সিংহের দেশে পাঁচ দিন
নন্দিনী নাগ
যতদূর চোখ যায় ঢেউ খেলানো জমি, যেন জলের বদলে ডাঙা দিয়ে তৈরি সমুদ্র। অবশ্য ন্যাড়া জমি নয়, ঘাসে ঢাকা, আর মাঝেমধ্যে ছোট ছোট ঝোপ। যখন পৃথিবীর স্থলভাগ জেগে উঠেছিল, এই ভূ-ভাগকে মনে হয় যেন দুহাতে ধরে দুপাশ থেকে চাপ দেওয়া হয়েছিল। সেই চাপে পুরো ভূমিরূপেই শুধু ওঠানামা, যেন পাহাড় জেগে উঠতে গিয়েও থমকে গেছে। ফলে সামনে তাকালে মনে হয়, ওই উঁচুতে, যেখানে রাস্তাটা মিশেছে আকাশে, ওখানেই পৃথিবী শেষ হয়ে গেছে। খানিক পরেই অবশ্য ভুল ভাঙে, উৎরাইয়ের ওপারে আবার উঁকি দেয় নতুন দুনিয়া। এমন মজাদার রাস্তা বেয়ে নাইরোবি থেকে আমরা এসে পৌঁছলাম মাসাইমারার দরজায়।
দুর্গাপুজোর ষষ্ঠীর দুপুরে আমরা কলকাতা থেকে বেরিয়েছিলাম, মুম্বাই হয়ে নাইরোবি পৌঁছেছি সপ্তমীর সকালে। মুম্বাই থেকে ছয়ঘন্টার উড়ান। এখানকার সময় ভারতীয় সময় থেকে আড়াই ঘন্টা পিছিয়ে থাকায় আমাদের বেশ সুবিধাই হল। ইমিগ্রেশন, কারেন্সী এক্সচেঞ্জ সেরে আমরা বিমানবন্দরের বাইরে যখন এলাম তখনও সূর্য ওঠেনি, লেপমুড়ি দেওয়া শহরের ঘুম একটু একটু করে ভাঙছে। বিমানবন্দর থেকে অ্যাপ ক্যাব নিয়ে হোটেলে যাবার পথে নাইরোবির রাস্তাঘাট, শহরের বৈভব দেখে মনে হচ্ছিল যেন কোনো ইউরোপীয় শহরে এসে পড়েছি। এক্সপ্রেসওয়ের ধারে কয়েকটা ইমারত তো আবার দুবাইয়ের আকাশচুম্বী ইমারতের মতো, ক্যাবের ড্রাইভারও গর্বভরে সেইসব বিল্ডিং দেখালো। আফ্রিকার দেশ মানে অত্যন্ত গরীব, এই ধারণার কোনো প্রতিফলন অন্তত নাইরোবির আয়নায় পড়তে দেখিনি।
নাইরোবিতে অনেক বাঙালীর বাস। অতএব ধুমধাম করে দুর্গাপুজো তো হবেই। আমাদের হাতে সময় কম, তাই হোটেলে ঢুকে ফ্রেশ হয়েই আমরা আবার বেরিয়ে পড়লাম, গন্তব্য কেনিয়া মিউজিয়াম এবং এক পুজো প্রাঙ্গন।
দু’হাজার আটে ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের সহায়তায় কেনিয়া মিউজিয়ামটি তৈরি। বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ করে রাখা দেহ, কিছু নৃতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং কেনিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে সমৃদ্ধ মিউজিয়ামটা খুব একটা বড় নয়। তবে সবচাইতে বড় দাঁতাল হাতি “আহমেদ” এর দাঁতসমেত পুরো কঙ্কাল এবং গন্ডারের একটি বিশেষ প্রজাতির শেষ পুরুষ সদস্য “সুদান” এর সংরক্ষণ করে রাখা শরীর দেখতে পাওয়া এই মিউজিয়ামের বড় প্রাপ্তি।
মিউজিয়াম সংলগ্ন কাফেতে কফি খেয়ে এবং কিউরিও শপে একবার চোখ বুলিয়ে চলে গেলাম পুজো-বাড়িতে। নাইরোবির এই পুজো সত্তর বছরের পুরনো, আয়োজনও দেখলাম বিরাট। সুদূর আফ্রিকায় গিয়ে দুর্গাপুজোতে সামিল হওয়া বেশ অন্যরকম অভিজ্ঞতা বৈকি। প্রবাসীদের সঙ্গে আলাপ, আড্ডা এবং জমাটি খাওয়া দাওয়া হল। শুনলাম, ওঁরা ওখানে দারুণ ভালো আছেন, শান্তিতে আছেন, কেউ কেউ তো আর দেশে ফিরতেই চান না। ওঁরা সন্ধ্যাবেলার অনুষ্ঠানে আসার জন্য বার বার অনুরোধ করেছিলেন, কিন্তু সময়াভাবে সেই অনুরোধ রাখা সম্ভব হয়নি। কারণ, ওইদিনের মধ্যেই আমাদের নাইরোবি যতটা সম্ভব দেখে নিতে হবে, পরেরদিন খুব সকালে বেরিয়ে যাব মাসাইমারা উদ্দেশ্যে।
মাসাইমারা! ছোটবেলায় বুদ্ধদেব গুহ’র লেখা পড়ে যে ফ্যান্টাসির জন্ম, তার দরজায় দাঁড়িয়ে মনের মধ্যে একটা অন্য রকমের রোমাঞ্চ তো হবেই, যেন দরজার ওপারে রয়েছে রূপকথার রাজ্য, শুধু দরজাটা পেরনোর অপেক্ষা। নাইরোবি থেকে চারঘন্টার পথ মাসাইমারায় ঢোকবার অন্যতম দরজা ‘সেকেনানি’ গেট পর্যন্ত আমরা এসেছি পিটারের গাড়িতে। এখানে মোজেস আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল ওর গাড়ি নিয়ে, কারণ ভেতরে শহুরে শৌখিন গাড়ি অচল। মোজেস মাসাই যুবক, সম্পূর্ণ দেশীয় পোশাক আর গহনায় সজ্জিত, সে আমাদের সম্ভাষণ করল “জাম্বো!”, মানে, “হাই!”। আমরা জিনিসপত্র ওর গাড়িতে উঠিয়ে পিটারকে “বাই” করে দিলাম।
মাসাইমারায় ঢোকার জন্য মোট ছটা দরজা আছে, আমরা ঢুকলাম সেকেনানি গেট দিয়ে। গন্তব্য, আমাদের আগামী কয়েকদিনের বাসস্থান “মাতিরা বুশ ক্যাম্প”। ঘাসজমির বুক চিরে পাথুরে রাস্তা, প্রবল ঝাঁকুনি আর ধুলো খেতে খেতে এগোলাম, এগারোটা বেজে গেছে, মাথার ওপর রোদ্দুরও বেশ চড়া। এর আগে ভারতবর্ষের যে কটা জঙ্গলে গেছি, অনেক ঘোরাঘুরির পর দেখা মিলেছে বনের বাসিন্দাদের, সে বাঘ, হাতী, গন্ডার, যা-ই হোক না কেন। তাই মনের মধ্যে ধারণা জন্মে গেছিল, সাফারিতে বেরিয়ে বেশ খানিকটা ঘোরাঘুরি খোঁজাখুঁজির পরই দেখা মিলবে মাসাইমারার বিখ্যাত “বিগ ফাইভের”, সেই ভুল ভেঙে দিল জেব্রার দল, গেটের কাছেই ঘাসজমিতে তাদের দেখা মিলল। জেব্রা ক্রশিং-এর পর, মানে জেব্রাদের ক্রশ করে একটু এগোবার পরেই দেখা মিলল খানদুই জিরাফের, একটা অ্যাকাশিয়া গাছের মাথাটাকে টেবলটপ বানিয়ে তার ওপর থেকে খাওয়াদাওয়া সারছিল। খাওয়ার ফাঁকে অতিথিদের দিকে তাকিয়ে “পোজ”ও দিয়ে দিল।
একে একে অনায়াসে চোখের সামনে চলে এল দাঁতাল বুনো শুয়োর ওয়াট হগের দল, বেশ কয়েকপ্রকারের অ্যান্টিলোপ, লেপার্ড, বাফেলোর দল, এমনকি বুনো হাতিও। বিগ ফাইভের মধ্যে সিংহ আর গন্ডার ছাড়া বাকিদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল ক্যাম্পে যাওয়ার পথে, তাও আবার বিনা চেষ্টাতেই।
হাতি, লেপার্ড, গন্ডার, বুনো মোষ আর সিংহ-এই হল মাসাইমারার বিখ্যাত বিগ ফাইভ। মাসাইরা অবশ্য মনে করে শৌর্যে বীর্যে তারা এদের চাইতে কম কিছু নয়, তাই নিজেদেরও এই দলের মধ্যে ধরে নিয়ে বলে, বিখ্যাত “বিগ সিক্স”।
মাসাইমারায় ঢুকে দু’ঘন্টা ড্রাইভিংয়ের পর আমাদের ক্যাম্প নজরে এল। বিস্তীর্ণ ঘাসজমির একপ্রান্তে খানিকটা ঝোপ আর কিছু বড় গাছের জমায়েত, তার আড়ালে তাঁবুর মধ্যে থাকার ব্যবস্থা।
ক্যাম্পে পৌঁছতেই ফলের রস সহযোগে অভ্যর্থনা পেলাম। ম্যানেজার একটি অল্পবয়সী মেয়ে, জ্যাকি, সে এখানে থাকার নিয়মকানুন বাৎলে দিল। ছড়িয়ে ছিটিয়ে চব্বিশটা তাঁবু আছে অতিথিদের থাকবার জন্য, মাসাই ভাষায় এক একটি বন্যপ্রাণীর নামে সেগুলোর নাম, যেমন আমাদের তাঁবুর নাম গনু(Gnu), মাসাই ভাষায় যার অর্থ হল ওয়াইল্ড বিস্ট(Wildebeest)। এছাড়া রিসেপশন, কিচেন, ডাইনিং হল, অফিস সবটাই এক একটা তাঁবুতে, তাছাড়াও গাছের নিচে ছাতা টাঙিয়ে টেবিল চেয়ার পাতা আছে, প্রকৃতির মাঝখানে খাওয়ার ব্যবস্থা। এমনকি খাওয়ার জায়গায় হাত ধোওয়ার বেসিনটাও ক্যানভাসের তৈরি। দেখে মনে হল, এই দুনিয়ায় সবই যে অনিত্য, অস্থায়ী, সেটা এরা প্রতি মুহূর্তে মনে রাখে, তাই সবটাই অস্থায়ী নির্মাণ, কোথাও শিকড় নামায়নি।
আমাদের তাঁবুর ধার থেকেই শুরু হয়ে গেছে বুনো জন্তুদের চরে বেড়ানোর ঘাসজমি, মাঝে একটা গাছের ডাল দিয়ে তৈরি সীমানা নির্দেশক বেড়া। তাঁবুতে ঢোকার সময়েই দেখলাম বুনো মোষ চরে বেড়াচ্ছে সামনে। শুনেছি, মাসাইরা সিংহের চাইতে বুনো মোষকে বেশি ভয় পায়, ওরা বলে, সিংহের সামনে পড়লে তবু প্রাণে বেঁচে ফেরা যায়, কিন্তু বুনো মোষের সামনে পড়লে সেই চান্স খুবই কম। দলছুট বুনো মোষের রাগী-রাগী মুখটা দেখে, সেই শোনা কথাটা মনে পড়ে গেল।
তাঁবুর ভেতরটা অনেক বড় আর আরামদায়ক ভাবে সাজানো। প্রয়োজনীয় সব কিছুই আছে, শুধু রোদে গরমে তেতেপুড়ে গিয়ে একটা ফ্যানের অভাব বোধ করছিলাম। আসলে, সকাল আর সন্ধ্যেটা এখানে বেশ ঠান্ডা, রাতে লেপমুড়ি দিতে হয়, তাই হয়তো দুপুরের কয়েকটা ঘন্টাকে ওরা গুরুত্ব দেয় না। ক্যাম্পে অনেকগুলো ইউরোপীয় পরিবার ছিল সেইসময়, তার মধ্যে একটা বাচ্চাকে তো গরমের জ্বালায় খালি গায়েই ঘুরতে দেখলাম।
লাঞ্চ সেরে সাফারিতে বেরনো হল চারটের সময়, মনে প্রবল উত্তেজনা, কি জানি নতুন কি দেখা যায়! গন্ডার, সিংহ, হাতি এসব যে দেখতেই হবে, এমন কোনো চাহিদা ছিল না আমার। এসেছি এক নতুন মহাদেশে, তার নতুন রকম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নতুন মানুষ, তাঁদের আলাদা রকম জীবনযাত্রা, আলাদা সংস্কৃতি, যা দেখছি সবই ভালো লাগছে। মাসাইমারায় আসার পথে প্রকৃতির এমন কিছু রূপ বিস্মিত হয়ে দেখেছি যা আগে কখনো দেখিনি। আরবীয়(Arabian), নুবীয় (Nubian), সোমালীয় (Somalian), এই তিন প্লেটের সংঘর্ষের কারণে তৈরি হওয়া গ্রেট রিফট ভ্যালির (Great Rift Valley) মতো ভৌগোলিক বিস্ময় বইয়ের পাতা থেকে বার হয়ে এই প্রথম চোখে ধরা দিল। এই উপত্যকায় রয়েছে চেরাঙ্গানি পর্বতমালা, আর রয়েছে আগ্নেয়গিরির সারি, যার মধ্যে কয়েকটি আবার সক্রিয় আগ্নেয়পাহাড়। পাহাড়ের চূড়া থেকে গড়িয়ে আসা লাভা স্রোতের দাগ দেখে আগ্নেয়গিরিকে চিনে নিয়েছিলাম সহজেই।
মানুষের আঁতুড়ঘর আফ্রিকা, বিবর্তনের ইতিহাস খোঁজার জন্য আফ্রিকা মহাদেশই গন্তব্য। গ্রেট রিফট ভ্যালীতে অবস্থিত তুগেন (Tugen) আগ্নেয় পর্বতমালা থেকে গড়িয়ে আসা লাভাস্রোত চোদ্দ মিলিয়ন বছর আগেকার মানুষের পূর্বজদের (Hominids) ফসিল আগলে রেখেছে, এই কথা জানলে যুগপৎ রোমাঞ্চিত এবং বিস্মিত হতে হয় বৈকি! গ্রেট রিফট ভ্যালী দেখার জন্য যে ভিউ পয়েন্টে নেমেছিলাম, তার উল্টো দিকে পাহাড়ের গায়ে পাথরের ওপরে আঁকা আবছা হয়ে আসা কয়েকটা ছবি চোখে পড়েছিল। আফ্রিকার পরিচায়ক অ্যাকাশিয়া গাছ এবং হাতির ছবি কেউ বা কারা পাথরের ওপর খুব সুন্দর করে এঁকে রেখেছে, দেখে প্রাচীন মানুষের গুহাচিত্রের কথা মনে পড়ে গেল, সেই ধারা এখনো রয়ে গেছে।
গ্রেট রিফট ভ্যালী ছাড়িয়ে খানিকটা এগোনোর পর এমন এক পাহাড়ের সারি চোখে পড়ল, যাদের চেহারা করাতের দাঁতের মতো (saw-tooth) দেখে চমৎকৃত হলাম। বহু জায়গায় বহুরকম পাহাড় দেখেছি এমন করাতদেঁতো পাহাড়সারি কখনো দেখিনি।
এই বিস্তীর্ণ সাভানা ঘাসের জমি আমাকে পৌঁছে দিয়েছিল বহুযুগ আগেকার আদিম পৃথিবীতে, যেখানে নিজেদের গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ ছাড়া কোনো শহুরে শব্দ নেই। তথাকথিত সভ্য জগৎ থেকে বহু দূরের সেই দুনিয়ায় কানে আসে কেবল নানারকম পাখি আর পোকামাকড়ের ডাক, বুনো জন্তুর গায়ের গন্ধের সঙ্গে গাছপালার গন্ধ মিশে সেই পৃথিবী তার নিজস্ব গন্ধ তৈরি করেছে। এখানে সকাল আর বিকেলে ঘাসজমি জুড়ে নেমে আসে অলৌকিক গোলাপী আলোর চাদর, আকাশ গোলাপী থেকে ম্যাজেন্টা রঙের হয়ে গেলেও মাটির পৃথিবীর বুকে অন্ধকার নামে না। কোনো এক জাদুবলে রঙবদলের খেলার মধ্যে দৃশ্যমান থেকে যায় সব কিছুই।
সেদিন বিকেলের সাফারিতে, ওদের ভাষায় গেম ড্রাইভে, বেরিয়ে মোজেস আমাদের নিয়ে গেল সিংহের ডেরায়। যাবার পথে দুবার দুটো হাতির দলের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, তার মধ্যে একটা দাঁতালকে আমাদের গাড়ির দিকে এগিয়ে আসতে দেখে বুকটা একটু ঢিপঢিপও করেছিল। আসলে, ঝাড়গ্রাম বা উত্তরবঙ্গের হাতিদের কার্যকলাপ মনে পড়ে গেছিল। এশিয়ার হাতিদের ক্ষেত্রে শুধু পুরুষরাই দাঁতাল হয়, আফ্রিকায় তেমন একচোখামি নেই। এখানে স্ত্রী-পুরুষ উভয়েই দন্তসম্পদের অধিকারী, কেবল শিশুরাই বঞ্চিত। বড় দাঁতালটা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে আমাদের নিরীক্ষণ করে নিজের কাজে মন দিল, আমরাও হাঁপ ছেড়ে রওনা হলাম। হাতিদের অবশ্য অন্যদিকে মন দেবার সময় একদম থাকে না। ওই বিরাট শরীরটাকে টিকিয়ে রাখতে পূর্ণবয়স্ক হাতীর প্রতিদিন গড়ে ১৪৯ কেজি থেকে ১৬৯ কেজি খাবার লাগে, আর লাগে ১০০ থেকে ২০০ লিটার জল। এতসব যোগাড় করতেই ওদের সারাদিন কেটে যায়, অন্যদিকে আর কখন তাকাবে?
গাড়িসমেত একটা নালা পেরিয়ে খাড়াই বেয়ে উঠে পৌঁছানো গেল আরেক ঘাসজমিতে। সেখানেই কয়েকটা ছোট ছোট ঝোপের আড়াল খুঁজে সিংহমশাই বিশ্রাম নিচ্ছিলেন পুরো পরিবারসহ। পরিবারে গোটা পনের সিংহী ছিল, বিভিন্ন বয়সের। আমাদের দেখে তাদের কোনো ভাবান্তর হল না, যে যেমন ভঙ্গীতে শুয়ে বসে ছিল, তেমনই থাকল।
এই কয়েকদিন গেম ড্রাইভে বেরিয়ে সিংহদের রাহান-সাহান দেখতে দেখতে আমার মনে বহুশ্রুত একটা ছড়ার প্যারডি উঁকি দিয়েছে, সেইটা এইবেলা বলেই ফেলি।
যেখানে দেখিবে বুশ
না করিও উশখুশ
পাইলে পাইতে পারো
সিংহের ঠিকানা।
সারাদিন ধরে সিংহেরা কেবলই ঘুমায়। একটু হালকা ঝোপের আড়াল পেলেই হল, চার হাত-পা ছড়িয়ে কখনো বা আকাশের দিকে পা তুলে, নাক ডেকে ঘুমায়। সূর্য ডোবার সময় তাদের দিন শুরু হয়, তখন একে একে সব নড়েচড়ে বসে, গা ঝাড়া দিয়ে আস্তে আস্তে ওঠে। নাক ডাকার কথাটা একটুও অতিরঞ্জিত নয়, ঘুমন্ত সিংহের দলের এত কাছে আমরা গেছি যে নাক ডাকার আওয়াজও পেয়েছি।
চারদিনের গেম ড্রাইভে অনেকগুলো সিংহদের দলের সঙ্গে মোলাকাতের সুযোগ হয়েছে, ফলে ওদের সংসারের খুঁটিনাটি বেশ নজর করে দেখে নিতে পেরেছি। বাঘের মতো সিংহদেরও আলাদা আলাদা বিচরণক্ষেত্র আছে, তার মধ্যেই ওরা নিজেদের পুরো পরিবারকে নিয়ে থাকে, কেউ অন্যের সীমানায় যায় না। আমরা বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে অনেকগুলো সিংহের দলের দেখা পেয়েছি এবং তাদের আহার-নিদ্রা-মৈথুন এমনকি প্রাতঃকৃত্য করা পর্যন্ত দেখে ফেলেছি।
একদিন বিকেলে এক বিরাটদেহী পূর্ণবয়স্ক সিংহ ঘুম ভেঙে উঠে সোজা এগিয়ে আসতে লাগল আমাদের গাড়ির দিকে। আমরা ক্যামেরা তাক করে দাঁড়িয়ে, উত্তেজনায় বুক দুরুদুরু। হঠাৎ কি মনে করে রাজামশাই পথ বদলে আমাদের পাশের গাড়িটার দিকে ঘুরে গেলেন এবং ওটা পেছনের চাকাটাকে পছন্দ করে তার ওপর পা তুলে হিসি করলেন ঠিক যেমন কুকুরেরা করে। আর একদিন দুপুরে এক সিংহী ঘুম ভেঙে উঠে সোজা এগিয়ে আসতে লাগলেন আমাদের গাড়ির দিকে। গাড়ির ঠিক সামনের দিকে একটা ঝোপকে নির্বাচন করে বসলেন মলত্যাগ করতে। এত কাছে ব্যাপারটা ঘটল যে গাড়িতে বসে আমরা দূর্গন্ধও পেলাম।
যেসব অঞ্চলে সিংহরা ঘুরে বেড়ায় সেখানে মাঠময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে বিভিন্ন জন্তুর শাদা হয়ে যাওয়া হাড়, সিং সমেত বুনো মোষের বা ওয়াইল্ড বিস্টের মাথা, কখনো বা আস্ত কঙ্কাল। (এখানে আমি “সাদা” না লিখে ইচ্ছে করে “শাদা” লিখলাম। হাড়গুলো দেখলে যে শিরশিরে অনুভূতি হয় তা “শাদা”তে যতটা প্রকাশ করা যাচ্ছে, “সাদা” তা করতে অপারগ।) একবার তো বিরাট একটা জলহস্তীর আস্ত একটা কঙ্কাল পড়ে থাকতে দেখলাম। পুরুষ জলহস্তীগুলোর ওজন শুনলাম দেড় থেকে দু’হাজার কেজি, আর মেয়েদের তেরশো থেকে দেড় হাজার কেজি। তাদের সবটুকু সাবড়ে কেবল কঙ্কালটা ফেলে রেখে গেছে। সিংহরা আকছার জলহস্তী শিকার করে বটে, তবে সবসময় তারা পুরোটা খায় না। তাদের ফেলে যাওয়া অংশটা খায় হায়নারা, আর একেবারে পরিষ্কার করে শাদা করে ফেলার জন্য রয়েছে শকুনরা। একবার গেম ড্রাইভে বেরিয়ে পাশাপাশি হায়না আর শকুনের দলকে একটা জলহস্তীর ভূক্তাবশেষ দিয়ে ভোজন চালিয়ে যেতে দেখলাম। এখানে সবচাইতে বড় প্রজাতির শকুনের দেখা মিলল, নাম ল্যাপেড ফেসড ভালচার।
সেদিন বিকেলে সিংহের দলের কাছে পৌঁছনোর পরই বৃষ্টি নামল ঝাঁপিয়ে। গাড়ির ছাদ বন্ধ করে দেওয়া হল, তবু জানলা দিয়ে আসা ছাঁট আটকানো গেল না। অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই অবশ্য বৃষ্টি থেমে গেল, আকাশে রামধনু উঠল সেইসঙ্গে সোনালী কমলার মিশেলে আলোতে ভরে গেল চরাচর। এদিন বেরিয়েই ঝোপের আড়ালে একটা ঘুমন্ত লেপার্ডকে দেখেছিলাম। মোজেস বলল, সেই লেপার্ডের এখন জাগার সময় হয়েছে, অতএব এবার তাকে স্পট করতে যাওয়া যায়। গাড়ি ছুটল ফেলে আসা লেপার্ডের দিকে।
দূর থেকেই দেখা যাচ্ছিল প্রচুর গাড়ি দাঁড়িয়ে, অতএব লেপার্ড এখনো ওখানেই আছে। আমরা গিয়ে পৌঁছতেই দেখলাম সে গা ঝাড়া দিয়ে উঠল, ঝোপের আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে এসে এগোতে থাকল গাড়িগুলোর দিকে। ঘুম ভাঙলে সকলের যা হয়, ওরও তাই হয়েছে, হিসু করার প্রয়োজন হয়েছে। লেপার্ডের অবশ্য সিংহের মতো স্বভাব নয় দেখলাম, গাড়ির সামনে দিয়ে রাজকীয় ভঙ্গীতে হেঁটে চলে গেল সামনে, নদীর পাড়ে। ওখানে হিসি সেরে নেমে গেল নদীতে, জল খেতে। ততক্ষণে অবশ্য তার ছবি আমাদের তোলা হয়ে গেছে।
আফ্রিকায় পাওয়া যায় অনেক রকমের অ্যান্টিলোপ। সকালে এখানে ঢোকার পর থেকে দেখেছি দলে দলে টোপি আর থমসনস গ্যাজেল। কি সুন্দর যে তাদের রঙ! তামাটে রঙের ওপর রোদ পড়ে এক একটা টোপিকে মনে হচ্ছিল যেন ব্রোঞ্জের তৈরি মূর্তি। গায়ের রকমারী রঙের জন্য স্থানীয়রা বলে, টোপিরা ব্লু জিনস আর ইয়োলো সকস পরে থাকে। আর ওদের পায়ের থাইয়ের ওপরে এমন একটা গাঢ় নীল রঙের ছোপ থাকে যে দেখে মনে হয় আফ্রিকার ম্যাপ প্রিন্ট করা রয়েছে। শেষ বিকেলের গোলাপী আলোতে দিগন্তরেখায় দাঁড়িয়েছিল টোপিদের দল, অপার্থিব দেখাচ্ছিল তাদের, মনে হচ্ছিল, ওরা যেন জীবন্ত নয়, কোনো শিল্পীর বানানো ভাস্কর্য। গাড়ির আওয়াজে সামনে থেকে দৌড়ে পালালো থমসনস গ্যাজেলের দল। সন্ধ্যা ঘন হয়ে আসছিল, আমরা ক্যাম্পে ফেরার পথ ধরলাম, হেডলাইটের আলোতে দেখা গেল দুটো শেয়ালকে, ঘাসজমিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
পরদিন সকাল সাড়ে পাঁচটায় বিছানা ছেড়ে তাঁবুর বারান্দায় এলাম, তখনো সূর্য ওঠেনি। ধীরে ধীরে নরম গোলাপী মায়াবী আলোয় ভরে উঠলো চারপাশ, সাড়ে ছটা নাগাদ সূর্য উঠলো। শুনলাম, আগের রাতে ক্যাম্প থেকে সিংহ আর হায়নার ডাক শোনা গেছে, খুব কাছেই চলে এসেছিল ওরা। তখন অবশ্য তাদের কোনো চিহ্ন ছিল না, সামনের ঘাসজমিতে একটা বুনো মোষকে দেখলাম ঘাস খেতে। সারারাত অবশ্য সশস্ত্র পাহারাদারেরা থাকে ক্যাম্পে, তাই ভয়ের কোনো কারণ নেই।
তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম সাতটায়, সঙ্গে বিরাট বাক্সে ব্রেকফাস্ট দিয়ে দিয়েছে, ইচ্ছেমতো কোনো গাছের তলায় দাঁড়িয়ে সেরে নেওয়া যাবে বুশ ব্রেকফাস্ট। এদিন বেরিয়ে প্রথমেই দেখা মিলল “সারভাল ক্যাট” (serval cat) এর। এই বনবেড়ালের দেখা কেবল আফ্রিকাতে, বিশেষত সাব-সাহারান অঞ্চলেই পাওয়া যায়। এদের সারাগায়ে লেপার্ডের মতো ছোপ ছোপ, দেখে মনে হয় যেন ছোট লেপার্ড। অনেকে দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে ঘুরে বেরিয়েও এদের দেখা পায় না, তাই গাইড বলল, আমরা নাকি বেশ লাকি।
দিনটা সেদিন ভালোই শুরু হয়েছিল। সারভাল ক্যাটের পরেই দেখতে পেলাম চিতারা তিন ভাই ঘাসজমিতে বসে রোদ পোহাচ্ছে। একটু বাদেই গা ঝাড়া দিয়ে উঠে এগিয়ে আসতে লাগল গাড়িগুলোর দিকে। তিনজনের একসঙ্গে হাঁটার ভঙ্গী দেখে মনে হল যেন হিন্দি সিনেমার হিরো আর তার সঙ্গীরা এগিয়ে আসছে ভিলেনের দিকে। তবে ওরা ভিলেনদের আক্রমণ করেনি, নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ দেখে নিয়ে (এবং দেখতে দিয়ে) ফিরে গেল নিজের জায়গায়।
গেম ড্রাইভে বেরলে কিছুক্ষণ পরপরই দেখা যায় ছানাপোনা সমেত ওয়াট হগদের। কখনো ওরা সামনের পা দুটো মুড়ে বসে খেতে ব্যস্ত থাকে, কখনো বা দেখা যায় ল্যাজটাকে ফ্ল্যাগের মতো উঁচিয়ে দৌড়চ্ছে। এমনিতে এই দাঁতাল বুনো শুয়োর বেশ ভয়ঙ্কর, কিন্তু ওদের একটা গোপন দূর্বলতা আছে। আমাদের ট্যুর অপারেটর শেলা বলেছিল, ওয়াট হগের স্মৃতি নাকি ভীষণই কম। তাই মাসাই ভাষায় এদের বলে রুম্বা, যার মানে হল যাদের স্মৃতি খুব অল্প সময় স্থায়ী। শেলা বলল, সিংহের তাড়া খেয়ে পালাতে পালাতে ওরা নাকি ভুলে যায় কি কারণে দৌড়চ্ছিল। ব্যস্, ভুলে গিয়ে যেই দাঁড়িয়ে পড়ে, অমনি পড়ে যায় সিংহের খপ্পরে। তাই এরা সিংহের সহজ শিকার। তার নমুনাও আমরা পেয়েছি। এইদিন ঘুরতে ঘুরতে আমরা পৌঁছে গেছিলাম আরেক সিংহের ডেরায় এবং এবার আরও কাছে। সাধারণত কোথাও সিংহ, চিতা বা লেপার্ডের দেখা মিললে একসঙ্গে অনেক গাড়ি সেখানে পৌঁছে যায়। দূর থেকে গাড়ির ভীড় দেখেই বোঝা যায় ওখানে কিছু একটা আছে। কিন্তু এবার যখন সিংহের ডেরায় পৌঁছলাম তখন আমরা একেবারে একা। দুপাশে কাঁটা ঝোপের নিচে ঘুমন্ত সিংহের দল, মাঝখান দিয়ে আমরা ঢুকে পড়েছি চুপিচুপি। এবারে আমরা ওদের এত কাছে দাঁড়িয়েছি যে নাক ডাকার আওয়াজও পাচ্ছি। আমাদের চারপাশে পাঁচ ছটা গাছের নিচে কম করে কুড়িটা সিংহ, মাঝখানে আমরা, অনধিকার প্রবেশকারীরা। যদিও ঘুমিয়ে রয়েছে সিংহগুলো, তবে যদি জেগে ওঠে? এই কথাটা এখন লিখতে বসে ভাবলাম বটে, কিন্তু তখন এতটাই আপ্লুত হয়ে পড়েছিলাম যে একবারও মনে ভয় উঁকি দেয়নি। আমরা দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই এক সিংহীর ঘুম ভাঙল। সে কিছুক্ষণ বসে বসে চিন্তা করল, তারপর সিংহমশাইকে গিয়ে খোঁচাখুঁচি করে জাগাতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ল।
দ্বিতীয় দিন বিকেলে গেম ড্রাইভের সময় থেকে আমাদের দায়িত্ব নিল শেলা। প্রথমদিন বিশেষ কাজে আটকে পড়ায় ও নিজে আসতে পারেনি, তাই দেওর মোজেসকে পাঠিয়েছিল। শেলা মাসাই মেয়ে, মাসাই গ্রামে বাড়ি। বয়স বেশি নয়, কিন্তু এই বয়সেই নিজের ট্যুরিজম কোম্পানি চালায়। সাড়ে তিন বছরের মেয়েকে মায়ের জিম্মায় রেখে শেলা ট্যুরিস্টদলের সঙ্গে ঘোরে। জঙ্গল সম্পর্কে ভালো জ্ঞান, ভালো গাড়ি চালায়, এককথায় ঝলমলে মেয়ে, আগামীদিনের আফ্রিকার মুখ। এক সন্ধ্যায় ক্যাম্পে বসে গল্প করার সময় ওকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম মাসাইদের রীতিরেওয়াজ সম্পর্কে। বইতে পড়েছিলাম, মাসাইরা দুধের সঙ্গে বাছুরের রক্ত মিশিয়ে খায়, সেটার সত্যতা যাচাই করছিলাম। শেলা বলল, ওর দিদিমার আমলে এমনটাই হত। সেই সময় মাসাইদের খাদ্য ছিল, পশুর দুধ, মাংস আর রক্ত। এখন অবশ্য ওরা শুধুমাত্র পশুপালন করে না, সব্জিও ফলায়। তাই খাদ্য তালিকায় সব্জি ঢুকেছে। তবে ওর দিদিমা এখনও পুরনো খাদ্যাভাসে রয়েছে, শুধুই দুধ খায়, আর মাঝেমধ্যে মাংস। শেলা আমাদের সঙ্গে যে কদিন খেল, দেখতে পেলাম মাংস আর দুধের তৈরি খাবারই ওর পছন্দের। চিজ, বেকন, সসেজ, হ্যাম এসবই খেল মূলত, কখনো সঙ্গে আলুভাজা আর সঁতে করা সব্জি সেদ্ধ। ভাত, ডাল বা রুটি পাতেই নিল না। মাসাইদের সমাজে যার যত বেশি সংখ্যায় গবাদি পশু থাকে, সে তত বড়লোক। এই রীতি এখনও আছে।
শেলার সঙ্গে বেরিয়ে দ্বিতীয় দিন বিকেলে দেখলাম এক দূর্লভ দৃশ্য, সিংহের মেটিং। ও বলল, তিনমাসের মধ্যেই ওই অঞ্চলে নতুন শাবকরা আসতে চলেছে।
তৃতীয়দিন সকালে শেলা আমাদের নিয়ে চলল নতুন একটা অঞ্চলে, ডাবল ক্রশিং জোন। দুই পাহাড়ী নদী ডিয়াক ডিয়াক আর অলা রিও রককে পার হয়ে যেতে হয় এই অঞ্চলে, তাই এমন নাম। অলা রিও রক শব্দের অর্থ, ব্ল্যাক ওয়াটার। এই নদীর জল সত্যিই ভীষণ কালো, সম্ভবত কৃষ্ণমৃত্তিকার দৌলতে। অলা রিও রক আর ডিয়াক ডিয়াক মিলিত হয়ে তৈরি করেছে আর এক পাহাড়ী নদী, নাম তালেক। তালেক নদীকে এই দুদিনে আমরা বেশ কয়েকবার গাড়ি সমেত পেরিয়েছি।
অলা রিও রক এ দেখা মিলল জলহস্তী আর কুমীরের। একটা দুটো নয়, নদীটা থিকথিক করছে জলহস্তীতে, পাড়ে দাঁড়িয়ে তাদের হাঁকডাক দিব্যি শোনা যাচ্ছে। শেলা বলেছিল যে এই অঞ্চলটা গন্ডারের বিচরণ ক্ষেত্র, তবে গন্ডারের দেখা পাওয়া গেল না। সাভানা ঘাসের মধ্যে কোথায় যে তারা লুকিয়ে পড়েছে, খুঁজে পাওয়া গেল না।
এদিন প্রচুর হায়নার দেখা পাওয়া গেল। রোদ থেকে বাঁচতে গায়ে কাদা মাখছে তাদের কেউ কেউ। হায়নাদের স্বভাব হল অন্যের খাটনির ফসল চুরি ছিনতাই করে ভোগ করা। সিংহের শিকার এরা প্রায়শই চুরি করে খায়, আবার পিঁপড়ে আর উইপোকাদের তৈরি মাটির বাড়িগুলো দখল করে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে বাস করে। তেমনই দখল করা বাড়ির সামনে বাচ্চাদের নিয়ে বসে থাকতে দেখা গেল কয়েকটা হায়নাকে। হায়নার ড্রপিং আগের দিন দেখিয়েছিল শেলা, একেবারে সাদা ফুটফুটে। শেলা বলল, ওরা এত হাড় খায় যে মলে প্রচুর ক্যালশিয়াম থাকে, তাই অমন সাদা।
