bibidho-boi-mela

বইম্যালা 
রম্যরচনা
আশুতোষ ভট্টাচার্য 

 

বহু প্রতীক্ষার পরে একটা ২০১ বাসের দেখা পেয়েছি, সেটা অবশ্য৷ বহুক্ষণ ধরেই স্থির, স্থিতি জাড্য কেস, নিউটন প্রথম সূত্র মেনে, বাহির হইতে প্রযুক্ত বল প্রয়োগ না করলে স্থির বস্তু স্থির অবস্থায় থাকবে যুগ-যুগান্ত। এক্ষেত্রে স্থিতি থেকে গতিতে পরিবর্তন করবার দায়িত্ব পুলিশ না প্যাসেঞ্জার নেবে সেটা নিয়ে আলোচনা চলছে। লটারি পাবার মত হাডকো মোড়ে জায়গা পেয়েছি বসবার, ঘুমটা সদ্য এসেছে হঠাৎ শুনি কানের কাছে কে গুনগুন করে বলছে দাদা প্রি-বুকিং করেছেন। আমি ভাবলাম কন্ডাকটার বুঝি টিকিট চাইছেন, তা কোলকাতার টিনের বাসেও যে চড়বার আগে বুকিং সিস্টেম চালু হয়েছে তা জানতাম না, পকেট থেকে একটা দশটাকার নোট বের করে বললাম কলেজ মোড় একটা আর এসব বুকিং টুকিং কবে থেকে চালু হল? যেই বলেছি অমনি দেখি আরে এ তো সুটেড বুটেড সেলস-ম্যানের মত দেখতে মস্ত স্মার্ট ছোকরা। সে আমায় বলল, না স্যার, ওই সনাতন জায়গিরদারের ‘রক্তচোষার আর্তনাদ’ বইটার প্রিবুকিং এর কথা বলছিলাম আর কি। ট্রেনের টিকিট, প্লেনের টিকিট বুকিং হয় শুনেছি, সিনেমার টিকিট আগে লোকে কাটত এখন নাকি এ সব অ্যাপ দিয়ে তার বুকিং দিতে হয়, খাবার দাবার অনলাইনে অর্ডার দেওয়া ইদানিং চালু হয়েছে (খাবারের ছবি দেখে) তা এই বইটাই বাকি ছিল। বললাম, আমি বাপু তেমন বইটই পড়ি না আর বুকের আবার বুকিং, জাঙ্গিয়ার আবার বুকপকেট? তা শুনে সেই ছেলেটি ভারি বিরক্ত হল। বলল, পড়তে হয় নইলে পিছিয়ে পড়তে হয়, হঠাৎ দেখি তার পাশে হ য ব র ল-র ন্যাড়ার মত দেখতে এক ছেলে পকেট থেকে একতারা কাগজ বের করে গড়গড় করে পড়তে লাগল, –

‘বিশাল আতলান্তিকের ওপর দিয়ে নানা বিপদ ঝঞ্ঝা অগ্রাহ্য করে চলেছে নরশার্দুলের হোম মেড জাহাজ, লক্ষ্য কাস্পিয়ান সাগরের রক্তচোষা হাঙ্গর। ইতিমধ্যে এই হাঙ্গর ২০ জন রাশিয়ান, ১৩ জন ফ্রেঞ্চ আর ৭ জন ক্যারবিয়ানের রক্ত চুষে খেয়েছে, অথচ এই হাঙ্গরের টিকিটিও কেউ দেখতে পায়নি, আমেরিকান গুপ্তচর সংস্থা, রাশিয়ার সংবাদ সংস্থা খবর কি ছবি দূরের কথা সেই হাঙ্গরের বুকপকেটে রাখা পেনখানাও উদ্ধার করতে পারেনি। মছলন্দপুরের নরশার্দুল বাবু সেদিন সকালে ২০ কিলোমিটার দৌড়ে বাল্যবন্ধু নিত্যগোপালের উঠোনে বসে সদ্য এক হাড়ি খেজুরের রস খেয়ে দ্বিতীয় হাড়ি খাবেন বলে দম নিচ্ছেন অকস্মাৎ তার মোবাইল ফোনে চিটেগুড়ে পড়লে পিঁপড়ে নড়তে চড়তে পারে না রিংটোন বেজে উঠল। আমেরিকার পররাষ্ট্র দপ্তরের সহ উপপ্রধান জসেফ মেজমামা ফোন করে তার সাহায্য চেয়েছেন এই রক্তচোষা হাঙ্গরের উৎপাতে জেরবার হয়ে।’

আমি সে ছেলেকে থামিয়ে বললাম এ তো অসাধারণ প্লট ভাই, সৃজিত দাকে দিলে তো সিনেমা বানিয়ে ফেলবেন, বুম্বাদা হিরো, আমায় থামিয়ে দিয়ে সেই প্রিবুকিং বাবু বললেন, তবেই দেখুন এ বই প্রিবুক করার মত কিনা। ইতিমধ্যে জেনে নিয়েছি সে ছেলের নাম অশ্বত্থামা কাল্পনিক আর তার প্রকাশনার নাম কাঁঠালপিড়ি প্রকাশনী। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা প্রিবুক কিভাবে করে, সে ফস করে তার মোবাইল বের করে কি খুটখাট করতেই দেখি তার প্রকাশনার অ্যাপ খুলে গেল আর তাতে দেখি নানান বইয়ের নাম আর রংচঙে প্রচ্ছদ।

সে গড়গড় করে বলতে থাকল এই দেখুন কবিতার বই ‘ময়ূর তোমার পেখম কোথায়’, ‘এ বাড়িতে বোরলিন নেই’, ‘শীত বলেছে স্নান কোরো না’ কিংবা রহস্য উপন্যাস ‘কবরস্থানে খবরদার’, ‘হাঙরের হাহাকার’। আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, এ তো বিশাল আয়োজন। তা তোমরা বইমেলায় স্টল দেবে না? সেখানে গিয়ে না হয়; সে বলল সে হবার জো নেই, আমরা ইদানিং খুব পরিবেশ সচেতন, যত অর্ডার ততগুলো ছাপি নইলে তো বৃক্ষহত্যার দায়ে পড়তে হবে। আমি বললাম তাইত তাইত। শুনে সেই ন্যাড়া হাততালি দিয়ে বলে উঠল ২১,২২,২৩,২৪। আমি বললাম এর সাথে কোন নাম্বার সিরিজের সম্পর্ক আছে নাক্‌ এ পি, জি পি, ফিবোনাকি, অশ্ব। বলল, না না আসলে আপনি হচ্ছেন ২৪ নাম্বার মুরগী মানে সম্মানীয় পাঠক। তা পেমেন্ট কার্ডে করবেন না ক্যাশ? ক্যাশে করলে প্রিবুকিং-এর ২০ পারসেন্ট ডিস্কাউন্টের সাথে এক্সট্রা ৫ পারসেন্ট পাবেন সাথে আরও হাজার পুরস্কারের হাতছানি। 

আমি বললাম ভাই আমার কাছে কার্ডও নেই আবার তেমন ক্যাসও নেই, তুমি বরং কালকে এসো। সে দেখি নাছোড়বান্দা, বলে আপনার জি পে, পেটিএম নেই, ফট করে টাকা ট্রান্সফার করে দিন। আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, এটিএমেই টাকা তুলি না, উনি বলছেন পেটিএম এর কথা। এই কথা শুনে ন্যাড়া বলতে থাকল দাদা তোমায় বললাম না এ কাকু বইফই পড়ে না, জীবনানন্দের কবিতা মুখস্থ নেই, ‘চশমখোরের চিৎকার’ উপন্যাস পড়েনি সে বুঝবে ‘রক্তচোষার আর্তনাদ’? এ কথা শুনে আমার ভয়ংকর রাগ হল, এরা জানেই না আমি উচ্চমাধ্যমিক বাংলায় ১২০ নম্বর পেয়েছিলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রশ্ন বলে মনসাপোতা এথলেটিক ক্লাবের কবিতা কম্পিটিশনে সান্ত্বনা পুরস্কার পেয়েছিলাম। কলেজের দেওয়াল ম্যাগাজিনে আমার কবিতা “জলে ভেজা কবিতা” প্রভূত প্রশংসা লাভ করেছিল।

এমন সময় কন্ডাকটার এগিয়ে এল, বলল, মেসমশাই প্রিবুক যদি করতেই হয় তবে পলাশপুকুর বাস সিন্ডিকেটের ‘বাসরঘরে বাস’ কবিতার বইটা পড়ুন। আমি সামান্য কনফিউজড হয়ে বললাম ভাই বাস না বাঁশ? সে অবাক হয়ে বলল বাস সিন্ডিকেটের বইতে বাঁশ আসবে কি করে, কাকু? বাঁশ দিতে হলে জনগণকে দেবে সরকার, কেন্দ্রের জন বিরোধী নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান, গ্যাস সহ ১৪ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে সাধারণ ধর্মঘট। হঠাৎ দেখি ড্রাইভার হাজির, বলে বাপির এই দোষ, কথায় কথায় ১০-২০ বছর পিছিয়ে যায়। এ সব বামফ্রন্ট আমলের ডায়লগ ঝাড়ছে।

আমি বললাম, এ তো ভয়ংকর ব্যাপার করেছ হে, বাসরঘরে বাস ঢুকিয়ে দিয়েছ, এ বাস চার্টার্ড না মিনিবাস। কন্ডাকটর বলল, কাকু বইটা পড়েই দেখুন, পরতে পরতে বিস্ময়, সাসপেন্স, ভালোবাসার হাতছানি, প্রতিবাদ বিক্ষোভ হতাশা, রুখে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ সবই আছে, টু বাই টু এসি স্লিপার। 

আমি বুঝলাম সমূহ বিপদ।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *