short-story-kanta

কাঁটা

মধুজা ব্যানার্জী

বিকেলের আলোটা দীর্ঘ অপেক্ষার। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে খোঁপা বাঁধতে বাঁধতে তটিনী হঠাৎ থমকে গেল। আজ সে অনেকদিন পর সেই শাড়িটা বের করেছে — বেশ উজ্জ্বল গোলাপি মলমল, সরু কমলা পাড়—একটু অন্যরকম। দশ বছর আগের বৈশাখী উপহার। পাপড়ির দেওয়া। “তোকে এই রঙটাই মানায়”—বলেছিল সে। তখনও তাদের বন্ধুত্বে কোনও ফাঁক ছিল না। তারপর কত কিছু বদলে গেল। মাঝখানে কতদিন কথা হয়নি তাদের। এক তুচ্ছ কথা থেকে শুরু হওয়া অভিমান এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছিল যে, দুজনেই চুপ করে গিয়েছিল।

পাপড়ির ডিভোর্সটা হয়েছিল হঠাৎ করেই — অন্তত বাইরে থেকে তাই মনে হয়েছিল। পনেরো বছরের দীর্ঘ দাম্পত্যে হঠাৎ ভাঙন। তটিনী ওর পাশে ছিল, শুনেছিল, সান্ত্বনা দিয়েছিল। কিন্তু যখন শুনল, পাপড়ির নতুন একটা সম্পর্ক হয়েছে, তার ভেতরে কোথায় যেন একটা খারাপ লাগা দানা বেঁধেছিল। কারণটা সে নিজেও ঠিক বোঝেনি প্রথমে।
তারপর একদিন পাপড়ির প্রাক্তন স্বামীকে দেখেছে—চুপচাপ, একটু ভেঙে পড়া। তটিনীর হঠাৎই খুব কষ্ট হয়েছিল। মনে হয়েছিল, এই বয়সে মানুষটা একা হয়ে গেল! পাপড়িকে বলেছিল, “তুই একটু তাড়াতাড়ি এগোচ্ছিস না?”

বাকিটা খুব দ্রুত ঘটেছিল। পাপড়ির চোখের দৃষ্টি বদলে গিয়েছিল। “তুই আমার পাশে নেই, তাই না?” তারপর ধীরে ধীরে দূরত্ব। কথা বন্ধ। এভাবে পেরিয়ে গেছে দশটা বছর।

তার দীর্ঘদিন পর আজই হঠাৎ পাপড়ির মেসেজ এসেছে। যাতে লেখা “তোকে খুব মনে পড়ছে।”

তটিনী লিখেছিল, “আয়।”

বিকেলে অনেক দিন পর তটিনীর সাজতে ইচ্ছে করল। কত বছর পর নিজেকে ভালো করে আয়নায় দেখলো সে। এর আগে যতবার আলমারি খুলে শাড়িটার দিকে তাকাত তটিনী, তার মনটা পাপড়ির জন্য হুহু করত। পাপড়ি একটাই বন্ধু ছিল তার। স্বামী প্রজিত যেটা কোনও দিন হয়ে উঠতে পারেনি। শাড়িটা গায়ে দিতেই একটা অদ্ভুত হালকা লাগল। ম্যাচিং ব্লাউজ খুঁজতে আলমারির এ তাক ও তাক ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎই হাতে এলো সেই ছোট্ট বটুয়াটা—নাগাল্যান্ডের বাহারি কাজ করা- যার মধ্যে তটিনী আগলে রেখেছিল খোঁপায় সাজানো এক বাহারি কাঁটা। খোঁপায় সেট করতে গিয়ে হাতটা কেঁপে উঠল তটিনীর। এই কাঁটাটার মধ্যে অন্যরকম এক সময় লুকিয়ে আছে—যে সময়ের কথা কেউ জানে না।

দরজার বেল বেজে উঠতেই স্মৃতির দরজা বন্ধ করে দিল তটিনী। পাপড়ি এসেছে। চোখের তলায় দীর্ঘ ক্লান্তি। আগের সেই দৃঢ়তাও মুখে লেগে নেই। “ভিতরে আয়,” তটিনী নরম স্বরে ডাকল। পাপড়ি ঘরে পা দিয়েই চারদিকে তাকিয়ে রইল। এই ঘরের রূপ গন্ধ সবই তার চেনা। তবু যেন অন্যরকম লাগল। সোফায় গিয়ে চুপ করে বসে রইল সে। কথাও কখনো সখনো বৈশাখী হাওয়ার মতো আচরণ করে। আসতে সময় নেয় বড্ড।
শেষে পাপড়িই বলল, “সেদিন তুই বলেছিলি—আমি তাড়াতাড়ি এগোচ্ছি।”

তটিনী তখনো নিষ্পলক তাকিয়ে ছিল বন্ধুর দিকে।

পাপড়ি কথায় জোর দিয়ে আবার বলল, “কী রে, বলেছিলি তো একথা? জানিস, আমার তখন তোর সাপোর্টটা খুব দরকার ছিল— মনে হত তুই শুধু আমার দিকটাই দেখবি।”

তটিনী তার অস্বস্তিগুলো সরিয়ে রেখে ধীর স্বরে উত্তর দিল, “মানুষ কখন যে কেমন আচরণ করে ফেলে নিজেও বোঝে না হয়তো!”

পাপড়ি বলে, “দোষ আমারও হয়েছে। আমিও তখন তোকে সব কথা খুলে বলিনি। নিজেই দূরে সরে গেছি অভিমানে।”

খোঁপা থেকে কাঁটাটা খুলে টেবিলে রাখে তটিনী। তারপর বলে, “তোকে বলা হয়নি আমারও কত কিছু। গল্প, কাহিনিও বলতে পারিস।”

তটিনীর মনে পড়তে থাকে অনেক কিছু। পাঁচ বছর আগের এক শীতকালের কথা। করবেট ন‍্যাশানাল পার্কের ধিকালা ফরেস্ট বাংলো—জঙ্গলের একদম ভেতরে। কয়েকদিন আগেই খবর ছড়িয়েছে এক মানুষখেকো বাঘ নাকি আশেপাশে ঘোরাঘুরি করছে! তবু তটিনী এসেছিল— তার ক্যামেরা, তার শখ, তার নিজের জেদের টানে। স্বামী প্রজিত প্রথম দিনই বলে উঠেছিল— “এটা ছুটি কাটানোর জায়গা না স্কাউট ক্যাম্প?” না আছে সুইমিং পুল, না বার — তার বিরক্তি লুকোনো ছিল না। নিজেই দুপুরে প্যান্ট্রি থেকে বরফ জোগাড় করে ভদকা বানাতে শুরু করেছিল। জঙ্গলের মধ্যে নেট কানেকশন নেই, মেয়েরও মুখ গোমড়া। তটিনী ভেবেছিল কদিন প্রকৃতির গভীরে নাগরিক অভ্যাসের থেকে একটু বিশ্রাম পাবে তারা। কিন্তু মেয়ে আর বরের এই খারাপ লাগাটা কুরে কুরে খাচ্ছিল তাকে। মনে হচ্ছিল—ইস! কী ভুলই না করলাম!

মন খারাপ করে বিকেলে সে একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। জঙ্গল তাকে ডাকছিল। সেই সময়—পাশের বারান্দায় তটিনী দেখতে পেল অভিযান বসু দাঁড়িয়ে আছেন। অভিযান হাতে গোনা ক’জন বাঙালি ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফারের একজন। ফেসবুক থেকে চেনা। ছবি, লেখা—সবই আগে দেখেছিল তটিনী।

সেদিন চোখের সামনে দেখে নিজেই উত্তেজিত হয়ে বলে ফেলেছিল— “আপনাকে আমি চিনি, ফলো করি আপনার সব কিছু!” একদম ছোটো বাচ্চাদের মতো আনন্দ পেয়ে হেসে উঠেছিল অভিযান। বলেছিল, “আমি তো ক্যামেরার পেছনের লোক। আমাকে দেখে কেউ চিনতে পারলে আমার দারুণ লাগে! আপনারা আজ কী করছেন? চলুন, বরং কাল ভোরে আপনাদের জঙ্গলটা দেখাই।”

অতো সকালে উঠতে হবে শুনে প্রজিত বেঁকে বসল। মেয়েও তাই। কিন্তু সুযোগটা ছাড়তে মন চাইল না তটিনীর। রাজি হয়ে গিয়েছিল তৎক্ষনাৎ। অভিযানের সঙ্গে জিপে করে জঙ্গলের গভীরে যাবার সুযোগ কি মিস করা যায়!

জঙ্গল গভীর হচ্ছিল। হাতি, হরিণ—এসব পেরিয়ে হঠাৎ থেমে গেল সব। একটা মা বাঘ।
তার দুটো শাবক। রাস্তা পার হচ্ছে। তটিনীর নিঃশ্বাস আটকে গিয়েছিল। অভিযান ক্যামেরা তুলেছিল— কিন্তু বাঘের দিকে নয়, তটিনীর দিকে।

পরের দিনই প্রজিত জোর করে জঙ্গলের বাইরে পাঁচতারা রিসর্টে চলে গেল। সেখানে আলো, মদ, সুইমিং পুল—সব আছে। শুধু জঙ্গল নেই। তারপর করবেটে আর দেখা হয়নি তটিনীর অভিযানের সঙ্গে। ভাগ্যিস জঙ্গল সাফারির দিনই অভিযান নম্বর দিয়েছিল নিজের, বলেছিল—
“সামনেই কলকাতায় আমার একটা এক্সিবিশন আছে, আসবেন, ভালো লাগবে।”

একদিন সুযোগ করে ছুটির দিনে মেয়েকে নিয়ে অভিযানের এক্সিবিশন দেখতে গিয়েছিল তটিনী। যাবার আগে যে জড়তা ছিল না তা নয়। কিন্তু ব্যস্ত অভিযান এগিয়ে এসে সেটা কাটিয়ে দিয়েছিল। তারপর মাঝে মাঝে হোয়াটসঅ্যাপে ছবি পাঠাত। পাখির ছবি, হোয়াইট লেপার্ডের ছবি, আরও কত কী। তারপর এটা-সেটা কথা, কিছুদিন পর ফোনে কথা বলা। অফিস ফেরতা তটিনী বিকেলবেলায় গাড়ি চালাতে চালাতে অভিযানের সঙ্গে গল্প করত। আর এভাবেই পাপড়ির না-থাকাটা অভিযান আস্তে আস্তে পূরণ করে দিচ্ছিল অথবা তার চেয়েও কিছুটা বেশি।

একদিন তারা দেখা করেছিল। কলকাতায়, এক ক্যাফেতে। একটা খাম। ভিতরে ছবি—
তটিনীর মুখ, চোখের ফ্রেমে ধরা রয়েছে গভীর জঙ্গল।

“তোমার চোখে তখন শুধুই জঙ্গল ছিল” বলতে বলতে ব্যাগ থেকে ছোট্ট একটা বটুয়াটা বের করল সে। ভিতরে মোষের শিংয়ের মাথার কাঁটা। বলল, “নাগাল্যান্ডে গিয়েছিলাম, সেখান থেকে নেওয়া। ওরা বলে—এই শিং পথ চিনে নেয়।”

“তাই নাকি?” অভিযান একটু তাকিয়ে থেকে বলেছিল—

“আর কখনও কখনও পথও আটকায়।” গভীর চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বলেছিল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিল— “এটা আমি। তোমার পথের কাঁটা। চুলে লুকিয়ে রেখো… শুধু তুমিই জানবে।”

তটিনী কিছু উত্তর দিতে পারেনি। শুধু কাঁটাটা তুলে রেখেছিল— একটা গোপন সময়ের মতো।

তারপর এলো সেই বৃষ্টির দিন। “আমি খুব কাছাকাছিই আছি”— মেসেজ এল অভিযানের। বাড়িটাও ফাঁকা ছিল একদম। মেয়ে স্কুলে আর প্রজিত ট্যুরে। অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল তটিনী। তারপর লিখেছিল— “এসো।”

তারপর দরজা খুলতে ভেজা মানুষটা ঢোকে। যেদিন তার আচরণে কোনও নাটকীয়তা ছিল না। কথা, নীরবতা, খুব কাছে এসে দাঁড়ানো—  এবং তারপর এক স্পর্শ। সেই স্পর্শে তটিনীর চেনা পৃথিবীটা কেঁপে উঠেছিল। সে ভুলে গিয়েছিল সব সীমারেখা। তার শরীরের হঠাৎ মনে পড়েছিল, কীভাবে জেগে উঠতে হয়। তারপরই ভয় এসে মনে দানা বেঁধেছিল। বলেছিল, “এটা ঠিক না”—অভিযান আঁকড়ে ধরে ছিল, বিড়বিড় করে ছিল— “সব ঠিক-ভুল একরকম না।”

কিন্তু অপরাধবোধ কাটেনি তটিনীর। মনে হয়েছিল, নিজের জীবন, সংসারকে সে পাপড়ির মতো ছারখার করে দিতে পারে না। পরের দিন থেকেই তটিনী নিজেকে সরিয়ে নিতে শুরু করল। ওদের মেসেজ কমল, উত্তর ছোট হল, তারপর প্রায় বন্ধ।

অভিযান বুঝতে পেরেছিল সবটাই। তবুও একদিন লিখেছিল— “একবার দেখা করবে?”

অনেক ভেবে আর যায়নি তটিনী।

কখন যে ভাবতে ভাবতে মনের কথাগুলো বলতে শুরু করেছিল পাপড়ির কাছে, তটিনী নিজেও বোঝেনি তা। বলে, “আমি ওকে এড়িয়ে গিয়েছিলাম, বুঝলি?”

পাপড়ির নীরবতা ভাঙ্গেনি তখনও। চুপ করে বন্ধুর মুখের রেখা পড়ছিল। তটিনী ব’লে চলে, “নিজেই সব দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলাম—ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ সব। তবু অভ্যাস ছাড়েনি। মাঝে মাঝে চুপিচুপি ফেসবুকে গিয়ে দেখতাম-
অভিযান কোথায়, কী করছে। মেসেঞ্জারের ছোট্ট সবুজ আলো দেখে বুঝতে পারতাম —সে জেগে আছে। একটা অদ্ভুত নিশ্চিন্তি ছিল সেই আলোয়। তারপর এল কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ। একদিন দেখলাম— অভিযান লিখেছে, “Covid positive।” দুদিন নিজেকে আটকে রেখেছিলাম। তারপর আর পারিনি। মেসেজ করেছিলাম— “কেমন আছ?” কোনও উত্তর আসেনি।

একদিন হঠাৎ সবুজ আলো নিভে গেল। মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ—সবখানে। দুদিন পর অভিযানের ওয়ালে ভেসে উঠতে লাগল—

“না, এটা হতে পারে না…”
“বিশ্বাস করতে পারছি না…”
তটিনী স্ক্রল করতে করতে থেমে গিয়েছিল।
RIP।
বিশ্বাস হচ্ছিল না। কাকে জিজ্ঞেস করব? আমাদের মাঝে তো কেউ ছিল না— কোনও তৃতীয় মানুষই ছিল না। সেদিন বাড়িতে নিউ ইয়ার পার্টি। প্রজিত কোভিডের ভয় ভুলে বন্ধুদের সঙ্গে মেতে। খাওয়া, হাসি, মদের ফোয়ারা। এই ভিড়ের মধ্যে আমি কোথাও জায়গা পাইনি। বাথরুমের দরজা বন্ধ করে, চুপচাপ, মুখ চেপে কেঁদেছি। অনেকক্ষণ। অনেকদিন। শুধু একটা নামহীন সম্পর্কের জন্য— যার কোনও শোকসভা হয় না। কাউকে কিছু বলতে পারিনি। পাশে তুই ছিলি না, কোন কালেই তুই ছাড়া আমার যে কথা বলার মতো কেউ ছিল না।”

পাপড়ির চোখ ভিজে ওঠে। তটিনীর উষ্ণ হাতটা চেপে ধরে। বলে, “আমার সম্পর্কটাও টেকেনি, রে!”

বাইরে বিকেলের আলো তখন আরও নরম হয়ে এসেছে। দুই বন্ধুর জীবনই যেন ঠিক টেবিলে রাখা খোঁপার কাঁটাটারই মতো বলে মনে হচ্ছে। কখনো সুন্দর ভাবে বেঁধে রেখে ছিল। আবার আলগা দিতেই …

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *