মিলি ও মৌচাক
অন্বেষা রায়
মালতিমাসি বলে,
“মৌমাছিরা ভগবানের সঙ্গে কথা বলে। যা বলবে ওদের, ঠিক পৌঁছে দেবে ভগবানের কানে। বিশ্বাস না হয় পরীক্ষা করে দেখো।”
মিলি মৌচাকটার দিকে তাকিয়ে মালতিমাসির কথাটা ভাবতে লাগল। মৌমাছিরা বললেই কি ভগবান চট করে সারিয়ে দেবেন বাবাকে?
বাবার অসুখটা যেমন বিচ্ছিরি, নামটাও তেমনই খটোমটো। কিছুতেই উচ্চারণ করতে পারে না মিলি। অথচ মা কেমন অনায়াসে বলছে সকলকে। সেরোনেগেটিভ স্পন্ডাইলোআরথ্রোপ্যাথি। এমন ভয়ঙ্কর অসুখ, যে ব্যথায় মিলির বাবাকে শয্যাশায়ী করে দিয়েছে। কবে সারবে বুঝেই উঠতে পারছেন না ডাক্তারবাবুরা। বাবা আর আগের মতো কারখানায় যায় না। হাসপাতালে শুয়ে থাকে দিনের পর দিন। সেরোনেগেটিভ স্পন্ডাইলোআরথ্রোপ্যাথি। মিলি ঠোঁট নেড়ে নেড়ে উচ্চারণ করার চেষ্টা করে, কিন্তু এত বড় নাম মনে রাখাটাই কি কম কঠিন? মিলি পারে না। মিলির মা পারে।
পাড়ায় সবাই জানে, মিলির মা ইংরেজি জানে। সবাই বলে, মিলির মায়ের মতো সুন্দরী এলাকায় দ্বিতীয়টি নেই। সবাই অবাক হয়ে ভাবে, কেন ইংরেজি জানা অসাধারণ সুন্দরী এই মেয়েটি অমন অতিসাধারণ ছেলেটিকে বিয়ে করল। ভাবতে ভাবতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তারা। তারপর মিলির চিবুক নেড়ে বলে,
“যাক গে যা হয়েছে ভালই হয়েছে। সৌজন্যা আর রণ বিয়ে না করলে আমরা মিলিকে পেতাম নাকি?”
ছোট্ট মৌচাকের গায়ে বিনবিন করছে মৌমাছির দল। মিলি চোখ ফেরাতে পারে না। ওর সবুজ হাওয়াই চটি ডিঙিয়ে খাবারের খোঁজে পিঁপড়েরা এদিক ওদিক করে। মশারা পায়ের নরম চামড়ায় হুল ফুটিয়ে রক্ত শুষে নেয়। মিলি হাতের ঝাপটায় তাদের উড়িয়ে দেয় কিন্তু মৌচাকের সামনে থেকে সরে না। ছোট আর সুন্দর চাক। গাছের সঙ্গে মানানসই। বুঝিবা তার সঙ্গেও মানিয়ে গেছে। যেন মিলি পূর্ণাঙ্গ মৌচাকটিকে মুগ্ধ চোখে দেখবে বলেই মৌমাছিরা এক হাত সমান লম্বাটে চাক গড়েছে। দূর দূরান্তের বাগান থেকে বিন্দু বিন্দু মধু এনে জমা করছে চাকটায়।
প্রতিদিন সকালে মিলির খাবার গুছিয়ে রেখে মা যান হাসপাতালে। বাবার কাছে। পরিচিত মানুষদের বলে যান,
“মেয়েটাকে একা রেখে গেলাম, একটু দেখো।”
মায়ের সেই কথা মিলির চোখ ভিজিয়ে যায়। মিলির মনে হয়, যদি মা তার মতো ছোট্ট আর সে মায়ের মতো বড় হত তাহলে এক্ষুনি ছুটে গিয়ে মাকে বুকে জড়িয়ে ধরত। মায়ের কুচকুচে কালো চুল ভর্তি মাথাটা বুকে চেপে হাত বুলিয়ে বলত,
“চিন্তা কোরো না মা। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি তো আছি।”
কিন্তু মা যে এখনও মিলিকে ছোট্ট ভাবেন। মিলির যে সাত বছর বয়স সেটা যেন কথার কথা।
তিনকোণা, মধুভরা মৌচাকটার সামনে এসে দাঁড়ালে মিলি ভুলেই যায় যে সে বাড়িতে একা আছে। তবু মায়ের কথায়, কত মানুষ আসেন মিলির খোঁজ নিতে। তারা দেখেন মিলি কখনও দাঁত মাজতে মাজতে, কখনও খাবার খেতে খেতে কখনও বা একটা ফল হাতে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে মৌচাকের সামনে। যেন মৌচাক নয়, বিশ্ব ব্রম্ভান্ড। দেখে দেখে দেখা ফুরায় না।
কাগজ বিলি করতে এসে গদাইকাকা এক মুহূর্ত থামেন মিলির সামনে। বলেন,
“সাবধান মিলি। ওরা কিন্তু যেকোনও সময় আক্রমণ করতে পারে। মৌমাছির হুল বড় সাংঘাতিক। একবার ফুটলে সেই হুল আর বেরোবে না শরীর থেকে। হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।”
মিলি অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে মৌচাকের দিকে। যারা নাকি ভগবানের সঙ্গে কথা বলে, তারাই আবার হুল ফোটায়? এও কি হয়? তা হতেও পারে। ভগবান কি বিশ্বাস করার মতো লোক? এই তো সেইদিন মা কাঁদতে কাঁদতে মাসিকে বলছিল,
“ভগবানের এ কেমন বিচার জানি না রে দিদি, বাড়ির অমতে বিয়ে করেছি বলে এত বড় অভিশাপ?”
মায়ের কথায় একটা জিনিস স্পষ্ট বুঝেছে মিলি। ভগবানের বুদ্ধিসুদ্ধি ঠিক নেই। কখন কী করেন। অথচ মালতি মাসির মতো আরও সকলে বিপদে পড়লে এই ভগবানের কাছেই ছুটে যায়। আশ্চর্যের কথা, মিলির মাও যান। সঙ্গে যায় মিলি। ওর মা যখন মাথায় আঁচল দিয়ে চোখ বুজে অশ্রাব্য স্বরে প্রার্থনা করেন তখন মিলি ভগবানের কাছে কিছু চাইতে ভুলে যায়। সে অপলক চোখে কেবল মাকে দেখে যায়। তার সুন্দরী মা। তার সাহসী এবং যোদ্ধা মা।
পাশের বাড়ির বিভাকাকিমা, মিলি খেয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করতে আসেন প্রতি দুপুরবেলা। বিভাকাকিমার যেমন স্বভাব, কোনও কাজে এবাড়িতে এলেই হাতে ঢাকা দেওয়া বাটি নিয়ে আসেন। সেই পাত্রে ডাল, শুক্তো, চচ্চড়ি বা এক টুকরো মাছ, যা খুশি থাকতে পারে। সেই বাটি রান্নাঘরে রেখে এসে মিলির পাশে এসে দাঁড়ান কাকিমা।
মৌচাকের দিকে বড় বড় চোখ করে বলেন,
“জানিস মিলি, খাটি মধু একশ বছর অবধি ভাল থাকে।”
একশ বছর কত বছর সে আন্দাজ মিলি কিছুতেই ঠাহর করতে পারে না। বছর মানে আগে ছিল নতুন ক্লাসে ওঠা। এখন স্কুল বদলের পর, লেখাপড়াও বদলে গিয়েছে। তার নতুন স্কুলে দিদিমণি আসেন না সবসময়। কার জন্য আসবেন? স্কুলে যে মোটে দশজন ছাত্র। নোনা ধরা দেওয়াল, ভাঙা চেয়ার টেবিল আর মাকড়শার জালে ঢাকা বোর্ডটা যেন ফাঁকা মাঠের মাঝে মস্ত একটা আবর্জনার স্তূপ।
সেই স্তূপের ভেতর ধোয়াকাচা ফ্যাকাশে জামা পরে, বইখাতা হাতে প্রতিদিন ঢুকে পড়ে মিলি ও তার বন্ধুরা। লেখাপড়া নিজে থেকে যা করে, তাই হয়। নতুন কিছু কেউ শেখাতে আসে না বিশেষ। তাই এক বছরের অন্য বছরে বদলে যাওয়া চট করে ঠাহর হয় না।
২
বনবিভাগে কাজ করেন সুধীর মল্লিক। অফিস যাওয়ার পথে মিলিকে বললেন,
“এই মৌচাক আর বেশিদিন নয় মিলি। রঙ গাঢ় হয়ে এসেছে। টলটলে ভাবটাও কমতির দিকে। মনে হচ্ছে এবার খুব তাড়াতাড়ি চলে যাবে মৌমাছিরা।”
সুধীরকাকার কথায় চিন্তিত হয়ে পড়ে মিলি। কোনও এক সকালে উঠে যদি দেখে মৌচাক ছেড়ে চলে গিয়েছে সব মৌমাছি, তখন? সে দ্রুত চিন্তা করে নেয়। মৌমাছিরা চলে গেলে, শুকনো চাকটা সে ঘরে নিয়ে যাবে। বাবা হাসপাতাল থেকে এলেই দেখাবে। হাসপাতালে যাওয়া মিলির নিষেধ। মা বলে ছোটদের ওখানে যেতে নেই। তাছাড়া হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে মা কাজে যায়। কয়েক বাড়ি রান্না করে। দত্ত স্টোর্সের পেছনে একফালি ঘরে ঘাড় গুঁজে শাড়ির ফল পিকোও করে।
দত্ত স্টোর্সের মালিক প্রতীক দত্ত মিলির বাবার ছোটবেলার বন্ধু। বাবার মতো চেহারা। হাবভাব সিনেমার নায়কের মতো। যেদিন যেদিন কাজ শেষ হতে দেরি হয়ে যায়, প্রতীক দত্ত মিলির মাকে স্কুটারে বসিয়ে বাড়ি অবধি পৌঁছে দিয়ে যায়।
মা হাসপাতালে বেরিয়ে গেলে, মিলি একা একা স্নান করে, ভাত খেয়ে স্কুলে যায়। নতুন ক্লাসের পুরনো বই, মা জোগাড় করে এনেছে পাড়ার উঁচু ক্লাসের ছাত্রীদের থেকে। মিলি সেই বই পড়ে সমস্ত মন দিয়ে। তবু কিছুক্ষণ পর অক্ষরগুলো মৌমাছি হয়ে ঘুরে বেড়ায় চোখের সামনে। সেইসব অক্ষরমাছি উড়ে উড়ে সারি বেঁধে একের পর এক ছবি আঁকে। ফুল, গাছ, মালতিমাসির মুখ আবার কখনও স্কুটারের পেছনে বসে থাকা মাকেও। মায়ের বা হাত জাপটে ধরে আছে কোলে বসানো শাড়ির বিশাল পোটলাটাকে। আরেকটা হাত, পাখির ফেলে যাওয়া পালকের মতো রাখা প্রতীককাকুর কাঁধে।
ছবিটা গড়েই আবার ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় মৌমাছিরা। শুধু প্রতীককাকুর কাঁধে রাখা হাতটা এঁকেছিল যারা, তারা থেকে যায়। মিলি তাদের দিকে তাকিয়ে বসে থাকে চুপচাপ। ওর বন্ধু কুনুইয়ের খোঁচা দিয়ে বলে,
“কাল ছুটি। শুনেছিস? আমি বাবার সঙ্গে কলকাতা যাব। পয়লা বৈশাখের বাজার করতে হবে।”
মিলি, বন্ধুর কথার জবাব দেয় না। নতুন জামা পুজোতে একটাই হয় তার। পয়লা বৈশাখ চুপিচুপি আসে আবার চুপি চুপি চলেও যায়।
আজ সেই ছুটির দিন। স্কুলে যাওয়া নেই বলে সকাল থেকে মৌমাছিদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে মিলি।
বেলা বাড়লে বাদল পাগলা বেরিয়ে এল ওর আস্তানা ছেড়ে। মিলির দেখাদেখি অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল মৌচাকের দিকে। বলল,
“মৌমাছিদের জন্য মানুষ বেঁচে আছে। মৌমাছিরা না থাকলে, মানুষও থাকতে পারবে না।”
বাদল পাগলার কথা শুনে, ঘাড় ঘোরায় মিলি।
মিলির হাতে পেয়ারা। বাদল ওর দিকে তাকিয়ে হাসে। মিলি ভাবে, বাদল পাগলার অনেক জ্ঞান। পড়তে পড়তেই না এই হাল। সারাদিন পড়ত। স্নানের সময়, খাওয়ার সময়, এমনকি বাজার করার সময়েও বাদলের হাতে বই খোলা থাকত।
বাদল পাগলাকে কেউ পছন্দ করে না। সে যখন তখন ঢুকে পড়ে এর ওর বাড়ি। খাবার চুরি করে।
মিলি হাতের পেয়ারাটা বাদলকে দিল। পেয়ারা পেয়ে বাদল খুশি খুশি গলায় বলল,
“মৌমাছিরা খুউউব ভাল। তোমার মতো। হে হে।”
বাদল পাগলা চলে যেতেই মিলি বাবার অসুখের নামটা বলার চেষ্টা করল। সসসসস্পনননডাই…
সে মৌমাছিদের উদ্দেশ্য করে মনে মনে বলে,
“ভগবানকে বলো না, বাবাকে সারিয়ে দিতে।”
মনে মনে ভাবে, যাদের মধু একশ বছর ভাল থাকে, যাদের হুল মানুষের শরীরে একবার ঢুকলে আর বেরোয় না, তাদের কথা কি ভগবান শুনবেন না? হয়তো মানুষের কথা শুনবে বলেই ওদের পৃথিবীতে আসা। তাই কি সব মৌমাছি চলে গেলে মানুষ বাঁচতে পারবে না?
ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মিলি ভাবে, বাবা সেরে উঠলে মাকে আর কাজে যেতে হবে না। সন্ধে থেকে রাত হওয়ার সময়ও মা ওর পাশেই থাকবে। প্রতীককাকুর স্কুটারে চেপে তাড়াতাড়ি চলে আসতে হবে না।
মৌচাক দেখতে দেখতে এইসব ভাবছে মিলি, ঠিক তখনই ফটাস করে, কোল্ডড্রিংকসের ঢাকনা খোলার মতো, চৌবাচ্চার আড়াল থেকে একেবারে মিলির সামনে চলে এল পাপান। খোঁচা খোঁচা চুলগুলো আকাশের দিকে মুখিয়ে আছে। চোখের ভেতর মণিটা বাগাডুলির বাক্সে আটকে পড়া গুলির মতো এদিক ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছে। হাতে একটা ঝকঝকে লাল বাস।
পাপান বড় হয়ে বাস চালাতে চায়। পাপানের বাবা সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার।
মিলিও ভেবেছিল পশুপাখিদের ডাক্তার হবে। কিন্তু বাবার অসুখের পর থেকে নতুন করে ভাবছে। মানুষের ডাক্তার হলে বাবার ঐ খটরমটর অসুখটা সারিয়ে দিতে পারবে। ডাক্তারকাকু বলেছেন এ রোগের চিকিৎসা এখানে হবে না। চেন্নাই যেতে হবে। কিন্তু বাবা যে বিছানা থেকে উঠতেই পারছে না। তাছাড়া মাকে সে বলতে শুনেছে, চেন্নাই যাওয়া অনেক খরচের ব্যপার।
যেদিন কালবৈশাখীর সঙ্গে বৃষ্টি নামল তুমুল, মা আর প্রতীককাকু বাড়ি ফিরল কাকভেজা হয়ে। স্কুটারের শব্দে বিভাকাকিমাদের বাড়ি থেকে ছুট্টে চলে এসেছিল মিলি।
আলমারি থেকে বাবার গামছা আর শুকনো জামা প্রতীককাকুর দিকে এগিয়ে দিতে দিতে মা বলেছিল,
“চা বসাচ্ছি। লিকার চা তো? চিনি ছাড়া?’
প্রতীককাকু মায়ের দিকে তাকিয়ে মাথা হেলিয়েছিল। মিলি কেন কেজানে শক্ত করে ধরেছিল মাকে। যেন ছেড়ে দিলেই তলিয়ে যাবে মা। মায়ের এখন টাকার দরকার। মায়ের এখন বাবাকে সুস্থ করে তুলতেই হবে খুব তাড়াতাড়ি।
বাবার জামাপ্যান্ট পরে প্রতীককাকু যখন বেরিয়ে এল, মাও ঠিক তখনই চায়ের ট্রে হাতে ঘরে ঢুকেছিল। বাবার কাপে চা, সঙ্গে বাটিতে মুড়ি আর ছোলা। ঠিক বাবা যেমন খেত কাজ থেকে ফিরে।
প্রতীককাকু, মায়ের হাত থেকে চায়ের কাপ তুলে নিতে নিতে বলেছিল,
“এতসব কী আবার?”
মা মুচকি হেসে বলেছিল,
“এতসব কিছুই না। শুধু চা খাবেন নাকি?”
মিলির মাকে হাসলে কত যে চমৎকার দেখায়, সেকথা বলে বোঝানো মুশকিল। কিন্তু সেদিন মাকে হাসতে দেখে খুব রাগ হয়ে গিয়েছিল মিলির। সে চিৎকার করে বলেছিল,
“মা, বাগানে চলো না মৌচাক দেখাব। চলো না। চলো না।”
বলতে বলতে গলা ধরে এসেছিল মিলির।
মিলিকে আচমকা এমন বায়না করতে দেখে খুব অবাক গলায় মা বলেছিল,
“এই অন্ধকারে বাগানে কেন যাবি মিলি?”
মিলি সেকথার উত্তর না দিয়ে ঐ একটা কথা কেবল বলেই যাচ্ছিল।
“মা, বাগানে চলো না মৌচাক দেখাব। চলো না। চলো না। তুমি কক্ষনও আমার সঙ্গে বাগানে যাও না। একদম যাও না।”
মা অসহায়ের মতো ওকে শান্ত করার চেষ্টা করছিল। আর বোকার মতো মুখ করে, চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়েছিল প্রতীককাকু।
বায়না করতে করতে কিছুতেই শান্ত হয়নি মিলি। আর তাই একসময় ঠাস করে তার গালে চড় বসিয়েছিল মা।
মৌচাক দেখে পাপান বলল,
“ওরা অ্যাটাক করলে মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়বি নয়ত তোকে খেয়ে নেবে।”
মিলি জবাব দিল না। পাপান কিছুক্ষণ মৌমাছি দেখে দৌড়ে চলে গেল। যাওয়ার আগে ফিসফিস করে বলল,
“আজ বিভাকাকিমাদের বাড়ি যাবি সন্ধেবেলা?”
বিভাকাকিমাদের বাড়িতে বড় টিভি আছে। পাপানদের বাড়িতেও টিভি আছে কিন্তু সে টিভি দেখার অনুমতি পাপানের নেই। মিলি আর পাপান তাই সুযোগ পেলেই বিভাকাকিমার টিভিতে উকি দেয়।
সেই টিভিতে ধারাবাহিকের নায়িকারা, নায়কদের সঙ্গে ধাক্কা খায়। লজ্জা পাওয়া চোখে তাকায়, ওদের ঝগড়া হয়, ভাব হয় আর একেকদিন সেইসব নায়িকারাও নায়কদের বাইকের পেছনে বসে চলে যায়। যাওয়ার সময় নায়িকাদের হাত থাকে নায়কদের কাঁধে।
পাপান চলে যেতেই চারপাশটা কেমন শান্ত হয়ে এল। মিলির চোখের সামনে বিজবিজে মৌমাছি ভর্তি মৌচাক ছাড়া আর কিছু রইল না। খুব মৃদু একটা ভনভনে শব্দে ঢাকা পড়ে গেল পাখিদের ডাক, গাড়ির শব্দ, রিক্সার প্যাকপ্যাক। মিঠে একটা গন্ধও ভেসে এল হাওয়ায় চেপে। মিলির মনে পড়ল, সেদিন চা না খেয়েই চলে গিয়েছিল প্রতীককাকু। অনেক রাত অবধি কেঁদে, ঘুমিয়ে পড়েছিল মিলিও। সেইদিনের পর আর কোনওদিন মিলিদের বাড়িতে আসেনি প্রতীককাকু।
৩
একমাসের মধ্যেই পাড়ার সবাই চাঁদা তুলে অনেকটাকা জমা করে ফেলল। মিলির মাসিও মাটির ভাঁড় ভেঙে, সমস্ত পয়সা তুলে দিল মায়ের হাতে। আর মিলির মা, কানের, গলার দুটি চিকন গয়না, স্যাকরার দোকান থেকে টাকায় বদলে নিয়ে এল।
রাতে, মিলিকে ভাত মেখে খাওয়াতে খাওয়াতে মা বলল,
“মিলি, কয়েকদিন মাসিরবাড়ি থাকতে হবে মা। বাবাকে নিয়ে আমি চেন্নাই যাচ্ছি। তুমি লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে থেকো কেমন? মলুদাদার সঙ্গে লেখাপড়া কোরো। মিলি অবাক চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে ভাবে, মা কি একা যাবে বাবার সঙ্গে?
প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করতে ভয় হয় তার। যদি মা বলে, মায়ের সঙ্গে প্রতীককাকুও যাচ্ছে, তখন? কী করবে মিলি? স্কুটারের পেছনে, বড় ব্যাগ একহাতে জাপটে, অন্য হাত প্রতীককাকুর কাঁধে রাখে মা। বৃষ্টির দিনে প্রতীককাকু ভিজে গেলে বাবার জামা পরতে দেয় মা। মা কি প্রতীককাকুর সঙ্গেই চেন্নাই যাবে?
বাবার জন্য হঠাৎ খুব মন খারাপ হয় মিলির। সে মাকে জিজ্ঞেস করতে ভুলে যায়, ‘বাবা ঠিক হয়ে যাবে কিনা।’ সে জিজ্ঞেস করতে ভুলে যায়, মা, বাবাকে নিয়ে কবে ফিরবে?’
সে শুধু বড় বড় ফোঁটায় কান্না ঝরায়। মা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন,
“চিন্তা করে না মা। সব ঠিক হয়ে যাবে। সাতদিনের তো ব্যাপার। আমি আছি, প্রতীককাকু আছেন। বাবাকে আমরা সারিয়ে তুলবই। তুমি শুধু ঠাকুরের কাছে…”
মা কথা শেষ করার আগেই খাওয়া ছেড়ে উঠে যায় মিলি। তার ভাল লাগছে না। কিচ্ছু ভাল লাগছে না।
৪
মামাবাড়িতে মলুর মাস্টারমশাইয়ের কাছে রোজ পড়তে বসে মিলি। মাস্টারমশাই তাকে কাজ দেন। মিলি বাবার কথা ভাবতে ভাবতে, পেন্সিলের গোড়া চিবোতে চিবোতে, আকাশের দিকে তাকিয়ে মায়ের কথা ভাবে। ধারাবাহিকের নায়িকাদের মনে পরে তার। আর মনে পড়ে বাবাকে। লেখার কাজ পড়ে থাকে।
একদিন স্যার লিখতে দিলেন, ‘তোমার প্রিয় প্রাণী’। মিলি লিখল মৌমাছি। পাতার পর পাতা লিখে গেল মুখ নিচু করে। খাতা পড়ে, মাস্টারমশাই বড় বড় হরফে লিখলেন,
“চমৎকার!”
সেই লেখায় নাক ডুবাতেই মৌচাকের গন্ধ মনে পড়ল মিলির। কেজানে চাকটা এখন কেমন আছে। কেজানে বাবা এখন কেমন আছেন। মৌমাছিরা কি চলে গিয়েছে এতদিনে? শুকনো চাকটা একইরকমভাবে ঝুলছে বুঝি গাছের ডালে?
মামাবাড়িতে টেলিফোন আছে। মা ফোন করে মিলির সঙ্গে কথা বলেন। অল্প সময়। এসটিডি করতে খরচ অনেক বেশি। সেইটুকু সময়েই মা বলেন, বাবা ঠিক হয়ে যাবে। মিলির চোখে ভাসে সাদা চাদর পাতা বিছানায় শুয়ে থাকা বাবার ছবি। ওর গলা ব্যথা করে। চোখ জ্বলতে থাকে। সে মাকে কিছু বলতে যায়, তার আগেই ওপাশ থেকে ঝাপসাভাবে শোনা যায় প্রতীককাকুর গলা। মায়ের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ফোন নামিয়ে রাখে মিলি।
রাতে তাকে কাঁদতে দেখে মাসি বলেন,
“আর কয়েকটা দিন মিলি, তারপরেই মা চলে আসবে।”
মেসো আর মলুদাদা তাকে বেড়াতে নিয়ে যান। তবু মনটা খুব খুউব খারাপ হয়ে থাকে মিলির।
৫
ঠিক সাতদিনের মাথায়, মা ফিরল বাবাকে নিয়ে। মিলির বাবা পুরোপুরি সুস্থ হয়নি ঠিকই কিন্তু ডাক্তার বলেছেন সেরে উঠবেন। মেসোর সঙ্গে বাড়ি ফিরল মিলি। আনন্দ, রাগ, অভিমান আর কষ্টে মন উথালপাথাল। বাবাকে জড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে কাঁদল সে। বাবা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল গোটা সময়টা। তারপর ব্যাগ থেকে ছোট্ট একটা কাগজে মোড়া পুতুল বার করে, মিলিকে দিল। বলল,
“দেখ তো পছন্দ হয়েছে কিনা?”
বাবার উপহার মিলির পছন্দ হবে না তা কি হয়? মিলি লম্বা করে ঘাড় নাড়ে। তারপরই মনে পরে, আরে! তারও যে বাবাকে কিছু দেওয়ার আছে।
সে এক ছুটে হাজির হয় বাগানে। একি! মৌমাছিরা চলে গিয়েছে। শুকনো চাকটাও যে নেই।
পেয়ারাগাছের নিচে বসে সারা দুপুর খুব কাঁদল মিলি। আজ প্রতীককাকু তাদের বাড়িতেই খাবে। মেসোর হাত দিয়ে অনেক রান্না পাঠিয়েছে মাসি। মা আর প্রতীককাকু মিলে ঘর পরিষ্কার করেছে সারা দুপুর। বাবা মিলিকে বুঝিয়ে বলল,
“মিলি, মৌমাছিরা তো আবার চাক বানাবে। তখন নিও বরং।”
প্রতীককাকু, মা সকলেই বলল কত ভাল ভাল কথা। মিলির কান্না থামে না তবু।
ঘুম থেকে উঠে, বিকেলের সূর্যডোবা আলোয় নিমগাছের সামনে এসে দাঁড়াল মিলি। মা মিষ্টি এনেছে। বাবা বাড়িতে আসার আনন্দে। নিমগাছের ফাঁকা ডাল দুটোর দিকে তাকিয়ে হু হু করে উঠল বুক। নরম গাল বেয়ে জল নামল তরতরিয়ে।
মৌমাছিরা কি আর আসবে এখানে? আর কি বানাবে ছোট্ট একটা চাক?
বাবা কি সত্যিই সেরে উঠবে? নাকি এইভাবেই চলবে?
হঠাৎ তাকে চমকে দিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল বাদল পাগলা। মিলি বেজার মুখে হাতের মিষ্টিটা বাদলকে দিয়ে দিল। এক গাল হেসে বাদল বলল,
“ইঁদুরে মৌচাক খেতে খুব ভালবাসে।”
কথাটা শুনে বুক নিঙড়ে কান্না এল মিলির। বাদল মিষ্টিটা টপ করে মুখে দিয়ে মিলির পাশে বসে পড়ল।
ময়লা দাঁতে হাসি মাখিয়ে বলল,
“তোমার জন্যে একটা জিনিস এনেছি। এই দেখো।”
বলতে বলতে বার করে এনেছে উপহার। মিলির জন্য শুকনো মৌচাক।
আনন্দে বাদল পাগলাকে জড়িয়ে ধরল মিলি। তারপর চাকটা নিয়ে ছুট দিল ঘরের দিকে।
সেইখানে মেঝেতে চা আর মুড়ি নিয়ে বসেছে তিনজন। সৌজন্যা আজ ভারী খুশি। চেন্নাইয়ের ডাক্তার আশার আলো দেখিয়েছেন। নিয়মিত চিকিৎসা করলে সেরে উঠবে রণ। রণও ভারী সুখী আজ। কতদিন পরে নিজের বাড়িতে রাত কাটাবে সে। বউ আর মেয়ের সঙ্গে। প্রতীক মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে বাল্যবন্ধু আর তার স্ত্রীর দিকে। একসময় তার উদ্যোগেই এক হয়েছিল এই দুই কপোত কপোতী। যত বিপদই আসুক এই বন্ধুর ওপর, স্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে রক্ষা করবে সে তাদের।
আচমকা পায়ের শব্দে মুখ ঘোরায় সবাই। ঝলমলে হাসি নিয়ে দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে মিলি। তার হাতে শুকনো মৌচাক। মধুর গন্ধে ম ম করছে চারিদিক। মৌমাছিরা লক্ষ লক্ষ মঙ্গলকামনা নিয়ে উড়ে গিয়েছে ঈশ্বরের কাছে।
