short-story-kokhono-bidhur

কখনও বিধুর

ময়ূরী মিত্র

বাস থেকে নামতেই আরাম লাগল। বাসস্ট্যান্ড ব্রিজের ওপরই। সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলে পরপর তিনটি ঝিল। কমলাপুরের দুটো ঝিলের মধ্যে দিয়ে সরু রাস্তা। হাঁটলে শাড়ির ভাঁজে লম্বা ঘাস ঢুকে পড়ে। দু-চারটে বুনো কাঁটাও। মন্দিরাদের বাড়ির দিকে মুখ করে দাঁড়ালে, বাঁদিকের দুটো প্রথম ও দ্বিতীয়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঝিলের মাঝে যেটুকু মাটি তাতে হাঁটা যায় না। কেউ হাঁটার চেষ্টাও করে না। কেবল বস্তির কিছু  কুচো বাচ্চা এবং যুবক হতে থাকা বিচ্চু জলে ঝাঁপায়। তৃতীয় ঝিলের ভাসা পদ্ম তাদের খুব পছন্দের। কমলাপুরের বাজারে বিক্রির সাহস পায় না। দক্ষিণেশ্বর ছোটে। পতিতপাবন রামকৃষ্ণের পাদপদ্মে মেশে  ঝিলপদ্ম। বাচ্চাগুলোর খুব বুদ্ধি। জানে, কমলাপুরের মানুষরা প্রাণ গেলেও ঝিলের ফসল তুলতে দেবে না। কিন্তু ঠাকুরের পুজোয় লাগছে দেখলে কিচ্ছুটি বলবে না। বলতে চাইবেও না। এ অঞ্চলের বাসিন্দারা যেমন ঝিল ভালোবাসে তেমনি রামকৃষ্ণকেও। ছোঁড়াগুলো দক্ষিণেশ্বরের নাম দিয়ে দিয়েছে রামকৃষ্ণ বাজার। 

গুরুজনরা বকে — এই বজ্জাতগুলো, এই উল্লুকগুলো, বলি ঠাকুরের মন্দিরকে বাজার বানিয়ে দিলি? আলী আর পামেলা কমলাপুর বস্তি অঞ্চলের যুগল মাস্তান। মাস্তান বর আর মাস্তান বউ সবার হয়ে  উত্তর দেয় — ঠাকুর আছে মন্দিরে। চত্বরে দাঁড়িয়ে ছেলেগুলো ফুল বেচে। ভক্তরা কেনে। তবে? বাজার হল না সেটা? চত্বরকে মন্দিরের সঙ্গে গুলিয়ে দাও কেন? না জেনে, নাকি ইচ্ছে করে? 

মনে পড়তেই ভেতরটা চঞ্চল হয়ে উঠল মন্দিরার। ভীষণ মেজাজ হয়েছে আজকাল আলী-পামেলার! দু ধম্মের লোকজনদেরই সমান তালে খেপিয়ে যাচ্ছে! প্রায় মাস তিন আগে আলীর বড়োচাচা আমন মিঞা হোয়াটস্যাপ করেছিলেন মন্দিরাকে। ঝিলের ধারের সবুজ কাঠের বেঞ্চে জুত করে বসে  মেসেজটা মনে করার চেষ্টা করল — বউদি আপনে ঠিক কবে আসবেন কন দেখি? মন্দিরা মজা করে লিখেছিল — কেন কন দেখি কাকা? আমার গমনাগমন জেনে আপনার কী দরকার? শ্বশুরবাড়ির পাড়ার এই বুড়ো মানুষটার সঙ্গে কবে থেকে এমন মজার লেনদেন শুরু হল, আজ আর মনে করতে পারে না। বর যতীন চলে যাবার পর থেকে কি? আসলে সংসারের বাইরের মানুষ যখন নিজের অঙ্গ হয়ে যায়, পরিচয় কিংবা ঘনিষ্ঠতার দিনক্ষণ আলাদা করা যায় না। আমন-আলী-পামেলা সব তো মন্দিরার হাত-পা-চোখ-কান। কমলাপুরের সবাই জানে, আলী – পামেলার জিদ্দিপনা ঠান্ডা হবে মন্দিরার শাসনে। আমন মিঞা কিংবা পামেলার মা লক্ষ্মী কত ঠাট্টা করে এ নিয়ে!

ওরা কি আর আমাদের ছেলে মেয়ে? দুইখানই বউদির গতজম্মের সন্তান।  

সেদিন কিন্তু মন্দিরার ফাজলামোর উত্তরে পাল্টা ইয়ার্কি দেয়নি আমন চাচা। বরং  লিখেছিল — হাসির ব্যাপার আর নেই গো বউদি। আমায় হুমকি দিয়েছে পামেলা, হজে যেতে দেবে না। হজের টাকা খরচ করে বস্তির ছেলেমেয়েদের সাতদিন ধরে রাবড়ি আর পাঁঠা খাওয়াতে হবে। বউদি, আমি যত বলি, আমার আলাদা টাকা আছে। তা দিয়ে একদিন খাইয়ে দেবখন। তা হবে না। ওই হজের নাম করে যে টাকা রেখেছি তা দিয়েই খাওয়াতে হবে। এবং ওই সাতদিনই খাওয়াতে হবে। তাতেও যদি টাকা না ফুরোয় তো… নিয়ে চলো চাচা দীঘা – বিষ্ণুপুর। জয়েন্ট ট্যুর। 

ক্লাসরুমে বসে পড়তে পড়তে যখন পেট গুলিয়ে হাসি আসছিল, তখনই আবার মেসেজ ঢুকল —  এসে দুটোকে বুঝিয়ে বলুন। সরল কথায় মানুষ আজকাল বড়ো কারণ খুঁজে গো বউদি। তোমাদের রামকেষ্টার থিওরি আর চলবে না গো কমলাপুরে। না তুমি চালাতে পারবা, না আমি! 

শেষ কথাগুলো মনে হতেই জ্বালা হল কেমন! আমন মিঞা ভেবেছে কী! সবার সঙ্গে সুন্দর করে মেশে বলে মন্দিরাকে কি ছাগল পেয়ে গেছে? যা বলবে তাই মানতে হবে! রামকেষ্টা -রামকেষ্টা করে কেন? জানে না… রামকৃষ্ণ এখানকার মানুষের কত্ত বড়ো আবেগ! আমরা যেমন তোদের প্রতিবেশী, তোরাও তেমনি আমাদের প্রতিবেশী! তোর হজের সমস্যা মেটাব আমি? আর তু্ই করবি আমার ঠাকুরকে অপমান! 

তিনটে জলরাশি বাতাস হয়ে ঢুকছে ঘেমো ব্লাউজে। বিরক্ত হতে গিয়েও কী যেন ভাবছে মন্দিরা! আমন মিঞা তো আগেও অমন রামকেষ্টা বলে মন্দিরাকে খেপাত! আবার ভোগ দেবার জন্য স্পেশাল সুজির পায়েস রেঁধে দিত। রামকৃষ্ণের থালায় ভুরভুর করত আমনের ঘি-মাখা পায়েস। মন্দিরার হাতেই তো পৌঁছে যেত রামকৃষ্ণের প্ৰিয় খাবার। তখন তো আমনের কেষ্টা ডাকে বিরক্ত লাগত না। উল্টে সেও তো “কেষ্টা ব্যাটা – রাম ব্যাটা” বলে চাচার সঙ্গে মজা মেরে যেত। ফকিরচাঁদ কলেজে  চলে যাবার পর আর নিয়মিত দক্ষিনেশ্বর যাওয়া হয় না মন্দিরার। 

সেই মেসেজ পাওয়ার ঠিক তিনমাস বাদে কমলাপুরে পা দিল মন্দিরা। নতুন কলেজে ট্রান্সফারের পর, শ্বশুরবাড়িতে রেগুলার থাকতে পারে না। ওখানেই থাকে ঘরভাড়া নিয়ে। মেয়ে বড়ো জেঠি যমুনার কাছে থেকে স্কুল করে। মেজোজ্যাঠা সুশোভনের জন্য এখনও প্রাইভেট টিউটর রাখতে হয়নি। সুশোভন — ইউনিভার্সিটির টপ। 

— আচ্ছা, চাচাকে যদি কাল বলে …চাচা সেই পায়েসটা বানিয়ে দাও! আমি রামকৃষ্ণকে খাওয়াব। বানিয়ে দেবে চাচা, মন্দিরার জন্যে!

আরে এই তো সুশোভনের কথা ভাবছিল! তার মধ্যে ফের চাচা ঢুকে পড়ল কখন! নাহ! পামেলা সবদিক থেকে ঝামেলা বাঁধাচ্ছে! চাচাকে জ্বালাচ্ছে! তার মনে প্রশ্ন বাঁধাচ্ছে! প্রশ্ন উঠলে চিন্তা করতে হয়, হতভাগা  জানে না? মেয়েটার কথা শুনলে হাড় চিড়বিড় করে। একমাত্র মন্দিরা ছাড়া আর কেউ পছন্দ করে না পামেলাকে। আলী যাও বা দু ধম্মে একটা মিলমিশ রাখার চেষ্টা করে… পামেলা ধম্মো ব্যাপারটাকেই উড়িয়ে দেয়। অন্তত কথায় একটা সম্প্রীতিমার্কা ব্যাপার রাখে আলী।

পামেলার সাগরেদ হল বস্তির অবিবাহিত ছেলেমেয়েগুলো। পামেলার হয়ে তারাই বলে দেয় — এই যে মাসিমা কিংবা পিসেমশাইরা পামেলা দিদির পোঁদে বেশি লেগোনি। কেমন? আলীদাদা জাঙ্গিয়ায় বোমা নিয়ে ঘোরে। পামেলাদিদির আবার দাঁতের ফাঁকে বঁটি। বোঝলা? মানে ধরো গে… একজন যদি বোমা মেরে মুখ তোবড়াতে ফেল মারল তো কোই বাত নহি! আরেকজন বঁটি দে নাড়ি-নুনু সব কেটে দেবে! তো তাইলে কী হল? নাড়ি-নুনু দুইই কাটা পড়লে বাচ্চা পয়দা বন্ধ তোমাদের। তাইলে কী দাঁড়াল? তোমাদের ধম্মের কাজ আরও কমল। বাচ্চার জন্য কালীর থানে মানত করতে হবেনি। ফকিরের জলপড়া? সেও লাগবেনি। শুধুমুধু ঘরময় জল ছিটিয়ে কি চন্নামেত গিলে করবা তুমি কী? তোমাদের তো বের-করার অঙ্গই নাই। কুনো ভগমান তো তুমাদের জনমের অঙ্গ তৈরি করতি পারবে না। 

বাচালের দল বকে যায়। কমলা-র মানুষ বাজার অফিস সেরে ঘরে দোর দেয়। তখনও দেখা যায় —  টিমকে উৎসাহ দিতে পামেলা ফুট কেটে চলেছে  —

বল বল! থামলি কেনে রে? পয়দা বন্ধ হলে কী হবে সেটাও বলে দে আমার সন্তানরা! কী হবে? হবে আবার কীই? ঝিলের জলে একশো পায়রা নাচবে!  তাদের সঙ্গে জলে জলে চলব এঁকেবেঁকে!

ছেলেরা হয়ত বলল — তাপ্পর? তাপ্পরটাও বলে দাও না কেনে পমিদিদি!

জোলো বাতাস নতুন শব্দে আরও কি ভারী করে ফেলে পমিদিদি? পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়েছে যে মেয়েটা।

— তাপ্পর? মানে ঝিলেপারেতে পৌঁছে গিয়ে?

ফাইনাল উত্তরে সন্তানদল চেঁচিয়ে মরে  — সেঁধিয়ে যাব তোমাদের ঘর। হাগাখানা – ছুঁচুর কল সব দখল।

মনে পড়তেই হো হো করে হেসে ফেলল মন্দিরা। খানিকক্ষণ আগে বাড়ি ঢুকেছে। প্রতিবারই বাড়ি ঢোকার আগে ঝিলের ধারের বেঞ্চেতে বসে হাওয়া খেয়ে নেয়। তারপর  ঘাস বাঁচিয়ে হাঁটতে হাঁটতে  গেটে গিয়ে দাঁড়ায়। তবে অন্যদিনের থেকে আজ সময়টা বেশি হয়ে গেছে। পামেলাকে ধরার জন্যে প্রায় চল্লিশ মিনিট দেরি করে ঢুকেছে বাড়ি। 

ঢুকতেই মনসা বলল– জেঠুর জন্মদিন আজ! তুমি জানো না? সকাল থেকে বসে আছে লোকটা! কখন পায়েস করবে আর কখন মাংস! মন্দিরা দেখল, গুটিগুটি পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে বড়ো জা যমুনা। এই মেয়েমানুষ চিরটাকাল নিশ্চুপ থাকার রাজনীতি করে গেছে। নিজে কিছু না বলে, মনসাকে দিয়ে সুশোভনের পুরো দায়িত্ব মন্দিরার ঘাড়ে চাপিয়ে গেছে। যত ক্লান্তই হোক আর যেদিনই বাড়ি ফিরুক, সুশোভনের সেবায় লাগতে হবে। মেয়ের অলিখিত নির্দেশ আজকাল ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলে। খুব স্বার্থপর হয়েছে মনসাটা। মা যে ক্রমশ একা হয়ে পড়ছে, সেদিকে লক্ষ নেই। জেঠু যেহেতু অংক আর সায়েন্সে ফার্স্ট বানিয়ে দেয়, জেঠুর দিক টেনে কথা বলে যায় সর্বক্ষণ। তিনবছর বয়সে বাপ গেছে মনসার। তারপর থেকে মেয়েটাকে আর মা-মুখী করতে পারল না মন্দিরা। এট্টু ভালোবাসা… এট্টু গুরুত্ব পাবার জন্য কত ঝগড়াই যে করেছে মনসার সঙ্গে। মনসা সেই জেঠু আর জেঠু। যমুনাকে অবশ্য পাত্তা দেয় না তেমন। কিন্তু জেঠুর হাত আর ছাড়তে শিখলে না মনসা। মেয়ের সঙ্গে ঝগড়া হয়েই তো তিনমাস কমলাপুর মাড়ায়নি। এই তিন-তিনটি মাস একটা ফোনও করেনি মনসা। সুশোভনের জন্মদিন মনে করে নিজেই এসেছে মন্দিরা। তবু দেখামাত্তর এমনভাবে কথা বলল, যেন জানত জেঠুর জন্মদিন মানেই পৃথিবীর যে কোনও প্রান্ত থেকে দৌড়ে চলে আসবে মা। আর এসেই পায়েস রাঁধতে বসে যাবে। তবে কি সুশোভন কিছু বলেছে? কাল রাতে সুশোভনের মেসেজ পেয়ে অবাক হয়ে গিয়েছিল। সুশোভন কখনও মেসেজ করে না। ফোনও না। আসলে মন্দিরাই তার কথা ভাবার চান্স দেয় না। সুশোভন ভাবার আগেই মন্দিরা পৌঁছে যায়। বিশেষ করে বনানীর সঙ্গে বিয়েটা ভেঙে যাবার পর থেকে। আসলে সুশোভন তখন স্বামীহারা মন্দিরার মতোই একা হয়ে গিয়েছিল তো! বনানী পাড়ার মেয়ে। পাড়ার ফার্স্ট বয়ের সঙ্গে প্রেমটাও করেছিল মন লাগিয়ে। কিন্তু  অনেকগুলো ভাই-বোন সামলে যখন বিয়ে করতে গেল, সুশোভনেরও তখন দেরি হয়ে গেছে। বনানীর বিলম্বে ব্যথিত সুশোভন মনসা-মন্দিরায় নতুন আনন্দ খুঁজে পেয়েছে।  

আজ এসেই ঝগড়া করতে চায়নি মন্দিরা। ঠিকই করে রেখেছিলাম মনসা যাই বলুক, একটি কথারও উত্তর দেয়নি। রান্নাঘরে ঢুকে কড়াইয়ে দুধটা জ্বাল দিতে শুরু করেছিল। পায়েসের কিশমিশ – বাদাম এমনকি মাদার ডেয়ারীর দুধের প্যাকেট অব্দি গুছিয়ে নিয়ে এসেছিল। কাল রাতে মেসেজের চারখানা শব্দ মন্দিরাকে ছুটে আসতে জোর দিয়েছিল খুব। –চলে এসো। পায়েস খাব। 

সত্যি বলতে কি, সুশোভনের মেসেজ না গেলে মন্দিরার পক্ষে কমলাপুর আসা মুশকিল হত! কী করে আসে! মেয়ের সঙ্গেই ঝগড়া। সেই মেয়েই করল না খোঁজখবর! মা বলে  কোনওই লজ্জা থাকবে না, এ হয়? 

পায়েস রেঁধে সোজা চান করতে চলে গিয়েছিল। মনসাকে এড়াবার দরকারও ছিল। তার ওপর এখন পচা ভাদ্দর। ডিউটি করতে করতে গরমে হাঁসফাঁস। এত মোটা হয়ে গেছে এসির মধ্যেও হাঁটতে  ঘামে। উইকডেতে বাসে এত  ভিড়! এতক্ষণ একেবারে চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে ছিল। কোনটা নিজের আর কোনটা লোকের ঘাম, বোঝা দায়। কাচা শাড়ি আর নতুন সাবানের গন্ধটা জরুরি ছিল খুব। 

ভেজা চুলে গামছা বেঁধে জানলার কাছে চেয়ারটা টেনে নিল মন্দিরা। এইসময়টায় এখানে বসার লোভটুকু সামলাতে পারে না। একটু আগে পায়েস দিতে গিয়ে দেখে এসেছে, সুশোভনের ঘরের দরজা বন্ধ। কড়া থেকে আরও কটা কাজু – কিশমিশ সুশোভনের বাটিতে তুলে  চাপা দিয়ে রাখল। তারপর নিজের জন্যে অনেকটা দুধ-চিনি দিয়ে চা বানাল। যদিও জানে, যমুনা চা আশা করছে, তবু কেন জানি আজ এককাপই বানাল। কিন্তু  সুশোভন এত সন্ধে অব্দি ঘুমোচ্ছে কেন কে জানে! সুশোভন অমনই। এই মেসেজ করে ডাকল ! আবার এই নিজের মতো বই পড়তে লাগল। কিংবা ধরো, আজকের মতোই ঘুমোতেই লাগল… ঘুমোতেই লাগল। যতীন মজা করে একটা কথা বলত — শোভনটা মাঝে মাঝে হুঁশ হারিয়ে নিজেকে দুর্লভ করে রাখতে পারে। ছেলেদের এমনটাই হওয়া উচিত, বলো মন্দিরা? মেয়েদের কাছে ধারাবাহিক আদর পাওয়া যায়। আচ্ছা কেন বলত এসব যতীন? বেঁচে থাকাকালীনই কি সুশোভনকে নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছিল যতীনের? কিন্তু কেন? মন্দিরার মধ্যে তো সততার অভাব ছিল না। যতীন এই ব্যাপারে কোনওদিন অভিযোগ স্পষ্ট করেনি। আজ এত বছর পরেও মন্দিরা আর সুশোভনের আধা রোমান্টিক সম্পর্কে ছিটেফোঁটা শরীর নেই।

বড়ো একটা চুমুক দিয়ে বাগানে উঁকি দিল মন্দিরা। একই লম্বা ঘাস। দেখলে মনে হয়, ঝিলের ধারের ঘাসগুলোই যাযাবরের মতো ছড়িয়ে গেছে কমলাপুরের সবখানে। এবারে শুধু সবাই মিলে আরামে আরাম খাওয়ার পালা। মন্দিরার শ্বশুরবাড়ি আর চারপাশের প্রতিবেশীরা, গাছপালা বাঁচাতে সবসময়ই কিছু না কিছু উদ্যোগ নেয়। ফলে কমলাপুরের রং সবুজ।

 সুশোভনের পোঁতা একসার জুঁই গাছ পাতায় ভরে আছে। দু-একটা কুঁড়িও আছে অবশ্য। মাটি শুকিয়ে আসছিল। মনসাটা মুখেই জেঠু -জেঠু করে শুধু। জেঠুর গাছগুলো যে নুইয়ে পড়ছে, সেদিকে খেয়াল নেই।

গাছে জল দিয়ে ঝিলের জলে চোখ ডুবোল মন্দিরা। বিয়ে হয়ে আসা থেকে তিনটি ঝিল তিন বর হয়ে আছে। কালরাত্রিতে প্রথম দেখেছিল তার তিন জলবরকে। তখন সন্ধে নেমে রাত হয়েছে। বাঙালবাড়ির বউ তো। শ্বশুরবাড়ির কথামতো মা আর মামা বিকেলের পরই মেয়ে পাঠাবার ব্যবস্থা করেছিলেন। শাশুড়ি বরণ করে ঘরে ঢুকিয়ে প্লেটে দুটো দানাদার আর ত্রিভূজ নিমকি খেতে দিয়েছিলেন। যে-কোনো খাবারই খুব তৃপ্তি করে খায় মন্দিরা। গুঁড়োও ফেলে না। সেদিন নিমকি বারবার দাঁতে আটকে যাচ্ছিল। ইচ্ছে করছিল দাঁতগুলো চিরে ঢুকে-পড়া নিমকি বার করতে। এত সোয়াদ তখন কমলাপুরের নিমকির। শাশুড়ি চিৎকার করে উঠেছিলেন — ও বড়ো বউমা। নতুন বউয়ের নিমকির প্লেট আর কোথাও রাখার জায়গা পেলে না তুমি? জানলার ধারের টেবিলে রেখেছ! বর্ষাকাল। ঝিলের বাতাসে সব মিইয়ে গেছে। বড়ো বউ যমুনা  ঘরে ঢুকে সরি-সরি বলল বটে! তবে নতুন নিমকি আনল না। 

প্লেট রেখে মন্দিরা তখন জানলার শিকে নাক ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পেছন থেকে একটা হাত এসে গলা জড়িয়ে ধরেছিল। জিভে জোর ছ্যাঁকা।

একেবারে পুড়ে যাবার জোগাড়। নতুন বউয়ের মুখের মধ্যে গরম নিমকি পুরে দিয়েছে যতীন। অতবড়ো নিমকি মুখে নিয়ে যখন হাঁসফাঁস করছে, দুবছরের বড়ো ভাসুরটা হাতে আরও দুটো গুঁজে দিয়ে বলেছিল — ফাউ দুটো ফাউ। আমি তোমার বরের থেকে পাক্কা দু-বছরের বড়ো তো। তাই দুটো ফাউ। ধরে নাও –ফাউ দুটোর নাম রাধা-কৃষ্ণ। 

হাঁ হয়ে সুশোভনকে দেখেছিল মন্দিরা। তার বরের দাদা এত সুন্দর! এতো নতুন বরের থেকেও বাচ্চা। সেই প্রথম সুশোভনকে ভাসুর হিসেবে মানতে নারাজ হল ভাদ্দর বউ। সুশোভন, শোভনদা হল। যতীন আটটা নাগাদ অফিস বেরিয়ে পড়ত। মন্দিরার কলেজে প্রথম ক্লাস বেলা এগারোটায়। মনীন্দ্র কলেজে সবে জুনিয়র লেকচারার হিসেবে জয়েন করেছে। দশটা নাগাদ সুশোভন তাকে ব্রিজের ওপর থেকে বাসে তুলে দিত। লোক তোলার জন্য বাসটা আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকত। যখন ছাড়ত, মন্দিরা দেখত, তার তিন জলবরের মাঝে স্থল-ভাসুর কোথায় হারিয়ে গেছে! কখনও আবার এমন হত…সুশোভন আগে থেকে দক্ষিণেশ্বর স্টপে দাঁড়িয়ে থাকত। ঠিক দশ মিনিট বাদে মন্দিরা। ঘোমটা টেনে হাতটি ছুঁয়ে এদিক-ওদিক হাঁটা। পঞ্চবটি তলে বাদাম ভাঙা। ফেরার পথে রাস্তায় উবু হয়ে বসে ঠাকুরের ফ্রেমওয়ালা ছবি কিংবা রঙিন  কাঠের রান্নাবাটি কেনা। এমনটি ঠিক কতবার গিয়েছিল তারা? কে কেমন করে বন্ধ করল যাওয়াটা! 

ঘাড় ঘুরিয়ে পুরোনো ঘর ভালো করে দেখল মন্দিরা। বাঁদিকের দেওয়ালে ঠাকুরের ছবিটা সন্ধেবেলায় ছায়াময়।

— দিদি। মেজদা ডাকে তোমায়। শোনো নাই?

পামেলার গলা গম্ভীর। সুইচটা কী জোর জ্বালাল! 

মন্দিরা চেঁচালে — কতদিন বারণ করেছি, সুইচ খটখট করবি না। খারাপ হোক একবার। মাইনে থেকে কাটব।

— খটখট করি নাই। সময়ও নাই। আলো জ্বালাইছি। অন্যের জ্বালানো পছন্দ না হলে নিজে জ্বালিয়ে নিও।

এঁটো বাসনে কল ছেড়ে দিয়েছে পামেলা। 

কী হল মেয়েটার? এত কম শব্দ তার স্টাইলের সঙ্গে যায়ই না।

— এই পামেলা, কী হয়েছে রে তোর?

— মন্দিরা। একটু এসো প্লিজ। সুশোভনের আর্তনাদ।

ছিপছিপে মানুষটা পেছন উল্টে শুয়ে আছে। পাজামা খুলে লুঙ্গিই বা পরছে কবে থেকে? তিনমাসে এত পরিবর্তন! কিন্তু লুঙ্গি পরেও শান্তি নেই কেন? ছটফট করছে। মাথার কাছে গরম চায়ের কাপ। মা করেনি দেখে নির্ঘাত মনসা বানিয়েছে। জেঠুর কাজে মায়ের পর নিজের ওপর নির্ভর করে মনসা। 

আলতো করে ঠেলা দিল মন্দিরা –কী হল তোমার? 

কোথাও কেটে গেছে নাকি? 

সুশোভন বিচ্ছিরিভাবে পেছনটা  ফাঁক করছে আর বন্ধ করছে। যন্ত্রণায় আঁ-আঁ করতে হাতের ইশারায় চায়ের কাপটা দেখাল।

চায়ের কাপ এগিয়ে দিল মন্দিরা।

— আরে না না। পাছায়… পাছায়।

মন্দিরা হাঁ হয়ে গেল। এ কী নোংরাভাবে কথা বলছে সুশোভন! এরকম শব্দ তো কখনো বলে না। হিপে ব্যাথা করছে তো হিপ বললেই পারে।

— আহ! মুখে নয়, পাছার ওপর চায়ের কাপটা বসাও তো। গরম ভাপে ব্যাথা কমবে। 

কাপশুদ্ধ মনসার হাতটা জোর করে টানতে লেগেছে সুশোভন। অস্ফুট ধ্বনি দিয়ে হাত ছাড়াবার চেষ্টা করল মনসা। 

— আরে! লজ্জা পাচ্ছ কেন? আর ছাগলের মতো আওয়াজ মারছ কেন? জেঠুর জুভেনাইল ফিস্টুলা, তুমি জানো না?  না জানলে এখন জানো। গরম জল করে এনেছি। তোয়ালে ভিজিয়ে সেঁক দাও।

বলতে বলতে গরম জলের গামলা, গামছা আর একটা মলম রাখল মনসা।

— আমি পারব না।

মনসা তীব্র চোখে তাকিয়ে আছে। 

নিজেকে দ্রুত শুধরে নিল  — মনসা, ও মনসা, বলছি কি…পারব না বলাটা ভুল হয়েছে আমার। কিন্তু… কিন্তু সত্যিই আমি এসব কখনও দেখিনি রে মনসা…

শিবের মেয়ে ঠিক করেছে, চোখ নামাবে না। ধীর স্বরে বলল — দেখোনি নাকি তোমার চারনম্বর ঝিলবরের পাছায় ঘা বাঁধতে পারে এটা ভাবোনি?

ঠাস।

দেখেছ! মায়ের হাতে চড়ে লুটিয়ে পড়েও ঠ্যাং নাচাচ্ছে! বসে বসেই কমেন্ট্রি দিতে লাগল মনসা — এবার ভাবো মাগো। এবার অন্তত ভাবো। জেঠুকে বিয়ে করতে দাওনি। আধখানা সম্পক্কে বেঁধে রেখেছ কেন, আমি বুঝিনি ভেবেছ? জেঠুকে দিয়ে আমায় মানুষ করিয়ে নিয়েছ। এখন তার বিচ্ছিরি রোগটা ভাবো। রোগের বিচ্ছিরি নামটা কুড়িবার ভাবো। আর ওই পোঙা-নাড়ানো — পোঙা-ফাঁক করে লাফানো ওটা অন্তত একশোবার ভাবো।

মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে মন্দিরা। এত বদ কবে হলি রে মনসা! ক্লাস টেন হচ্ছে তোর, তাই না? তাই জেঠুকে সাপোর্ট দেওয়ার নামে মাকে এমনভাবে এম্বারাস করে যাচ্ছিস? 

রোগটার কথা মনসা যদি আগেই ফোনে জানাত, এতদিনে একটা নার্সও আরেঞ্জ করে ফেলতে পারত। শোভনও  এতটা কষ্ট পেত না। মনসা কি মায়ের মন টের পেয়েই আরও লজ্জা দিতে শুরু করল। দ্যাখো কেমন হাসতে হাসতে বলছে — মা। নো মা। নো। আয়া-সিস্টার নয়। জন্মের পর বাবার রোগ বাড়ল। অপয়া ভেবে খাট থেকে বাবা আমায় ছুঁড়ে দিল সোফায়। মাথাটা পটল হল। প্রদীপ জ্বেলে সেঁক দিতে দিতে জেঠু বলল– বাবা মেরেছে তো কী হয়েছে! তু্ই আমার মনসা। বাবা মরে গেল। তেরো দিন বাদে কলেজ গেলে তুমি। ইজেরে হাগু করে দিলাম। জেঠু ছুঁচু করে দিল। ডেটল দিয়ে ইজের কেচে দিল। সব জেঠু নিজের হাতে করেছে মা।

মেঝে ছেড়ে উঠছে। গরম গামছাটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল –মাগো! এবার তুমি ভাবো, নিজের বাচ্চার পোঙার ক্ষত সারাচ্ছ! 

সুশোভন উঠে হাত বাড়িয়েছে। বুকে ঝাঁপ দিয়ে ডুকরে উঠল মেয়ে — ও জেঠু, যমুনা জেঠি খালি ভয় দেখায় গো আমায়। বাবার যখন শরীর ভর্তি ক্যান্সার তখন নাকি আমি জন্মেছি! ওই শয়তান যমুনা বলে, এমন অবস্থায় বাচ্চা হলে রোগ নাকি বাচ্চাতেও যায়? তাই জেঠু? 

এতক্ষণ বাদে রাগ দেখাবার সামান্য সুযোগ পেল মন্দিরা  — তোমার যমুনা জেঠি কি ডাক্তার? এসব বলে ভয় দেখায়!

ঝগড়ার ফের চান্স পেয়ে গেছে মনসাও —

আর তুমি? বাবা? তোমরাও তো ডাক্তার নও। কেন এমন  নিশ্চিন্ত হয়ে আমায় জন্ম দিলে? কেন বাবাকে মাঝপথে থামালে না? এসব তো বউদেরই জানতে হয়, বলো জেঠু? আমার ক্লাসমেটরা তো বলে… ডেট মেইনটেইন করলে…

ভাগ্যিস সুশোভন মনসার মাথাটা বগলে ঢুকিয়ে নিয়েছিল! দ্বিতীয় মার থেকে বেঁচে গেল ঝগড়াটিটা।

নটা নাগাদ পামেলা এসে বলল — যমুনাকাকিকে বলেছি দিদি। আজ আলীর কাছে যাব না। রাতে তোমার ঘরে শোবো । 

মনসা চোখ বুজে শুয়েছিল। ক্লান্ত গলায় বলল — আলী এতদিন মারেনি কেন? এখনই বা মারল কেন?

প্রথম কথার উত্তরে ভেংচি কাটল পামেলা।

দ্বিতীয় কথার উত্তর দিল — তিননম্বর ঝিলে একটা হাঁস ছেড়েছি গো। খাবারদাবার সব আমি দেব। তাও আলী বলবে–ভোটের আগে পাবলিক প্রপার্টিতে পার্সোনাল জীব চরিয়ে সুখ করবি না। শুনিনি। তাই মেরে মেরে থোবড়া পাল্টে দিল। তবে দিদি, আমন চাচা এবার আমার ফরে। আলীকে হেবি ঝাড় দিয়েছে। আর আমায় বলেছে — তু্ই বিটি এবার থে হাঁসের পিঠে ঘুরবি। আলী গাল দিলে, আমি ঠ্যাং ভেঙে দিব। 

মন্দিরা বুকের কাপড় আলগা করল — এখন আর মেলা বকিস না। আমি একটু রেস্ট করি। কাল মনে করে চাচার জন্যে পায়েস নিয়ে যাস। বলবি, তার ফর্মুলা অনুযায়ী বানাব বলেই, চালের বদলে  আজ সুজির পায়েস করেছি। খেয়ে যেন বলে কেমন হয়েছে! যদি পরীক্ষায় ফিফটি পার্সেন্ট নম্বর পাই, তাহলে চাচার হজের টাকার ফিফটি পার্সেন্ট কেটে নেব। 

— ইই। যমুনা কাকি গো, পিকনিক হবে গো। তোমায় সেদিন সারাদিন চা খাওয়াব যমুনাবতী।

বলতে বলতে একতলা -দোতলা করছে পামেলা। 

গভীর রাতে সুশোভনের বিছানায় উঠে মন্দিরা বলল — ডানপাটা আমার কোমরের ওপর তুলে দাও দিকি। না না দাঁড়াও। কোমরের ওপর পাশবালিশটা চাপাই আগে। নাও –এবার পা তুলে দাও। ঘায়ের জায়গাটায় হাওয়া লাগছে তো এবার….? ফাঁক করেই রাখো…..। 

সুশোভনের ব্যাথা কমছে। মন্দিরার কথার উত্তর দিতে এত লজ্জা করছে! 

ইস। দরজা হাট করে খাটে এসে শুয়ে পড়ল মন্দিরা! আর কেউ না দেখুক, যমুনাবউদি দেখছেই। 

— মন্দিরা। মন্দিরা শোনো না… বলছি মনসাকেও ডাকো না! রোজ তো আমার কাছেই শোয়! 

মন্দিরার গা ঝাঁকিয়েই যাচ্ছে সুশোভন। মন্দিরাকে দ্যাখো! ওপাশ ফিরে এরই মধ্যে নাক ডাকতে শুরু করেছে। একবার মনে হল, জাগিয়ে দেয়। জিজ্ঞেস করে, রোজকার মতো রামকৃষ্ণের ফটোয় প্রণাম করেছে কিনা! ধুর। ঘুমন্ত মানুষের পাশে বেশিক্ষণ জাগা খুব মুশকিল। স্বপ্নে এখন পঞ্চম ঝিলবর। পামেলার সেই হাঁসটা গো। আলীর সেই পার্সোনাল সুখজীব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *