binodan-smritir-studiopara-part-18

স্মৃতির ষ্টুডিও পাড়া – পর্ব ১৮
জন্ম-জন্মান্তরেও ভোলা যাবে না
প্রিয়ব্রত দত্ত
তাপস পালের প্রথম ছবি দাদার কীর্তির একটি দৃশ্য


সেদিন টেকনিশিয়ান স্টুডিও গিয়েছিলাম ধারাবাহিক ‘জোয়ার ভাটা’র সেট কভার করতে। শ্যুটিং হচ্ছিল চার নম্বর ফ্লোরে। এখনকার টেকনিশিয়ান স্টুডিওর সঙ্গে আগের স্টুডিওর কোনও মিল নেই। আগাপাশতলা, খোল নলচে সমস্ত বদলে দেওয়া হয়েছে। শুধু বদলায়নি শ্যুটিং ফ্লোরের অবস্থানগুলো। কিন্তু আশপাশের বদলটা এত ব্যাপক, যে ফ্লোরগুলোর দিকে তাকিয়ে আগের অবস্থান বা ছবি কল্পনা করা যায় না। 

 

ভেতরে শ্যুটিং চলছে। কিছুক্ষণ দেখে বাইরে এসে দাঁড়ালাম। এখন অধিকাংশ শ্যুটিং ফ্লোরের বাইরে একটি টেবিলে চার রকম চায়ের ফ্লাস্ক থাকে। দুধ-চিনি সহ চা, চিনি ছাড়া দুধ চা, চিনি দেওয়া লিকার চা এবং চিনি ছাড়া লিকার চা। ছোট কাগজের কাপের (তিন চুমুকে চা শেষ! এমন ছোট কাপ) লম্বা প্যাকেট টেবিলেই রাখা থাকে। একটা ওই রকম ছোট কাপে ফ্লাক্সের মাথা চেপে চিনি ছাড়া লিকার চা নিয়ে চুমুক দিতে দিতে চারপাশটা দেখছিলাম। জোয়ার ভাটা ফ্লোরের সামনেটা ভালো করে দেখতে দেখতে এখন-তখন মেলাতে গিয়ে মনে পড়ল… আরে এই ফ্লোরেই তো শ্যুটিং চলাকালীন আগুন লেগে গিয়েছিল না!

 

সালটা ঠিক মনে নেই। সম্ভবত ‘৯৮-‘৯৯ সাল নাগাদ। সকালে আজকালের সান্ধ্যর দফতরে বসে আছি। হঠাৎ খবর এলো টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে আগুন লেগেছে। দমকলের দুটো ইঞ্জিন ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে গেছে। 

 

ফটোগ্রাফার সহ দৌড়লাম টেকনিশিয়ান। যখন পৌঁছলাম, তখনও ফ্লোরের মধ্যে সেটে আগুন জ্বলছে। তবে বড় আগুন নয়। আলোর উত্তাপে ফিল্টার পেপারে আগুন লেগে বিপত্তি। ধপ করে সেখান থেকে সেটে আগুন ধরে যায়। আগুন বড় আকার নেয়নি, কলাকুশলী ও অভিনেতাদের তৎপরতায়। আগুন দেখতে আশপাশের স্টুডিও ও এলাকার মানুষজন ভিড় করেছে টেকনিশিয়ানে। 

 

তাপস পাল অভিনীতি সুপারহিট ছবি সাহেব


আগুন তখন প্রায় নিয়ন্ত্রণে। জটলা ডিঙিয়ে, ভিড় ঠেলে আগুন লাগা ফ্লোরে ঢুকতে যাব, দেখি সারা শরীরে কালিঝুলি মেখে বেরিয়ে আসছেন তাপস পাল। মুখে, গালে ভুসো লেগে আছে। বাইরে এসে সেই এক গাল ট্রেড মার্ক হাসিটা ছড়িয়ে দিয়ে সবার দিকে একবার তাকিয়ে বললেন, ‘আগুন নিভে গেছে’। বলে একটা স্বস্তির শ্বাস ছাড়লেন।

 

ঠিক তখনই দমকলের বড়কর্তা ফ্লোর থেকে বেরিয়ে এসে তাপস পালের দিকে তাকিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সংবাদ মাধ্যমকে বললেন, ‘রিয়েল হিরো। সিনেমায় দেখি অকুতোভয় নায়ক আগুনের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল। এবার সত্যি সত্যি দেখলাম নায়ক কিভাবে আগুনের সঙ্গে মোকাবিলা করেন। একটু এদিক ওদিক হলে তাপসবাবুর বিপদ হতে পারত…।’

 

‘আরে না… না… ওসব কিছু নয়… এটা আমাদের কর্মভূমি, মন্দির। মন্দিরে আগুন লেগেছে, মা-কে বাঁচাতে ছুটে যাব না! তাই কী কখনও হয়! আর আমি তো একা কিছু করিনি, ফ্লোরে যে সমস্ত টেকনিশিয়ানরা ছিল, এই এঁরা… দমকলের দাদা-ভাইরা খুব দ্রুত এসে পড়ল… সবাই মিলে সামলে দেওয়া গেল আর কী…,’ লাজুক হেসে তাপস পাল একটানা কথাগুলো বলে গেলেন। সেদিন চা খেতে খেতে তাপসদার সেই কণ্ঠস্বরটা হঠাৎ কানে বেজে উঠল। 

 

পরমুহূর্তেই শুনতে পেলাম, এক সায়াহ্ন সন্ধিক্ষণে এই মানুষটিই পার্পল স্টুডিওর মেকআপ রুমে বসে কাঁপা কাঁপা গলায় বলছেন, ‘মনে আছে রে প্রিয়, দাদার কীর্তিতে আমার একটা সংলাপ ছিল – আমি কী বোকা না! সত্যি ভাই, এখন আমি মনে মনে ওই সংলাপটাই সারাক্ষণ আওড়াই – আমি কী বোকা না!’ 

 

তাপসদা তখন জামিনে মুক্ত সদ্য জেল ফেরত আসামি! বেশ কিছু দিন বাড়িতে বিশ্রামে থেকে ফিরেছেন সিনেমার সংসারে। বৃদ্ধ মানুষের চরিত্র। স্টুডিওর দোতলায় উঠে দেখি করিডরে একটি স্টিলের চেয়ারে বসে আছেন তাপসদা। মেকআপ নিয়ে। হাতে লাঠি। দু-হাঁটুর সামনে দুই হাতে লাঠিটাকে সোজা করে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। স্লিপ খেয়ে যাচ্ছে বারবার। সেদিন আমরা অনেকেই ছিলাম। ছিলেন সদ্য প্রয়াত আজকালের চিত্র সাংবাদিক সুপ্রিয় নাগও। একজন প্রাক্তন, অন্যজন বর্তমান আজকালি। একসঙ্গে পুরনো দুই পরিচিতকে দেখে তাপসদার মুখে সেই সিগনেচার হাসি। ‘আয়… আয়… কতদিন পর সব নিজের মানুষদের দেখছি। আয়… কাছে এসে বোস তোরা। কেমন আছিস দুটোতে… আমার মাথার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোর যে সব চুল পেকে গেল রে, প্রিয়… তবে একদম রঙ লাগাবি না… সব চুল পড়ে যাবে…।’ তাপসদাকে থামিয়ে আমি আর সুপ্রিয়দা প্রায় একসঙ্গেই জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কেমন আছ তাপসদা?’

 

‘আমি…’ বলে কেমন যেন ছানা কাটা দুধের মত হয়ে গেল তাপসদার মুখ। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বললেন, ‘কী মনে হয় তোদের… এই যে লাঠি সুদ্ধু হাতটা কাঁপছে না, এটা অভিনয় নয়, রিহার্সাল নয়, হাত দুটো এমনি করে সর্বক্ষণ কাঁপে… বুঝলি… সারা শরীরটা কাঁপে… আতঙ্কে…!’

 

অভিনয় জগৎ থেকে রাজনীতির ময়দানে নামাটা নতুন কিছু নয়। তবে চমক তো বটেই। সেই রকমই সবাইকে চমকে দিয়ে রাজনীতির ময়দানে পা রেখেছিলেন তাপস পাল। ২০০১ সালে এবং ২০০৬ সালে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে রাজ্য বিধানসভায় জয়ী হন। এরপর ২০০৯ আর ২০১৪ – দুবার কৃষ্ণনগর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জিতে লোকসভার সদস্য হন তিনি।

 

এই অমায়িক হাসি মলিন হয় নিজের কিছু ভুল সিদ্ধান্তে


একজন সরল, সাধারণ, অমায়িক, পরোপকারী, হুল্লোড়ে, ফূর্তিবাজ মানুষ কিভাবে রাজনীতির গ্রাসে উদ্ধত, অহংকারী, দুর্বিনীত হয়ে উঠতে পারেন, চোখের সামনে দেখেছিলাম আমি। পরবর্তীতে তাপসদার ওই করুণ পরিণতির জন্য কে দায়ী, তার উত্তর যেমন আমি খুঁজে চলেছি, তেমনি বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিও খুঁজে চলেছে। আজও। রাজনৈতিক ঔদ্ধত্যের অনন্য নজির হয়ে আছেন তাপস পাল। তাঁর পরিণতিতে আজও শিউরে ওঠে টালিগঞ্জ স্টুডিও পাড়া!

 

পুরনো টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে ঢোকার মুখে গাছে ঘেরা একটা বাগান ছিল। বসার বেঞ্চ ছিল সারিবদ্ধভাবে। বাগানের শেষ প্রান্তে ডান দিকে ছিল অফিসঘর। সরকার পরিচালিত একমাত্র স্টুডিও। ওই অফিস ঘরে বসতেন রাজ্য তথ্য সংস্কৃতি দফতরের কোনও অধিকারিক। বাগানটায় প্রায়ই লোকেশন হিসেবে ব্যবহৃত হত সিনেমা, সিরিয়ালের শ্যুটিং-এ। 

 

একদিন টেকনিশিয়ানে ঢুকে দেখি বাগানে শ্যুটিং চলছে। লন জুড়ে লাইট কাটার, স্ট্যান্ড। উল্টো দিকে, টেকনিশিয়ানের গেটের দিকে মুখ করে ক্যামেরা বসানো। এগিয়ে গিয়ে উঁকি মারতেই দেখলাম একজন মেকআপ অ্যাসিস্ট্যান্ট আয়না ধরে আছেন, চুল সেট করছেন তাপস পাল। পাশ থেকে একজন সহকারী পরিচালক সংলাপ পড়ে শোনাচ্ছেন। 

 

১৯৮০ তে ‘দাদার কীর্তি’ দিয়ে শুরু। আর কখনও পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাপস পালকে। নব্বই-এর দশকের শেষেও নায়ক তাপস পালের জেল্লা এতটুকু কমেনি। সঙ্গে চিরঞ্জিৎ, প্রসেনজিৎ, অভিষেক চ্যাটার্জিরা থাকা সত্ত্বেও। কিন্তু হিরো বা অভিনেতা তাপস পালের কোনও দাপট বা দম্ভ তখন ছিল না। তিনি ছিলেন স্টুডিও পাড়ার মনের মানুষ।

 

শ্যুটিং চলছে। এমন সময় তাপস পালের খেয়াল হল, ওঁর রে ব্যান-এর সানগ্লাসটার কথা। কোথায় রেখেছেন মনে করতে পারছেন না। খোঁজ খোঁজ। আমি ভাবছি তাপস পালের মত শীর্ষ নায়কের আবার সানগ্লাসের জন্য উৎকণ্ঠা! একটা হারালে দশটা আসবে! কিন্তু না, শিশুর মত শ্যুটিং ছেড়ে সানগ্লাসের সন্ধানে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। আমার হাসি পেল। শ্যুটিং লোকেশন ছেড়ে টেকনিশিয়ানের অফিস ঘরে গেলাম, রুটিন ঢুঁ মারতে। তখন টেকনিশিয়ান স্টুডিওর দায়িত্বে ছিলেন অপূর্ব চট্টোপাধ্যায়। ওঁর টেবিলের কাছে যেতেই চোখে পড়ল একটা চশমার খাপ। ভালো করে দেখতে গিয়ে দেখলাম সেটি রে-ব্যানের। অপূর্বদাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এটা আপনার?’ উনি তখন টেলিফোনে কথা বলছেন। ইশারায় মাথা নেড়ে বললেন, না। টেবিল থেকে চশমার খাপটা নিয়ে বেরিয়ে এলাম বাইরে। সোজা শ্যুটিং স্পটে। তাপস পালের কাছে গিয়ে খাপটা দেখিয়ে বললাম, ‘এটা কি?’ চশমার খাপটা ছোঁ মেরে আমার হাত থেকে তুলে নিয়ে শিশুর উচ্ছ্বাসে বললেন, ‘এই তো… কোথায় ছিল…’ বলে খাপ খুলে সানগ্লাসটা বার করে পরে নিয়ে তাকালেন আমার দিকে। বললাম, ‘অপূর্বদার টেবিলে।’ 

‘ও… হ্যাঁ…, হ্যাঁ… অপূর্বর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। ভুলে ফেলে এসেছি। ইস… দেখছো… কী ভুলো মন আমার… সবাইকে ছুটিয়ে মারছি… সরি… সরি…’ বলতে বলতে হঠাৎ আমার কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কে, ভাই?’

 

গুরুদক্ষিণা

 

পরিচয় দিতেই ফের হাঁক ডাক শুরু করে দিলেন, ‘এই প্রোডাকশনের কে আছিস… চা টা দে…’ বলে আমার দিকে ফিরে বললেন, ‘দাঁড়া শটগুলো দিয়ে নিই… অপূর্বর ঘরে বসে কাটলেট খাব… যাবি না কিন্তু…!’ প্রথম আলাপেই সরাসরি তুইতোকারি!

 

সেই আমার সঙ্গে তাপস পালের আলাপ। মুহূর্তে আপন করে নিতে পারা একজন মানুষ। সারাক্ষণ মুখে হাসি লেগেই আছে। কিছুতেই বিরক্তি নেই। যখন তখন যা খুশি প্রশ্ন করেছি, বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর মুখে তৈরি। অসম্ভব খেতে ভালোবাসতেন। খাওয়াতেও। টেকনিশিয়ান হোক, ইন্দ্রপুরী হোক, এনটি ওয়ান হোক, টালিগঞ্জের স্টুডিও চত্বরে তাপসদার শ্যুটিং থাকলে বিকেলে মুড়ি-তেলেভাজার উৎসব। একটা বড় ধামায় তেল, চানাচুর মাখা মুড়ি, আর অন্য একটি ধামায় উপচে পড়া হরেক রকম তেলেভাজা। খোলা চত্বরে গোল করে চেয়ার পেতে পরিচালক, সহ অভিনেতা, কলাকুশলীদের সঙ্গে আড্ডা মারতে মারতে মুড়ি তেলেভাজা খেতেন, সবাইকে খাইয়ে ছাড়তেন। যে ফ্লোরে যাঁর শ্যুটিং থাকুক না কেন, প্রত্যেকের ওপেন ইনভিটেশন থাকত তাপসদার মুড়ি – তেলেভাজা ভোজে। শীতকাল আসলেই, বাজারে কড়াইশুঁটি উঠলেই বলতেন, ‘মুঠো মুঠো কড়াইশুঁটি খাবি বুঝলি। গ্ল্যামার বাড়ে।’ দেখেছি শীতকালে শ্যুটিং চলাকালীন স্পটেই বড় স্টিলের গামলায় ছাড়ানো কড়াইশুঁটি রাখা থাকত। শট দিচ্ছেন, ফাঁক পেলেই টুক করে একমুঠো কড়াইশুঁটি মুখে পুরে চিবোচ্ছেন। আমি কোনওদিন হাজির হলে বলতেন, ‘নে… নে… কড়াইশুঁটি নে… খা… মুঠো মুঠো খা!’

 

আর ছিল ঈশ্বরদত্ত স্মরণ শক্তি। পাঁচ পাতা হোক কী দশ পাতা, একবার পড়েই দাঁড়ি, কমা সমেত সব মুখস্থ! একবার রবীন্দ্রসদনে উত্তমকুমারের স্মরণে শিল্পী সংসদের একটি অনুষ্ঠানে তাপসদার কিছু একটা করার বা বলার কথা ছিল। বেশ বড় একটি দৃশ্যাংশ। অন্যরা তৈরি। সময় এগিয়ে আসছে তাপসদার দেখা নেই। অংশটির অন্যমত অভিনেত্রী বাসবী নন্দীর টেনশন শুর হয়ে গিয়েছে। বিড়বিড় করছেন, ‘স্ক্রিপ্ট জানে না, কি হবে তাই জানে না, এখনও তাপসটার দেখা নেই। কখনইবা ও স্ক্রিপ্ট পড়বে, আর কখনইবা ওকে সিন বোঝাব?’ 

 

জনসভায় সাংসদ তাপস পাল


তাপসদা প্রায় দৌড়তে দৌড়তে সদনে ঢুকলেন দৃশ্যাংশটি শুরু হবার ঠিক মিনিট পাঁচেক আগে। জোড় হাতে ক্ষমা চাইলেন বাসবীদির কাছে। দেখলাম তিনজন মানুষ তাপসদার তিনদিকে। একদিকে বাসবীদি। উনি তাপসদাকে সিন বোঝাচ্ছেন। অন্যপাশে একজন সহকারী। স্ক্রিপ্ট পড়ে শোনাচ্ছেন। সামনে মেকআপ আর্টিস্ট, তাপসদার মুখে টাচ আপ দিচ্ছেন। 

 

ঘোষণা পর, নির্ধারিত সময় ধরে মঞ্চে তাপস পাল। তারপরের আধ ঘন্টার বিস্ময়ের রেশ আজও আমার যায়নি। মঞ্চে, উইংসের পাশ থেকে স্তব্ধ বিস্ময়ে দেখলাম কী সাবলীল দক্ষতায় বাসবীদির নির্দেশ মত সিন অনুযায়ী দশ পাতা স্ক্রিপ্টের একটা অক্ষর, শব্দ বাদ না দিয়ে সবার সঙ্গে অভিনয় করে গেলেন। শেষে তুমুল করতালি। স্টেজ থেক বেরিয়ে এসে বাসবীদি দু’হাতে মাথা চোখ ঢেকে ধপ করে একটা চেয়ারে বসে পড়লেন। তাপসদা তখনও মঞ্চে  উত্তমকুমার নিয়ে বলছেন। বলা হয়ে গেলে তাপসদা ফিরতেই বাসবীদি তাপসদার শার্টের কলার ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বললেন, ‘তুই কে, কী করে করিস? তোর ভেতরে কি মা সরস্বতী বসে থাকেন, পাঁচ মিনিটে দশ পাতা ডায়লগ মুখস্ত করে বলে দিলি… নির্ভুল কম্পোজিশনে!’ তাপসদা ঝাঁকুনি খেতে খেতে হো হো হাসছেন। আমি পাশে ভ্যাবলার মত দাঁড়িয়ে ঘটমান আর একটি দৃশ্য দেখছি। রূদ্ধশ্বাস সিনেমার মত। তাপসদার চোখে চোখ পড়তেই, ছোট্ট করে চোখ মেরে, বাসবীদির দুটো গাল ধরে বললেন, ‘সবই তোমাদের আশীর্বাদে। ওটা ঠিক করে ফেলি।’ আমার দিকে মুখ ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কেমন হল রে…’ আমি কেশে, ঢোঁক গিলে, তুতলিয়ে কোনও মতে নাটকীয় ভঙ্গীতে বললাম, ‘যাহা দেখিলাম, তাহা জন্ম-জন্মান্তরেও ভুলিব না!’ শুনে আমার কাঁধ চাপড়ে হো হো করে হেসে উঠলেন তাপসদা।

 

এই তাপসদাকেই পার্পল স্টুডিওর মেকআপ রুমে আমাকে আর সুপ্রিয়দাকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কাঁদতে দেখব, স্বপ্নেও কোনওদিন ভাবিনি!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *