novel-aagun-paakhi

আগুন পাখি

দীপান্বিতা রায়

সাল ২০১০

 পর্দা নেমে এল। প্রেক্ষাগৃহের ভিতরে আলো জ্বলে উঠেছে। পর্দার পিছনে মঞ্চ তখন জড় হচ্ছে সবাই। রাধাদা আলাদা দাঁড়ালেন একপাশে। বাকিরা এক লাইনে সার দিয়ে দাঁড়িয়েছে। পর্দা উঠে যেতে মঞ্চের আলো ঝলমল করে উঠল। স্টেজের ওপরে অভিনেতারা সবাই হাতজোড় করে নমস্কার করতেই প্রতিদিনের মতো হাততালির ঝড়। পরের দিনের শো-এর কথা ঘোষণা করে শুভরাত্রি জানিয়ে দিলেন রাধাদা। পর্দাটা নামতে শুরু করতে ভিতরে একটা হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। তাড়াতাড়ি মেক-আপ তুলে, জিনিসপত্র গুছিয়ে রওনা দিতে হবে। জিনিসপত্র গোছানোর কাজটা অবশ্য রুচিরাকে করতে হয় না। যদিও দলে সে নতুন কিন্তু বয়সটা যেহেতু অনেকটাই বেশি তাই কেউ কিছু মনে করে না। তবে এক্সারসাইজে কোনও ছাড় নেই। মহড়ার আগে প্রতিদিন সবাইকে এক্সাসারসাইজ করতে হয়। অন্তত আধঘন্টা। প্রথমদিকে অসুবিধা হত। শরীরটা একধরনের আরামে অভ্যস্ত হয়ে গেছিল। এখন আর হয় না। বরং ভালোই লাগে। বাড়িতেও সকালে খানিকক্ষণ হাঁটা আর ফ্রি-হ্যান্ড ব্যায়াম চালু করেছে। খুব বেশিক্ষণ নয়। চল্লিশ মিনিট বড়জোর। তাতেই শরীরটা বেশ ঝরঝরে হয়ে যায়।

মেয়েদের গ্রিনরুমে ঢুকে রুচিরা দেখল সোমজা, ঋতু এরমধ্যেই পোশাক বদলে নিয়েছে। ওরা অবশ্য শেষদুটো দৃশ্যে থাকে না। মণীষা মেক-আপ তুলছে। টেবিলের একপাশে একটা ট্রে-তে অনেকগুলো রোল রাখা আছে। রুচিরাকে দেখেই ঋতু বলল, এগ রোল রুচিদি। রাধাদা আনিয়েছেন। গরম আছে এখনও। খেয়ে নাও। আমি পল্টুকে বলেছি চা দিয়ে যেতে।

অভিনয় যতক্ষণ চলে ততক্ষণ খিদে-তেষ্টার কোনও বোধ থাকে না। কিন্তু স্টেজ থেকে নেমে এসেছে প্রায় মিনিট পনেরো হল। পেটের ভিতরে চাহিদাগুলো জানান দিচ্ছে।

দাঁড়া আগে জামাটা বদলে নিই…

ঋতুকে কথাটা বলে তাড়াহুড়ো করে চেঞ্জিংরুমে ঢুকলে রুচিরা। এই মঞ্চটা নতুন। এখানে গ্রিনরুমের সঙ্গে আলাদা দুটো চেঞ্জিংরুম আছে। নাহলে বাথরুমে জামা-কাপড় বদলাতে বড্ড অসুবিধা হয়। আগে অবশ্য এসবের বালাই ছিল না। তখন কি খুব অসুবিধা হত? প্রশ্নটা হালকাভাবে একবার মাথার ভিতরে খেলে গেল রুচিরার। বাইরে চলাফেরার জন্য আজকাল পাজামা আর কুর্তাই পরে। ঢিলে পাজামা। পায়ের দিকটায় যদি ইলাস্টিক দেওয়া থাকে তাহলেও মন্দ হয় না। বেশ একটা অন্যরকম স্টাইল। সঙ্গে একটু লম্বা কুর্তা। চটির পাট তুলে দিয়েছে। ওই গোবদা-নরম জুতোতেই হাঁটা-চলার সুবিধা হয়।

সোমজা আর মণীষা নতুন কী একটা সিরিয়াল নিয়ে বকবক করছে। মেক-আপ তুলতে তুলতে হালকা কানে আসছিল রুচিরার। অন্যরাও টুকটাক মন্তব্য করছে। রুচিরা খুব একটা টেলিভিশন দেখে না। সিরিয়াল তো একেবারেই নয়। তাই শুনছিল চুপ করে। রোলটা ভালো ছিল। এককাপ চা দিয়ে খেয়ে পেটটা ভরে গেছে। এবার একটু তাড়াতাড়ি হাত চালাতে হবে। এখান থেকে বেরিয়ে অটো ধরে পাটুলিতে তার বাড়ি পৌঁছতে আরও আধঘণ্টা। নটার পর থেকে অটোর সংখ্যা কমতে থাকে। বাস অবশ্য থাকে। ততক্ষণে বেশ খানিকটা ফাঁকাও হয়ে যায়। কিন্তু বাসে উঠতে এখনও কেমন যেন ইচ্ছে করে না রুচির। বেশ কয়েকটা বছর তো কেটে গেল। তবুও যেন মনের আড় ভাঙেনি। অটোও ইচ্ছে করে না। বাসস্ট্যান্ডে এসে দাঁড়ালেই একটা ট্যাক্সি ধরে নিতে মন চায়। কিন্তু সেই ইচ্ছেকে যে সবসময় প্রশ্রয় দেওয়া যায় না, সেটা তার থেকে বেশি আর কে জানে। রোজ দুবেলা কলেজ যাওয়া-আসা তো বাসেই করতে হয়।

ফ্ল্যাটটা বড় রাস্তা থেকে বেশি দূরে নয়। অটো থেকে নেমে ওটুকু পথ হেঁটেই আসে। সবজির দোকানটা খোলা আছে এখনও। বাড়িতে কলা শেষ হয়ে গেছে মনে পড়ায়, কলা কিনল। সকালে কর্নফ্লেক্সের সঙ্গে কলা না থাকলে অসুবিধা হয়। অনেকদিনের অভ্যাস। ব্রেকফাস্টে এক গ্লাস ফ্রেশ ফ্রুট জুসের অভ্যাস ছিল দীর্ঘদিন। শরীরও সেটাকে মানিয়ে নিয়েছিল। তার বদলে একটা পাকাকলা দিয়ে ব্যাপারটা ম্যানেজ করতে হয়। প্রথমদিকে একটু অসুবিধা হত। এখন শরীরও তার মনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিয়েছে। লোকটার কাছ থেকে উচ্ছে, বেগুন আরও দু-একটা সবজিও কিনে নিল। কালও সন্ধের পর রিহার্সাল রয়েছে। ফেরার সময় হয়তো বাজার করার সময় হবে না। সবজি কিছু ফ্রিজে থাকলে পারুল ম্যানেজ করে নেবে। মেয়েটার বুদ্ধি আছে। এই কয়েক বছরেই রুচিরার সঙ্গে দিব্যি একটা বোঝাপড়া হয়ে গেছে। বাজার না থাকলেও ডিম-পোস্ত যা কিছু দিয়ে দু-এক পদ রেঁধে রাখে। নিতান্ত দায়ে না পড়লে রুচিরাকে তাগাদা দেয় না।

হরিদাস নিজের ঘরের সামনে একটা টুল পেতে বসে এফএম শুনছিল। ওর বউ বোধহয় রান্না করছে ঘরে। হিং-এর চমৎকার গন্ধ আসছে। ঠাকুমা হিং দিয়ে ভারী সুন্দর কলাইয়ের ডাল রাঁধত। রুচিরা আর ওর বাবা দুজনেরই খুব পছন্দ ছিল। গরমের দিনে কলাইয়ের ডাল আর আলুপোস্ত। হরি একবার চোখ তুলে দেখে নিল রুচিরাকে। সবাই ফিরে এলে ও গেট বন্ধ করবে। বনপলাশী আবাসনটা ছোট। দুটো টাওয়ারের একেকটাতে বারোটা করে ফ্ল্যাট। ডানদিকের একদম টপ ফ্লোরে থাকে রুচিরা। ছাদের ফ্ল্যাটে গরম একটু বেশি হয়। তবে ভাড়াটাও সেজন্য কম। তাছাড়া ছাদটা কাছে। রুচিরার কাছে সেটা একটা ভীষণ মুক্তি।

দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে মনটা ভালো হয়ে গেল। পারুল রান্না করে যাওয়ার সময় অভ্যাসমতো একটা ধূপ জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে। গোটা ঘরটা সুগন্ধে ভরে আছে। এই সুগন্ধের ব্যাপারটা নিয়ে রুচিরা বড্ড খুঁতখুঁতে। যে দু-একটা জিনিসের সঙ্গে হাজার চেষ্টা করেও মানিয়ে চলতে পারে না, তারমধ্যে একটা হল বদগন্ধ। গায়ে দুর্গন্ধ আছে এমন লোকের সঙ্গে কথা বলা তার পোষায় না। ঘরে, বাথরুমে, রান্নাঘরে হালকা সুগন্ধি স্প্রে করে রাখে। দামী পারফিউম এখন আর ব্যবহার করে না। কিন্তু বাড়তি খরচ হচ্ছে বুঝেও নানারকম ডিও কেনার অভ্যাসটা ছাড়তে পারেনি।

পারুল ক্যাসারোলেতে খাবার গুছিয়ে টেবিলে রেখে গেছে। বসার ঘরের জানলাগুলো খুলে ব্যালকনির দরজাটাও খুলে দিল রুচিরা। বাতাসে একঝলক শিরিষ ফুলের গন্ধ ভেসে এল। এদিকটায় খানিকটা পোড়ো জমি আছে। তাতে পরপর অনেকগুলো শিরিষ ফুলের গাছ। সেটা দেখেই ফ্ল্যাটটা পছন্দ হয়েছিল। অয়নিকা বলেছিল, এটা কিন্তু পূবদিক রুচিদি। হাওয়া পাবে না। ওপরের ফ্ল্যাট তো এমনিতেই গরম হবে….

ঠিক আছে। ছেড়ে দে। অত বাছলে আর পছন্দই করতে পারব না। ভাড়াটাও তো সেজন্য কম। সবদিকই ভাবতে হবে তো। তাছাড়া বেডরুমের জানলাগুলো দক্ষিণমুখো। ওদিকটাও মোটামুটি ফাঁকা। হাওয়া-বাতাস পাব। আর খুঁজে দরকার নেই। এটাই ফাইনাল করে ফেলি।

ঠিক আছে। চলো তাহলে রাতে কথা বলি। এমনিতে সত্যিই সুবিধা। মালিক এখানে থাকে না। এনআরআই। মাসে মাসে টাকা পেলেই আর কোনও ঝামেলা করবে না। ঘাড়ের ওপর বাড়িওলা থাকার অনেক ঝামেলা গো।

ফ্ল্যাটটা ভদ্রলোকে এখানে কিনেছিলেন কী জন্য রে?

আরে অসীমদার এখানে দুটো ফ্ল্যাট আছে। দোতলার ফ্ল্যাটে ওর মা থাকতেন আর ওপরেরটা ওঁদের নিজেদের। মায়ের দেখাশোনার জন্যই এভাবে কেনা হয়েছিল। তারপর তো হঠাৎ করে বিদেশে অফার পেয়ে চলে গেল। মাসীমা এখানেই ছিলেন। ওরা বছরে এক-দুবার এসে এখানেই উঠতো। পরে অসীমদা রাজারহাটে একটা বড় ফ্ল্যাটও কিনেছে। বউদি আর বাচ্চারা এলে ওখানে থাকত। মাসীমা মারা যাওয়ার পর এখানে আসার পাট চুকলো। আপাতত ভাড়া দিয়েছে। আমার ধারণা পরে বিক্রিই করে দেবে। তুমি থেকে যাও। তেমন বুঝলে সস্তায় কিনে নিতে পারবে।

কেনার কথা অবশ্য এখন মাথাতেও নেই রুচিরার। আপাতত একটা ভদ্রগোছের থাকার ঠাঁই হয়েছে সেটাই যথেষ্ট। অসীমবাবু অয়নিকার কীরকম যেন দূরসম্পর্কের জামাইবাবু হয়। ওই বদ্যিদের যেমন সবার সঙ্গেই আত্মীয়তা থাকে অনেকটা সেরকমই। তবে সুবিধা যেটা হয়েছে সেটা হল ভদ্রলোক ফার্নশিড্ ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়েছেন। তাই রুচিরাকে খুব সামান্য জিনিসই কিনতে হয়েছে। আর ভাড়াটাও তুলনায় কমই। এর থেকে বেশি হলে তার বাজেটে কুলোতো না। কলেজের চাকরির মাইনে এখন খারাপ নয়। কিন্তু তাহলেও বাড়ি ভাড়া দিয়ে, কাজের লোক রেখে সংসার চালাতে অনেকটা টাকাই বেরিয়ে যায়। বয়স হয়েছে। ওষুধ-বিষুধের খরচ ক্রমশ বাড়ছে। তাছাড়া পেনশন থাকলেও নিজের জন্য সংস্থানও তো কিছু রাখতে হবে।

পারুল ডিমের ডালনা, আল-পটলের তরকারি আর মুসুর ডাল করে রেখে গেছে। খাওয়ার সময় একটু স্যালাড কেটে নিতে হবে। ফ্রেশ স্যালাড ছাড়া কেমন যেন ঠিক করে খাওয়া হল না মনে হয় রুচিরার। গরম পড়ে গেছে। এমনিতেও দিনে অন্তত দুবার স্নান না করলে অস্বস্তি হয় তার। বাইরের জামা-কাপড় বদলে স্নানে ঢুকে, হালকা গরম জলে অডিকোলন মিশিয়ে গায়ে ঢালতেই শরীর যেন জুড়িয়ে গেল। স্নান সারতে সারতেই মনে হল শো-শেষ করে বেরিয়ে আসার পর এতক্ষণেও কোনও ফোন আসেনি তো ! অবশ্য ফোন করার মতো কজনই বা আছে। তাও স্নান সেরে গায়ে পাউডার দিয়ে ঘরে এসে আগে ফোনটা বার করল ব্যাগ থেকে। এদিক-ওদিক ফোন ফেলে রাখার অভ্যাস আছে বলে যন্ত্রটা ব্যাগেই রাখে। কিন্তু শো-এর আগে সাইলেন্ট করেছিল। তারপর ভুলে গেছে। তাড়াতাড়ি ফোনটা হাতে নিয়ে খুলতেই জোর চমক লাগল একটা। গোটা বারো মিসড্ কল। তারমধ্যে চারটে অয়নিকার। এছাড়া ওর কলেজের আরও তিনজন কলিগ ফোন করেছেন। ঋতু ফোন করেছে। রাণাদা ফোন করেছেন। সবথেকে আশ্চর্যের ব্যাপার হল অতনু সরকারের দুটো মিসড্ কল। ব্যাপারটা কী ! একটু ঘাবড়ে গিয়ে প্রথম ফোনটা অয়নিকাকেই করল রুচিরা। আর ফোন ধরেই উচ্ছ্বাসে একেবারে ফেটে পড়ল অয়নিকা, কনগ্র্যাচুলেশন রুচিদি, কনগ্র্যাচুলেশন, অনেক অনেক অভিনন্দন, কী যে আনন্দ হচ্ছে আমার…

কথাগুলো কিছুই মাথায় ঢুকছিল না রুচিরার। তাই নার্ভাস হয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল,

কী বলছিস পাগলের মতো! কীজন্য কনগ্র্যাচুলেশন? কী হয়েছে বলবি তো…..

সে কি তুমি খবর পাওনি এখনও! টিভি দেখোনি? আরে বাবা হাতের ফোনটাও তো দেখতে পারো, নিশ্চয় অনেক মেসেজ এসেছে।

অয়নিকা প্লিজ, কী হয়েছে বল, আমি সত্যি কিছু জানি না।

বলছি বলছি…অতনু সরকারের মেঘলা দিনের আলো ছবির জন্য তুমি বেস্ট অ্যাক্ট্রেস পুরস্কার পাচ্ছ, ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড বুঝতে পারছ, জাতীয় পুরস্কার, অতনু সরকারের ছবি এই প্রথম পুরস্কার পেল।

হড়বড় করে আরও অনেক কিছু বলে যাচ্ছে অয়নিকা। রুচিরা বুঝতে পারছে সবটা তার কানে ঢুকছে না। পাদুটো কাঁপছে। এখনই বসে পড়া দরকার। ফোনটা হাতে নিয়ে সোফার হাতলটা ধরে ধীরে ধীরে নিজের শরীরটাকে ছেড়ে দিল রুচিরা। হাসি, আনন্দ, উচ্ছ্বাস কিছুই কাজ করছে না তার ভিতরে। শুধু মনে হচ্ছে যেন একটা বাষ্প উঠে আসছে। হৃদয়ের একেবারে অন্তঃস্থল থেকে উঠে এসে একটু একটু করে ছড়িয়ে যাচ্ছে শরীরময়, তার একান্ত নিজস্ব শরীরী সুগন্ধি মেশানো বাষ্প ঘিরে ফেলছে তাকে, ডুবিয়ে দিচ্ছে একটু একটু করে।  




১৯৭২

ফড়িয়াপুকুরের বাড়িতে ওদের বৈঠকখানার সঙ্গে লাগোয়া বারান্দাটা দক্ষিণমুখী। গরমের দিনে ভারী আরামের। ওপাশটায় তেমন উঁচু বাড়ি খুব একটা নেই। তাই হাওয়া আসে ফুরফুর করে। অফিস থেকে ফিরে জামা-কাপড় বদলে বাবা রোজকার মতো বারান্দাতেই বসেছিলেন। হারুদাকে চা করতে বলে মা চিঁড়ে ভাজছে। হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা হয়ে গেছে। রেজাল্ট বেরোতে এখনও দেরি আছে। অখণ্ড অবসরকে কাজে লাগাতে নিজের ঘরে বিছানার ওপর উপুড় হয়ে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক উপন্যাস গিলছিল রুচিরা। মন যখন তুঙ্গভদ্রার স্রোতে ভেসে যাচ্ছে, তখনই হুড়মুড় করে সিঁড়ি দিয়ে উঠে এল পল্টুদা আর মানসদা। তাদের পাড়ার মিলনসংঘ ক্লাবের দুই পাণ্ডা। সোজা বারান্দায় গিয়ে বাবার সামনে মোড়া টেনে বসে পড়ে বলল, মেসোমশাই আর্জি পেশ করতে চলে এলাম।

বাবা অভ্যাসমতো মুচকি হেসে বললেন, ঠিক আছে সে নাহয় শুনবো, কিন্তু চা খাবে তো?

হ্যাঁ নিশ্চয়।

রান্নাঘরে হারুদা নিশ্চিত ততক্ষণে কেটলিতে আরও দু-কাপ জল ঢেলে দিয়েছে। ছোট বাটিতে চিঁড়ে ভাজা নিয়ে এসে মা বললেন, চা আসছে। আগে এটা খাও আর খবর কী বলো। আজকাল তো দেখাই পাওয়া যায় না। নতুন চাকরি পেয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছো দেখছি।

পল্টুদা কিছুদিন হল রাজ্যসরকারি কর্মী। মানসদা স্কুলে পড়াচ্ছে। নিজের ঘর থেকে সবই শুনতে পাচ্ছিল রুচি। কিন্তু তুঙ্গভদ্রা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করছিল না।

মাসিমা এবার পঁচিশে বৈশাখে ক্লাবে রক্তকরবী হবে ঠিক হয়েছে। রুচিকে আমাদের লাগবে। ওকে দিয়েই নন্দিনী করাবো ভেবেছি আমরা।

নিজের নাম শুনে রুচিরা ততক্ষণে দুই লাফে বারান্দায়। হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা দিয়ে দেওয়ার পর থেকে বাড়িতে ফ্রক পরাও বন্ধ হয়েছে। ঠাকুমা চেঁচাচ্ছিল অনেকদিন ধরেই। এমন ধিঙ্গি লম্বা মেয়েকে নাকি ফ্রকে মানায় না মোটেই। মায়ের জেদের কাছে অবশ্য বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি। তবে পরীক্ষার পর মা নিজেই বেশ কয়েকটা ধনেখালি ডুরে আর ছাপা শাড়ি এনে দিয়ে বলল, রুচি এবার থেকে ছাপাগুলো ঘরে পরিস। বাইরের জন্য ডুরেগুলো তোলা থাক। কলেজে ভর্তি হলে লাগবে।

কিন্তু রুচি তো নাটক করতে পারে না। কখনও করেনি। ওতো প্রতিবছর গানই করে।

কিচ্ছু চিন্তা করবেন না মেসোমশাই। আমরা শিখিয়ে নেব। আসলে নন্দিনী যে হবে তাকে তো গানও করতে হবে। সেজন্য সব দেখে-শুনে আমাদের মনে হল রুচিই হচ্ছে আইডিয়াল।

তাছাড়া রুচির তো পরীক্ষাও হয়ে গেছে। এখন রিহার্সাল দিতেও কোনও অসুবিধা নেই।

পল্টুদার কথায় মাথা নাড়লেন বাবা, না তা নেই। তবে আমার ভয় হচ্ছে লোক হাসানো যেন না হয়। মিলন সংঘ ক্লাবের প্রোগ্রামের নাম আছে। আশপাশের পাড়া থেকে লোকে দেখতে আসে।

কিচ্ছু চিন্তা করবেন না মেসোমশাই। নাটক শেখাতে আসছেন রাধারমণ তপাদার। দীর্ঘদিন গণনাট্য সংঘে নাটক করেছেন।

বাবা যে মোটামুটি নিমরাজি হয়েছেন আন্দাজ করে এবার সাহস বাড়ে রুচিরার,

বিশু পাগল কে করবে পল্টুদা?

ও বাবা! তোর কি রক্তকরবী পড়া আছে নাকি! তাহলে তো ভালই। বিশু করার কথা বিহানের। আমাদের অফিসের এক কলিগের দূরসম্পর্কের ভাই। প্রেসিডেন্সিতে পড়ে। ভালো ছাত্র। আবার এদিকে নাটক পাগল ছেলে। দারুণ অভিনয় করে। রাধারমণদাদের গ্রুপে নাটক করে নিয়মিত। রাধারমণদাকে তো ওই যোগাড় করে দিল। নাহলে আমাদের সাহস হত নাকি গিয়ে বলার। যাক্ গে শোন রোববার থেকেই কিন্তু রিহার্সাল শুরু হয়ে যাবে। ক্লাবঘরেই হবে। তুই চারটের মধ্যে চলে যাস। আর শোন্, গলা ঠিক থাকে যেন, এরমধ্যে আবার সর্দি-কাশি বাঁধাস না। হাতে সময় কিন্তু বেশি নেই।

চা আর চিঁড়েভাজা খেয়ে পল্টুদারা চলে যাওয়ার পর বাবার সঙ্গে মায়ের খানিক তক্কাতক্কি হল। মেয়ে নাটক করুক এটা মায়ের খুব একটা ইচ্ছা নয়। ঠাকুমাও মায়ের দলে। কিন্তু বাবার বক্তব্য হচ্ছে ছেলেগুলো আশা করে এসেছে। ওদের ফেরানোটা ঠিক হবে না। তাছাড়া পাড়ার মধ্যেই তো হচ্ছে। বাইরে কোথাও যেতে হবে না। দুদিন বাদে যে মেয়ে কলেজে পড়তে যাবে তার পায়ে অত বেড়ি পরানো কিছু ভালো কথা নয়।

রুচিরার ইচ্ছে ছিল খুব। গান সে ছোটবেলা থেকে শিখেছে। স্টেজে গান গাইতে কোনও অসুবিধা হয় না। কিন্তু নাটক তো কখনও করেনি। বাড়িতে রবীন্দ্র রচনাবলি আছে। আগে পড়েছিল। তাও আবার রক্তকরবী নাটকটা পড়ে নিল বারদুয়েক। খুব একটা কিছু বোঝেনি যদিও। এবিষয়ে তাকে সাহায্য করার মতো লোক বাড়িতে নেই। মা-ঠাকুমা দুজনেরই গল্পের বই পড়ার অভ্যাস থাকলেও তাঁদের দৌড় শরৎচন্দ্র পর্যন্ত। আর বাবা তো সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। সারাক্ষণ বালি, সিমেন্ট, ইঁট-কাঠ নিয়ে ব্যস্ত। রুচিরা নিজেও বিজ্ঞানের ছাত্রী। কেমিস্ট্রি অনার্স নিয়ে পড়ার ইচ্ছা। সাহিত্যে যে খুব একটা আগ্রহ আছে তা নয়। কিন্তু তাহলেও রক্তকরবী নাটকটা যে বেশ অন্যরকম বুঝতে তার অসুবিধা হয়নি। আর সেজন্যই সম্ভবত আগ্রহটা বেড়েছে।

পাড়ার ক্লাবে রিহার্সাল। তাই সাজগোজের কিছু নেই। তবু বয়সের অভ্যাসে পরিপাটি করে দুবেণী বাঁধল। লাল-হলুদ-সবুজ খড়কে ডুরে শাড়ি। কপালে ছোট টিপ। চোখে কাজল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে মনটা বেশ ভালো হয়ে গেল রুচিরার। হারুদাকে দরজাটা বন্ধ করতে বলে যখন গলির বাঁক পেরিয়ে মিলন সংঘের সামনে এসে দাঁড়াল, তখন ঘড়ির কাঁটা সবে চারটে পেরিয়েছে। ক্লাবঘরের দরজা ভেজানো। তবে বাইরে বেশ কয়েকটা চটি দেখে বুঝতে অসুবিধা হল না কিছু লোকজন ইতিমধ্যেই এসে গেছে।  

চটিটা বাইরে ছেড়ে রেখে ভিতরে ঢুকলো রুচি। ভিতরে মানসদা, পল্টুদা ছাড়াও আরও কয়েকজন রয়েছে। ক্লাবঘরের মাঝখানে যে বড় টেবিলটা থাকে সেটাকে রিহার্সালের জন্য একপাশে সরিয়ে রাখা হয়েছে। আপাতত সেই টেবিলের পাশেই চেয়ারে একজন ভদ্রলোক বসে আছে। বয়স চল্লিশের ঘরেই হবে। মাঝারি উচ্চতা। বেশ পেটানো চেহারা। শরীরে মেদ নেই কোথাও। মাথার চুলে অল্পস্বল্প পাক ধরেছে। বয়সের তুলনায় চেহারা এবং বসার ভঙ্গিতে একটা বেশ রাশভারি ভাব। রুচি আন্দাজ করল ইনিই নিশ্চয় রাধারমণ তপাদার, যাঁকে নাটক শেখানোর জন্য ডেকে আনা হয়েছে। মানসদা হাত নেড়ে রুচিকে ডেকে আলাপও করিয়ে দিলেন, রাধাদা, এ হল রুচিরা। আমাদের পাড়ারই মেয়ে। এবার হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা দিয়েছে। খুব ভালো গান করে। আমরা ভাবছি নন্দিনী যদি ওকে দিয়েই করানো যায়।

ভাঁড়ে চা এসে গেছিল। তাতে একটা চুমুক দিয়ে রাধারমণবাবু একবার আপাদমস্তক দেখে নিলেন রুচিরাকে। তারপর ভরাট, গম্ভীর গলায় বললেন, শুধু গান জানলে তো চলবে না। অভিনয়টাও জানতে হবে। নাটক করেছো কখনও? ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়ল রুচিরা। রাধারমণের মুখে একটা হালকা ব্যঙ্গের হাসি খেলে গেল বুঝতে অসুবিধা হল না, প্রথমবার স্টেজে উঠেই নন্দিনী! ভালো ভালো, দেখা যাক চেষ্টা করে। অভিনয় যদি ভিতরে থাকে তাহলে পারবে। তবে খাটতে হবে খুব। আমি মহড়ায় কোনও ফাঁকি বরদাস্ত করি না। যে সময়ে আসতে বলব, সেই সময়ে আসতে হবে। বাড়ি যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করা চলবে না। রিহার্সালের সময় হাসি-গল্প এসব চলবে না। আর পার্ট পুরো মুখস্থ রাখতে হবে। পারবে তো?

ভয়ে বুক ধুকপুক করছিল রুচির। পা কাঁপছিল একটু একটু। কিন্তু তবু বড় করে ঘাড় নাড়ে। ভদ্রলোক বোধহয় একটু প্রসন্ন হন। চা-এর কাপে আর একটা চুমুক দিয়ে বলেন, বোসো এখানে, আমার সামনে বোসো। কতগুলো কথা বলছি মন দিয়ে শোনো। এতক্ষণ যা বললাম সেগুলো হল নিয়মের কথা। যে কোনও কাজ ঠিক করে করতে হলে একটা ডিসিপ্লিন লাগে। সে নাটক বা ফুটবল কিংবা অঙ্ক করা যাই-ই হোক না কেন। কিন্তু নাটক করতে হলে তার সঙ্গে আরও একটা জিনিস লাগে সেটা হল ভালোবাসা। নাটককে ভালোবাসা। ভালো না বাসলে কিন্তু নাটক করা খুব কঠিন। কারণটা কী বলো তো?

মন দিয়ে শুনছিল রুচি। ভালো লাগছিল শুনতে। ভদ্রলোকের গলায় এখন একটা অদ্ভুত মেদুর ভাব এসেছে।

কারণটা হচ্ছে, তুমি যখন মঞ্চে উঠছো তখন তুমি আর তুমি থাকছে না। মানে কী যেন নাম তোমার…রুচিরা…তখন তুমি আর রুচিরা নও। তখন তুমি নন্দিনী কিংবা কল্যাণী কিংবা খ্যান্তমণি কিংবা অন্য কেউ। তুমি তখন সেই মানুষটা হয়ে যাচ্ছ। সেই মানুষটার ভিতরে ঢুকে গিয়ে নিজেকে সেখানে বসিয়ে ফেলছো। এই যে নিজেকে বদলে আর একটা মানুষ হয়ে যাওয়া এটাই হল নাটকের ম্যাজিক। নাটককে ভালোবাসলে এই ম্যাজিকটা নিজের মনের মধ্যে, শরীরের মধ্যে বোঝা যায়, অনুভব করা যায়। তখন একটা নেশা হয়ে যায়। প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষ হয়ে ওঠার নেশা। এই নেশাটা একবার ধরে গেলেই কেল্লা ফতে।

রাধারমণবাবু হয়তো আরও কিছু বলতেন কিন্তু তার আগেই দরজাটা খুলে কেউ একজন ঢুকল আর পল্টুদার খুশি খুশি গলা শোনা গেল, এই যে আমাদের বিশু পাগলও এসে গেছে।

বিহান এসে গেছিস? দেরি হল কেন? রাধারমণদার গলা আবার গম্ভীর। ছেলেটা একটু ছটফটে গলায় বলল, কী করব রাধাদা। মায়ের ওষুধ এনে দিতে হল। ব্যাথাটা হঠাৎ বেড়েছে। ওষুধ যে শেষ হয়ে গেছে সেটাও খেয়াল করেনি।

বয়স হচ্ছে তো। এখন আর সবসময় মনে রাখতে পারবে না। ওগুলো তোদেরই দেখে রাখতে হবে। সবাই কি এসে গেছে, তাহলে এবার শুরু করা যাক।

 পল্টুদার আড়াল থেকে সামনে এগিয়ে এসেছে ছেলেটা। এতক্ষণে তাকে ঠিক করে দেখার সুযোগ পায় রুচিরা। ছিপছিপে লম্বা, গালে নরম দাড়ি। একমাথা ঘন এলোমেলো চুল। খুব যে সুপুরুষ তেমনটা বলা যাবে না। তবে চোখদুটো ভারী সুন্দর। নরম, মায়াময় দৃষ্টি। বিহান তোর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই, এ হচ্ছে রুচি মানে রুচিরা। নন্দিনীর পার্টটা ওই করবে…মানে আমরা সেরকমই ভেবেছি। এবার রাধাদা যেরকম বুঝবেন।  




আর কি কিছু কেনা বাকি রইল? বিহানের প্রশ্ন শুনে ভুরু কুঁচকে তাকালো রুচিরা।

আসলটাই তো বাকি। নন্দিনীর শাড়ি। রাধাদা বলে দিয়েছেন ধানি রঙের শাড়ি পরবে নন্দিনী।

রুচির কথা শুনে কেমন যেন একটু ভেবলে যায় বিহান।

ধানি রঙের শাড়ি! সে আবার কী?

আরে বাবা শাড়ি একটা, ধানি রঙের হতে হবে…লেখা আছে তো নন্দিনীর পরনে ধানি রঙের শাড়ি, চুলে রক্তকরবীর মঞ্জরী। সেইরকমই তো সাজ হবে।

ওসব শাড়ি-টাড়ি আমি বুঝি না। রাধাদার যত পাগলামি। তুমি কিনে নাও। আমি নাহয় বাকি জিনিসগুলো নিয়ে এখন কলেজে ফিরি। কাল রিহার্সালে যাওয়ার সময় নিয়ে যাব।

সে আবার কী কথা! পল্টুদা তো বলেই দিল, সব জিনিসপত্র কেনা হয়ে গেলে একটা ট্যাক্সি করে নিতে। ভাড়ার টাকা ক্লাব থেকে দিয়ে দেবে। আর শাড়ি কিনতে আমি একলা যাব কী করে? বাছতে হবে তো?

বিহানের মুখ দেখে মনে হয় তার পুরো ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। নাটকের চরিত্রদের কয়েকজনের কস্টিউম আর সেটের জন্য দরকারি কিছু জিনিসপত্র কেনার ভার বিহান আর রুচিরাকে দিয়েছেন রাধাদা। মেয়েদের জামা-কাপড়ও আছে। তাই বিহান একলা পারবে না। তাছাড়া নাটকের কস্টিউম একটু আগে কিনতে হয়। কারণ ওয়েদারিং করার দরকার হয়। এই ওয়েদারিং কথাটা আগে রুচিরার জানা ছিল না। রাধাদার কাছেই শুনেছে। অভিনয়ের সময় যেসব পুরোনো জামা-কাপড় পরা হয়, সেগুলো আসলে মোটেই পুরোনো নয়। নতুন জামা কিনে, তাকে গরম জলে সোডা দিয়ে ফুটিয়ে, শিরীষ কাগজ ঘষে আরও নানারকমভাবে এমন চেহারা করা হয় যাতে মনে হয় যেন বহুদিন ধরে পরে পরে একেবারে জ্যালজেলে হয়ে গেছে, এদিক-ওদিক ছিঁড়ে গেছে। এই নতুন জামাকে পুরোনো করার পদ্ধতিটাকেই ওয়েদারিং বলে। রক্তকরবী শ্রমিকদের অনেকেই এরকম ছেঁড়া জামা-কাপড় পরবে। সেসব কিনতেই আজ কলেজ স্ট্রিট বাজারে আসা। বিহান বলে দিয়েছিল রুচিরা যেন এসে কফি হাউসের সামনে দাঁড়ায়। সে কলেজ থেকে চলে আসবে। সেই মতোই এসেছে দুজনে। কেনাকাটাও হয়েছে। কিন্তু লিস্টিতে যে নন্দিনীর শাড়িও ছিল সেটা বিহানের জানা ছিল না মোটেই। আগে জানলে নির্ঘাৎ কাজটা অন্য কারও ঘাড়ে চাপিয়ে কেটে পড়ত। এখন পড়েছে বেকায়দায়। তাও পরিস্থিতি থেকে সটকে যাওয়ার একটা মরিয়া চেষ্টা করে সে।

আরে বাছাবাছির কী আছে। ধানি রং মানে তো ধানের মতো রং। কিনে নাও একটা। তারপর ট্যাক্সি ধরে নিও। আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না। আমার এদিকে একটু কাজও আছে।

কিন্তু রুচি মোটেই বিহানকে ছাড়তে রাজি নয়। একে তো একলা বাজার-দোকান করা তার তেমন অভ্যাস নেই। শাড়ি-জামা-কাপড় এখনও পর্যন্ত মা আর ঠাম্মা গিয়ে কিনে নিয়ে আসে। কিন্তু সেকথা বিহানকে বলতে তার প্রেস্টিজে লাগছে। তাছাড়া আরও একটা ব্যাপার আছে মনের গভীরে। নিজের কাছেও সে সেটা স্বীকার করতে রাজি নয়। রুচি জানে যে তাকে দেখতে খুব একটা খারাপ নয়। পাড়ায় মানসদা, পল্টুদার মতো দু-চারজনের কথা বাদ দিলে বাকিদের দিকে একটু হেসে তাকালে ধন্য হয়ে যায়। স্কুল যাওয়ার পথে চা-এর দোকানে উৎসুক চাউনির ভিড় থাকে। আর এই কোথাকার ক্যাবলা ছেলে তার সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েও পালাই পালাই করছে। রুচির মনের ভিতরে একটা হালকা রাগের বাষ্প কুণ্ডলি পাকাচ্ছিল। নাঃ, একে এরকম বেমক্কা পালাতে দেওয়া চলবে না মোটেই। তাই গম্ভীর মুখে বলে, সেরকম তো কোনও কথা ছিল না। আপনি সঙ্গে থাকবেন সেটাই আমাকে বলা হয়েছে। তাছাড়া বাছার ব্যাপার তো আছেই। ধানি রং মানে ধানের মতো রং সে আমি জানি। কিন্তু কোন ধান সেটা কি আপনার জানা আছে?

কোন ধান মানে! ধান আবার কয়রকম হয়! আমি চাষে বিশেষজ্ঞ নই।

সে আমি জানি। কিন্তু ধানের তো অনেক রকম রং হতে পারে তাই না। আপনি নিশ্চয় কখনও ধানক্ষেত দেখেননি। আমি দেখেছি। আমার মামার বাড়ি নদিয়ায়। সেখানে দেখেছি। দিদিমা বেঁচে থাকতে বছরে দু-তিনবার যেতাম। বলছি, শুনে নিন ভালো করে। ধান যখন প্রথম লাগানো হয়, তখন তার রং থাকে কচি সবুজ। বলতে পারেন মখমলি সবুজ। তারপর বর্ষায় যখন ধানগাছ বেশ বেড়ে উঠল, তখন সেই সবুজ রঙটা খানিকটা গাঢ় হয়ে যাবে। ইংরাজিতে যাকে বলে লাশ গ্রিন, অনেকটা সেরকম। পাকার আগে সেই সবুজে একটা হলদে ছোপ লাগে। আর ধান পাকলে তখন তার রং সোনালি হলুদ। এবার বলুন রবীন্দ্রনাথ নন্দিনীর জন্য ঠিক কীরকম ধানি রঙের শাড়ির কথা বলেছেন।

বিহান এতক্ষণ হাঁ করে তাকিয়েছিল রুচিরার দিকে। মেয়েটাকে একসঙ্গে এতগুলো কথা বলতে আগে কোনওদিন শোনেনি। রাধাদার সামনে রিহার্সালের সময় দিব্যি ভিজে বেড়ালের মত থাকে। এখন বোঝা যাচ্ছে ভিতরে ভিতরে ভয়ানক বিচ্ছু। আপাতভাবে এর হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার কোনও উপায় নেই। রুচিরা ততক্ষণে হাঁটতে শুরু করেছে। বাধ্য হয়েই কাপড়ের ঝোলা ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে বিহানও তাকে অনুসরণ করে। বেশ খানিকক্ষণ বাছাবাছির পর শেষ পর্যন্ত লাল পাড় দেওয়া একখানা কচি সবুজ রঙের শাড়ি পছন্দ হল মেয়ের। দেখতে মন্দ নয়। রুচিরার গমের মতো গায়ের রঙে ভালোই মানাবে মনে হল বিহানের । যদিও মুখে কিছু বলল না। বাজার থেকে বেরিয়ে ফুচকাওলার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছিল রুচিরা। ঘুগনি-আলুকাবলি তার দারুণ লাগে এরকম একটা আভাসও দিল। কিন্তু এবার আর ফাঁদে পা দিতে রাজি নয় বিহান। কফি হাউসের সামনে থেকে তাড়াতাড়ি কেটে পড়া গেছে। বাজারের ভিতরটা মোটামুটি নিরাপদ। কিন্তু এই মোড়ে দাঁড়িয়ে ফুচকা খেলে আর দেখতে হবে না। নিয়মিত কলেজ ফেস্টে নাটক করার সুবাদে বিহান এখন বেশ পরিচিত মুখ। খবর বিদ্যুতের গতিতে ছড়িয়ে পড়বে। তারপর কাল ক্লাস করতে এসে বিভিন্ন বেঞ্চ থেকে যেসব বাক্যবাণ ধেয়ে আসবে তার কথা ভেবেই কপালে ঘাম ফুটে গেল বিহানের। সঙ্গে সঙ্গে মাথার মধ্যে ঝিলিক মেরে গেল বুদ্ধিটাও।

ফুচকা খেয়ো না। তেঁতুলজলে গলা খারাপ হয়ে যেতে পারে। মহড়া চলছে। এখন এসব না খাওয়াই ভালো।

কাজ হল মন্ত্রের মতো। পা থেমে গেল রুচিরার। ভুরুতে হালকা ভাঁজ। পুরোপুরি বিশ্বাস হয়তো করেনি। কিন্তু ঝুঁকি নিতে পারছে না। যতই হোক নাটকের ব্যাপারে ওর থেকে বিহানের অভিজ্ঞতা বেশি।

ঠিক আছে। চলুন তাহলে আখের রস খাই।

আখওয়ালা গাড়ি নিয়ে একটা পাঁচিলের ধারে ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে। সামনের দেওয়ালে লম্বা লম্বা পাতাসুদ্ধ আখগুলো ঠেস দিয়ে রাখা। রাস্তা থেকে চট্ করে চোখে পড়বে না। তাই খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়েই এগোলো বিহান। লেবুর রস দিয়ে দুগ্লাস ঠাণ্ডা আখের রস। রুচিরাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল সে বেশ উপভোগ করছে ব্যাপারটা। বিহান তাকে খানিকটা তাড়া দিয়েই গ্লাস খালি করিয়ে ট্যাক্সি ধরল। বিশাল পাগড়িবাঁধা শিখ ড্রাইভার ফড়িয়াপুকুরের অলিগলি চেনেন। তাই বিশেষ কিছু বলতে হল না। মিলনসংঘ ক্লাবের সামনে নেমে ভাড়া মিটিয়ে দিল বিহান।




নন্দিনী – আজ মনের খুশিতে ভাবলুম এখানকার প্রাকারের ওপর চড়ে ওদের গানে যোগ দেব। কোথাও পথ পেলুম না। তাই তোমার কাছে এসেছি।

বিশু – আমি তো প্রাকার নই।

নন্দিনী – তুমিই আমার প্রাকার। তোমার কাছে এসে উঁচুতে উঠে বাহিরকে দেখতে পাই…

না না হচ্ছে না। একদম হচ্ছে না…

 রাধাদার চিৎকারে থতমত খেয়ে যায় বিহান আর রুচিরা দুজনেই।

হচ্ছে না রুচিরা। একদম হচ্ছে না। নন্দিনী কখনও অমনভাবে বিশুর সঙ্গে কথা বলবে না। তোমাকে মনে রাখতে হবে যে বিশু কিন্তু নন্দিনীর প্রেমিক নয়। নন্দিনীর প্রেমিক রঞ্জন। বিশুকে নন্দিনী ভালোবাসে নিশ্চিত। খুব ভালোবাসে। কিন্তু সেটা হল বন্ধুর ভালোবাসা। সে জানে যে বিশু তার প্রেমে পাগল। তাই সে কখনও চায় না বিশুকে কষ্ট দিতে। ভালো করে বোঝার চেষ্টা করো রুচিরা। নন্দিনী যখন বিশুকে ডাকবে তখন তার কণ্ঠস্বরে, তার বাচনভঙ্গিতে ভালোবাসা থাকবে, প্রেম নয়। তার নিজের মধ্যে সেই বোঝাপড়াটা আছে। তাই তার কথার মধ্যেও সেটা ফুটে উঠবে। সে একদম ভিতরের যন্ত্রণা থেকে বিশুকে এই কথাগুলো বলছে। নন্দিনী যখন রঞ্জনের সম্বন্ধে কথা বলছে আর যখন বিশুর সঙ্গে তার কথোপকথন চলছে, দুটো সংলাপের ধরন কিন্তু একদম আলাদা। যেরকম কিশোরের সঙ্গেও তার কথা বলার ধরন অন্যরকম হবে। সেখানে তার গলায় একটা স্নেহের সুর থাকবে। এগুলো বুঝতে চেষ্টা করো। না বুঝে নন্দিনী করার চেষ্টা কোরো না। শুধু মুখস্থ নয়, বারবার পড়ো নাটকটা। প্রত্যেকটা সংলাপের ভিতরের কথাগুলো ছেনে বার করে আনো। নাটকটা ছেলেখেলার ব্যাপার নয়। না করতে ইচ্ছে করলে আসবে না। কিন্তু না ভেবে মহড়া দিতে এসো না…কথাগুলো রাধাদা বলেছিলেন মহড়া শুরু হওয়ার প্রায় সপ্তাহখানেক পর। চোখে জল এসে গেছিল রুচিরার। সত্যি ভেবেছিল আর আসবে না। বাড়িতে আদরের মেয়ে। স্কুলে ভালো ছাত্রী। কেউ কোনওদিন তাকে অমন বিচ্ছিরি করে বকেনি। কিন্তু সন্ধেয় বাড়ি ফিরে বালিশ ভেজালেও রাতে নিজের ঘরে বসে খুব মন দিয়ে নাটকটা পড়েছিল আবার। পরের দিন মহড়ায় যেতেও দেরি হয়নি। বিহান বোধহয় ভেবেছিল বকুনি খেয়ে সে আর আসবে না। তাই তাকে দেখে একটু অবাকই হয়েছিল। যদিও মুখে কিছু বলেনি। বরং পল্টুদা চুপিচুপি বলেছিল,

মনখারাপ করিস না রুচি। রাধাদা ওরকমই একটু খিটখিটে। আসলে নাটক নিয়ে একেবারে পাগল তো লোকটা। তাই রাধাদা কিন্তু একটা কথাও বলেননি। এমন সহজভাবে মহড়া শুরু করেছিলেন যে রুচিরার মনে হয়েছিল উনি জানতেন হাজার বকুনি দিলেও রুচিরা আসবে রিহার্সাল দিতে।

আসলে তখন থেকেই নাটকের প্রতি আকর্ষণটা একটু একটু করে থানা গাড়ছিল তার মনে। রাধাদা তো শুধু সংলাপ মুখস্থ আর রিহার্সাল করান না। তার সঙ্গে আরও অনেক কথাও বলেন তাদের সঙ্গে। নাটক ছোটবেলা থেকে রুচিরা অনেকবার দেখেছে। তাদের বাড়িতে নাটক দেখতে যাওয়ার চল আছে। উত্তর কলকাতার স্টার, মিনার্ভা, সারকারিনায় তো নিয়মিত নাটক হয়। সিনেমার জগতের অনেকেও অভিনয় করেন। পুজোর সময় একদিন নাটক দেখাটা বেশ নিয়মিত ব্যাপার। এছাড়া বাড়িতে কোনও বিয়ে হলেও নতুন মেয়ে-জামাইকে নিয়ে নাটক দেখতে যাওয়া হয়। তবে নাটকের মধ্যে যে কমার্শিয়াল থিয়েটার আর গ্রুপ থিয়েটার এরকম দুটো ভাগ আছে সেটা তার আগে জানা ছিল না। রাধাদার কাছেই শুনেছে। প্রথম যেদিন যারা নাটক করবে তাদের সবাইকে নিয়ে বসলেন রাধাদা সেদিনই কথাগুলো বলেছিলেন। গণনাট্যসংঘের ইতিহাস। কীভাবে আইপিটিএ তৈরি হল। কী তাদের লক্ষ্য ছিল। শম্ভূ মিত্রের নামটা শোনা ছিল। কিন্তু নবান্ন নাটকটা যে বাংলায় এমন সাড়া ফেলেছিল সে সম্বন্ধে কোনও ধারণাই ছিল না রুচিরার। নবান্ন যে বাংলার ভয়াবহ মন্বন্তর নিয়ে লেখা তাও তো জানত না। কীভাবে নবান্ন হল সেই গল্প করেছিলেন রাধাদা। উৎপল দত্তের পিএলটি-র কথাও বলেছিলেন। মিনার্ভাতেই নাকি হয়েছিল কল্লোল। নৌ-বিদ্রোহের নাটক। সেই নাটকের জন্য গ্রেফতার হয়েছিলেন উৎপল দত্ত। রুচিরা কিন্তু কল্লোল দেখেনি। উৎপল দত্তের কোনও নাটকই দেখেনি সে। নান্দীকারের মঞ্জরী আমের মঞ্জরীতে অকল্পনীয় অভিনয় করেছেন অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়। সেও তো দেখা হয়নি তার। অথচ তারা সবাই মিলে বারবধূ দেখে এসেছে। সাহেব-বিবি-গোলাম দেখেছে। আমি মন্ত্রী হব দেখে তো ঠাম্মা হেসে গড়িয়ে পড়েছিল। মিলনী সংঘেই বছরদুয়েক আগে পুজোর সময় শাহজাহান হয়েছিল। সেটাও দিব্যি লেগেছিল তার।  

সেদিন একটু অবাক হয়েই রুচিরা জানতে চেয়েছিল দুটোই তো নাটক রাধাদা। স্টেজে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করতে হবে। তাহলে কমার্শিয়াল থিয়েটারের সঙ্গে গ্রুপ থিয়েটারের পার্থক্যটা কোথায়?

রুচিরার মনে হয়েছিল তার প্রশ্ন শুনে বিহান বোধহয় একটু মুচকি হাসল। রাধাদা কিন্তু খুশি হয়ে বলেছিলেন, ঠিক প্রশ্ন করেছো। এই পার্থক্যটা না বুঝলে ঠিকঠাক অভিনয় করতে পারবে না। আমি উত্তর দেব, কিন্তু তার আগে বিহান তুমি বলো তো। তোমার এই নাটকের সঙ্গে ওঠা-বসা বেশ কয়েকবছর হয়ে গেল।

রাধাদা কি বিহানের হাসিটা খেয়াল করেছিলেন? মনে মনে ভাবছিল রুচিরা। মনে হয় না। কারণ বিহান যেখানে বসেছিল সেখান থেকে রাধাদা সরাসরি ওর মুখ দেখতে পাবেন না। বিহান অবশ্য প্রশ্নটা শুনে একটুও ঘাবড়ায়নি। বরং বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই বলেছিল,

উত্তর তো খুব সহজ রাধাদা। কমার্শিয়াল থিয়েটার হচ্ছে নিছক বিনোদন। সস্তার, খেলো আনন্দের। আর গ্রুপ থিয়েটারের মধ্যে গভীরতা আছে। মানুষের কথা বলে, না, হল না।

রাধাদা গলা সামান্য গম্ভীর।

তুমি ব্যাপারটা একটু ওপর ওপর ভেবেছো। প্রথমত নাটক ব্যাপারটাই হল বিনোদন। ভালো না লাগলে কেউ পয়সা দিয়ে টিকিট কেটে কোনও নাটকই দেখতে আসবে না। এবার এই ভালোলাগাটার মধ্যেও কিন্তু রকমফের আছে। এই ভালো লাগা তোমার মনের কোন অনুভূতিটা উসকে দিচ্ছে সেটা দেখতে হবে। বাণিজ্যিক থিয়েটার মানুষের ভালো লাগে, দর্শকরা উপভোগ করে, আনন্দ পায়। গ্রুপ থিয়েটারও মানুষের ভালো লাগে। কিন্তু শুধু সেই ভালো লাগাতেই থেমে থাকে না। গ্রুপ থিয়েটার মানুষকে ভাবায়। তাকে নিজের চারপাশ সম্বন্ধে সচেতন করে। তার শ্রেণি অবস্থানকে বুঝতে সাহায্য করে। এটাই হল গ্রুপ থিয়েটারের বৈশিষ্ট। গ্রুপ থিয়েটার মনে করে না যে নাটক শুধুই বিনোদন। নাটক তার কাছে নিজের রাজনৈতিক বক্তব্যকে মানুষের সামনে নিয়ে আসার হাতিয়ার। আর একটা কথা বলি, সস্তা, খেলো এই শব্দগুলো কোনও নাটক বা নাটকের অভিনেতা সম্বন্ধে কোনওদিন ব্যবহার কোরো না বিহান। ভালো অভিনেতা না হলে কোনও মঞ্চেই অভিনয় করা যায় না। কমার্শিয়াল নাটকে যাঁরা অভিনয় করেন তাঁদের মধ্যে অনেকেই অসাধারণ অভিনেতা। আর একটা কথা বলি, আমি জানি না তুমি বাণিজ্যিক থিয়েটার দেখেছো কিনা। আমি দেখেছি। তবে থিয়েটার না দেখলেও পোস্টার তো নিশ্চয় দেখেছো। বেশিরভাগ এই ধরনের নাটকই কিন্তু ভালো লেখকের গল্প থেকে হয়। এবার তাঁরা তো মানুষের কথাই বলেন। তাই সেখানেও নাটকে মানুষের গল্পই বলা হয়। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে যে গল্পই বাছা হোক না কেন, তার পরিবেশনার ধরনটা এমন থাকে যে নাটক শেষ হয়ে যাওয়ার পরে সেটা নিয়ে দর্শকদের মনের গভীরে যাওয়ার আর কোনও সুযোগ থাকে না।   

সেদিন রাতে রাধাদার কথাগুলো নিয়ে অনেকক্ষণ মনের মধ্যে নাড়াচাড়া করেছিল রুচিরা। এই প্রথম সে নিজের স্কুলের পড়াশোনা কিংবা বাড়ির সাংসারিক আলোচনার বাইরে অন্য একটা কিছু জানছে। একদম নতুন একটা কিছু। এই জানার আগ্রহটাও তার বাড়ছে। এই বিষয়ে কিছু বইপত্র পেলে ভালো হত। কিন্তু সেটা কোথায় পাওয়া যেতে পারে তার জানা নেই। মিলনী সংঘের লাইব্রেরিতে সে নিয়মিত যায় বাড়ির জন্য গল্পের বই আনতে। সেখানে এসব বই নেই। তাছাড়া লাইব্রেরি থাকলেই তো হবে না। বইয়ের নামও তো জানতে হবে। বেশ খানিকক্ষণ ভেবে রুচিরা ঠিক করেছিল বিহানকে বলবে বইয়ের সন্ধান দিতে। প্রেসিডেন্সিতে পড়া ছেলে। তার ওপর নিজে নাটক করে। ও নির্ঘাৎ নাম বলে দিতে পারবে। কিন্তু পরদিন মহড়ায় গিয়ে শুনলো বিহান আসেনি। তাকে নাকি কলেজে কী একটা পেপার জমা দিতে হবে। তাই রাধাদাকে বলেই একটা দিন ছুটি নিয়েছে। কিন্তু সেদিন রিহার্সাল শেষ হওয়ার পর সবাই যখন চা-মুড়ি খাচ্ছে, তখনই রাধাদা তাকে ডাকলেন, শোন, এই বইটা রাখ। গণনাট্য সংঘের ইতিহাসটা জানতে পারবি। পড়া হয়ে গেলে আমাকে ফেরত দিস।




প্রেম বোধহয় একটা ম্যাজিক। মানুষের মনের গভীরে কখন সেই ম্যাজিকটা ঘটে যাবে, কখন একটা মস্ত ঢেউ বুকের ভিতর ভেঙে পড়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে ঘর-দুয়ার সেকথা কেউ জানে না। আগে থেকে বুঝতেও পারে না। রুচিরারও ঠিক তাই হল। বিহানের সঙ্গে রোজ মহড়া দিচ্ছে। কথাবার্তা হচ্ছে। টুকটাক খুনসুটি, পরস্পরের পিছনে লাগাও চলছে। তার বেশি কিছু মনে হয়নি কোনওদিন। এমনকি রাতে একলা ঘরে যখন নিজের মনে নাটকের সংলাপ প্র্যাকটিস করত, তখন বিহানকে কেবল প্রক্সি দেওয়ার জন্যই দাঁড় করাতে হত। কিন্তু তারপরেও ঘটে গেল ঘটনাটা। পঁচিশে বৈশাখের তখন আর দেরি নেই। মহড়া একেবারে জোর দিয়ে চলছে। রাধাদার বকুনিও উত্তরোত্তর বাড়ছে। তবে এখন লোকটার মুখোশটা রুচিরা বুঝে গেছে। তাই অসুবিধা হয় না। তাছাড়া তার অভিনয়ে যে বেশ খানিকটা উন্নতি হয়েছে সেটা মুখে না বললেও রাধাদার বকুনির ধরন দেখে আন্দাজ করতে পারে।

বাড়ি থেকে বেরনোর সময় দেখা গেল ধোপা আসেনি দুদিন। রুচিরার ডুরে শাড়ি তাই একটাও ইস্ত্রি করা নেই। বাধ্য হয়েই মায়ের একটা হালকা বেগুনি ফুলছাপ ভয়েল আলমারি থেকে বার করে পরল। শাড়িটা এমনিতেই তার ভারী পছন্দের। কিন্তু মা সচরাচর পরতে দেয় না। পিসিমণির শরীর খারাপ। তাই মা তাকে দেখতে গেছে। এমন সুযোগ হাতছাড়া করার কোনও মানে হয় না। শাড়িটা পরার পর মনে হল, এমন রং, তার সঙ্গে একটু না সাজলে চলে! তাই কপালে ছোট টিপ, চোখে কাজলের টান আর কানে একজোড়া ছোট মুক্তো। সব মিলিয়ে নাকি একটা নিটোল বেগুনি স্বপ্ন। কথাটা পরে বিহান বলেছিল। প্রেমের রং যে বেগুনি সেকথা তখন রুচির জানা ছিল না। তবে ম্যাজিকটা যে ঘটছে সেটা বুঝতে পেরেছিল।

নন্দিনী -পাগল, যখন তুমি গান করো তখন কেবল আমার মনে হয়, অনেক তোমার পাওনা ছিলো। কিন্তু কিছু তোমাকে দিতে পারিনি।

বিশু পাগল – তোর সেই কিছু-না-দেওয়া আমি ললাটে পরে চলে যাবো। অল্প কিছু দেওয়ার দামে আমার গান বিক্রি করব না।

অনেকবার বলা সংলাপ। টানা রিহার্সালই চলছে অন্তত সাতদিন। কিন্তু তাও রুচিরা বুঝতে পারছিল চোখের ভাষা পাল্টে যাচ্ছে বিহানের। সে যেন সত্যিই কিছু পায়নি। শূন্য হাতে তাকে ফিরে যেতে হচ্ছে রুচিরার সামনে থেকে। কিন্তু পাওয়ার আকঙ্খা তার কণ্ঠস্বরে, বাচনভঙ্গিতে ঠিকরে বেরোচ্ছে। এমন একটা আকুলতা তার কথার মধ্যে যে রুচি ভুলে যাচ্ছিল যে বিশু নয় আসলে তার প্রেমিক রঞ্জন। তার জন্যই অপেক্ষা করছে নন্দিনী। বিশুকে বিদায় তাকে দিতেই হবে। কিন্তু সেই মুহূর্তে তার শরীর-মন সব উন্মুখ হয়ে উঠেছিল শুধু বিহানের জন্য। তবে সেটা কয়েকমুহূর্ত মাত্র। রাধাদার তীক্ষ্ণ চোখের কথা মনে পড়তেই সতর্ক হয়ে গেছিল রুচিরা। কিন্তু বিহানের নিজেকে সামলাতে একটু দেরি হয়ে গেল। রাধাদা হয়তো কিছু বুঝেছিলেন। রুচিকে কিছু বলেননি। বিহানকে বললেন, বিশু পাগলকে কিন্তু আরও একটু সংযত হতে হবে। সে কিন্তু আবেগে ভেসে যাওয়ার মানুষ নয়। বিপ্লবের পথের পথিক। কথাটা মনে রেখো বিহান।

অন্যদিন মহড়া শেষ হলেই বেরিয়ে পড়ে রুচি। এমনিতে তাদের বাড়িতে রাস্তার আলো জ্বলে গেলে বাইরে থাকা বারণ। কিন্তু রিহার্সালে আসছে বলে ছাড় মিলেছে কিছুটা। তবে বেশি দেরি করলে মা বিরক্ত হয়। আর বাবা অফিস থেকে ফিরেও যদি দেখে মেয়ে ঘরে ঢোকেনি, তাহলে নির্ঘাৎ ক্লাবে এসে হানা দেবে। সেই ভয়ে একেকদিন পেঁয়াজি আর আলুর চপের মায়াও তাকে কাটাতে হয়। কিন্তু আজ কেমন যেন অকুতোভয়ে সে গল্প করছিল সবার সঙ্গে আর আড়চোখে খেয়াল রাখছিল বিহান বেরোচ্ছে কিনা। রাধাদা বেরিয়ে গেলেন চা খেয়েই। পল্টুদারা জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখছে। অন্যরাও বেরোচ্ছে একে একে।

আমি এগোলাম মানসদা। রবিদাদের নাটকটা কিন্তু ভালো হয়েছে। যাবে যদি বলো।

কথাটা শুনেই তড়িঘড়ি চটি পায়ে গলালো রুচি। গলি থেকে বেরিয়ে খানিকটা এগোলেই ট্রামলাইন। তারপর ডানদিকে কিছুটা গিয়ে রুচিদের বাড়ি। গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে ছিল বিহান। রুচিরা প্রথমটায় দেখতে না পাওয়ার ভান করলেও কাজে লাগল না।

বাড়ি ফেরার কি খুব তাড়া?

না, তেমন কিছু নয়, কথাগুলো নিজে বলল নাকি তাকে দিয়ে কেউ বলিয়ে নিল জানে না রুচি।

তাহলে একটু ঘুরে গেলে হয় না, মানে সুন্দর হাওয়া দিচ্ছে তো, এতক্ষণ বদ্ধ ঘরে রিহার্সাল দিয়ে একটু ইচ্ছে করছিল।

সন্ধেবেলায় জমজমাট ফড়িয়াপুকুর। চারপাশে লোকজন গিজগিজ করছে। দোকানের হাঁকাহাঁকি। ট্রামের টংটং। বাসের হর্ন। এসবের মধ্যে দুজনে হাঁটছে ফুটপাথ দিয়ে। অসংখ্য মানুষের ভিতরে থেকেও যে এভাবে নিজেদের নিভৃতি খুঁজে নেওয়া যায়, আগে কোনওদিন বোঝেনি রুচি। কথা বলছে না বিহান। শুধু নিঃশব্দে পাশে হেঁটে যাচ্ছে। গলিটা শেষ হয়ে এল। ট্রামলাইন দেখা যাচ্ছে। আর একটু এগিয়ে মোড় ঘুরলেই রুচিদের বাড়ি। বাবার বাড়ি ফেরার সময় হয়ে এসেছে। একটা লাইটপোস্টের নীচে দাঁড়াল বিহান। পাশেই একটা রাধাচূড়ো ফুলের গাছ। হলুদ ফুল বিছিয়ে পড়ে আছে মাটিতে। হঠাৎ রুচির মনে হল একমুঠো ফুল কুড়িয়ে বিহানকে দেয়। কিন্তু বড্ড পাগলামি হয়ে যাবে না? এলোমেলো ভাবনাটার মাঝেই কথাগুলো ভেসে এল, আর তো মাত্র দশদিন…

জানে রুচি। পঁচিশে বৈশাখ আসতে আর দশদিন বাকি। সেদিন মঞ্চস্থ হবে মিলন সংঘের রক্তকরবী।

তারপর রিহার্সাল শেষ। মিলন সংঘে আর আসতে হবে না আমাকে। তুমিও কলেজে ভর্তি হয়ে যাবে…

কলেজ পাড়াতেই তো যাব।

চমকে উঠে রুচির দিকে তাকায় বিহান।

ও পাড়াতেই তো আপনার ওঠাবসা।

তুমি…তুমি….দেখা করবে তো আমার সঙ্গে?

আপনার কি মনে হয়?

কিচ্ছু মনে হয় না। এতদিনেও আপনি বলা ছাড়তে পারলে না। এই কদিন অবশ্য না ছাড়াই ভালো। রিহার্সালের সময় মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেলে আর দেখতে হবে না।

আমাকে এখন যেতে হবে। বাবার ফেরার সময় হয়েছে। বাড়ি ফিরিনি দেখলে ক্লাবে চলে যেতে পারে।

মোড়ের মাথার হলুদ বাড়িটাই তো তোমাদের?

আপনি চেনেন আমাদের বাড়ি!

একদিন এসেছিলাম তোমার পিছন পিছন। বুঝতে পারনি। আসলে কদিন ধরেই কেমন যেন পাগল পাগল লাগছিল। নাটকটা হয়ে গেলেই আর তোমার সঙ্গে দেখা হবে না সেটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না। এদিকে তুমি আবার এমন রাধাদার অনুগত ছাত্রী যে কিছু বলারই সাহস হচ্ছে না। শেষকালে আজ তোমাকে এই বেগুনি শাড়িতে দেখে আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। মনে হল যা থাকে কপালে বলেই ফেলি। এমন মিষ্টি প্রেমের রং পরে না এলে আজও হয়তো ফিরেই যেতাম।

বাবা বাড়ি ফেরেনি তখনও। কিন্তু রুচিকে ঘরে ঢুকতে দেখে ভুরু কুঁচকে গেছিল মায়ের।

কী ব্যাপার আজ হঠাৎ এত সাজগোজ কিসের!

সাজ আবার কোথায় দেখলে। শাড়িটা পরেছি তাই কানে দুটো দুল পরলাম…

কোনওরকমে কথাগুলো বলে মায়ের চোখ এড়াতে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয় রুচি। তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কীরকম যেন বিহ্বল চোখে নিজেকে দেখে। কেমন যেন বদলে গেছে মুখচোখ। আর একটা মানুষের ভালোলাগা-ভালোবাসার গুঁড়ো যেন ছড়িয়ে আছে মুখময়।

বাকি কদিন রিহার্সালের পর সবার চোখ এড়িয়ে বেরিয়েছে দুজনে। পাড়ার ভিতরেই অলিগলি ঘুরে কিছুটা পথ হেঁটেছে। কথা যে খুব হয়েছে তা নয়। শুধু পাশাপাশি থাকার অনুভূতিতেই ভরে উঠেছে রুচি।

জমজমাট নাটক হল রক্তকরবী। ক্লাবের সামনেই বড় মঞ্চ বাঁধা হয়েছিল। পাড়ার লোকেরা তো বটেই, অন্য পাড়া থেকেও এসেছিলেন অনেক মানুষ। রাধাদার অনুরোধে বেশ কয়েকজন নাটকের বিশিষ্ট ব্যক্তিও ছিলেন দর্শক আসনে। রুচির একটু ভয় ভয় লাগছিল। বিহানের সঙ্গে এই হঠাৎ গড়ে ওঠা সম্পর্কটার রেশ কোনওভাবে তার অভিনয়ে পড়বে না তো? তাহলে তো এতদিনের এত চেষ্টা সবই ব্যর্থ হবে। রাধাদাই বা কী মনে করবেন। কিন্তু মঞ্চে ওঠার পর তার আর কিছুই মনে রইল না। তখন সে যেন শুধুই নন্দিনী। বিহান কিংবা রাধাদা কাউকে সে চেনে না। সে তখন রাজার নন্দা, রঞ্জনের নন্দিন। নাটক শেষ হয়ে গিয়ে যখন পর্দা নামছে, হাততালির ঝড় উঠেছে বাইরে তখন আবার ফিরে এল তার বুকের কাঁপুনি।

 সেদিন ক্লাবেই খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। সেসব শেষ হতে রাত হল বেশ খানিকটা। আজ আর কোনও সুযোগ নেই। বাড়ি ফিরতে হবে এখনই। বিহানের থেকে চোখে-চোখে বিদায় নিয়ে বেরোতে যাচ্ছে রুচিরা এমন সময় রাধাদা ডাকলেন, শোন, একটা কথা বলি। আজ যা অভিনয় করলি তা নিয়ে অনেকে অনেক ভালো ভালো কথা বলবে। ওসব কিছু মাথায় রাখিস না। আজ যতটা করেছিস ততটা অনেকেই পারে। কিন্তু তোর রাস্তাটা আরও অনেক লম্বা। তুই নাটকের ভিতরে ঢুকতে পেরেছিস। তোর হবে। নাটকটা ছাড়িস না। যদি আমাদের দলে আসতে চাস, জানাস, আমি খুশি হব।




রাধাদার নাটকের দলে কিন্তু যোগ দেওয়া হল না রুচিরার। হায়ার সেকেন্ডারির রেজাল্ট বেরোল কদিন পরেই। ফল যথেষ্ট ভালো। আগে থেকেই ঠিক ছিল কেমিস্ট্রি অনার্স পড়বে। কিন্তু গোল বাঁধল অন্য জায়গায়। রুচির ইচ্ছে সে ভর্তি হবে স্কটিশ চার্চ কলেজে। কিন্তু মা আর ঠাম্মার তাতে ঘোর আপত্তি। কো-এডুকেশন কলেজ। ছেলেদের সঙ্গে অনবরত গা ঘেঁষাঘেষি। ওসবের কোনও দরকার নেই। ভালো নম্বর যখন পেয়েছে, তখন বেথুন তো আছেই। মেয়েদের কলেজ। কড়া ডিসিপ্লিন। ছাত্রীরা শাসনে থাকে। রুচির হাঁড়িমুখ, মায়ের গজগজানি, ঠাম্মার জ্ঞানগর্ভ ভাষণ, সব মিলিয়ে বাড়ির পরিবেশ যখন বেশ উত্তপ্ত তখন বাবা মাঠে নামলেন। খোঁজ-খবর নিয়ে এসে জানালেন স্কটিশের কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট বেথুনের থেকে অনেক ভালো। অধ্যাপকদের রীতিমত নাম-ডাক আছে। ল্যাবরেটরিও ঠিকঠাক।

কলেজে তো ভর্তি হচ্ছে পড়াশোনা করবে বলে। তাই যেখানে সেটা ভালো হবে সেখানেই যাওয়া উচিত। মেয়েটা যখন খেটেখুটে এতটা ভালো রেজাল্ট করল।

রেজাল্ট ভালো করেছে ভালো কথা। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো শানু, মেয়ের কিন্তু বিয়ে দিতে হবে তোমাকে। তখন ওই সব ছেলেদের সঙ্গে কলেজে পড়া মেয়ের ফস্টিনস্টি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সামাল দিতে পারবে তো?

ঠাম্মার কথার ঝাঁঝ দেখে একটু হাসলেন বাবা, দ্যাখো মা, ফস্টিনস্টি কেউ চাইলে বাড়িতে বেঁধে রাখলেও করতে পারে। কিন্তু সেরকম দিনকাল তো এখন আর নেই। তাছাড়া পরে যদি ইউনিভার্সিটিতে পড়তে যায়, তখন তো ছেলেদের সঙ্গে পড়তেই হবে। এখনও পর্যন্ত মেয়েদের জন্য আলাদা কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থা তো সরকার করে দেয়নি।

তাহলে আর কী…পাঠাও তাহলে। এরপর বলবে মেয়ে যখন চাকরি করতে যাবে তখনও তো ছেলেদের পাশে বসে কাজ করবে…তোমার মেয়ে তুমিই ভালো বুঝবে…

রুচি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। বাবার চোখের ইশারায় চুপ করে যায়। ঠাম্মার গলার ঝাঁঝ কমে এখন একটা মৃদু গজগজানি চলছে। বাড়ির সবাই জানে বাবা এখন যদি একটু পিঠ টিপে দেয় তাহলে সেটুকুও একটু পরে উপে যাবে। মা যতই ঠাম্মার তালে তাল দিক আর নতুন করে বাবার মতবদল হবে না।

কিন্তু কলেজে ভর্তির ব্যাপারে বাবা পাশে দাঁড়ালেও নাটক করার ইচ্ছেয় কাউকে পাশে পেলো না রুচি। অবশ্য তখনই বাড়িতে কিছু বলেনি সে। প্রথম কিছুদিন তো নতুন কলেজ আর তার ক্লাস নিয়েই ব্যস্ত ছিল। তাছাড়া বিহানের সঙ্গে প্রেমটাও ক্রমশ জমে উঠছে। কলেজে ক্লাস শেষ হয়ে যায় তিনটে নাগাদ। কিন্তু মাকে রুচি বলে রেখেছে সাড় চারটে পর্যন্ত ল্যাবে কাজ করতে হয় রোজই। চুরি করে পাওয়া এই দেড়ঘণ্টা তাদের দুজনের। কোনওদিন কলেজ স্কোয়ার, কোনওদিন কফি হাউস। পকেট রেস্ত থাকলে দিলখুশায় চিকেন কবিরাজি। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর হাতখরচ বরাদ্দ হয়েছে রুচির জন্য। বিহানের যদিও পকেটের অবস্থা সুবিধার নয়। একটা টিউশন সে করে। কিন্তু সেটুকু টাকা নিজের হাতখরচ আর সিগারেটেই চলে যায়। তাতে অবশ্য কিছু মনে করে না রুচি। কলেজ যাতায়াতে বাসের ভাড়াটুকু ছাড়া তার তো আর খরচ কিছু নেই। তাছাড়া তাদের বাড়িতে এখনও আত্মীয়স্বজন কেউ এলে যাওয়ার সময় হাতে টাকা গুঁজে দেওয়ার চল আছে। মাসে বারদুয়েক কেউ না কেউ তো আসেই। তাই রুচির ভাঁড়ার ভরাই থাকে।

ধর্মতলায় একটা দারুণ ইংরাজি ছবি এসেছে। ম্যাকেনাস গোল্ড। গ্রেগরি পেক আর ওমর শরিফ আছে। রুচিদের ক্লাসের মেয়েরা অনেকেই দেখেছে। রুচিরও খুব দেখার ইচ্ছে। বাড়ি থেকে যাওয়া হবে না। বাবা প্রচুর ইংরাজি বই পড়েন ঠিকই কিন্তু ইংরাজি সিনেমা দেখায় আপত্তি আছে। বিশেষ করে ওরকম খোলামেলা দৃশ্য ছেলে-মেয়ের সঙ্গে বসে দেখার তো প্রশ্নই ওঠে না। ক্লাসের বন্ধুদের সঙ্গে দলবেঁধে যাওয়া যেতে পারে। কিন্তু তাহলে আবার ফেরাটা একটু ঝামেলার। সিনেমা দেখে বেরিয়ে ঠিক কোন বাস কোথা থেকে ধরতে হবে জানে না রুচি। এখনও রাস্তাঘাটে চলাচলটা তার খুব সড়গড় হয়নি। কিন্তু সেকথাটা তো আর বন্ধুদের বলা যাবে না, তাহলেই সবাই মিত্তির বাড়ির রাজকন্যে বলে ক্ষেপাতে শুরু করবে। সত্যি কথা বলতে কী বাড়ি থেকে কলেজ ছাড়া বাসে চেপে তেমন তো আর যাওয়া হয় না কোথাও। বাকি সব যাওয়া- আসা বাড়ির গাড়িতেই, তা সে বালিগঞ্জের পিসিমণি হোক কিংবা সিঁথির মেজমামা। শীতের ছুটিতে বাবা সবাইকে নিয়ে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল আর চিড়িয়াখানাও ঘুরিয়ে আনে। কিন্তু তাতে তো আর রাস্তা চেনা যায় না। মায়ের ইচ্ছে ছিল কলেজটাও গাড়িতেই যাক। বাবাকে অফিসে পৌঁছে দিয়ে শিবুদা নাহয় ফিরে আসবে। কিন্তু কলেজে একেকদিন একেকসময় ক্লাস, ছুটির কোনও ঠিক নেই, এইসব নানা কথা বলে বহু কষ্টে সেটা আটকানো গেছে।

 রুচি তাই ঠিক করে নিয়েছে সিনেমাটা সে বিহানের সঙ্গেই দেখবে। কিন্তু সময় বার করা কঠিন। সুযোগ পাওয়া গেল একটা বুধবার। একজন প্রফেসার আসবেন না। তিনি পরপর দুটো ক্লাস নেন। তাই সেই সময়টা ফাঁকা পাওয়া যাবে। সোমবার বিকেলে বিহানের সঙ্গে দেখা হতেই তাই আর সময় নষ্ট না করে কথাটা বলে ফেলে সে। বিহানের আপাতত পরীক্ষা শেষ হয়ে ছুটি চলছে। তাই অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু রুচির প্রস্তাব শুনে গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ল বিহান, বুধবার হবে না রুচি। কলেজে আমার জরুরি মিটিং আছে?

কলেজে আবার মিটিং কিসের…

সামনেই কলেজ ইলেকশন। সেখানে এবার আমরা ক্যান্ডিডেট দেব ঠিক করেছি।যদিও জানি না শেষপর্যন্ত পারব কিনা। ছাত্র পরিষদের ছেলেরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে এমনভাবে ভয় দেখায় যে বেশিরভাগ ছেলে-মেয়েই রাজি হয় না। তবু চেষ্টা তো করতেই হবে।

কথাগুলো কিছুই মাথায় ঢুকলো না রুচির। কয়েকদিন আগেই ভোট হয়ে গেছে। তার অবশ্য এখনও ভোট দেওয়ার বয়স হয়নি। তবে মা-বাবা-ঠাম্মা সবাই গিয়ে ভোট দিয়ে এসেছে। ভোটে কংগ্রেস জিতেছে। সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। এসবই তার জানা। কিন্তু বিহান কোন ইলেকশনের কথা বলছে ? রুচির মুখ দেখে বোধহয় তার প্রশ্নগুলো কিছুটা আঁচ করতে পারে বিহান। তাই একটু নীচু গলায় বলে, চলো কলেজ স্কোয়ারে গিয়ে বসি। এখানে বড্ড ভিড়। কথা বলা যাবে না। আর শোনো আজকে যে কথাগুলো বলবো, সেগুলো কিন্তু কারও সঙ্গে আলোচনা করবে না। বাড়িতে তো নয়ই বন্ধুদের সঙ্গেও নয়।

দু’ভাঁড় চা আর একঠোঙা বাদামভাজা নিয়ে বসে সেদিন অনেকক্ষণ কথা বলেছিল তারা। বলেছিল অবশ্য বিহানই। রুচি প্রায় পুরো সময়টাই শ্রোতা। এমন অনেক কথা সেদিন বলেছিল বিহান যেগুলো সে আগে কোনওদিন শোনেনি।

শোনো রুচি আমরা একটা খুব বিপজ্জনক সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। এবারের ইলেকশনে কংগ্রেস জিতেছে। মানুষের ভোটে জেতেনি। জিতেছে গুণ্ডা লেলিয়ে, ভয় দেখিয়ে। বামপন্থীদের যাঁরা ক্যান্ডিডেট ছিলেন তাঁরা প্রায় সবাই হেরেছেন। এই অবস্থায় কংগ্রেস আর ওদের ছাত্র সংগঠন ছাত্র পরিষদের নেতারা বিরোধীদের টুঁটি টিপে মেরে ফেলতে চাইছে। এমন পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে যে ভয়ে কেউ কোনও কথা বলতে সাহস পায় না। কিন্তু আমরা ওদের এই অত্যাচার মেনে নিতে রাজি নই। তাই আমরা ঠিক করেছি যাই ঘটুক না কেন কলেজ ইলেকশনে আমরা প্রার্থী দেব। তাতে যদি গ্রেফতার হতে হয় কিংবা মার খেতে হয়, তাহলেও তাতেও রাজি আছি…

তোমরা মানে কারা বিহান?

ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করে রুচিরা।

আমাদের সংগঠনের নাম স্টুডেন্ট ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া, আমরা বলি এসএফআই। আগে নাম ছিল এসএফ। দুবছর আগে নাম বদলে এসএফআই হয়েছে। আমরা মানুষের জন্য কাজ করি। গরিব, মেহনতি মানুষের পাশে দাঁড়ানোই আমাদের কাজ। এই সিস্টেমটাকে বদলে সর্বহারার রাজ প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের লক্ষ্য। সেজন্য আমরা শ্রমিকদের মধ্যে, কৃষকদের মধ্যে প্রচার চালাই। একটা কথা জেনে রাখো রুচি, বামপন্থা ছাড়া, সাধারণ মানুষের বাঁচার আর কোনও পথ নেই। এই স্বৈরতান্ত্রিক কংগ্রেস দেশের মানুষকে ধ্বংস করে দেবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সেদিকেই নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এরকম ভয়ঙ্কর, নিষ্ঠুর মহিলার উদাহরণ তুমি ইতিহাসেও খুব বেশি পাবে না। দেখে নিও দেশের মানুষ ওকে রক্তচোষা ডাইনি হিসাবেই মনে রাখবে…

ইন্দিরা গান্ধীর ছবি দেখেছে রুচি। অসম্ভব সুন্দর দেখতে একজন মহিলা। কপালের ওপর থেকে একগোছা পাকা চুলের জন্য যেন আরও বেশি সুন্দর দেখায়। নেহেরুর মেয়ে। ঠাম্মা বলে বাপের উপযুক্ত মেয়ে। দেশ স্বাধীন করার জন্য গান্ধীজির পাশে দাঁড়িয়ে লড়েছিলেন নেহেরু। কতবার জেলেও গেছেন। এসব কথা রুচি বাবার কাছে, ঠাম্মার কাছে অনেকবার শুনেছে। কিন্তু আজ বিহান একদম উল্টো কথা বলছে। বিহানের কথাগুলো বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে তার কিন্তু আবার মনের ভিতর থেকে একটা বাধাও আসছে। আসলে বিহান যখন কথা বলে তখন তার মধ্যে এমন একটা জোর ফুটে বেরোয়, এমন আবেগ দিয়ে যুক্তির পর যুক্তি সাজায় যে তার সামনে অন্য ভাবনাগুলো ভুল মনে হতে বেশি দেরি হয় না। রুচি বুঝতে পারে বিহানের যুক্তিকে খণ্ডন করার ক্ষমতা তার নেই। বরং এই নতুন ভাবনার স্রোতে সে খুব দ্রুত ভেসে যাচ্ছে।

কাউকে কিছু বলেনি রুচি। পরে খেয়াল করে দেখেছে, যেসব কথা সেদিন শুনেছিল সেরকম পোস্টার তাদের কলেজের দেওয়ালেও সাঁটা আছে। যদিও কারা সেগুলো লাগিয়েছে জানতে পারেনি। বিহানদের কলেজের নির্বাচন নিয়ে ভালোরকম গণ্ডগোল হয়েছিল। বেশ কয়েকজন ছেলে মারও খেয়েছিল। বিহানের অবশ্য কিছু হয়নি। তবে গণ্ডগোলের পরে দুদিন বিহান কলেজে আসেনি। কোনও খোঁজ-খবর না পেয়ে রুচির যখন প্রায় পাগল পাগল অবস্থা তখনই তৃতীয় দিনে দেখা হল আবার। বিহানের কাছেই রুচি শুনলো গণ্ডগোল হলেও তাদের দলের ছেলেদের কিছু হয়নি। কারণ ঝামেলাটা হয়েছিল ছাত্রপরিষদের সঙ্গে নকশালদের। মার খেয়েছে তারাই।

এই নকশালদের নিয়ে বড্ড ঝামেলা বুঝলে রুচি। সবসময় এমন গোঁয়ার্তুমি করে। আরে বাবা, সময় বুঝে যে খানিকটা সমঝোতা করে চলতে হয় সেই জ্ঞানটুকু নেই। তাই মার খেয়ে মরে।

 নকশালদের সম্পর্কে তেমন কোনও ভালো ধারণা রুচিরও নেই। তারা মূর্তি ভাঙে, কলেজের লাইব্রেরিতে আগুন লাগিয়ে দেয়, বোমা-বন্দুক নিয়ে ঘোরে, এসবই সে শুনেছে। তাই ওবিষয়ে আর কোনও আগ্রহ সে প্রকাশ করে না। কিন্তু এই ঘটনার পর ক্রমশ একটু একটু করে বিহানের জীবনযাত্রার সঙ্গে সে নিজেও জড়িয়ে যেতে থাকে। বিহান অনেক কিছু করে। পাস করে সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে। কিন্তু তার আগে হাতে অনেকটা সময় আছে। তাই ব্যস্ততাও বেড়েছে। কোনওদিন তাকে যেতে হয় কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলতে। কখনও ইস্তাহার বিলি করার দায়িত্ব পায়। কখনও আবার পোস্টার লিখে রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে দেওয়ালে দেওয়ালে মারতে যায়। পার্টির মিটিং সেরে বাড়ি ফিরতে প্রায় রোজই তার অনেকটা রাত হয়। এসব কাজে সঙ্গী হওয়া রুচির পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু সপ্তাহে দুদিন আরও একটা জায়গায় যায় বিহান, যাকে ওরা বলে স্টাডি সার্কেল। সেখানে রাজনৈতিক পড়াশোনা হয়। তাদের লক্ষ্য কী, কীভাবে লক্ষ্য পূরণের দিকে এগোতে হবে এসব নিয়ে আলোচনা চলে, তর্কাতর্কিও হয়। স্টাডি সার্কেলে বিহান যায় রুচি জানে। সে নিজে কোনওদিন যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেনি, কারণ ব্যাপারটা যে কী সেটাই তার ঠিক করে মাথায় ঢোকেনি। কিন্তু একদিন বিহান নিজেই বলল, কাল দুপুরে মানিকতলায় আমাদের একটা স্টাডি সার্কেল আছে। তুমি যাবে?

আমি! আমি গিয়ে কী করব?

কী আশ্চর্য! শুনবে। আমরা কী আলোচনা করি জানতে ইচ্ছে করে না তোমার! আমার স্বপ্নের শরিক হতে চাও না তুমি?

বিহানের এহেন কথায় খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে যায় রুচি, না না তা নয়। তবে তোমার পলিটিক্যাল পড়াশোনা যতটা আমার তো ততটা নয়। তাই একটু অস্বস্তি লাগছে…

কিচ্ছু অস্বস্তি লাগবে না। চলো। কাল ভবেশদা আসবেন। অসম্ভব ভালো বক্তা। সবকিছু কেমন সহজভাবে বুঝিয়ে দ্যান দেখো।

মানিকতলার বাসে উঠেই বিহান বলে দিয়েছিল, বাস থেকে নেমে আমার সঙ্গে আর কোনও কথা বলবে না রুচি। চুপচাপ একটু দূরত্ব রেখে পিছন পিছন যাবে…

কিন্তু ভিড়ে তুমি যদি হারিয়ে যাও?

চিন্তা কোরো না। তুমি পিছনে আসছে কিনা আমি খেয়াল রাখব।

অন্যরকম একটা উত্তেজনায় বুকের ভিতরে ধুকপুক করছিল রুচির। নিষিদ্ধ কিছু একটা করার উত্তেজনা। ভয়ও করছিল। কী হতে পারে বিহানের সঙ্গে তাকে দেখলে? পুলিশ কি তাকেও ধরবে?

মানিকতলা মোড়ে নেমে ট্রামলাইন ধরে খানিকটা হেঁটে বাঁ দিকে একটা রাস্তায় ঢুকল বিহান। রুচিও আসছে পিছন পিছন। দু-একবার এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করেছে কেউ তাদের অনুসরণ করছে কিনা। তবে সেরকম কিছু মনে হয়নি। দুপাশে বাড়ি। তখনও বিকেল হয়নি বলে রাস্তায় লোকজন তেমন নেই। একটা মিষ্টির দোকানে সিঙাড়া ভেজে ঝুড়িতে রাখছে। স্কুল পড়ুয়া কয়েকটা মেয়ে হাঁটছে কলকল করে গল্প করতে করতে। বিহান বেশ জোর পায়ে হাঁটছে। তবে তাতে অসুবিধা হয়নি রুচির। আরও খানিকটা গিয়ে একটা গলির ভিতরে ঢুকল বিহান। কয়েক পা এদিয়েই ডানহাতে একটা কালো গেট। তার সামনে দাঁড়িয়ে একবার চোখের ইশারা করল রুচিকে। তারপর গেটটা খুলে ঢুকে গেল ভিতরে।

বাড়িটা বিহান পরে বলেছিল তাদেরই পার্টির কমরেড সুবলদাদের। বেশ বড় দোতলা বাড়ি। একতলার একটা ঘরে জমায়েত হয়েছে সবাই। রুচি আর বিহান যখন পৌঁছাল, তখন সেখানে আরও সাত-আটজন ছেলে বসে রয়েছে। টাইট করে একটা বেণী বাঁধা, বেশ মিষ্টি চেহারার একটি মেয়েও রয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে রুচির থেকে একটু বড়ই হবে। মাটিতে সতরঞ্চি পেতে গোল হয়ে বসেছে সকলে। একপাশে একটা তক্তাপোশ পাতা। সেখানে একজন ভদ্রলোক বসেছিলেন। বিহান রুচিকে তার কাছে নিয়ে গিয়ে বলল, সুবলদা, এ হল আমার বন্ধু রুচিরা। স্কটিশে পড়ে। ও আমাদের কাজকর্ম সম্পর্কে জানতে চায়। তাই ভাবলাম আজকে তুমি আছ, ভবেশদাও আসবেন। তাই ওকে নিয়ে এলাম।

ভালো করেছিস। কমরেড রুচিরা আপনি বসুন। আমাদের কথা শুনুন। কোনও প্রশ্ন থাকলে অবশ্যই জিজ্ঞাসা করবেন। তবে একটা কথা বিহান নিশ্চয় আপনাকে বলেছে, তাও একবার মনে করিয়ে দিই, আমাদের চারপাশের অবস্থাটা এখন খুব সুবিধাজনক নয় তো। তাই এখানে যা কথাবার্তা হবে তা নিয়ে বাইরে কারও সঙ্গে আলোচনা করবেন না।

কমরেড শব্দটা শুনেই কেমন যেন গা শিরশির করছিল রুচির। ভদ্রলোকের চোখদুটোও ভীষণ তীক্ষ্ণ। অন্তর্ভেদী দৃষ্টি। তাই নিঃশব্দে মাথা নেড়ে বিহানের পাশে সতরঞ্চিতে বসে পড়ে। ঘরটা বেশ বড়। জানলায় ভারী পর্দা দেওয়া আছে। তাই বাইরের আলো আসছে না। ভিতরের দিকে যাওয়ার একটা দরজা আছে। সেটা বন্ধ। এখানে যারা এসেছে বোঝাই যাচ্ছে পরস্পরের পরিচিত। সবাই নিজেদের মধ্যে নীচুস্বরে কথাবার্তা বলছে। সুবলদা একটা কোনও বই উল্টেপাল্টে দেখছেন। একটা থালার ওপর মাটির ভাঁড় বসিয়ে চা দিয়ে গেল একজন। রুচির একটু একটু দুশ্চিন্তা হচ্ছে। বাড়ি ফিরতে বেশি দেরি হয়ে গেলে মুশকিল। ঠিক সেই সময় দরজা ঠেলে একজন লম্বা মতো ভদ্রলোক ঢুকলেন। গেরুয়া রঙের হাফহাতা পাঞ্জাবি আর পাজামা পরা। মাথায় ঝাঁকড়া চুল। কাঁধে একটা কাপড়ের ঝোলা।

একটু দেরি হয়ে গেল কমরেড। যাদবপুর থেকে আসছি, রাস্তায় বাসটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল। আশা করি আপনাদের খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি…

বলতে বলতে ভদ্রলোক গিয়ে তক্তাপোশে সুবলদার পাশে বসে পড়েন। দুজনে কিছু আলোচনা সেরে নেওয়ার পরেই কথা বলতে শুরু করেন ভবেশদা।

কমরেড, আজ আমাদের এই স্টাডি সার্কেলে মূলত আলোচনা করব মার্কসবাদ বিষয়ে। মার্কসবাদ কী এবং কেন। এখানে কমরেড বিহান ছাড়া আরও দু-একজন আছেন যাঁরা এই আলোচনায় আগে অংশ নিয়েছেন। কিন্তু অন্য যাঁরা নতুন এসেছেন, তাঁদের জন্য আমার মনে হয় এই কথাগুলো জরুরি। আজকের আলোচনা শেষ হয়ে গেলে সুবল আপনাদের কয়েকটা বইয়ের নাম দেবে। সেগুলো আপনারা সংগ্রহ করে পড়ে নেবেন। তাতে আজ আমি যা বলব সেই আলোচনার ভিত্তিটা মজবুত হবে। তবে একটা কথা বলে রাখি মার্কসবাদ কী এবং কেন সেটা আমাদের মতো যারা বামপন্থী রাজনীতি করেন তাঁদের জানাটা দরকার। কিন্তু তার থেকেও অনেক বেশি জানা দরকার মাঠে, ঘাটে, কলকারখানায় যেসব শ্রমিক-কৃষক লড়াই করছেন, তাঁদের জীবন, তাঁদের সংগ্রামের কথা। কারণ আমাদের কাজ কিন্তু বিপ্লবের স্বার্থে তাঁদের পাশে দাঁড়ানো, সেই লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। বিপ্লব বলতে আমি কিন্তু জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের কথাই বলছি। যদিও আমরা সবাই জানি যে আমাদের দেশে এখন বিপ্লবের পরিস্থিতি নয়। কিন্তু তারজন্য তো আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারি না বা লড়াই থেকে সরে আসতে পারি না। আমাদের বুঝতে হবে যে এই মুহূর্তে এই সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকেই আমাদের লড়াইটা চালাতে হবে। তারজন্যই আমরা নির্বাচনে অংশগ্রহণের কথা বলছি। নির্বাচনে বামপন্থীরা জয়ী হলে, এই রাষ্ট্র ব্যবস্থা যে আসলে সাধারণ মানুষের জন্য নয়, এরা পুঁজিপতিদের হাতই শক্ত করে এই কথাটা মানুষকে বোঝানোর একটা সুযোগ পাওয়া যাবে। মানুষ ক্রমশ এই ব্যবস্থা সম্বন্ধে বীতশ্রদ্ধ হবে এবং বিপ্লবের পথ প্রশস্ত হবে…

সেদিন অনেক কথাই বলেছিলেন ভবেশদা। তারমধ্যে মার্কসবাদ যে আসলে বিজ্ঞান, দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ আর ঐতিহাসিক বস্তুবাদ দ্বারা পরীক্ষিত সত্য। পুঁজিবাদ কাকে বলে। মার্কস কীভাবে পুঁজিবাদকে ব্যাখ্যা করেছেন…এরকম অনেক কঠিন কঠিন গম্ভীর কথাও ছিল। ভদ্রলোকের গলার স্বর বেশ ভরাট। কথা বলার ধরনটিও সুন্দর। প্রতিটি শব্দ এমনভাবে উচ্চারণ করেন যেন মনে হয় তাঁর উচ্চারিত কথাগুলোই ধ্রুবসত্য, এর বিরুদ্ধে কোনও যুক্তিই দাঁড়াতে পারে না। মন দিয়ে শুনেছিল রুচিরা। যদিও প্রায় কিছুই বোঝেনি। তার কেবলই মনে হচ্ছিল ভদ্রলোক আসলে কী বলতে চান সেটা যেন কিছুতেই ধরা যাচ্ছে না। তাদের কলেজের প্রফেসর মানস ভৌমিক যেমন অরগানিক কেমিস্ট্রির জটিল থিওরি মজা করে গল্পের ছলে এমন সহজভাবে বলেন যে মাথার মধ্যে ঢুকে যায়, ইনিও সেই বিদ্যাটি রপ্ত করতে পারলে ভালো হত।তবে সেদিন স্টাডি সার্কেল থেকে বেরিয়ে বিহান যখন জিজ্ঞাসা করেছিল তখন এসব বলেনি। বরং বিহান যখন ভবেশদাকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত হচ্ছিল তখন ঘাড় নেড়ে সায়ই দিয়েছিল। সে কতটা কী বুঝল সেই প্রশ্ন অবশ্য বিহান তোলেনি, তুললে বিপদ হত নিশ্চিত। অবশ্য অতকথার বলার মতো সময়ও ছিল না। সুবলদার বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রায় দৌড়তে দৌড়তে মোড়ে এসে বাস ধরেছিল রুচি। তখনও আলোচনা শেষ হয়নি। তাই তাকে বাসে তুলে দিয়ে বিহান ফিরে গেছিল সুবলদার বাড়িতে।




রাধাদা একটা নতুন নাটক করছেন, বিহানের মুখে কথাটা শুনে বেশ একটু উত্তেজিত হয়ে ওঠে রুচি। যদিও নাটকের সূত্রেই তাদের দুজনের আলাপ কিন্তু প্রেমের এই প্রাথমিক পর্বে তাদের মধ্যে নাটক নিয়ে বিশেষ কোনও কথাবার্তা হয়নি। রুচি দু-একবার প্রসঙ্গ তুললেও বিহান যেন খানিকটা এড়িয়েই গেছে। আজ তাই কথাটা শুনে মনের ভিতরটা চনমন করে ওঠে তার।

কী নাটক, রবীন্দ্রনাথের?

নাঃ। রবীন্দ্রনাথ আজকাল আর রাধারমণ তপাদার করেন না। ইদানীং অন্য ধরনের নাটক করছেন, বিহানের গলায় যেন একটু অসন্তোষ আর তাচ্ছিল্যের সুর। তবে তাতে খুব একটা গুরুত্ব দেয় না রুচি।

সে নাই করতে পারেন। সবসময় রবীন্দ্রনাথের নাটকই যে করতে হবে তার কী কোনও মানে আছে নাকি। কী নাটক করছেন তুমি জানো?

তা জানি। উড়িষ্যার একজন খুব নামকরা লেখক আছেন ভগবতী চরণ পাণিগ্রাহী। তাঁর লেখা গল্প। গল্পটার নাম শিকার। সেটাকে নিজেই নাট্যরূপ দিয়েছেন। নামটা অবশ্য শিকারই থাকবে কিনা এখনও বোধহয় ঠিক হয়নি। বদলেও দিতে পারেন।

গল্পটা তুমি পড়েছো?

 হ্যাঁ তা পড়েছি। রাধাদা করছেন শুনে খোঁজ করছিলাম। আমাদের সিনিয়র পার্থদা নানারকম অনুবাদ গল্পের খোঁজ রাখে। ওকে জিজ্ঞাসা করতে একটা বইয়ের নাম বলল। আমাদের লাইব্রেরিতে ছিল। পড়লাম। ইংরাজি অনুবাদ অবশ্য। আমার তেমন আহামরি কিছু লাগেনি।

চলো না একদিন রিহার্সালে যাই। নাটক শুরুর আগে এই সলতে পাকানোর ব্যাপারটা আমার বেশ লাগে। আগে অবশ্য কোনও ধারণা ছিল না। রক্তকরবী করতে গিয়েই জানলাম যে একটা নাটক করতে গেলে তার সঙ্গে আরও কত কিছু জানতে হয়, পড়তে হয়…

রাধাদা আমাকে বলেছেন দেখা করতে। হয়তো কোনও পার্ট ভেবেও রেখেছেন। একদিন যাওয়া যেতেই পারে…কিন্তু তুমি কি পারবে? ওঁর দলের অফিসটা হচ্ছে এন্টালির কাছে। চারটের আগে মহড়া শুরুও হয় না। তোমার বাড়িতে অসুবিধা হবে না।

অসুবিধা হবে রুচি খুব ভালো করে জানে। কিন্তু তার যাওয়ার আগ্রহটা এতই তীব্র যে সে বিন্দুমাত্র না ভেবেই বলে, সে আমি ঠিক সামলে নেব। শুচি আর দীপিকা তো একদিন আমাদের বাড়ি গেছিল। আমিও একদিন নাহয় ওদের বাড়ি ঘুরে আসব। ওরকম অল্পস্বল্প মিথ্যে কথা মা ধরতে পারে না। তুমি কবে যাবে বলো।

এন্টালি অঞ্চলে কখনও যায়নি রুচি। একেবারে পাঁচমিশালী একটা জায়গা। বিভিন্ন ধর্মের মানুষ যে পাশাপাশি বাস করেন সেটা এলাকায় ঢুকলেই বোঝা যায়। ছোট্ট শিবমন্দির পেরোনোর সময় মসজিদের আজান শোনা যাচ্ছে। আবার বড় রাস্তার ধারেই বেশ বড় চার্চও আছে একটা। রাধাদার নাটকের দলের জায়গাটা রুচিরা যেখানে বাস থেকে নামল সেখান থেকে খুব বেশি দূর নয়। চারটে বাজেনি তখনও। তবে ভিতরে ঢুকে দেখা গেল রাধাদা এরমধ্যেই এসে গেছেন। দলের আরও কয়েকজনও এসেছে। বিহানের সঙ্গে রুচিকে দেখে রাধাদা যে বেশ অবাক হলেন সেটা বোঝা গেল। কিন্তু মুখে কিছু প্রকাশ পেল না। বরং বেশ স্বাভাবিকভাবেই বললেন, আয় বোস….সমীর আরও দুটো চা বলে দে। কলেজ লাইফ কেমন লাগছে?

ভালই তো। বিহান বলল আপনি নতুন নাটক করছেন। তাই ভাবলাম একবার যাই…

বেশ করেছিস। সবাই এখনও এসে পৌঁছায়নি। মহড়া শুরু হতে মিনিট পনেরো দেরি আছে। তোরা বরং নাটকটায় ততক্ষণ একবার চোখ বুলিয়ে নে। বিহান একটা মহাজনের চরিত্র আছে। সেটার জন্য আমি তোর কথা ভাবছিলাম।

নাটকটা পড়ে কিন্তু দারুণ লাগল রুচির। একেবারে অন্যরকম একটা গল্প। পড়লে গায়ে কাঁটা দেয়।

মহড়া শুরু হয়ে গেল একটু পরেই। একেবারে শুরুর দিক। তাই এখন শুধু পড়া চলছে। গোল হয়ে সবাই বসে নিজেদের অংশটা পড়ছে। নাটকের মূল চরিত্র ঘিনুয়া করছে সমীর নামে ছেলেটি। আর তার বউ ডুঙ্গরির পার্ট করছে পূর্বা। রুচির বারেবারেই মনে হচ্ছিল পূর্বা যেভাবে ডুঙ্গরির সংলাপ বলছে, তার থেকে অনেক ভালো ভাবে সে বলতে পারবে। রাধাদা যদি তাকে একবার পড়ার সুযোগ দেন। কিন্তু সেকথা তো মুখে বলা সম্ভব নয়, তাই চুপ করেই থাকতে হল। মহাজনের সংলাপ বিহানও যে খুব ভালো পড়ছে তেমনটা নয়। কেমন যেন একটা দায়সারা ভাব গলায়। রাধাদার মুখ গম্ভীর। পছন্দ হচ্ছে না বোঝাই যাচ্ছে।

কথাটা বেরিয়ে এসে বিহানকে বলেই ফেলল রুচি, তুমি ওরকম কাঠ কাঠ ভাবে ডায়লগ বলছিলে কেন? রাধাদার তো পছন্দ হচ্ছিল না মনে হল। আমার তো ভয় লাগছিল এই বুঝি খেঁকিয়ে ওঠেন। প্রথমদিন বলেই বোধহয় কিছু বললেন না।

নাটকটা আমি করব না তাই। রাধাদাও সেটা খুব ভালোই বুঝেছেন, তাই কিছু বলেননি।

করবে না কেন? আমার তো পড়ে বেশ ভালোই লাগল।

ভালো-মন্দের প্রশ্ন এটা নয়। এই নাটকে যে রাজনীতির কথা বলা হচ্ছে আমরা সেটাকে সমর্থন করি না। কিন্তু রাধাদা খুঁজে খুঁজে এই গল্পটাই বেছেছেন। আমার আপত্তি সেখানেই। রাধাদাও তো একসময় আমাদের সঙ্গেই ছিলেন। তবে কিছুদিন হল একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে। কানাঘুষোয় নানারকম কথাবার্তাও শুনছিলাম। এখন তো মনে হচ্ছে সেগুলো ঠিকই…..

শিকার গল্পটার মধ্যে রাজনীতি কোথায় আছে ঠিক বোঝে না রুচি। যদি কিছু থাকেও তাহলে তো সেটা গরিব মানুষের ওপর অত্যাচারের কথাই। বিহান নিজেও তো সেকথাই সারাক্ষণ বলে। সেদিন ভবেশদাও একই কথা বললেন। বিহানের আপত্তির জায়গাটা ঠিক ধরতে না পারলেও সে যে নাটকটা করবে না এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না। তবে বিহান যদি নাও করে, তাহলেও তার নিজের তো করতে কোনও অসুবিধা নেই।

আমার খুব ইচ্ছে করছিল রাধাদাকে একবার বলি, ওই ডুঙ্গরির সংলাপটা আমাকে একবার বলতে দিন। ওই পূর্বার থেকে আমি অনেক ভালো বলব…

রুচির কথা শেষ হওয়ার আগেই দাঁড়িয়ে পড়ে বিহান, তার মানে? তুমি কি নাটকটা করবে ভাবছ নাকি?

রাধাদা বললে করতেই পারি। বিশেষ করে ওই ডুঙ্গরির চরিত্রটা। আমার দারণ লেগেছে।

রুচি শোনো, ওই নাটকটা তুমি করতে পারবে না। ব্যাপারটা সিরিয়াস। সুবলদা জানতে পারলে খুব বিরক্ত হবেন।

আমি নাটক করলে সুবলদা বিরক্ত হবেন কেন?

বিহানের কথা শুনে রুচি প্রায় আকাশ থেকে পড়ে।

কী আশ্চর্য, তুমি তো আমার…মানে আমার বান্ধবী। আমার সঙ্গে স্টাডি সার্কেলে গেছো। তারমানে এটা সবাই ধরেই নিয়েছে যে তুমি হয়তো এখনও দলের সদস্য নও। কিন্তু আমাদের মতাদর্শে তোমার বিশ্বাস আছে। ভবিষ্যতে তুমি দলে যোগ দেবে। আমার ওপর দলের সেই আস্থাটা আছে। এখন তুমি যদি হঠাৎ ওই রাধারমণ তপাদারের দলে ভিড়ে যাও, তাহলে সবাই বিরক্ত হবেই। তাছাড়া তুমি যে এই নাটক করার কথা ভাবছো, তোমার বাড়িতে মেনে নেবে ? এন্টালিতে গিয়ে প্রতিদিন রিহার্সাল দিতে হবে। নাটকের শো থাকলে সেটা করতে হবে। তোমাদের উত্তর কলকাতার বনেদি বাবা এসব মেনে নেবেন তো? বিহানের গলায় বেশ খানিকটা ব্যঙ্গের সুর। কথাটা যে খুব মিথ্যে বলছে তাও নয়। বাড়ির অনুমতি পাওয়ার ব্যাপারে রুচির নিজের মধ্যেও যথেষ্ট সংশয় আছে। কিন্তু বিহানের এই আপত্তিটা তার ভালো লাগে না। কেমন যেন মনে হয় বিহান জোর করে তাকে নিজের মতে চালাতে চাইছে। কিন্তু কোনও ব্যাপারেই জোরাল প্রতিবাদ করা কিংবা চট্ করে ঘুরিয়ে কিছু বলা তার আসে না। তাই চুপ করে যায়। কিন্তু মন থেকে ইচ্ছেটাকে মুছে ফেলে না। সেদিন রাতে ঘুমোনোর আগে বেশ কিছুক্ষণ বিষয়টা নিয়ে নিজের মনের মধ্যে নাড়াচাড়া করে ঠিক করে, বিহানকে আপাতত কিছু বলার দরকার নেই। জায়গাটা তো সে চিনেই গেছে। সামনের সপ্তাহে বিহান তার মাকে নিয়ে দুদিনের জন্য বর্ধমান যাবে। সেই সময় সে গিয়ে রাধাদার সঙ্গে দেখা করবে। আগে জানা দরকার রাধাদা তাকে নাটকে নিতে রাজি কিনা। যদি রাজি থাকেন, তাহলে তখন বাবার সঙ্গে কথা বলতেই হবে। বাবা রাজি হলে নাহয় বিহানকে মানিয়ে নেওয়া যাবে। সে এমন কিছু কঠিন কাজ হবে না।

মহড়া ঘরের দরজায় রুচিকে দেখে রাধাদার ভুরুতে ভাঁজ পড়ল। চেয়ার থেকে উঠে এসে কিছু বলার আগে প্রথমে পিছনটা দেখলেন। তারপর বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, একা এসেছিস নাকি?

হ্যাঁ…মানে বিহান আসলে কলকাতায় নেই। একটু বাইরে গেছে।

অপ্রস্তুত মুখে কথাগুলো বলে রুচিরা। কিন্তু রাধাদার মুচকি হাসি দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না,তার চুরি ধরা পড়ে গেছে।

আয় বোস্। নিজে চিনে আসতে পেরেছিস মানে এখন রাস্তাঘাটে অনেকটা সড়গড় হয়েছিস। খুব ভালো কথা। একলা পথ চলার অভ্যাস জীবনে খুব জরুরি।

সেদিন নাটকটা আমার খুব ভালো লেগেছে রাধাদা।

এটা একটু অন্যরকম নাটক রে। একটা গল্পকে আমি নাট্যরূপ দিয়েছি। এই কাজটা প্রথমবার করলাম। এর আগে নাটক বেছে নিয়ে কাজ করেছি। কিন্তু একটা গল্পকে নাটক হিসাবে দাঁড় করানো, একদম অন্যরকম একটা ব্যাপার…নিজের মনেই একটা সন্দেহ ছিল, তোর ভালো লেগেছে, আমার ছেলে-মেয়েদেরও ভালো লেগেছে। তারমানে খুব একটা খারাপ উতরোয়নি।

রাধাদার মুখে একটা প্রায় শিশুসুলভ খুশির হাসি। মনটা ভালো হয়ে যায় রুচির।

আমি আপনার নাটকে অভিনয় করতে চাই রাধাদা, আমাকে নেবেন?

তুই করবি! তাহলে তো খুব ভালো হয়। ঠিক আছে বসে যা ওদের সঙ্গে…

সেদিনের মহড়ায় ডুঙ্গরির সংলাপ ওকে দিয়ে পড়ালেন রাধাদা। সবাই বলল ও খুব ভালো পড়েছে। এমনকী পূর্বা পর্যন্ত নিজে থেকেই বলল, আমার থেকে রুচিরা অনেক ভালো করবে দাদা। আপনি ওকেই ডুঙ্গরির পার্টটা দিন।

সেদিন এন্টালি থেকে প্রায় উড়তে উড়তে বাড়ি ফিরল রুচিরা। তারপর রাতে খাবার টেবিলে কথাটা পাড়ল। ঠাম্মা আগেই দুধ-খই খেয়ে শুয়ে পড়ে। রাতের খাবার তারা তিনজনেই খেতে বসে। ইচ্ছা করেই তাই সেইসময় কথাটা বলবে ঠিক করেছিল রুচি। কারণ ঠাম্মা থাকলেই মায়ের পৃষ্ঠবল বাড়ে আর দুজনে মিলে বাবাকে জব্দ করে ফেলার চেষ্টা করে। তবে সেসব কিছুর অবশ্য দরকার পড়ল না। কথাটা বলা মাত্রই বোমার মতো ফেটে পড়ল বাবা।

নাটক করবে মানে! মিত্তির বাড়ির মেয়ে রঙ মেখে স্টেজে উঠে অ্যাক্টো করবে! এতদূর অধঃপতন হয়েছে তোমার! এখন তো মনে হচ্ছে তোমাকে কলেজে পাঠানোই আমাদের উচিত হয়নি। পড়াশোনা শিখে এইসব বুদ্ধি হচ্ছে। ভালোবাড়ির মেয়েরা নাটক করে কখনও শুনেছো?

কিন্তু আমি তো রক্তকরবী করলাম…

ক্ষীণ গলায় নিজের আর্জি পেশ করার চেষ্টা করে রুচি। ভয়ে তার হাত-পা কাঁপছে। বাবাকে এতখানি রাগতে সে কখনও দেখেনি।

ওটা কি নাটক নাকি, ওটা তো ছেলেখেলা। পাড়ার ছেলেরা এসে ধরেছিল, তাই রাজি হয়েছিলাম। ঘরের পাশে ক্লাব। সেখানে রিহার্সাল। সবাই চেনাশোনা লোক। তাই মনে হয়েছিল, ঠিক আছে করুক। ছেলেগুলো আশা করে এসেছে। এখন তো দেখছি ভুল করেছি। শেয়ালকে আখের ক্ষেত দেখাতে নেই। ওখান থেকেই তারমানে তোমার মাথায় নাটকের ভূত ঢুকেছে। ঢোকালটা কে? ওই রাধারমণ তপাদার নিশ্চয়। লোকটাকে দেখেই আমার মনে হয়েছিল সুবিধার নয়। ওই পাঞ্জাবি পরে, কাঁধে ঝোলা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো আর কথায় কথায় মার্কস-লেনিন আওড়ানো লোকগুলো মোটেই সুবিধার হয় না। ছেলেপুলেগুলোর মাথা খাচ্ছে এরা। শোনো রুচি, আমি তোমাকে খুব স্পষ্ট করে বলে দিচ্ছি এসব চিন্তা মাথা থেকে তাড়াও। কলেজে পড়াশোনা করতে গেছো, পড়াশোনা করো। রেজাল্ট ভালো হলে ইউনিভার্সিটিতে পাঠাবো কিনা তখন ভেবে দেখব। কিন্তু এইসব উল্টোপাল্টা কাজ করার যদি চেষ্টা করো, তাহলে কিন্তু আমি কলেজ ছাড়িয়ে ঘরে বন্ধ করে রেখে দেব। মেয়ের পড়াশোনার থেকে বাড়ির মান-সম্মান আমার কাছে অনেক বেশি জরুরি। কো-এডুকেশন কলেজে পড়তে পাঠিয়েছি বলে লোক হাসাবে তা আমি বরদাস্ত করব না কোনও মতেই…

 মা বসে আছে শক্ত মুখ করে। দুচোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়ছে রুচির। চিরকাল বাবার আদরের মেয়ে সে। পিসিরা ঠাট্টা করে বলে বাপ সোহাগী। সত্যি করেই মণিশঙ্কর মিত্র এমনিতে বেশ গম্ভীর মানুষ হলেও মেয়েকে কোনওদিন মারধর তো দূরের কথা বকাঝকা পর্যন্ত করেননি। অথচ আজ রুচির চোখে জল দেখেও একটুও মন গলল না বাবার। কঠিনে স্বরে বললেন, কান্নাকাটি করে কোনও লাভ নেই। গ্র্যাজুয়েশনটা যদি করতে চাও তাহলে আর কোনও দিন আমার সামনে এসব কথা বলতে এসো না। মিত্তির বাড়ির যে একটা মানসম্মান আছে সেটা মাথায় রাখার চেষ্টা করবে। এসব কথা যে তোমাকে বলতে হবে কোনওদিন ভাবিনি। দ্বিতীয়বার আর যেন বলার দরকার না হয়।

বিহানকে রুচি কিছু বলেনি। বিহানও কথাটা আর তোলেনি। কিন্তু প্রায় এক সপ্তাহ পরে কলেজ থেকে বেরিয়ে রুচি দেখল গেটের উল্টোদিকে যে চায়ের দোকানটা আছে, সেখানে রাধাদা বসে আছেন। তার জন্যই যে অপেক্ষা করছেন বুঝতে অসুবিধা নেই। বিহানের ছুটি দেরি করে হবে। তাই রুচিই চলে যাবে কলেজ স্ট্রিটে, এমনটাই কথা হয়ে আছে। তাই খানিকটা নিশ্চিন্ত মনেই চা-এর দোকানে ঢুকে রাধাদার উল্টোদিকে বসে সে।

এখানে আর একটা চা দিন তো ভাই, গ্লাসটা ধুয়ে দেবেন…

কথাটা বলে একটু সময় চুপ করে থাকেন রাধাদা। রুচিও চেষ্টা করে নিজের ভিতর থেকে উথলে ওঠা কান্নাটা সামলে নেওয়ার। সবটা যে পারে তা নয়। রাধাদার তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে নিজেকে আড়াল করতে মুখটা নীচু করে রাখে।

রাধাদা শান্তভাবে গ্লাসে একটা চুমুক দেন। তারপর বলেন, কী হল, সেদিনের পর আর রিহার্সালে এলি না যে?

গলা ভেঙে গেছে রুচির। চা-এর গ্লাসটা তার দিকে ঠেলে দেন রাধাদা।

শান্ত হ। চা-টা খা। তারপর বল, কেন হবে না। কী অসুবিধা হল?

বাবা করতে দেবে না…

বাবা বারণ করেছেন? কেন, আপত্তি কীসের!

রাধাদার গলায় সামান্য স্বস্তির সুর।

সে অনেক কথা। মিত্তির বাড়ির মেয়েরা নাকি রঙ মেখে স্টেজে ওঠে না। ভালো বাড়ির মেয়েরা নাকি নাটক করে না…এইসব…

আমি যাব? তোর বাবার সঙ্গে গিয়ে কথা বলব? আমার সঙ্গে তো আলাপ আছে। রাধাদার কথায় রীতিমতো আঁতকে ওঠে রুচি।

কখনও যাবেন না। বাবা আপনাকেও অপমান করতে দুবার ভাববে না। আপনি অপমানিত হলে সেটা আমার খুব খারাপ লাগবে। তাছাড়া তাতে আমার বিপদ আরও বাড়বে। বাবা বলে দিয়েছে, নাটক নিয়ে আর কোনও কথা বললে আমার কলেজে পড়া বন্ধ করে দেবে। বাবা সব পারে। এরকম ঝুঁকি আমি নিতে পারব না। নাটক করা আমার ভাগ্যে নেই রাধাদা।

রুচির চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। সেদিকে তাকিয়ে রাধাদা বলেন, ভাগ্যের কথা কে বলতে পারে রুচিরা। সবে তো তোর এখন আঠারো-উনিশ বছর বয়স। গোটা জীবনটা সামনে পড়ে রয়েছে। সারাজীবন অন্যের ইচ্ছের দাস হয়ে থাকার মত মানুষ যে তুই নোস সে আমি বেশ জানি। তবে এখন হয়তো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু একটা কথা বল, বিহান তো সেই প্রথমদিনের পর আর যায়নি। কিছু জানায়ওনি। ও কি নাটকটা করবে না? তোকে বলেছে কিছু?

রাধাদার চোখ এড়ানো খুব কঠিন। তাই সেই চেষ্টা করে না রুচি। খোলাখুলিই বলে, বিহান করবে না দাদা। আমাকে বলেছে আপনার নাটকের যে রাজনীতি সেটা নাকি ওদের দলের সঙ্গে মেলে না। এই নাটকটা করলে সুবলদারা বিরক্ত হবেন।

আমি এটাই আন্দাজ করেছিলাম। বিহান তোকেও কি করতে বারণ করেছে?

হ্যাঁ করেছে। তবে আমি ভেবেছিলাম, বাড়িতে যদি আপত্তি না থাকে, তাহলে রিহার্সালে যেতে শুরু করব। তারপর কিছুদিন বাদে ওকে জানিয়ে দেব।

রুচিরা আমি আজকে একটা কথা বলছি, রাধাদার গলা গম্ভীর, বিষাদময়, বিহানের সঙ্গে তোর কী সম্পর্ক আমি জানি না। কিন্তু যদি সম্পর্কটাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবিস, ভবিষ্যতে একসঙ্গে থাকবি এরকম ভাবনা যদি থাকে তাহলে আমি বলব মানুষটাকে আরও একটু ভালো করে চিনে নেওয়ার চেষ্টা করিস। আর একটা কথা, তুই নাটক করবি কিনা বা করতে পারিস কিনা, সে বিষয়ে বিহানের মতামতের ওপর নির্ভর করিস না। বিহান ভালোই অভিনয় করে। তবে তোর ক্ষমতা আরও অনেক বেশি। আর সেটা বিহান নিজেও খুব ভালো করে জানে।…..আজ চলি রে। যদি কোনওদিন মনে হয় এবার নিজের ইচ্ছেয় চলার সময় হয়েছে, তাহলে ওই এন্টালির ঠিকানায় চলে আসিস। ওখানেই আমার বাড়ি। ইস্কুলে পড়াই, নাটক করি আর নিজের পড়াশোনা নিয়ে থাকি। বিহান ঠিকই বলেছে ওরা যে রাজনীতিতে বিশ্বাস করে তাতে আমার আর আস্থা নেই। আমার মনে হয় আমি সঠিক পথ খুঁজে পেয়েছি। বেঁচে থাকতে সেখান থেকে সরব না।




১৯৭৫

গত তিন-বছর ধরেই রাজনৈতিক ডামাডোলে উত্তপ্ত গোটা পশ্চিমবঙ্গ। স্বাভাবিকভাবেই কলকাতায় তার আঁচটা সবথেকে বেশি। আর এইসব গণ্ডগোলের আঁতুড়ঘর হল কলেজ স্ট্রিট। কারণ ছাত্রদের একটা অংশ, যাদেরকে নকশাল বলা হয়, তারা এই ব্যবস্থাকে উল্টে দিতে চাইছে। ফলে মিছিল, বোমাবাজি, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, মারপিট এসব তো চলছেই। মাঝে মাঝেই ক্লাস বন্ধ হয়ে যায় কলেজের। নিয়ম মেনে পরীক্ষা হয় না। তবে এসবের মধ্যেও গ্র্যাজুয়েশন হয়ে গেল রুচির। রেজাল্টও বেশ ভালো। সেদিনের পর আর নাটক নিয়ে কোনও কথা বলেনি বলেই সম্ভবত ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির ব্যাপারে বাবা আপত্তি করল না। এরমধ্যেই ২৫ জুন মধ্যরাতে রাষ্ট্রপতি ফকরুদ্দিন আলি আহমেদ জারি করলেন জরুরি অবস্থা। রাস্তায় রাস্তায় মিলিটারি নামল। মিসায় গ্রেফতার হল বহু ছেলে-মেয়ে। রুচি কানাঘুষোয় শুনল রাধাদাও নাকি গ্রেফাতর হয়েছেন। তবে বিহানের কিছু হয়নি, এর জন্য অনেকটা নিশ্চিন্ত সে। যদিও বিহানের সঙ্গে নিয়মিত এখন আর তার দেখা হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা হয়ে গেছে বিহানের যদিও রেজাল্ট এখনও বেরোয়নি। কবে বেরোবে তাও ঠিক জানা নেই। বিহানদের বাড়ি যাদবপুরের কলোনি এলাকায়। রুচির সঙ্গে দেখা করতে হলে তাকে আসতে হবে কলেজ স্ট্রিট। এই ডামাডোলের বাজারে সেটা খুব একটা নিরাপদও নয়। তাই রুচিও কোনও জোর করে না। যদিও মনখারাপ লাগে খুবই। মাঝে মাঝেই তার মনে হয়, বিহান নাহয় নাই আসুক। সেও তো যেতে পারে ওদিকে। দেখে আসতে পারে বিহানের বাড়ি বাবা-মা, ছোট বোন ফুলকি, যার গল্প অনেক শুনেছে। যদিও যাদবপুর এলাকাটাই তার সম্পূর্ণ অচেনা। কিন্তু এখন বাসে-ট্রামে চলাফেরায় অনেক সড়গড় হয়েছে। অসুবিধা হবে না। তাছাড়া সরাসরি কখনও কথা না হলেও রুচি নিজে তো জানে বিহান ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। বিহানও যে একইরকম ভাবে তাতেও কোনও সন্দেহ নেই। সেক্ষেত্রে ওর বাড়ির লোকের সঙ্গে আলাপ করাটাও কি জরুরি নয় ? রুচির বাড়িতে বিহানকে মেনে নেবে না নিশ্চিত। বিহান বলে নয়, বিয়ের ব্যাপারে রুচি নিজের কোনও পছন্দ থাকলে সেটাই মেনে নেওয়া হবে না। তখন কোনও একটা সিদ্ধান্ত  নিতেই হবে। বিহানের বাড়ির লোকজন কী ভাবেন, আদৌ তাঁরা রুচির কথা জানেন কিনা সেটাও বোঝা দরকার। কিন্তু এসবই তার মনের ভিতরে তোলপাড় করা কথা।  নিজে থেকে বিহানকে প্রস্তাবটা দিতে লজ্জা করে রুচির।

ইচ্ছেটা বড় বেশি জোরাল ছিল বলেই হয়তো হঠাৎ একটা সুযোগ এসে গেল। রুচিরার বাড়িতে ফোন আছে। সন্ধেবেলায় ঠাম্মাকে নিয়ে মা মাঝেমাঝেই হরিমন্দিরে যায়। বাবা ফেরে আরও একটু পরে। তাই ঘণ্টাখানেক সময় রুচিরা একাই বাড়িতে থাকে। বিহানকে বলা আছে কথাটা। সে সুযোগ পেলে পাড়ার একটা দোকান থেকে সেইসময় ফোন করে। রুচি ধরলে কথা হয়। অন্য কারও গলা শুনলে ফোন ছেড়ে দেয় । সেদিনও ফাঁকা বাড়িতে ফোনের কাছেই বসে বই পড়ছিল রুচি। ফোনটা বাজতেই ধরে প্রিয় মানুষটির সাড়া পেয়ে আনন্দে বুকের ভিতরটা যেন চলকে উঠল। বিহানের কিন্তু গলাটা একটু মিয়ানো। দুদিন ধরে শরীরটা ভালো নেই। রাতে জ্বর আসছে।

তাহলে তুমি আবার কষ্ট করে বাড়ির বাইরে এলে কেন?

কতদিন তোমার গলা শুনিনি। তাই মনে হল একবার চান্স নিয়ে দেখি….

বুকের ভিতরে কুলকুল করে একটা যেন প্রেমের মিষ্টি নদী বয়ে যায় রুচির। তাও গলা ভারী করে বলে, ঠিক আছে কথা তো হল। এবার বাড়ি গিয়ে লক্ষ্মী ছেলের মতো শুয়ে থাকো। ডাক্তার দেখিয়েছো নাকি নিজের ডাক্তারি চলছে।

দেখিয়েছি। ও নিয়ে চিন্তা নেই। ওষুধও মা এনে দিয়েছে। কিন্তু অন্যদিকে একটা সমস্যা হয়েছে। আমার একটা বই দরকার। বিশ্বজিতের কাছে আছে। এদিকে এখন তো পাড়ায় বেপাড়ার ছেলে ঢোকা বিপজ্জনক, তাই ও আসতে চাইছে না। কী করি বলোতো?

একটুখানি ইতস্তত করে রুচি বলে, শোনো, আমি তোমাকে দিয়ে আসতে পারি বইটা।

তুমি! তুমি আসতে পারবে!

না পারার কী আছে। কত নম্বর বাসে যাব, কোথায় নামব বলে দেবে। তাহলেই চলে যাব।

আচ্ছা। ঠিক আছে। অন্য কোনও উপায়ও দেখছি না। মেয়েরা কেউ এলে কোনও সমস্যা নেই। তাহলে বিশুকে খবর পাঠাচ্ছি তোমাকে বইটা পৌঁছে দিতে।

হ্যাঁ। কালকে ইউনিভার্সিটিতে এসে যদি দিয়ে যায়, তাহলে বৃহস্পতিবার আমাদের ল্যাব বন্ধ। সুবোধদা মেয়ের বিয়ের জন্য কদিন ছুটি নিয়েছেন। সেদিন চলে যাব। তুমি এখনই আমাকে কীভাবে যাব সেটা বলে দাও।

বাসের নম্বর, রাস্তার ডিরেকশন সবই দিয়ে দিল বিহান। ফোন ছাড়ার আগে নিজে থেকেই বলল, চেষ্টা কোরো তিনটের মধ্যে চলে আসতে। তাহলে মায়ের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। ফুলকির অবশ্য কখন ছুটি জানি না।




গড়িয়াহাট পেরোতেই রাস্তায় বাসের সংখ্যা কমে এল। চারদিকটা বেশ ফাঁকা ফাঁকা। বাড়িঘরের ফাঁকে মাঝে মাঝেই পুকুর বা জলা দেখা যাচ্ছে। কন্ডাক্টরকে বলে রেখেছিল রুচি। বাসস্ট্যান্ড আসতেই হাঁক পাড়তে তড়িঘড়ি নিজের সিট থেকে উঠে নেমে পড়ল রুচি। বিহান যেরকম বলেছিল, রাস্তা পেরিয়ে উল্টোদিকে হরিবাবুর মণিহারী দোকানের পাশ দিয়ে ঢুকল। দোকান অবশ্য বন্ধ। বাইরে ঝাঁপ ফেলা আছে। মাটির রাস্তা। নভেম্বরের শুরু। তাই রাস্তাঘাট শুকনো। কিন্তু বর্ষায় কাদা হয় নিশ্চিত। সেজন্য একেকজায়গায় রাস্তার ওপর ইঁটও পাতা আছে। এছাড়া অনেকটা সুরকির মতো কিন্তু কালো রঙের একটা জিনিস ছড়ানো হয়েছে। রুচির জানা ছিল না সেটাকে ঘেঁষ বলে, পরে বিহানের কাছে শুনেছে। যাদবপুরের কাছেই কাচের কারখানা আছে একটা। কাচ তৈরির সময়ই এই ছাইয়ের মতো ঘেঁষ বেরিয়ে আসে। কলোনির মানুষদের অনুরোধে কারখানার মালিক বিনা পয়সায় রাস্তায় ঘেঁষ ছড়ানোর ব্যবস্থা করেছেন। এতে বর্ষার সময় কাদার হাত থেকে খানিকটা নিস্তার পাওয়া যায়।

রাস্তাটা সোজা খানিকটা গিয়ে তারপর ডানদিকে বেঁকেছে। বাঁকের পরেই দুপাশে দুটো পুকুর। বিকেলের আলো জলের ওপর পড়ে ঝলমল করছে। বিহান বলে দিয়েছিল পুকুর ছাড়িয়ে একটু এগোলেই প্রথমে একটা কাঠগোলা, তারপরেই ওদের বাড়ি। তাই চিনতে অসুবিধা হল না। যদিও বাড়িটা দেখে মনে মনে একটু দমে গেল রুচিরা। জমি বেশ অনেকটা। সরু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। একটা ছোট গেট রয়েছে ঢোকার। ফড়িয়াপুকুরে বাড়ির চারপাশে এতখানি জায়গা কল্পনাও করা যায় না। সামনেটা বাগান। একটু পিছন ঘেঁষে দরমার বাড়ি। টিনের চাল। সামনে একটা ছোট সিমেন্ট বাঁধানো বারা্ন্দা। বাগানের একপাশে সার দিয়ে কতগুলো নারকেল গাছ। তারপাশে অনেকটা একইরকম দেখতে সরু সরু গাছগুলো কীসের রুচি ঠিক বুঝতে পারল না।তাতে সবুজ-কমলা ফল ধরে আছে। এছাড়াও বেশ কয়েকরকম গাছ আছে। তারমধ্যে আম ছাড়া কোনওটাই চেনা নয়। সামনের দিকে টগর আর জবা ফুল ফুটেছে অনেক। গেট থেকে বারান্দা পর্যন্ত সার দিয়ে পরপর ইঁট পাতা। ভিতরে ঢুকে সন্তর্পণে তার ওপর পা দিয়ে দিয়েই বারান্দায় পৌঁছে গেল রুচি। দরজা বন্ধ। কড়া নাড়তে বিহানই দরজা খুলল।

এসে গেছো…এসো এসো…রাস্তায় কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করেনি তো?

মাথা নেড়ে চটি ছেড়ে ভিতরে ঢোকে রুচি। দরজাটা বন্ধ করে দেয় বিহান। ঘরটা বেশ বড়ই। সিমেন্টের মেঝের ওপর দুপাশে দুটো চৌকি পাতা। মাঝখানে একটা সস্তা কাঠের টেবিল আর চেয়ার। টেবিলে কিছু বই-খাতা রাখা আছে। একপাশে রাখা একটা আলনায় জামা-কাপড় গুছিয়ে রাখা।

তুমি আমার ঘরে এসো রুচি…

বড় ঘরটায় ঢুকেই বাঁদিকে একটা দরজা। সেটা সম্ভবত রান্নাঘরে যাওয়ার। খোলা দরজা দিয়ে বাসন-কোসন দেখা যাচ্ছে। উল্টোদিকে আর একটা দরজা। সেটা দিয়ে বেরোলে অল্প একটু সিমেন্ট বাঁধানো চাতাল। তার দুদিকে দুটো দরজা। বাঁদিকের ঘরটায় ঢুকল বিহান। দেওয়াল ঘেঁষে একটা চৌকির ওপর বিছানা পাতা। তার একটা পাশ নানারকম বই-খাতায় ভর্তি। এঘরেও একটা টেবিল-চেয়ার আছে। তার ওপর রং-তুলি, পোস্টার আরও অনেক কিছু রাখা।

খাটেই বোসো আরাম করে…

বাড়িতে আর কারও সাড়া-শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। তাই রুচি একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞাসা করল, তোমার মা নেই বাড়িতে?

না এখনও ফেরেনি। স্কুলে কী একটা মিটিং আছে বলছিল। সেইজন্যই বোধহয় দেরি হচ্ছে…

ফাঁকা বাড়িতে শুধু সে আর বিহান। কথাটা ভেবেই রুচির বুকের ভিতর যেন সমুদ্রের ঢেউয়ের ওঠানামা শুরু হয়ে গেল। কানে গরম ভাপ। বিহান একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তার দিকে। কেমন যেন একটা পাগলামি তার চোখে। রুচি চোখ নামিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু তার আগেই বিহান এক ঝটকায় কাছে টেনে নেয় তাকে। রুচির পাতলা ঠোঁটের ওপর চেপে বসে বিহানের ঠোঁট। জিভ ঢুকে যায় মুখের ভিতর। এর আগে সিনেমা হলে লুকিয়ে হাত ধরা বা আলতো চুমু খাওয়ার মধ্যে আটকে ছিল তাদের শরীরী সম্পর্ক। তাই হঠাৎ এমন গভীর চুম্বনে প্রথমটায় হকচকিয়ে গেলেও দ্রুত সাড়া দিতে শুরু করে রুচির শরীর। গভীর আশ্লেষে উপভোগ করে দুই ওষ্ঠাধরের মিলন। বিহান ততক্ষণে একদম কাছে টেনে নিয়েছে রুচিকে। তার অবাধ্য হাত ঘুরে বেড়াচ্ছে রুচির শরীরে। আঁচল আলগা হয়ে গেছে রুচির। ব্লাউজ সরিয়ে দিয়ে উদ্ধত স্তনে মুখ ঘষছে বিহান। রুচি বুঝতে পারছে তার সব প্রতিরোধ আলগা হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। ইচ্ছে করছে বিহানের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে নিতে। বিহানের শরীর, তার আদর সব যেন কেমন অবশ করে দিচ্ছে রুচিকে। বিহান তাকে শুইয়ে দিয়েছে নিজের চৌকিতে। গোটা শরীরে চুমু খাচ্ছে নিবিড় ভাবে। শাড়িটা বেশ খানিকটা তুলে দিয়ে স্পর্শ করছে তার যৌনাঙ্গ। বিহানের কঠিন হয়ে ওঠা পুরুষাঙ্গের ছোঁয়া সে অনুভব করতে পারছে। ইচ্ছে করছে আরও নিবিড়ভাবে মিলে যেতে। একসময় নিজেকে উন্মুক্ত করে বিহান উঠে এল রুচির শরীরের ওপর। তারপর জীবনে প্রথম এক উন্মুখ নারীর শরীরে প্রোথিত করল নিজেকে। কতক্ষণ এই অবস্থাটা চলেছিল খেয়াল নেই। কিন্তু হঠাৎ-ই যেন সম্বিৎ ফিরে এল রুচির। প্রাণপণ চেষ্টায় বিহানকে নিজের শরীরের ওপর থেকে সরিয়ে দিল সে, কী পাগলামি করছ, কিছু যদি হয়ে যায়! তোমার মা যদি এসে পড়েন…

ঘোর কাটতে একটু সময় লাগে বিহানের। ঘড়ঘড়ে গলায় বলে, চিন্তা কোরো না। কিছু হবে না। আমি তো আছি, তুমি জামা-কাপড় ঠিক করে নাও।

দ্রুত হাতে শাড়ি-ব্লাউজ ঠিক করে রুচি। চুলটা একবেণীতে টাইট করে বাঁধা। তাই অসুবিধা নেই। কপালে মাঝে মাঝে গুঁড়ো কুঙ্কুমের টিপ পরা তার অভ্যাস। আজ ভাগ্যিস পরেনি। বিহানও নিজের পোশাক ঠিক করে, ঝাঁকড়া চুল আঙুল চালিয়ে বশে এনেছে।

চলো আমরা বসার ঘরে গিয়ে বসি। মায়ের আসার সময় হয়ে গেছে।

বিহানের পিছুপিছু বড় ঘরটায় চলে আসে রুচিরাও। দরজাটা খুলে দেয় বিহান।

তুমি তার মানে দুষ্টুমি করার জন্যই আমাকে ভিতরের ঘরে নিয়ে গেছিলে তাই না…মায়ের যে দেরি হবে সেটাও নিশ্চয় আগেই জানতে।

অপ্রস্তুতভাবে মাথা নাড়ে বিহান, না, বিশ্বাস করো। মায়ের দেরি হবে সেটা আজ সকালে জেনেছি। তখন তো তোমাকে আর জানানোর উপায় নেই…

কথার মাঝখানে গেটের শব্দ শোনা যায়।

মা, এ হল রুচিরা। আমার বন্ধু। আমার একটা বই দরকার ছিল। সেটা ও দিতে এসেছে….

মহিলার মুখ দেখে রুচি স্পষ্টই বুঝতে পারে ছেলের যে কোনও বান্ধবী আছে, সে ব্যাপারে বিন্দুমাত্র ধারণা তাঁর ছিল না। মুখের গড়ন অনেকটা বিহানের মত। বয়সও মধ্য চল্লিশের বেশি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু দেখাচ্ছে অনেকটা বেশি। মুখের রেখায় কঠিন পরিশ্রম আর জীবনযুদ্ধে লড়াই করে যাওয়ার চিহ্ন যেন খোদাই করা আছে। একটা সাধারণ তাঁতের শাড়ি আর সস্তার ব্লাউজ পরা।

তোমরা বোসো, আমি কাপড়টা বদলে আসছি।

কাপড় বদলে রুচিকে চা আর চিঁড়েভাজা দিয়ে মহিলা সামনে এসে বসলেন। বিহান বসে আছে ভিজে বেড়ালের মত মুখ করে।

তুমি বিহানের বন্ধু? কতদিনের চেনাশোনা?

বছর চারেক হল…

তুমিও কি প্রেসিডেন্সিতে পড়তে?

না আমি স্কটিশচার্চ।

সে তো অনেক দূর। সেই হেদোর কাছে। আলাপ হল কী করে?

আসলে ওই একটা নাটক করতে গিয়ে…

নাটক! বিহু আবার নাটক করল কবে!

ওই যে, তোমাকে বলেছিলাম তো, রাধাদার সঙ্গে একজায়গায় ‘রক্তকরবী’ করতে গেছিলাম…

বিহান কথা শেষ করতে পারে না। মহিলা কঠিন চোখে তাকান ছেলের দিকে। তারপর আবার শুরু করেন জেরা। রুচির বাড়ি-ঘর-দোরের খুঁটিনাটি জানা হয়ে যায় চা খাওয়া শেষ হওয়ার আগেই। তারপর একইরকম কঠিন গলায় বলেন, এদেশি মেয়ে। উত্তর কলকাতায় নিজেদের বাড়ি। আমরা কিন্তু বাঙাল। বরিশালে জায়গা-জমি সবই ছিল। সব ছেড়ে এখন এই উদ্বাস্তু কলোনিতে থাকছি। তোমাদের সঙ্গে আমাদের মেলে না। কিছু মনে কোরো না মা। সত্যি যা তাই বললাম। জীবনে অনেক ঘা খেয়েছি তো তাই সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরাই। বিহু চা খাওয়া হয়ে গেলে ওকে বাসে তুলে দিয়ে আয়।   

শেষের দিকে মহিলার গলা যে নরম হয়ে এসেছে বুঝতে অসুবিধা হয় না রুচির। বেরনোর সময় প্রণাম করলে মাথায় হাতও রাখেন। রাস্তায় বেরিয়ে বিহান বলে, কীরকম দেখলে আমার মাকে?

ওঁর তো আমায় পছন্দ হয়নি। আর তুমিও মনে হলো কোনওদিন বাড়িতে আমার কথা বলোনি।

আসলে মায়ের মধ্যে এই বাঙাল-ঘটি ব্যাপারটা খুব স্ট্রং। দেশভাগের যন্ত্রণাটা ভুলতে পারেনি এখনও। ভোলা সম্ভবও নয়। তবে কথাগুলো কিন্তু ভুল নয়। তোমরা বনেদি বড়লোক। বিশাল বাড়ি। ঠাকুর-চাকর রেখে থাকা অভ্যাস। আমরা কোথায় থাকি দেখলে তো।

সংশয়গুলো রুচির নিজেরও মনের মধ্যে ঠেলে উঠছিল। জোর করে সেগুলোকে চাপা দিয়ে একটু হেসে বলে, হ্যাঁ দেখেছি। তুমি যা বলছো সেটাও অস্বীকার করছি না। কিন্তু আমার কাছে কোনটা বেশি জরুরি সেটা তো বুঝতে হবে। তাছাড়া চিরকাল যে সবকিছু এরকমই থাকবে তা তো নয়। তোমার এত ভালো রেজাল্ট। একটা ভালো চাকরি তো পাবেই। তারপর দেখো সবকিছু বদলে যাবে। হাতে তো এখনও সময় আছে…

বাস এসে গেছিল। বিহানকে হাত নেড়ে বাসে উঠে পড়ে রুচি। সিটে বসে জানলা দিয়ে দেখে সেই ঘেঁষ ছড়ানো রাস্তা দিয়ে গলির দিকে হাঁটতে শুরু করেছে বিহান। বাসটা ছাড়ার জন্য অপেক্ষা করেনি।


১০

হাতে সময় আছে ধরেই নিয়েছিল রুচি। ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। দুবছরের কোর্স। তারমধ্যে বিহান নিশ্চয় কিছু একটা ব্যবস্থা করে ফেলবে। কিন্তু আদতে যে পরিস্থিতিটা সেরকম নয়, সময় যে মোটেই হাতে নেই, এটা সে ভাবতেই পারেনি। মেয়ে গ্র্যাজুয়েশনের পরীক্ষা দেওয়ার পর থেকেই পাত্রের জন্য খোঁজখবর শুরু করেছিলেন মণিশঙ্কর। মেয়েকে কিছু বলেননি। রুচির মা-ঠাকুমা দুজনেই জানতেন। তবে চাইলেই তো আর মনের মতো পাত্র পাওয়া যায় না। একমাত্র মেয়ে। তারজন্য ঘর-বর দুই-ই দেখতে হবে। ঠাকুমার দাবি, কোষ্ঠীর মিলও থাকা চাই। এসব চলতে চলতেই রুচির রেজাল্ট বেরিয়ে গেল। যতদিন বিয়ে না হচ্ছে, পড়ুক না হয়, মেয়ের যখন এত ইচ্ছা….অনেকটা এরকম মনোভাব থেকেই বাড়ির খানিকটা আপত্তি সত্ত্বেও তাকে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি করে দিলেন মণিশঙ্কর। তবে তার জন্য পাত্র খোঁজায় কোনও ছেদ পড়ল না। বেশ কিছু সম্বন্ধ নাকচ করার পর শেষপর্যন্ত বালিগঞ্জের বোসবাড়ির সঙ্গে কথাবার্তা অনেকটা এগিয়েছ। ছেলে আর তার বাড়ি-ঘর সম্বন্ধে খোঁজখবর নিয়ে পছন্দ হয়েছে মণিশঙ্করের।

রবিবারের সকাল। জলখাবারে সাধারণত লুচিই হয়। শীতের দিন বলে সঙ্গে খেজুরগুড়ের পায়েসও আছে। রুচির খুব পছন্দের পায়েস। লুচি শেষ করে সবে আয়েশ করে পায়েসে চামচ ডোবাতে যাচ্ছে এমন সময় মা বলল, আজ বিকেলে কোথাও বেরোস না। আর একটু সেজেগুজে তৈরি হয়ে থাকিস।

আমি! সেজেগুজে! কেন?

কয়েকজন আসবেন। তাঁদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে হবে।

কথাবার্তা আমাকে কেন বলতে হবে! আর কথাবার্তা বলতে হবে বলে সাজতেই বা যাব কেন…

মা কিছু বলার আগেই ঠাম্মা ঝংকার দিয়ে ওঠে, তুমি অত ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে বলছ কেন বউমা। সোজা কথা সোজাভাবে বললেই হয়।বালিগঞ্জের বোস বাড়ি থেকে তোকে আজ দেখতে আসবে। ছেলের দিদি-জামাইবাবু আর এক কাকা আসবে প্রথমে। তাদের যদি পছন্দ হয়, তখন ছেলে আর তার মা-বাবা আসবে।

তার মানে! তোমরা আমার বিয়ের সম্বন্ধ করছ নাকি?

সেটাই তো স্বাভাবিক। মেয়ে বড় হলে সব বাবা-মাই তাই করে। এতে এত আশ্চর্য হওয়ার কী আছে।

বাবার গলার স্বর গম্ভীর। ততক্ষণে রাগে-দুঃখে চোখে জল এসে গেছে রুচির।

আমাকে একবার জানানোর প্রয়োজন মনে করলে না তোমরা। তার আগেই বিয়ে ঠিক করে ফেললে। আমার মতামতের কোনও দাম নেই।

জানানো তো হল তোমাকে। আর বিয়ে এখনও ঠিক হয়নি। ওঁরা দেখতে আসবেন বলেছেন। দেখে পছন্দ হলে কথাবার্তা আরও এগোবে। সব ঠিকঠাক থাকলে তখন দিন-ক্ষণ ভাবা যাবে। আর পাত্র কেমন হওয়া উচিত সে ব্যাপারে তোমার মতামতের তেমন কোনও গুরুত্ব আছে বলে আমি সত্যিই মনে করি না। তুমি এখনও ছেলে-মানুষ। জগৎ-সংসার কিছুই দেখোনি। আমি  দেখেশুনে তোমার উপযুক্ত ছেলেই ঠিক করব, এটুকু ভরসা রাখতেই পারো। তবে হ্যাঁ, এখন তো আর আগেকার সময় নেই। ছেলে তোমাকে দেখতে আসবে। তুমিও ছেলেকে দেখবে। তখন যদি তেমন আপত্তিকর কিছু মনে হয়, আমাকে জানিও, ভেবে দেখব।

আমার এমএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত অন্তত অপেক্ষা করতে পারতে!

পরীক্ষার সঙ্গে তো বিয়ের কোনও সম্পর্ক নেই। তুমি চাইলে পড়া শেষ করতে আমার মনে হয় না অসুবিধা হবে। ফার্স্ট ইয়ারে মাস ছয়েক ক্লাস তো হয়েই গেল। ছেলের ঠাকুমা মারা গেছেন অল্পদিন আগে। একবছর ওঁদের কালাশৌচ। সবকিছু ঠিকঠাক হলে পাটিপত্র করে রাখবেন। বিয়ে হবে সামনের অঘ্রাণে। তারমানে তারপর আর বড়জোর তিন-চার মাস ক্লাস হয়ে পরীক্ষার জন্য পড়ার ছুটি পড়ে যাবে। ল্যাবও নিশ্চয় তারমধ্যেই শেষ হয়ে যাবে।

শুধু ক্লাস করলেই চলবে, আমাকে নিজের পড়াশোনা করতে হবে না?

পড়াশোনা করতে আটকাচ্ছে কে! শিক্ষিত পরিবার। আমার ধারণা তোমার এমএসসি শেষ করা নিয়ে ওঁরা আপত্তি করবেন না। তাও তোমার যখন এত ইচ্ছা আমিও একবার বলব নিশ্চয়। তবে এটাও তোমায় বলে রাখছি, ওঁরা যদি বেশি আপত্তি করেন, তাহলে ডিগ্রির মায়া তোমাকে ছাড়তে হবে। এত ভালো পাত্র সচরাচর পাওয়া যায় না।

বাবার কথার কোনও উত্তর না দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে নিজের ঘরের দিকে চলে যায় রুচি। পিছনে থেকে ঠাম্মার গলা শুনতে পায়, মেয়ের ভাব-গতিক কিন্তু খুব সুবিধার দেখছি না বউমা। একটু চোখে চোখে রেখো…

আমার তো কিছুদিন ধরেই মনে হচ্ছে মা, কেমন যেন উড়ুউড়ু ভাব। সেদিন হরিমন্দির থেকে ফিরে দেখি ফোনে ফিসফিস করে কার সঙ্গে যেন কথা বলছে। আমার পায়ের আওয়াজ পেয়েই রেখে দিল।

যাক্ গে, এখন আর ওসব নিয়ে আলোচনা করে লাভ নেই। তুমি দেখো যেন ঠিকঠাক সাজগোজ করে তৈরি হয়। শীতের বেলা। ওঁরা কিন্তু পাঁচটার মধ্যেই এসে পড়বেন। আমি বেরোচ্ছি। মিষ্টি যা আনার এবেলাই এনে রাখি।

মায়ের একটা জরিপাড় সিল্কের শাড়ি আর কানে গলায় হালকা-গয়না। চুলটা বেণী না করে হাতখোঁপায় জড়িয়ে নিয়েছে। সাজগোজ সে কখনোই তেমন কিছু করে না। তবে চোখে কাজল আর কপালে ছোট একটা টিপ আছে। পাত্রপক্ষ এসে গেছে কিছুক্ষণ আগেই। বসার ঘর থেকে কথাবার্তার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। মা একটু আগে এসে বলে গেছে, চা-এর ট্রে নিয়ে রুচিকে যেতে হবে। ঘর থেকে বেরোনর আগে একবার আয়নায় নিজেকে দেখে নেয় রুচি। মার্জিত প্রসাধন। বাবার কিছু বলার থাকবে না। আসলে সকালের ওই ঘটনার পর সারাদিন নিজের ঘরে বসে ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্থিতিটা ভেবেছে রুচি। এখন যা অবস্থা তাতে সে যত প্রতিবাদ করবে বাড়ির লোকের সন্দেহ তত বাড়বে। তারজন্য বাবা হয়তো বিয়ের তারিখ এগিয়ে আনার চেষ্টাও করতে পারে। কিন্তু রুচি তো এখনই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে পারবে না। বিহানকে কিছুটা সময় তাকে দিতেই হবে। তাই আপাতত মা-বাবা যেমন চাইছে তেমনভাবে চলাই ভালো। ঝামেলা না করলে অন্তত তার ইউনিভার্সিটি যাওয়া নিয়ে অসুবিধা হবে না। আর বাড়ি থেকে বেরোতে পারলে বিহানের সঙ্গে যোগাযোগও করা যাবে। রুচি মনে মনে ঠিক করে ফেলে, সামনের সপ্তাহেই আর একদিন যাদবপুর যাবে সে। বিহানকে সবকিছু জানিয়ে বলতে হবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সে যেন একটা কাজের ব্যবস্থা করে। একটা স্কুলের চাকরির কথা নাকি ওদের কোন অধ্যাপক বলেছিলেন। কিন্তু স্কুলে পড়ানো পছন্দ নয় বলে বিহান তাঁকে হ্যাঁ-না কিছুই বলেনি। আপাতত নাহয় সেটাই নিয়ে নিক। তারপর অন্যকিছু ভাবা যাবে।

দিদি-জামাইবাবুর সঙ্গে, কাকা-কাকিমাও এসেছিলেন। তাদের কথাবার্তা শুনে জানা গেল ছেলের নাম অমিত। কমার্স নিয়ে মাস্টার ডিগ্রি করে এখন বাবার সঙ্গে ব্যবসার কাজ দেখাশোনা করে। দিদি মানুষটা খারাপ নয়। রুচিকে তার পড়াশোনা, স্কুল, কলেজ নিয়ে দু-চারটে প্রশ্ন করলেন। কাকিমা কিন্তু প্রথমেই জানতে চাইলেন রাঁধতে জানে কিনা। রুচি কিছু বলার আগেই মা বললেন, ও তো পড়াশোনা নিয়েই ব্যস্ত থাকে। আর বাড়িতে ঠাকুর আছে, আমি আছি, রান্না করার দরকার হয় না। দরকার পড়লে শিখে নেবে। রান্না শিখতে মেয়েদের সময় লাগে না।

কাকিমা খুব একটা প্রসন্ন হলেন বলে মনে হল না। গম্ভীরভাবে বললেন, বিএ, এমএ যাই-ই পাস করুক বাড়ির বউয়ের রান্না জানাটা বেশি দরকার। রেঁধেবেড়ে সংসারের সবাইকে খাইয়ে খুশি করতে পারলে তবেই না, আমাদের বাড়ির বউরা সবাই কিন্তু খুব ভালো রান্না জানে। রাঁধুনি তো আছেই। কিন্তু লোকজন খেলে নিজেরাই রান্নাঘরে ঢুকি। অমির মা তো আবার কেক-পুডিংও করতে পারে। বিয়ে হয়ে আসার পর বড়দা মেমসাহেবের কাছে রান্না শিখতে পাঠিয়েছিলেন। যাক্ গে হাতে তো এখনও সময় আছে। চাইলে এর মধ্যে শিখে নিতে পারবে।

দাদা আর কাকা অবশ্য বাবার সঙ্গেই বেশি কথা বলছিলেন। রুচিকে তেমন কিছু জিজ্ঞাসা করেননি। প্রায় একঘণ্টা ওদের সামনে কাঠ হয়ে বসে থাকার পর অবশেষে ছুটি মিলল। নিজের ঘরে এসে জামা-কাপড় না বদলেই চুপ করে বসেছিল রুচি। অসম্ভব কান্না পাচ্ছে তার। নিজেকে ভয়ানক অসহায় মনে হচ্ছে। কিন্তু কাঁদলে চলবে না। শক্ত থাকতে হবে। অভিনয় করে যেতে হবে, যেটা সে খুব ভালো পারে বলেছেন রাধাদা। একসময় ওঁরা চলে গেলেন। বাবা আর মা দুজনেই নীচে গেলেন এগিয়ে দিতে বুঝতে পারলেও ঘর থেকে বেরোয়নি রুচি। রাতে খাবার টেবিলে সে কিছু জিজ্ঞাসা করেনি। কিন্তু আলোচনা থেকে বোঝা গেল রুচিকে ওঁদের পছন্দ হয়েছে। আজ ঠাম্মাও দুধ-খই খেয়ে শুয়ে পড়েনি। টেবিলের পাশে তার নিজের চেয়ারটিতে বসে বলল, তাহলে আর দেরি করিস না। সংক্রান্তিটা পেরিয়ে যাক। তারপর ঠাকুরমশাইকে ডেকে একটা ভালো দিন দেখে ওদের আসতে বল। শুভকাজ, শুভদিনেই কার ভালো। ছেলে একবার দেখে পছন্দ করলে নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে। অবশ্য পছন্দ না হওয়ার কারণ নেই, মেয়ে আমাদের সুন্দরী।

সাজগোজের বেশ বাহার আছে কিন্তু মা। কাকিমা তো দিব্যি একগা গয়না পরে এসেছে….

ব্যবসায়ী বাড়ি। পয়সা আছে। গয়না তো পরবেই। বালিগঞ্জে শুধু রমানাথ বোসেরই তিনতলা বাড়ি। পাশাপাশি আরও দুই ভাই থাকে। তাদেরও রমরমা কিছু কম নয়। বাবার ব্যবসা তিন ভাই ভাগ করে নিয়ে আলাদা আলাদা চালায়। তবে অমিত তো শুনলাম, ওর কাকা বলল নিজে আলাদাভাবে কিছু করার চেষ্টা করছে।


১১

তাকে দেখতে আসার চারদিন পরে রুচি যখন আবার ওই ছোট্ট কালো গেট দেওয়া দরমার বাড়িটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল, ঘড়িতে তখন তিনটে। বারান্দায় মোড়া পেতে একজন ভদ্রলোক বসে খবরের কাগজ পড়ছেন। ধুতি পরা, গায়ে আলোয়ান। বিহানের বাবাই হবেন। রুচিকে ঢুকতে দেখে একটু অবাক হয়ে এগিয়ে এলেন, কাকে চাই?

আমি…মানে বিহানের সঙ্গে…

বিহু তোকে কে খুঁজছে দ্যাখ…গলা তুলে কথাটা বলতেই দরজা দিয়ে মুখ বাড়াল বিহান। তাকে দেখে সে যে ভীষণ অবাক আর বেশ খানিকটা অপ্রস্তুত হয়েছে বুঝতে অসুবিধা হল না রুচির।

কী ব্যাপার, তুমি হঠাৎ…

একটা জরুরি কথা ছিল তোমার সঙ্গে।

একমিনিট দাঁড়াও, আমি আসছি।

দ্রুত ঘরে ঢুকে যায় বিহান। ইতিমধ্যে বিহানের মাও এসে বারান্দায় দাঁড়িয়েছেন। তাঁর মুখে বিরক্তির ছাপ। রুচি অপ্রস্তুতভাবে বারান্দার নীচে দাঁড়িয়ে আছে দেখে বললেন,

ভিতরে এসে বোসো।

না না দরকার নেই। আমি একটু বেরোচ্ছি।

পাজামাটা বদলে একটা প্যান্ট পরে নিয়েছে বিহান। বাইরে এসে মাথা গলিয়ে সোয়েটারটা পরে নিতে নিতে দ্রুত গেটের দিকে এগোয়। পিছনে রুচি।

এরকমভাবে হঠাৎ করে চলে এলে। একটা কথা বোঝার চেষ্টা করো রুচি, এটা কিন্তু সাহেবপাড়া নয়, কলোনি। চারপাশের লোকজন নানারকম কথাবার্তা বলে, এসব তো তোমার না বোঝার কথা নয়। আমাকে তো কোনওদিন তোমাদের বাড়ির ধারপাশেও যেতে দাওনি।

বিহানের গলায় অসন্তোষের সুর স্পষ্ট। রুচি প্রাণপণে নিজেকে সংযত করে বলে,

তোমার সঙ্গে আমার খুব জরুরি কথা আছে বিহান। আজকাল তো তুমি কলেজ স্ট্রিটে খুব কম যাও। তাই বাধ্য হয়েই আমাকে আসতে হল।

কী কথা বলো?

এভাবে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বলা যাবে না। কোথাও একটা বসবে চলো।

একটু ভেবে নেয় বিহান, ঠিক আছে। এখানকার কফিহাউসেই গিয়ে বসি চলো। এই সময়টা আশা করি ফাঁকা থাকবে।

যাদবপুর কফিহাউসে কোণার দিকে একটা টেবিলে বসল দুজনে। মোটামুটি ফাঁকাই। দু-চারজন বসে চা-কফি খাচ্ছে।

হ্যাঁ, বলো কী বলছিলে?

বিহান বাবা আমার বিয়ে ঠিক করেছে…..

বিয়ে!

হ্যাঁ। রবিবার দিন ছেলের বাড়ি থেকে দেখতে এসেছিল। এরপর ছেলে আর তার মা-বাবাও আসবে। পছন্দ হলে পাটিপত্রের দিন ঠিক হবে।

কফির কাপে একটা চুমুক দিয়ে মৃদু হাসে বিহান, বেশ তো। সেজেগুজে পিঁড়িতে বসবে। আমাকে নেমন্তন্ন করলে গুছিয়ে খেয়ে আসব।

শোনো বিহান, এটা মজা করার সময় নয়। আমার বাবাকে আমি জানি। একবার যা ঠিক করে চার থেকে সরে না। পাটিপত্র নিয়ে আমি মাথা ঘামাচ্ছি না। কিন্তু অঘ্রাণে মাসে বিয়ের দিন ঠিক করবে। তার আগে তোমাকে কিছু ব্যবস্থা করতে হবে।

তুমি আমাকে কী করতে বলছ রুচি?

একটা কিছু করো…..মানে যাতে আমি দরকার হলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতে পারি। আমার মনে হয় তোমার প্রফেসর যে স্কুলের চাকরিটার কথা বলেছিলেন, সেটাই এখন নিয়ে নাও। তারপর অন্য জায়গায় চেষ্টা করবে।

তুমি তো জানো, স্কুলের চাকরি আমার পছন্দ নয়। তাছাড়া আমি পিএইচচি করব ঠিক করেছি। কারণ কলেজের চাকরিতে পিএইচডি থাকলে ভবিষ্যতে সুবিধা হবে।

সে তো তুমি পরেও করতে পারে। কিন্তু এখন হাতে সময় নেই। তুমি একটা কিছু না করলে আমরা বিয়ে করতে পারব না।

শোনো রুচি একটা কথা বোঝার চেষ্টা করো। আমি কিন্তু একটা বামপন্থী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত। আমার অনেক কাজ, অনেক দায়িত্ব। পার্টি আমার ওপর আস্থা রাখে। আর বছর দেড়েক পরেই নির্বাচন। তার আগে যদি জরুরি অবস্থা উঠে যায়, তাহলে আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। গ্রামে গ্রামে, জেলায়-জেলায় গিয়ে শ্রমিক-কৃষকদের মধ্যে প্রচার করতে হবে। এই সময় আমার বিয়ে করার কোনও প্রশ্নই আসে না। সত্যি কথা বলতে কী আমি চাকরি করার কথাও ভাবছি না। হয়তো ইউনিভার্সিটিতে যাতায়াতটা বজায় রাখার জন্য পিএইচডি-তে নামটা লিখিয়ে রাখব।

তাহলে আমি কী করব?

রুচির মনে হয় তার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। দুচোখ উপছে জলের ধারা নামে। সেদিকে একবার তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নেয় বিহান।

তুমি কী করবে সেটা তোমার সিদ্ধান্ত। তুমি বাড়িতে বলতে পারো যে তুমি এখন বিয়ে করবে না। এমএসসি পাস করে চাকরি করবে। নিজের পায়ে দাঁড়াবে। অনেক কথাই বলতে পারো।

বাবা এসব কোনও কথা শুনবে না। বাড়িতে থেকে এসব বলার কোনও মানে নেই। আমাকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ঠিক আছে, তুমি যদি এখনই না চাকরি করতে চাও, আমরা টিউশন তো করতে পারি। তোমাদের বাড়িতে তো আমরা থাকতে পারব। তাছাড়া আমিও তোমার সঙ্গে সংগঠনের কাজ করতে পারি। আমি গণনাট্য সংঘে যোগ দিতে পারি। ওরাও তো তোমাদের সঙ্গে যুক্ত।

তুমি কি পাগল হয়ে গেছ নাকি! তুমি গণনাট্য সংঘে নাটক করবে ! তোমার কি ধারণা তুমি খুব ভালো নাটক করতে পারো? রাধারমণদা প্রশংসা করেছেন বলে তোমার মনে হচ্ছে তুমি একজন বিশাল অভিনেত্রী। অভিজ্ঞতা হল, পাড়ার ক্লাবে রক্তকরবী। ওটা একটা পুরোপুরি অ্যামেচারিস কাজ। গণনাট্য সংঘে কোন মাপের লোকজন অভিনয় করেন তুমি জানো না। আর রাধারমণ তপাদার নাটকের কিস্যু বোঝে না। ওঁর কথায় নেচো না, বিপদে পড়বে। মাথা ঠাণ্ডা করে শোনো। আমাদের বাড়িতে তোমাকে মেনে নেবে না সেটা আমি সেদিন তুমি চলে যাওয়ার পরেই বুঝতে পেরেছি। তোমার নিজেরও দরমার বাড়ি আর টিউবওয়েলের জলে মানিয়ে নিতে অসুবিধা হবে। এখন বুঝতে পারছ না। তখন নিজেদের মধ্যে অশান্তি হবে। তাছাড়া এটাও তো সত্যি যে তোমার সঙ্গে আমার একটা শ্রেণিগত পার্থক্য আছে।তোমরা হলে কলকাতার বাবু সমাজের লোক। আমরা রিফিউজি। যাক্ গে এসব কথা বাদ দাও। আমার কথা যদি বলো, মানে আমি তোমাকে এই কবছরে যতটুকু চিনেছি তাতে আমার মনে হয়, তুমি বাবার কথা মেনে নাও। বাড়ির পছন্দের পাত্রকে বিয়ে করো। সেটাই তোমার জন্য ঠিকঠাক। এখন যা বলছ সেগুলো আবেগের কথা। আমার আশায় বসে থেকো না। আমি আদৌ কোনওদিন বিয়ে করব কিনা জানি না। মেহনতি মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই করাই আমার জীবনের স্বপ্ন। সেই পথ থেকে কেউ চাইলেও আমাকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করতে পারবে না।


১২

১৯৭৬

১৯৭৬ সালের অঘ্রাণ মাসে রমানাথ বোসের একমাত্র ছেলে অমিত বোসের সঙ্গে বিয়ে হল রুচির। আর ১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থা উঠিয়ে দিয়ে নির্বাচন ঘোষণা হল। বামপন্থীরা নির্বাচনে অংশ নিল। ভোটের ফল বেরোলে দেখা গেল সারা দেশে কংগ্রেস পরাজিত হয়েছে। ক্ষমতায় এল জনতা পার্টি। নতুন প্রধানমন্ত্রী হলেন মোরারজি দেশাই। পশ্চিমবঙ্গে বিপুল ভোটে জিতে ক্ষমতায় এল বামপন্থীরা। ততদিনে অবশ্য ভোট দে্ওয়ার বয়স হয়ে গেছে রুচির। কিন্তু ইলেকশন কিংবা তার রেজাল্ট কোনও কিছু নিয়েই তার সামান্যতম আগ্রহ ছিল না। সে তখন এমএসসি-র পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত। মণিশঙ্করবাবু কথা রেখেছিলেন। রুচি যে কোর্সটা কমপ্লিট করতে চায় সেকথা জানিয়েছিলেন তার শ্বশুরকে। বউমানুষের কলেজ যাওয়া-আসায় যথেষ্ট আপত্তি ছিল শাশুড়ির। যদিও শেষ পর্যন্ত মেনে নিয়েছিলেন। শর্ত ছিল যাওয়া-আসাটা হবে বাড়ির গাড়িতে। এক্ষেত্রে ভাগ্যও কিছুটা সহায় হয়েছিল রুচির। অমিতের ছোট বোনের বিয়ে হয়েছে দিল্লিতে। রুচির পরীক্ষার যখন মাস চারেক বাকি, তখন থবর এল বোনের বাচ্চা হবে। তার শ্বশুরবাড়িতে কেউ নেই। এই অবস্থায় তো শুধু জামাইয়ের ভরসায় মেয়েকে ফেলে রাখা যায় না। তাই রুচির শাশুড়ি চলে গেলেন মেয়ের কাছে থাকতে। একেবারে বাচ্চা হলে তাকে একটু সাব্যস্ত করে দিয়ে তারপর ফিরবেন। ফাঁকা বাড়িতে নিশ্চিন্তে পড়াশোনা করতে লাগল রুচি। বড়লোকের বাড়ি, সব কাজেরই লোক আছে। তাই তার তেমন কোনও দায় বা দায়িত্ব কিছুই নেই। অমিত সারাদিনই ব্যবসার কাজে ব্যস্ত। রাতে বাড়ি ফিরে অবশ্য স্ত্রীর সঙ্গে খানিকক্ষণ কথাবার্তা বলে। তবে তাও বেশিরভাগ কাজের কথাই। শ্বশুরমশাইয়ের ব্যবসার পাশপাশি সে একটা নিজের ব্যবসাও শুরু করেছে। অধিকাংশ সময় তাই নিয়েই আলোচনা করে। রুচি যে খুব একটা কিছু বোঝে তা নয়। অমিতেরও তাতে বিশেষ কিছু যায়-আসে বলে মনে হয় না। বউকে ঠিক বোঝানোর জন্য নয় বরং নিজে সারাদিন যে পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গেছে সেটা মুখ ফুটে কাউকে বলে খানিকটা হালকা হতে চায়। তার মাথার মধ্যে যেসব নতুন চিন্তা আসছে সেগুলো যেন এভাবে আর একবার ঝালিয়েও নেয়। অনেকটা যেমন নিজের লেখা প্রশ্নের উত্তর অন্যকে পড়ে শোনালে ভুলগুলো চট্ করে ধরা পড়ে সেরকম। একেকদিন ঘুম পেয়ে যায় রুচির। তবে মুখে কিছু বলে না। প্রথমটায় অবশ্য একটু আশ্চর্য লাগত। বিশেষ করে যখন হানিমুনে মানালি বেড়াতে গিয়ে বিপাশার ধারে বসেও অমিত ব্যবসার কথা বোলতো। এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। রুচি বুঝে গেছে টাকা আর নিজের বিজনেস ছাড়া আর কোনও বিষয়ে অমিতের কোনও আগ্রহ নেই। বই পড়া, গান শোনা এসব তার আসে না। এমনিতে মানুষটা খারাপ নয়। রুচি নিজে যেভাবে থাকতে চায় তাতে খুব একটা বাধা দেয় না। তবে হুটহাট করে স্ত্রীর বাড়ি থেকে বেরোনো তারও পছন্দ নয়। ইউনিভার্সিটি ছাড়া রুচির অবশ্য বাইরে যাওয়ার বিশেষ কোনও দরকার হয় না। বাপের বাড়িতে থাকতেও তার তেমন বেরোনো অভ্যাস ছিল না। তাই কোনও সমস্যা হয় না। এখনও পর্যন্ত অমিতের দুটো দিক তার ভালো লেগেছে। প্রথমত নিজে এই যে ব্যবসা শুরু করেছে, সেখানে অমিত তার বাবার কাছ থেকে কোনও সাহায্য নেয়নি। টাকা-পয়সা সবই তার নিজের। আর রুচির শরীর নিয়ে অমিতের তেমন কোনও হ্যাংলামি নেই। ফুলশয্যার রাতে শুধু মনখারাপ নয় রীতিমত আতঙ্কে ছিল রুচি। কিন্তু অমিত অতিরিক্ত কোনও আগ্রহ দেখায়নি। ক্রমশ তার মনে হয়েছে, অন্য অনেক কিছুর মতই নারী শরীরও অমিতকে খুব একটা টানে না। এটা ভালো না মন্দ, ভবিষ্যতে এর ফল কী হতে পারে এসব রুচি ভেবে দেখেনি কোনওদিন। বরং নিশ্চিন্ত হয়েছে। অমিত যতটুকু চেয়েছে সেটুকু দিতে আপত্তি করেনি তবে নিজের দিক থেকেও কোনও আগ্রহও প্রকাশ করেনি। সেদিন বিহানের বাড়িতে তাদের দুজনের শরীরী মিলনের যে জোয়ার, বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে অনেকবার মিলিত হয়েও সেই আকুলতা, সেই আগ্রহ খুঁজে পায়নি রুচি। তাই কিছুদিনের মধ্যেই সহবাস তাদের দুজনের কাছেই একটা নিয়মমাফিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসা একটু না দাঁড়ালে সন্তান সে নিতে চায় না, এই কথাটা বিয়ের কযেকদিন পরেই রুচিকে জানিয়ে দিয়েছিল অমিত। এটাও ভারি নিশ্চিন্ত করেছে তাকে। অমিত সম্ভবত কথাটা নিজের মা-বাবাকেও বলে রেখেছিল। তাই সেদিক থেকেও ভাবী নাতি-নাতনির জন্য কোনও চাপ দেওয়া হয়নি। বরং আত্মীয়-স্বজনরা কোনও কথা বললে শাশুড়িই তাদের থামিয়েছেন। প্রথমদিকে রুচির মা একটু ঝামেলা করত। ফড়িয়াপুকুরে গেলেই, বয়স বেড়ে যাচ্ছে, এবার বাচ্চা না নিলে অসুবিধা হবে, এধরনের মন্তব্য মা-ঠাম্মা দুজনেই করতে শুরু করেছিল। বাধ্য হয়েই রুচি একদিন মাকেও অমিতের ইচ্ছের কথাটা জানিয়ে দেয়। তারপর অবশ্য মা আর এনিয়ে কোনও চাপাচাপি করেনি।

 স্বামীর সঙ্গে রুচির হাসি, গল্প, টুকটাক সিনেমা দেখতে কিংবা আত্মীয়ের বাড়ি যাওয়া সবই হয়। কিন্তু তারা যেন আলগাভাবে জুড়ে থাকা দুপিস রুটি। মাঝখানে ভালোবাসার মাখনটা কম পড়েছে। রুচির অবশ্য তাতে কিছু আসে যায় না। সেদিন যাদবপুরের কফিহাউস থেকে বেরিয়ে সে কীভাবে বাসে চড়ে বাড়ি ফিরেছিল নিজেও জানে না। কিন্তু ভালোবাসার সংজ্ঞাটা তার কাছে এরপর থেকেই নিশ্চিতভাবে বদলে গেছে। বিহানের কথায় সেদিন এমন একটা ব্যঙ্গের সুর ছিল যেটা কশাঘাতের মতো রুচির মনের ভিতর কেটে বসে গেছে। বিহানের চোখে সে একটা বড়লোকের বাড়ির অপদার্থ মেয়ে। শাড়ি-গয়নায় মুড়ে বাবার পছন্দমত পাত্রকে বিয়ে করা ছাড়া তার আর কোনও উপায়ই নেই। এটাই যে তার সম্বন্ধে বিহানের ধারণা সেটা সেদিন স্পষ্ট হয়ে গেছিল। কীভাবে পারবে সে নিজেও জানে না। কিন্তু এর একটা জবাব অন্তত নিজের কাছে দিতে বড্ড ইচ্ছে করে রুচিরা বোসের।

সুযোগটা এল খুব অদ্ভুতভাবে। এমএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট খুবই ভালো হয়েছিল। কিন্তু তারপরে কী করবে তা নিয়ে কোনও নিজস্ব পরিকল্পনা ছিল না রুচির। তার পরীক্ষা শেষ হতে শাশুড়ি প্রায় হাঁফ ছেড়ে বলেছিলেন, ‘যাক্ বাবা আর তোমাকে কলেজ যেতে হবে না। বাড়ির বউ এরকম সকাল না হতে বেরিয়ে যায়, যতই বাড়ির গাড়িতে যাও, সারাদিন কাঁটা হয়ে থাকতাম আমি’। তারমানে পড়াশোনা আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার, পিএইচডি করার যে কোনও সম্ভাবনা নেই, সেকথা বুঝে গেছিল ভালো করেই। কিন্তু কিছু একটা করার ইচ্ছেটা মনের মধ্যে অনেকদিন ধরেই নড়াচড়া করছে। অমিতের নিজের ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে। বেশ কিছু টাকা লোকসানও হয়েছে। ফলে তার মন-মেজাজ খারাপ। বাড়ি ফিরে অনেকসময়ই গুম হয়ে থাকে। যদিও শাশুড়ি বারেবারেই তাকে বলেন যে এসব নিয়ে মাথা না ঘামাতে কিন্তু সেটা যে অমিতের ভালো লাগে না সেটা রুচি বুঝতে পারে। এই অবস্থায় নিজের ভবিষৎ পরিকল্পনা নিয়ে অমিতের সঙ্গে আলোচনা করার সাহসও তার হয় না। এরকম করেই রেজাল্ট বেরোনর পর প্রায় বছর দুয়েক কেটে গেল। রুচি যখন সবে ভাবছে যে অমিতকে বলবে ব্যবসার কাজেই তাকে সঙ্গে নিতে সেইসময় হঠাৎ একদিন তার বন্ধু মধুমিতা ফোন করল। শ্বশুরবাড়িতে ফোন আছে। আর ফোন করা নিয়ে নজরদারিরও কোনও ব্যাপার নেই।যদিও ফোন করার লোক রুচির হাতে গোণা। মা-বাবা ছাড়া কলেজের দু-তিনজন বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ আছে। তার মধ্যে মধুমিতা একজন। দুপুরবেলা ফোন করেছিল মধুমিতা। শাশুড়ি তখন নিজের ঘরে দিবানিদ্রায়। কাজের মেয়ে মালতীর ডাকে রুচি গিয়ে ফোন ধরতেই, উত্তেজিতভাবে মধুমিতা বলল, শোন রুচিরা। আমাদের কলেজে কেমিস্ট্রির লেকচারারের পোস্ট খালি হয়েছে। আমি প্রিন্সিপালকে তোর কথা বলেছিলাম। অত ভালো রেজাল্ট শুনে উনি খুবই আগ্রহী। তুই একটা অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে একদিন এসে দেখা কর। আমার মনে হয়ে যাবে। গভর্নিং বডির একটা অনুমোদন লাগবে। তবে প্রিন্সিপাল যদি নিজে বলেন, তাহলে সাধারণত ওঁরা সেটা মেনেই নেন…

কেমন যেন একটা হতভম্বভাবে মধুমিতার কথাগুলো শুনছিল রুচি। এবার নার্ভাস গলায় বলে,

আমি চাকরি করব! কলেজে পড়ানোর চাকরি?

কেন করবি না ! তোর অত ভালো রেজাল্ট। সারাজীবন শুধু বাড়ি বসে হাঁড়ি ঠেলবি আর ছেলে মানুষ করবি নাকি!

মধুমিতার কথাবার্তা চিরকালই এরকম। কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে সে ছিল নিয়মভাঙাদের দলে। রুচির অত সাহস ছিল না ঠিকই কিন্তু মধুমিতাকে তার ভালো লাগত। ওর ওই অন্যরকম ঝাঁঝালো কথাবার্তার জন্যই বেশি ভালো লাগত। অপছন্দের জায়গাও অনেক ছিল। তবে সব মিলিয়ে-মিশিয়ে তাদের বন্ধুত্বটা টিঁকে গেছে। মধুর কাছে খোলাখুলি কথা বলতে অসুবিধা হয় না তার।

শ্বশুরবাড়ি থেকে করতে দেবে না রে। যখন পড়ব বললাম তখনই শাশুড়ি রাজি হচ্ছিল না। নেহাৎ শ্বশুরমশাই বাবাকে কথা দিয়েছিলেন, আর অমিতও আপত্তি করল না তাই সাপের ছুঁচো গেলা করে মেনে নিয়েছিলেন। চাকরি করব বললে শ্বশুর, শাশুড়ি, বর সবাই সার দিয়ে পিছনে পড়ে যাবে। অত অশান্তি আমি সামলাতে পারব না।

শোন, আমি একটা কথা বলি। আগেই কিছু বলার দরকার নেই।অ্যাপ্লিকেশনটা রেডি কর। কিছু একটা মিথ্যে কথা বলে প্রিন্সিপালের সঙ্গে দেখাটাও করে আয়। যদি চাকরিটা হয়ে যায়, তখন নাহয় বাড়িতে জানাবি।

তারপর আমি যদি করতে না পারি, তখন তোর তো মুখ পুড়বে। তুই-ই তো আমার নামটা বলেছিস।

কিচ্ছু মুখ পুড়বে না। আমাকে মুখপোড়া হনুমান বানানো অত সহজ নয়। বিয়ের পর বাঙালি মেয়েদের চাকরি করতে আসা আর এভারেস্ট জয় করা যে প্রায় একইরকম সবাই জানে। যা বলছি তাই কর।

চাকরি করা তার হবে না ধরে নিয়েও খানিকটা মধুমিতার ধাতানিতেই রুচি একটা অ্যাপ্লিকেশন লিখে ফেলে। মাঝখানে একদিন ফড়িয়াপুকুরে গিয়ে হায়ার সেকেন্ডারি আর গ্র্যাজুয়েশনের সার্টিফিকেটগুলোও নিয়ে আসে। স্বাভাবিকভাবেই মায়ের হাজার প্রশ্ন। ‘কী হবে এগুলো নিয়ে? কেন হঠাৎ দরকার পড়ল ?‘এরকমটা যে হতে পারে রুচির ধারণা ছিল। তাই উত্তরগুলোও নিজে ভেবে রেখেছিল। নির্লিপ্ত মুখে বলল, ‘অমিত বলেছে আমাদের পাসপোর্ট বানানো হবে। সেজন্য লাগবে’ পাসপোর্ট বানানোর জন্য কী লাগতে পারে আর না লাগতে পারে সে সম্বন্ধে মায়ের কেন বাবারও সম্ভবত বিশেষ কোনও ধারণা নেই। রুচিরও ছিল না। কিছুদিন আগে তার এক ননদ বিয়ে করে আমেরিকা গেল, তখনই বাড়িতে ভাসা ভাসা শুনেছিল। সেটা এখানে কাজে লেগে গেল। মধুমিতার সঙ্গে ফোনে আরও দু-চারবার কথা বলে অ্যাপ্লিকেশনটা রুচি তৈরি করে ফেলল।

এবার সব কাগজপত্র নিয়ে কলেজে যেতে হবে। রুচি এমনিতে বাড়ি থেকে খুব কমই বেরোয়। তাই সে কোথাও যেতে চাইলে শাশুড়ি সাধারণত আপত্তি করেন না। বিশেষ করে ফড়িয়াপুকুর গেলে তো নয়ই। কিন্তু ঝামেলা একটাই, বাড়ির গাড়িতে যেতে হবে। ড্রাইভাররা সবাই বেশ পুরোন আর মালিকের বশংবদ। তাই বাপের বাড়ি যাচ্ছি বলে বেরিয়ে অন্য কোথাও গেলে ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।  ভেবে-চিন্তে রুচি অন্য একটা মতলব বার করল। পরদিন সকাল বেলায় জলখাবার খেতে বসে শাশুড়িকে বলল, মা, আমার বন্ধু মধুমিতার বিয়ে ঠিক হয়েছে। আমাকে বলছিল যদি আমি একদিন গাড়িটা নিয়ে ওর সঙ্গে বেরোই, তাহলে নিউমার্কেট থেকে কিছু কেনাকাটা করবে।

বিয়ের বাজার করার ব্যাপারে শাশুড়ি সবসময় খুব উৎসাহী। তাই সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় নেড়ে বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ যাও না। প্রশান্তকে সঙ্গে নিয়ে যাও। বন্ধু কি এখানে চলে আসবে?

না। ও তো কলেজে পড়ায়। আমি ওকে কলেজ থেকে তুলে নেব। তারপর কেনাকাটা সেরে বাড়িতে নামিয়ে দেব।

যুক্তিতে কোনও ফাঁকি নেই। শাশুড়ি রাজি হয়ে গেলেন। রুচিও কাগজপত্র নিয়ে সেদিন দুপুরবেলা হাজির হল শিয়ালদার কাছে বেলা দেবী গার্লস কলেজে। মধুমিতাকে বলা ছিল। সে অপেক্ষা করছিল। রুচিকে নিজেই নিয়ে গেল প্রিন্সিপালের ঘরে। প্রিন্সিপাল কনকপ্রভা বেশ রাশভারি মহিলা। বয়সও পঞ্চাশের কাছাকাছি। রুচির কাগজপত্র তিনি ভালো করে খুঁটিয়ে দেখে খুশি হয়ে বললেন, আমার তো মনে হচ্ছে কোনও অসুবিধা হবে না। কোয়ালিফিকেশন ঠিকঠাক আছে। রেজাল্ট তো খুবই ভালো। তবে পরে চেষ্টা করবেন পিএইচডিটা করে নিতে। আমাদের এখানে দরকার হলে ছুটি দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। সামনের মাসের প্রথম সপ্তাহেই গভর্নিং বডির মিটিং আছে। সেখানে আমি আপনার অ্যাপ্লিকেশনটা প্লেস করব। যদি হয়ে যায় তাহলে মাসের মাঝামাঝি আপনার বাড়িতে চিঠি যাবে।

নমস্কার করে বেরিয়ে এল রুচি। তারপর দুই বন্ধুতে নিউমার্কেটে খানিক ঘুরে, ম্যাগনোলিয়ার আইসক্রিম খেয়ে, মধুমিতাকে পার্ক সার্কাসে তার বাড়ির কাছে নামিয়ে বাড়ি ফিরে এল। কেউ কিছু টের পায়নি। তবে রুচির বুকের ভিতর সারাক্ষণ ধুকপুক করছে। যদি শেষপর্যন্ত চিঠি আসে তাহলে কী হবে।

বিকেলে বাদামি রঙের খামটা যখন মালতী দিয়ে গেল তখন রুচি নিজের ঘরেই ছিল। কোনওরকমে দরজা বন্ধ করে খামটা খুলল সে। বেলা দেবী কলেজের তরফে জানানো হয়েছে যে রুচিরা বোসকে কেমিস্ট্রির লেকচারার হিসাবে তাঁরা যোগ্য প্রার্থী বলে মনে করছেন। আগামী সোমবার তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতার সবরকম সার্টিফিকেট সহ কলেজে এসে অন্যান্য যেসব ফর্মালিটি আছে সেগুলো যেন তিনি করে যান। সামনের মাসের এক তারিখে যে তাকে কাজে যোগ দিতে হবে সেটাও লেখা আছে চিঠিতে। চিঠিটা হাতে নিয়ে খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইল রুচি। তারপর ঠিক করল যা করার আজই করতে হবে। রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর অমিত ঘরে এলে তাকে সে কথাটা বলবে। অমিত যদি খুব বেশি আপত্তি করে তাহলে আর শ্বশুর-শাশুড়িকে বলে লাভ নেই। কিন্তু অমিতের যদি তেমন অমত না থাকে তাহলে তার খানিকটা পৃষ্ঠবল বাড়বে। যদিও অমিত রাজি হবে এমন আশা নেই, তবু তার মনে হল চেষ্টাটা এদিক থেকেই করা ভালো।

বোস বাড়িতে রাতের খাওয়াটা একসঙ্গেই হয়। শ্বশুরমশাই সন্ধে নাগাদ বাড়ি ফিরে আসেন। অমিতের ফিরতে একটু দেরি হয় ঠিকই কিন্তু খুব বেশি নয়। বাড়ি ফিরে মা-বাবার সঙ্গে বসে কিছুক্ষণ কথা বলা রুচির বরের অভ্যাস। তারপর স্নানে ঢোকে। শাশুড়িমাও তখন মালতীকে খাবার গরম করতে বলেন। টেবিলে খাবার সাজানো, সুন্দর করে একপ্লেট স্যালাড কেটে দেওয়া রুচির দায়িত্ব। ফড়িয়াপুকুরের মত এবাড়িতেও শেষপাতে মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাস। ফ্রিজ থেকে মিষ্টি বার করে ঠাণ্ডা কাটিয়ে রাখতে হয়। মনের মধ্যে তোলপাড় চললেও সবই ঠিকঠাক করল রুচি। খাওয়ার পর শ্বশুর-শাশুড়ি নিজের ঘরে চলে যান। মালতী ফ্রিজে খাবার ঠিকঠাক তুলল কিনা, সকালের জলখাবারের ময়দা বার করা আছে কিনা, এসব দেখে নিয়ে নিজের ঘরে এল রুচি। তাদের শোবার ঘরের লাগোয়া একটা সুন্দর বারান্দা আছে। সেখানে একসেট বেতের চেয়ার পাতা থাকে। সাধারণত শোয়ার আগে অমিত সেখানে বসেই সিগারেট খায়। আজ ঘরের দরজা বন্ধ করে রুচিও এসে বসল। অমিত তাকে খুব একটা খেয়াল করল না। সে একমনে কিছু ভাবছে। একটু চুপ করে থেকে রুচি বলল,

তোমাকে আমার একটা কথা বলার ছিল।

হ্যাঁ বলো…

অমিত সামান্য অন্যমনস্ক বুঝল রুচি।কিন্তু তাকে তো বলতেই হবে,

আমি না একটা চাকরি পেয়েছি…

চাকরি পেয়েছো! কী চাকরি?

আনমনা ভাব কেটে গিয়ে অমিত প্রায় লাফিয়ে উঠেছে। তার চোখেমুখে প্রবল বিস্ময়।

কলেজে পড়ানোর চাকরি। বেলা দেবী গার্লস কলেজে কেমিস্ট্রির লেকচারার।

দাঁড়াও দাঁড়াও ঠিক করে বুঝতে দাও। চাকরি তুমি পেলে কী করে? চাকরি তো তোমাকে কেউ ঘরে এসে ডেকে দেবে না। তার একটা প্রসেস আছে। তার জন্য অ্যাপ্লাই করতে হয়।

আমি অ্যাপ্লাই করেছিলাম।

কী করে অ্যাপ্লাই করলে? তুমি জানলে কী করে যে ওখানে কেমিস্ট্রির লেকচারার নেওয়া হবে?

রুচি আগেই ঠিক করে রেখেছিল যে মধুমিতার নাম সে কাউকে বলবে না। তাই বলল,

ওদের বিজ্ঞাপন বেরিয়েছিল। ইউনিভার্সিটিতে আমাদের প্রফসর ছিলেন মিসেস নেলি বোস। ওঁর বোন ওখানে পড়ান। উনিই খোঁজখবর নিয়ে আমার ফোন নম্বর যোগাড় করে আমাকে জানিয়েছিলেন।

উনি ফোন করলেন আর চাকরি হয়ে গেল!

অমিতের গলায় একই সঙ্গে ব্যঙ্গ আর অবিশ্বাস। রুচি যতটা সম্ভব নিজেকে সামলে নিয়ে শান্তভাবে বলে, না তা হয়নি। হওয়া সম্ভবও নয়। তোমাকে খোলাখুলিই বলছি, নেলি ম্যাডাম ফোন করার পর আমি ওঁর কথামত অ্যাপ্লিকেশন লিখে, যেসব ডকুমেন্টস বলেছিলেন সেগুলো নিয়ে কলেজে গেছিলাম। প্রিন্সিপালের সঙ্গে কথা বলে সব দিয়েও এসেছিলাম। তারপর ওঁরা ওদের গভর্নিং বডির মিটিংয়ে আলোচনা করে, সিদ্ধান্ত নিয়ে আমাকে চিঠি পাঠিয়েছেন।

বাবা, তুমি তো সাংঘাতিক স্মার্ট মেয়ে! এত কিছু করে ফেলেছো, বাড়িতে কেউ কিছু টেরটিও পায়নি। কই চিঠিটা দেখি।

রুচি ঘরে গিয়ে চিঠিটা এনে অমিতের হাতে দেয়। বারন্দার আলোটাও জ্বালিয়ে দেয়। অমিত মন দিয়ে চিঠিটা পড়ে সামনের টেবিলে রেখে বলে, তুমি তো জানো রুচি মা-বাবা কেউ রাজি হবেন না। বোস বাড়ির বউ চাকরি করতে যাবে এটা ওঁরা মেনে নেবেন না।

কিন্তু এটা তো মেয়েদের কলেজ। সব মহিলা প্রফেসর। গাড়িতে যাব গাড়িতে আসব…..

ওতে কিছু যায় আসে না। বাড়ির বউ রোজ সকালে সেজেগুজে বেরিয়ে যাচ্ছে এটা ওঁরা ভাবতেই পারে না। আর তুমিই বা হঠাৎ চাকরির জন্য ক্ষেপে উঠলে কেন ? এখানে তো তোমার কোনও অভাব নেই!

না না আমি তা বলছি না। তোমাদের বাড়িতে আমার সত্যিই কোনও অভাব নেই। কিন্তু কাজও তো তেমন কিছু নেই। সময় কাটতে চায় না। তাই মনে হচ্ছিল যদি কিছু করি। এমএসসিটা যখন করেই ফেলেছি…

গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ে অমিত। বুকের ভিতরটা একদম দমে যায় রুচির। কেমন যেন মনে হয় হাত-পায়ের জোর চলে গেল। অমিতের উল্টোদিকের চেয়ারটায় বসে পড়ে গা ছেড়ে দিয়ে। তার দিকে একবার তাকিয়ে চিঠিটা আরও একবার তুলে নিয়ে পড়ে অমিত। এতক্ষণ উত্তেজনার পর অবসাদে চোখ বুজে গেছে রুচির। হঠাৎ অমিতের গলা শুনে চমকে ওঠে,

ঠিক আছে, তোমার যখন এত ইচ্ছা, তখন বাবাকে একবার বলে দেখি। যদিও রাজি হবেন বলে তো মনে হয় না।

তুমি যদি একটু জোর দিয়ে বলো, তাহলে নিশ্চয় হবেন…

রুচির বুকের ভিতর আবার আশার আলো চমকে উঠেছে।

জয়েনিং বলেছে মাস পয়লায়। তারমানে পরের সপ্তাহেই কাগজপত্র সব জমা দিতে হবে। রবিবার বাবা বাড়ি থাকবেন। সুগার আর প্রেশারের রিপোর্ট ঠিকঠাক এসেছে, তাই মেজাজ ভালো। চলো একবার কথাটা পেড়ে দেখি।

এতটাও ভাবেনি রুচি। কৃতজ্ঞতায় তার চোখে জল এসে যায়। নরম করে হাত রাখে অমিতের হাতের ওপর। অমিত যদিও এসব আবেগের তেমন ধার ধারে না কখনোই। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই বলে, চিঠিটা তুলে রাখো। আমি সিগারেটটা শেষ করে যাচ্ছি।

শ্বশুর-শাশুড়ি দুজনেরই প্রবল আপত্তি ছিল। কিন্তু অমিতের জোরের কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানতে হল তাদের। ১৯৭৮ সালের জুন মাসের পয়লা তারিখে বেলাদেবী গার্লস কলেজে কেমিস্ট্রির লেকচারার হিসাবে কাজে যোগ দিল রুচিরা বোস।

তাকে চাকরি করতে দিতে অমিত সেদিন কেন রাজি হয়েছিল, এই কথাটা রুচি বুঝেছে অনেক পরে। আসলে তখন অমিতের নিজের ব্যবসার অবস্থা খুব খারাপ যাচ্ছিল। অনেক টাকা লোকসান হয়ে গেছে। বাবার কাছে চাওয়ার মুখ নেই বলে লোন নিতে হয়েছে।সবমিলিয়ে তার আর্থিক অবস্থা তখন খুবই খারাপ। রুচির পক্ষে এটা বোঝা সম্ভব ছিল না। কারণ ব্যবসার লাভ-লোকসানের ব্যাপারে কোনও কথাই তাকে অমিত বলত না। শাশুড়িও কিছু জানতেন না। শ্বশুর জানতেন কিনা বা কিছু অনুমান করেছিলেন কিনা রুচি জানে না। বাড়িতে তাদের দুজনের থাকা-খাওয়ার জন্য অমিতকে কিছু দিতে হত না। কিন্তু একটা অলিখিত নিয়ম ছিল। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের বাড়িতে কোনও বিয়ে, পৈতে, অন্নপ্রাশন বা ওইরকম কোনও উপলক্ষে সপরিবারে নেমন্তন্ন হলে সেই উপহারের দায়িত্ব অমিতের। বড় পরিবার। তাই দু-একমাস অন্তর এরকম অনুষ্ঠান লেগেই থাকে। আর রমানাথ বোসের সম্মান রাখতে বেশ দামী উপহারই দিতে হয়। বিশেষ করে আত্মীয়দের মধ্যে কেউ হলে তো সোনার গয়না ছাড়া অন্য কিছু দেওয়ার কথা রুচির শাশুড়ি ভাবতেই পারেন না। এইটা অমিতের পক্ষে ক্রমশ অসুবিধাজনক হয়ে যাচ্ছিল। রুচি পরে মনে করে দেখেছে, সে চাকরি পাওয়ার পর থেকেই অমিত কোনও অনুষ্ঠান হলে প্রথমদিকে্ তাকে বোলতো, গয়নাটা তুমি কিনে নিয়ে এসো রুচি। আমি তো কাজ ছেড়ে যেতে পারব না। তোমাকে পরে টাকাটা দিয়ে দেব।

রুচি কখনও টাকা চাইত না। অমিতেরও আর দেওয়ার কথা মনে থাকত না। পরের দিকে আর ফেরত দেওয়ার কথা বলতোও না। রুচি নিজেই উপহার কিনে আনতো। খুশি মনেই আনতো। কারণ তার তো নিজের কোনও খরচ নেই। সংসারে কিছু দিতে হয় না। মাঝেমধ্যে শুধু ফড়িয়াপুকুর গেলে ঠাম্মার জন্য ফল আর হরলিক্স কিনে নিয়ে যায় আর পুজোয়, পয়লা বৈশাখে মা-বাবার জন্য ধুতি-শাড়ি কেনে। বাকি টাকা তার জমে। তাই উপহারের জন্য টাকা খরচ করতে আপত্তি ছিল না রুচির।

অমিত যে রুচির ইচ্ছে হয়েছে বলে নয়, নিজের কোনও প্রয়োজনেই সেদিন চাকরি করতে দিতে রাজি হয়েছিল, মা-বাবাকেও রাজি করিয়েছিল এই সন্দেহটা রুচির হয় মেয়ে পেটে আসার পর। ততদিনে অমিতের ব্যবসার খারাপ সময় কেটে গেছে। লাভ হচ্ছে হুড়মুড়িয়ে। ব্যবসা যে শক্ত মাটিতে দাঁড়িয়ে গেছে বুঝে নিয়েছে অমিত। শ্বশুরমশাইয়ের সঙ্গে তার বরের কথাবার্তায় রুচিও সেটা আন্দাজ করেছিল। তবে অমিত যেদিন তাকে বলল যে এবার বাচ্চা নেওয়া যেতে পারে সেদিন নিশ্চিত হয়েছিল। বিয়ের পাঁচবছরের মাথায় অন্তঃসত্তা হল রুচি। শাশুড়ি খুব খুশি। ফড়িয়াপুকুরের বাড়িতেও আনন্দের জোয়ার। এরমধ্যেই একদিন রাতে অমিত বলল, এবার তাহলে তুমি চাকরিটা ছেড়ে দাও।

কেন, চাকরি ছাড়ব কেন? মেটারনিটি লিভ দেবে তো।

ছাড়ো তো তোমার মেটারনিটি লিভ। কতদিন ছুটি দেবে…তিনমাস…চারমাস? তারপর বাচ্চা মানুষ করবে কে?

বাচ্চার দেখাশোনার জন্য আলাদা একটা সবসমেয়র লোক রাখব। তাছাড়া মা তো বাড়িতেই থাকবেন, মালতী আছে। আমার তো কলেজে সপ্তাহে দুদিন ছুটি। প্রথম মাস ছয়েক নাহয় ল্যাব করব না। তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে আসব…

শোনো রুচি, ওসব বাজে কথা ছাড়ো। আমার বাচ্চা কাজের লোকের হাতে মানুষ হবে না। তোমার রোজগারের ওইকটা টাকায় আমার দরকার নেই। অনেক চাকরি করা হয়েছে। এবার একটু সংসারে মন দাও। বাচ্চা মানুষ করো। মা-বাবার বয়স হচ্ছে, তাদেরও একটু যত্ন-আত্তি করো এবার। আর কতদিন গায়ে হাওয়া দিয়ে চলবে…

রাগে-অপমানে গলা বন্ধ হয়ে আসে রুচির। কিন্তু জীবনে এই প্রথম নিজেকে সামলে নিয়ে সে ঠাণ্ডা কঠিন গলায় বলে, গায়ে হাওয়া লাগিয়ে আমি বেড়াই না। আমার কাজটা পড়ানোর। আর আমার মনে হয় না বাচ্চা হবে বলেই চাকরিটা আমাকে ছাড়তে হবে। এখনই চাকরি ছাড়ার কোনও দরকার নেই। পরে যদি প্রয়োজন মনে হয় তখন ভেবে দেখবে।

ভেবে দেখবে মানে! আমি বলছি তোমাকে চাকরি ছাড়তে হবে।

তোমার সবকথা আমি মেনে চলি। তোমার মা-বাবারও কোনও কথা আমি অমান্য করি না। কিন্তু এটা আমি মানতে পারব না।

রগের শিরা ফুলে গেছে রুচিরার। মুখ লাল। নাকের পাটা কাঁপছে। পোয়াতি অবস্থায় এতটা উত্তেজিত হলে শরীরের কোনও ক্ষতি হতে পারে ভেবেই হয়তো সেদিন চুপ করে গেছিল অমিত। কিংবা হয়তো ভেবেছিল, এমন তেজ আর কদিন থাকবে। ওইরকম নরম-সরম মেয়ে। দুদিন বাদেই ফণা নামিয়ে নিজেই সুড়সুড় করে ঝাঁপিতে ঢুকবে। কিন্তু তা হয়নি। অমিত, শ্বশুর-শাশুড়ি, নিজের মা-বাবা কারও অনুরোধেই সেদিন মাথা নোয়ায়নি রুচি। কোথা থেকে অমন শক্তি পেয়েছিল সে জানা নেই। কিন্তু লড়ে গেছিল দাঁতে-দাঁত চেপে। শেষপর্যন্ত হার মানতে বাধ্য হল সবাই। আরও ছমাস পরে মউপিয়া যখন জন্মাল তখন বাড়ির সবাই জানে মেটারনিটি লিভ শেষ হলে আবার কলেজে ফিরে যাবে রুচি। তবে একটা কথা শুধু রুচি নিজে বুঝতে পেরেছিল, অমিতের সঙ্গে তার একটা মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে, যেটা সহজে মিটবার নয়।


১৩

সেদিনটা পরিষ্কার মনে আছে রুচির। তার আগের দিন মউপিয়ার দশবছরের জন্মদিন ছিল। আত্মীয়-স্বজন অনেকেই এসেছিল। মউয়ের বন্ধুরাও ছিল। নীচের বসার ঘরটা সুন্দর করে ফুল আর বেলুন দিয়ে সাজিয়ে সেখানেই সব ব্যবস্থা হয়েছিল। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া মেয়ে। তার ধরন-ধারণ রুচির থেকে আলাদা। তাই বড় কেক এসেছিল নিউমার্কেট থেকে। তার ওপর মোমবাতি জ্বেলে-নিভিয়ে গান গাওয়াও হল। সঙ্গে অবশ্য পোলাও, মাছের কালিয়া, পায়েস, মিষ্টি এসবও ছিল। সবকিছু সেরে রাতে শুতে দেরি হয়েছে। খাবার যা বেঁচেছিল ফ্রিজে তুলে রেখেছে মালতী। সকালে সেসব নিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছিল রুচি। শাশুড়ি ইদানীং আর রান্নাঘরে আসেন না। বিশেষ করে বছর দুয়েক আগে শ্বশুরমশাই চলে যাওয়ার পর একটু যেন জবুথবু হয়ে পড়েছেন। বাবা মারা যাওয়ায় এখন ব্যবসার পুরো দায়িত্বই অমিতের ঘাড়ে। কাজের চাপও বেড়েছে অনেক। তাও ছুটির দিন বলে চাযের কাপ আর খবরের কাগজ নিয়ে বসেছিল খাবার ঘরের টেবিলে। হঠাৎ-ই খবরের কাগজ থেকে মুখটা বাড়িয়ে বলল, তুমি কি বিহান সেন কে চেনো?

বিয়ের পাঁচবছর পরে মেয়ে হয়েছে। তারও বয়স হল দশবছর। একযুগেরও বেশি সময়ের ওপার থেকে হঠাৎ নামটা ভেসে এসে যেন আছড়ে পড়ল রুচির ওপর। কোনওরকমে ফ্রিজের দরজাটা খুলে অমিতের দিকে পিছন ফিরে ভিতরের জিনিসপত্র দে্খার ছলে দু-এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল। তারপর যতটা সম্ভব স্বাভাবিক গলায় জানতে চাইল,

কে বিহান সেন?

কালকে আমার অফিসে এসেছিলেন। কথায় কথায় হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলেন আমার স্ত্রীর নাম রুচিরা কিনা।

বুকের কাঁপুনি অনেকটা কমে এসেছে। আর অমিতের গলা কিংবা কথা বলার ধরনে মনে হচ্ছে না সে কোনওরকম সন্দেহ করেছে। রুচি তাই ফ্রিজটা বন্ধ করে টেবিলের সামনে এসে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়।

আমি বেশ অবাক হয়েছি দেখে বললেন, আপনার স্ত্রী তো ফড়িয়াপুকুরের মেয়ে। কলেজে পড়ার সময় আমার মাথায় নাটকের ভূত চেপেছিল। যাঁর দলে নাটক করতাম, তাঁর সঙ্গে ওদের পাড়ার ক্লাবে একবার রক্তকরবী করেছিলাম। আমি বিশু পাগল আর আপনার স্ত্রী করেছিলেন নন্দিনী। তারপরে অবশ্য আর যোগাযোগ হয়নি। পরে ওই নাটকের দলেরই কারও মুখে বোধহয় শুনেছিলাম বালিগঞ্জের রমানাথ বোসের ছেলের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে। তুমি আবার নাটক করতে নাকি?

ওই একবারই করেছি। ভদ্রলোক ঠিকই বলেছেন। অনেকদিন হয়ে গেছে। হঠাৎ করে নামটা বলায় প্রথমটা বুঝতে পারিনি। রাধারমণদার দলে অভিনয় করতেন। তোমার কাছে এসেছিলেন কীজন্য?

বিহান সেন এখন খুব নামকরা প্রোমোটার। কলকাতার সব বড় বড় রিয়েল এস্টেট ওর দখলে। নাকতলায় বাবা সস্তায় পেয়ে এক লপ্তে অনেকটা জমি কিনে রেখেছিল। সেটা কিনতে চায়।

ওখানে তো একটা বড় পুকুর আছে বলেছিলে।

আরে পুকুর বুজিয়ে দেবে। বিহান সেন হচ্ছে পার্টির কোলের ছেলে। একেবারে যাকে বলে ব্লু-আইড বয়। যা খুশি করুক পুলিশ ওর গায়ে হাত দেবে না। এর আগে সিরিটি এলাকায় যে আগুন লাগিয়ে বস্তি উচ্ছেদ করে লোকগুলোকে তাড়িয়ে দিল, তার পিছনেও ওরই হাত ছিল।কিন্তু গায়ে আঁচড়টি পরেনি।

হঠাৎ আমার কথা তুললেন কেন?

কিছুই না। ব্যবসার ট্যাকটিক্স। বউয়ের বাপের বাড়ির লোক ভাবলে যদি কিছু সুবিধা হয়। আমি অবশ্য সেই ফাঁদে পা দিইনি। মেট্রোটা হয়ে গেলেই ওদিকে জমির দাম অনেক বেড়ে যাবে। সেই বুঝেই দর দিয়েছি।

বাপের বাড়ির লোক নয়। ওই একবারই নাটকের সূত্রে পরিচয় হয়েছিল। ও নিয়ে তোমার মাথা ঘামানোর দরকার নেই। নিজে যা ভালো বুঝবে সেটাই কোরো।

ঠাণ্ডা গলায় কথাগুলো বলে অমিত আর মেয়ের জন্য জলখাবার বেড়ে দেয় রুচি। মালতীর হাতে শাশুড়ির খাবার পাঠিয়ে দেয়। সাধারণত সে নিজেও একইসঙ্গে খাবারটা খেয়ে নেয়। কিন্তু আজ কেমন যেন ইচ্ছে করছে না। অমিত আবার কাগজের মধ্যে ডুবে গেছে। ব্যবসার কাজকর্ম নিয়ে এতকথা রুচিকে সে কোনওদিনই বলে না। নিজের স্ত্রীর নাম হঠাৎ অপরিচিত ভদ্রলোকের মুখে শুনে বেশ অবাক হয়েছে বলেই যে বলেছে সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না রুচির। কৌতূহল মিটে যেতেই আবার ফিরে গেছে নিজের জগতে।

 ধীরপায়ে নিজের ঘরে আসে রুচি। এই ঘরটা এখন তার। মেয়ে হওয়ার পরেই রাতে ঘুমের অসুবিধা হয় বলে আলাদা ঘরে শোয়ার ব্যবস্থা করেছিল অমিত। রুচির ঘরে রাতে মেঝেতে শুতো মউয়ের দেখাশোনার জন্য যাকে রাখা হয়েছিল সেই মেয়েটি। বাচ্চা বড় হওয়ার পরও সেই ব্যবস্থা আর বদলায়নি। তবে মেয়ের এখন একটা আলাদা পড়ার ঘর হয়েছে। সেখানে তার টেবিল-চেয়ার, বইখাতা থাকে। দিনের বেশিরভাগ সময়টা মউ সেখানেই কাটায়। রাতে মায়ের কাছে শুতে আসে। তবে সেটাও  আর খুব বেশিদিন আসবে বলে মনে হয় না। বাবার কাছে পড়ার ঘরেই একটা আলাদা ডিভানের জন্য আবদার পেশ করা হয়ে গেছে। আসলে একমাত্র সন্তান হলেও মউ খুব একটা মা ন্যাওটা নয়। এমনিতেই তার মেয়ে যে একটু একলষেঁড়ে ধরনের, নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতে ভালোবাসে সেটা রুচি বোঝে। তাও ওরমধ্যেই যেটুকু টান আছে সেটা ঠাকুমার ওপরেই বেশি। ছোটবেলায় রুচি যখন কলেজে চলে যেত তখন মউ বেশিরভাগ সময়টা ঠাকুমার কাছেই থাকত। সেটাই হয়তো কারণ। রুচি জানে, মা তাকে ফেলে চাকরি করতে যায়, তাকে বেশি ভালোবাসে না, যত্ন করে না এরকম ধারণা নাতনির মাথায় ঢুকিয়েছিলেন তার শাশুড়ি। মউ যখন বেশ ছোট তখন তার কথাবার্তায় এটা মাঝেমধ্যে প্রকাশ পেত। রুচির ধারণা হয়েছিল বড় হলে, নিজের বোধবুদ্ধি হলে এটা বদলে যাবে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত সেটা হয়নি। মেয়ের সঙ্গে তার একটা দূরত্ব আছে।  

মনটা বড় অস্থির লাগছে। কিছুটা সময় অন্তত নিজের সঙ্গে একলা হওয়া দরকার। তাই জামা-কাপড় গুছিয়ে নিয়ে স্নানের ঘরে ঢোকে রুচি। শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে ছেড়ে দেয় নিজেকে। ঈষদুষ্ণ জলের ধারা নামছে সারা শরীর বেয়ে। ধুয়ে যাচ্ছে গোপন স্থানে জমে থাকা ময়লা। রুচির মনে হচ্ছে যেন বহুদিনের জমে থাকা অনুভূতিও সেই জলের ধারায় ধুয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে শরীর থেকে। গোপন ভালোবাসা, গোপন সুখ, গোপন অহং। হঠাৎ কুলকুল করে একটা হাসির স্রোত উঠে আসে তার ভিতর থেকে। কত বোকা ছিল সে ! বিহান তাকে ফিরিয়ে দেওয়ায় দুঃখ পেয়েছিল। তাকে বড়লোকের অপদার্থ মেয়ে বলে অপমান করায় রাগ হয়েছিল। রাতের পর রাত তার চোখে ঘুম আসেনি, নিঃশব্দে কেঁদেছে। কিন্তু এতকিছুর পরেও বিহানের প্রতি তার ভালোবাসা মরে যায়নি। কারণ রুচি জানত যে সে একজন মহান মানুষকে ভালোবেসেছে। যে নিজের জন্য কিছু চায় না। গরীব মানুষের, মেহনতি মানুষের পাশে দাঁড়ানোই তার লক্ষ্য। বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে সে। আর সেজন্য নিজের ভালোবাসাকেও বিসর্জন দিতে দ্বিধা করে না। এমন একজন মানুষকে ভালোবাসার মিথ্যে গর্ব সে নিজের বুকের গোপন কুঠুরিতে জমিয়ে রেখেছিল। আজ সেই কুঠুরির দরজা হাট করে খুলে গেছে। সুগন্ধি সাবানের ফেনায় সাফ হয়ে যাচ্ছে সব। আজ রুচি স্নাত, মুক্ত। শাওয়ারের নীচে নানা ভঙ্গিমায় নিজের শরীরকে মেলে ধরে আপনমনে হাসতে থাকে রুচি।


১৪

২০০৫

সমস্যাটা ঠিক কবে শুরু হয়েছিল রুচি বলতে পারবে না। তবে ২০০০ সালের আগে সম্ভবত নয়। মউ হওয়ার সময় থেকেই অমিতের সঙ্গে তার একটা মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়। মেয়ে হওয়ার পর ঘর আলাদা হয়েছিল। তবে তখনও তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক একদম বন্ধ হয়ে যায়নি। মাঝে মাঝে ভোররাতে অমিত উঠে তাদের ঘরে চলে আসত। মউ একটু বড় হওয়ার পর রুচিই যেত অমিতের ঘরে। তবে ধীরে ধীরে সেটা কমছিল। প্রথমদিকে মাসে দু-একবার, তারপর দুমাসে একবার এমনি করে মউ যখন বছর দশেকের তখন আর দুজনের মধ্যে শরীরের যোগ নেই বললেই চলে। রুচি তখন চল্লিশও নয়। শরীর মাঝে মাঝেই জানান দিত। কিন্তু সেটাকে উপেক্ষা করাই অভ্যাস করে ফেলেছিল সে। অমিত কী করত জানা নেই। তবে দু-তিন মাস অন্তর ব্যবসার কাজে মুম্বই যেতে হত তাকে। সেই সময় নিজের শরীরের চাহিদা মেটানোর কোনও ব্যবস্থা সে করত কিনা রুচি জানে না। হালকা একটা সন্দেহ হলেও সরাসরি কোনও প্রমাণ সে কোনওদিন পায়নি। আসলে নিজের মনের দিক থেকে এই চিন্তাটাকে সে খানিকটা এড়িয়েই চলত। সংসারে কোনও অসুবিধা ছিল না। স্ত্রী এবং মেয়ের প্রতি কর্তব্যেও অমিতের কোনও ত্রুটি ছিল না। কলেজে ততদিনে রুচি বেশ খানিকটা সিনিয়র হয়েছে। ফলে দায়িত্ব এবং কাজের চাপ বেড়েছে। তাছাড়া সে ভালো গান জানে, একটু-আধটু নাটকও করতে পারে। তাই কলেজের কালচারাল প্রোগ্রামের ভার অনেকসময়ই তার ওপরে থাকে। মউ বড় হচ্ছে। সে যে দারুণ ব্রিলিয়ান্ট ছাত্রী তেমনটা নয়। তাই তার পড়াশোনাও খানিকটা দেখতে হয়। যদিও অমিত খুব স্পষ্টভাবেই বলে দিয়েছে মেয়ের পড়াশোনা নিয়ে রুচির মাথা ঘামানোর দরকার নেই। উচ্চমাধ্যমিক পাস করলেই সে মউকে আমেরিকা পাঠিয়ে দেবে। কোথায় ভর্তি করবে তারও খোঁজখবর নিয়ে রেখেছে। সেখানে থাকবে। নিজের মত পড়াশোনা করে বছর পাঁচ-সাত পরে ফিরে এসে ব্যবসার দায়িত্ব নেবে। কিন্তু মোটামুটি একটা রেজাল্ট করে উচ্চমাধ্যমিক পাস তো করতে হবে। তাই রুচির পক্ষে গা ছেড়ে দেওয়া সম্ভব হয় না। মউ পছন্দ করে না মোটেই। তবু তার পড়াশোনার তদারকি সে নিজেই করে। শাশুড়ি এই কয়েক বছরে আরও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। প্রায় শয্যাশায়ীই বলা যায়। তাই তার দেখাশোনা-যত্নআত্তির একটা ব্যাপার আছে। এছাড়া আত্মীয়-স্বজন লোক-লৌকিকতা সবই তো রুচির ঘাড়ে। এত কিছু সামলিয়ে নিজের শরীরের চাহিদার কথা ভাবার তার অবকাশ মেলে না। আর এই ফাঁকে বছরগুলো হাত ফসকে গলে বেরিয়ে কখন যেন তাকে যৌবনের শেষপ্রান্তে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। হঠাৎ একদিন অনুভব করে ঘন চুলের ভার যেন কিছুটা হালকা হয়েছে। ঝুরো চুলে ঢেকে থাকা কপালে আগে বড় টিপ মানাত না। এখন দিব্যি দেখায়। ভোরবেলা হঠাৎ একটা মানুষকে কাছে পাবার উথাল-পাথাল ইচ্ছায় সারা শরীর উদ্বেলিত হয়ে যে ঘুম ভেঙে যেত, সেটাও কতদিন যেন আর হয় না।

এই অনুভূতিগুলো আরও বাড়ল যখন অনেকদিন অসুস্থ থাকার পর শাশুড়ি স্বর্গে গেলেন আর মেয়েও উচ্চমাধ্যমিক পাস করে আমেরিকা পাড়ি দিল। বাড়িটা হঠাৎ খালি হয়ে গেল। রুচির কাজও কমে গেল অনেক। আর এই সময় মানে নতুন শতকের ঠিক আগে থেকেই অমিত হঠাৎ ভয়ানক ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তার কাজের ধারাটাও গেল বদলে। শ্বশুরমশাইয়ের ছিল রিটেলের কারবার। বেশ কয়েকটি মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির ডিলারশিপ ছিল বোসেদের। অমিত তার সঙ্গে শুরু করেছিল এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের ব্যবসা। দুটোই খুব ভালো চলছে। দুজায়গা মিলিয়ে প্রায় একশজন কর্মচারী। কিন্তু তারপরেও অমিতের মনে হল ভালো লাভের জন্য সে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে বিনিয়োগ করবে। রুচিরা এব্যাপারে কিছু জানত না। এবাড়িতে সিনেমা কিংবা নাটক দেখার চল কোনওকালেই নেই। তাই অমিত যখন হঠাৎ একদিন তাকে জানাল যে একটা নতুন ছবির প্রিমিয়ারে তারা অতিথি হিসাবে আমন্ত্রিত, তখন রুচি বেশ অবাকই হয়েছিল। পরে গিয়ে অবশ্য বুঝতে পারল ছবিটির প্রযোজক অমিত বোসের কোম্পানি এলএফ এন্টারপ্রাইজ এবং সেইজন্যই এত খাতির। রুচি সেদিন সব দেখেশুনে বেশ হকচকিয়েই গেছিল। চারিদিকে আলো আর ক্যামেরার ঝলকানি। দারুণ সেজেগুজে সিনেমার তারকারা সব এসেছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে যে অমিত আগে থেকেই চেনে। তারা এগিয়ে এসে হেসে কথা বলছে, রুচির সঙ্গেও আলাপ করছে। পরিচালকের গলা জড়িয়ে ধরছে। সব মিলিয়ে একেবারে অন্য একটা জগৎ। তারপরেও দু-একবার এরকম যেতে হয়েছে তাকে। ছবির সাফল্যের পর পাঁচতারা হোটেলের পার্টিতেও গেছে। কিন্তু সব মিলিয়ে তার ভালো লাগেনি। মানিয়ে নিতে অসুবিধা হয়েছে। তবে অমিত যে এই পুরো ব্যাপারটাই খুব উপভোগ করে সেটা বুঝতেও অসুবিধা হয়নি।

অমিতের জীবনযাত্রার ধরনও যে পাল্টে যাচ্ছে সেটা এই সময় থেকেই একটু একটু করে বুঝতে পারছিল রুচি। ইদানীং বাড়ি ফিরতে তার বেশ রাত হয়। বেশিরভাগ দিনে বাইরে খেয়েই আসে। কোনওদিন ডিরেক্টরের পার্টি থাকে, কোনওদিন মিটিং কিংবা কারও বাড়িতে গেট-টুগেদার। আগে রুচি খাবার নিয়ে অপেক্ষা করত। এখন আর করে না। একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর নিজে খেয়ে নেয়। অমিতের খাবার গুছিয়ে টেবিলে রাখা থাকে। বাড়ির পুরোন লোক শিবুদার কাজ গেটে তালা লাগিয়ে নীচের দরজা বন্ধ করা। তাকে বলা আছে। সেই খেয়াল রাখে। দাদাবাবু না খেলে খাবার ফ্রিজে তুলে রেখে। খেলে, এঁটো থালা-বাসন নামিয়ে শুতে যায়। রুচি নিজের ঘর থেকে বেরোয় না। তবে শুধু দেরি করে ফেরা নয়। আনুষাঙ্গিক আরও কিছু অভ্যাসও অমিতের বদলেছে। মদ খাওয়া নিয়ে রুচির কোনও ছুঁৎমার্গ নেই। তার বাপের বাড়িতে কেউ মদ খেতো না ঠিকই। কিন্তু বিয়ের পর দেখেছে শ্বশুরমশাইদের ভাইরা একসঙ্গে হলে বাড়িতেও বোতল খোলা হত। সেটা নিছকই আনন্দের ব্যাপার। মাতাল কেউ হতেন না। অমিতও চিরকালই বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে দেখা হলে দু-এক পেগ খায়। সাহেব-সুবোদের সঙ্গে মিটিং কিংবা অফিসের কিছু অনুষ্ঠানেও যে মদ খাওয়া হয় সেটা রুচি জানে। কিন্তু কোনওদিন আপত্তিকর কিছু দেখেনি। অথচ সেই মানুষটা এখন মদ খেয়ে টলতে টলতে ঘরে ফেরে। শিবুদাকে একেকদিন গাড়ি থেকে ধরে ধরে নামাতে হয়। বাড়ির কাজের লোকের সামনে রীতিমত অপ্রস্তুত বোধ করে রুচি। কিন্তু অমিতের কোনও বিকার নেই। দু-চারবার বারণ করতে গেছে। কিন্তু অমিত স্পষ্টই বলে দিয়েছে, এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই। সোসাইটিতে অমিত বোসের এখন যা স্ট্যাটাস তাতে এরকম একটু-আধটু না করলে চলবে না। এসব বোঝা রুচির সাধ্য নয়। তাই তার সংসার আর চাকরি নিয়ে ব্যস্ত থাকাই ভালো।

ইদানীং অমিতের মুখের ভাষাও বেশ খানিকটা বদলে গেছে। আজকাল খবরের কাগজে সিনেমার পাতাগুলো সে বেশ মন দিয়ে দেখে। একদিন এরকমই এক নায়িকার ছবি দেখে হঠাৎ বলে উঠল, আরে বাঃ, এই মেয়েটাকে তো ঝক্কাস দেখতে!

মধ্যবয়সে পৌঁছে যাওয়া স্বামীর মুখে শব্দটা শুনে বেশ ঘাবড়েই গেছিল রুচি। এমনিতে অমিত চিরকালই বাড়িতে কম কথা বলে। স্ত্রীর সঙ্গে গল্প-গাছা করার অভ্যাস তার নেই। তারমধ্যেও আজকাল যতটুকু কথা হয় সবই প্রায় সিনেমার জগৎ নিয়ে। কোন অভিনেত্রী অহংকারী। কে ডুবে ডুবে জল খায়। এসবের মাঝে একটা নাম বেশ কয়েকবার শুনেছে রুচি। অপরূপা সান্যাল। সে মেয়ে নাকি একেবারেই সার্থকনামা। কিন্তু এমন দুর্ভাগ্য যে টালিগঞ্জের পরিচালকরা কেউ তাকে নায়িকার রোল দিতে চায় না। দু-চারজন ভ্যাম্পের রোলের অফারও দিয়েছে। অপরূপা এসে কেঁদে পড়েছিল অমিতের কাছে। ছবিতে টাকা যে ঢালছে, তার কথা তো আর অমান্য করা যায় না। তাই অমিতের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত একজন পরিচালক রাজি হয়েছেন অপরূপাকে নায়িকা হিসাবে নিতে।

এত ট্যালেন্টেড মেয়ে। একটা সুযোগ ওর দরকার ছিল বুঝলে। সেটা আমি ওকে করে দিয়েছি। এই ছবিটাতে ওর অভিনয় দেখে চমকে যাবে সবাই।

ভদ্রমহিলা নিশ্চয় তোমার প্রতি খুবই কৃতজ্ঞ?

হ্যাঁ, হতেই পারে…আমি ওসব নিয়ে ভাবিনা। দু-চারটে অন্য মন্তব্য করে কথাটা এড়িয়ে গেছিল অমিত। তারপরেও বেশ কয়েকবার অপরূপার প্রসঙ্গে উঠছে। কিন্তু সেই ছবিটা হল কিনা কিংবা তাতে মেয়েটি কেমন অভিনয় করল জানা হয়নি রুচির। মেয়েলি অনুভূতি দিয়ে অমিতের যে মেয়েটির প্রতি একধরনের আগ্রহ আছে সেটাও সে বুঝেছিল। কিন্তু কুড়ি বছরের বেশি বিয়ে হয়ে গেছে তাদের। এইসব বিষয় নিয়ে স্বামীকে কিছু বলতে ইচ্ছে হয়নি। নিজেকে বড্ড ছোট মনে হচ্ছিল। তাছাড়়া বিষয়টা নিয়ে তেমন কোনও আশঙ্কাও তার মধ্যে তৈরি হয়নি।

ভুলটা ভাঙল ছোট্ট একটা ঘটনায়। সেদিন কলেজে ক্লাস সেরে ফিরে টিচার্স রুমে ঢুকেই তার মনে হল সবাই যেন একটু সতর্ক হয়ে গেল। ঘরের মাঝখানে লম্বা একটা টেবিল পাতা। তারই একপাশে চার-পাঁচজন অল্পবয়সী লেকচারার জড় হয়ে একটা বই থেকে কিছু দেখছিল আর বেশ একটা তেঁতুলের চাটনি খাওয়ার মতো মুখ করে কিছু আলোচনা করছিল। রুচি ঘরে ঢোকামাত্র আলোচনাটা থেমে গেল। যেন কিছুই হয়নি এরকম একটা মুখ করে সবাই নিজের নিজের জায়গায় গিয়ে বসে পড়ল। ব্যাপারটা দেখে রুচি বেশ অবাক হল। আলোচনাটা কি তাহলে তাকে নিয়ে হচ্ছিল ? কিন্তু তাকে নিয়ে আলোচনার কিই-বা থাকতে পারে ? রুচিকে দেখে শুভ্রা খুব তাড়াতাড়ি বইটা নিজের ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়েছিল। বই নয়, আসলে একটা পত্রিকা। ওই তাড়াহুড়োর মধ্যেও নামটা চোখে পড়েছে রুচির। তার কীরকম যেন একটা সন্দেহ হল। তাই বাড়ি ফেরার পথে রাস্তা থেকে একটা কপি কিনে নিয়ে গাড়িতে বসে পাতা উল্টেই চমকে উঠল। প্রায় দুপাতা জুড়ে অভিনেত্রী অপরূপা স্যান্যালের সঙ্গে প্রডিউসার এবং প্রখ্যাত ব্যবসায়ী অমিত বোসের কেচ্ছার খবর। শুধু লেখা নয় কাগজের সম্পাদক দুজনের কিছু ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবিও ছেপেছেন। অপরূপা যে অমিত বোসের শয্যাসঙ্গিনী হয়েই নায়িকার ভূমিকায় অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছেন বেশ স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েই সেকথা বুঝিয়ে দিয়েছেন রিপোর্টার। রাগে অপমানে গা-হাত-পা কাঁপছিল রুচির। সে বুঝতে পারছিল আর সহ্য করা ঠিক হবে না। এবার অমিতের মুখোমুখি হতেই হবে তাকে।

শনিবার রাতে একটু বেশিই খাওয়া হয়ে গেছিল। তাই রবিবার সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়েছিল অমিতের। বাথরুমে গিয়ে একেবারে স্নান সেরে যখন ঘরে এল, তখন রুচিরা চা-এর ট্রে নিয়ে তারজন্য অপেক্ষা করছে। ঘরের দরজা বন্ধ।

আজ এখানে বসেই চা খাও। তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।

স্ত্রীর মুখের দিকে একবার তাকিয়ে ধীরে-সুস্থে চুল আঁচড়াল অমিত। তারপর সোফায় এসে বসল। রুচি তার দিকে পত্রিকাটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, এসব কী?

অমিত নিশ্চিত পত্রিকাটা আগেই দেখেছিল। তাই পাতা পর্যন্ত না উল্টে বলল,

তুমি আবার এইসব ট্র্যাশ জিনিসপত্র কবে দেখতে শুরু করলে! কথা এড়িও না অমিত। এখানে কী লেখা হয়েছে তুমি নিশ্চয় জানো?

তা জানি অবশ্য।

তাহলে এব্যাপারে তুমি কী বলতে চাও?

বলাবলির তো কিছু নেই রুচি। কথাগুলো খুব মিথ্যে কিছু নয়। অপরূপার ট্যালেন্ট আছে। আমি ওকে ব্যাক করছি। এরমধ্যে লুকো-ছাপা কিছু নেই। অপরূপাকে আমি ভালোবাসি।

ভালোবাসো! কুড়ি বছরেরও বেশি বিয়ে হয়ে গেছে আমাদের। সন্তান আছে। তারপরে তুমি তোমার স্ত্রীর সামনে দাঁড়িয়ে বলছ যে অন্য একটি মেয়েকে তুমি ভালোবাসো!

তোমার সঙ্গে তো আমার ভালোবাসার সম্পর্ক কোনওদিনই ছিল না রুচি। কোনও সম্পর্কই আসলে অনেকবছর নেই। সমাজের চোখে আমরা স্বামী-স্ত্রী। তাই একবাড়িতে থাকি। কিন্তু আমরা আলাদা ঘরে শুই। শরীরের সম্পর্ক নেই বহুবছর। সত্যি কথা বলতে কী কোনওদিনই ঠিকমত ছিল কিনা আমি জানি না। তোমার দিক থেকে কখনও এতটুকু আগ্রহ ছিল না। হ্যাঁ, আপত্তিও ছিল না। আমি ইচ্ছে প্রকাশ করলে তুমি সাড়া দিতে এই পর্যন্তই।  এটা কেন হয়েছিল তাও আমি জানি না। তোমার কাছে কোনওদিন জানতেও চাইনি। মউ হওয়ার পর তোমার আগ্রহ আরও কমে গেছে। আমিও আস্তে আস্তে সরে এসেছি। তাবলে ওই বয়সেই আমার শরীরের চাহিদা যে মরে গেছিল তা তো নয়। সেটা কীভাবে পূরণ হয়েছে সেই আলোচনা তোমার সঙ্গে আজ আমি করব না। কিন্তু আমি তোমাকে খোলাখুলিই বলছি, আমার প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়স। এখনও আমার শরীর সুস্থ আছে, আমি সক্ষম। বাকি জীবনটা আমি আমার মত করে বাঁচতে চাই। আমি অপরূপাকে বিয়ে করব ঠিক করেছি। কথাগুলো আমি নিজেই তোমাকে বলব ভেবেছিলাম। তুমি এগিয়ে এলে বলে সুবিধা হল।

অমিতের কথা শুনতে শুনতে রুচির মনে হচ্ছিল তার পায়ের জোর কমে আসছে। সে কোনওরকমে সোফার হাতলটা ধরে তাতে বসে পড়ে। অমিত সেটা খেয়াল করলেও কোনও গুরুত্ব দেয় না। তার কথা তখনও শেষ হয়নি।

আর একটা কথা রুচি, তুমি তো জানো বিজনেসম্যান হিসাবে আমি খুবই সফল। এই মুহূর্তে কলকাতা শহরে যারা বড় ব্যবসায়ী তাদের মধ্যে প্রথম দু-তিনজনের মধ্যেই আমার নাম আছে। আমার এখন যা স্ট্যাটাস তাতে যে কোনও সোশ্যাল গ্যাদারিংয়ে তোমাকে নিয়ে আমার অসুবিধা হয়। তুমি তো নিজেকে বদলাবে না। তোমার ওই ঢাকাই শাড়ি, চশমা সবমিলিয়ে এমন একটা মাস্টারনীর লুক আছে যেটা আমার পাশে মানায় না। অমিত বোসের বউকে হতে হবে গ্ল্যামারাস্, সেলিব্রিটি। কোথাও গেলে সবাই ঘুরে তাকাবে। তুমি বড্ড বেশি সাধারণ।

এই কথাগুলো তোমার এতদিন বাদে মনে হল।

মনে অনেকদিন ধরেই হচ্ছে। বলতে দেরি হল। অনেকবছরের একটা অভ্যাসের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা তো কঠিন। তবে আমি মনে করি না এমন কিছু দেরি হয়ে গেছে বলে। এখনও সময় আছে। অপরূপা রাজি আছে। আমরা আর দেরি করতে চাইছি না।

রুচির মনে হচ্ছিল এতদিনের চেনা মানুষটাকে সে চিনতে পারছে না। অপমানে তার সমস্ত শরীর জ্বালা করছে। তবু প্রাণপণে নিজেকে সংযত করে বলে, আর তোমার মেয়ে? মউয়ের কথা একবার ভেবে দেখেছো?

আমি মউকে সব জানিয়েছি। ওর কোনও আপত্তি নেই। মউ খোলাখুলিই বলেছে যে সবার নিজের মত বাঁচার অধিকার আছে বাবি। তাই তুমি যেরকম চাইছো তাই করো। তবে মা যাতে কোনও অসুবিধার মধ্যে না পড়ে সেটা দেখো। সেটা আমি নিজেও ভেবে রেখেছি। তুমি যদিও চাকরি করো, তাও খরপোষ চাইলে আমার দিতে আপত্তি নেই। কিংবা যদি একটা মোটা টাকা একবারে নিয়ে নিলে সুবিধা হয়, তাও নিতে পারো। তোমার নিজের গয়নাগাটিও তুমি নিয়ে যেতে পারো। মউ দেশে ফিরলে সে যদি তার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে চায়, তাহলেও আমার আপত্তি হবে না।

অমিতের কথার মাঝখানেই নিঃশব্দে উঠে নিজের ঘরে চলে আসে রুচি। তার মাথায় তখন একটা কথাই শুধু ঘুরছে, এই বাড়ি ছেড়ে কোথায় যাবে সে? একুশ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে এই ৭ নম্বর বালিগঞ্জ প্লেসের বাড়িতে এসেছিল। এখন তার বয়স চুয়াল্লিশ। তেইশ বছর ধরে এই বাড়িই তার ঠিকানা। এরাই তার সবথেকে কাছের মানুষ। মা-বাবা মারা গেছেন বেশ কয়েকবছর হয়ে গেল। ফড়িয়াপুকুরের শরিকি বাড়ি বিক্রি হয়ে গেছে। এই অবস্থায় কোথায় সে তার নতুন ঠিকানা খুঁজে পাবে ! চোখে জল ছিল না রুচির। শুধু তার বুকের ভিতরে জৈষ্ঠ্যের দুপুরের মত একটা শুকনো গরম হাওয়া যেন সবকিছু জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে খাক করে দিয়ে হুহু করে বয়ে যাচ্ছিল।


১৫

মধুমিতা অনেক বছর আগেই কলেজের চাকরি ছেড়ে দিয়ে একটা রিসার্চের কাজ নিয়ে আমেরিকা গিয়ে সেখানেই থেকে গেছে। অন্য বন্ধু-বান্ধবের কারও সঙ্গে তেমনভাবে যোগাযোগ নেই। দরকারও হয়নি কোনওদিন। কিন্তু থাকার একটা জায়গা তো সে নিজে খুঁজে বার করতে পারবে না। খানিকটা বাধ্য হয়েই তাই পরেরদিন কলেজে গিয়ে সহকর্মীদের কথাটা জানিয়েছিল রুচি। সবকিছু ভেঙে বলেনি ঠিকই। কিন্তু সে যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসবে, সেজন্য আপাতত একটা বাড়ি ভাড়া নেওয়া খুব দরকার সেটা বলেছিল। আশ্চর্যের ব্যাপার মেয়েরা কিন্তু এককথায় সবাই রুচির পাশে দাঁড়াল। কেউ কিছু জানতে চাইল না। বাড়তি কৌতূহলও প্রকাশ করল না। বাড়ির খোঁজ দিয়েছিল অনেকেই। শেষপর্যন্ত অয়নিকার জামাইবাবুর ফ্ল্যাটটাই পছন্দ হল রুচির। কলেজ থেকে বেশ খানিকটা দূর হবে ঠিকই। কিন্তু সরাসরি বাস আছে। আর জায়গাটা ভালো। এখনও বেশ ফাঁকা ফাঁকা। ফ্ল্যাটটা ফার্নিশড। সেটাও তার পক্ষে একটা খুব সুবিধার ব্যাপার। টাকা-পয়সা ফাইনাল হয়ে যাওয়ার পর, অমিতের সঙ্গে তার কথা হওয়ার ঠিক তিন সপ্তাহের মাথায়, মাসের শুরুতে নিজের ফ্ল্যাটে চলে এল রুচি। অমিতকে সে জানিয়ে দিয়েছে খরপোষ কিংবা টাকা কোনওটারই তার প্রয়োজন নেই। বালিগঞ্জের বাড়ি থেকে নিজের জরুরি কাগজপত্র, জামা-কাপড়, দু-একটা শৌখিন জিনিস আর বাবা তাকে বিয়ের সময় যে গয়নাগুলো দিয়েছিলেন সেগুলো নিয়ে এসেছে। ওবাড়ি থেকে উপহার হিসাবে যেসব অলঙ্কার পেয়েছিল কিংবা পরে বিভিন্ন সময় অমিত যা দিয়েছে সব গুছিয়ে একেবারে তালিকা করে দিয়ে এসেছে অমিতকে।

এগুলো তো তোমারই গয়না। নিয়ে যেতে পারতে।

দরকার নেই। ইচ্ছে করলে মউয়ের জন্য রাখতে পারো। আর মিউচুয়াল ডিভোর্সের জন্য কী করতে হবে জানিও। আমি করে দেব।

রুচি যে এত সহজে ঘাড় থেকে নেমে যাবে সম্ভবত ভাবেনি অমিত। তাই সামান্য অপ্রস্তুত ভাবে বলেছিল, এত তাড়াহুড়ো করলে…তোমার কি থাকার জায়গা ঠিক হয়েছে? নাহলে আরও কিছুদিন থাকতে পারো। আমার অসুবিধা নেই।

যে বাড়িতে এতদিন নিজের অধিকারে থেকেছে সেখানে কারও দয়ায় যে একদিনও থাকা রুচির পক্ষে সম্ভব নয়, সেটা বোঝার ক্ষমতা অমিতের নেই। রুচি তাই শান্তভাবেই বলেছিল,

থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। তোমার ও নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই।

নতুন ফ্ল্যাটে আসার পর প্রথম কয়েকদিন সবকিছু গুছিয়ে নেওয়ার একটা ব্যস্ততা ছিল। বাসে-ট্রামে যাতায়াত করার অভ্যাস বহুদিন চলে গেছে। তাই প্রথমটায় বেশ অসুবিধাই হচ্ছিল। তাও একটা রক্ষে যে রুচির বাড়ির কাছেই টার্মিনাস। যাওয়াটা অন্তত বসে হয়। কিন্তু ফেরার সময় ভিড় বাসে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া উপায় থাকে না। ফলে বাড়ি ফিরে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ত সে। মানসিক একটা অবসাদ, যন্ত্রণা তো আছেই। তার সঙ্গে শরীরটাও যেন ছেড়ে দিত। এরসঙ্গে যতদিন না পারুলকে পাওয়া গেল, ততদিন বাড়ি ফিরে ভাতে-ভাত অন্তত বসাতেই হত। শুরুর কয়েকটা মাস এভাবেই গেছিল। তারপর ধীরে ধীরে শরীর অভ্যস্ত হল। ঘরের কাজের চাপ কমল। আর ক্রমশ রুচি অনুভব করতে লাগল নিজের জীবনকে অসম্ভব অর্থহীন মনে হওয়ার একটা বোধ তার ওপর চেপে বসছে। বিহান তাকে বলেছিল অপদার্থ। আর অমিত তো তাকে রীতিমত তাচ্ছিল্য করেছে। তাহলে কি সত্যিই তার কোনওরকম কোনও যোগ্যতা নেই? তাহলে এই পৃথিবীতে সে বেঁচে আছে কেন? ঘুমের ওষুধ খেয়েও রাতে আজকাল ঘুম আসে না তার। ফাঁকা ঘরে সাদা সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে ক্রমাগত মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায় এইসব চিন্তা। রুচি বুঝতে পারছিল এভাবে চললে সে ক্রমশ মানসিক অবসাদের শিকার হয়ে পড়বে। সেরকম হলে ভীষণ বিপদ। কারণ মৃত্যু কবে আসবে কেউ জানে না। যতদিন বাঁচবে তাকে তো একাই বাঁচতে হবে।

অন্ধকারে পথ হাতড়াতে হাতড়াতে রুচি একদিন কলেজ থেকে ফেরার সময় এন্টালিতে বাস থেকে নেমে পড়ল। পঁচিশ বছর কেটে গেছে। রাস্তা-ঘাট সবই বদলে গেছে অনেক। তবে চার্চটা আছে। মন্দিরের পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় বিকেলের আজানের সুর কানে এল। আরও একটু এগিয়ে ডানহাতে একতলা বাড়িটা। একটু অবাক হয়ে রুচি দেখল বাড়িটা একইরকম আছে। তবে তখন বোধহয় সাদা রং ছিল। এখন হলুদ আর ছাই রঙে মেশানো। পুরোনো হয়েছে। তবে যত্নে আছে বোঝা যায়। সামনের ছোট গেটটার পরে দুধাপ সিঁড়ি। তারপর দরজা। পাল্লাদুটো অল্প ফাঁক হয়ে আছে। রুচি হাতের চাপ দিতেই খুলে গেল। ঠিক আগের মতই ফাঁকা ঘর। একদিকের দেওয়াল ঘেঁষে গোটা তিনেক কাচের আলমারি। জানলার পাশে একটা টেবিল। সেখানে চেয়ার বসে পাকা চুলের একজন ভদ্রলোক কিছু একটা লিখছেন। জানলা দিয়ে বিকেলের আলো এসে পড়েছে তার মুখের একপাশে। রুচি ঘরের ভিতর এক পা এগোতেই ভদ্রলোক মুখ তুলে তাকালেন। রাধারমণদা তপাদার।

কে?

উত্তর না দিয়ে আর এক পা এগোল রুচি। ভদ্রলোক উঠে এসেছেন চেয়ার ছেড়ে। একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন তার দিকে। ধীরে ধীরে তাঁর চোখের বিরক্তি ক্রমশ বিস্ময় তারপর খুশিতে ভরে গেল।

রুচিরা….আয় আয়…..কেমন আছিস?

রুচিরা নীচু হয়ে প্রণাম করে রাধাদাকে। তারপর শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলে, আমি নাটক করতে এসেছি রাধাদা। এবার আর কারও ইচ্ছেয় চলে যাব না।

রুচির দুকাঁধের ওপর হাত দিয়ে একটু সময় তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকেন রাধাদা। তারপর মৃদু হেসে বলেন, বেশ। তাহলে আলমারি থেকে সতরঞ্চিগুলো বার করে পাততে শুরু কর। ছেলে-মেয়েগুলো এসে গেলেই মহড়া শুরু হবে।


১৬

রাষ্ট্রপতির হাত থেকে পুরস্কার নিয়ে হোটেলে ফিরতে একটু দেরিই হল। ডিনার ছিল। সেখানে সারা দেশ থেকে পরিচালক, অভিনেতা-অভিনেত্রীরা এসেছিলেন। অনেকের সঙ্গে আলাপ হল। মুম্বইয়ের দুজন পরিচালক নিজে এসে রুচির সঙ্গে আলাপ করে ফোন নম্বর নিয়ে যোগযোগ করবেন বলে জানিয়েছেন। অতনু সরকারের মেঘলা দিনের আলো ছবির জন্য সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছে রুচিরা। অতনু সরকার নিজে তো ছিলেনই। বাংলার অন্যান্য পরিচালকরাও অনেকে ছিলেন। অতনু নিজে তো বটেই অন্যরাও রুচির কাজের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। সাংবাদিকরাও অনেকে ছিলেন। ছবি উঠেছে, ইন্টারভিউও নিয়েছে অনেকে। মেঘলা দিনের আলো ছবিতে রুচির চরিত্রটা ছিল একজন বিগতযৌবনা যৌনকর্মীর। একসময় সে নিজেই শরীর বেচেছে। কিন্তু এখন তার লড়াই নাবালিকা মেয়েদের এই পেশায় নিয়ে আসার বিরুদ্ধে। সবাই বারেবারেই বলছিল চরিত্রটার মধ্যে অনেকগুলো শেড আছে। আর রুচি ভীষণ নীচু তারের অভিনয় করেও সবকটা দিকই দারুণভাবে ফুটিয়েছে। সাংবাদিকরাও সবাই তাকে এবিষয়েই প্রশ্ন করেছে। শুধু যখন সে বেরিয়ে গাড়িতে উঠতে যাচ্ছে, তখন একটি মেয়ে দৌড়ে এসে বলল, ম্যাম আমি নারীচিন্তা পত্রিকা থেকে আসছি। অন্য কাজে একটু আটকে গেছিলাম বলে দেরি হল। খুব স্যরি। আসলে আমার একটা আপনার ইন্টারভিউ লাগবে…..

ক্লান্ত হয়ে গেছিল রুচি। তাই একটু বিরক্ত হয়েই বলল, আর তো হবে না। আমি হোটেলে ফিরছি। রাতে আমাকে কয়েকটা ওষুধ খেতে হয়। তুমি বরং অন্যদের কাছ থেকে আমি কী বলেছি জেনে নাও।

আমি কথা বলেছি ম্যাডাম। কিন্তু আমার যেটা প্রশ্ন সেটা ওরা কেউ করেনি্। আমি কি কাল সকালে একবার আপনার হোটেলে যেতে পারি?

পরের দিনটা আছে রুচি। অতনু নিজে সন্ধেবেলায় একটা ছোট পার্টি দেবেন। সেখানে থাকতে হবে। সকালে কোনও কাজ নেই। তাই খানিকটা দায়সারা ভাবেই বলল, ঠিক আছে সকালের দিকে এসো। কিন্তু তোমার প্রশ্নটা কী শুনি?

ম্যাডাম আপনি সারা জীবনে কোনওদিন অভিনয় করেননি। কলেজে পড়িয়েছেন। এত বয়সে অভিনয় করতে এলেন এবং তারপর এরকম একটা পারফরমেন্স। এর পিছনের চালিকাশক্তিটা কী?

মেয়েটা চলে গেল। রুচিও গাড়িতে উঠে পড়ল। কিন্তু তার সারাক্ষণ মনে হচ্ছিল মেয়েটা যেন এক ধাক্কায় তাকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। হোটেলে ফিরে, জামা-কাপড় বদলে বিছানায় শুয়েও যেন ঘোর কাটছে না। সারাক্ষণ মাথার মধ্যে ঘুরছে কথাগুলো। সত্যিই তো কী তার চালিকা-শক্তি। কেন সে এই বয়সেও এরকম একটা অভিনয় করতে পারল। প্রথমে আগুনের দেওয়াল, তারপর টেবিলের ওপাশে। রাধাদার সঙ্গে তিন নম্বর নাটক ছিল পারিজাতের পাপড়ি। সেই নাটক দেখতে এসেই অতনু সরকার কথা বলেন তার সঙ্গে। রাধাদা খুশি হয়েছিলেন। মেঘলা দিনের আলোর পরে আরও দুটো ছবিতে অভিনয় করেছে সে। সেগুলো এখনও রিলিজ করেনি। কিন্তু রুচি নিজে জানে তার আসল জায়গা হল নাটক। নাটকই তার প্রাণ। কিন্তু এটা তো সত্যি যে সেই রক্তকরবীর পরে এতবছরে সে আর নাটক করেনি। তাহলে কী করে পারল! দু-দুজন মানুষের কাছ থেকে তীব্রভাবে অপমানিত হওয়াই কী এর কারণ? এমন মানুষ যাদের সে একান্ত নিকটজন ভেবেছিল। কিন্তু তাহলে তো তার মধ্যে একটা প্রতিশোধের স্পৃহা থাকবে। অপরূপার ছবিটা ফ্লপ করেছে। তারপরে আর কোনও নায়িকার রোলও পায়নি। সিনেমা পাড়ায় সে এখন বাতিলের খাতায়। কিন্তু শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পাওয়ার পর তার তো একবারও মনে হয়নি যে অমিত বোসের অপমানের ঠিকঠাক জবাব দেওয়া হল কিংবা বিহান সেনকে এতদিনে বোঝানো গেছে সে অভিনয় করতে পারে কিনা। সত্যি কথা বলতে কি এদের কারও কথা মনেই পড়েনি তার। আজ মেয়েটি বলাতে এসব মাথার মধ্যে আসছে। কিন্তু যেটা ইচ্ছে হয়েছিল সেটা হচ্ছে ছুটে গিয়ে রাধাদাকে প্রণাম করার।

ধীরে ধীরে বিছানায় উঠে বসে রুচি। মেয়েটির প্রশ্নের উত্তর সে খুঁজে পেয়েছে। বিহান কিংবা অমিত নয়। তাদের প্রেম কিংবা অপমানও নয়। তার আসল চালিকা শক্তি হল নাটকের প্রতি ভালোবাসা, অভিনয়কে ভালোবাসা। আর এর পিছনে আছেন একটিমাত্র মানুষ, রাধারমণ তপাদার। একজন আদ্যন্ত সৎ, নাটকের প্রতি দায়বদ্ধ মানুষ যিনি সেই আঠারো বছর বয়সে রুচিকে বলেছিলেন সে নাটকের ভিতরে ঢুকতে জানে, তার অভিনয় হবে। রুচির ভিতরে নাটকের প্রতি ভালোবাসার আগুন তিনি জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। সতর্কও করেছিলেন। দীর্ঘসময় সেই আগুন ছাইচাপা ছিল। কিন্তু আগুনকে তো চিরদিন চাপা দিয়ে রাখা যায় না। সে জ্বলে উঠবেই। তার শিখা আলো ছড়াবেই। রুচি শেষ পর্যন্ত পেরেছ ছাই সরিয়ে নিজের ভিতরের সেই আগুনকে জ্বালিয়ে নিতে। এবার আর ভয় নেই। হাতের মশালই তাকে আগামীর পথ দেখাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *