ভিন্ন প্রতিবিম্ব
তানিয়া সুলতানা
দূরের আবছা ফসলের ক্ষেতিজমির ওপর কোথাও লুকিয়ে আছে মাঝ ডিসেম্বরের সূর্যটা। কিছুক্ষণ নিমগ্ন হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকার পর আরেকটি দৃশ্য চোখে পড়লো দিশার। তাদের সড়কের বা পাশে সঙ্কীর্ণ এক খাল, ওটার পরে হালকা কুয়াশায় জংলাটে পরিবেশে উঁকি দিচ্ছে ছোট্ট একটি কুঁড়েঘর। এক চিলতে পাতাঝরা উঠোন সামনে। সেখানেই একধারে ভাঙা বেড়া ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে দুই আদম সন্তান।
“ওদের দিকে তাকাস না!”
সামিউলের কথা শুনে তার দিকে ফিরলো সবাই। যে যার যার মতো নীরবতা উদ্যাপন করছিল এতক্ষণ। দিশার বাবা-মা শীতের বিকেল দেখায় মগ্ন। ভিডিও গেমের পোকা ছোটভাই নয়নের অবশ্য বাবার ফোন ছাড়া আর কোথাও মন নেই। ভ্যানের মাঝখানে আড়াআড়িভাবে মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে সে। শীতকালীন স্কুল ছুটি পেয়ে তারচেয়ে বেশি খুশি আর কেউ হয়নি।
যদিও এ পথে অটোরিকশা চলে কিন্তু সবাই পায়ে চালিত ভ্যানের প্রতি আগ্রহ দেখালে বড় বাজার থেকে তারা সেটাই নিয়েছে। কাঁচা রাস্তা হওয়ার কারণে অনেকটা ঢিমেতালে চলছে চালক। কুমিল্লার মাধবপুরের ছোট্ট এই গ্রামে জন্ম নেয়া সামি বেশ কিছুক্ষণ নিজ জন্মস্থান নিয়ে বড়বোনের ছেলেমেয়েকে এটা ওটা বলে বিরতি নিয়েছিল; তখনই দেখে অপর দিকে বসা তার ভাগনি সেই বিচ্ছিন্ন বাড়িটার দিকে তাকিয়ে আছে। ফোনে এ বাড়ি নিয়ে গ্রামের বন্ধুদের কাছে সব শুনেছে সে।
“ওদের দিকে তাকালে কী সমস্যা, মামা?” দিশার টানা চোখে ব্যাপক বিস্ময়। জিন্স-লং ফতুয়ার ওপর কালো কার্ডিগান পরে আছে সে। কোলের ভ্যানিটি ব্যাগের ওপর দু হাত রাখা।
“বলো, বলো! কী সমস্যা?”
এবার ভাগনির ঠিক পাশে বসে থাকা দুলাভাইয়ের প্রশ্ন শুনে সেদিকে তাকালো সামি। ভদ্রলোকের নাকের ডগা লালচে হয়ে গেছে।
“আছে, ভাই! আপার কাছে শুনেন নাই আপনি?” এটুকু বলে নিজের পাশে বসা বোনের দিকে দৃষ্টি ফেরালো সে, “তুমি বলো নাই কিছু?”
ক্লান্তিতে জব্দ শাহানা মলিন হাসলো। “বলছি, কিন্তু তোর দুলাভাই ওইসব বিশ্বাস করে নাকি?”
সামি গাল চুলকে হাসার চেষ্টা করলো। পড়াশোনার কারণে গত কয়েক বছর যাবত ঢাকায় একমাত্র বড়বোনের বাসায় আছে সে। তার দুলাভাই পৈতৃক ব্যবসা বেশ সফলতার সাথে সমৃদ্ধ করা সত্ত্বেও জীবন তার ছিমছাম আর অনাড়ম্বর। মানুষ হিসেবে যুক্তিবাদী। এ কারণেই হয়তো তাদের গ্রামে কয়েক মাস আগে ঘটে যাওয়া বিষয়টিকে কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
একমাত্র শালার দিকে হালকা ঝুঁকলো রফিকুল আলম। “সাইন্স নিয়ে পড়েও তোমার কী অবস্থা, শ্যালকসাহেব!” আস্তে করে বলে স্ত্রীর কোলে শুয়ে থাকা ৮ বছরের পুত্র সন্তানের হাত থেকে নিজের ফোনটি নিয়ে নিলো। “আজকের মতো সময় শেষ, এবার একটু আশপাশটা দেখ, ব্যাটা!”
উঠে বসে আড়মোড়া ভাঙার মাঝে সত্যিই চারপাশে তাকাতে থাকলো নয়ন। তারপর ডাগর চোখের দৃষ্টি স্থির করলো বড়বোনের ওপর। দিশা মৃদু হাসলো। আদতে ভাবনায় ডুবে আছে সে। ওই বাড়িটা নিয়ে এমন কোনো ব্যাপার রয়েছে যা বড়রা তাকে বলতে চাইছে না। কিন্তু সে তো আর ছোট বাচ্চাটি নেই, এবার ক্লাস এইটে উঠতে যাচ্ছে। সামাজিক উপন্যাস থেকে শুরু করে গোয়েন্দা গল্প, থ্রিলার, গথিক জঁরাসহ কত কিছু পড়ে আজকাল।
অবশ্য বেশ কিছু প্রশ্নের জবাব সে-রাতেই খাবার টেবিলে পাওয়া গেল। ততক্ষণে খেয়েদেয়ে ঘুমে ডুবেছে নয়ন। দিশাকেও তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল কিন্তু সে নিজেকে এখন বড়দের কাতারে ফেলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। ডিম্বাকৃতির ভারি কাঠের টেবিলে খাওয়ার ফাঁকে নানান রকম আলাপ হতে থাকলো। বিশেষ করে আর মাত্র মাস দুয়েক পর ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনটা আদৌ হবে কি না এ নিয়ে চলল নানান পর্যালোচনা।
এক পর্যায়ে তার নানা মোজাম্মেল সরকার কথা প্রসঙ্গে বলতে থাকলো সেই রহস্যময় ভিটেবাড়ির কথা। দিশার নানি কামরুন্নেসা বেগম স্বামীকে বার কয়েক থামানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো। বুড়ো ভদ্রলোক কথার পোকা। কথার ফাঁকে খাবার চিবানো আর গালের সফেদ দাড়িতে ধীর লয়ে হাত বোলানো চলতে থাকে তার।
ঘটনাটি এই গ্রামেরই কিছু বাসিন্দাদের নিয়ে। অন্যান্য বাড়িঘর থেকে খানিক দূরে কবরস্থানের উলটো দিকে বাঁশঝাড় ঘেঁষা ছোট্ট একটি কুঁড়েঘর। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া বাড়ির একমাত্র বংশধর জয়নাল মিয়া তার স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে বাস করছিল সেখানে। পেশায় রাজমিস্ত্রি জয়নাল কাজের সন্ধানে আজ এখানে তো কাল ওখানে বহমান। আচমকা একদিন কুমিল্লা শহরের একটি বহুতল ভবনের কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় সে। গ্রামের সকলের বারণ সত্ত্বেও তার বৌ কবরটা তাদের ঘরের ঠিক পেছনে দেয়। অভাবগ্রস্ত পরিবার হলেও স্বামী তাকে অত্যন্ত সোহাগ করতো। তাছাড়া বৌটা ছিল এতিম। ছোটবেলা থেকে পরগাছার মতো অনাদরে বেড়ে ওঠা মেয়েটি জয়নালের বুকে পেয়েছিল জীবনের পরম শান্তি আর ভালোবাসার খোঁজ।
তাদের বিয়ের ঘটনাটিও কম নাটকীয় নয়। দুই গ্রাম পরে এক অবস্থাসম্পন্ন বাড়িতে কাজ করতে যেয়ে প্রথম পরিচয় তাদের। ও বাড়িতে আশ্রিতা ছিল খুব ছোটবেলায় বাপ মা হারানো এতিম রেশমা। দুপুরে যখন দাওয়ায় শ্রমিকদের খাবার দেয়া হতো, তখন মেয়েটিকে এক পলক দেখার পর সমস্ত ক্লান্তি উবে যেত তার। একে অপরের দৃষ্টি পড়তে ভুল করে না তারা। তখন বয়স কত হবে তাদের? জয়নালের ১৯ কী ২০, রেশমার খুব বেশি হলে ১৬। সেসময় গ্রামাঞ্চলে এমন বয়সে বিয়ে করে সংসার পেতেছে বহু মানুষ।
একদিন কী এক কারণে বাড়ির কর্তা দ্বারা ভীষণ নির্যাতিত হয় মেয়েটি, তখনই পালানোর চিন্তাটা মাথায় আসে জয়নালের। সেই কথা ভয়ে ভয়ে জানালে মেয়েটি রীতিমতো উধাও হয়ে যায়। খাবার নিয়ে আসে অন্য লোক। কারও কাছে কিছু জিজ্ঞেস করতেও সাহস হয় না। এর ঠিক ৪ দিন পর দেখা দেয় সে। শুকনো চেহারা, কপালের কাছে কালশিটে দাগ। তার ওপর দিয়ে কী গেছে বুঝতে বাকি থাকে না।
কী করবে, কী করা যায় ভাবনার মাঝেই একদিন ওদিক থেকে হ্যাঁ-সূচক জবাব আসে। ওই বাড়ি নামক জেলখানা চিরতরে ছাড়ে রেশমা। এদিকে একমাত্র অভিভাবক বলতে অসুস্থ মা ছিল জয়নালের; শুরুতে ভীষণ ক্ষেপে যায় সে। কত পীর ফকির ধরে প্রায় শেষ বয়সে এই ছেলেকে জন্ম দিয়েছিল, সেই ছেলে কি না তাকে না জানিয়ে এমন এক কা- ঘটিয়ে ফেলেছে!
তবে বৃদ্ধা তার সুন্দরী আর কর্মঠ ছেলের বৌয়ের ওপর চাইলেও বেশিদিন বেজার থাকতে পারেনি। কতই না যত্নআত্তি করে তার। সেই সেবা অবশ্য বেশিদিন কপালে সয় না। একদিন পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে সে-ও পরপারে পাড়ি জমায়।
এরপর দুজন এতিম মানুষ একে অপরের বেঁচে থাকার অবলম্বন হয়ে ওঠে। একে একে একটি কন্যা ও পুত্র সন্তান এসে মুখরিত করে তোলে তাদের সংসার। তবে সেইসাথে মটকায় চালের কমতিও দেখা দিতে থাকে একসময়। দম ফেলার সুযোগ থাকে না জয়নালের। যখন যেখানে ডাক পায় ছুটে যায় সে। দূর থেকে বাকিদের কাছে যখন এটা টানাটানির সংসার, তখন রেশমার কাছে এটাই স্বর্গ। সেই প্রথম নিজের ঘর পেয়েছে। নিজের পরিবার, আপনজন বলতে কী বোঝায়, সেই প্রথম অনুভব করেছে।
এভাবে তাদের বিবাহিত জীবনের প্রায় ১৫টি বছর পার হলো। কন্যা সন্তানটির বয়স এখন ১৩, আর প্রায় ১০ হতে চলল ছেলেটির। তাদের ভবিষ্যত, পড়াশোনা নিয়ে কত চিন্তা আর পরিকল্পনাই না ছিল স্বামী-স্ত্রী দুজনের। তাই স্বামীর আচমকা মৃত্যুতে প্রথমে রেশমা পাথর বনে যায়। তারপর যেন তার দুচোখে ঠাই নেয় অতল সমুদ্রের সমস্ত জল। দিনের পর দিন কেঁদে বুক ভাসায় সে। রাতে ঘর ছেড়ে স্বামীর কবরের পাশে শুয়ে থাকতে দেখা যায় তাকে।
ছেলেমেয়ে দুটো মায়ের এই অবস্থা দেখে অসহায় হয়ে পড়ে। এ বাড়ি ও বাড়ি গিয়ে সাহায্য কামনা করলে গাঁয়ের অনেকে নানানভাবে বোঝানোর চেষ্টা করে সদ্য-বিধবাকে। কেউ কেউ খাবার দিতে এসে জোর করে তাকে খাইয়ে দেয়। কিন্তু লাভের লাভ তেমন কিছু হয় না। মৃত জয়নালের বৌ কিছুতেই তার স্বামীর কবর ছেড়ে যাবে না। এভাবে প্রায় সপ্তাহখানেক কেটে গেলে তার ব্যাপারে মানুষের আগ্রহ কিছুটা মিইয়ে যায়। আর ঠিক তখনই ঘটে অঘটনটা।
সমস্ত কিছু শুনে এ গাঁয়ের মেয়ে সালমা আসে রেশমাকে দেখতে। বয়স তাদের কাছাকাছি। মাস দুয়েক আগে দ্বিতীয় বিয়ে হয়েছে তার। প্রথম বিয়েটি বহু বছর আগে ভেঙে গেছিল বন্ধ্যাত্বের আপবাদে। এ কারণে লোকে যখন তার দিখে বাঁকা চোখে তাকাতো, তখন রেশমা ছিল তার ভরসার জায়গা। তো, স্বামী বয়স্ক হলেও দীর্ঘ বিরতির পর অবশেষে ফের বিয়ের ফুল ফুটেছে তার। শরীরে এখনো হলুদ, গাঁদা ফুলের ঘ্রাণ। বাবার অসুস্থতার কথা শুনে নতুন জামাইসহ ছুটে এসেছে। রেশমা যখন বিয়ের পর প্রথম এই গ্রামে এলো, তখন একসাথে অনেক সময় কাটিয়েছে তারা। সদ্য-সধবা যেহেতু সদ্য-বিধবার পূর্বচেনা এবং এক কালের ঘনিষ্ঠ, সেহেতু সহানুভূতি জানাতে আসা উচিতই বটে। কিন্তু এই দেখতে আসাই তার জীবনে কাল হয়ে দাঁড়ালো।
গল্পের এই পর্যায়ে সবাই যখন আগ্রহের সাথে মোজাম্মেল সরকারের দিকে তাকিয়ে আছে, ঠিক তখন পাশের ঘর থেকে নয়নের কান্না ভেসে এলো। হয় দুঃস্বপ্ন দেখেছে কিংবা ঘুম ভাঙার পর কাউকে না দেখে ভয় পেয়েছে বেচারা। শাহানা খাওয়া ফেলে দ্রুত ও ঘরে ছুটে গেল, পেছন পেছন গেল সেতু। নানাবাড়িতে আসার পর থেকে এই তরুণীকে নানির সার্বক্ষণিক সঙ্গী হিসেবে দেখছে দিশা। রান্নাবান্না থেকে শুরু করে মেহমানদের আতিথেয়তা, সব প্রায় এক হাতে সামলে যাচ্ছে পাশের বাড়ির দরিদ্র এই মেয়েটি। এ বাড়িতে টুকটাক কাজ করে কিছু টাকা পায় মাস শেষে। অসুস্থ মাকে নিয়ে এভাবেই দিন কেটে যায় তার। কর্মঠ ও আর্থিকগতভাবে সৎ হওয়ার কারণে দিশার নানি বেশ স্নেহ করে তাকে।
তো, সে-রাতে সুর কেটে গেলে বাকি ঘটনা বলার আর আগ্রহ পেলো না মোজাম্মেল সরকার। রাতটা আফসোসের হলেও পরদিন সকালটা কিন্তু বেশ চমক নিয়ে এলো দিশার জন্য। নাস্তা শেষে সেতুকে নিয়ে গ্রামে হাঁটতে বেরোলো দু ভাই বোন। একসময় গাছগাছালি ঘেরা চমৎকার একটি একতলা দালান বাড়ির আঙিনায় প্রবেশ করলো তারা। বাড়িটির চারিদিকে চেনা অচেনা গাছের সমাহার। বিশেষ করে পেছনের দিকে যেন অনন্ত সবুজ।
“কেনু চাচাগো সীমানা এইডা। এত্তারা দালান, থাহে খালি দুই বুড়া-বুড়ি আর কিছু কামলা পোলাপাইন। সন্তানরা সব দেশ-বিদেশ!” হলুদ ওড়নার কোঁচড় থেকে আমলকী বের করলো সেতু। “এইদিকে এট্টু খাঁড়াও তো, আমি নুন লইয়া আইতাছি।”
লবণ আনার ছুতোয় একপাশের একটি টিনের ঘরের দিকে দ্রুত ছুটে গেল সে। সম্ভবত এই ঘরগুলো কামলা-মজুরদের জন্য তৈরি। সেখান থেকে লুঙ্গি আর খয়েরি সোয়েটার পরা এক ছোকরা বেরিয়ে এলো। তার সাথে বেশ উৎফুল্ল ভঙ্গিতে কথা বলছে মেয়েটি।
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ভাইকে নিয়ে বাড়ির পেছনের দিকে এগিয়ে গেল দিশা। ঠাণ্ডা এখানে আরও জেঁকে বসেছে। শরীরের ভারি গোলাপি কার্ডিগানে আর শীত মানতে চাইছে না। তবুও তার ভালো লাগছে। মাথায় সাদা স্কার্ফ জড়িয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে ওপরে তাকালো। সেখানে ছেঁড়া ছেঁড়া আকাশ, ডালপাতার তৈরি মৃদু সরসর ধ্বনি আর পাখির কুহুতান ভাসছে। একসময় বেগুনি ফুলের উচু একটি ঝোঁপ দেখে সেদিকে হাসিমুখে এগিয়ে গেল তারা। মাটি-ফুল-পাতার মাতাল ঘ্রাণে ভরে আছে চারপাশ।
আচমকা একটি শব্দে তাদের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। কোনো কিছুর অস্তিত্ব টের পেলো ঝোঁপের ওপাশে। ভয় পেয়ে বোনের একটি হাত খাঁমচে ধরলো নয়ন। কিন্তু দিশা তো আর ছোটটি নেই। ভুতেও বিশ্বাস করে না। তার বাবা বলে, পৃথিবীতে যদি ভুত থেকে থাকে তবে সেটা মানুষের মাথার ভেতর।
নিশ্চয় কোনো কুকুর-বিড়াল হবে?
এসব প্রশ্নের জবাবেই যেন আড়াল থেকে দুই আদম সন্তান বেরিয়ে এলো। বয়সে তাদের কাছাকাছি। শুরুতে তাদের খেয়াল না করলেও পরে দেখতে পেয়ে বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো আগন্তুকদ্বয়।
“তোমরা? তোমরা ওই বাড়ির না” দিশার চাপা কণ্ঠে বিস্ময়।
ওদের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রোগা ছেলেমেয়েদুটো ভাই-বোনই হবে। তাদের মতোই বোনটি বড়। নীল সালোয়ার আর ফ্রক পরেছে সে। ওটার ওপর জড়ানো লাল সোয়েটারের ডান হাতের কাছে অনেকটা ছেঁড়া। সে হাতেই একটা বেতের ডোলা তার। সম্ভবত ফল টোকাতে এসেছে। ভাইটির পরনের ফুলহাতা সবুজ গেঞ্জিটা ছেঁড়া না হলেও বেশ পুরনো, নানান রকম দাগে ভর্তি ওটা।
“কী নাম তোমাদের?”
প্রত্যুত্তরে চোখ নামিয়ে অন্য দিকে তাকালো বড়জন। আর ছোটজন ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে গেঞ্জির হাতা কামড়াতে লাগলো, তারপর হঠাৎ সেতুর উপস্থিতি টের পেয়ে মুহূর্তে গাছগাছালির আড়ালে মিলিয়ে গেল দুজন।
দিশা নিশ্চিত এদেরকেই সেদিন ভ্যান থেকে দেখেছে। বিকেলে আর কৌতুহল দমন করতে না পেরে সেতুকে প্রশ্ন করে বসলো-তার জানতে হবে কী কারণে এ গাঁয়ের মানুষ ওদের এড়িয়ে চলে। শুরুতে একটু গড়িমসি করলেও এক পর্যায়ে বরই-ভর্তা খেতে খেতে বাকি গল্পটুকু বলতে শুরু করলো সেতু।
তো, বিধবা রেশমাকে একাধিকবার দেখতে আসে সালমা। যতবার আসে পরনে থাকে ঝলমলে দামি শাড়ি, পায়ে জুতো আর সোনার গহনা তো আছেই। একসময় বান্ধবী হিসেবে গণ্য করা রেশমার দুঃখ তাকে স্পর্শ করলেও, ভেতরে ভেতরে নিজ জীবনের সুখ-সঙ্গীত গাইবার তাড়না অনুভব করে সে। একদিন কষ্ট প্রশমিত করতে এসে বিধবাকে নিজ সংসারের খুঁটিনাটি বলার মাঝে কলকলিয়ে হেসে ওঠে সালমা। এককালের সখীর এমন অমানবিক আচরণে প্রথমে নির্বাক থাকে রেশমা, পরে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙলে চোখ মুখ বিকৃত করে তাকে চলে যেতে বলে। সাথে আরও বলে, কোনোদিন বিধবা হলে তার দুঃখটা বুঝতে পারবে সালমা। কথাটা অভিশাপের মতো শোনায় সদ্য-সধবার কাছে। তিক্ত বাকবিতন্ডার পর বুকে খচখচে অনুভূতি নিয়ে বাড়ি ফেরে সে। আর ঠিক সে-রাতেই তার স্বামী বড় বাজার থেকে ফেরার পথে সাপের কামড়ে প্রাণ হারায়।
স্বামী হারানোর দায় একবাক্যে রেশমার ওপর চাপায় সালমা। প্রায় অতিপ্রাকৃতের মতো সারাদিন বিলাপে কেবল সেই অভিশাপের কথা বলতে থাকে সে। শুরুতে কেউ বিষয়টাকে তেমন গুরুত্ব না দিলেও এর দু দিন পর আরেক সধবা, যে কি না সকালে রেশমার বাড়ি হয়ে এসেছিল, তার স্বামীও ভরদুপুরে শহরে সড়ক দুর্ঘটনায় পটল তোলে। এবার আর দেখে কে, পুরো গ্রাম রটে যায় রেশমার অভিশপ্ত জবান আর বদ নজরের কথা। রাত দিন মরা স্বামীর কবরের ওপর পড়ে থাকতে থাকতে নাকি তার ভেতর খারাপ শক্তি জন্মেছে। যেই শক্তি স্বামী সোহাগা নারীদের জন্য জ্বলন্ত অভিশাপ। সেই থেকে সধবারা আর সে বাড়ির সীমানা মাড়ায় না। বাকিরাও কী এক অজানা আশঙ্কায় বর্জন করে তাদের। এই তো, প্রায় মাস ছয়েক ধরে এভাবেই বাড়িটাকে অনেকটা একঘরে করে দেয়া হয়েছে।
ওরা এখন কিভাবে জীবন যাপন করে, জানতে চাইলে জানা যায়, বড় বাজার থেকে খানিক দূরে কোনো এক ইটভাটায় কাজ করে রেশমা। সে নিজেও সহজে কোনো গ্রামবাসীর সামনা সামনি হতে চায় না। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়, ফেরার পথে শাড়ির লম্বা আঁচলে চেহারা ঢেকে নেয়, দৃষ্টি থাকে নিচের দিকে। বাজার সদাইও এমন জায়গা থেকে করে যেখানে কেউ তাকে সেভাবে চেনে না।
কেন? এ প্রশ্নের জবাবে কয়েক মুহূর্ত ঠোঁট উলটে রাখলো সেতু। তার ধারণা, আর কারোর দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সাথে যদি রেশমার সম্পৃক্ততা খুঁজে পায় গ্রামবাসী, তাহলে এ গাঁয়ে থাকা মুশকিল হয়ে যাবে তাদের জন্য। তাদের যাওয়ার অন্য কোনো জায়গা নেই। অবশ্য থাকলেও রেশমা জীবদ্দশায় স্বামীর ভিটে, কবর ফেলে যেত বলে মনে হয় না।
সব শুনে দিশার কেমন অবিশ্বাস্য লাগলো। এই এতটুকুর জন্য পুরো গ্রাম গোটা একটা পরিবারকে এভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল! তাও এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে! মৃত্যুগুলো নিঃসন্দেহে দুঃখজনক কিন্তু সেগুলো নিতান্ত কাকতালীয় ছাড়া আর কী? তার বাবাও নিশ্চয় এমনটাই বলবে।
ওর বাচ্চারা স্কুলে যায় কি না এ প্রশ্নের জবাবে ছোট্ট শ্বাস ফেলল সেতু। “এহনো যাইতে পারে।”
“আচ্ছা, এই গ্রামের সবাই ওদের ভয় পায়?”
“না, সবাই ডরাইবো ক্যান?”
“তুমি?”
“ধুর! বাচ্চা দুইডারে জন্মাইতে দেখছি আমি।” বরই চিবুতে চিবুতে উঠোনের দিকে তাকালো। “তোমার নানিও ডরায় না। চুপ্পে চুপ্পে মেলা সাহায্য পাডায়।”
“আমার নানি?” কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে দৃষ্টি প্রসারিত করলো দিশা। “তুমি সেসব সাহায্য নিয়ে যাও, তাই না?”
ফিরে তাকিয়ে মলিন হাসলো সেতু।
“আমাকে ওই বাড়িতে নিবে?”
আবদারটা শুনে শুরুতে হেসে উড়িয়ে দিলেও পরক্ষণে কী যেন ভাবে সে। যতটুকু দেখেছে মেয়েটার হৃদয় বেশ সহানুভূতিশীল, ঠিক তার নানির মতো।
“ওইখানে তুমার না যাওয়াই ভালো। ক্যাডা না ক্যাডা দেখবো, তারপর হুদামিছি আবার হাউকাউ! আর আমি যে তুমারে এত্তসব কইছি নানিজানরে কইয়ো না কিন্তু…গোপন রাখবার কইছে।”
“কিন্তু সেতু আপা, এভাবে তো চলতে পারে না!” আহত চোখে তাকিয়ে রইলো দিশা। “এসব কুসংস্কার! আমি আমার বাবাকে বলবো। বাবা নানাকে বলে-”
“দুনিয়ায় এমন কত কিছু চলে যেইডা বহু মানুষ চায় না।” মেয়েটিকে কেমন উদাস দেখালো। “আর গ্রামের মানুষের বিরুদ্ধে গিয়া তোমার নানা একলা করবোডা কী? তোমরা বেশি কিছু কইলে, দুই দিনের মেজবান কইয়া না আবার অপমান করে।”
মুখ ভার করে উঠোন ছাড়িয়ে অদূরে তাকালো দিশা। ভুল কিছু বলেনি সেতু। খোদ শহরেই তো শিক্ষিত মানুষের ভিড়ে কত কুসংস্কার দেখেছে সে। তাদের হাজার বোঝালেও কাজ হয় না। তার সহপাঠীর এক আত্মীয়ার মানসিক সমস্যা হলে জিনে ধরেছে বলে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে যাওয়া হয় চিকিৎসার জন্য। আরেক প্রতিবেশির ছেলেকে নেশা থেকে বিরত রাখতে রিহ্যাবে না দিয়ে এক পীরের পড়া-পানি খাওয়াতে দেখেছে। আর সেখানে এই অনুন্নত গ্রামের এই ঘটনা এমন কী আহামরি। তবুও তার হৃদয় মানতে চায় না।
এভাবেই দেখতে দেখতে ডিসেম্বর প্রায় শেষ হয়ে এলো। এক কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে ঢাকায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি হলো তারা। উঠোনে একে অপরের কাছ থেকে বিদায় নিলো সবাই। দিশা নিজের নানিকে অনেকক্ষণ জড়িয়ে ধরে শরীরের ঘ্রাণ নিলো। কামরুন্নেসা নাতনির মাথায় মমতার হাত বোলালেন। তার অভিজ্ঞ দুচোখ ঝাপসা হয়ে এসেছে।
সব শেষে সেতুকে জড়িয়ে ধরলো দিশা। “তোমরা ওদের খেয়াল রাখবা, ঠিক আছে?” বলেই নিজের জমানো এবং বাবা-মায়ের কাছ থেকে চেয়ে নেয়া কিছু টাকা সেতুর হাতে গুঁজে দিলো সে। “এগুলা ওদের দিয়ো। আমি এরপর আবার এলে ওদের জন্য গিফ্ট নিয়ে আসবো।”
মেয়েটির ছলছল চোখের দিকে তাকিয়ে আশ্বস্ত ভঙ্গিতে হাসলো সেতু।
তারপর আবারও ভ্যানে চড়ে একই পথ ধরে ঢিমেতালে ছোটা। যেতে যেতে কবর স্থানের উলটো পাশের বিচ্ছিন্ন সেই ভিটেবাড়ি। কুয়াশায় ডুবে আছে ওখানটা। কাকতালীয়ভাবে ঠিক তখনই প্রথম দিনের মতো সেই ছেলেমেয়ে দুটো উদয় হলো। বেড়ার পাশে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে। ওরা যেন দিশা আর নয়নের ভিন্ন এক প্রতিবিম্ব। আবছা, বিষণ্ণ।
