অন্নদাতা
মূল লেখক – সুকেশ সাহনী
ভাষান্তর- বেবী কারফরমা
সুকেশ সাহনী বিশিষ্ট অণুগল্পকার ও উপন্যাসিক। তার রোশনি গল্পের উপর ধারাবাহিক ভাবে একটা সিরিয়াল ডি ডি ওয়ানে দেখিয়ে ছিল।
দরজা খোলা ছিল। আমি চৌকাটের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। সামনেই বাবার কঙ্কালসার শরীর, একটা ছেঁড়া জুতোয় পেরেক ঠুকছে। পায়ের আওয়াজ পেয়ে আমায় ভালো করে দেখতে লাগল, তারপর আমায় চিনতে পেরে ওনার অক্ষিকোঠরে ঢুকে যাওয়া চোখ দুটো চকচক করে উঠল।
“আসুন” সে তাড়াতাড়ি করে বলল।
তার মুখ থেকে “আসুন” শব্দটা শুনে আমার সারা শরীর বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে গেল। আমি অবাক হয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। সে হেসে চোখটা নামিয়ে নিয়ে তাড়াতাড়ি আওয়াজ দিল “দেখো কে এসেছে।” আমি এগিয়ে গিয়ে ওনার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলাম। সে ব্যস্ত হয়ে এদিক ওদিক দেখতে লাগল তারপর পাশে পড়ে থাকা নিজের একটা ময়লা জামা দিয়ে ঘরের বহু পুরোনো ভাঙা চেয়ারটা ছাড়তে লাগল। আমি অসহায় ভাবে ওনাকে দেখতে লাগলাম, সে তাড়াতাড়ি ভেতরের ঘরে চলে গেল। আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল।
মা একবার আমার আগে যাচ্ছে একবার আমার পিছনে যাচ্ছে, ওর মুখ দিয়ে আমার জন্য আশীর্বাদের বর্ষা বইছে। এমন সময় দাদা ঘেমে নেয়ে ঘরে ঢুকল। আমি কাপড়ে জড়ানো দাদার রিক্ত শরীরটা দেখতে লাগলাম। বেকারত্ব তাকে প্রায় শেষ করে দিয়েছে। আমাকে দেখে তাঁর ম্রিয়মান চোখদুটো জ্বলজ্বল করে উঠল। সে আমার দিকে জোরে জোরে এগোতে লাগল, তাকে দেখে আমি তাড়াতাড়ি দাঁড়িয়ে পড়লাম। আমার মনে হল হীনমন্যতায় ভুগতে ভুগতে সে হয়তো তার ছোট ভাইয়ের পায়ে হাত দিতে প্রণাম করতে আসছে। আমি বিদ্যুৎবেগে ছুটে গিয়ে তার পা দিয়ে প্রণাম করে চেয়ারে শরীরটাকে ছেড়ে দিলাম।
আমি রান্নাঘরে মায়ের পাশে বসে খাবার খেতে চাইছিলাম, কিন্তু বড়ো ভাই আমার আপত্তি সত্ত্বেও বাবার সাথে খেতে বসাল। আমার থালায় তিনটে তরকারি, অথচ বাবার থালায় শুধুমাত্র আলুর তরকারি। দাদা ফোলা ফোলা রুটি গুলো আমার পাতে দিচ্ছিল, আর যে রুটিগুলো ফুলছিল না কিংবা পুড়ে যাচ্ছিল সেগুলো বাবার পাতে দিচ্ছিল। ইচ্ছে করছিল থালাটা তুলে ফেলে দি, কারণ আমারই ঘরে আমাকে বিশিষ্ট অতিথি রূপে কেন দেখা হচ্ছে?
ইচ্ছে করলেও কিছু করতে পারলাম না, চুপচাপ গিলতে লাগলাম। ছোটবেলার কত কিছু চোখের সামনে ভেসে উঠল-‘মা, বাবার পা টিপে দিচ্ছে, মা কুয়ো থেকে জল তুলে বাসন মাজছে, পড়া তৈরি না করার জন্য দাদার সামনে কান ধরে ওঠবস করছি, অনেক কথা………।
আমি এটাচি খুলে গত মাসে মাইনে থেকে বাঁচানো টাকা মায়ের হাতে তুলে দিলাম। ঘরের মধ্যে একটা নিস্তব্ধতা নেমে এলো। দাদা আরেকটা ঘরে গিয়ে মাকে ডাকল। আমি এই ঘরে একা বসে রইলাম। মনে হল পাশের ঘরে দাদার সাথে মায়ের টাকা পয়সা নিয়ে একটা বচসা চলছে। দাদা রেগে গিয়ে তার প্রয়োজনের হিসাব দেখাচ্ছে, আর মা তার সব প্রয়োজনীয় টাকা দিতে অসমর্থ, সেটা ব্যক্ত করছে। একা বসে থাকতে থাকতে আমার মনে হল যে আজ এদের কাছে আমার কোন প্রয়োজন নেই।
“আমি এবার যাবো।” ঘর থেকে বেরিয়ে বললাম।
“রাতে থেকে যেতে পারতে” মা ক্ষীণ ভাবে বলল।
“না দরকারি কাজ আছে” মিথ্যা কথা বললাম।
“কাজ আছে, তাই না বলছে। মানুষ নিজের কাজে ব্যস্ত থাকবে, এটাই তো ঠিক।” বাবা বলল
“আমি রিকশা ডেকে আনছি।” দাদা বাইরে বেরিয়ে গেল।
আমি একে একে সকলকে প্রণাম করে রিকশাতে গিয়ে বসে পড়লাম। আমার চোখ জলে ভরে এলো। কিছুটা দূরে যাওয়ার পর পিছন ফিরে দেখলাম মা, বাবা আর দাদা দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। ওদের কথা ভাবতেই চোখ জলে ভর্তি হতে লাগল আর ওদের চেহারা ততো অস্পষ্ট হতে লাগল। আমার মাথাটা ঝিমঝিম করতে লাগল। আমি কে? এরাই বা কে? এই হাত বাঁধা দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর আমি ছেলে কিংবা ভাই তো হতেই পারি না, তাহলে আমি এদের কে?
