ব নেই। তাঁর অন্যায়ের শাস্তি প্রাণ দিয়ে শোধ করতে হল। চোখ জলে ভরে এল। আমি তাঁকে বাঁচাতে পারলুম না! কিন্তু, এ কথাও ঠিক, যমুনা মাসি আর স্মরণকেও বাঁচাতে পারিনি। পুরোহিতমশাই ঠিকই বলেছিলেন। যমুনা মাসি আর স্মরণ একই উদ্দেশ্য নিয়ে দেবযানীর কাছাকাছি হয়েছিল। ওরা চেয়েছিল দেবযানীর সর্বনাশ করতে। কুরুকুল্লা সেই ইচ্ছে পূরণ করেননি।

কেন?

কে জানে! বিনিময়ে স্মরণের রোড অ্যাকসিডেন্টে মৃত্যু হলো। আর যমুনা মাসি হারিয়ে গেল অজানা মন্দিরের অভ্যন্তরে।

কর্মফল? কে জানে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *