হনন
সুমন মহান্তি
আমার স্ত্রী সুনন্দা গত হয়েছে দশ বছর। সুনন্দা মারা যাওয়ার বছর খানেক আগে থেকে অল্পবিস্তর ভুগছিল। ঘুসঘুসে জ্বর হত প্রায়ই। মাঝেমধ্যে সুনন্দা দু-একবার আমাকে বলেছিল। কিন্তু ব্যবসা নিয়ে এত মেতেছিলাম যে ওসব নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় পেতাম না। আমার টনক নড়ল যেদিন আমার শরীরকে গ্রহণ করতে গিয়ে ও যন্ত্রণায় ভেঙে পড়ল। সদরের বড় ডাক্তার দেখেশুনে মুখ গোমড়া করলেন। পরীক্ষানিরীক্ষার পরে ডাক্তারের মত অভ্রান্ত প্রমাণিত হল। জরায়ুতে ক্যান্সার। শেষ অবস্থা। এর পরে সুনন্দা সাত মাস বেঁচেছিল। খুব যন্ত্রণা নিয়ে গেছে। যাবার আগে ষোল বছরের দীপুকে আমার হাতে তুলে দিয়ে বলেছিল, “ওকে দেখো। বড্ড মুখচোরা” নিঃসন্তান সুনন্দা দীপুকে নিজের সন্তানের মতোই দেখত।
সেই থেকে একা ছিলাম। ব্যবসা ছিল, ভাইয়ের দিকে লক্ষ্য রাখা ছিল। কিন্তু কোনো নারী ছিল না। কর্তব্য ছিল, বিনোদন ছিল না। মদ, গাঁজা, বিড়ি, সিগারেট আমার নেশার তালিকায় ছিল না। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন কেউ কেউ বলেছিল আবার বিয়ে করতে। অনেকে ঘটক লাগিয়ে যোগাযোগ করেছিল, কেউ বা সরাসরি ধরে পড়েছিল। কানে তুলিনি, গ্রাহ্য করিনি। খানিকটা লজ্জায়, খানিকটা কর্তব্যের খাতিরে।
ব্যবসাতে ততদিনে আমি দাঁড়িয়ে গেছি। সাফল্যের আনন্দ ছিল। কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়। সুনন্দা-শূন্য জীবনে আমি মাঝে মাঝে ভাবতাম যে, সুনন্দা ঠিক কতটা ছিল আমার জীবনে। ঠিক কতখানি ভালোবাসতাম তাকে।
খাঁ খাঁ মরুভূমিতে দীর্ঘ তেরো বছর অনাবৃষ্টির পরে কিছুদিনের প্রবল বর্ষণে বন্যা দেখা দিয়েছিল। যদিও সেই জলোচ্ছাসকে শোষণ করতে বেশিদিন সময় নেয়নি আমার তৃষিত হৃদয়। এখন আমি একা নই। জলজ্যান্ত এক নারীকে নিয়ে আমি বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এসেছি বললে খুব ভুল হয় না, আবার মধুচন্দ্রিমা যাপন করছি বললেও চলে।
শেষ কয়েক ঘন্টা আমরা দুজন দুজনকে সহ্য করতে পারছিলাম না। অতি অল্পদিনের মধ্যে শরীরী আকর্ষণ মুছে গিয়ে হতাশার পলি পড়েছিল। হতাশার নানা কারণ। নিজেদের প্রতি তীব্র ঘৃণায় আমরা একজন অপরজনের মুখে থুতু ছিটিয়েছি। আত্মদহনের আগুনে আমাদের মুখ ঝলসে গেছে, পুড়ে গেছে। আমরা এখন মুক্তি খুঁজেছি। সাগরবেলা থেকে মুখ ফিরিয়ে, হোটেলের দরজা জানালা বন্ধ করে, কেউ কারও মুখের দিকে না তাকিয়ে, হাতে মুখ ঢেকে, অশ্লীল গালিগালাজে . . .
ঘন্টা দেড়েক আগেও খুব অশ্লীল গালি দিতে দিতে ও আমার মুখে একদলা থুতু ছিটিয়ে দিয়েছিল। আমারও সহ্যের সীমা আছে। হাতের কাছে ভারী কাঠের রুলটা ছিল। সেটা ওর মাথায় আমি সজোরে বসিয়ে দিয়েছিলাম। কয়েক মিনিট ওর শরীরটা ছিটকে ছিল। একটু রক্তবমি করল ও নিস্পন্দ হল। এইভাবেই ও পড়ে আছে মাটিতে। আমি চেয়ারে বসে লিখছি। ও মুক্তি পেয়েছে। আমারও মুক্তি চাই। কোথাও ফিরতে পারব না, ফেরার পথ বন্ধ। বেঁচে থাকলে পরবর্তী গন্তব্য হবে জেল-হাজত। শুধুমাত্র আত্মহননেই মুক্তির পথ আছে। যাই হোক, আত্মহত্যার অনেক উপায় আছে। তার আগে নিজের কথা বলতে চাই। কনফেশন ছাড়া মরতে আমি চাই না।
২
আমার ভাইটা একটু আলভোলা। ব্যবসায় মন থেকেও যেন নেই। গুটিকয় বন্ধুবান্ধব আছে। ওকে আগলে রেখেছিলাম। ইদানীং বিভিন্ন মিশনে যাতায়াত খুব বেড়েছিল। ভয় পেলাম। ছাব্বিশ বছর বয়স তো হল। বিয়ে দেওয়ার জন্য মরীয়া হলাম। বিয়ে করে যদি পরিবর্তন কিছু হয়। দীপায়ন ওরফে দীপু আমার স্নেহ-ভালোবাসার আধার। তার মতামত নিলাম। বিয়ে করতে সে রাজি আছে কিনা।
— দীপু, একটা কথা আছে শোনো।
দীপু চুপ করে পাশে এসে দাঁড়ায়।
— তুমি আজকাল মিশনে বেশি যাতায়াত করছ। কেন?
খানিক চুপ থেকে দীপু বলে, ভালো লাগে দাদা।
— সন্ন্যাসী-টন্ন্যাসী হবার ইচ্ছে আছে নাকি?
— না, না। সেরকম কিছু নয়।
আর ঘাঁটাই না। সরাসরি কাজের কথায় চলে আসি।
— শোনো, আমার বয়স হচ্ছে। তোমারও বিয়ের বয়স হয়েছে। একমাত্র অভিভাবক হিসেবে এবার তোমার বিয়ে দেওয়া আমার দায়িত্ব।
— এত তাড়াহুড়োর কী আছে?
দীপুর মধ্যে কোনো উত্তাপ লক্ষ্য করলাম না।
— দেখো, অনেকদিন এই বাড়িতে কোনো মেয়ের স্পর্শ নেই, উপস্থিতি নেই। আমারও তো শখ, আহ্লাদ আছে।
দীপু চুপ থাকে। নীরবতাকে আমি সম্মতির সংকেত বলে ধরে নিই।
৩
ঘটক লাগালাম। বাইশজনের ফোটো এল। তার মধ্যে পছন্দ করে একজনকে দেখতে গেলাম। দীপু সম্পূর্ণ উদাসীন, পাত্রী দেখতে যেতে চাইল না। অবচেতন মন কীরকম কাজ করে তা আমরা নিজেরাই জানি না। পাত্রী মনোনয়নে আমার দীর্ঘ তেরো বছরের উপোসী শরীর-মন কাজ করেছিল কিনা জানি না। বেশ লম্বা চওড়া। সুন্দরী। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ। দীপু কমার্স গ্র্যাজুয়েট। আরও পড়তে চেয়েছিল। প্রায় জোর করে ব্যবসায় ঢুকিয়েছি।
— ছেলে একবার দেখবে না?
— দরকার নেই। অবশ্য আপনারা ছেলেকে দেখে আসতে পারেন। বাড়িটাও দেখা হয়ে যাবে।
— না, না। তার দরকার নেই। আমরা খোঁজখবর নিয়েই এগিয়েছি।
বিয়েটা হয়ে গেল। বেশ ঘটা করেই বিয়েটা দিয়েছিলাম। বিয়ের পরে প্রথম মাসটা ভালোই কাটল। দীপুকে একটু উচ্ছ্বল লাগছিল কি? মনে তো হয়েছিল, দীপু খুশি। অষ্টমঙ্গলা, মধুচন্দ্রিমা কেটে গেল। বউমার পায়ে রুপোর তোড়া। হাতে চুড়ি, বাউটি। ঝমঝম, রিনরিন, ঠিনঠিন আওয়াজে বাড়ি ভরে উঠল। দোতলায় পাশাপাশি দুটো বেডরুম। একটা ওদের, একটা আমার। আমি নিচে নেমে যেতে চেয়েছিলাম। দীপু রাজি হয়নি। নিজের বেডরুমে শুয়ে বুঝতাম, ওরা ভাব-ভালোবাসার কথা বলছে। গজলের হালকা সুর ভেসে এসে আমায় জানিয়ে দিত, দীপু খুশি আছে, সে সুখী হয়েছে।
ছন্দপতনটা টের পাই মাস দেড়-দুই পরে। সকালে খাবার টেবিলে চা দিতে এসেছিল মণিদীপা। দীপুকে চা দেবার সময় ‘ঠক’ শব্দটা কেমন কানে লাগল। আমাকে অবশ্য চা পরিবেশন করল মোলায়েম ভাবেই। দুপুরে খাবার টেবিলে, হয়তো দেখলাম, দীপু একা একা খাচ্ছে। কেমন যেন ঝিমিয়ে গেছে ভাইটা। বউমা কাছাকাছি কোথাও নেই। হয়তো পরে খাবে, হয়তো আগেই খেয়ে নিয়েছে। এদিকে আমাকে খাবার দিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে তত্ত্বাবধান করছে, কী লাগবে না লাগবে। আমার চোখে লাগে, অনুভূতিতে আঘাত লাগে। তবে কি ওদের বিবাহিত জীবনে কোনো গোলমাল দেখা দিল? ছন্দপতনটা ধীরে ধীরে আমার বোধে সঞ্চারিত হতে লাগল। বেহালায় একটা করুণ সুর যেন ফেনিয়ে উঠেই মিলিয়ে যায়, তারই পাশে সেতারের ঝংকারের রুদ্রাংশ। রাতে ওদের রুম থেকে গান ভেসে আসে না। পরিবর্তে দু-একটা কথা কাটাকাটি গভীর রাতে কানে ধরা দেয়। দিনের বেলায় দীপুর প্রতি মণিদীপার ব্যবহারে তুচ্ছিতাচ্ছিল্য বোঝা যায়।
ক্রমে ক্রমে আমি নিঃসন্দেহ হই। আমার আলভোলা ভাইটা বউটাকে সম্পূর্ণ তৃপ্তি দিতে পারছে না। ইচ্ছে হয় দীপুকে আড়ালে ডেকে ডাক্তার দেখানোর কথা বলি। কিন্তু বলা হয়ে ওঠে না। জড়তার সঙ্গে চোরা একটা লোভ যেন বাধা দেয়। এখন রোজই দিনের বেলা দীপু দোকানে থাকে। দোকানে একটা অ্যাটচড শোওয়ার ঘর আছে। গত দশ দিন ধরে ওখানেই রাতে শুই। দীপুকে বললাম, “দীপু, দুপুরেও আমি থাকব, বুঝলে? বিশেষ করে সামনের ক’টা মাস। দোকানে এখন লাখ লাখ টাকার মাল আছে। এখন বউমার পাশে তোমার একটূ বেশি থাকা দরকার।’’
আসলে আমি বোঝাতে চেয়েছিলাম, শরীরের দুর্বলতা থাকলে মন দিয়ে সেটা ভরাট করো। এর থেকে আর স্পষ্টভাবে তো বলা যায় না। গবেট ভাইটা কথা ধরতে পারল না। বিয়ে করার পর একটু গোঁ হয়েছে। কিছুতেই রাজি হল না। দিনের বেলায় দোকানে থাকতেই নাকি তার ভালো লাগে।
আসলে আমি দূরে সরে যেতে চাই। ইদানীং নিজেকে আমি ঠিক ততটা বিশ্বাস করতে পারছি না।
৪
নিঃসঙ্গ দুপুর। দুপুরে ঘুমনো আমার স্বভাব নয়। দীপু আমার সমস্ত কাজ কেড়ে নিয়ে বোধহয় নিজের ব্যর্থতা কাজ দিয়ে ঢাকতে চাইছে। পাশের ঘরেই মণিদীপা, ভাদ্রবউ। আমার অলস মস্তিষ্ক কল্পনার জাল বুনতে থাকে। মনে মনে ওকে আমি ‘মণি’ বলে ডাকি। কল্পনায় প্রতি দুপুরে মণিকে নিয়ে আমি নানারকম ছবি আঁকি। সবই যৌনতার। এক একদিন কল্পনাকে বাস্তবায়িত করতে ইচ্ছে করে। প্রবল গ্রীষ্মে দরজা জানালা বন্ধ করে ছায়া ছায়া অন্ধকারে শুয়ে থাকি। মনে হয়, আমি যদি এখনই ওই ঘরে যাই? সেটা আচমকা একটু অন্যরকম হলেও ধরা যাক, মণিদীপা অপ্রতিভ হল না। ধরা যেতেই পারে, কেননা ও ভেতরের দরজা ঠেসিয়ে রাখে। বরং ও উঠে বসল। নিজের মতো শুয়ে থাকার ফলে ওর শাড়িটা খানিক ওপরে উঠে গিয়েছিল। ও উঠে সেটা ঠিকঠাক করল। ওর নরম সুগোল পায়ে রুপোর তোড়া শব্দ করে বেজে উঠল। আমি ওর বিছানায় বসলাম।
— মণি, দুপুরে ঘুম আসতে চায় না। তাই তোমার কাছে চলে এলাম। তুমি বিরক্ত হচ্ছ না তো?
— না, একেবারেই না। আমারও দুপুরটা কাটতে চায় না।
— দুপুরটা খুব খারাপ কাটে?
আমি ওর চুলে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাম।
— ভীষণ। এত একা লাগে।
চমকে উঠে বসে পড়ি। কল্পনায় লাগাম দেওয়ার চেষ্টা করি প্রাণপণ। আমার কি মতিভ্রম শুরু হয়েছে? কল্পনাতেই সব কিছু, বাস্তবে আমি কখনোই ওদের বেডরুমে পা রাখি না।
আজকাল মণিদীপা একটু বেশি যত্নআত্তি করে। খানিক গায়ে পড়া ভাব মনে হয়। আমি ভীষণ উপভোগ করি। কল্পনার জগতে নিজেকে উজাড় করে দিই। যদিও এখন আমি খুব সংশয়ে থাকি। ও কি আমার মনের কথা জানতে পেরেছে? আমি লজ্জা পাই। সবকিছু ছেড়ে কোথাও পালিয়ে যাওয়ার কথা ভাবি। কিন্তু এই সাধের ব্যবসা, ঘরবাড়ি ছেড়ে যাব কোথায়? নাহ, লাগাম টানতে হবে। মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। এভাবে ভেসে গিয়ে সমূহ সর্বনাশ করলে তো চলবে না।
একদিন কান্ডটা ঘটেই গেল। আমি যথারীতি ওকে নিয়ে দিবাস্বপ্নে মশগুল ছিলাম। সংযমের বালাই নেই, ওসব নেহাতই জ্ঞানের কথা মনে হল। দীঘার সমুদ্রে আমরা স্নান করছিলাম। সবে আমি কল্পনার ঝাঁপি খুলে শুয়েছি। মণিদীপা হঠাৎ আমার ঘরে এল।
— দাদা, আপনার কাছে কোনো গল্পের বই নেই?
বুঝতে একটু সময় নিলাম। এই নতুন বিয়ে। শো-কেসে বেশ কিছু গল্পের বই থাকার কথা। এই বয়সের মেয়েরা গল্প বই পড়ার থেকে মোবাইলে বুঁদ হয়ে থাকতে ভালোবাসে। মণিদীপা আমার বিছানায় আমার গা ঘেঁসে বসল। আমি উঠে বসেছি। আমার শরীরে শত শত কাঁকড়াবিছে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আমার অভিজ্ঞতা আমার অনুভব বলছে যে কিছু একটা ঘটে যেতে পারে। আমি কি এই আবছা অন্ধকার পরিবেশে নিজেকে ঠিক রাখতে পারব? শরীরের কোষে কোষে লুকিয়ে থাকা কাঁকড়াবিছেরা তাদের দশ বছর ধরে সঞ্চিত বিষ ঢেলে দিচ্ছিল। আমি নিজের সঙ্গে সংগ্রামের হাতিয়ার একটা একটা করে হারিয়ে ফেলছি। আমার ভিতরে আরেকটা আমি প্রবল হয়ে জমি দখল করে ফেলছে।
আমার কথা জড়িয়ে যাচ্ছে উত্তেজনায়। ও সেটা বুঝতে পারছে এবং সান্নিধ্য বাড়াচ্ছে।
— না, গল্পের বই আগে পড়তাম। এখন আর ভালো লাগে না। তবে আছে এখনো দু-একটা। কীরকম বই নেবে?
ও অদ্ভুত হাসল। কিছু বলল। আবছা আলোয় মায়াবী হাসিটা আমার রক্তে আগুন ধরিয়ে দিল। এবার আমার পালা। ওর মাথা, চুল, গলা, ঘাড় বেয়ে একে একে ধাপে ধাপে আমার হাত নামিয়ে আনলাম সন্তর্পণে। রেসপন্স দেখলাম। ওরও শরীর আছে একটা। আর সেটা একুশ বছরের গনগনে আগুনের মতো মনে হল আমার। হঠাৎ জড়িয়ে ধরে একটা চুমু খেলাম আলতো। এবং তারপরেই ছেড়ে দিয়ে ওর মুখের দিকে তাকালাম। ও রাজি আছে কিনা জানতে চাই নীরবে। মেয়েটা হাসছে। আবছা আলোয় মায়াবী হাসি। এ হাসির একটাই অর্থ হতে পারে। এবার সজোরে জড়িয়ে ধরলাম আর মণিদীপা আমাকে আঁকড়ে ধরল। শরীরের বিষ আগুন হয়ে ঝরছিল, নামছিল। ভেসে যাচ্ছিল, খড়কুটোর মতো উড়ে যাচ্ছিল সম্পর্ক। হুম, তুচ্ছ সম্পর্ক। সমাজ, মানসম্মান— সব তুচ্ছ।
আমি কোনো ফাঁদ পাতিনি। এতদিন শরীরের কামনা কীটের মতো কামড়াত। সংযমের রাশ আমি ঠিকই টেনে ধরতে জানতাম। তবে ছাইচাপা আগুন হয়ে ছিলাম। এখন আগুন তো দাউদাউ করে জ্বলে উঠবেই।
দিন দিন প্রতিদিন। তবুও মনে প্রাণে আমি বিশ্বাস করি যে শুধু একদিন, মাত্র একটি দিনের জন্য আমি চেয়েছিলাম ওকে। হায়, সাময়িক তৃপ্তি সবসময় অতৃপ্তির দিকে ধায়। আকাঙ্ক্ষা অভ্যেসে পরিণত হয়। শরীরে একবার ডুব দিলে আর ফেরা যায় না। মাঝেমধ্যে রাতেও দীপুকে দোকানঘরে পাঠিয়ে দিই। শরীরের ওপর শরীরের ধস নামে। ক্যাজুয়াল কথাবার্তা চলে। মণিদীপা এসব মুহূর্তে আমাকে ‘তুমি’ বলে ডাকে।
—তোমার ভাই। কেমনধারা যে পুরুষ!
— হুঁ।
— প্রাণহীন।
— হুঁ।
— এই, তোমার ভাই এমন কেন?
— জানি না।
একদিন এমনই এক মুহূর্তে মণিদীপা আমাকে অভিযোগ জানাল।
— এই জানো, ও আমাকে মেরেছে।
পৌরুষ জেগে ওঠে আমার।
— কেন?
—ও বোধহয় সন্দেহ করছে।
— তাই নাকি? জানলেই কী করবে ও?
—ও বাচ্চা নেওয়ার জন্য জোর করছে। কিন্তু আমি এখনই ওর সন্তানের মা হতে চাই না।
আমার তখন দেহ জুড়ে শ্রান্তি নেমে আসছে। অদ্ভুত এক তৃপ্তি।
— তুমি কিছু করবে না?
— কী করব?
__ ও যে আমাকে মারল। সন্দেহ করছে।
আগুন ধরে যায় মাথায়। এত সাহস ঐ আলভোলা ভাইয়ের!
_ জানলেই কী হবে? আমারই খায়, আমারই পরে, আমারই তিলে তিলে গড়ে তোলা সম্পত্তি ভোগ করে। বাবা তো কিছুই রেখে যায়নি। ওর এত সাহস! আমি কিছুদিন পরেই তোমাকে বিয়ে করব। ডিভোর্সটা হতে দাও।
ভোর হয়ে আসছিল। আমার মাথা দপদপ করছিল। আমি যা করব তাতেই মণিদীপা রাজি। ডিভোর্স, বিয়ে ইত্যাদি অনেক পরের ব্যাপার, আপাতত আমরা দুজন সারাক্ষণ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বেঁচে থাকতে চাই। আমরা ভোরের বাস ধরে শহরে এলাম। তারপর ওকে নিয়ে এলাম এই সাগর-বেলায়। আমার অনেকদিনের কল্পনা, যেটা নিছকই স্বপ্ন ছিল বাস্তবে তা সত্যি হল।
আমরা টানা সাতদিন শরীরে শরীর লেপটে ছিলাম। তারপর মণিদীপা যেন হঠাৎ নিভে গেল। শরীরের চাহিদা ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠল সমাজ, আত্মীয়স্বজন। সম্পর্কের তো মূলোৎপাটন হয়নি, তা করাও যায় না। এটা আমার মতো অভিজ্ঞ একজন মানুষের বোধবুদ্ধিতে আসেনি। সাময়িক উত্তেজনায় আবেগে দুজনেই হঠকারিতা করেছি। আমিও নিভে এলাম। ভয় করতে লাগল। আমরা কোনোদিনই কোথাও ফিরতে পারব না। তখন আমাদের এই নতুন সম্পর্কটার ভিত নড়ে গেল। সারাদিন জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে হোটেলের বন্ধ রুমে আমরা শুধু নতুন সম্পর্কটার গুল্ম ধরে নাড়াচ্ছি, টানছি। দোষারোপ এবং গালিগালাজ করতে লাগলাম একে অপরকে। এখন তো সব শেষ। রাগের মাথায় খুন করে সমস্ত কিছুর ওপর যবনিকা টেনে দিয়েছি।
হোয়াটসঅ্যাপে একটা মেসেজ ঢুকল। দীপু পাঠিয়েছে। লিখেছে, দাদা, তোমার আর মণিদীপার জন্য করুণা হয়। জানিনা, তোমাদের ভবিষ্যৎ কী? ভালো হবার কথাও নয়। তুমি কিন্তু কখনো এখানে ফিরো না। ফিরলে আমার বন্ধুরা তোমাকে ছাড়বে না। মানুষ, কোনো সুস্থ মানুষ, সে যতই তোমার বন্ধু হোক, তোমাকে সাহায্য করবে না। মুখ ফিরিয়ে নেবে। কোর্ট-কাছারির কথা ভেবো না। ভাবলে ভুল করছ। তুমি কখনো এখানে ফিরলে হয় তুমি থাকবে, না হয় আমি। টাকা ফুরোলে বোলো, পাঠিয়ে দেব অনলাইনে।
আরও লিখেছে যে আজীবন সে আমাকে টাকা পাঠিয়ে যাবে। কারণ, যত অন্যায়ই করে থাকি, সে আমায় ক্ষমা করেছে। কেননা, আমি তার দাদা। তাকে স্নেহ-আদরে বড় করে তুলেছি।
দীপু, আমার দীপু, এ কথা লিখেছে? ঠিক লিখেছে। শাস্তি আমি নির্মমভাবে পেয়েছি। আসলে দীপু বা মণি এরা কেউই দোষী নয়। আমিই আদিম কামনা গোপনে লালন করেছিলাম। হুঁশ ছিল না, বোধবুদ্ধি হারিয়ে ফেলেছিলাম। তাই দাবার শেষ চালে মাত হয়ে গেলাম। দোষী আমি। ভুল আমার। বয়সে আমি বড় ছিলাম, আমারই লাগাম টানা উচিত ছিল। বেঁচে থাকার অধিকার আমার নেই। বেঁচে থাকলেও তো জেলে পচে মরতে হবে।
মাথার ওপরে সিলিং ফ্যানটার দিকে তাকালাম। মরতে ভয় পেলে চলবে না। হাত বাড়ালাম চেয়ারের দিকে …
