শঙ্খচিল ও দত্ত বাড়ির পুকুর
মোস্তফা মঈন
শুভদীপ। আমার আত্মায় মেলে ধরা চোখ। যে আলোয় আমি কৈশোর দেখি। শৈশব কুড়াই। বাতাবি লেবুর ঘ্রাণ শুঁকি নাকে নাক ঘষে। হাতের মুঠোয় ভরে রাখি জোনাকি পোকার সন্ধ্যা। আমার মুঠোর ভেতরে জ্বলতে থাকে জোনাকি পোকাটা। শুভদীপের কৌটোতেও জ্বলে নিভে তিনটে জোনাকি পোকা।
আমি চিৎকার করে বলি, কৌটো খুলে ছেড়ে দে! ছেড়ে দে! শ্বাস বন্ধ হয়ে মরে যাবে তো…!
কৌটোর ভেতর থেকে জোনাকি পোকাটা ছেড়ে দেয় শুভদীপ। সে বুঝতে পারে, আমি কেন চেঁচাচ্ছি।
শুভদীপ জানে, আমি সন্ধ্যারাগ পছন্দ করি। নদীর ধারে ডুবন্ত সূর্যটার দিকে তাকিয়ে সেদিন চলছিল সন্ধ্যারাগ। আর এটা ছিল একটা কানিবগীর সন্ধ্যা। বগীটা (লালছে রঙের বক) বসেছিল জলের কোলে। নদীর উজানে কেউ কলার ডোঙায় ফুল আর প্রদীপ ভাসিয়েছিল। ডোঙাটা দুলতে দুলতে ভেসে আসছিল। প্রদীপটা জ্বলছিল ঢেউয়ে ঢেউয়ে ডোঙায়। বাতাসে খেলা করছিল শিখাটা।
আমি শিখাটার দিকে তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকি।
কিন্তু মুহূর্তেই শুভদীপ একটা ঢিল ছুঁড়ে দেয় কানিবগীটার ওপর। ডোঙায় ভেসে আসা প্রদীপটার ওপর দিয়ে কানিবগীটা পাখনা ঝাঁপিয়ে আস্তে করে উড়ে যায়। বাতাসে দুলে উঠলো শিখাটা। আমি পেছনে মুখ ফিরিয়ে রাগে কটমট করে শুভদীপের দিকে তাকাই।
বলি, কানিবগীটার কী দোষ ছিল? কেন ঢিলটা ছুঁড়ে মারলি?
শুভদীপ নিরুত্তর। আমি ঝগড়া বাধিয়ে দিই শুভদীপের সঙ্গে। ওর গালে ঠাস করে একটা চড় মেরে দিই। আমার গালেও একটা মেরে দেয় শুভদীপ। তারপর হাসতে থাকে। আমিও হাসতে থাকি।
আমরা মাঠে মাঠে কুড়াতে থাকি শৈশব। প্রতিদিন বিকেলবেলা ছুটতে থাকি ফড়িঙের পেছনে। নদীর কোলে কোলে প্রজাপতির পাখনার পেছনে পেছনে আমরা ছুটছি…। বেড়ার ধারে ছিল একটা মৌরির খেত। ফুটে রয়েছে থোকা থোকা হলুদ মৌরি ফুল। ম ম করা মৌরি ফুলের ঘ্রাণ আমার নাকে এসে লাগছে! যেন গন্ধের সুড়সুড়ি লাগছে নাকে।
এ-ফুল ও-ফুলে ভনভন করে ছুটছে ভ্রমর। ফড়িং আর প্রজাপতিরা উড়ছে। ফুলে ফুলে ঘুরছে পোকারা। হালকা বাতাসে গুনগুন একটা গুঞ্জন উঠছে। খুব মিহি চিকন একটা স্বর বইছে। একদম অন্যরকম স্বর। আমি তন্ময় হয়ে কান পেতে থাকি স্বরটার ওপর। মুহূর্তেই শুভদীপ দৌড়ে এসে মৌরি খেতের বেড়াটার ওপর হোঁচট খেয়ে পড়ল!
খেতের আইলের পাশে গড়াগড়ি খেয়ে শুভদীপ চিৎকার শুরু করে দিল। বাবা রে! মরলাম…। ও মা গো…।
শুভদীপের পায়ের বুড়ো আঙুলটা চোট পেয়ে কেটে গেছে বাঁশের ছিলকায়। ফিনকি দিয়ে লাল রক্ত বেরুচ্ছে! আমি দ্রুত আমার গায়ের গেঞ্জিটা ছিঁড়ে ওর কাটা আঙুল বেঁধে দেয়ার চেষ্টা করি। শুভদীপ ব্যথায় ইস ইস করে। বলে, বাবা রে! মরলাম!
আমি বলি, ধেৎ! এত ইস ইস করস ক্যান? মরলাম! কই মরলি?
শুভদীপ হেসে ওঠে বলে, ব্যথাটা তুই পাসনি তো। পাইলে বুঝতি। ও-রে বাবা রে…!
আমি বলি, হয়েছে। এই-যে তোর ব্যথাটা শেষ হয়ে গেল। থাম এবার। আমি শুভদীপের কাটা আঙুলটা ভালোমতো ব্যান্ডেজ করে দিই। শুভদীপ ব্যান্ডেজ করা আঙুলের ওপর তাকিয়ে বলে, তুই এত সুন্দর করে ব্যান্ডেজ বাঁধতে পারিস!
আমি বলি, আ রে গাধা! তোর আঙুল কেটেছিস। এটা কি বেঁধে দিতে হবে না?
শুভদীপ আমার কথা শুনে মুখ ভেংচিয়ে হাসে।
বলি, তোর মুখ ভেংচানোর কী সময় নেই! এতটা চোট পেয়ে তোর পায়ের আঙুল কেটে গেল। তবুও তোর মুখ ভেংচানো গেল না!
আসলে এটা ওর বাজে অভ্যাস! কাউকে দেখলেই সে মুখ ভেংচায়। কখনো সে জিব বের করে কালীমূর্তীর মুখ বানায়। কখনো চোখের পাতা উল্টে দিয়ে চোখ-মুখ বিকৃত করে প্রেত সেজে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে।
আমি বলি, রাখ তোর এসব ফাজলামো! এজন্যেই তো পা-টা কেটেছিস। এখন ভালো ছেলের মতো খেতের আইলের ওপর বোস। বিশ্রাম কর। কিন্তু কে শোনে কার কথা!
আমিও আবার দৌড়ে গিয়ে ঢুকে পড়ি মৌরির খেতে। শুভদীপ খোঁড়াতে খোঁড়াতে আমার পিছু পিছু আসে। আসলে এই খেতটার চারদিকে ঘের দিয়ে ছিল মৌরি গাছের পাঁচটি সারি। আমার গলা সমান উঁচু। মাঝখানে বড় একটা মরিচ খেত। লাল লাল পাকা মরিচ ঝুলে রয়েছে গাছে-গাছে। সমস্ত খেতজুড়ে লালে লাল রং!
অদূরেই একটা লাল পরীকে এদিকে ছুটে আসতে দেখা যায়। দৌড়াতে দৌড়াতে লাল ফ্রক পরা পূরবী এদিকে চলে আসে। পূরবী আমাদের খেলার সাথি। সে চিৎকার করতে করতে হৈ চৈ বাধিয়ে এসে ঢুকে পড়ল মরিচ খেতে।
কিন্তু আমার চোখ মৌরি ফুলে। আমি মৌরি ফুল ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখি। কী সুন্দর ফুটে থাকা থোকা থোকা হলুদ রঙের মৌরি ফুল। আমি একটা কাঁচা সবুজ মৌরির থোকা ছিঁড়ে কিছু মৌরি পুরে নিই মুখে। কিছু মৌরি হাফপ্যান্টের পকেটে রাখি। কী ঘ্রাণ আর কাঁচা মৌরির স্বাদ! দু-চিমটি মৌরি আমি শুভদীপের হাতে দিই। পূরবীর হাতে দিই আরও দু-চিমটি মৌরি। তারপর বলি, চিবিয়ে নে। খেয়ে দেখ কী মজা! আমরা মৌরি চিবাতে চিবাতে খেতের আইল ধরে হাঁটি। কখনো ছুটাছুটি করে দৌড়াই নদীর ধারে।
হঠাৎ আমার চোখ পড়ল, আকাশে উড়তে থাকা দুটো চিলের দিকে। চিল দুটোর ঘাড়, গলা, বুক ও পেট একদম ধপধপে সাদা। পালক গাঢ় খয়েরী রং! আমি অভিভুত হয়ে উড়ন্ত চিলের দিকে তাকিয়ে থাকি। ডানা মেলা চিল দুটো দেখিয়ে পূরবী ও শুভকে বলি, ওই-যে দেখ, কতো সুন্দর দুটো চিল মাথার ওপর চক্কর দিচ্ছে। দেখ এরা কতো উঁচুতে উঠেছে রে!
পূরবী হা করে তাকিয়ে থাকে চিলের দিকে। শুভদীপও চিলগুলো দেখে। তারপর বলে, জানিস এরা শঙ্খচিল। শঙ্খচিলেরা উড়তে উড়তে আকাশের মেঘ ছুঁয়ে ফেলতে পারে। এই চিলেরাই তো মেঘগুলো নিচে নামিয়ে আনে।
বলিস কি! আমি বলি।
শুভদীপ বলে, হ্যাঁ। দিদিমার কাছে কতো শুনেছি শঙ্খচিলের গল্প।
বল তো শুনি।
শুভদীপ বলতে শুরু করে। পুরো চৈত্র মাস জুড়ে যখন দিনের পর দিন খরা পড়ে। শুকনো সব মাঠ ঘাট। সারা মাঠ জুড়ে মাটিতে বড় বড় ফাটল। ঘাসগুলোও শুকিয়ে মরে যায়। বৃষ্টি নেই এক ফোঁটাও। চাতক পাখিরা তখন বৃষ্টির জন্যে হা করে তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে।
শঙ্খচিলেরা তখন উড়তে উড়তে আকাশ ফুঁড়ে মেঘের পাহাড়ে গিয়ে ওঠে বসে। আর এই চিলেরা শক্ত ঠোঁট দিয়ে মেঘের ওপর ঠোকর দিতে থাকে। তখন বড় বড় মেঘের দলাগুলো গলতে শুরু করে। অন্ধকার হয়ে আসে সমস্ত আকাশ। দক্ষিণ দিক থেকে প্রবল বেগে ছুটে আসে ঝোড়ো বাতাস। শুরু হয় কালবৈশাখীর ঝড়। অমনি ঝুমঝুম করে শুরু হয় বৃষ্টি। মুহূর্তের এক ঝটকা বৃষ্টিতে পুরো পথ-ঘাট ভিজে একশা। তখন ভেজা ধুলির কী উগ্র গন্ধ ছড়ায় জানিস!
পূরবী হা করে তাকিয়ে শুভদীপের গল্প শুনে। তারপর বলে, হ্যাঁ, তাই হবে হয়তো। শঙ্খচিলেরাই তাহলে বৃষ্টি নামায়।
আমি বলি, ধুর! আজগুবি গল্প তোর! শঙ্খচিলেরা কী কোনদিন মেঘের দেশে যেতে পারে? আকাশের কোলে হাতি আর মোষের মতো বড় বড় মেঘের পাহাড়! এসব মেঘের পাহাড় কী এত ছোট চিলেরা ঠোকর দিয়ে গলাতে পারবে? তোর দিদিমার যা গল্প! আমি বিশ্বাস করি না।
তারচে এসব ভুয়া গল্প ছেড়ে চল, আমরা ঝড়ের দিনের আম কুড়ানোর জন্য প্রস্তুতি নিই।
২
তারপর একদিন জ্যৈষ্ঠের আকাশ ছিঁড়ে ভীষণ বেগে ঝড় আসতে শুরু করল। আমরাও প্রস্তুতি নিচ্ছি আম কুড়ানোর জন্যে। আমাদের সঙ্গে আজ পূরবীও যাচ্ছে। আমরা দৌড়াতে দৌড়াতে যাচ্ছি দত্তদের আমগাছ তলায়। এ গাছটির আম বড় বড়। ভারি মিষ্টি। পাকা সিঁদুরে আম! স্বাদে ও গন্ধে কী দারুণ! একেবারে টসটসে রসে ভরা আম। এ আম হাতে নিয়ে খেলে কনুই বেয়ে রস পড়ে। কিন্তু একটা আম চাইলেও পাড়তে দেবে না টাক পড়া বুড়ো মাধব দত্ত!
অতএব আমাদের ভরসা জ্যৈষ্ঠের বড় ঝড়। তখন ধুপ ধুপ করে আম পড়তে শুরু করেছে গাছতলায়। কোনো আম জঙ্গলের ঝোপের ভেতরে পড়ছে। কোনো আম ঘাসের ওপর পড়ছে। কোনটা ওদিকে গড়িয়ে ডোবার ভেতরে পড়ছে। আমি দুটো পাকা আম খুঁজে পাচ্ছি না। আম দুটো ঝোপের ভেতর হারিয়ে গেল। পূরবী আম কুড়াতে কুড়াতে দ্রুত আমগুলো ফ্রকের ভেতর ভরছে। আমিও পূরবীকে বলি, আমগুলো তুলে নে তাড়াতাড়ি। বুড়ো মাধব দত্ত এখন নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে না-কি এসে পড়ল রে…! পূরবী তাড়াতাড়ি কর। কিন্তু পাঁচ-সাতটা আম কুড়াতেই পূরবীর ফ্রকের তলা ঢোল!
শুভদীপের মাথায় ছিল একটা লাল গামছা। সে গামছাটা মেলে ধরল। আমি আর শুভদীপ গামছায় তুলে নিচ্ছি পাকা পাকা আম। ধুপ ধুপ করে গাছ থেকে আম ঝরে পড়ছে। লাল লাল সিঁদুরে আম। ঝোড়ো বাতাসে পুরো গাছটাই যেন ভেঙে পড়ে। গাছের ডালগুলো বাতাসে এদিক-ওদিকে দুলছে। আমার মাথার ওপর কোনো আম পড়ে কি-না। আমি মাথায় হাত দিয়ে ঝোপের ভেতর থেকে আম কুড়াতে থাকি। দেখতে দেখতে পুরো গামছা ভরে গেল পাকা আমে।
আম কুড়ানো শেষ হলে, আমরা দৌড়ে এসে নেমে পড়ি দত্ত বাড়ির পুকুরে। তখন ধুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জলের ওপর বড় বড় হয়ে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো পড়ে জলের ওপর যেন এক একটা চেপটা দাগ বসে যাচ্ছে। আর মুহূর্তে মিলিয়ে যাচ্ছে জলের দাগ। আমরা খুশিতে হাত-পা ছোড়ে সাঁতার কাটতে শুরু করি। সারা পুকুরজুড়ে এদিক-ওদিকে ছুটে সাঁতার কাটছি। মাথার ওপর ঝুমঝুম বৃষ্টি পড়ছে। কিন্তু হঠাৎ মনে হচ্ছে, পুকুরের সমস্ত জল যেন সেদ্ধ করা কুসুম গরম জল! এই জলে ডুবে থাকতে কি-যে আরাম লাগছে!
আমি না চাইলেও জলকেলি শুরু করে দেয় শুভদীপ। পূরবীও পানি ছিটায় আমার দিকে। আমরা জলকেলি করে তোলপাড় তুলি জলে। আমিও পানি ছোড়ে দিই পূরবীর গায়ে। পূরবী কিছু বুঝে ওঠার আগেই, আমি দুষ্টুমি করে ডুব দিয়ে ধরে ফেলি পূরবীর ঠ্যাং। পূরবী ভয়ে চিৎকার দিয়ে যেন জলেই মূর্ছা যায়! আমি মুহূর্তে মুখ তুলে ভেসে উঠি পূরবীর চোখের সামনে। একদম ওর থুতনির তলায় আমার মুখ!
এবার হাসতে থাকে পূরবী। বুঝতে পারে, আমিই ওর পা-দুটো খামচে ধরেছিলাম। সে ভেবেছিল, কোনো কাছিম হয়তো খামচে ধরেছে ওর পা।
আমরা এবার শুরু করে দিই ডুবডুবি খেলা। কে কতক্ষণ জলের তলায় ডুবে থাকতে পারে। যে সবার চেয়ে বেশি সময় ডুবে থাকতে পারবে তার জিত। অন্যেরা হারবে। আমরা একসঙ্গে চোখ কান বন্ধ করে ডুব মেরে দিই জলের তলায়। আর আমি ভেসে উঠি সবার আগে। তারপর ভেসে ওঠে পূরবী। আর শুভদীপ জিত পেয়ে জলের ওপর হাত-পা ছোড়ে চিৎকার করতে থাকে।
আবার… আবার… বলে খুশিতে চিৎকার করে পূরবী। আমরা ওর চিৎকারে ভ্রক্ষেপ না করে যেমন খুশি হাত-পা ছোড়ে এদিক-ওদিকে ডুবাতে থাকি। পূরবী চিৎকার করে বলতে থাকে, না হবে না, হবে না। ঠিক সেই আগের মতোই ডুবে থাকতে হবে। আবার হার-জিত খেলা হবে। ডুবডুবি খেলা।
আমরা আবার শুশুকের মতো ডুব মেরে দিই জলের তলায়। কিন্তু জলের নিচে যে ঝুমঝুম বৃষ্টির শব্দ শুনতে পাচ্ছি। যেন অন্যরকম একটা শব্দের তরঙ্গ বইছে জলের ওপর। কানে কিরকম যেন একটা ঘুমঘুম শব্দ হচ্ছে। জলে ডুব দিয়ে বৃষ্টির শব্দটা শুনতে কি-যে ভালো লাগছে! কিন্তু আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে যে!
তবুও, এবার আমাকে জিত নিতেই হবে। আমি বুকের ভেতর দম চেপে আরও ডুবে থাকি একটু সময়।
এবার ভেসে উঠে মাথা তুলে তাকাই জলের ওপর। পূরবী আর শুভদীপ কোথায়? পুরো পুকুর যে ফাঁকা! কেউ নেই। ওরা ভেসে উঠছে না কেন!
আমি অপেক্ষা করি ওদের ভেসে ওঠার জন্যে। কিন্তু না, পূরবী মাথা তুলছে না জলের তলা থেকে। সে ভেসে উঠছে না! শুভদীপও ভেসে উঠছে না। কেন ওরা ভেসে উঠছে না?
আমি ভয় পেয়ে চিৎকার করে ডাকি, পূরবী… শুভ…। আবার ডাকি, পূরবী… শুভ…। কোনও সাড়া শব্দ নেই!
একদম নিঝুম! সমস্ত পুকুর ফাঁকা। পুকুরটা ঘিরে যেন ভুতুরে অন্ধকার নামছে! হঠাৎ একটা ভয়ঙ্কর বজ্রপাতের শব্দ হলো! এই বুঝি আমার মাথার ওপর পড়ল বজ্রটা! আমি ভয়ে জড়সড় হয়ে জমে যাচ্ছি জলে। বিজলি চমকাচ্ছে। তীব্র বেগে ঝোড়ো বাতাস বইতে শুরু করেছে। বারবার বাতাসের ঝাপটা এসে শক্ত ঝাপট মারছে জলের ওপর। মুহূর্তে ভয়াবহ একটা ঝড়ের তাণ্ডব শুরু হয়ে গেল।
আমি ভীষণ জঙ্গল ঘেরা পুকুরটার পূর্বপাড়ে তাকাই। ঝোড়ো বাতাসের ঝাপটায় জঙ্গলের বাঁশগুলো একবার পুকুরের ওপর নুয়ে পড়ছে, আরেকবার আকাশের দিকে উঠছে! যেন কোনো দৈত্য পড়ছে বাঁশঝাড়ের আগায়! ভীষণ রকম তা-ব চালাচ্ছে ঝড়ের দৈত্যটা। আর বাঁশগুলো পুকুরের জলের ওপর নাকানি-চুবানি খেয়ে একবার উপরের দিকে উঠছে, আরেকবার নিচে জলের ওপর পড়ছে!
আমার বুকটা ধুকধুক করতে থাকে। তাহলে কী পূরবীরা জলের তলায় ডুবে মরল! কোনো দৈত্য না-কি জলপরী এসে ওদের টেনে নিয়ে গেল! আমি ভয় পেয়ে পূরবী পূরবী… শুভ শুভ… বলে কাঁদতে শুরু করি। হঠাৎ মনে হলো, আমার পায়েও কী খামচে ধরবে কেউ! আমাকেও কি টেনে নিয়ে যাবে জলপরীরা! বাঁশঝাড়ের আগা থেকে আমার ওপর কী ঝাঁপিয়ে পড়বে ঝড়ের দৈত্যটা! আমি হাঁপাতে হাঁপাতে প্রাণপণ পুকুরের পানি বুকে ঠেলতে ঠেলতে তীরে এসে উঠি। এদিক-ওদিক তাকাই। নেই শুভদীপ। পূরবীও নেই। তাহলে! শুভদীপ আর পূরবী মরে গেছে রে…!
শুভদীপ ও পূরবীর মাকে খবরটা জানাতে হবে। ওরা দু’জন পুকুরের জলে ডুবে মরে গেছে…!
শুভদীপ আর পূরবীর জন্যে আমি কাঁদতে কাঁদতে দৌড়াতে দৌড়াতে শুভদীপদের বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়াই।
এ আমি কী দেখছি! এ-যে শুভদীপ! ঘরের দাওয়ায় ওঠে শুভদীপ ভেজা হাফপ্যান্ট পালটাচ্ছে! দু’ঘর পরে, আঙিনায় মানকচু গাছটার বড় বড় পাতার আড়ালে পূরবীকেও দেখা যায়! সে গায়ের ফ্রক পালটাচ্ছে। আর মুহূর্তেই একি! হঠাৎ একঝলক পূরবীর ফরসা উদলা বুকটা দেখা গেল। আমি চমকে উঠি। কিন্তু পূরবীর বুকে এ দুটো কী! আমি দু’হাতে চোখ মুছে আবার তাকাই।
আমাকে দেখেই হাসতে থাকে শুভদীপ। আমি কাঁদতে থাকি শুভদীপের দিকে চেয়ে। বলি, আমাকে পুকুরে একা ফেলে তোরা চলে এলি কেন?
তোকে ভয় দেখাতে মজা করেছিলাম।
শুভদীপের কথা শুনে আমার চোখ ফেটে আরও কান্না আসে। আমি কান্না থামিয়ে, শুভকে একটা শক্ত বকা দিয়ে ধুম বৃষ্টির ভেতর দৌড়াতে দৌড়াতে বাড়ির দিকে ছুটি।
