অলীক স্বপ্নভূমি
অমর মিত্র
তন্দ্রা বর্মণের দুই চোখ যেন জলবিন্দু দুই। শিশিরের দুই ফোটা। কী মায়াময়, কী স্নিগ্ধ! টল টল করছে পদ্মপাতায় জলের মতো। এখনই যেন মিলিয়ে যাবে। কিন্তু তা হয়নি। রাইকে এই কথা বলেছিল অলীক। রাই হাসি উপহার দিয়েছিল। স্মাইলি। যখন আলাপ হয়েছিল এই ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ডে, ফেসবুকে, তখন দুই চোখের কথা বলেছিল। জানত না রাই মুখার্জির প্রোফাইল পিকচারে তন্দ্রা বর্মণের মুখ, সেই অতল জলের আহ্বান, ‘ভুল সবই ভুল, এই জীবনের পাতায় পাতায় যা লেখা আছে, ভুল”। গেয়েছিলেন সুজাতা চক্রবর্তী। ইউটিউবে অতল জলের আহ্বান আছে, গানও আছে। তন্দ্রা বর্মণের লম্বাটে মুখ, বিমর্ষতায় ছাওয়া। সুজাতা চক্রবর্তীর গান আর শোনেনি অলীক। কী আশ্চর্য সব গান, “এ কী চঞ্চলতা জাগে আমার মনে, ভালো লাগে, কত ভালো লাগে…”। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় গাইছে পিয়ানোর সামনে বসে, আড়ালে তন্দ্রা বর্মণ। সেই মুখ বসেছে রাই মুখারজীর মুখে। অনলাইনে।
অনলাইনে বহুদিন কেটেছে। দিন রাত্রি, না দিন না রাত্রি। তন্দ্রা বর্মণ, সেই হারিয়ে যাওয়া কন্যা। ক’টি ছবির হিরোইন। তারপর খোঁজ নেই। অন্তত অলীক জানে না। এই হিরোইন তারা বাবা-কাকাদের যৌবনের ক্রাশ। এক সিনেমা যে কতবার দেখেছে তারা, শুধু ওই গানটি শুনবে, ভুল শুধু ভুল…। সুন্দর অদৃশ্য হয়েছিল অক্ষয় রূপ নিয়ে। সেই রূপই রয়ে গেছে ছবিতে। সেই রূপ রাই মুখারজির রূপে যুক্ত হয়েছিল। অলীক বলল, শুনেছ রাই, আমাকে মেঘালয়ের সুরগুঞ্জা হিল চলে যেতে হবে।
সুরগুঞ্জা হিল, নাম শুনিনি তো এমনি কোনো পাহাড়ের।
কে জানে, ওটা মহাপাত্রর বানানো কোনো জায়গা হতে পারে।
বুঝতে পারলাম না। রাই বলল।
আমাকে বদলি করেছে মহাপাত্র।
বদলি মানে ট্রান্সফার, হোয়াই?
আই ডোন’ নো রাই, মনে হয় এটা পানিশমেন্ট ট্রান্সফার।
পানিসমেন্ট বদলি, কী করে বুঝলে?
জায়গাটার নাম কেউ শোনেনি, বললাম না বানানো জায়গা।
বানানো জায়গা মানে? রাইয়ের বিস্ময় বেড়ে যাচ্ছিল। জায়গা বানানো হয়, হতে পারে? অলীক অদ্ভুত সব কথা বলে। আর সেইটাই অলীকের প্রতি তার আকর্ষণ।
অলীক বলল, অ্যাকচুয়ালি ও রকম কোনো জায়গা হয় তো নেই, কিন্তু ট্রান্সফার অর্ডারে ওই জায়গার নাম, মহাপাত্র একবার পছন্দপুর নামে একটি জায়গায় একজনকে বদলি করেছিল, ওই জায়গাটা নাকি চক্রধরপুরে সঞ্জয় নদের ধারে, সেই অনিমেষ তো গিয়ে কোথাও খুঁজে পেল না পছন্দপুর, গরমে ছুটে ছুটে হয়রান।
রাই হি হি করে হাসল, তোমাদের মহাপাত্র দারুণ তো, সঞ্জয় নদ, চক্রধরপুর, পছন্দপুর, অথচ তার কোনোটাই নেই?
না না, পছন্দপুরটাই শুধু নেই, বাকি সব আছে রাই, চক্রধরপুর এক রেলওয়ে জংশন, সেখানে সঞ্জয় আর রঞ্জয় নামের দুটো নদী আছে, তারা নাকি দুই ভাই, নদীরা আবার যমজ দুই ভাই, বোঝো রাই, আসলে তারা নদ, নদী নয়।
রাই জিজ্ঞেস করল, নদ আর নদী কীভাবে আলাদা করে দেখা যায়?
অলীক বলল, নদ হল নদী খুঁজে খুঁজে হয়রান।
যেমন সেই অনিমেষ পছন্দপুর খুঁজে হয়েছিল?
অলীক বলল, তাইই হবে, পছন্দপুর বা পছনপুর পুরুষের কাছে নারী, নারীর কাছে পুরুষ, বুঝলে, যেমন তুমি ভাববে, তেমনই তা হবে।
রাই বলল, দারুণ তো, তোমাদের মহাপাত্র এইসব খুঁজে বের করেন?
হু, আরো আছে, এই যেমন নীলাভকে বদলি করেছিল ন’পাহাড়ি, চাইবাসার কাছে একটা ফিকটিসাস প্লেসে, নেই, নীলাভ কী করল গুগুল সার্চ করে না পেয়ে গেল স্যারের কাছে, গুগুলে নেই এমন জায়গা আছে নাকি স্যার?
তারপর? রাইয়ের দম যেন বন্ধ হয়ে আসে, পেয়েছিল?
স্যার বলল, যেতে হবে না, অন্য লোক যাচ্ছে, গুগুল সব খোঁজ রাখে না, গুগুল ইজ নট গড, মানুষই ওতে অ্যাড করে, ভুলভালও থাকে।
হি হি করে রাই হাসল, আমি অনেক কিছুই গুগুল থেকে জেনে নিই, হে হে হে, গুগুল জানে না, স্যার জানে?
ইয়েস, যেমন মহাপাত্র তাকে তখন জিজ্ঞেস করেছিল, হোয়াট ইজ দ্য নেম অফ ইওর নেটিভ ভিলেজ?
তারা দুজন এখন মুখোমুখি। রাই আর অলীক। এর ভিতরে রাইকে লাভার বয় নামের এক ফেক আইডির লোক এসে হাই করেছে দুবার, ছবি পাঠিয়েছে ম্যানহাটনের, গোলাপ দিয়েছে, রাই ফিরেও তাকায়নি। তখন সে থেমেছে নিজে নিজে। অলীকের সঙ্গে কথা বলে সুখ। অলীক এমন সব বিষয়ের অবতারণা করে যে তার কথা না শুনে পারা যায় না। কথায় কথা বেড়েই যেতে থাকে। হুঁ, নেটিভ ভিলেজ? আমার তো কোনো নেটিভ ভিলেজ নেই অলীক, সেই কবে কোনকালে আমার ঠাকুদ্দার ঠাকুদ্দা চলে এসেছিলেন সপ্তগ্রাম থেকে, সরস্বতী নদীর ধার থেকে, তারপর থেকে আমরা কলকাতার লোক, গঙ্গার ধারে, জোড়াবাগান, আমি হলে নেটিভ ভিলেজের নাম তো বলতে পারতাম না অলীক।
অলীক বলল, নীলাভর তো আছে নেটিভ ভিলেজ, পতিনা, তো স্যার গুগুলে সার্চ দিল, অ্যান্ড কুড নট ফাইন্ড, তখন নীলাভ চুপ।
অনলাইন রাই, অলীকও অনলাইন। রাই অলীকের ভার্চুয়াল ফ্রেন্ড। তারা কম্পিউটারে বসে এক বাস্তবতা তৈরি করে নিজেদের মতো করে। কল্পনার পৃথিবী। এই যেমন তারা এখনই বেরিয়ে মনিস্ক্যোয়ার মলের আলোয়। বাইরে অনুজ্জল শহর। মেঘ এসেছে। ভিজে ভিজে বাতাস বইছে। কয়েকদিন ধরে চলছে এই মেঘের আনাগোনা। মধ্যে একদিন হঠাৎ করে সন্ধেয় ঠান্ডা বাতাস, মেঘের ডাক, হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল মেঘ। সেদিন নাকি খুব ভিজেছিল অলীক। ওর টনসিলের সমস্যা আছে। ঠান্ডা লাগলে গলা ব্যথা হয়, গলা বসে যায়। গায়ে তাপ চলে আসে। ছোটবেলা থেকে এই চলছে। আরো দু-তিন বছর গেলে তবে ঠিক হবে। রাইয়ের ছিল ছোট বেলায়। দশ বারো থেকে তা অদৃশ্য।
রাই বলল, আমরা এখন কোথায় অলীক?
কেন মনিস্ক্যোয়ারের ভিতরে একটা কাফেতে, বিশেষ কেউ নেই।
রাই বলল, এমন হতে পারে নাকি, কাফেটা শুধু তোমার আর আমার হয়ে গেছে?
হতেই পারে, এক একটা সময় গর্জমান সমুদ্রও চুপ করে থাকে শোনোনি, অমনি কাফেও নিস্তব্ধ হয়ে গেছে, কেউ নেই কোথাও।
রাই বলল, তুমি দেখতে পাচ্ছ না, ওখানে এখন তিনটে বুড়ো বসে আছে কফি নিয়ে।
তাই? অলীক এবার রাইয়ের কথায় গল্পের গন্ধ পায়। জিজ্ঞেস করে, কোনদিকে?
আমরা আছি উইন্ডো সাইড, কাচের ভিতর দিয়ে কতদূর দেখা যায় রাতের কলকাতা, ওরা আছে একদম মধ্যিখানে, তিনটে বুড়োর তিন রকম পোশাক।
ইয়েস। অলীক বলল, একজন হাফ হাতা শার্ট আর গ্রে ট্রাউজারস, আর একজন ধুতি আর পাঞ্জাবী, থার্ড ম্যান…। অলীক থেমে যায়।
থার্ড ম্যান জিনস আর ব্ল্যাক টিশার্ট, গোল গলা, চোখে একটা নাইনটিন্থ সেঞ্চুরির শেষ দিকের চশমা, সোনালি রং, একেবারে গোল গোল দুটো চোখ, টোয়েন্টি ফার্স্ট অ্যান্ড নাইনটিন্থ সেঞ্চুরি মিশে আছে ওই ওল্ডম্যানের ভিতর। রাই হাসল বলতে বলতে।
তারপর?
ওই লোকটা আমাকে দেখছে অলীক, কী সুন্দর দৃষ্টি। রাই মুগ্ধ গলায় বলল।
অলীক বলল, ওল্ড ম্যানরা খুব ইয়াং অ্যান্ড বিউটিফুল খোঁজে।
তাই, আমি তো জানি না।
তুমি জানবে কী করে, তুমি নিজেকে নিয়েই মুগ্ধ, তুমি বাইরে তাকাও না।
রাই বলল, একদম না, আমি সব দেখি, তুমি টের পাও না, আই লাইক ওল্ড ম্যান, দে আর সেফ, তারা হেল্পফুল হয়, অনেক কিছু জানে, অনেক গল্প, আমার জন্মের আগে তারা জন্মেছে, তারাই যেন জগত, আই মিন ইউনিভার্স, কী সুন্দর ভালোবাসার কথা বলতে পারে।
অলীক জিজ্ঞেস করল, আমি কি ওল্ড ম্যান, রাই? যদি হই, নো কোয়েশ্চেন, যদি না হই, অনেক প্রশ্ন আছে।
রাই খিলখিল করে হাসে, তুমি একটা হদ্দ বুড়ো, দুশো বছরের গ্রান্ড-গ্রান্ড ফাদার ক্লক যেমন তেমনি, দ্যাখো না কী সুন্দর তাকিয়ে আছে মানুষটা, আমাকে দেখছে।
উফফ, রাই, আমি এখনই বেরিয়ে যাব এই কাফে থেকে।
কেন গো, এত ঈর্ষা!
বাহ, ঈর্ষা হবে না, ঈর্ষা না থাকলে ভালোবাসা হয়।
রাই জিজ্ঞেস করল, আমরা কি ভালোবাসাবাসি করি?
অলীক বলল, বুঝতে পারি না রাই, তোমাকে দেখিনি তো কোনোদিন।
রাই হাসল, ইটস ওকে, আমরা প্রেম করতে পারি, নাও পারি, দ্যাখো অলীক, লোকটাকে আমার চেনা মনে হচ্ছে।
কে ওই লোকটা?
মনে হচ্ছে, আমার দাদুর বন্ধু মানসরঞ্জন, দাদু আর তিনি দাবা খেলতেন খুব, আমাদের একতলার বৈঠকখানার ঘরে, হি ওয়াজ আ সিভিল সারভেন্ট, ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন ইউপিতে, মোরাদাবাদ ডিস্ট্রিক্টে, তাঁর টেনিওরে একটা বড় রায়ট বাঁধে, স্থানীয় এম পি, ছিলেন তার হোতা, মানসরঞ্জন তাকে অ্যারেস্ট করে নন-বেলেবল সেকশন দিয়ে দিয়েছিলেন, সে একটা বড় স্টোরি অলীক। বলতে বলতে রাই থামে। যেন কাচের দেওয়াল দিয়ে সে বাইরের আলো-অন্ধকারের শহর দেখছে অন্যমনা হয়ে।
এই তাদের আলাপের খেলা। অন লাইনে আলাপ। কেউ কাউকে দ্যাখেনি এখনো। প্রতিদিন রাত সাড়ে ন’টার পর এখানে দেখা হয়। কম্পিউটারের সামনে। সেই সময়টা সকাল না বিকেল, বিকেল না সন্ধে তারা ঠিক করে নেয়। ঠিক করে নেয়, তারা সেই সময়ে কোথায়? সাউথ সিটি মল না মনি স্ক্যোয়ার কিংবা সিটি সেন্টার। অথবা গঙ্গার পাড়ে, রবীন্দ্রসদনের সিঁড়িতে। একাডেমি অফ ফাইন আর্টসের সামনে যে ফোয়ারা, সেখানে। কোথায় তাদের দেখা হয়েছে, সবটাই নিজ কল্পনা। কম্পিউটারে সকাল নেই সন্ধে নেই, প্রকৃতির রোষ নেই, ভালবাসা নেই। তবে বাইরে শীত বসন্ত ঋতুর চিহ্ন এখানে ছবিতে ধরা পড়ে। বাইরের ঝড় বৃষ্টি, তুফান সমস্তটা। আবার বসন্তের ফুল আর শীতের আগুন পোহানোর ছবিতে তারা সেই ঋতুর ভিতরে প্রবেশ করে।
নিউ প্লেস অফ পোস্টিঙে তুমি যাবে? রাই জিজ্ঞেস করল।
জানি না, হয়ত চাকরিই ছাড়তে হবে, অলীক জবাব দিল। নর্থ ইস্টে মেঘালয় খুব সুন্দর জায়গা। রাই বলল, শিলং পাহাড়, রবীন্দ্রনাথের খুব প্রিয় ছিল, শেষের কবিতার শহর।
আমি প্রপার শিলং শহরে যাচ্ছি না, সুরগুঞ্জা হিলস শিলং থেকে চার ঘন্টার রাস্তা, গাড়িতে যেতে হয়, ট্রেন লাইন নেই, রাস্তা খুব খারাপ, একবার পৌঁছলে ফিরতে ইচ্ছে হবে না, আর সেখান থেকে কলকাতা এলে সে জায়গার কথা ভুলে যাবে।
দারুণ জায়গা হবে, মেঘালয় এক অপূর্ব রাজ্য, যেন দেবতাদের বাসভূমি।
বেড়াতে গেলে অমন সুন্দর মনে হয়, কিন্তু এমনিতে না, দিনের পর দিন কাটাতে হবে একা একা, নেট খুব শ্লো, হয়ত এক একদিন থাকলই না, ফোনের টাওয়ারও নেই, তুমি জগত বিচ্ছিন্ন হয়ে আছ।
ইস, জগত বিচ্ছিন্ন, সে দারুণ হবে, আমি একা, আমাকে কেউ হাই করতে পারছে না, চেষ্টা করে যাচ্ছে সমস্তদিন, কিন্তু খুঁজে পাচ্ছে না, আমি একা শুয়ে আছি, বাইরে অবিরাম বৃষ্টি, আমি ঘুমিয়ে আছি, ঘুম থেকে উঠে দেখি একবার টাওয়ার এসেছিল, তখন অলীকের ফোন বেজে থেমে গিয়েছিল, আমি তখন আবার ল্যাদ খেতে লাগলাম। রাই বলল।
এত আলিস্যি করলে রাতে ঘুম হবে না। অলীক বলল।
রাতের বেলা সব থেমে গেলে, শহরে মিটি মিটি আলো আর কুয়াশার ভিতর, টাওয়ার আসে, নেট ফিরে আসে, তখন আমি কাউকে না কাউকে খুঁজে পাব, পুবে না হলে সাগরপারের পশ্চিমে, তুমি কী করতে অলীক?
অলীক বলল, উপন্যাস লিখতাম, লিখতাম আর ভাবতাম, ঘুমতাম না।
কেমন উপন্যাস তা?
লেখা হলে বোঝা যাবে কেমন।
সেই উপন্যাসের বিষয় কী?
অলীক বলল, এই ধর উন্নয়ন, উন্নয়নের ভয়ে নদী পাহাড় পালাচ্ছে।
আরে দারুণ, এই লেখাটি আমি সবার আগে পড়ব, প্রথম বই আমি কিনব, আচ্ছা বিষয় তো হল, এর আশয়?
অলীক বলল, মহাকাশের নিচে যে পৃথিবী আছে, তাইই আশয়।
রাই বলল, জলাশয় না মহাশয়, সদাশয় অলীক?
অলীক বলল, সবই আবার কোনোটাই না, না লিখলে কিছুই ধরা যাবে না।
তাহলে তুমি সুরগুঞ্জা হিল চলে যাও, বদলি নিয়ে ভালোই লাগবে, এক অফিসে চাকরি করতে একই মানুষ দেখতে ভালো লাগে?
অলীক বলল, মহাপাত্র আমাকে সহ্য করতে পারে না, জায়গাটা নেই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, মহাপাত্র তবু বলবে আছে, গুগুলে সব থাকে না।
হু ইজ মহাপাত্র?
আমার ইমেডিয়েট বস, দ্যাখো রাই, লোকটা আমাকে বিপদে ফেলতে চাইছে, ওখানে নর্থ ইস্টের ওই দুর্গম জায়গায় টেররিস্টদের খুব প্রতাপ।
রাই চুপ করে থাকে। অলীক আবার তার অফিসের কথা আরম্ভ করল। অলীক সেখানে যাবে কী করে? সে কোনোদিন কলকাতা ছেড়ে কোথাও যায়নি। গ্রাম দেখেছে সে ট্রেনের জানালা থেকে। আর কখনো বা বেড়াতে গিয়ে বন বাংলোয় উঠে। অলীক বলছে, তাকে মহাপাত্র সেই জায়গায় বদলি করেছে, যেখানে এখনো নর্থ ইস্টের টেররিস্টরা এখনো সক্রিয়। আমাকে তাদের দিয়ে মারবে মহাপাত্র। সুনীতাকে বলেছে, অলীককে যেতেই হবে ওই রিমোট প্লেসে।
রাই বলল, ধুত, একবার বলছ জায়গাটা নেই, আবার বলছ টেররিস্ট, টেররিস্টরা আর আগের মতো নেই, ভয় পেও না।
অলীক বলল, এখন তারা মার্ডারের লাইন চেঞ্জ করেছে কদিনের জন্য, তারা টাকা তুলছে পাবলিকের কাছ থেকে, টু পারচেস আর্মস, হয়ত আমাকে মারার জন্য রিভলবার কিনবে আমারই দেওয়া চাঁদায়।
মাথা নাড়ে রাই, কে বলল, কই শুনি না তো।
শুনবে কি রাই, স্যালারির টেন পারসেন্ট আমাকে দিয়ে দিতে হবে, এটা মাস্ট।
নো নো নো, এটা রটনা, তোমার স্যালারি তারা জানবে কী করে?
মহাপাত্র জানিয়ে দেবে, হি ইজ আ নটরিয়াস পারসন, সে আমার অ্যাকচুয়াল স্যালারি জানিয়ে দেবে, ডিডাকশনটাও ধরিয়ে দেবে, প্রচুর যাবে।
রাই বলল, তুমি ওসব মাথা থেকে তাড়াও অলীক, ওসব বলে তোমাকে ভয় দেখাচ্ছে তোমার মহাপাত্র, সে থাকে কলকাতায়, সে জানবে কী করে টেররিস্টদের খবর?
আমাদের কোম্পানি সব পার্টিকে চাঁদা দেয়, দিতেই হয়, না হলে বিজনেস বন্ধ, মানি কালেকশন হবে কী করে। সেটা মহাপাত্র করে, সে যোগাযোগ করে সব পার্টির সঙ্গে, মহাপাত্র আমার সর্বনাশ করে দেবে। আমাদের মহাত্মা কোম্পানির কাজ কম্মো নিয়ে কথা উঠতে আরম্ভ করেছে।
তোমার অন্য কলিগরা কী বলছেন?
তারাও চাপে আছে, ভাবছে যে কোনোদিন জলধরগঞ্জ বা হলধরপুর বদলি হয়ে যাবে।’
সে আবার কোথায়? রাই জিজ্ঞেস করল।
কেউ জানে না।
লোকটার এত রাগ কেন তোমাদের উপর?
অলীক বলল, এইভাবে প্রশাসন চালানোই নিয়ম, তোমাকে ভয়ে রাখবে, যে কোনোদিন চাকরি চলে যাবে হয়ত, না হলে এমন জগতপুরে বদলি করে দেবে, যে জগতপুর এই জগতেই নেই।
রাই বলল, ইস, মানসরঞ্জন উঠে যাচ্ছেন অলীক, তুমি ওঁর কাছে জেনে নিতে পারতে মেঘালয়ে অমনি পাহাড় আছে কিনা।
অলীক বলল, একটু থেমে থাকুন স্যার, স্টপ স্যার মানসরঞ্জন, রাই বললে না তো, কী হলো, সেই যে রায়টে এম পি-কে জেলে ভরে দিল? অলীক জিজ্ঞেস করল, উনি তারপর থাকতে পারলেন ওখানে।
নো, কিন্তু রায়টের সময়টায় উনি ওখানেই, ড্রাস্টিক অ্যাকশন নিয়েছিলেন দাঙ্গাবাজদের বিরুদ্ধে, ক্রিমিনাল ল-য়ের এমন সব সেকশন জুড়ে দিয়েছিলেন যে এম পি জামিনই পায়নি, উনি তারপর বদলি হয়ে যান, আর কিছুদিন বাদে চাকরি ছেড়ে দিয়ে অধ্যাপনা করতে যান, দারুণ ছিলেন, কী হ্যান্ডসাম বলো অলীক।
অলীক জিজ্ঞেস করল, তোমার দাদু বেঁচে আছেন, রাই?
আছেন, হি ইজ এইট্টি, মাই ফাদার ইজ ফিফটি, মাদার ইজ ফোরটি টু।
উফ, এত কথা জিজ্ঞেস করছি না আমি রাই, মানসরঞ্জন কি এইট্টি হবেন?
নো, সেভেন্টি সেভেন হবেন, দাদুর চেয়ে ছোট ছিলেন কয়েক বছর, আমার জন্মের সময় ওরা সারাদিন দাবার বোর্ড বন্ধ করে চুপচাপ বসেছিলেন, আমি তখন কোচবিহারের এক নার্সিংহোমে জন্মাচ্ছি, ইন দ্য ইয়ার নাইন্টিন নাইনটি নাইন, ওখানে আমার মায়ের বাপের বাড়ি।
তারপর? অলীক অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
তারপর আর কী, মানসরঞ্জনকে জিজ্ঞেস করলে বলতে পারতেন, কতদিন বাদে দেখলাম, আচ্ছা অলীক, উনি কি আমাকে চিনতে পারেননি?
কী করে বলি বলতো?
আমাকে বার বার দেখছিলেন, এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন যে তা আমি টের পাচ্ছিলাম, কতদিন বাদে দেখলাম মানুষটাকে।
অলীক জিজ্ঞেস করে, কোথায় থাকেন মানসরঞ্জন?
তা তো জানি না অলীক।
চিনতে পারলে উনি তোমাকে ডাকতেন রাই।
আমি ওঁকে ভুলিনি অলীক, তাই এখানে দেখতে পেলাম, উনি কেন আমাকে ডাকছেন না, হাই রাইকিশোরী।
তুমি এখন লেডি, চিনতে পারেননি মনে হয়।
রাই বলল, কী জানি, হয়তো তাই, চিনতে পারেনি মানস, আমি একদিন ওঁকে হাই মানস বলে ডেকে উঠেছিলাম, দ্য হ্যান্ডসাম ইয়াং ম্যান অফ সেভেনটি, আমি তখন এইট্টিনে পড়লাম, জাস্ট এইট্টিন অ্যান্ড বিকেম অ্যাডাল্ট, উনি আমাকে কী বই গিফট করেছিলেন জানো?
কী বই? অলীক জিজ্ঞেস করল।
ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ আর লোলিটা, হি হি হি, আমি বলেছিলাম, আই লাভ ইউ মানস, এমনি, মজা করে, বলেছিলাম, আমি যদি অনেক বছর আগে জন্মাতাম, উফফ!
তুমি কি ওঁর প্রেমে পড়েছিলে?
কী জানি, হয়তো তাই, আবার না হতেও পারে, অলীক উনি এখন কোথায় তা কে জানে?
তার মানে? অলীক জিজ্ঞেস করে, কোথায় থাকেন?
কিছুই জানি না অলীক, শুধু জানি, কী হয়েছিল, উনি আস্তে আস্তে সব ভুলে যাচ্ছিলেন, অ্যালঝাইমার হয়ে গিয়েছিল, সব কিছু ব্ল্যাক, বাড়ি থেকে বেরিয়ে ফেরেননি আর। রাইয়ের চোখে অশ্রুবিন্দু। বলল, বহুদিন বাদে মনে হলো এই ভাবে দেখা হয়ে যেতে পারে হয় তো, চলো আর না, কাফেটা এত নিস্তব্ধ! মনে হচ্ছে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে, বেয়ারা, কাউন্টারের লোকটি, কিচেনের দুটো শেফ…… একটা ঘুমন্ত কাফেতে বসে থাকা যায় না, চলো বেরিয়ে পড়ি অলীক।
মুহূর্তে মানিস্ক্যোয়ার, হারিয়ে গেল তাদের মন থেকে। মানসরঞ্জন তাঁর নিজের স্মৃতির মতো মুছে গেছেন। কোথাও নেই। অলীক আর রাই রাস্তায়। তারা রাস্তা ভেবে নিল।
২
রাই বলল, বাইপাসে আছি তো, ভাল লাগছে না, চলো মিলেনিয়াম পার্ক যাই।
অলীক বলে, আমার এখন ভাল লাগছে না রাই।
তাহলে কোথায় যাবে?
ওককে চলো, কিন্তু আমি তো এখন খুব ডিস্টার্বড।
তাহলে বাড়ি ফিরে যাও, বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাব তুমি কী করবে, আমি অফলাইন হই।
না রাই, কিন্তু আমি মহাপাত্রর সঙ্গে লড়ব কী করে?
রাই বলল, তুমি নিজেই জেনে যাবে, মানুষ নিজেই নিজের বিপদের প্রতিষেধক খুঁজে বের করে।
রাই পোস্ট গ্রাজুয়েট করছে বাংলা সাহিত্য নিয়ে, ফাইনাল ইয়ার। আগের সেমিস্টারে একষট্টি পারসেন্ট নাম্বার পেয়েছিল, বলল, মেঘালয় কী আর কলকাতা কী, আমরা তো অনলাইন হবো, ওদিকে শীতের সময় স্নো-ফল হয়, এই সময় অনলাইন হয়ে আমি তোমার সঙ্গে জানালায় বসে দেখব নিরবচ্ছিন্ন তুষারপাত।
না না, আমিই যাবই না, আমি খুব শীত কাতুরে। অলীক বলল, আর নেট থাকবে না তো তুষারপাত দেখবে কীভাবে, আমি যে তুষারপাতের ভিডিও পাঠাব, কী করে পাঠাব, স্নো ফল লাইভ হবে না রাই।
নেট কি আসবে না?
মনে হয় না, উপদ্রুত অঞ্চল তো, যখন তখন নেট বন্ধ রাখে সুরগুঞ্জা হিলে।
রাই একটি বিমর্ষ মুখের ছবি পাঠায়। তারপর বলে, তাহলে তুমি আঙুরের সুরা নিও, নেট ছাড়া শীত চলে যাবে। রাই একটা লাভ সাইনের ছবি এঁকে দিল তার কথার পাশে।
অলীক বলল, আমি কলকাতার বাইরে কিছুই চিনি না রাই।
চিনে যাবে, এখন আমাদের গাড়ি কতদূর গেল? রাই জিজ্ঞেস করে অন লাইনে তার বাড়িতে বিছানায় কাত হয়ে শুয়ে ল্যাপটপের কি বোর্ডে আঙুল সরাতে সরাতে।
অলীক বলল, বাই পাস থেকে বেরিয়ে মানিকতলার দিকে ছুটছে গাড়ি। কিছুটা গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে।
কেন, দাঁড়াল কেন? রাই জিজ্ঞেস করল।
অলীক বলল, মিছিল।
কিসের মিছিল? বিরক্ত রাই জিজ্ঞেস করে, এখন তো রাত্তির।
না, আমরা দিনে ফিরে এসেছি।
উফফ, অলীক আমি দিনের ভিতরে যেতে চাই না, কী রোদ্দুর, ভ্যাপসা গরম, আমি স্নিগ্ধ রাত্রির ভিতরে তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই।
অলীক বলল, কিন্তু দিনের বেলা ছাড়া মিছিল হয় না।
কেন হবে না, মোমবাতি নিয়ে রাস্তার ধার দিয়ে, কারো মুখে একটাও কথা নেই, সেই মিছিল তো হয়, আমি সেই মিছিলে হেঁটেছি, সেই রাত দখলের মিছিলে, সব মোবাইলের টর্চ জ্বেলে হাঁটছে, আমি, আমার মা, বাবা, দাদা সকলে হেঁটেছি কতবার, কিন্তু কিছুই হল না শেষ পর্যন্ত।
অলীক বলল, সে তো অন্যের পক্ষে মিছিল, আমার কিছু হয়নি, আমি অন্যের প্রতি সমবেদনা জানাতে মিছিল করছি, সেখানে রাগ, ক্ষোভ থাকে কম।
কিছুটা সত্যি, সমস্তটা নয়, আমার খুব রাগ হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল খুব অন্যায়, খুব ভয়ের, আমারও অমন হতে পারে।
তা হয় তো ঠিক, কিন্তু ধরো বন্ধ জুটমিলের শ্রমিকদের মিছিল, চিট ফান্ডে সর্বস্ব হারানোদের মিছিল, তা তো মোমবাতি নিয়ে হয় না। বলল অলীক, তোমাকে আমি তাই দিনের বেলায় নিয়ে এলাম রাত থেকে।
হুঁ, মানুষ খুব রেগে আছে অলীক, আমি দেখতে পাচ্ছি, অভয়ার বিচার হল না তাই আমরাও রেগে আছি, তবে তা এমনিতে বোঝা যায় না, কথা উঠলে টের পাই মেয়েটার অমন পরিণতির সঠিক বিচার কেন হল না।
অলীক বলল, এখন মানুষ খুব রেগে থাকে, মিছিলে গাড়ি আটকে গেলে রেগে যায়, আবার মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে রেগেই হাঁটে।
কেন গো? রাই জিজ্ঞেস করে, আমার খুব ভয় করে কেউ রেগে গেলে, মানসরঞ্জন বলত, রাগের মাথায় মানুষ লণ্ডভণ্ড করে দিতে পারে সব কিছু, রাগের ভিতরে কোনো কাজ করা উচিত নয়।
অলীক বলল, একের পর এক জুটমিল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, রাগ হবে না, প্রতিবাদ হবে না?
রাই বলল, হবে, রাত দশটার পর মিছিল হোক তার জন্য।
তা হয় নাকি, মিছিল হলে লোকে অন্যায়ের খবর জানতে পারে, রাত দশটার পরে নির্জন হয়ে আসা কলকাতার মানুষ জানবেই না জুটমিল বন্ধ, জুটমিলের শ্রমিককে অদৃশ্য করে দিয়েছে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে, কিছুই জানবে না, এতগুলো মানুষের ভাত বন্ধ হয়ে গেছে, তা-ও না, একটা লোক হারিয়ে গেল, তাও না।
রাই বলল, তাহলে আমরা বরং একটা মিছিলে হাঁটি।
অলীক বলল, সিনেমার নায়ক সাতটা ঘুমন্ত মানুষকে চাপা দিয়ে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, শাস্তি হতে হতেও হয় না, তার জন্য মিছিল হোক।
জানি, খুব খারাপ লাগছে, সিনেমার গায়ক, নায়ক, নায়িকারা, আই পি এল ক্রিকেটাররা কি তার হয়ে কি মোমবাতি মিছিল করবে?
অলীক বলল, হ্যাঁ, রাস্তাজুড়ে মোমবাতি মিছিল সিনেমার হিরোর পক্ষে।
দিনের আলোয় মোমবাতি মিছিল?
না, আমরা রাতে ফিরে এসেছি রাই, আমরা মিলেনিয়াম পার্ক যাব বাট রাস্তা বন্ধ, নায়কের শাস্তি মকুবের জন্য মোমবাতি হাতে হাঁটছে গায়ক, ক্রিকেটার, হিরো হিরোইন, বছর কুড়ি বাইশের ছেলে মেয়ে, বুকে হিরোর মাসল ফোলান বডি।
উফফ, তা হয় না অলীক, ওই হিরো মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চাপা দিয়েছিল সাতটা লোককে, খুনি, ওর জন্য মিছিল? উদ্বেগ ফুটে উঠল রাইয়ের গলায়।
ইয়েস, ওর সঙ্গে জুড়ে গেছে জেলবন্দী মন্ত্রীর মুক্তি, আয় বহির্ভূত কোটি কোটি টাকার মালিক মন্ত্রীর বেকসুর মুক্তির দাবী, সুপারি কিলার লাগিয়ে নিরীহ স্বামীকে হত্যা করা স্ত্রী আর তার প্রেমিকের মুক্তি, প্রেমে সাতখুন মাপ। বলতে বলতে অলীক থেমে গেল। তার মনে হতে লাগল সে যা বলছে তা হলেও হতে পারে, খুব শিগগির তেমন একটা মিছিল হবে, তেমন দাবীপত্র রচিত হবে। তাদের পথ আটকে যাবে। তাদের হাঁটতে বলা হবে সেই মিছিলে। সিনেমার নগ্নিকা আর উন্মুক্ত দেহী সিক্স প্যাক হিরোরা মিছিল করবে। বলবে সিনেমার হিরো কোনও অন্যায় করতে পারে না, যে অন্যায় করে তাকে শাসন করে সিনেমার হিরো, সিক্স প্যাক মাসল ফুলিয়ে সিনেমার হিরো নায়িকা উদ্ধার করে, ভিলেন বধ করে রাবণ বধের মতো।
অলীক বলল, দিনের আলোয় সেই চিট ফান্ডে সবর্স্বান্ত লোকদের মিছিল, বন্ধ জুটমিলের শ্রমিকের মিছিল, নিহত ফুটপাথবাসীদের বাবা মায়ের মিছিল।
উফফ, আমাদের কথা কোনদিকে চলে যাচ্ছে অলীক, আমার কেমন অস্বস্তি হচ্ছে, চিট ফান্ডে – আমাদের কাজের মাসির চল্লিশ হাজার গেছে।
সবর্স্বান্তরা মিছিল করছে। অলীক বলল।
না, তারা কপাল কপাল করে হা হুতাস করছে। রাই বলল, আমাদের কাজের মাসি তাই করছে।
২২০০০ কোটি টাকা তুলে ফুরতি করে পালিয়ে গিয়েছিল লোকটি, এখন জেলে, জামিন হয়নি, বাট মোমবাতি মিছিলের হিরো তার কথাও বলছে।
কী করে হল বল দেখি, এত টাকা তুলল কী করে? রাই জিজ্ঞেস করে।
কী করে হবে, লোককে মিথ্যে বলে টাকা তুলেছে, আমাদের বাজারে সব্জিওয়ালার পঁয়ষট্টি হাজার গেছে, সবজি বেচে, ডেইলি রাখত টাকা।
রাই কিছুক্ষণ চুপচাপ। কিছু বলবে, কিন্তু বলতে পারছে না, ভাবছে, শেষে না পেরে জিজ্ঞেস করে, তোমাদের অফিস কী করে?
অলীক বলল, আমি ঠিক জানি না রাই।
তুমি তো টাকা ব্যাঙ্কে রাখ অলীক, তোমার কোম্পানি কি বাজার থেকে টাকা কালেক্ট করে?
অলীক বলল, আমি তো বি কম, ডিস্টানস কোর্সে এম বি এ, আমি কোম্পানির কিছুই জানি না, শুনছি আমাদের কোম্পানি মেঘালয়ে বড় একটা ডেভলপমেন্ট প্রজেক্টে হাত দিয়েছে, আমাকে সেখানে বদলি করেছে, কিন্তু সবটাই ফেক হতে পারে, মহাপাত্র আমাকে হয়রান করতে এইসব করছে।
কী প্রজেক্ট?
জানে না অলীক, সে বানাতে লাগল, বলল, বোধ হয় রুরাল ইলেক্ট্রিফিকেশন, নাহলে পাহাড় কেটে রাস্তা, পাহাড় ভেঙে সমতল করে দেওয়া, জঙ্গল কেটে ফর্শা, এমনি, একটার পর একটা গ্রাম ধরা হচ্ছে, আর খুটি পুতে তার লাগিয়ে সব ব্যবস্থা করবে আমাদের কোম্পানি, তারপর নো পাওয়ার, গভমেন্ট বলবে ফালতু জায়গার ফালতু মানুষকে পাওয়ার দিলে শক খেয়ে মরবে, কিন্তু আমি তো এম, বি,এ, আমার এই কাজ নয়।
এখন ওসব দ্যাখে না অলীক, আভিয়েশন ইঞ্জিনিয়ার করছে আইটি’র কাজ, এখন এসব হচ্ছে।
গাড়ি এক এক কদম এগোচ্ছিল। মিছিল খালব্রিজ পার হয়ে বাম দিকে ঘুরে যাচ্ছে। গাড়ির গতি বাড়ছে। অলীক বলছে তার আশঙ্কার কথা। রাই তাকে আশ্বস্ত করতে চাইছে। তারা মিলেনিয়াম পার্কের দিকে এগোচ্ছিল ক্রমশ। রাত বাড়ছিল অনলাইনে।
৩
মহাপাত্র আর অলীক এখন মুখোমুখি। মহাপাত্র ছ’ফুটের উপর। টকটকে ফর্সা, মস্ত বুকের ছাতি, মুখখানি কেমন, ভালো না মন্দ, সুন্দর না অসুন্দর, তা ঠিক করতে পারে না অলীক। বাড়ি মেদিনীপুর ওড়িশার সীমানায়। মহাপাত্র একদম গ্রামের ইস্কুল থেকে পাশ করে জেলার কলেজে পড়ে অর্ডিনারি গ্র্যাজুয়েট। কিন্তু সে এত এফিসিয়েন্ট যে এই কোম্পানিতে বড় কত্তার ডান হাত। বড় কত্তা বছরের অর্ধেক সময় বাইরে থাকেন, ইউ কে, ইতালি, টার্কি, গ্রিস, ভূমধ্যসাগর টেমস নদীর হাওয়া খেয়ে বেড়ান। ভেনিসে গন্ডোলায় ভেসে বেড়ান। দেশে থাকলে কখনো দিল্লি, কখনো মুম্বাই, পুনে, লাতুর গিয়ে বসে থাকেন। লাতুরে ভূমিকম্প হয়েছিল বছর কুড়ি আগে। সেখানে এখনো কাজ চলছে। কোম্পানি সেখানে আবাসন নির্মাণ করছে। গুজরাতের ভূজেও কোম্পানি ওই কাজ করছে। নর্থ ইস্টেও হচ্ছে, রুরাল ইলেক্ট্রিফিকেশন, স্যানিটেশন—এই সব। নির্মল ভিলেজ গড়ছে কোম্পানি। অলীক তুমি মেঘালয় গিয়ে কাজটা সাক্সেসফুল করে এস, ভার্জিন এরিয়া, প্রচুর টাকা, চা বাগান, কমলা লেবু বাগান, আনারস বাগান, প্রচুর টাকা লোকের হাতে, হাত বাড়ালেই কোম্পানির অ্যাকাউন্টে চলে আসবে, এরপর তোমাকে কোম্পানি ইউ কে পাঠাবে।
স্যার, আমি কোথায় থাকব ওখানে?
মহাপাত্র বলল, সে ব্যবস্থা আছে, বাংলো রেডি, তোমার জন্য ওখানে স্টাফরা ওয়েট করছে, সুরগুঞ্জা হিলস দারুন জায়গা, গেলে আর ফিরতে ইচ্ছে হবে না, পাহাড়, জঙ্গল, ঝর্না, নীল আকাশ, মেয়েরা খুব সুন্দর আর সেক্সি, চলে যাও।
অলীক বলল, আমি কোনও দিন গ্রামে যাইনি।
যাও, গ্রামই তো আমাদের সব কিছু দেয়, আর এতো সুন্দর সুরগুঞ্জা পাহাড়, মেঘালয় হিলস, অপূর্ব প্রকৃতি, সরল মানুষ, বললাম তো দরকারে সব পাবে, তবে সাবধান, রোগটোগ বাঁধিয়ে এস না।
অলীক বলল, আমি না গেলে হবে না?
না, বড় সায়েবই তোমাকে সিলেক্ট করেছেন। মহাপাত্র বলল।
বড় সায়েবের কাছে আমার নাম আপনি রেকমেন্ড করেছেন?
তা করতে হয়, তুমি এফিসিয়েন্ট স্টাফ, তোমার ক্রেডেনশিয়াল রিপোরট ভালো, এমন স্টাফকেই তো দায়িত্ব নিতে হয়।
আমার রিপোর্ট ভালো না, ইনক্রিমেন্ট হয়নি দু’বছর।
সব পেয়ে যাবে, কোম্পানি তার রত্নদের কিছুই বাকি রাখে না।
আমি খারাপ স্টাফ স্যার।
খারাপ হলে পানিশমেন্ট ট্রান্সফার হয়, কিন্তু সে বদলি সুরগুঞ্জা হিলস থেকে আরো দুশো মাইল দূরে, বাংলাদেশ বর্ডারে, তোমাকে বড় সায়েব লাইক করেন।
বড় সায়েবকে আমি দেখিনি স্যার, আমি তো আপনাকে জানি।
বড় সায়েবের নজরে আছ তুমি, এরপর ইউ কে, টেমস-এর তীরে তুমি ঘুরবে, লর্ডসে বসে ক্রিকেট দেখবে, ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে ফুটবল, ক্যান ইউ ইমাজিন?
স্যার, জায়গাটা আছে তো?
তার মানে? মহাপাত্র সিধে হয়ে বসলেন, আছে মানে?
মানে সঞ্জয় আর রঞ্জয় নদীর ধারে পছন্দপুর, পছন্দপুর তো পাওয়া যায়নি।
কে বলেছে পাওয়া যায়নি, সেখানে অফিস চলছে।
অনিমেষ পাল তো পায়নি স্যার। অলীক সাহস করে বলল।
সে যায়ইনি, পাবে কী করে, চাকরি ছেড়ে চলে গেল, তাকে ওর পরে তো বলেছিলাম সাতপাহাড়ি যেতে, সে গেল না। মহাপাত্র বলল।
কিন্তু স্যার মেঘালয় যাই কী করে, ওই এরিয়াটা নাকি টেররিস্টদের দখলে আছে।
হু সেড দিজ, দেয়ার ইজ নো টেররিস্ট নাউ।
অলীক বলল, তারা আত্মগোপন করে আছে।
তা যদি থাকে, থাকতে পারে, তোমার কী?
অলীক বলল, আপনি তো জানেন স্যার, আপনি পনেরদিন ছিলেন ওখানে।
কে বলেছে?
আমি জানি, স্যার।
মহাপাত্র বলল, ভিজিটে যেতে হয়, কিন্তু সে খুব সুন্দর জায়গা, পাহাড় আছে, ফরেস্ট আর একটা ছোট নদী, নদীটা সেই পাহাড় থেকে নেমেছে।
অলীক আচমকা জিজ্ঞেস করে নদীটা কতদূর গেছে?
মহাপাত্র বলল, ঠিক জানি না, কোথাও একটা গেছে, নেমে গেছে, কেন?
আমার বন্ধু রাই বলছে, নদীটা চলে গেছে সেখান থেকে।
অবাক মহাপাত্র বলল, এই কথার মানে কী?
ওসব জায়গা যাদুর, নদী চিরকাল থাকে না, বহমান বলে বেশিদিন একজায়গায় রয় না, যায় আবার ফিরে আসে।
মহাপাত্র বলে, তুমি তো বেশি জেনে বসে আছ, এসব ফালতু কথা কে বলল?
অলীক বলল, একজন ওখান থেকে পালিয়ে এসেছে, সে বলল।
হু ইজ হি? কী নাম তার?
অলীক মাথা নাড়ে, বলা যাবে না, স্যার।
কেন বলা যাবে না?
তাহলে তাকে গ্রেপ্তার করে আবার সুরগুঞ্জা হিলস পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
কেন, সেকি তহবিল তছরুপ করে এসেছে, নাকি খুন করে পালিয়ে এসেছে, তার বিরুদ্ধে লুক আউট নোটিস জারি করা আছে?
না স্যার, তবে নদীর ব্যাপারটা সে জেনে গেছে, এসে চলে যায়, কখনো পাহাড় থেকে নেমে আসে, কখনো পাহাড়ে উঠে যেতে যেতে হাসফাঁস করে।
তুমি দেখছি গাঁজাখোরের মতো কথা বলছ। এমনি হতে পারে, নদী পাহাড়ে উঠতে পারে?
কিন্তু চলে যায় যে তা ঠিক, স্যার, সে বলল। অলীক বানাতে লাগল, বলতে লাগল। যখন নদী চলে যায়, জলের অভাব হয় খুব।
মহাপাত্র বলে, রাবিশ সব কথা, তুমি গিয়ে জয়েন কর।
অলীক বলল, আপনি বড় সায়েবকে বলুন।
বড় সায়েব এখন মহারাষ্ট্রের লাতুর জেলায়, হি ইজ ওয়েটিং ফর আ ট্রেমর।
আরথ কোয়েক, ভূমিকম্পের জন্য অপেক্ষা করছেন, সুরগুঞ্জা হিলসের খবর উনি জানেন না, হাজার হাজার মানুষ মরে গেছে, নদী উলটো দিকে বইছে আবার চলে যাচ্ছে একেবারে।
সুরগুঞ্জার খবর মিথ্যে, এখন আমাদের কাজ লাতুরে, আমরা ট্রেমর ফ্রি হাউজিং করেছি ওখানে জাপানি টেকনোলজিতে।
কিন্তু স্যার ওখানে আর ভূমিকম্প হবে না, নাইনটিন নাইনটি থ্রির পর তেত্রিশ বছর কেটে গেছে, বড় সায়েব সুরগুঞ্জা হিলস চলুন, সেই ভূমিকম্পে নদী পাহাড়, জঙ্গল এখনও কাঁপছে, উনি লাতুরে বসে কেন?
মহাপাত্র রেগে গেল, সে ওঁর ইচ্ছে, তুমি বলার কে, তুমি এত মিথ্যে বলতে পার।
সুরগুঞ্জা হিলস এখনো কাঁপছে স্যার।
ট্রেমর থামলে যাবেন বড় সায়েব, তারপর ওয়েট করবেন পরবর্তী ট্রেমরের জন্য।
আমার মনে হয় স্যার, এবার হলে অন্য কোথাও হবে, যেমন হয়েছে সুরগুঞ্জা হিলসে, আমরা আগে থেকে জানতে পারব না কোথায় হতে পারে।
মহাপাত্র বলল, তুমি যাও, প্রজেক্টটা কমপ্লিট করে এস।
অলীক বুঝল মহাপাত্র করবে না। সে বলল, ওক্কে স্যার আমি ভেবে দেখি।
মহাপাত্র আর কথা বলল না। অলীক বেরিয়ে এল প্রাবৃট মহাপাত্রের ঘর থেকে। প্রাবৃট মানে মেঘ। কী রকম নাম! আন-কমন। অলীক বেরিয়ে এসে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসতে সুনীতা এল। ধলভূমগড়ের মেয়ে। সে অলীকের সহকর্মী বন্ধু, শুভানুধ্যায়ী। অলীককে জিজ্ঞেস করল, কথা হলো? মাথা নাড়ে অলীক, চাপা গলায় বলল, শয়তান।
সুনীতা বলে, রাগ করে কী হবে, তুমি বড় সায়েবের সঙ্গে যোগাযোগ করো, আসলে যেতে হতো মহাপাত্র সায়েবকে, বদলে তুমি।
বলছে এর পর ইউ কে।
ঢপ, ওসব বলে, মেঘালয়ে যে ছিল সে টেররিস্টদের ভয়ে চাকরি ছেড়ে গেছে, তার জায়গায় তুমি।
কে বলো দেখি।
সুশান্ত কর, শুনেছ তো। সুনীতা বলল।
চিনি না তো।
এই অফিসে আসত না, তুমি ওর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারো।
নাম্বার আছে?
না। সুনীতা বলল মহাপাত্র স্যারের কাছে থাকতে পারে।
উনি কি দেবেন?
বলে দ্যাখো না।
আবার যাব?
ইন্টারকমে কথা বলো। বলে সুনীতা তার মোবাইল বাজতে তা শান্ত করতে সরে গেল সামনে থেকে। অলীক ইন্টারকমে ধরল মহাপাত্র স্যারকে। মহাপাত্র ধরল না। ফোন তুলে রেখে দিল। কেটে গেল লাইন। অলীক বুঝল লোকটা হয়তো মোবাইলে কথা বলছে। একটু বাদে আবার ফোন করল সে। এবার মহাপাত্র ধরে, কে অলীক সোম?
ইয়েস স্যার।
‘বলুন’ শুনে অলীক জিজ্ঞেস করে সুশান্ত করের কথা। শুনে আকাশ থেকে পড়ল মহাপাত্র, হু ইজ হি, কে সুশান্ত কর?
আমাদের কোম্পানির নর্থ ইস্ট ইনচারজ।
সে কে, আমি তো চিনি না।
হি হ্যাজ রিজাইনড ফ্রম দ্য সার্ভিস।
কে বলল?
আমি জানি স্যার।
তুমি তো অদ্ভুত এক নাম বলছ, এই লোক কি নদী পালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছিল?
পালিয়ে যাওয়া না স্যার, চলে যাওয়া।
কেমন যাওয়া তা?
এই যেমন মাঠের ভিতর দিয়ে একটা লোক চলে যাচ্ছে দূরে, তেমনি।
নদীর কথা বলছ?
ইয়েস স্যার।
ধুস, তা তো বলেই গেলে, ওসব গল্পেও হয় না, ফোন করলে কেন?
সেই সুশান্ত করের নাম্বার চাইছি স্যার।
আরে যে তোমাকে এই নাম বলেছে তার কাছে চাও, এই নামে কেউ কখনো ছিল বলে আমার জানা নেই। বলতে বলতে মহাপাত্র ফোন রেখে দিল।
তখন সুনীতা ফিরে এল অলীকের টেবিলের ওপারে, জিজ্ঞেস করল, দিয়েছে, দেয়নি তো ওই নামে কেউ ছিল না বলছে।
হি ইজ আ লায়ার, ছিল, ভেরি মাচ ছিল।
বাড়ি কোথায়? অলীক জিজ্ঞেস করে।
বাঁকুড়ায়।
তুমি তো জানো সুনীতা, অ্যাড্রেসটা দিতে পারবে না, কন্ট্যাক্ট নাম্বার?
কম্পিউটার সার্চ করে দেখি।
অলীক চুপ করে বসে থাকল। সে বুঝতে পারছিল মহাপাত্র তাকে কোনো ব্যাপারে সাহায্য করবে না। তাকে বড় কর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। কী ভাবে করবে তা তাকে নিজেকেই বুঝে নিতে হবে। আচ্ছা, বড় সায়েব কি সত্যিই লাতুরে বসে আছেন? হা হা হা, তা কি হতে পারে? এক জায়গায় হলো ভূমিকম্প, উনি আছেন অন্য জায়গা, লাতুরে, ট্রেমর খুঁজছেন সেখানে? তেত্রিশ বছর আগের কম্পন! সঞ্জয় রঞ্জয় নদীর ধারে পছন্দপুর খোঁজার মতো ব্যাপার। চাইবাসায় নপাহাড়ি কিংবা কলকাতার বালিগঞ্জ। সুনীতা কিছু কিছু সাহায্য করলেও করতে পারে। কিন্তু তার বেশিদূর অবধি যাওয়ার ক্ষমতা নেই। উপায়ও নেই। সুনীতা একটু পরে ফিরে এসে বলল, নেই, যে অফিস ছাড়ে, তার সবটা আলাদা একটা ফাইলে সেভ করা হয়, জেনারেল ফাইল থেকে তার সব ডিটেইলস ডিলিট করে দেওয়া হয়। কিছুই নেই। আছে যে ফাইলে তার পাশওয়ার্ড মহাপাত্র স্যার জানেন।
অলীক হতাশ হয়ে বসে পড়ে। তাকে সুরগুঞ্জা হিলস যেতেই হবে। সুনীতা বলল, সুশান্তকে অতিষ্ঠ করে দিয়েছিল ওরা, সে কাউকে বলতেও পারছিল না।
তুমি জানলে কী করে? জিজ্ঞেস করে অলীক।
আমার সঙ্গে ওর যোগাযোগ ছিল। সুনীতা জবাব দিল।
তাহলে নাম্বার নেই কেন? অলীক আবার জিজ্ঞেস করে।
ওই নাম্বারটা এখন ইনভ্যালিড, তুমি চেষ্টা করে দেখতে পারো। সুনীতা হতাশ হয়ে বলল।
আমি এখন কী করব?
সুনীতা বলল, যাও, না পোষালে চলে এস।
চাকরি ছেড়ে? অলীক জিজ্ঞেস করে।
সুনীতা বলল, মহাত্মা কোম্পানির ফিউচার স্পষ্ট নয়, কী হয় কে জানে?
কী হবে?
টের পাচ্ছ না অলীক, চারধারে কী হচ্ছে!
অলীক মনে মনে বলল, নদী, পাহাড় সব মানুষের ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছে।
৪
ফেসবুকে অনলাইন হয়ে রাই বলল, নাম্বারটা ফল্স মনে হয়।
কেন?
ঠিক নাম্বার হলে প্লিজ চেক দ্য নাম্বার ইউ হ্যাভ ডায়ালড, এমন বলবে কেন?
তাহলে আমি কী করব?
রাই জিজ্ঞেস করে, কবে যেতে বলছে?
তা কিছু বলছে না, কিন্তু রেডি হয়ে থাকতে বলছে, বড় সায়েব ইয়েস বললেই চলে যেতে হবে, আমার কাছে মেইল আসবে।
প্রজেক্ট কবে শেষ হবে?
অলীক বলল, আমার তো মনে হয় অনন্ত কালেও না।
এমন বলছ কেন, কেউ কি গ্রামে যায় না সার্ভিস করতে?
কেন যাবে না রাই, কিন্তু আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না আমি ওখানে গিয়ে কী করব, উফ্, রিমোট ভিলেজ, গ্রামে টেররিস্টদের আস্তানা।
এত সব ভেবে নিয়েছ, ওয়েট করো, দ্যাখো কী বলে তোমার বস।
হুম, ওয়েট তো করছি, বস বলবে না মহাপাত্র বলবে তাই ধরতে পারছি না, বস আদপে আমাকে বদলি করেছে কিনা কে জানে।
স্মাইলি লিখল রাই, বলল, তুমি একটা কাজ করতে পার, ফেসবুকে লোকটাকে খোঁজ করো, সে নিশ্চয় থাকবে, আমি একটু উঠছি।
রাই-এর সঙ্গে কথা শেষ হয়ে গেল। ফেসবুকে কথা হচ্ছিল। রাই অফলাইন হলো। তাদের সঙ্গে বছর দুই-এর বন্ধুতা। আলাপ এই ফেসবুকে। রাই তার ছবির পরিবর্তে শাদা কালোয় মধুবালা। তার বন্ধুর সংখ্যা আগে কম ছিল। কিন্তু তার ভিতরেই অলীক হয়ে গিয়েছিল। রাই ভেবেছিল অলীক তার আসল নাম নয়। ফেসবুকের বন্ধুদের মতো সে ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ডের বাসিন্দা। সে জিজ্ঞেস করেছিল, তোমার রিয়েল নেম?
আই অ্যাম অলীক সোম।
তুমি কি সত্যিই অলীক?
হ্যাঁ।
ফেসবুকে অলীক?
নো খুকুমনি, আয়াম অলীক ইন মাই বার্থ সার্টিফিকেট।
আয়াম নট খুকুমনি।
তুমি খুকুমনিই বটে।
তাহলে তুমি খোকাবাবু। রাই জবাব দিয়েছিল। হা হা করে হেসেছিল অলীক। রাই তখন প্রেমে প্রত্যাখ্যাতা। তার তরুণ অধ্যাপক তার সঙ্গে এক বছর ঘুরে তাকে পরিত্যাগ করেছে। ফেসবুকে আলাপের সাতদিনের ভিতরে তা কবুল করেছিল রাই, আমি খুব ডিস্টার্বড অলীক, আমি জানি না আমি কী করব।
সেই থেকে রাইকে নানাভাবে উজ্জীবিত করেছে অলীক। এখন তারা খুব বন্ধু। রাইয়ের দুঃসময়ে অলীক তার পাশে দাঁড়িয়েছিল। সদ্য আলাপ তখন, ফেসবুকেই দেখা হত ঠিক রাত সাড়ে নটার সময়। ওই-ই তাদের নিয়মিত সাক্ষাৎ। তারপর অনেক দিন, তা প্রায় বছর ঘুরে গেলে রাই একদিন বলল, তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে হয় অলীক, তুমি কি আত্মপ্রকাশ করবে?
তুমি কি চাও আমি আত্মপ্রকাশ করি এখন?
হ্যাঁ, এতদিন ধরে আমি নিজেকে প্রস্তুত করেছি, সব পুরুষেই আমার ভয় হয়ে গিয়েছিল অলীক, দ্যাট ম্যান, সেই চক্রবর্তী আমাকে ওই একটা বছর কী ভাবে না ব্যবহার করেছিল, আমি ওর জন্য ক্লাস কামাই করে লাইব্রেরিতে বসে ৫০ বছরের পুরনো পত্রিকা ঘেঁটে ঘেঁটে কত আর্টিকেল কপি করেছি, হারিয়ে যাওয়া রেকর্ড খুঁজে এনেছি ধর্মতলা থেকে, বাবার কালেকশনের বই ওকে দিয়ে দিয়েছি, রেয়ার বই, জারমান শেফারস এ পেন এনে দিয়েছিল আমার মামাতো দাদা, ও দেখে বলল, ও নাকি পেন কালেক্টর, আমি দিয়ে দিয়েছি, ওহ, মানুষ এতো অকৃতজ্ঞ হয়!
প্রেম কি কৃতজ্ঞতা থেকে জন্মায়? অলীক জিজ্ঞেস করেছে।
আমি জানি না অলীক, যত ভাবছি, তত কাঁদছি, আমি কাঁদছি। চাপা গলায় বলল রাই।
সে চলে গেল কেন?
আর একটা মেয়েকে নিয়ে ঘুরছে, সেও ওর জন্য লাইব্রেরিতে গিয়ে বসে নোট করছে ওর দরকারি তথ্য, ওর জন্য কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের ভাবনা শতক জোগাড় করছে, ওই বই পাওয়া যায় না, রেয়ার, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদেও নেই।
অলীক বলল, এসব কথা তুমি জানলে কী করে?
কী করে জানব, ললিতাই তো আমাকে বলেছে।
সে জানে না তোমার ঘটনা?
কার কাছে যেন শুনেছিল, বিশ্বাস করেনি, না অলীক, আমি কিছু বলিনি।
যাকগে, ভালই হয়েছে, একেও কাজ মিটলে ছেড়ে দেবে।
ওই চক্রবর্তী আমাকে রীতিমতো ইউজ করেছে, আমি তোমাকে সব বলতে পারব না।
বলতে হবে না, তুমি বেঁচে গেছ রাই।
রাই বলল, আমি আসলে রাই নই, আমার নাম অন্য, কিন্তু রাই নামটা আমার খুব পছন্দ, আমি তাই ফেসবুকে ওই নামটা নিয়েছি, আমার আসল নাম অন্য কিছু মুখার্জি, আমার দাদু, মায়ের বাবা দিয়েছিলেন একটা রুশ নাম, নাতাসা, ভানিয়া, সাশা, আনা—এই রকম কিছু।
আমি তাহলে ভানিয়া বলব না রাই বলব?
তোমার যা ইচ্ছে।
অলীক জিজ্ঞেস করেছিল, তোমার কী ইচ্ছে?
রাই রাই, আমি রাই মুখার্জি, দেয়ার ইজ নো এগজিস্টেন্স অফ রাই মুখার্জি ইন দি রিয়েল ওয়ার্ল্ড, রাই নামটা আমি ভুলেই গেছিলাম, আমার ঠাকুরদা দিয়েছিলেন এইটা, যখন চক্রবর্তী আমাকে চিট করল, আমি রাই হয়ে ফেসবুকে এলাম, মধুবালার ছবি সঙ্গে, প্রথম দিনেই চক্রবর্তী আমাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিল, ও নতুন নতুন চায়, ফেসবুক থেকে মেয়ে তোলে, অ্যান্ড আই রিফিউজড হিম।
অলীক বলল, রাই, তাহলে কবে দেখা হবে।
রাই চুপ করে থাকল। তারা তখন ইমাজিনারি গঙ্গার তীরে বসেছিল। কুলকুল করে বহিয়া যাইতেছিল স্রোতস্বিনী। তখন জোয়ার শেষ হইয়া ভাটার আরম্ভ। অপরাহ্নকাল শেষ হইয়া আসিতেছিল, গঙ্গার অপর তীরে সূর্যাস্ত হইতেছে। আলো নিভিয়া আসিতেছে। সেই নিভন্ত সূর্যালোকের ভিতরে দিকহারার মতো বলল রাই, আমার ভয় করছে অলীক, আমি তারপর কোনো ছেলের সঙ্গে জড়াইনি, কিন্তু আমি তো কত চিঠি পেয়েছি, মেসেজ, রাই হয়ে ওই খারাপ লোকটার কাছ থেকেও, হি প্রোপোজড মি, হি ইজ সো ট্রেচারাস, তার জন্য ললিতা বই খুঁজে বেড়াচ্ছে, নিজের পয়সায় বই কিনে আনছে আর সে নেটে পর্ণ দেখছে, ফেসবুকে বসে মেয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে, প্রোপোজ করছে, চ্যাট করবে।
অলীক বলল, লোকটার নাম কী?
তুমি রিকোয়েস্ট পাঠালেও সে তোমার রিকোয়েস্ট অ্যাক্সেপ্ট করবে না, তার বন্ধুরা সবাই মেয়ে, তাদের সঙ্গে সে ইনবক্সে চ্যাট করে রাত ন’টা থেকে, সাতটা অবধি ললিতা তার সঙ্গে থাকে, তারপর ফেসবুকের নারীরা।
অলীক বলল, একদিন সে ফেঁসে যাবে, তুমি জানো কত পুরুষ লোক মেয়ের নামে অ্যাকাউন্ট খোলে ফেসবুকে, তারপর লোকটার দুবর্লতা খুঁজে নিয়ে ব্ল্যাক মেইল, মি-টু কেস খেয়ে যাবে, সব স্ক্রিনশট ফেসবুকে চলে আসবে, ওর চাকরি চলে যাবে।
জানে রাই। আবার এও জানে, স্যারের কাজ করে আনলে ললিতা একটু আদর পাবে, সে যেমন পেত। চুমু উম উম, বুকে ব্যথা পেয়েও কী সুখ। ইচ্ছে মতো শরীর ছেনে সে ক্ষান্ত হতো। তাতে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকত রাই তার মুখের দিকে। শয়তান শয়তান। রাই বলছে সব, তুমি একটু বিপদে পড়েছ অলীক, এখন আমি তোমার পাশে দাঁড়াই তা তুমি চাও?
চাই তো।
এক বছরের উপর আমরা রাত নটা থেকে সাড়ে দশটা এগারটা বারোটা গল্প করি, কিন্তু কেউ কাউকে দেখিনি।
অলীক বলল, এক বছর আমরা সারা কলকাতা হেঁটে বেড়িয়েছি, শিমুলতলা গিয়েছি, অযোধ্যা পাহাড়, মাঠাবুরু গিয়েছি, মনিহারি গ্রামে গিয়ে ছোট একটা নদী ঝুমরির সঙ্গে কথা বলেছি, যে কোনও দিন যে কোনও জায়গায় চলে যেতে পারি, তাই তো।
এইটা আমরা পারি, মিছিলে হাঁটতে পারি, বিক্ষোভে অংশগ্রহন করতে পারি, কত কিছু পারি, একদিন একাডেমিতে গিয়ে পেইন্টিং দেখব, একদিন কলেজ স্ট্রিট গিয়ে বই পছন্দ করব, তোমাকে অরুন্ধতী রায়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব।
ওহ, অরুন্ধতী রায়, তাকে তুমি পাবে কোথায় অলীক?
কেন কফি হাউসে বসে থাকবেন, তাঁকে কেউ চিনতে পারবে না, তোমাকে দেখে হাত তুলবেন, হাই রাই।
ওহ দারুণ হবে তা, উনি নতুন বইয়ের কথা বলবেন, আমরা শুনব।
হুঁ। অলীক সাড়া দেয়, অরুন্ধতী রায় বলবেন, রাই মুখার্জির জন্যই তিনি বসে আছেন।
এতদিন বাদে একটি পুরুষকে আমার দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে। রাই বিনবিন করে বলল।
অলীক বলল, আমার ফোটোটা তো অরিজিনাল, কিন্তু তোমার ছবি তো তন্দ্রা বর্মণ, তুমি নও, আমি জানি না কতদিন তোমাকে দেখেছি, কিন্তু চিনি না বলে পাশ কাটিয়ে চলে গেছি, অদ্ভুত, আমরা এক অলীক সময় আর অলীক পৃথিবীতে দিন কাটিয়েছি রাই।
হতে পারে, আমি কতদিন উল্টোদিকের ফুটপাথে, তোমার মত কাউকে দেখে অবাক হয়ে এগিয়ে গেছি, না, একদম না, ও অলীক হোক না হোক, ঠিক সাড়ে ন’টায় আমাদের দেখা হবে, তার আগে কিছুতেই নয়।
অলীক বলল, কাউকে কাউকে অবাক হয়ে আমাকে দেখতে দেখি, হয়ত তাদের মধ্যে রাইও থাকে এক একদিন।
রাই বলল, এস তাহলে, আমরা পরস্পরের কাছে আত্মপ্রকাশ করি।
৫
সুনীতা বলল, তোমাকে আমি একটা নাম দেব, তার সঙ্গে কথা বলে দেখতে পার।
সে কে?
অঞ্জন রায়, সে সুশান্ত করের বন্ধু।
তার কাছে সুশান্তর নাম্বার আছে?
আছে, কিন্তু এই নাম্বার, সুশান্ত কি ইতালি নিয়ে চলে গেল? সুনীতা জিজ্ঞেস করল যেন নিজেকেই।
ইতালি! আশ্চর্য!
হাঁ, ইতালিতে আমাদের প্রোজেক্ট আছে, টপ বস হয়তো সুশান্তকে ওখানে নিয়ে গেছেন, সুশান্ত হয়তো চাকরি ছাড়েনি। বলতে বলতে সুনীতা তার ওড়না ভাল করে পেতে নিল বুকের উপর। মেয়েটি পাঁচ ফুট আট। মেয়েদের এত হাইট দেখা যায় না। গায়ের রঙ ময়লা ময়লা, কালো চোখের মণি দ্যুতিময়। সুনীতা একজনের সঙ্গে এঙ্গেজ। সেও রাঁচির ছেলে। শিবপুরের এঞ্জিনিয়ার। আছে বাঙ্গালুরু। তার সঙ্গে খুব শিগগির বিবাহে বসবে সুনীতা, তাই বলেছে সে। সে অলীকের ভালো বন্ধু। অলীককে তার বদলির কথা থেকে তাকে নানা কথা নানা অনুমানের কথা বলে যাচ্ছে। এই যে এখন বলছে সুশান্ত কর ইতালিতে চলে যেতে পারে, যেমন মহাপাত্রর কথা মতো সে যাবে ইউ কে। বস কোনো ব্যাপারেই কোনো কিছুর প্রচার চান না। তিনি নিভৃতে কাজ করতে ভালোবাসেন।
বসের নাম কী? অলীক জিজ্ঞেস করে।
বসের আবার নাম কী, তিনি বস, বসই জানবে, তিনি স্যার, স্যার বললেই হবে।
তিনি মহাপাত্রর কত উপরে?
সুনীতা বলল, মহাপাত্র স্যার পাঁচ ফুট ছ ইঞ্চি হলে, টপ বস ছ ফুট তিন ইঞ্চি, লাইক অমিতাভ বচ্চন।
ইতালিতে আমাদের কী প্রোজেক্ট? অলীক জিজ্ঞেস করে।
জানি না তো। সুনীতা বলল, সোফিয়া লোরেনের গ্রাম দেখতে যাব।
সোফিয়া লোরেনের গ্রাম আছে? অলীক অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
নিশ্চয়ই আছে, গ্রামে পাহাড়ের ধারে, আঙুরলতায় ছাওয়া কুটির।
অলীক বলল, সেটা নিশ্চয় প্রোজেক্ট না, কিন্তু প্রোজেক্ট আছে কে বলল?
মহাপাত্র স্যার।
আমরা গিয়ে কী করছি?
সুনীতা বলে, কিছু একটা করছি।
অলীক বলল, যে রাস্তার মোড়ে মুসোলিনির ফাঁসি হয়েছিল, সেই রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াব আমি আর রাই।
সুনীতা হাসল, যাও, অলীক ভ্রমণ।
হ্যাঁ, এমনি না হলে অমনি হয়, সোফিয়া লোরেনের গ্রাম, মারসেল্লো মাস্ত্রোয়ানির টাউন, ভেনিসের গণ্ডোলা, জলপথে ভ্রমণ, ভুল সবই ভুল, এই জীবনের পাতায় পাতায় যা লেখা আছে, ভুল…।
বাহ্ রে, গানটা আমাদের বাড়িতে বাজে ইউটিউব থেকে।শুনিনি, যাক গে, আমার কী হবে? প্রোজেক্টটা কী?
মহাপাত্রকে জিজ্ঞেস করলে কি বলবে? বলবে না। অস্ফুট মন্তব্য করল সুনীতা।
না, আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, উনি বলেননি।
সুনীতা বলল, কী দরকার জানার, যা হয় প্রোজেক্ট আছে একটা।
অলীক চুপ করে বসে থাকে। সুনীতাও চুপ। মহাপাত্রকে ফোন করবে বলে অলীক ইন্টারকম তুলে এনগেজড সাউন্ড পায়। মনে হয় রিসিভার নামানো নেই। মহাপাত্র কারোর সঙ্গে কোনো কথা বলতে চায় না। সুনীতা বলল, আমি নেট সার্ফ করে দেখেছি, কিন্তু তেমন কিছু পাইনি।
বড় সায়েব ইতালি ঘুরতে যান, তার মানেই ইতালিতে আমাদের প্রজেক্ট নয়।
আমরা ইরাকেও কাজ করছি, কন্সট্রাকশন ওয়ার্ক, গাজাতে করব, ইউক্রেইনে করব।
কে বলল, মহাপাত্র স্যার?
ইয়েস, স্যার।
অলীক বলল, আচ্ছা মহাপাত্রই কি টপ বস হতে পারে?
তা কেন হবে, টপ বস তো পৃথিবীময় ঘুরে বেড়ান।
সেও তো মহাপাত্রর বলা। অলীক বিড়বিড় করে বলল।
হি ইজ দি রাইট হ্যান্ড অফ আওয়ার বস, তিনি সব জানেন।
অলীক বলল, না, আমার মনে হচ্ছে শুধু ডান হাত নয়, বাম হাতও, তিনিই টপ বসের বডি, তিনিই হাত পা মাথা আর ব্রেন।
খিলখিল করে হাসে সুনীতা, বলল, তোমার ফেসবুকের রাইয়ের মতো নিজের আইডেন্টিটি লুকিয়ে?
ইয়া, হতেই পারে। অলীক জবাব দেয়।
তখন অলীকের ইন্টারকম বেজে ওঠে। সে তুলতেই ওপারে মহাপাত্রর কণ্ঠস্বর, আমার ঘরে একটু আসবে অলীক।
ইয়েস স্যার, যাচ্ছি।
সুনীতাকে বসিয়ে রেখে অলীক চলল। এই প্রতিষ্ঠান আসলে কী কাজ করে তা অলীক ভালো ভাবে জানে না। তার কাজও যে কি সে তা ভালো জানে না। এখনো পাকা কাজ দেয়নি। দায়িত্ব দেয়নি। তাকে মাঝে মধ্যে কম্পিউটারে অনেক নাম এন্ট্রি করতে হয়। কিন্তু তা করার পর মহাপাত্র হয়তো বলে বসে, ওগুলো ডিলিট করে দাও।
তাহলে এন্ট্রি করলাম কেন স্যার?
পরে শুনবে। মহাপাত্র গম্ভীর গলায় জবাব দেয়।
মহাপাত্রর ঘরে ঢুকল অলীক। ঘরে মহাপাত্রর সঙ্গে মহাত্মা গান্ধির ফোটো। কী রকম লাগে দেখলে। মহাপাত্রর বয়স পঞ্চাশের বেশি নয়। গান্ধি তো দেড়শো পার হয়ে গেছেন। মহাপাত্রর এই ছবিটা সুপার ইম্পোজিশনে তৈরি। কিন্তু মনে হয় সত্যি। একটি ছবি বার বার দেখতে দেখতে সত্যি মনে হয়। যেমন রাইয়ের সঙ্গে তন্দ্রা বর্মণ। সেই হিরোয়িনের শাদা কালো ছবি রাইয়ের প্রোফাইল পিকচার। রাই আর অলীকের জন্মের অনেক আগে তন্দ্রা বর্মণ কেঁদেছিল, ভুল সবই ভুল গাইতে গাইতে। “চলে গেলে ডাকবে না তো কেউ পিছু, স্মৃতি আমার থাকবে না তো আর কিছু। যদি ভাবি এই আমি আর নই একা, সে ভুল। ভুল সবই ভুল, এই জীবনের পাতায় পাতায় যা লেখা, সে ভুল।”
তার অনেক ছবিই নাকি মুক্তি পায়নি। সত্যজিৎ রায় অপরাজিত ছবিতে অপুর কিশোরী প্রেমিকা লীলার চরিত্রে তাকে নিয়ে শুটিং করেছিলেন বোটানিকাল গার্ডেনে, কিন্তু পরে লীলাকে বাদ দিয়েই অপরাজিত ছবি হয়। সব ব্যর্থতা নিয়ে তন্দ্রা বর্মণ। একটি ছবিতেই চিরকালীন। এসব অলীক জেনেছে ইন্টারনেট থেকে। রাইয়ের কাছ থেকেই জেনেছে রাইয়ের ছবি তন্দ্রা বর্মণের। কিন্তু তার মনে হয় রাইয়ের ছবিই ঐটা। আসলে তন্দ্রা বর্মণের মুখে রাইয়েরই মুখ বসিয়ে দিয়েছে কেউ।
মহাপাত্র বলল, তুমি কবে যাচ্ছ?
কোথায় স্যার, লান্ডান?
হাসল মহাপাত্র, নো অলীক, শিলং থেকে সুরগুঞ্জা হিল।
কী করব স্যার ওখানে গিয়ে?
সে ওখানে গিয়ে জানতে পারবে।
কবে যেতে হবে? অলীক জিজ্ঞেস করল।
মহাপাত্র বলল, বস জানালেই হবে, বস আজ শিলঙে, মেঘালয়ের ক্যাপিটল।
অলীক সাহস করে বলল, বসের নাম্বার দেবেন স্যার, আমি লান্ডান যেতে পারি, কিন্তু আপনার সুরগুঞ্জা হিল যাব না, তাহলে আমি রিজাইন দেব।
তোমাকে পার মান্থ একলাখ দেওয়া হবে ওখানে আগে গেলে, আমরা সবাই একটু একটু করে ওখানে শিফট করে যাব, কলকাতা, ওয়েস্টবেঙ্গলে আমরা আর থাকব না, ক্যান ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড? ইয়েস স্যার, কিন্তু আমি তো লান্ডান যেতে রাজি।
লান্ডান যাবে সুরগুঞ্জা হিল হয়ে।
অলীক বলল, বসের নাম্বারটা দেবেন স্যার।
মহাপাত্র চুপ করে থাকল একটু সময়, তারপর বলল, অলীক তুমি যাও, খুব সুন্দর জায়গা, কমলা লেবু আর চা বাগান, প্রচুর কাঁচা টাকা, কালেক্ট করতে হবে।
অলীক বলল, স্যার, সুশান্ত কর কি ভেনিস গেছে?
কে সুশান্ত?
সুরগুঞ্জা হিলে ছিল, ম্যানেজার অফ এম কোম্পানি।
সুরগুঞ্জা হিলে আমাদের কোনো ব্রাঞ্চ ছিল না, ছিল নর্থ ইস্ট মেঘালয়ের অন্য জায়গায়।
সুশান্ত কোথায় স্যার? অলীক একই কথা আবার জিজ্ঞেস করল।
আমি তো অমন কাউকে চিনি না, হু টোল্ড ইউ? বিরক্ত হচ্ছে মহাপাত্র, বিরক্তি প্রকাশ করল।
আমি জানি স্যার সুশান্ত কর ছিল।
তুমি জান, আমি জানি না! তুমি আসল কবে যাবে বল।
সুশান্ত করকে জিজ্ঞেস করে যাব স্যার।
মহাপাত্র বলল, তুমি ঠিকঠাক জান না অলীক, শোনো, মহাত্মা ভেঙে মহাপাত্র কোম্পানি স্টার্ট করছি আমি সুরগুঞ্জায়, সম্পূর্ণ নতুন জায়গা, এভরি থিং ইজ রেডি, ওখানে কেউ মহাত্মা কোম্পানিকে চিনত না, তুমি গেলেই মহাপাত্র কোম্পানিকে চিনবে, তারপর এই কলকাতার মহাত্মায় তালা পড়ে যাবে, নর্থ ইস্টের মহাত্মাতে তালা পড়ে গেছে, মহাত্মা ভ্যানিশ, এবার এদিকের ফ্রেস স্টাফ ওদিকে যাবে, ওদিকের সব এদিকে আসবে নতুন মহাপাত্র কোম্পানিতে। বুঝতে পারছ, এর পর এখানে থাকা রিস্কি, পাবলিক এসে ভীড় জমাবে, তারা তাদের টাকা ফেরত চাইবে, চার ধারে একটা সোরগোল পড়ে গেছে মানি মারকেটে, ভূমিকম্প হয়ে যাবে মনে হচ্ছে।
অলীক এমন কিছু ভাবছিল, বলল, বস তাহলে আপনিই?
কেন অসুবিধে আছে? মহাপাত্র জিজ্ঞেস করল।
না স্যার, এইটা ভালো হল, আমি সুরগুঞ্জা হিলস যাব না।
মহাপাত্র বলল, কলকাতায় থাকলে বিপদ হবে।
অলীক বলল, সুরগুঞ্জা হিলস যাব, কিন্তু সঙ্গে আমি আর রাই, তন্দ্রা বর্মণ যার মতো দেখতে ছিলেন।
তার মানে? হকচকিয়ে গেল মহাপাত্র, বলল, সেই নায়িকা তো ২০১৮ সালে মারা গেছেন বৃদ্ধা হয়ে, তোমার গার্লফ্রেন্ডের বয়স কত?
জানি না স্যার, হয়ত বাইশ-তেইশ। অলীক ভোলেভালে গলায় জবাব দিল।
কী যে বল তুমি অলীক, তন্দ্রা বর্মণ তার মতো হবে কেন, সে জন্মাল কবে, এই শতাব্দীতে, তন্দ্রা বর্মণের অতল জলের আহ্বান নাইনটি সিক্সটি টুএ রিলিজ করেছিল।
অলীক বলল, হতে পারে স্যার, আমি রাইকে দেখিনি এখনও, দেখলে বলতে পারব।
মহাপাত্র হাঁ করে তাকিয়ে আছে অলীকের দিকে। অলীকের কথাগুলি বুঝে নিতে চাইছিল। কিন্তু কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিল না। নিজের গার্ল ফ্রেন্ড হোক, প্রেমিকা হোক, তার সঙ্গে বেড়াতে যায়, কিন্তু তাকে দ্যাখেনি? না দেখে প্রেম হয় কী করে। সব মিথ্যে মিথ্যে মিথ্যে, এর ভিতরে অন্য কিছু কথা আছে নিশ্চয়। অলীক এক বিপজ্জনক যুবক।
৬
সুনীতা বলল, তুমি এখন কোথায় যাবে অলীক?
কোথাও না, কিন্তু বাড়ি ফিরতেও ইচ্ছে করছে না।
বাড়িতে তোমার কে আছে?
আমার মা বাবা আর বোন চন্দনা, বড়দা থাকে জামসেদপুর।
সুনীতা বলল, চলো আজ আমার ওখানে যাবে, তুমি আজ খেয়ে ফিরবে, মাকে বলে দাও ফোনে।
তুমি তো একা থাকো। অলীক বলল, মেস করে থাকো ক’জন?
তাই, কিন্তু এখন আমার বোন রনিতা এসেছে, ওর একটা এগজাম আছে নেক্সট উইকে, সারাদিন ফাঁকা বাড়িতে বসে পড়ে।
কিসের এগজাম? অলীক জিজ্ঞেস করল কৌতুহলে।
সার্ভিস, ও খুব স্টুডিয়াস, আমার রুম মেট চন্দ্রিমা বাড়ি গেছে।
রাত আটটার সময় অনলাইন হবে রাই। আজ তারা গড় মান্দারণ যাবে, বঙ্কিমচন্দ্রের দুর্গেশনন্দিনী উপন্যাসের গড় মান্দারণ, এইতো আরামবাগের পথে। সে বুঝিয়ে দেবে চিনিয়ে দেবে রাইকে। কী বোঝাবে?
“৯৯৭ বঙ্গাদের নিদাঘশেষে একদিন একজন অশ্বারোহী পুরুষ বিষ্ণুপুর হইতে মান্দারণের পথে একাকী গমন করিতেছিলেন। দিনমণি অস্তাচলগমনোদ্যোগী দেখিয়া অশ্বারোহী দ্রুতবেগে অশ্ব-সঞ্চালন করিতে লাগিলেন। কেন না, সম্মুখে প্রকাণ্ড প্রান্তর; কি জানি, যদি কালধর্ম্মে প্রদোষকালে প্রবল ঝটিকা-বৃষ্টি আরম্ভ হয়, তবে সেই প্রান্তরে নিরাশ্রয়ে যৎপরোনাস্তি পীড়িত হইতে হইবেক। প্রান্তর পার হইতে না হইতেই সুর্য্যাস্ত হইল; ক্রমে নৈশগগন নীলনীরদমালায় আবৃত হইতে লাগিল। নিশারম্ভেই এমত ঘোরতর অন্ধকার দিগন্ত-সংস্থিত হইল যে, অশ্বচালনা অতি কঠিন হইতে লাগিল। পান্থ কেবল বিদ্যুদ্দীপ্তি-প্রদর্শিত পথে কোন মতে চলিতে লাগিল।”
শুনতে শুনতে রাই বলল, উফ, মনে হচ্ছে ঝড় আসছে, কালবৈশাখী, সেই ঝড়ের মেঘ আমি দেখতে পাচ্ছি, অলীক আমার হাত ধর।
অলীক বলল, তুমি তো দুর্গেশনন্দিনী, মন্দিরের ভিতর আছ, বাইরে ঝড় বৃষ্টি, প্রলয় ঘটিয়া গেল।
“অল্পকাল মধ্যে মহারবে নৈদাঘ-ঝটিকা প্রধাবিত হইল, এবং সঙ্গে সঙ্গে প্রবল বৃষ্টিধারা পড়িতে লাগিল। ঘোটকারূঢ় ব্যক্তি গন্তব্য-পথের আর কিছুমাত্র স্থিরতা পাইলেন না। অশ্ব-বল্গা শ্লথ করাতে অশ্ব যথেচ্ছ গমন করিতে লাগিল। এইরূপ কিয়দ্দূর গমন করিলে ঘোটকাচরণে কোন কঠিন দ্রব্য়সংঘাতে ঘোটকের পদস্খলন হইল। ঐ সময়ে একবার বিদ্যুৎ প্রকাশ হওয়াতে পথিক সম্মুখে প্রকাণ্ড ধবলাকার কোন পদার্থ চকিতমাত্র দেখিতে পাইলেন। ঐ ধবলাকার স্তূপ অট্টালিকা হইবে, এই বিবেচনায় অশ্বারোহী লাফ দিয়া ভূতলে অবতরণ করিলেন। অবতরণমাত্র জানিতে পারিলেন যে, প্রস্তরনির্মিত সোপনাবলীর সংস্রবে ঘোটকের চরণ স্খলিত হইয়াছিল; অতএব নিকটে আশ্রয়স্থান আছে জানিয়া, অশ্বকে ছাড়িয়া দিলেন। নিজে অন্ধকারে সাবধানে সোপানমার্গে পদক্ষেপ করিতে লাগিলেন। অচিরাৎ তড়িতালোকে জানিতে পারিলেন যে, সম্মুখস্থ অট্টালিকা এক দেবমন্দির। কৌশলে মন্দিরের ক্ষুদ্র দ্বারে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন যে, দ্বার রুদ্ধ, হস্তমার্জনে জানিলেন দ্বার বহির্দিক হইতে রুদ্ধ হয় নাই।”
যুবক তুমি কি সেই অশ্বারোহী, গড় মান্দারণের পথে আসিতেছিলে? চাপা গলায় রাই বলল।
“এই জনহীন প্রান্তরস্থিত মন্দিরে, এমত সময়ে, কে ভিতর হইতে অর্গল আবদ্ধ করিল, এই চিন্তায় পথিক কিঞ্চিৎ বিস্মিত ও কৌতূহলাবিষ্ট হইলেন। মস্তকোপরি প্রবল বেগে ধারাপাত হইতেছিল, সুতরাং যে কোন ব্যক্তি দেবালয়-মধ্যবাসী হউক, পথিক ভূয়োঃভূয়ঃ বলদর্পিত করাঘাত করিতে লাগিলেন, কেহই দ্বারোন্মোচন করিতে আসিল না। ইচ্ছা, পদাঘাতে কবাট মুক্ত করেন, কিন্তু দেবালয়ের পাছে অমর্যাদা হয়, এই আশঙ্কায় পথিক ততদূর করিলেন না; তথাপি তিনি কবাটে যে দারুণ করপ্রহার করিতেছিলেন, কাষ্ঠের কবাট তাহা অধিকক্ষণ সহিতে পারিল না, অল্পপরেই অর্গলচ্যুত হইল। দ্বার খুলিয়া যাইবামাত্র যুবা যেমন মন্দিরাভ্যন্তরে প্রবেশ করিলেন, অমনই মন্দিরমধ্যে অস্ফুট চীৎকারধ্বনি তাঁহার কর্ণে প্রবেশ করিল ও তন্মুহূর্তে মুক্তদ্বারপথে ঝটিকাবেগ প্রবাহিত হওয়াতে, তথায় যে ক্ষীণ প্রদীপ জ্বলিতেছিল, তাহা নিবিয়া গেল। মন্দিরমধ্যে মনুষ্যই বা কে আছে, দেবই বা কি মূর্তি, প্রবেষ্টা তাহার কিছুর দেখিতে পাইলেন না। আপনার অবস্থা এইরূপ দেখিয়া নির্ভীক যুবা পুরুষ কেবল ঈষৎ হাস্য করিয়া, প্রথমতঃ ভক্তিভাবে মন্দিরমধ্যস্থ অদৃশ্য় দেবমূর্তিকে উদ্দেশে প্রণাম করিলেন। পরে গাত্রোত্থান করিয়া, অন্ধকারমধ্যে ডাকিয়া কহিলেন, “মন্দিরমধ্যে কে আছে?” কেহই প্রশ্নের উত্তর করিল না; কিন্তু অলঙ্কার-ঝঙ্কারশব্দ কর্ণে প্রবেশ করিল। পথিক তখন বৃথা বাক্য়ব্যয় নিষ্প্রয়োজন বিবেচনা করিয়া, বৃষ্টিধারা ও ঝটিকাপ্রবেশরোধার্থ দ্বার যোজিত করিলেন, এবং ভগ্নার্গলের পরিবর্তে আত্মশরীর দ্বারে নিবিষ্ট করিয়া পুনর্বার বহিলেন, “যে কেহ মন্দিরমধ্যে থাক, শ্রবণ কর; এই আমি সশস্ত্র দ্বারদেশে বসিলাম, আমার বিশ্রামের বিঘ্ন করিও না। বিঘ্ন করিলে যদি পুরুষ হও, তবে ফলভোগ করিবে; আর যদি স্ত্রীলোক হও, তবে নিশ্চিন্ত হইয়া নিদ্রা যাও, রাজপুতহস্তে অসিচর্ম থাকিতে তোমাদের পদে কুশাঙ্কুর বিঁধিবে না।”
“আপনি কে?” বামাস্বরে মন্দিরমধ্য হইতে এই প্রশ্ন হইল। শুনিয়া সবিস্ময়ে পথিক উত্তর করিলেন, “স্বরে বুঝিতেছি, এ প্রশ্ন কোন সুন্দরী করিলেন। আমার পরিচয়ে আপনার কি হইবে?”
মন্দিরমধ্য হইতে উত্তর হইল, “আমরা বড় ভীত হইয়াছি।”
যুবক তখন কহিলেন, “আমি যেই হই, আমাদিগের আত্মপরিচয় আপনার দিবার রীতি নাই। কিন্তু আমি উপস্থিত থাকিতে, অবলাজাতির কোন প্রকার বিঘ্নের আশঙ্কা নাই।”
রমণী উত্তর করিল, “আপনার কথা শুনিয়া আমার সাহস হইল, এতক্ষণ আমরা ভয়ে মৃতপ্রায় ছিলাম। এখনও আমার সহচরী অৰ্দ্ধমূচ্ছিতা রহিয়াছেন। আমরা সায়াহ্নকালে এই শৈলেশ্বর শিবপূজার জন্য আসিয়াছিলাম। পরে ঝড় আসিলে, আমাদিগের বাহক ও দাস-দাসীগণ আমাদিগকে ফেলিয়া কোথায় গিয়াছে, বলিতে পারি না।”
যুবক কহিলেন, “চিন্তা করিলেন না, আপনারা বিশ্রাম করুন; কাল প্রাতে আমি আপনাদিগকে গৃহে রাখিয়া আসিব।” রমণী কহিল, “শৈলেশ্বর আপনার মঙ্গল করুন।”
অলীক জিজ্ঞেস করল, দুর্গেশনন্দিনী পড়েছ সুনীতা?
কেন বল তো?
আমরা আজ গড় মান্দারণ যাব, সেই শৈলেশ্বরের মন্দিরে।
সুনীতা মুচকি হাসল, হাউ ফানি, তুমি সব সময় অদ্ভুত সব ভাব, তাই না?
আমরা দু’জনেই। বলল অলীক।
আটটায় অন লাইন হবে,সেই কথাই আছে। এখন সাড়ে পাঁচ। অফিস থেকে বেরিয়ে সুনীতার ফ্ল্যাট নয়াপট্টি মহিষবাথানের সেই বিপুল জলাশয়ের সামনে পৌঁছতে এক ঘন্টা। তারপর সেখান থেকে বেরিয়ে তার নিজের বাড়ি পৌঁছতে আরো এক ঘন্টা। আটটার সময় সে অনলাইন হতে পারবে না। আজ তারা কলকাতা থেকে বেরিয়ে নিউটাউনে চলে আসবে ঠিক করেছিল। বিদেশি এক শহরের মতো গড়ে উঠছে সেই শহর। মস্ত মস্ত আকাশচুম্বী বাড়ি, আলোর মালায় সাজানো মল, চওড়া চওড়া রাস্তা, সেখানে গেলে সিঙ্গাপুর কিংবা ব্যাঙ্কক এসে গেছে মনে হয়। তারা শুধু ঘুরে বেড়াবে তাদের ওয়াগনর নিয়ে। আজ রাই একটা ওয়াগনর নিয়ে আসবে কথা আছে। সেই গাড়ির রঙ হবে স্টিল গ্রে। রাই নিজে ড্রাইভ করবে। আর যদি মনে হয় তারা যাবে না নিউটাউন দেখতে, গাড়ি রেখে দিয়ে তারা হাঁটবে আপন মনে। নতুন সেই ওয়াগনার পড়ে থাকবে রাস্তার পাশে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘোড়ার মতো ঝিমোবে। তার উপরে ধুলো পড়বে। জল পড়বে আর রোদ পড়বে সারাবছর ধরে। তারপর সেই গাড়ি একদিন ধুলোর আস্তরণে ঢেকে যাবে। সেই ধুলোর উপর বিন্দু বিন্দু সবুজ তৃণ, বলতে বলতে দুজনে যেন চোখের সামনে দেখতে পেয়েছিল সব। তাহলে রাত আটটায় অন লাইন হতে পারছে না সে। ফোন নাম্বার নেই কারোর কাছে কারোর, সংবাদ দেবে কী করে? মোবাইল ফোনে নেটে অন হওয়া নিষেধ, তাহলে সারাদিন অনলাইন, তা হবে না, তা হবে না।
নিউটাউন না গড় মান্দারণ, শৈলেশ্বরের মন্দির? বঙ্কিমচন্দ্রর কথা শেষ হবে না দেড় ঘন্টায়? তাহলে? নিউটাউন না, গড় মান্দারণ না, তাহলে তারা যাবে কলকাতার এমন একটি জায়গায়, যেখানে পথ এখনো বিরল নির্জনতায় ডুবে থাকে। কী করে যাবে? হেঁটে হেঁটে অনেকদূর। সেই পল্লীটি সারাদুপুর ঘুমিয়ে ঝিমিয়ে বিকেলে আড়ামোড়া ভেঙে ওঠে। কোনো বাড়ির জানালা দিয়ে রজনীগন্ধার সুবাস বেরিয়ে আসে। তারা চুপচাপ হাঁটবে আর একটি দুটি কথা বলবে, যা বলবে তা যেন না বলারই মতো। বাতাসের ফিসফিসানির মতো। সেই চলার সময় কখনো হয়তো আঙুলে ছুঁয়ে যাবে আঙুল। প্রায় মৃদু বাতাসের পরশ। সেখানে বিকেলে সেই আশ্চর্য বাতাস আসে অজানা এক পথ ধরে। যে পথ ধরে তারা হেঁটে এসেছে, সেই পথে পথেই যেন বাতাস এসেছে হেঁটে তাদের পিছু পিছু। আসলে সে দিকহারা হয়ে পাক খাচ্ছিল, ঘূর্ণি হয়ে আকাশে উঠে যাবে ভাবছিল। যে বাতাস ঘুম পাড়ায়, ভালবাসার জন্ম দেয়, সেই বাতাসই তো টর্নেডো টাইফুন হয়ে লণ্ডভণ্ড করে দেয় সব। দিকহারা হলেই বুঝি বাতাস এমন নিষ্ঠুর পাগল হয়ে যায়। অলীক আর রাইয়ের পিছু পিছু এসে সেই বাতাস বুঝি দিক খুঁজে পেয়ে শান্ত হতো।
কত সময় ধরে হাঁটবে অলীক? রাই জিজ্ঞেস করে।
অলীক বলেছিল, যতক্ষণ না সেই চায়ের দোকানির দোকানে না পৌঁছই।
রাই জিজ্ঞেস করেছিল, সেই চায়ের দোকানেই বা যেতে হবে কেন, পথে কি আর চায়ের দোকান পড়বে না?
হ্যাঁ পড়বে, তারা সব কয়লার আঁচ ধরিয়ে কালো কেটলি চাপিয়ে জল ফোটাতে আরম্ভ করে দেবে বিকেল হতেই, কিন্তু সেই লোকটা কয়েন জমায়।
ওমা, তাই নাকি, তুমি কী করে জানলে? রাই জিজ্ঞেস করে।
আমার বাবা বলেছিলেন।
বাবা কি সেখানে গিয়েছিলেন, কোথায় সেই জায়গা?
গেলেই আমরা বুঝতে পারব সেই জায়গার নামটা কী, তার আকাশটা কেমন।
অলীক, তুমি এমন কথা বল না, আকাশ আবার কেমন হবে, আকাশ তো আকাশই।
অলীক বলেছিল, সেই যে সুরগুঞ্জা পাহাড়, সেখানে আকাশ খুব ভারী।
কে বলল, আকাশ কি ভারী হয়?
ট্যাক্সিতে সুনীতা আর অলীক। তারা সেই ডায়মন্ড হারবার রোড ধরে আসছে। ঠাকুরপুকুরের কাছ থেকে পুরোন কালিঘাট—ফলতা রোড, এখন যা বাইপাস, ধরে উত্তর পুবে যাচ্ছে মধ্য গতিতে। দুজনে দুটি জানালার ধারে। সুনীতা জিজ্ঞেস করল, তুমি কী ভাবছ বলো দেখি।
না কিছু না তো। অলীক সংক্ষিপ্ত জবাব দেয়।
চুপ করে আছ যে? সুনীতা জিজ্ঞেস করে।
আচ্ছা সেই সুরগুঞ্জা পাহাড়ের দেশে আকাশ কি ভারী?
কে বলল, তোমার সেই ফেসবুক ফ্রেন্ড?
না না, আমার মনে হল হঠাৎ।
সুনীতা হাসল, বলল, মেঘালয় তো, মেঘে মেঘে আকাশ ভারী হয়েই থাকে সেই মেঘের দেশে, একেক দিন আসবে, সারাদিন বৃষ্টি আর বৃষ্টি, আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদল দিনে, জানালার কাচের বাইরে দিয়ে বৃষ্টিই দেখে যাবে শুধু।
শুনল অলীক। কিছু বলল না। আজ মন হলে যে জায়গাটায় তারা যেত অনলাইন হয়ে সেখানে আকাশে মেঘ আছে, কিন্তু সেই মেঘ পালকের মতো ভেসে বেড়ায়। সেই মেঘের জন্ম হয়েছিল কপোতের ডানা থেকে খসে পড়া পালকে। সেই মেঘ আকাশকে হালকা করে দেয়। আর যে মেঘে আকাশ হয়ে ওঠে ভারী, সেই মেঘের জন্ম হয়েছিল পবর্তের ডানা থেকে। এক সময় পবর্তের নাকি ডানা ছিল। পবর্ত ডানা মেলে ঊড়ত। তার ফলে আকাশ হয়ে যেত ভীষণ ভার আর ঢেকে যেত সব আলো, চাঁদ আর সূয দেখাই যেত না। পবর্তের ছায়ায় ঢেকে যেত পৃথিবী। তখন দেবরাজ ইন্দ্র যুদ্ধে নামলেন, তিনিই পবর্তের ডানা ছিন্ন করলেন। সেই ছিন্ন ডানাই আকাশে ওড়ে। এই গল্প কে তাকে বলেছিল তা মনে নেই। নাকি কেউ বলেনি, সে নিজে নিজেই ভেবেছে এই রকম। সেই জায়গাটা, গত রাতে অন-লাইন হয়ে যেখানে সে আর রাই হেঁটে যাবে ভেবেছিল, কে বলেছিল তার কথা? তার বাবা কি? না সে নিজেই জেনেছে। একটা বুড়ো লোক সমস্ত জীবন ধরে নানা দেশের কয়েন, নোট জমিয়ে যাচ্ছে। কেউ দেখতে চাইলে দেখায়। ওই দেখতেই তার কাছে কতজন আসে। আর তাতেই তার দোকানটি চলে। পুরোন কয়েন, তামার পয়সা, ফুটো পয়সা, রুপোর টাকা, লাল দুয়ানি, সিকি আধুলি, মহান সম্রাট পঞ্চম জর্জের মুখ, মহারানি ভিক্টোরিয়ার মুখ খোদাই করা কয়েন দেখে কেউ কেউ ওকে পেনি রুবল ফ্রাঁ দিয়েও গেছে। আমাদের কাছে থাকবে না, তুমি রেখে দাও। সে খুঁজছে একটা নোট। কোন নোট, না সুন্দরবনের গোসাবা দ্বীপে স্যার ড্যানিয়েল হ্যামিল্টন প্রচলিত নোট। তাঁর সমবায়ে ওই নোটে কেনা বেচা হতো। এই সব কথা তাকে বলল কে? তার বাবা? নাকি অন্য কেউ? কোপেক, রুবল ফ্রাঁ, পেনি, লিরা, দিনার জমিয়ে জমিয়ে সেই বুড়ো এখন চায়ের দোকানটিকে যেন মস্ত একটা শপ করে দিয়েছে। সেখানে লিরা ফ্রাঁ দিনার রুবল একানি দুয়ানি চারানির বাজনা সমস্তদিন বাজতে থাকে। তার বস তাকে সুরগুঞ্জা পাহাড়ে মেঘালয় পাঠাবে। সেখানে বসে চিনা ইয়েন আর বারমিজ কয়েন পাওয়া অসম্ভব কিছু না। আলিপুরদুয়ারে তো ভুটানি টাকার ছড়াছড়ি। সেই সব কালেক্ট করতেই যেন তাকে মেঘালয়ে পাঠাচ্ছে তার কোম্পানি। কোম্পানি তো সেই বুড়োর মতো কয়েন কালেক্ট করে থাকে। কয়েন নয় রুপি। রুপি এই দেশে আর সেই ইতালি ফ্রান্স ইংল্যান্ড তুরস্ক গ্রিসে সেই সেই দেশের কারেন্সি। কী অদ্ভূত! কী কথা থেকে কী কথা সে বুঝে ফেলল। তার কোম্পানি মহাত্মা ইনভেস্টমেন্ট আসলে ওই কাজই করে। কয়েন রুপি ফ্রাঁ লিরা দিনার পাউন্ড শিলিং পেনি কোপেক রুবল সংগ্রাহক। টাকা তুলে বেড়ায়। ইতালি ফ্রান্স ইংল্যান্ডেও তুলছে। এক পেনি দিলে দু পেনি দেব, দুকা চার চার কা আট বিশ কা হান্ড্রেড, হান্ড্রেড কা হাজার, টেন টাইমস।
সুনীতা বলল, চুপ করে আছ কেন অলীক?
সে বলল, কই চুপ করে।
বাহ, চুপ করেই তো আছ।
অলীক বলল, সেই সুশান্ত কি ইতালিতে লিরা কালেক্ট করছে এখন?
খিলখিল করে হাসে সুনীতা, বলল, তুমি কি তাই শুনেছ?
আমার মনে হচ্ছে তাই।
সুনীতা বলল, মহাত্মা কোম্পানি কী বলে?
আমাদের কোনো কথার উত্তর জানে না, কিন্তু ওর কথার উত্তর আমাদের জানতে হয়, আমি মহাপাত্রর কথা বলছি। বলতে বলতে অলীক দেখল তারা ইস্টার্ন মেট্রোপলিটন বাইপাসে ঢুকছে। আকাশে একটি দুটি, ক্রমশ ভরে উঠছে তারা। ডানদিকের জলাভূমি থেকে ধেয়ে আসছে নরম বাতাস। আহ! অলীকের চোখ জুড়িয়ে আসে যেন। আটটার সময় অন লাইন হয়ে অপেক্ষা করে করে রাই শেষমেশ একা একা হাঁটতে আরম্ভ করবে? নাকি সেই ওয়াগনার নিয়ে ঢুকে পড়বে নিউটাউনে। অন্ধকার শহরে তারার মতো জ্বলছে বহুতলের জানালাগুলি। রাই কোনো একটার সামনে দাঁড়িয়ে উঁচু গলায় ডাকতে আরম্ভ করবে অলীক অলীক। হাই হাই। হেল্লো। রাই জানে না আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে এই ডাক দিলে কেউ শুনতে পাবে না। ভার্চুয়াল রিয়ালিটি আর দৈনন্দিন বাস্তবতা — স্বপ্ন আর বাস্তবতার মধ্যে যেখানে অদৃশ্য সেতু, সেখানে ওই কথা শোনা যায় কী করে? অলীক আর রাইয়ের ঠাকুমার ঝুলি, রূপকথা নেই, আছে ইন্টারনেট—ফেসবুক। সে তো প্রাচীন রূপকথার চেয়ে কম আকর্ষণীয় নয়। তার টান কম নয়।
৭
এই হলো সুনীতার বোন রনিতা। ও কবিতা লেখে অথচ সিভিল সার্ভিস দেবে। সিভিল সার্ভেন্ট কবি। সরকার যদি বলে কবিতা লেখা চলবে না, তখন?
অলীক তার হাত বাড়িয়ে অভ্যাসে ডেকে ওঠে, হাই। ইদানীং কী হয়, কখনো কখনো সব কিছুই মনে হয় সত্য কিন্তু সত্য নয়। বাস্তবে থেকেও অলীক। সে যেন মস্ত এক ল্যাপটপ খুলে বসে আছে। তার সমুখে যারা তারা অনলাইন হয়ে আছে। এই যেমন রনিতা নামের মেয়েটি। সে যেন সত্যই শাদা কালো ছবির যুগের কেউ। মুখখানি দেখ, ঠিক যেন তার জন্মের তিরিশ বছর আগের কেউ। প্রশ্ন করি নিজের কাছে কে আমি? কোথায় ছিলাম, কোথায় যাব এই আমি।
মাথায় রাশি রাশি মেঘের মতো চুল। খোলা চুলেই ছিল সে। এক ঝটকায় দুহাত উপরে তুলে দুই কনুইয়ে শূন্যতা বিদ্ধ করে চুলে এলো খোপা করে হাত নামাতে নামাতে হাসি মুখে বলল, নমস্কার অলীকদা, তুমি ভাল আছ তো, তোমার কথা এত শুনি দিদির কাছে যে তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে অনেকদিনের আলাপ যেন তোমার সঙ্গে, তুমি শিলং পাহাড়ে বদলি হয়ে যাচ্ছ, গ্রেট।
অলীক বাস্তবতা বুঝে নিতে চাইছিল। সে বসে আছে সোফায়। সোজাসুজি ব্যালকনির দরজা খোলা। সেখানে যে অন্ধকার তার একটু অংশে ঘরের শাদা আলো গিয়ে একটা আয়তক্ষেত্র তৈরি করেছে। সে বলল, আপনি নাকি যেতে চাইছেন না?
হুঁ, ফেসবুকের প্রতিক্রিয়া তার মনের ভিতরে এসে যেন মিলিয়ে গেল। সে হেসে বলল, ঠিকই শুনেছ। আমি তো ঠিক করেছি আমি যদি সিভিল সার্ভিস পাই আমি নর্থ ইস্টে অপশন দেব, সাতটি বোন সাতটি তারা সাতটি পাহাড়, উফফফ সে দারুণ হবে।
অলীক অবাক হয়ে যেন শাদা কালো ছবির এক অচেনা নারীকে দেখছিল। তন্দ্রা বর্মণ। তার মায়ের প্রিয় হিরোইন। কিন্তু এই মুখখানি কোন সুদূরের? এই উদ্ভাসিত ডিম্বাকার, ঈষৎ লম্বাটে মুখ। চেক শাড়ি, কালো রঙের ব্লাউজ, দুই ভ্রুর সংযোগের দু’সুতো উপরে সুগোল একটি কালো টিপ। সে গৌরী নয়, মাজা মাজা তার গায়ের রং। হাতের নখে পাতলা গোলাপি নখ রঞ্জনী, বাম হাতে সোনার বালা, ডান হাতে মা বিপত্তারিনীর লালসুতো। সে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, এইটা দেখছ তো, আমার ঠাকুমা পরিয়ে দিয়েছে, সামনে একজামের বিপদ, হা হা হা।
অলীক বলল, লাল সুতো তোমার কব্জিতে মানিয়েছে।
ইসস, কিন্তু ঠাকুমার দেওয়া তো, থাক, থাকলে ঠাকুমার টাচ পাই আমি।
হতে পারে, ঠাকুমাকে তুমি খুব ভালবাস?
জানি না, কিন্তু এটার ভিতরে ঠাকুমা ঢুকে বসে আছে যেন, আমি তো পরতে চাইনি, কিন্তু বুড়ি ঠাকুমা তো বিপত্তারিনীর পুজো করল, সাত বামুন খাওয়ালো, ভোগ বিলি করল, চন্নমেত্ত খেয়ে উপোস ভাঙল, আর এই সব নাকি আমার জন্য, আমি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দিতে ধলভূমগড় চাঁপাবনি থেকে কলকাতা আসছি দিদির কাছে, তাই।
রনিতা বলছিল, পরীক্ষা মানেই তো বিপদ। তার ঠাকুমার চার ছেলে। তার ভিতরে একজন তো এইচ এস, পেরতেই পারছিল না, চার বছর না পেরে ক্ষান্ত দিয়েছিল, তখন ঠাকুমা বিপত্তারিনী করে রনিতা সুনীতার মেজ কাকাকে উদ্ধার করেন। তখন তো ছিল বিহার, এখন ঝাড়খন্ড। শোনা যায় মেজকাকার পরিবর্তে আর একজন দিয়েছিল পরীক্ষা। কিন্তু ঠাকুমা বলে, যাই হোক, মা বিপত্তারিনী, তিনি ছিলেন বলেই সব বিপদ থেকে রক্ষে। নইলে একজনের হয়ে আর একজন কি পরীক্ষা দিতে পারত?
অলীক বলে, তোমাদের চাঁপাবনির গল্প বলো, ওদিকে মাওয়িস্টরা আছে না?
হ্যাঁ আছে, কিন্তু অনেকটা দূরে, তা ধরো বিশ তিরিশ মাইল নর্থে, দলমা রেঞ্জে যে পাহাড় দেখা যায় নীল করে, সেদিকে।
অলীক জিজ্ঞেস করল, তোমাদের ওখানে সব নিরুপদ্রব?
হ্যাঁ, এখনো তাই।
আমাদের মহাত্মা কোম্পানি তো ওখানে যেতে পারে।
তোমাদের কোম্পানি কি ঠিক ব্যবসা করে? রনিতা জিজ্ঞেস করে।
জানি না। অলীক বলল।
যদি ভুল কাজ করে তো মাওবাদিদের টারগেট হয়ে যাবে।
অলীক বলল, তখন বিপত্তারিনীর লাল তাগা, তোমার ঠাকুমা বাঁচাবে।
হা হা করে হাসল রনিতা, বলল, তুমি দারুণ বললে কিন্তু।
তখন সুনীতা স্নান সেরে হাল্কা এক শালোয়ার কামিজ পরে এসে বসল, বলল, আমি ফোনে বলে দিয়েছি, সাড়ে আটে ডেলিভারি দেবে।
তুমি কি ডিনার করাবে বাইরে থেকে এনে?
ইয়েস বস, তা না হলে করব কী করে, কে প্রিপেয়ার করবে?
তুই আগে বলে দিয়ে যেতিস যদি, আমি করতাম দিদি।
চাঁপাবনি থেকে তুই এসেছিস কি ওই জন্য?
না না, অলীকদা আজ এল প্রথম, তাই, আর অলীকদা তো সেই নর্থ ইস্টে ট্রান্সফার হয়ে গেছে, বস বললেই গৌহাটির ফ্লাইটে উঠে পড়বে। বলতে বলতে উঠে পড়ে রনিতা, বলল, আমি চা আনি, তোরা কথা বল।
সুনীতা বলে, ভেজান হয়ে গেছে চা পাতা, তুই ছেঁকে নিয়ে আয়।
রনিতা যেতে সুনীতা বলল, চল ব্যালকনিতে গিয়ে বসি, আমাদের ব্যালকনি খুব সুন্দর, সামনে সেই ঝিল, দারুণ বাতাস, স্নিগ্ধ।
ঠিক তাই। ব্যালকনিতে একটি মোড়ার উপর বসে অলীক আর সুনীতা মুখোমুখি। সামনে খুব ছোট গোলাকার একটি টিপয়। কম পাওয়ারের আলো শুধু সামনেরটুকু দেখার জন্য। রনিতা চা নিয়ে এল ট্রেতে সাজিয়ে। টিপয়ে রেখে আর একটি মোড়া টেনে বসে। গ্রিলের ভিতর দিয়ে ওই রাস্তার ওপারে মস্ত জলাভূমির ওপারে সল্ট লেক সেকটর ফাইভের আলো। সেই আলোর রশ্মি ওপার থেকে জল বেয়ে বেয়ে প্রায় এপারে পৌঁছে গিয়ে হারিয়ে গেছে অন্ধকারে। বাতাস আসছে একটু মাতাল হয়ে। কী সুন্দর বাসস্থান খুঁজে বের করেছে সুনীতা! আসলে তাদের চাঁপাবনির এক ব্যক্তির ফ্ল্যাট এইটি। তিনি কবছরের জন্য ইউ, কে,তে। ফ্ল্যাটটি দিয়ে গেছেন তাদের নামমাত্র ভাড়ায়।
রনিতা বলল, দিদি তো থাকবেই না কলকাতায়, বাঙ্গালুরু চলেই যাবে, দিদির কোনো চিন্তা নেই, কিন্তু তুমি তো আপাতত চাকরিটা করবে?
হু, কিন্তু এখনই করব কিনা ভাবছি, আমি নর্থ ইস্ট যাব কিনা তাই ঠিক করে উঠতে পারিনি।
তোমাকে না হয় চাঁপাবনি পাঠাল মহাত্মা কোম্পানি, তারপর, মাওবাদিরা তোমাকে ধরল, বলল টোয়েন্টি পারসেন্ট দাও বিপ্লবের জন্য?
ওই তো বিপত্তারিনী আছেন।
আমাদের ওই দিকটা গরিবের দেশ, ওয়ান ক্রপ ল্যান্ড, ওখানে সেই রেনেসাঁ নামে একটি কোম্পানি টাকা তুলছিল, চিট ফান্ড, তারা এক চিঠিতে পালিয়েছিল, বলল রনিতা।
ভাল তো। মন্তব্য করে অলীক, তারপর বলে তারপর মহাত্মা নাম বদলে মহাপাত্র হয়ে আবার চলে যাবে চাঁপাবনি।
সুনীতা চমকে ওঠে, জিজ্ঞেস করল চাপা গলায়, সত্যি নাকি অলীক?
হ্যাঁ সত্যি, সুরগুঞ্জা হিলসে মহাপাত্র কোম্পানি যাচ্ছে, মহাত্মা অফিস বন্ধ করে পালিয়েছে শিলং থেকে, এবার শিলঙের বাইরে সুরগুঞ্জা হিলস, মহাপাত্র ইনভেস্টমেন্ট।
আমাকে তো যেতে বলেনি। সুনীতা বলল।
তোমাকে বলবে কেন, মেয়েদের ওদিক থেকে অ্যাপয়েন্ট করবে।
তুমি কী করে জানলে অলীক?
আমাকে বলেছে, নতুন কোম্পানি বছর পাঁচ কাজ করে কয়েন রূপি কালেক্ট করে আবার হয়তো পালিয়ে যাবে।
সুনীতা বলল, আমি যে প্রতিমাসে ইনভেস্ট করছি স্যালারি থেকে কোম্পানিতে।
আমি জানি না কী হবে, কিন্তু আমি নর্থ ইস্টে যাব না।
ওটা আমার ম্যারেজের জন্য জমাচ্ছি অলীক, আমাদের ফ্ল্যাট সাজাব, আমি কাল টাকার জন্য মহাপাত্র স্যারকে বলব।
তখন রনিতা বলল, তোমাদের খুব বিপদ দিদি, তুই আর অফিস যাবি না কাল থেকে, যা টাকা গেছে চলে যাক, কিন্তু পাবলিক তোকেই হয়তো ফিজিক্যালি অ্যাসল্ট করবে।
কিন্তু আমি যাব। অলীক বলে, আমি যাব, আমি মোটা টাকা অ্যাডভান্স নেব, তারপর যাব না, হা হা হা।
তুমি কিন্তু বিপদে পড়তে পার। রনিতা বলে।
কেন, বিপত্তারিনী তো আছেন। বলতে বলতে হা হা করে হাসে অলীক। কী অদ্ভূত। এই ঘন্টাখানেক কথা বলে সে কত ভারমুক্ত! পাহাড়ের ডানার বদলে বকের শাদা পালক যেন তার গায়ে এসে পড়েছে।
৮
অলীক দাঁড়িয়ে আছে সাবেক উত্তরা সিনেমার উল্টোদিকের ফুটপাথে। সে উত্তরার সামনে আসতে বলেছে রাই—তন্দ্রা বর্মণকে। সেই কালো চোখ, মাথাভরা বর্ষার মেঘের মতো কালো চুল। গভীর বিমর্ষতায় ভরা মুখ। সকলের ভালো করতে চায় সে। অলীকের আজ আত্মপ্রকাশ হবে তার সামনে। রাইয়েরও আজ আত্মপ্রকাশ হবে অলীকের সামনে। অলীক পরে আছে ডিপ গ্রিন টি শার্ট আর জিনস। তার বাঁ হাতের কব্জিতে সোনালি মেটাল ব্যান্ডের ঘড়ি, ডান হাতের কব্জিতে লাল সুতো। লাল সুতোর বিপত্তারিনীর তাগা। পরশু যখন বেরবে তখন রনিতা বলল, দাঁড়াও, তোমার সামনে কত বিপদ, আমি বিপত্তারিনী বেঁধে দিই অলীকদা।
সুনীতা সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেছে একটা ফ্লোর। অলীকের হাতে তখন এই সুতো পরিয়ে দিতে দিতে রনিতা বলেছিল, আমি তোমায় দিলাম অলীকদা, তোমার বিপদ হবে না হবে না হবে না।
কী স্নিগ্ধতা সেই কথায়, রনিতা একটু সময় নিল, বেশি সময় নিল যেন লাল সুতোয় তার কবজি বেঁধে ফেলতে। অলীক অবাক। শিহরিত হচ্ছিল। এই প্রথম কোনো অনাত্মীয় যুবতী আত্মীয়ের মতো হয়ে উঠে তাকে হাত ধরল। স্পর্শের কী মাদকতা! কেঁপে উঠেছিল অলীক। কী ভাবে সে তাকে জড়িয়ে নিচ্ছিল লালসুতোর পাকে পাকে।
কী হলো তো। শেষ গ্রন্থিটি দিয়ে রনিতা হেসেছিল তার দিকে চেয়ে। তারপর হাত জোড় করে বলেছিল, নমস্কার অলীকসুন্দর।
অলীক হাত বাড়িয়ে ডেকেছিল, হাই।
অবাক করে রর্নিতা সাড়া দিল, হেল্লো।
হাউ আর ইউ?
ফাইন, অ্যান্ড ইউ? মুখ টিপে হাসে রনিতা।
ফাইন, আজ ওয়েদার খুব সুন্দর, তাই না।
হ্যাঁ পালক মেঘ।
লেট’স গো। বলে হাহা করে হেসে রনিতা বলেছিল, নিচে যাও অলীকদা, দিদি ইজ ওয়েটিং ফর ইউ, ফোন থেকে অ্যাপক্যাব ডেকেছিল, এসে গেছে বোধ হয়।
নামতে নামতে অলীক বলেছিল, হাতে জড়িয়ে দিলে তো, সব সময় তোমার টাচে থাকব।
অলীকের পিঠের ব্যাগ সাইডে ঝোলান। ব্যাগের রঙ লাল আর কালোয় মেশান। ওর ভিতরে সে ল্যাপটপ রাখে। আজ নেই। রাই আসবে জিনস আর সবুজ কালো চেক শার্ট গায়ে। তার কাঁধে থাকবে একটা জুট-ব্যাগ। মাথার চুলে খোপা। চোখে সান গ্লাস। সিভিল সার্ভিস কোচিং থেকে সোজা এখেনে। অলীক আগে সেইভাবে নর্থের এই অঞ্চলে তেমন আসেনি। তার এক মাসি থাকত শ্যামবাজারে। সে অনেকদিন আগের কথা। রাই থাকে কোথায় ঠিক জানে না অলীক। একবার শুনেছিল শোভাবাজার। গঙ্গা তার বাড়ির খুব কাছে। রাই পড়ে একটা কোচিঙে, পাথওয়ে, কিংবা গেটওয়ে, এমনি হবে তার নাম। কোন জায়গা থেকে আসবে তা বলেনি। সে তিনটে টাইম দিয়েছে। তিনটে গেল, চারটে গেল। কই ? অলীক বারবার রাস্তা পার হয়ে ওপারে গেছে বিভ্রমে পড়ে। ফিরে এসেছে। একটা মিলেছে, তিনটে মেলেনি। দুটো মিলেছে দুটো মেলেনি। তিনটে মিলেছে একটা মেলেনি। তার দিকে ফিরেও তাকায়নি তাদের কেউ। আবার এমন হয়েছে অবিকল রাইয়ের পোশাক, কাঁধের ব্যাগটি পযর্ন্ত, সান গ্লাসটি পযর্ন্ত। কিন্তু এক সঙ্গে তিনজন। তিনটি রাই। ফেসবুকের তিনটি আইডি। সাশা, ভানিয়া, রাই। রাই, নাতাশা, সোফিয়া, ভানিয়া। অলীক পার হয়ে খুঁজতে যাবে তো তিনজনই ঢুকে গেল মলের ভিতরে।
বিকেল পাঁচটায় এত মানুষ গিজগিজ করছে চতুর্দিকে। তিনটি রাই প্রায় বিস্মৃত নায়িকার দুঃখী মুখচ্ছবি নিয়ে ভিতরে ঢুকে ভ্যানিশ হয়ে গেল। তার দিকে কেউ ফিরেও তাকাল না। পাঁচটা অবধি দাঁড়িয়ে ফিরে আসবে যখন অলীক, তখন পিছন থেকে ডাক এল, হাই অলীক।
চমকে ঘুরে তাকিয়ে অলীক দেখল, কে? নতুন এক সবুজ কালোয় চেক শাড়ি, সবুজ ব্লাউজ সবুজ টিপ দুটি বেনী বুকের দুই দিকে, এখানে কেন অলীক, তুমি না নর্থ ইস্ট যাবে, অফিস যাওনি আজ?
তুমি যে এখানে? অলীক জিজ্ঞেস করে।
আমি সিনেমা দেখব বলে এসেছিলাম, অতল জলের আহ্বান, সৌমিত্র আর তন্দ্রা বর্মণ, মায়ের কম বয়সের মুভি, কিন্তু দেখছি একটাও সিনেমা হল নেই, সেই অনেকদিন আগে প্রথম কলকাতায় এসেছিলাম, তখন আমি ক্লাস সিক্স, এখানের উত্তরা সিনেমায়, সেই অতল জলের আহ্বান দেখেছিলাম, আবার দেখব বলে এলাম, আজ দেখছি হলটা উঠে গেছে, কিন্তু সকাল থেকে আমার মনে হচ্ছিল এখানে হয়তো ‘’ভুল সবই ভুল” অতল জলের আহ্বান হচ্ছে এখানে, সেই সৌমিত্র আর সেই দুঃখী হিরোয়িন তন্দ্রা বর্মণকে আর একবার দেখব।
আমি তো দেখছি। অলীক বলল।
কী?
তন্দ্রা বর্মণের মুখ। অলীক বলল।
উফ, অলীকসুন্দর, তুমি যে কী!
অলীকের মনে হল সে তার জন্মের আগের শহরে দাঁড়িয়ে রনিতার সঙ্গে কথা বলছে। বুক কেঁপে উঠল, সমস্ত শরীর শিহরিত হলো। সাতাশ বছরের অলীকের বাল্যকাল যেন সাতাশ বছর পার করে পিছনে চলে গেল। লাল দোতলা বাস, খোলা পথ, টং টং করে ট্রাম চলেছে দ্রুত গতিতে। উত্তরা সিনেমায় ‘’অতল জলের আহ্বান’’, রাধা সিনেমায় ‘’সুরের আগুন’’, শ্রী সিনেমায় ‘’আর একটা কী, সব সেই সিঙ্গুর, হুগলি থেকে কলকাতায় আসা বর্মণ পরিবারের কন্যাটি। স্টার থিয়েটারে ডাক বাংলো নাটক……বাবার কাছে শুনেছে সে। রঙমহল থিয়েটারে ছায়াবিহীন…। উত্তর কলকাতার বিখ্যাত থিয়েটার পাড়া ছিল এইটা। সে কিছুই বলতে পারে না, ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল রনিতার দিকে। তারা হাঁটতে আরম্ভ করল। হাঁটতে হাঁটতে জনাকীর্ণ শহর ছেড়ে গেল। গেল এক নির্জন পথে। অপরাহ্ণের আলো সেখানে গা এলিয়ে আছে। বাতাসে অচেনা ফুলের গন্ধ। রাস্তার দুপাশের ব্যালকনিতে কেউ নেই, শুধু একটিতে এসে দাঁড়িয়েছে এক বৃদ্ধা। হাত তুলল অলীক, তিনিও হাত তুললেন। রনিতা বলল, চাঁপাবনির নিরূপমা দেব্যা, ওই যে ওই, আসলে উনিই দেবী বিপত্তারিনী।
রনিতা তুমি কি আমার জন্য এলে আজ? অলীক জিজ্ঞেস করে।
মোটেই না, আমি তন্দ্রা বর্মণের সিনেমা দেখতে এসেছিলাম। হাত ঘুরিয়ে রনিতা বলল।
দেখা হলো না তো। অলীক হেসে বলল।
সে তো তোমার জন্য অলীকসুন্দর। রনিতা মুগ্ধ দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে থাকল। বাতাসে ভেসে যেতে লাগল এক গানের ঢেউ, পিয়ানো বাজিয়ে গাইছে হিরো সৌমিত্র, “এ কী চঞ্চলতা জাগে আমার মনে, ভালো লাগে, কত ভালো লাগে…”
বাড়ি ফিরে রাত ন’টায় অন লাইন হয়ে দেখল রাই মুখারজি নেই। নেই কিন্তু তার জন্য একটি মেসেজ এসে বসে আছে—- “স্যরি, যেতে পারলাম না, অ্যাজ বিকজ ওই সিনেমা হলটির কোনো একজিস্টেনস নেই, মল হয়ে গেছে, আমি কোথায় যাব, অথচ হলটি ছাড়া তোমাকে পাব কোথায়? তাই আমি লাইব্রেরিতে গিয়ে বাসুস্যারের জন্য কবি রায়গুণাকার ভারতচন্দ্রের উপর যারা লিখেছে এ পযর্ন্ত, তাদের লিস্ট বানালাম, কপি করলাম, করতে পাঁচটা বেজে গেল! হ্যাঁ, অলীক, হি ইজ নিউ কামার টু মায় রিয়েলিটি, হি ইজ ভেরি মাচ রিয়েল ইন মায় লাইফ, হি ইজ মাই নিউ মহাত্মা……আই লাভ হিম, রিয়েলি, সত্যি বলছি, আমি তার প্রেমে পড়ে গেছি, কী হ্যান্ডসাম, অলীক তুমি রিচার্ড মার্ক্স শুনেছ, গান?”
…… লিখে একটা স্মাইলি এঁকে দিয়েছে রাই, বায় অলীক, আমি অন লাইন হব অন্য সময়, অন্য নামে। আবার স্মাইলি। তুমি আমাকে ফেসবুকের জনারণ্য থেকে খুঁজে বের করো দেখি। সুরগুঞ্জা হিলস থেকে ফিরে এস।” স্মাইলি।
উত্তর দিতে পারল না অলীক। ইউ টিউবে রিচার্ড মার্ক্স খুঁজতে থাকে। সে এক অনন্ত বিষাদের গান। প্রেমের গান। শুনতে শুনতে তার চোখে জল এল। তারপর পিংক ফ্লয়েড… মহম্মদ রফির গান, হেমন্ত……কিশোরকুমার।
অলীক পরদিন অফিসে গিয়ে দেখল তালা বন্ধ। নর্থ ইস্টে বিহু উৎসব, তাই সাতদিন কলকাতার অফিস চিরতরেই যেন বন্ধ। অলীক ফোন করল রনিতাকে, হেল্লো, শুনছ কী হয়েছে, ও রনিতা, বিপত্তারিণী, শুনছ…
কী হয়েছে অলীক?
অফিস বন্ধ হয়ে গেছে। অলীক হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।
জানতাম হবে, তুমি ওই অলীক জীবন থেকে বেরিয়ে এস অলীক। মধুকন্ঠে বলল রনিতা, আমরা তো অলীক নই, আমরা সত্য, বাস্তব।
অলীক বলল, তোমায় খুব দেখতে ইচ্ছে করছে তন্দ্রা বর্মণ।
আমি তো অন-লাইন হই না অলীক, আমি আমার আইডেন্টিটি নিয়ে বসে আছি, তুমি এস, আমি আছি।
অলীক ডাক পেল। অলৌকিক এক ডাক। ভুলেই গিয়েছিল এমন আহ্বান কেউ করতে পারে বাস্তবের পৃথিবী থেকে। সে বেরিয়ে পড়ল দুই নদীর মায়ায় ভরা চোখ আর এক কন্যার জন্য। এক কন্যা ছিল, আর এক কন্যা এল। যে ছিল সে কি সত্য, জানে না অলীক। জানতে চায় না। যা সত্য, তাইই আরো সত্য হোক।
