লোভ
কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিবারের মতো ইলেকট্রিক অফিসের সামনে যেতেই মেজাজ বিগড়ে গেল শোভনের। আজও ঠিক সেই পাশের গুমটিটায় বসে আছে লোকটা। শোভন গিয়ে অফিসের গেটের সামনে তার বাইকটা দাঁড় করাতেই দেখল, একটা নিষ্ঠুর হাসি ফুটে উঠেছে লোকটার মুখে। আশ্চর্য! এতদিনেও স্বভাবটা পাল্টানো না লোকটার? রোজকার মতোই এক্ষুনি ও এগিয়ে আসবে, আর গম্ভীরমুখে বাইকটার হ্যাণ্ডেল ধরে বলবে, “এই যে দাদা, এইদিকে রাখুন। ঘণ্টায় কুড়ি টাকা।”
গত প্রায় দেড় বছর ধরে এখানে আসছে শোভন। যবে থেকে ইলেকট্রিক অফিসটা আগের জায়গা থেকে শিফট করে এখানে উঠে এসেছে, তখন থেকেই। প্রতি তিনমাস অন্তর বাড়ির ইলেকট্রিক বিলের টাকা এই অফিসে এসেই ওকে জমা দিতে হয়। আগে অফিসটা বাড়ির কাছেই ছিল। আর ওখানে কোনও ঝুটঝামেলাও ছিল না। চট করে যেত, পাঁচ মিনিটের মধ্যে কাউন্টারে টাকা জমা দিয়ে বাড়ি ফিরে আসত। কিন্তু এই জায়গাটা বাড়ি থেকে অনেকটা দূর, প্রায় তিন কিলোমিটার। আর সবচেয়ে অসুবিধা যেটা, সেটা হল কিছু উটকো উৎপাত।
যেমন এই লোকটা। প্রথম যেদিন এখানে শোভন এসেছিল বিলের টাকা জমা দিতে, সেদিনই ওর চোখে পড়েছিল যে, গেটের ঠিক বাইরেই একটা চায়ের গুমটি আছে। সেখানে এই লোকটা চা বানিয়ে বিক্রি করছে, সঙ্গে কেক-বিস্কুট এইসব। তখন অন্য কোনও ঝামেলাও হয়নি। অনেকটা ফাঁকা জায়গা, তার মধ্যে অফিস। দূরে দূরে আরও কিছু কারখানা বা অফিস আছে, একেবারে পাশে কিছু নেই। শোভন দিব্যি গেটের সামনে বাইক রেখে ভেতরে ঢুকে টাকা জমা দিয়ে চলে গেছে। অন্য কিছু কিছু লোক, তারাও একইভাবে অফিসের নানা কাজে এসেছিল। কেউ বিল জমা দিতে, কেউ মিটারের ব্যাপারে কথা বলতে, আবার কেউ বা কিছু কমপ্লেন করতে। সকলেই গেটের সামনে এলোমেলোভাবে বাইক বা সাইকেল রেখে ভেতরে ঢুকেছে, কাজ সেরেছে, তারপর বেরিয়ে গেছে। কোনও সমস্যাই হয়নি।
কিন্তু সমস্যা শুরু হল মাস ছয়েক বাদে। সেবার শোভন গিয়ে যথারীতি বাইকটা পার্ক করতেই এই লোকটা হঠাৎ মস্তানের ভঙ্গীতে এগিয়ে এসে বলল, “এই যে দাদা, এখানে বাইক রাখলে পার্কিং ফি লাগবে। ঘণ্টায় দশ টাকা।”
শোভন ভুরু কুঁচকে লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল, “মানে?”
“মানে আবার কী? যেটা বললাম, সেটাই মানে। এখানে বাইক রাখলে ভাড়া দিতে হবে।”
শোভন এবার ভালো করে দেখল লোকটাকে। ওর মাথা গরম হতে শুরু করেছে। বলল, “কী বলছেন? ভাড়া দিতে হবে মানে কী? এটা তো রাস্তা। আমি তো অফিস কম্পাউণ্ডের ভেতর গাড়ি রাখিনি। আর আপনি কি অফিসের লোক যে পার্কিং ফি চাইছেন?”
লোকটা এবার তেরিয়ার ভঙ্গীতে বলল, “দেখুন, অত তর্কাতর্কিতে যেতে চাই না। এখানে বাইক রাখলে ভাড়া দিতে হবে, ব্যস। নাহলে গাড়ি নিয়ে কেটে পড়ুন।”
শোভন এবার পাশের গুমটিটার দিকে তাকিয়ে দেখল। সেখানে চায়ের উনুনটা এখনও আছে, তাতে চায়ের ডেকচি চাপানো। তবে পাশের কেক-বিস্কুটের বয়ামগুলো ফাঁকা। আর বেঞ্চিতে গোটা দুই লোক বসে এদিকেই তাকিয়ে আছে।
আর কথা না বাড়িয়ে শোভন বলল, “ঠিক আছে। রাখছি। তবে রিসিট দেবেন তো?”
“মেলা বকছেন কেন দাদা? ওসব রিসিট-ফিসিট পাবেন না। রাখতে হয় রাখুন, না হলে কাটুন।”
আর কিছুই বলার নেই। মনে মনে গজরাতে গজরাতে শোভন অফিসে ঢুকল।
তবে সেদিন থেকেই ব্যাপারটা শুরু হয়ে গেল। হয়তো আরও কিছুদিন আগেই হয়েছে, শোভন সেদিনই প্রথম দেখল। আর সেখানেই শেষ নয়, ব্যাপারটা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে লাগল। পরের বার, মানে আরও মাস তিনেক বাদে গিয়ে শোভন দেখল, চায়ের দোকান বলে আর কিছু নেই, শুধু গুমটিটাই আছে। আর সেখানে বসে এই লোকটা আরও জনাতিনেক সাগরেদের সঙ্গে দাদাগিরি করে যাচ্ছে। ঠিক তার পরের বার, মানে মাস ছয়েকের মাথাতেই পার্কিং ফি-এর দশ টাকাটা কুড়ি টাকা হয়ে গেল। শোভনের হাত-পা নিশপিশ করতে লাগল, কিন্তু কিছু করতে পারল না। ইলেকট্রিক অফিসে গিয়েও সে কথাটা তুলেছিল একবার, কিন্তু ওরা বলল, দেখুন, অফিসের বাইরে রাস্তায় কে কী করছে, সে ব্যাপারে আমরা তো কিছু করতে পারি না।
কথাটা ঠিকই। ওদের আর কী করার আছে? সুতরাং এইভাবেই চলল। এখনও চলছে। আর আজও শোভন সেই রাগ পুষে রেখেই এসেছে বিল জমা দিতে। যথারীতি বাইকটা পার্কিং করতেই লোকটা দাঁত বার করে হাসতে হাসতে এগিয়ে এল, “দাদা, এ-মাস থেকে পার্কিং তিরিশ টাকা হয়ে গেছে, বুঝলেন তো?”
কথাটা শোনামাত্র একটা ভয়ংকর রাগ ছড়িয়ে পড়তে লাগল শোভনের মাথা থেকে পা পর্যন্ত। কী ভেবেছে লোকটা? যা ইচ্ছে তাই করে যাবে? কোনও প্রতিকার হবে না? নিজের ওপরেই রাগ হতে লাগল শোভনের। চারপাশে তাকিয়ে দেখল। যথারীতি গুমটির সামনে বেঞ্চিতে সেই দু-তিনজন লোক। কোনও বেগড়বাঁই হতে দেখলে হয়তো ওরাও তেড়ে আসবে। হয়তো এই দাদাগিরির বেমক্কা পয়সায় ওদেরও হিস্যা আছে ! না হলে কেনই বা দিনরাত ওরা লোকটার সঙ্গে এখানে পড়ে আছে?
মনে মনে নিজেকে চাবকাতে চাবকাতে ইলেকট্রিক অফিসে ঢুকল শোভন। আর সেখানেই শুনল সেই প্রাণ জুড়নো কথাটা। এই মাস থেকে শুরু হয়ে যাচ্ছে অনলাইন পেমেন্ট। এবার থেকে ঘরে বসেই অনলাইনে বিলের টাকা জমা করা যাবে।
বাইরে এসে বাইকে চাবি লাগিয়ে পকেট থেকে তিরিশটা টাকা বার করে লোকটার হাতে প্রায় ছুঁড়ে দিল শোভন। তারপর বাইকে স্টার্ট দিয়ে লোকটাকে বলল, “যা! শেষ বারের মতো নিয়ে নে। এরপর বুঝবি কত ধানে কত চাল।”
হতভম্ব লোকটা ভালো করে কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাইক চালিয়ে বেরিয়ে গেল শোভন। এবার থেকে আর ওকে এখানে আসতে হবে না। ওর মতো আরও অনেককেই। কাজেই লোভী লোকটা যে কাজকর্ম না করে বসে বসে খাচ্ছিল, সে রাস্তা বন্ধ হয়ে গেল। আর লোক না এলে চায়ের দোকানই বা চলবে কী করে? শোভন প্রতিকার চাইছিল, সেটা বোধহয় অলক্ষ্যেই হয়ে গেল।