চারদিনের গেম ড্রাইভে মাঠে মহানন্দে ঘুরতে দেখা গেছে নানা রকমের পাখি। বিরাট আকারের উটপাখি, বিশাল বিশাল বিভিন্ন প্রজাতির হাঁস, বিরাট আকারের থেরন দেখলাম যা আগে কখনো দেখিনি। মাঠের মধ্যে একটা গর্ত মতো জায়গায় উটপাখি ডিম পেড়ে রেখেছে, তাও দেখলাম। সবচাইতে মজাদার পাখি হল সেক্রেটারী বার্ড। গায়ের রঙ সাদা আর কালোর যোগফল, যেন কালো স্কার্ট আর সাদা শার্ট পরে রয়েছে। মাথার ঝুঁটিটা দেখলে মনে হয় যেন খোঁপায় পেনসিল গুঁজে নোট নেবার জন্য তৈরি। এমন চেহারা আর সর্বদা লঘু পায়ে ব্যস্ত ভঙ্গীতে হেঁটে চলার জন্য ওদের এমন নাম। তবে সবচাইতে সুন্দর দেখতে লাগল স্টারলিংকে, এত সুন্দর তুঁতে আর নীলের মিশেলে গায়ের রঙ যে চোখ ফেরানো যায় না। পাখিগুলো সকলেই ওড়ার বদলে হেঁটে বেড়াতেই বেশি পছন্দ করে দেখলাম।
আমাদের দেশে যেমন হরিণ, আফ্রিকায় তেমন অ্যান্টিলোপ। দেখতে হরিণের মতো লাগলেও জাতে ওরা হরিণ নয়। থমসনস গ্যাজেল আর টোপির কথা তো আগেই বলেছি, দলে দলে গরু ছাগলের মতো এরা মাঠময় চরে বেড়াচ্ছে। এছাড়াও ইম্পালা, বুশ বাখ, ওয়াটার বাখ, ইলানদেরও দেখা পেলাম। ইলান এই গোত্রের সবচেয়ে বিশালদেহী, তাই এদের শিকার করতে পারলে সিংহদের দারুণ মজা। সবচাইতে ছোট অ্যান্টিলোপ হল ডিক ডিক। ছোট্ট আর লাজুক ডিক ডিকেরা ঝোপের আড়ালে থাকতেই ভালোবাসে, সেখান থেকেই কৌতুহলী চোখে সবকিছু দেখে। আর ওদের দিকে ক্যামেরা তাক করলে লজ্জায় দৌড়ে পালায়। শেলা বলল, এরা সঙ্গীর প্রতি খুব বিশ্বস্ত। জোড়ের একটা সিংহের পেটে গেলে অন্যটা বাকি জীবন একলাই কাটায়।
সেদিন দুপুরে ক্যাম্পে ফেরার সময় এক সিংহীকে দেখলাম, একটা ওয়াট হগের বাচ্চাকে সদ্য মেরে সামনে রেখে দিয়ে ঘুমিয়ে আছে। মনে হল, পেট ভর্তি তাই ভবিষ্যতের জন্য খাবার সঞ্চয় করে রেখেছে। ঘন্টা তিনেক বাদে ওই পথে যখন আমরা আবার যাচ্ছি, তখন দেখলাম শিকারী ঘুম থেকে উঠে শিকারের পাশে এসে বসেছে। কয়েকমিনিটের মধ্যে সে খাওয়া শুরু করল, আর সাড়ে চার মিনিটের মধ্যে পুরোটা সাবাড় করে ফেলল। আমাদের এত কাছে বসে খাচ্ছিল যে কড়মড় করে হাড় চিবানোর শব্দ স্পষ্ট শুনতে পেলাম। খারাপ লাগছিল শুয়োরের বাচ্চাটার জন্য, কয়েকঘন্টা আগেও সে ল্যাজ তুলে মায়ের পেছন পেছন দৌড়োচ্ছিল। কিন্তু এটাই খাদ্য-খাদক সম্পর্ক, প্রকৃতির নিয়ম।
তানজানিয়ার সেরেংগেটি আর কেনিয়ার মাসাইমারা আসলে একটাই তৃণভূমি। মাঝে কোনো বিভেদরেখা নেই যাতে বন্য পশুরা অবাধে বিচরণ করতে পারে। গ্রেট মাইগ্রেশনের সময় (জুন থেকে সেপ্টেম্বর) দলে দলে পশু সেরেংগেটি থেকে চলে আসে মাসাইমারায়, খাবারের খোঁজে। আসার পথে মারা নদী পেরতে হয় তাদের, সেখানে ওঁত পেতে বসে থাকে হিংস্র কুমীরের দল, সুযোগ বুঝে টেনে নিয়ে যায় তাদের। যারা কুমীরের কামড় থেকে বেঁচে এপারে উঠতে পারে, তাদের জন্য অপেক্ষা করে থাকে সিংহের দল। কিছু সিংহের পেটে যায় কিছু বেঁচে যায়। এভাবেই চলছে বছরের পর বছর এবং চলবেও। ওয়াইল্ড বিস্ট আর জেব্রার দলই বেশি আসে, আবার সেপ্টেম্বরের মধ্যে ফিরেও যায়। তবুও বেশ কয়েকটা ওয়াইল্ড বিস্ট দেখতে পেলাম, তারা এপারের স্থায়ী বাসিন্দা নাকি ওপারের পথভোলা পথিক, তা অবশ্য বোঝার উপায় নেই।
সেদিন বিকেলে আমরা গেলাম মারা নদীর ধারে। এই প্রথম আমরা গাড়ি থেকে নামার অনুমতি পেলাম। নদীর ধারে আমরা ছাড়া কোনো জনপ্রাণী নেই, যা আছে সব নদীর জলে। জলটা পুরোই কুমীর আর জলহস্তীর দখলে। এক একটা জলহস্তীর পরিবার তাদের সদস্যদের সঙ্গে কেবল চোখটুকু বাইরে ভাসিয়ে রেখে ডুবে রয়েছে। বিভিন্ন দলের মধ্যে হাঁকডাক করে কথাবার্তাও চলছে শুনলাম।
মারা নদী বয়ে চলেছে লেক ভিক্টোরিয়ায় মিশবে বলে। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মিষ্টি জলের হ্রদ ভিক্টোরিয়া নীলনদের উৎপত্তিস্থল। এক নদী জল নিয়ে জমা করছে সেখানে, আর একজন তা নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।
সূর্যাস্তের ঠিক আগে মারার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের রঙ বদল হতে দেখা এক অন্যরকম সুন্দর অভিজ্ঞতা।
গোধূলির এমন রঙরূপ আগে কখনো দেখিনি। হালকা সোনালী সেই আলোর প্রকৃত সৌন্দর্য বর্ণনা করার মতো শব্দ আমার জানা নেই। হুডখোলা গাড়িতে দাঁড়িয়ে চলছি আর প্রতি মুহূর্তে চোখের সামনে বদলে যাচ্ছে আলোর রঙ, পাথুরে মাটিও সেই আলোয় মোহময় হয়ে যাচ্ছে। পর মুহূর্তেই আবার বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট, সবটাই আলোর কারিকুরি। ক্রমে ঘাস জমিতে সন্ধ্যা নামল, ঠান্ডা হাওয়ার দাপটও বাড়লো। অ্যাকাশিয়া গাছের মাথায় একলা বসে থাকা শকুনটির পাশে উড়ে এসে বসল তার সঙ্গী। খরগোশ, অ্যান্টিলোপদের দৌড়াদৌড়ি বাড়ল নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছনোর জন্য। কারণ খানিকপরেই এই তৃণভূমি চলে যাবে সিংহ, চিতা, লেপার্ডদের দখলে। কয়েকটা টোপি আর ইম্পালাকে দেখলাম অনেক দূরে দিগন্তরেখায় ছুটোছুটি করতে।
এখানে আকাশ মাটিতে মেশে না, বরং মাটি চলে যায় আকাশের সঙ্গে মিলতে। দিগন্তরেখা তাই দেখা যায় অনেক উঁচুতে। শেষ আলোর রঙে দিগন্তে দেখা জিরাফের দল আর অ্যাকাশিয়া গাছের ফ্রেমটা মনের মধ্যে এঁকে নিয়ে সেদিনের মতো ফিরে গেলাম ক্যাম্পে।
পরেরদিনের গন্তব্য তানজানিয়া সীমান্ত এবং মারা নদীর অন্য একটা ধার, যেখানে গ্রেট মাইগ্রেশনের সময় সবচাইতে বেশি ভীড়ভাট্টা থাকে। প্রথমে শেলা আমাদের নিয়ে গেল লুকআউট পাহাড়ে, এখান থেকে তানজানিয়ার বিস্তীর্ণ উপত্যকাটাকে দেখা যায় নিচে পড়ে থাকতে।
কেনিয়া-তানজানিয়া সীমান্ত নামেই সীমান্ত, বর্ডারসুলভ কোনো চোখরাঙানি নেই এখানে। নেই কোনো বেড়া নিদেনপক্ষে পাহারাদারির ব্যবস্থা। চিনে নেবার জন্য আছে একটা পিলার, যার একপাশে কেনিয়া অপর পাশে তানজানিয়া চিহ্নিত করা। আর আছে গাছের ডালের খুঁটির ওপরে বসানো একটা ছোট্ট বোর্ড। তানজানিয়ার মাটিতে ভিসা ছাড়া পা রাখার সুযোগ পেয়ে ছোট্ট একটা চক্কর লাগিয়ে আবার ফিরে এলাম। এই সময় “রিফিউজি” মুভির একটা গানের লাইন মনে পড়ছিল, যার বক্তব্য হল, বেড়া বিভাজন কেবল মানুষের জন্য। পশু পাখি, রোদ, বাতাস, বৃষ্টি এদের কোনো বিভাজন নেই। মারা নদীর পাড়ে পৌঁছে চমকে উঠতে হয়। যেসব ওয়াইল্ড বিস্ট, হিপো বা বাফেলো কুমীর কিংবা সিংহের খাদ্য হয়েছে, তাদের কয়েকটার মাথার খুলি সাজিয়ে রাখা আছে নদীর ধার বরাবর। এমনকি গাছের ডালেও টাঙানো আছে কয়েকটা খুলি। এখানেও গাড়ি থেকে নামা গেল, বনবিভাগের উর্দিধারী গাইড নিয়ে নদীর পাড় ধরে হেঁটে আসা যাবে।
গাইড চমৎকার হাসিখুশি একজন সশস্ত্র মাসাই যুবক, নারক শহরে বাড়ি। ওর সঙ্গে গল্প করতে করতে দেখা গেল আফ্রিকান জলচরদের, শোনা হল তাদের অনেক কাহিনী। হাঁটতে হাঁটতে আমরা পৌঁছলাম মারা নদীর ওপরে তৈরি ব্রিজের ওপর। নদী এখানে পাথুরে জমির ওপর দিয়ে বইছে, দারুণ খরস্রোতা। ব্রিজের ওপারটা হল মারা ট্র্যাঙ্গল, সেখানেও পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা আছে। গ্রেট মাইগ্রেশনের সময়, এই জায়গাটার দারুণ চাহিদা। এখানে পাথরের ওপর এমন এক রঙের লিজার্ড দেখলাম যা কখনো ছবিতেও দেখিনি। লিজার্ডটার গায়ের রঙ অর্ধেক লালচে কমলা, বাকি অর্ধেক তুঁতে ঘেঁষা নীল। দেখে স্পাইডারম্যানের কথা মনে পড়ে গেল।
এরপর ফেরার পালা। আমাদের ভ্রমণ শুরু হয়েছিল নাইরোবি শহর থেকে, শেষদিনে ওখানেই ফিরতে হবে। মাসাইমারা ছেড়ে বেরনোর আগে আরেকটা অনন্য অভিজ্ঞতা হল। ঝুপসি একটা গাছের নিচে এক মা-চিতার দেখা পেলাম, সঙ্গে চারটে কচি ছানা। চিতা এবং হায়নার বাচ্চাদের গায়ের রঙ বেশ কালচে থাকে, ঘাড়ের ওপরটাও বেশ রোমশ হয় দেখলাম। মধ্যাহ্নভোজের জন্য মা চিতা একটা ইম্পালা সদ্য শিকার করে এনেছে, শাবকেরা সেটা খেতে ব্যস্ত। বোঝা গেল, আর একটু আগে এলে শিকার করার দৃশ্যটারও সাক্ষী হওয়া যেত। চিতাদের থেকে একটু দূরেই ইম্পালার দলটাকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। সম্ভবত ওরা ভেবেছে, এই জায়গাটাই আজকের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ, কারণ আজকের মতো ফাঁড়া কেটে গেছে।
ফেরার পথে মনে হল, মাসাইমারায় পৃথিবী থমকে আছে লক্ষ বছর পেছনে। প্রকৃতি এখানে নিষ্কলুষ, তাই আকাশ আর মাটিতে এত রঙের খেলা। জীবজগৎ এখানে বেঁচে রয়েছে কেবল প্রাথমিক দুটো লক্ষ্যপূরণের তাগিদে, বেঁচে থাকা আর বংশ বিস্তার। এই সহজ সরল জীবনযাত্রায় একদিন মানুষও অভ্যস্ত ছিল, যখন তারা ছিল শিকারী-সংগ্রাহক। মনের মধ্যে বুড়বুড়ি কেটে ওঠা প্রশ্নগুলোই মানুষকে এই অবস্থা থেকে টেনে বার করে নিয়ে এসেছে আজকের যে দুনিয়ায়। এত বড় একটা বিবর্তনের মূলে কিন্তু রয়েছে তিনটে ছোট্ট জিজ্ঞাসা, কি? কেন? আর কিভাবে?
