prabandho-war-biswa-sahityo

যুদ্ধ কী বিশ্বসাহিত্যের উপর প্রভাবশালী হয়?

সুমেধা চট্টোপাধ্যায়


“রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়” আমার ঠাকুমার মুখে এই প্রবাদ ছোটবেলা থেকে অগুনিত ও অসংখ্য বার শুনেছিলাম। ওঁর মুখেই আমার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গল্প শোনা, স্বাধীনতার গল্প শোনা এবং দেশ-ভাগের বিষয়ে জানা। বলতেন, “জানিস তো দেশে-দেশে যুদ্ধ বাঁধলে তার প্রভাব যেমন দৈনন্দিন জীবনে আর জিনিসপত্রের দাম বাড়া ইত্যাদির উপর পড়ে, তেমনই প্রভাব পড়ে কবি-সাহিত্যিকদের লেখার উপর।” ছোট ছিলাম, তখন কিছু বুঝিনি। 

প্রথম বুঝলাম অভয়ার ঘটনার পর। নিজের চিন্তাভাবনা বা লেখার ওপরেও দেখলাম আস্তে আস্তে চারপাশের প্রতিবাদ, দ্রোহ ইত্যাদির পরিষ্কার ছাপ পড়তে লাগল। সেই প্রভাব আরও প্রকট হল খুব সাম্প্রতিককালে ইরান – আমেরিকা যুদ্ধের কালে। সাহিত্যে প্রভাব তো অবশ্যম্ভাবী কারণ সাহিত্য সৃষ্টি করছে মানুষের মস্তিষ্ক এবং বিজ্ঞান বলছে জীবজগতের মধ্যে শিল্পকর্মে মানুষের ইমোশানাল কোশেন্ট সবচেয়ে বেশি। গবেষণাপত্রের বিস্তারিত আলোচনা থেকে জানা যাচ্ছে, নিজের কাছের মানুষ যুদ্ধে গেলে বা নিকটাত্মীয় কেউ যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হলে মানুষের মস্তিষ্কের খুব গুরুত্বপূর্ণ কোষমণ্ডলীতে বিশেষ রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয়, যা তার সমস্ত কার্যকারিতা বেশ খানিকটা সময়ের জন্য নির্ধারণ করে। তাই তার ভাবনাচিন্তা এবং তদোপরি সৃষ্টির মধ্যেও পারিপার্শ্বিক সমাজ ও ঘটনার প্রভাব পড়তে বাধ্য। 

বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে বিশ্বসাহিত্য এক গভীর ও বহুমাত্রিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। এই রূপান্তর কেবল বিষয়বস্তুর স্তরেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ভাষা, শৈলী, চরিত্র নির্মাণ, এমনকি পাঠকের সঙ্গে লেখকের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন মাত্রা সৃষ্টি করছে। বিশ্বায়নের বিস্তার, প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি, যুদ্ধ ও সংঘাত, অভিবাসনের ঢেউ, অর্থনৈতিক বৈষম্যের বৃদ্ধি—এই সমস্ত উপাদান মিলিতভাবে সাহিত্যকে একটি নতুন দিগন্তের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তা আদতে ভালো নাকি খারাপ সেই বিতর্ক অনর্থক। কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবের বিষয়টি মাথায় রাখা আবশ্যক। 

প্রথমত, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাত বিশ্বসাহিত্যের একটি প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর সংকট সাহিত্যিকদের গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। এই প্রেক্ষাপটে উপন্যাস, কবিতা ও নাটকে যুদ্ধের বিভীষিকা, মানবিক সংকট, বাস্তুচ্যুতি এবং মানসিক আঘাতের চিত্র স্পষ্টভাবে উঠে আসছে। লেখকরা কেবল ঘটনাবলির বর্ণনা দিচ্ছেন না, বরং এই ঘটনাগুলির অন্তর্নিহিত মানসিক ও সামাজিক অভিঘাতকে বিশ্লেষণ করছেন। ফলে সাহিত্য হয়ে উঠছে এক ধরনের নৈতিক সাক্ষ্য, যা ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতাকে সংরক্ষণ করে।

এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল পরিচয়ের প্রশ্ন। জাতীয়তা, ভাষা, ধর্ম, লিঙ্গ—এই সমস্ত পরিচয়ের ভিত্তিতে যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হচ্ছে, তা সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। আধুনিক সাহিত্য ক্রমশ ব্যক্তির বহুমাত্রিক পরিচয়কে তুলে ধরছে, যেখানে একটি চরিত্র একাধিক সাংস্কৃতিক ও সামাজিক স্তরের প্রতিনিধিত্ব করে। এর ফলে সাহিত্যিক বয়ান হয়ে উঠছে আরও জটিল, বহুস্বরিক এবং অন্তর্মুখী।

অর্থনৈতিক টানাপোড়েনও সাহিত্যকে সমানভাবে প্রভাবিত করছে। বিশ্বব্যাপী ধনী-গরিবের ব্যবধান বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, নগরায়নের চাপ এবং ভোক্তাবাদের বিস্তার—এই সমস্ত বিষয় সাহিত্যিকদের চিন্তার কেন্দ্রে চলে এসেছে। আধুনিক উপন্যাসে আমরা দেখতে পাই মধ্যবিত্তের সংকট, শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, এবং পুঁজিবাদী কাঠামোর সমালোচনা। অর্থনৈতিক বাস্তবতার এই প্রতিফলন সাহিত্যকে আরও বাস্তবমুখী ও সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ করে তুলছে।

বিশেষ করে অর্থনৈতিক বৈষম্য সাহিত্যকে একটি প্রতিবাদের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। অনেক লেখক তাঁদের রচনার মাধ্যমে ক্ষমতার কাঠামোকে প্রশ্ন করছেন এবং শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরছেন। এই প্রবণতা সাহিত্যকে কেবল বিনোদনের মাধ্যম থেকে বের করে এনে সামাজিক পরিবর্তনের একটি হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে। ফলে সাহিত্যিকরা এক ধরনের নৈতিক দায়িত্ব অনুভব করছেন, যা তাঁদের সৃষ্টিকে আরও গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলছে।

প্রযুক্তির প্রভাবও এখানে অনস্বীকার্য। ডিজিটাল মাধ্যমের বিস্তার সাহিত্যকে নতুন প্ল্যাটফর্ম দিয়েছে, যেখানে লেখকরা দ্রুত এবং সহজে তাঁদের ভাবনা প্রকাশ করতে পারছেন। ব্লগ, ই-বুক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—এই সবকিছু সাহিত্যকে গণতান্ত্রিক করেছে, যেখানে প্রথাগত প্রকাশনার সীমাবদ্ধতা অনেকাংশে কমে গেছে। তবে এর সঙ্গে সঙ্গে একটি নতুন চ্যালেঞ্জও এসেছে—গভীরতার অভাব এবং দ্রুত ভোগের প্রবণতা। ফলে সাহিত্যিকদের সামনে একটি দ্বৈত দায়িত্ব তৈরি হয়েছে—একদিকে পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করা, অন্যদিকে রচনার মান বজায় রাখা।

অভিবাসন এবং বাস্তুচ্যুতির বিষয়টি বর্তমান সাহিত্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ থিম হিসেবে উঠে এসেছে। যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক কারণে মানুষ যখন নিজেদের দেশ ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিচ্ছে, তখন তাদের অভিজ্ঞতা সাহিত্যিকদের জন্য এক নতুন উপাদান হয়ে উঠছে। এই ধরনের রচনায় আমরা দেখতে পাই বিচ্ছিন্নতার বেদনা, নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার সংগ্রাম, এবং পরিচয়ের সংকট। এই অভিজ্ঞতাগুলি সাহিত্যকে আরও মানবিক এবং বৈশ্বিক করে তুলছে।

এছাড়া, ভাষার ব্যবহারেও একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির সংমিশ্রণে একটি নতুন সাহিত্যিক ভাষা গড়ে উঠছে, যা একদিকে স্থানীয়তার গন্ধ বহন করে, অন্যদিকে বৈশ্বিক পাঠকের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। এই বহুভাষিকতা সাহিত্যকে আরও সমৃদ্ধ ও বহুমাত্রিক করে তুলছে। বর্তমান সময়ে সাহিত্যিকদের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হল সত্য এবং মিথ্যার সীমারেখা নির্ধারণ করা। তথ্যের অতিবাহুল্য এবং বিভ্রান্তিকর প্রচারের যুগে সাহিত্য একটি নির্ভরযোগ্য বয়ান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়। ফলে অনেক লেখক তাঁদের রচনায় তথ্যনির্ভরতা এবং গবেষণার উপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। এর ফলে সাহিত্য ও ইতিহাসের মধ্যে একটি নতুন সম্পর্ক গড়ে উঠছে।

অন্যদিকে, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা লেখকদের জীবনকেও প্রভাবিত করছে। অনেক লেখক তাঁদের জীবিকা নির্বাহের জন্য অন্য পেশার উপর নির্ভরশীল, যা তাঁদের সৃষ্টিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে। তবুও এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তাঁরা নতুন নতুন উপায়ে নিজেদের প্রকাশ করছেন, যা সাহিত্যকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলছে। বিশ্বসাহিত্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে যে পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে, তা সাহিত্যিকদের উদ্বিগ্ন করছে। ফলে “ইকো-লিটারেচার” বা পরিবেশকেন্দ্রিক সাহিত্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারায় পরিণত হয়েছে। এই ধরনের রচনায় মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক, পরিবেশের সংকট এবং ভবিষ্যতের আশঙ্কা তুলে ধরা হচ্ছে।

নারী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং লিঙ্গ-পরিচয়ের প্রশ্নও বর্তমান সাহিত্যে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এই গোষ্ঠীগুলিকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে, এবং তাঁদের অভিজ্ঞতা সাহিত্যকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। ফলে সাহিত্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে উঠছে, যেখানে বিভিন্ন কণ্ঠস্বর সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। এই সমস্ত পরিবর্তনের ফলে সাহিত্যিক আঙ্গিকেও নতুনত্ব এসেছে। প্রচলিত বর্ণনার পাশাপাশি পরীক্ষামূলক রচনা, খণ্ডিত বয়ান, এবং বহুস্বরিক আখ্যানের ব্যবহার বেড়েছে। লেখকরা নতুন নতুন উপায়ে গল্প বলার চেষ্টা করছেন, যা পাঠকদের জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করছে।

কয়েকটি বই বা সৃষ্টির আলোচনা এখানে আবশ্যক। আমি কলেজে পড়ি। তখন গোলপার্কের ফুটপাত থেকে কিনে পড়েছিলাম ‘’The Kite Runner”। এই উপন্যাসে আফগানিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতা ব্যক্তিগত জীবনের ট্র্যাজেডির সঙ্গে মিশে গেছে। একইভাবে “Half of a Yellow Sun” নাইজেরিয়ার গৃহযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত, যেখানে যুদ্ধের সামাজিক ও মানসিক অভিঘাত গভীরভাবে চিত্রিত হয়েছে। এই ধরনের রচনাগুলি প্রমাণ করে যে সাহিত্য কেবল ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নয়, বরং তার অন্তর্নিহিত মানবিক সত্যের অনুসন্ধান এবং পারিপার্শ্বিক প্রেক্ষাপটের এক জীবন্ত দলিল। 

অর্থনৈতিক টানাপোড়েনও সাহিত্যকে সমানভাবে প্রভাবিত করছে। Capital in the Twenty-First Century যদিও একটি অর্থনৈতিক গ্রন্থ, তবুও এর প্রভাব সাহিত্যিক চিন্তায়ও পড়েছে। পুঁজিবাদী কাঠামোর বৈষম্য নিয়ে যে আলোচনা এখানে উঠে এসেছে, তা বহু উপন্যাস ও প্রবন্ধে প্রতিফলিত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে The White Tiger-এ ভারতীয় সমাজের শ্রেণিবৈষম্য এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে।

বিশেষ করে অর্থনৈতিক বৈষম্য সাহিত্যকে একটি প্রতিবাদের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। Nickel and Dimed-এ নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে, যা আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজের একটি তীব্র সমালোচনা। এই ধরনের রচনাগুলি সাহিত্যকে সামাজিক পরিবর্তনের একটি হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। “It actually reveals the dark side of American prosperity.” যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই সামাজিক বৈষম্যের লেখাও চিন্তাশীল মানুষের কলমে উঠে আসে। 

অভিবাসন এবং বাস্তুচ্যুতির বিষয়টি বর্তমান সাহিত্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। The Refugees গ্রন্থে শরণার্থী জীবনের নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে—যেখানে স্মৃতি, পরিচয় এবং নতুন জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সংগ্রাম একসঙ্গে মিশে গেছে।

যদ্ধের ফলে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও সাহিত্যকে নতুনভাবে প্রভাবিত করছে। The Overstory উপন্যাসটি প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ককে নতুনভাবে ভাবতে শেখায় এবং পরিবেশগত সংকটের গভীরতা তুলে ধরে। একইভাবে Flight Behavior-এ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব একটি ব্যক্তিগত ও সামাজিক গল্পের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।

নারী ও প্রান্তিক কণ্ঠস্বরের উত্থানও বর্তমান সাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। Girl, Woman, Other-এ বিভিন্ন নারী চরিত্রের জীবনের মাধ্যমে সমাজের বহুমাত্রিক বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। আবার Persepolis-তে ইরানের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এক কিশোরীর অভিজ্ঞতা ফুটে উঠেছে।

এই সমস্ত পরিবর্তনের ফলে সাহিত্যিক আঙ্গিকেও নতুনত্ব এসেছে। খণ্ডিত বয়ান, বহুস্বরিক আখ্যান, এবং পরীক্ষামূলক রচনার ব্যবহার বেড়েছে। Cloud Atlas-এ একাধিক সময় ও স্থানের গল্প একসূত্রে গাঁথা হয়েছে, যা আধুনিক বিশ্বের জটিলতা প্রতিফলিত করে।

সবশেষে বলা যায়, বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েন বিশ্বসাহিত্যকে এক গভীর রূপান্তরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সাহিত্য আজ কেবল কল্পনার জগৎ নয়, বরং বাস্তবতার এক গভীর প্রতিফলন। এটি ইতিহাসের সাক্ষী, সমাজের সমালোচক এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনার এক দিকনির্দেশক।

বাংলাসাহিত্যও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সাহিত্যে বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন রূপে ধরা দিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আনোয়ার পাশার ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ (যুদ্ধ চলাকালীন লেখা প্রথম উপন্যাস), জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’ (ডায়েরিভিত্তিক স্মৃতিকথা), এবং হুমায়ূন আহমেদের ‘আগুনের পরশমণি’। এই বইগুলো যুদ্ধের ভয়াবহতা, সাধারণ মানুষের ত্যাগ, ও বীরত্বের দলিল।

আনোয়ার পাশা’র লেখা রাইফেল রোটি আওরাত। এটি ১৯৭১ সালের এপ্রিল-জুন মাসে লেখা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম উপন্যাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের অভিজ্ঞতায় ২৫শে মার্চের কালরাত্রি ও পরবর্তী অবরুদ্ধ পরিস্থিতির চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। যুদ্ধ যে লেখকমনকে একই সঙ্গে বিধ্বস্ত ও সৃষ্টিশীল করে তার জ্বলন্ত উদাহরণ এই উপন্যাস।

একাত্তরের দিনগুলি। খুব বিখ্যাত বই। লেখক জাহানারা ইমাম। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের লেখা একটি ডায়েরিভিত্তিক বই। অবরুদ্ধ ঢাকা থেকে তিনি কীভাবে মুক্তিযুদ্ধকে দেখেছেন, তার একমাত্র ছেলের যুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং পরিবারের ত্যাগ এর মূল উপজীব্য বিষয়।

আগুনের পরশমণি। লেখক হুমায়ূন আহমেদ। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত একটি উপন্যাস, যেখানে একটি সাধারণ পরিবার কীভাবে যুদ্ধের আঁচড়ে বদলে যায় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করে, তা ফুটে উঠেছে।

বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব কবিদের কবিতাতেও ভীষণভাবে উঠে আসে। তৃণা চক্রবর্তী লিখছেন, “যুদ্ধের কোনও স্মৃতি ছিল না বলে/আমরা একে অপরের দিকে ছুড়ে দিতাম ভাঙা চাঁদের টুকরো/অন্ধকার রাতে সেসব টুকরো পড়ে থাকত ছাদে, বারান্দায়/আমাদের আলাদা আলাদা বাড়িতে সকালে ঘুম ভেঙে আমরা দেখতাম/কে যেন চুরি করে নিয়ে গেছে আমাদের গলার স্বর/আমাদের না বলা কথাগুলো একটা বোবা ঘরের ভেতর ঘুরপাক খেত” (যুদ্ধের স্মৃতি ছিল না বলে, দেশ পত্রিকা, ২রা এপ্রিল,২০২৬) 

আবার যুদ্ধ-বিধ্বস্ত মানুষের আর্তি প্রকাশ পেয়েছে অসীমকুমার বসুর লেখা “সতর্ক সাইরেন ও পিকাসো” কবিতায়। তিনি লেখলেন,

“কোনও পূর্বাভাস ছিল না

হঠাৎই বদলে গেল পারিপার্শ্বিক

সাইরেনের সতর্কবার্তা, বাতাসে বারুদের গন্ধ

কোথা থেকে যে একতরফা যুদ্ধ এসে

ছেয়ে ফেলল চারিদিক!

সবাই বিভ্রান্ত, দিশেহারা।” 

যে কবিতাগুলির উদাহরণ দিলাম, সব কয়টিতেই দেখা যাচ্ছে প্রতিফলিত হয়েছে যুদ্ধের সময়ে চেনা সমাজের ছবি। 

নানা আলোচনায়, সাহিত্য সমাবেশে এমনকি আন্তর্জাতিক নানা পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে উঠে আসছে যুদ্ধ বিধ্বস্ত মানুষের কথা, শিশুদের আর্তি এবং অনর্থক ক্ষমতা-প্রদর্শনের প্রতিবাদ।   

সবশেষে বলা যায়, বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েন বিশ্বসাহিত্যকে এক গভীর রূপান্তরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই রূপান্তর কখনও উদ্বেগজনক, কখনও আশাব্যঞ্জক, কিন্তু সবসময়ই তা সৃষ্টিশীলতার নতুন সম্ভাবনা উন্মোচন করে। সাহিত্য এই সময়ের সাক্ষী, সমালোচক এবং কখনও কখনও পথপ্রদর্শক হিসেবেও কাজ করছে।

অতএব, বিশ্বসাহিত্য আজ কেবল কল্পনার জগৎ নয়, বরং বাস্তবতার এক গভীর প্রতিফলন। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের এই যুগে সাহিত্য মানুষের অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম এবং স্বপ্নকে ধারণ করে এক নতুন মানবিক দিগন্তের সন্ধান দিচ্ছে। এই দিগন্তে রয়েছে প্রশ্ন, প্রতিবাদ, এবং সম্ভাবনার এক অনন্ত যাত্রা, যা সাহিত্যকে চিরকাল প্রাসঙ্গিক ও জীবন্ত করে রাখবে।

 

তথ্যসূত্রঃ

The Kite Runner — Khaled Hosseini
Half of a Yellow Sun — Chimamanda Ngozi Adichie
Capital in the Twenty-First Century — Thomas Piketty
The White Tiger — Aravind Adiga
Nickel and Dimed — Barbara Ehrenreich
Flight Behavior — Barbara Kingsolver
Girl, Woman, Other — Bernardine Evaristo
Persepolis — Marjane Satrapi
Cloud Atlas — David Mitchell
দেশ পত্রিকা, ২রা এপ্রিল
অন্তর্জাল ও বিভিন্ন ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একাধিক বই-আলোচনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *