হারায়ে খুঁজি
ভাস্বর চট্টোপাধ্যায়
ওয়েলকাম অন বোর্ড, স্যার। মিষ্টি হেসে এয়ারহোস্টেস এক পাশে সরে দাঁড়ায়।
সমীরণের হাতে একটা ট্রলি ব্যাগ। বড় স্যুটকেসটা লাগেজে দিয়ে দিয়েছে। যাচ্ছে ম্যানচেস্টার, মাসির বাড়ি বেড়াতে। বেশ কিছু বছর পরিবার নিয়ে মাসি ওখানে সেটেলড। অনেকবার বলেছে আয় একবার ঘুরে যা। তাই এবার পুজোর সময় কলকাতার মায়া কাটিয়ে সমীরণ চলল বিলেত।
পুজোয় কলকাতায় থাকবি না? বন্ধুরা বিশ্বাস করতে পারে না, এখানকার পুজো ছেড়ে ওখানে?
যাই একবার ঘুরে আসি।
ধুর! পাগলা নাকি?
ভাই কলকাতার পুজোর ভিড়ভাট্টা আর ভালো লাগছে না, বিলিভ মি। ট্র্যাফিক জ্যামে এক পা এগোনো যায় না। তার থেকে কদিন বিদেশের হাওয়া খেয়ে আসি।
যা ভাই। পয়সা আছে যাবি না কেন?
বন্ধুরা আওয়াজ দিলেও গায়ে মাখেনি সমীরণ। ওরা এরকমই। ছোট থেকে একসঙ্গে বড় হয়েছে। পাড়ায় যেমন ক্রিকেট খেলেছে, কারোর বিপদে দলবেঁধে পাশে দাঁড়িয়েছে, তেমনই সরস্বতী পুজোও করেছে। তখন আবার সমীরণ সেক্রেটারি হত। চাঁদা তোলা থেকে ঠাকুর বায়না, খাওয়া দাওয়া, বিসর্জন সব দায়িত্ব মন দিয়ে পালন করত।
আর পুজোর সময় তো কথাই নেই। চারদিন হাওয়ায় উড়ত সবাই। কখন বাড়ি থেকে বেরতো, কখন ফিরত কোনো ঠিকানা নেই। এই আড্ডা ছেড়ে যেতে দুবার ভেবেছে, অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু যখন দেখল বাবা মা তাদের বন্ধুদের গ্রুপের সঙ্গে হিমাচল যাচ্ছেন, তখন তার মনটাও নেচে উঠল। না হিমাচল যাওয়ার জন্য নয়, সেতো কাপল ট্যুর। আর কেউ নট অ্যালাওড। তাই ঠিক করে ফেলল সোলো ট্রিপ করবে। মাস ছয়েক আগে ভিজা অ্যাপ্লাই করে, ফ্লাইটের টিকিট কেটে একেবারে কোমর বেঁধে তৈরী।
ভালো যে তুই বাবলির কাছে যাচ্ছিস, শকুন্তলা বলেছিলেন, নাহলে আমার বেড়াতে গিয়েও শান্তি হত না।
কেন মা?
কেন আবার! একা একা এই প্রথম বাইরে যাচ্ছিস…যতই ধেড়ে হয়ে যাস, নিজের দেখাশোনা কি করতে পারিস?
পারি না?
না না। খাওয়া দাওয়ার ঠিক ঠিকানা থাকে না কিছু না। বাবলি আছে, চিন্তা নেই।
সব মায়েদের এক কথা। অফিসেও কলিগদের কাছে এরকম শুনেছে সমীরণ। অবশ্য মা ছাড়া আর কেউ যে এমন করে ভাববে না ও জানে।
আচ্ছা শোন, বাবলি খুব সন্দেশ খেতে ভালবাসে। এক বাক্স নিয়ে যাস তো।
মা প্লিজ!
অত বড় স্যুটকেসে একটা বাক্স নিতে কি অসুবিধে, রে?
বুঝতে পারছ না। ম্যানচেস্টার পৌঁছোবার পর ওগুলো আর সন্দেশ থাকবে না। দলা পাকিয়ে যা তা হবে।
ও…তাহলে আমি একটা শাড়ি পাঠাবো। নিবি?
একটা শাড়ি বলে শকুন্তলা গোটা দুয়েক শাড়ি, বাবলির বর ছেলের জন্য জামাকাপড়ও দিয়ে দেন।
আরেকটা জিনিস নিয়ে যেতে পারবি?
কি?
শেষবার যখন বাবলি এসেছিল, বলছিল দিদি মায়ের পানের বাটাটা আমায় দিবি। ওর খুব পছন্দের। আমি যদি ভালো করে প্যাক করে দিই…
এখানেই থেমে যেও হ্যাঁ। আর কিচ্ছু আমি নিতে পারব না।
থেমে গেছিলেন শকুন্তলা। তবে ইচ্ছে ছিল একটা বেডকভারের সেট পাঠাবার। সে আর হল না।
কলকাতা থেকে এমিরেটস এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ছাড়বে রাত সাড়ে নটা। মাঝে দুবাইতে ঘন্টা তিনেকের লে ওভার। ইচ্ছে আছে যতটা সম্ভব এয়ারপোর্টটা ঘুরে দেখার। এদিকে কলকাতায় ইমিগ্রেশানের লম্বা লাইন। এগোচ্ছেই না। সমীরণ ফোন ঘাঁটছে আর উঁকি মারছে। কাউন্টারে বসা লোকগুলো এত স্লো যে বলার নয়।
এত লোক বিদেশ যাচ্ছে! ঘাড় ঘুরিয়ে লাইনটা দেখে সমীরণ, হবে নাই বা কেন? পুজো বলে কথা।
লাইনে যারা আছে বেশিরভাগ বাঙালি। কেউ যাচ্ছে কুয়ালা লাম্পুর, কেউ ব্যাংকক তো কেউ বালি। অসীম উৎসাহ জনগণের। সেলফি তুলে হইচই করে কানের পোকা বার করে দিচ্ছে।
আপনি কোথায় চললেন, দাদা?
পেছন থেকে এক আলাপি ভদ্রলোক হাসি মুখে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন।
ম্যানচেস্টার।
আরেব্বাস! দারুন ব্যাপার! আমরা ভিয়েতনাম যাচ্ছি।
ও। সমীরণের এই মুহূর্তে গপ্প জুড়তে একেবারেই ইচ্ছে করছে না।
একা নাকি?
হ্যাঁ।
বিয়ে থা করেননি।
ব্যক্তিগত প্রশ্নের দিকে আর এগোতে দেওয়া যাবে না। তাই সমীরণ চশমার ফাঁক দিয়ে এমন গম্ভীরভাবে তাকায় যে ভদ্রলোক থেমে যান।
মেই আই হেল্প ইউ?
সেই হাসিমুখ এয়ার হোস্টেস মেয়েটি এগিয়ে এসে সমীরণের হাত থেকে বোর্ডিং পাসটা নেয়, কাম উইথ মি, স্যার।
এয়ার ক্রাফটের প্যাসেজ দিয়ে এগোনোই যাচ্ছে না। ওভারহেড লাগেজ র্যাকে জিনিস রাখতে গিয়ে প্যাসেঞ্জাররা রাস্তা আটকে রেখেছে। মেয়েটি তার মধ্যেই কোনোমতে জায়গা করে সমীরণকে নিয়ে এগোয়। প্রথম সেকশান ছেড়ে পরেরটার প্রায় শেষে সিট। মিডল রো-তে। ভাগ্য ভালো আইল সিট পেয়েছে।
ইউ ক্যান পুট ইওর লাগেজ আপ দেয়ার। মেয়েটি চলে গেলে সমীরণ ট্রলি ব্যাগটা ওপরে রেখে সিটে বসে। ঘড়ি দেখে। ফ্লাইট ছাড়তে এখনো মিনিট কুড়ি। পিল পিল করে লোক ঢুকছে। পাশের সিটদুটো এখনো খালি। হলেই ভালো। তাহলে হ্যান্ডেলগুলো সরিয়ে একটু ঘুমিয়ে নিতে পারবে।
হল না। এক বয়স্ক দম্পতি কিছুক্ষণের মধ্যেই এলেন। বাঙালি। মহিলাকে সাইড সিট ছেড়ে দিয়ে ভদ্রলোক মাঝে বসলেন। ছাপোষা মধ্যমিত্ত। হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে ফ্লাইটে যাতায়াত করতে অভ্যস্ত নন।
বেল্টটা বেঁধে নাও।
ঝুঁকে পড়ে ভদ্রলোক স্ত্রীর সিট বেল্ট আটকে দিলেন। ততক্ষণে ফ্লাইটের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। অল্প অল্প করে এয়ারক্রাফট গড়াতে শুরু করেছে আর মনিটারে সেফটি ভিডিও চলছে। বাবা মাকে নিয়ে একবার ভিয়েতনাম আরেকবার ব্যাংকক গেছিল সমীরণ। লং ডিস্টেন্স ফ্লাইট যে কি বোরিং জানা আছে। ফোন ফ্লাইট মোডে করে, সামনের মণিটারে কি সিনেমা দেখা যায় দেখতে থাকে। সময় কাটানোর একমাত্র উপায়।
এবার আকাশে ওড়ার পালা। স্পীড নিয়েছে প্লেইন। এয়ার হোস্টেসদের আর দেখা যাচ্ছে না মানে যে যার সিটে বসে। মাটি ছেড়ে হুশ করে ওপরে উঠে গেল আবু ধাবি গামী উড়ান আর তখনই সমীরণ লক্ষ্য করল মহিলা চশমা খুলে চোখ মুছছেন।
ভদ্রলোক গলা নামিয়ে বললেন, কাঁদছ কেন?
তাহলে কি পুজোর সময় দেশের বাইরে যাচ্ছেন বলে স্ত্রীর মন খারাপ? তাই হবে। বেশিরভাগই কলকাতার বাইরে পুজো কাটাতে পছন্দ করে না। এখানকার এক অদ্ভুত চার্ম আছে সেটা মানতেই হবে। কত লোক পুজোর সময় কলকাতা আসে এই ‘এসেন্স’ পেতে।
সমীরণ আড়চোখে ওদের দেখে আবার স্ক্রিনে মনসংযোগ করে। ইন্ডিয়ান ফিল্ম বেশ কিছু আছে তবে বিদেশী ছবির কালেকশান খুব ভালো। কি দেখা যায় ভাবতে ভাবতে খাবারের গাড়ি ঠেলে এয়ারহোস্টেস হাজির।
হোয়াট উড ইউ লাইক টু হ্যাভ? ভেজ অর নন-ভেজ?
ভেজ খাবে ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটে? পাগল! বাড়িতে মা পটলের ডালনা বা কুমড়োর তরকারি করলে সে দিনটা গলা দিয়ে খাবার নাবে না।
আই উইল হ্যাভ…ফিশ।
ওকে। এনি ড্রিঙ্ক?
গাড়ির মাথায় রাখা বোতলগুলোয় চোখ বোলায় সমীরণ, আ গ্লাস অফ ওয়াইন।
রেড অর হোয়াট?
হোয়াইট?
ওকে, স্যার।
মেয়েটি খাবারের প্যাকেটটা ফুড ট্রেতে নামিয়ে গ্লাসে ওয়াইন ঢালে।
হিয়ার ইউ গো, স্যার।
গ্লাসটা নিয়ে পাশ ফিরতেই সমীরণ দেখে বুড়ো বুড়ি দুজনেই চোখ বন্ধ করে বসে।
স্যার, ম্যাম হোয়াট উড ইউ লাইক টু হ্যাভ? মেয়েটি এবার ওঁদের জিগ্যেস করে। কেউই উত্তর দেয় না। ঘুমিয়ে পড়লেন এত তাড়াতাড়ি? নাকি ইচ্ছে করে উত্তর দিচ্ছেন না? আরও একবার জিগ্যেস করার পর সমীরণ ভদ্রলোকের গায়ে হাত রাখে, আপনাকে কিছু জিগ্যেস করছে।
চোখ খোলেন ভদ্রলোক, ও সরি! আমি খেয়াল করিনি।
ভেজ অর নন-ভেজ স্যার?
চিকেন।
ওকে। ফর ম্যাম?
সেম।
এনি ড্রিঙ্কস?
নো।
এয়ার হোস্টেস ওদের খাবার দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়তে ভদ্রলোক অন্যদিকে তাকিয়ে থাকেন।
আজব তো! ডেকে দিলাম, একটা থ্যাঙ্ক ইউ বললেন না?
সমীরণ ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিয়ে খাবারের প্যাকেটটা খোলে। গ্রিল্ড ফিশ দিয়েছে। ওর ফেভারিট। সঙ্গে বয়েলড ভেজিটেবলস, বান, একটা মিষ্টি ইত্যাদি আছে।
মেয়েটি পাশের ট্রেতে খাবার আর জল নামিয়ে অন্য সিটের দিকে চলে যায়।
খেয়ে নাও, ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। ভদ্রলোক প্যাকেটটা খুলে দেখেন কি কি আছে।
আমার খিদে নেই। নিরস গলায় মহিলা বলেন।
খিদে নেই! এতটা রাস্তা না খেয়ে থাকবে কি করে?
বলছি তো খিদে নেই…আমি একটু ঘুমোবো।
খেয়ে নিয়ে ঘুমোও।
জোর করছ কেন?
জোর করিনি স্নিগ্ধা।
নামটা বেশ লাগে সমীরণের। স্নিগ্ধা। মহিলার চেহারায় সত্যি একটা স্নিগ্ধ ভাব আছে। সাদা চুল, মাথায় এক চিলতে সিঁদুর, হাতে শাঁখা-পলা, পরনে তাঁতের শাড়ি। সব মিলিয়ে সাহিত্যের পাতা থেকে উঠে আসা এক নরম সরম মা। বরং ভদ্রলোক ওঁর পাশে বেমানান। বেঁটে, কালো। চোখে মোটা কাচের চশমা।
আমরা কতদিন থাকব?
স্নিগ্ধার কথার উত্তর ভদ্রলোক দেন না। উলটে স্ত্রীর খাবারের প্যাকেটটা খুলতে থাকেন।
শুনতে পাচ্ছ কি জিজ্ঞেস করছি?
শুনলাম।
বলো কদিন থাকব।
আগে যাই।
আমায় ফিরতে হবে…
ফিরে কি করবে?
ওমা! সেজোমাসির বিয়ে না। কত কাজ বলো তো।
ঠিক আছে। আগে পৌঁছোই তারপর দেখা যাবে।
আমি এখনই বলে দিলাম।
জিরা রাইসের সঙ্গে চিকেন কারি মেখে মুখে পোরেন ভদ্রলোক, বাহ! বেশ করেছে। খেয়ে দেখো।
ওয়াইন শেষ করে সমীরণ ফরক দিয়ে ভেজিটেবলস কাটে। পাশে বসা দুজনের কথোপোকথন শুনে যা মনে হচ্ছে মহিলাকে জোর করে কোথাও নিয়ে যাচ্ছেন তাঁর স্বামী। বেশ অদ্ভুত ঠেকছে। কেসটা কি?
খাবারের প্যাকেট খুলে খানিকটা ভাত চামচে নিয়ে ভদ্রলোক ধরতে, অনিচ্ছা স্বত্তেও খান স্নিগ্ধা।
কেমন?
ভাল।
বাকিটা খেয়ে নাও।
সবেতেই জোর করো।
জানো, শুনেছি বাবাইয়ের বাড়ির পেছন দিকে একটা সুন্দর বাগান আছে। তোমার তো গাছ খুব পছন্দ…
শিউলি ফুলের গাছটার গায়ে বড্ড শুঁয়োপোকা হত। বোঝাই যেত না। ফুল তুলতে গিয়ে কতবার যে হাতে কাঁটা ফুটেছে!
তাই!
মালা গাঁথতাম, পুজোর সময়। এত্ত বড়! ষষ্ঠী থেকে দশমী রোজ একটা করে গেঁথে মায়ের গলায় পরাতাম। সবাই বলত স্নিগ্ধার মত যত্ন করে মালা কেউ গাঁথতে পারে না। জানো, চারটে করে ফুল আর একটা করে বেলপাতা জুড়ে দিতাম। দেখতে বেশ লাগত। গলায় পরাবার পর মা একেবারে ঝলমল করত। কি মজা হত! কত লোক আসত। নবমীর সন্ধেবেলা গানের আসর বসত ঠাকুরদালানে। বাবা হারমোনিয়াম বাজাতো আর আমি গান গাইতাম। তারপর চলত খাওয়া দাওয়া। বাব্বা! সে কি আয়োজন। লুচি, ধোঁকার ডালনা, আলু ছেঁচকি, দু তিন রকমের মিষ্টি…পুজোর চারটে দিন নিরামিষ খেতে হত তো!
বলেই স্নিগ্ধা হাত দিয়ে খাবারের প্যাকেটটা ঠেলে হঠাত রেগে যান, তুমি আমায় চিকেন খাওয়ালে কেন?
রীতিমত চেঁচিয়ে উঠতে অনেকেই পেছন ফিরে উঁকি মারে।
কি হল? বলো আমায় আমিষ খাওয়ালে কিসের জন্য? বাবা বকবে না! আরো গলা চড়ান স্নিগ্ধা।
ভদ্রলোক অপ্রস্তুত, আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। আমি…
তুমি জানো না পুজোর সময় আমাদের বাড়ির নিয়ম?
স্নিগ্ধা…প্লিজ আস্তে কথা বলো।
না বলব না। পুজোর সময় চিকেন খাইয়েছ…ছি ছি!
স্নিগ্ধা উঠে পড়েন।
কোথায় যাচ্ছ?
টয়লেটে। মুখ ধুতে।
ভদ্রলোকও উঠতে যান, চলো আমি নিয়ে যাচ্ছি।
আমি কি বাচ্চা! ক্লাস টেনে পড়ি। একাই যেতে পারব।
হন্তদন্ত হয়ে এয়ারহোস্টেসকে ঠেলে ঠুলে স্নিগ্ধা চলে যান। ভদ্রলোক লজ্জায় কারোর দিকে তাকাতে পারছেন না। মাথা নিচু করে জলের বোতল থেকে খানিকটা জল গলায় ঢালতে যাবেন, সমীরণের সঙ্গে চোখাচখি হয়।
এনি প্রবলেম? সমীরণ জিজ্ঞেস করেই ফেলে।
না না। ঠিক আছে।
সমীরণ এয়ার হোস্টেসকে ইশারায় ডাকে।
ইয়েস, স্যার।
আই ওয়ান্ট আ রিফিল।
ওয়াইনের গ্লাসটা এগিয়ে দিতে মেয়েটি আরো খানিকটা হোয়াইট ওয়াইন ঢেলে দেয়।
ভদ্রলোক জলের বোতলের মুখটা বন্ধ করে সমীরণকে জিজ্ঞেস করেন, কোথায় যাচ্ছেন?
ম্যানচেস্টার।
আমি লিভারপুল।
ও। বেড়াতে?
না। আমার ছেলে থাকে। আপনি কি বেড়াতে?
আমার মাসি থাকেন। ওখানে উঠব। তারপর নিজের মত ঘুরে বেড়াবো।
আচ্ছা।
লিভারপুল যাওয়ার আমারও প্ল্যান আছে। শুনেছি ওখানে একটা দারুণ ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারি আছে। তাছাড়া ওখানকার মিউজিয়ামটাও দেখার মত।
ভালো লাগল কো-প্যাসেঞ্জার বাঙালি। গল্প করে সময় কাটবে…আমার নাম অতীন্দ্র হালদার।
আমি সমীরণ বাগচী।
আপনি আমার ছেলের থেকে ছোটই হবেন। তা,কলকাতার কোথায় থাকেন?
নিউ আলিপুরে। আপনি?
চক্রবেড়িয়ায়। অবশ্য থাকি বলা যায় না। থাকতাম। পাস্ট টেনস হয়ে গেছে, অতীন্দ্রর গলায় আক্ষেপের সুর।
টয়লেটের দিকটায় একবার উঁকি মারেন। স্নিগ্ধা এখনও বেরোননি।
কি করছে এতক্ষণ? বিড়বিড় করে বললেও সমীরণের কানে যায়। সেও ঘাড় উঁচু করে দেখে। দরজা বন্ধ, মাথার ওপর রেড লাইট জ্বলছে। মানে টয়লেট অকুপায়েড।
কদিন থাকবেন?
প্রশ্ন শুনে অতীন্দ্র নিরাসভাবে বলেন, বাকি জীবনটা। আর কলকাতা ফেরা হবে না। ফিরে থাকবোই বা কোথায়? বাড়িটাও বিক্রি হয়ে গেল।
কি বলবে বুঝতে না পেরে সমীরণ চুপ করে থাকে।
বারণ করতে গিয়েও পারলাম না। বাবাইয়ের কথায় যুক্তি আছে।
মানে?
স্নিগ্ধা, মানে আমার স্ত্রীর ডিমেনশিয়া হয়েছে। প্রথম প্রথম আমরা বুঝতে পারিনি। ভুলে যেত, আমরা ওকে দোষারোপ করতাম। বলতাম তুমি কিছুই মনে রাখতে পারো না। আস্তে আস্তে সেটা বাড়াবাড়ি রকমের হয়ে গেল।
আপনাকে মনে আছে নিশ্চয়?
হ্যাঁ। সারাক্ষণ সঙ্গে সঙ্গে থাকি বলে। জানি না ছেলেকে আর মনে থাকবে কিনা।
ও!
অসুখটাই এরকম। বাড়িতে সারাক্ষণ ঘর অন্ধকার করে বসে থাকে। আলো সহ্য করতে পারে না। ডাক্তার বললেন এগুলোই সিম্পটমস। আমি তাও জোর করে…আমারও তো বয়স হয়েছে, সব সময় পেরে উঠি না।
কোয়াইট ন্যাচারাল।
আমি স্টেট ব্যাঙ্কে ছিলাম। রিটায়ার করার পর বাড়িতেই থাকতাম। দুপুরবেলা ঘুমিয়ে পড়লেই স্নিগ্ধা দরজা খুলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেত। দুদিন রাস্তার মোড় থেকে ফেরত নিয়ে এসেছি। আর তারপর তো একদিন…রাত কাবার হয়ে গেল ফিরলই না।
কি বলছেন!
থানায় গেলাম। এক দিন পর হাওড়া স্টেশন থেকে উদ্ধার করে আনল পুলিশ।
সেকি!
হ্যাঁ। ট্রেন ধরবে বলে বসেছিল। মনে করতে পারছিল না কোথায় যাবে। ভাগ্যিস! ট্রেনে উঠে পড়লে আর হয়ত খুঁজেই পেতাম না।
অতীন্দ্রর গলা ধরে আসে, তারপর থেকে দুপুরে বা রাতে ঘুমোতে গেলে ওর পা-টা খাটের পায়ার সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে দিতাম। কি করব? একা মানুষ আমি। ছেলে লিভারপুলে চাকরি করছে আজ বহু বছর। বউ বাচ্চা নিয়ে ওখানেই সেটলড। চাইলেই ছেড়ে ছুড়ে আসতে পারবে না। গত বছর জানুয়ারি মাসে এসে বলল এভাবে আর নয়। আমার ওখানে থাকবে চলো। ইনিশিয়েটিভ নিয়ে বাড়ি বিক্রি করে দিল।
আপনার স্ত্রী এসব কথা…
বলেছি, বুঝেছে বলে মনে হয় না। এ অসুখটা আশ্চর্য জানেন! পুরনো কত কথা মনে আছে কিন্তু প্রেসেন্ট ডে-র কিছুই মনে রাখতে পারছে না। ক্রমশ ডিটিরিওরেট করছে। ডাক্তার বলেই দিয়েছেন, এর কোনো চিকিৎসা নেই।
নেই?
না। অতীন্দ্র সিট ছেড়ে ওঠেন, ওই তো এসে গেছে।
স্নিগ্ধা কাছে এলে অতীন্দ্র হাত ধরে বসাতে গিয়ে দেখেন শাড়িটার অনেকটা ভিজিয়ে ফেলেছেন।
এ কি! ভিজলে কি করে?
সিটে বসেন স্নিগ্ধা, এমন ছোট্ট টয়লেট…আমাদের বাড়ির বাথরুমটা মনে আছে? কত বড় চৌবাচ্চা ছিল! গরমকালে দাদাভাই ডুবে বসে থাকত…আর মা খুঁজে খুঁজে হয়রান।
খিলখিল করে হেসে ওঠেন স্নিগ্ধা। কে বলবে কিছুক্ষণ আগে স্বামীর ওপর রেগে আগুন ছিলেন। এখন হয়ত সেটাও মনে নেই।
তবে ওঁকে দেখে সমীরণের ঠাকুরদার মুখটা ভেসে ওঠে। কিছু বছর হল সব ভুলতে শুরু করেছেন। সারাদিনে একই কথা কতবার যে জিজ্ঞেস করেন!
হ্যাঁরে সোম, তুই আজ বাড়িতে? অফিস নেই?
উত্তর দিতে দিতে সমীরণ রেগে যায়, কতবার বলব আজ রবিবার। ছুটি। তুমি কিচ্ছু মনে রাখতে পারো না আর আমায় একই প্রশ্ন করে যাও।
বকুনি খেয়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকেন চন্দনবাবু। তারপর ধীর গলায় বলেন, আমি কি ইচ্ছে করে ভুলে যাই বল? সত্যি মনে রাখতে পারি না। কথাগুলো কোথায় হারিয়ে যায় কে জানে? হাজার চেষ্টা করেও খুঁজে পাই না।
