short-story-kunjo-sajaye-rekho

‘কুঞ্জ সাজায়ে রেখ গো’

নলিনী বেরা

আমাদের গ্রামের ভিতর দিয়েই আরও দক্ষিণে ওড়িশা মুলুকে যাওয়া যায়। কার্তিক-অঘ্রাণে যখন কার্তিকছোলা রাঙাশাল জামাইনাড়ু কালোজিরে, এমন কী জলকলস ধানও উঠে গিয়ে তামাম মাঠ-বিল-জমিন ন্যাড়া, ফাঁকা ফৈ-ফিক্কির হয়ে ওঠে, রাত না পোহাতেই ফাঁকা ধাননাড়ার ডগায় বিন্দু বিন্দু শিশির জমে আর সে শিশিরে সূর্যের আলো পড়ে যখন মাঠময় নাকছাবির মতো ঝিলিক দেয়, যখন চাষাভুষো মানুষ হাল-লাঙল মাচায় তুলে রেখে হাত পা ঝেড়ে ঘরের দাওয়ায় কী হরিবাসরে বসে মনে মনে ভাবতে শুরু করে দেয়—যাক কাজকাম তো সারা হল, এবার একটু আয়েস করা যাক—ঠিক তখনই কীর্তনীয়ার দল, বালকসঙ্গীতের দল কী ছোটখাটো সার্কাসপার্টি আমাদের গ্রামের ভিতর দিয়ে পাশ করে। তারা আরও দূর দক্ষিণে যায়। এক কি দেড়মাসের মাথায় যখন ডিগি-তবলা-হারমোনিয়াম-ফুলেটবাঁশি কাপড়ে মোড়া মৃদঙ্গ কাঁধে তিলক আঁকা কপাল চন্দনচর্চিত গল-কপোল নিয়ে গাওনা সেরে হেলতে দুলতে ফিরে আসে, বাড়ি যাওয়ার তেমন ত্বরা করে না—তখন আমাদের গ্রামের পঞ্চাৎ কী সরকার তাদের ধরে বসে—আমাদের গেরামের ভিতর দিয়েই তো যাওয়া-আসা হয় অধিকারী মোশাই, মোশাইয়ের নিকট সবিনয় নিবেদং মিদং—হোক, ভাঙা ছাঁদে একটা নাইট হয়ে যাক! দিতে থুতে কিছু পারব না মোশাই, খালি দু-বেলা পেটপুরে খাওয়া—

কাঁধের মৃদঙ্গ হারমোনিয়াম সাজবাক্স নামিয়ে রেখে কীর্তন কি যাত্রাপার্টির দল পায়ের উপর পা দিয়ে আয়েস করে বসে যায়। কোমরে বাঁধা একস্ট্রা গামছা খুলে বিঁচে বিঁচে হাওয়া খায়, যারা রাজা কী সেনাপতি সাজে, রাম কী কৃষ্ণ সাজে তারা সিগারেট খায়, রাধা-বিন্দে-

দূতীর দল বাসিচুল খুলে ফের বাঁধতে বসে, রুপোর চুলচিপুনী কাঁটা আর বাসতেলের মহকে জায়গাটা ম ম করে, বাসসাবানের মোড়ক হাওয়ায় উড়ে যাবার মতো দু-চাট্টা গানের কলিও উড়ে আসে—

 “সাজায়ে রেখ গো, ভাল করে কুঞ্জ তোমার সাজায়ে

 রেখ গো—”

আমরা ছেলেছোকরারা সেই গানের কলি আওড়াতে আওড়াতে রাধা কী বিন্দেদূতীর নেলপালিশ রাঙানো লম্বা লম্বা নখের কারুকাজ দেখে বিভোর হয়ে গ্রামের ঘরপ্রতি চাঁদা তুলতে বেরিয়ে পড়ি। কারও গাছের এককাঁদি কলা, ক্ষেতের বেগুন, মুগ-মুসুরের ডাল, খেপলা কী চারগোড়িয়া জাল ফেলে কারোর পুকুরের মাছ, গোলআলু, তেজপাতা, একমন কী আধমন চাল মুহূর্তেই জোগাড় হয়ে যায়। মাটি খুঁড়ে উনুন বানিয়ে রান্না চড়িয়ে দেয় কীর্তনপার্টির রঁসুইঠাকুর।

হ্যাজাকগুলোয় ফ্রি-তে তেল ভরে দেয় হীরালাল মুদি। পরিবর্তে সে আব্দার করে—তার ঘরের বউ-ঝি-ঝিউড়ি দের বসতে দিতে হবে আসরের একেবারে সামনের দিকে। হ্যাজাকগুলোয় ম্যান্থেল না থাকে যদি তো তখন দৌড়োও নদী-সেপারে রোহিণী বাজারে তিমির বারিকের ‘রকমারি সপ’-এ।

সেবার ওড়িশার বারিপদায় গাওনা সেরে ফিরছিল গিরিবালার দল। গিরিবালা বালকসঙ্গীত, ঢপযাত্রা গাওনা করে। গিরিবালার নিজের বাড়ি আমাদের গ্রামের পাশের গ্রামে হলেও গোটা দলটার নিবাস আমাদের গ্রাম থেকে পঁচিশ-তিরিশ মাইল দূরে খাকুড়দা না অমরদায়—

 সে যাহোক, বারিপদা ফেরত গিরিবালার দলটিকে আটকে দিল আমাদের গ্রামের আমুদে মাতব্বররা। বলল, তাও কী হয় অধিকারী মোশাই? গিরিবালা আমাদের গ্রামের মেয়ে, এখানেই ছোট থেকে বড় হল, তা বাদে আপনার কৃপায় গান শিখে আজ দলের ও দেশের মন হরণ করল -সেই গিরি আজ আমাদের গ্রামের ভিতর দিয়ে আমাদের চোখের সামনে হেঁটে যাবে আর আমরা তার আপনার জন হয়েও দু ছাঁদ শুনতে পাব না, বলেন কী? অকাট্য যুক্তি, বলার কিছু ছিল না অধিকারীমোশাইয়ের। অগত্যা বোঁচকা বুঁচকি নামাতে বলে নিজে ছুটলেন নদী ধারে, আখশালে কাঁচা লঙ্কা লেবুর রস সহযোগে আখের রস সেবন করতে। লাটকে লাট আখের ক্ষেত শেষ, জ্বাল দিয়ে গুড় বানিয়ে এতদিনে চালান হয়ে গেল কলকাতার বড়বাজারে, যেটুকু অবশিষ্ট আছে তাই মাড়াই করতে এখনও আখশাল চলছে।

অধিকারীর দেখাদেখি গিরিবালা ও যেতে চেয়েছিল আখশালে, তাকে থামিয়ে দিলেন অধিকারী –

আসিস নে গিরি, কাঁচা পানা খেলে তোর গলা যদি ধরে যায়!

কাঁচা পানা অর্থাৎ কাঁচা আখের রস। গিরিবালা এমনিতেই গলায় মাফলার জড়িয়ে বসেছিল। অধিকারীর নিষেধে আরও বিমর্ষ হয়ে গলা থেকে মাফলার খুলে আরও ভালো ভাবে জড়িয়ে নিল। তাই তো, সে-ই তো মূল গায়েন তার গলা ধরে গেলে চলে?

 গিরিবালা গুন গুন করে গাইতে লাগল –

 “আমি জ্বলে মল্লেম গো, ওগো ওগো প্রাণসখি,

 আমি জ্বলে মল্লেম গো” –

আমরাও সে গান বিড়বিড় করে গাইতে গাইতে চাল-ডাল, তেল-নুন, তরি-তরকারির সংগ্রহে বেরিয়ে পড়লাম।

হ্যাজাকগুলোয় বিনি-মাগনার তেল ভরে দিল হীরালাল। এ-গ্রাম সে- গ্রাম ঢুঁড়ে দর্শকদের বসবার জন্য বড় বড় ধূলামলিন শতরঞ্জি বয়ে আনলাম ঘাড়ে করে। আমাদের পরিশ্রম দেখে কীর্তনদলের রঁসুইঠাকুর আদা-তেজপাতা দিয়ে তৈরি চা খাওয়ালো। বলল, খুব খাটছ বাবা সকল, চা খাও। আর গলা যদি ঠিক থাকে তবে গিরি তোমাদের ওবেলা ভিজিয়ে দেবে।

 আমি, সুনীল আর নির্মল তিনজনে খুব কাছ থেকে গিরিবালাকে দেখলাম। দুধে-আলতা গায়ের রঙ, পানপাতার মতো মুখ, দু ভুরুর মাঝখান থেকে নাকের ডগা পর্যন্ত রসকলি আঁকা, গলায় কণ্ঠীমালা গিরিবালা রাধা সাজে! আমাদের পাশের পাশের গ্রামের মেয়ে হলেও বয়সে কিঞ্চিত বড় বলে আর প্রায় সময় যাযাবরের মতো অধিকারীর দলে কাঁহা কাঁহা মুলুক গাওনা করে বেড়ায় বলে গিরির সঙ্গে আমাদের সাক্ষাত পরিচয় ছিল না। আমরা কে কার ছেলে, কে কার ভাই -তাও তার জানা ছিল না। ফলে সে আমাদের উপস্থিতিকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে বিন্দেদূতী সাজা কালো মেয়েটিকে কাছে ডেকে বলল, পায়ে আমার ব্যথা, পা টিপে দে তো সুরো!

বলেই পা ছড়িয়ে বসে হাঁটুর উপর কাপড় টেনে দিল গিরিবালা। রাধার পা টিপতে বসল বিন্দেদূতী। আমরা দলটার ভিতর হিরোইনের দাপট দেখে স্তম্ভিত হলাম। বলতে কি, রাগই হয়েছিল আমাদের -গিরির গান আগে কখনও শুনি নি, না হয় গান একটু ভালই গায় গিরিবালা, তা বলে এতদূর –

আট ঘটিকায় ‘শ্রীরাধার মানভঞ্জন’। আমাদের হরিমন্দির প্রাঙ্গণ লোকে লোকারণ্য। আমাদের গ্রামের লোকজন তো এলোই পাশের গ্রাম তস্য পাশের গ্রাম উজাড় করে লোক এলো গিরিবালার মানভঞ্জন দেখতে। সঙ্গে নিয়ে এল খেজুরপাতার চাটাই। আমাদের বিছানো শতরঞ্জির উপর জায়গা না পায় যদি তো নিজেদের আনা চাটাই পেতেই বসবে। ঘরপ্রতি একেকটা হেরিকেন এখন না হয় হ্যাজাকের আলোয় হরিমণ্ডপ দিনের মতোই আলোময়, কিন্তু যাত্রা শেষে অন্ধকার আলরাস্তায় হেরিকেন ছাড়া হাঁটবে কী করে তন্দ্রালস বউড়ি-ঝিউড়িরা? হ্যাজাকের ঘন আলোয় নিষ্প্রয়োজন হেরিকেন এখন মিচকে রাখলেই হয়!

লোকে লোকারণ্য! কচিকাঁচা, আবালবৃদ্ধবনিতার কোলাহল, কোলের শিশু ভ্যা করে কেঁদে উঠলে মা তার পিঠে থাপা দিয়ে বলছে চুপ কর বাবা চুপ কর। এখনই আমাদের গিরি কিষ্টোলীলা শোনাবে।

‘কিষ্টোলীলার মাহাত্ম্য ওইটুকু ছেলে বুঝবে কেন, অবুঝ আড়বুঝ শিশু হয়তো বলে বসল, গিরি কে মা?

একমুহূর্তও দেরি না করে মাদল উত্তর দিল –

গিরি? গিরিবালা আমাদের মেয়ে, তোর দিদি রে!

 এতদ অঞ্চলের বড় আপনার জন গিরিবালার মানভঞ্জন বালকসঙ্গীত বা ঢপযাত্রা শুরু হল। আমি, সুনীল আর নির্মল -এতক্ষণ এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করে লোকজন কে কোথায় বসবে সামাল দিচ্ছিলাম। ঘন্টা পিটিয়ে কনসার্ট শুরু হতেই আমরাও জায়গা খুঁজে বসে পড়লাম।

প্রথম প্রথম আমরা তিন বন্ধুতে এর-ওর গায়ে চিমটি কেটে ললিতা-চন্দ্রা-বিশাখার খুঁত ধরছিলাম। চন্দ্রার চোখদুটো ট্যারা নয় সুনীল? ললিতাটা কাঠের সখী। যশোদা কি হিজড়ে নির্মল? কিন্তু আসরে যখন, যতবারই প্রবেশ ঘটছিল রাধিকা আর বিন্দেদূতীর আমরা বিমোহিত হয়ে গান শুনছিলাম। দর্শকরা পুনঃ পুনঃ হাততালি মেরে এনকোর দিচ্ছিল -এনকোর! এনকোর!! এনকোর -তারমানে দৃশ্যটা আবার হোক!

 “বৃন্দা।। বলি ও বিনোদিনী, তুই বুঝি আর কালো রূপ

 হেরবি না? –

 (গীত) তমাল কালো কোকিল কালো, কালো মাথার

 বেণী

 কালো যে যমুনার জল, কালো চোখের মণি –

 এসব যে তোর দেহে বিরাজ করছে, এসব নিয়ে

 তুই তবে কী করবি?

 রাধা।। বিন্দে গো, আমি কালো দেখব না, কালো

 জলেও যাব না।

 বৃন্দা।। আর কোকিল, তমাল -কী করবি?

 রাধা । তমালগাছকে শ্বেতচন্দন লেপে সাদা করব,

 কুঞ্জ হতে কোকিলকে তাড়ায়ে দিব, মাথার চুল

 মুড়ায়ে ফেলব।

 বৃন্দা।। চক্ষের মণি কী করবি?

 রাধা।। (গীত) উঠায়ে ফেলব, চক্ষের মণি উঠায়ে

 ফেলব।

 বৃন্দা।। তবে যে তুই কানা হবি?

 রাধা।। আমার কানা-ই ভালো –

 বৃন্দা। আমিও তো বলি -কানাই ভালো, তোর

 কানাই ভালো। (গীত) বেশ তো হল

 আপষের কথা, যার লাগি এ মাথা ব্যথা,

 এ তো হল আপষের কথা”-

 

 শুনতে শুনতে আমার কী যে হল সেকথা বলতে পারি না। অন্তর ব্রহ্মাণ্ড আমার থর থর করে নড়ে উঠল, রিন ঠিন করে কী যেন কোথায় ভেঙে পড়ল! রাধিকার অঙ্গের ওই সিল্কের শাড়ি, তার কুঁচকানো-মুচকানো দাগ, ওই ‘ঢল ঢল অঙ্গের লাবণি’ –

মনে হল ছুটে গিয়ে একটু ছুঁয়ে দেখি, অভিমানিনী রাধার মানভঞ্জন করে বলি –

তোলো মুখ মোছ আঁখি জল, লো মানিনী

হেসে কথা কও –

আমিই বংশীধারী শ্রীহরি, তোমার বিহনে –

 “না না রাখব না, রাখব না গো এ ছার পরাণ

 রাখব না,

 আমি রাধাকুণ্ডে প্রাণ ত্যজিব, এ ছার পরাণ

 আর রাখব না”

  

মনে হল ছুটে গিয়ে মেডেলস্বরূপ সেফটিপিনে একটাকা দশটাকার নোট গিরিবালার বুকের কাপড়ে গেঁথে মালার মতো ঝুলিয়ে দিই! আসরের মান্যগণ্য লোকজন একে একে উঠে গিয়ে সাজঘর থেকে গিরিবালাকে মঞ্চে ডেকে এনে দশটাকা বিশটাকার নোট মেডেলস্বরূপ দিলও! দিতে গিয়ে যাহোক মুখস্ত বলল –

 “আমি শিরি গোবরধন ঢ্যাং।। সাং ভালিয়াঘাটি।।

 আজকের আসরে শিরিরাধার মানভঞ্জন পালায় শিরিরাধার

 ভূমিকায় গিরিবালার অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে মেডেলস্বরূপ

 একটা দশটাকার নোট” -ইত্যাদি ইত্যাদি –

 পরের দিন সকালেই কীর্তনীয়ার দল আমাদের গ্রাম ছেড়ে চলে গেল। শ্রীরাধার মানভঞ্জন ঢপযাত্রার রেশও ধীরে ধীরে মুছে গেল মন থেকে। হাটে গিয়ে বাজারে গিয়ে গ্রামের লোকজন মাঝেমাঝে গিরিবালার খবর নিয়ে আসে -নাকি কীর্তনপার্টির সেই অধিকারীমোশাইকেই বিয়ে করেছে গিরিবালা। না না, অধিকারীমোশাই তো প্রথম পক্ষ, তাকে ছেড়ে গিরিবালা এবার আছে এক কাঠমহাজনের সঙ্গে। নাকি গাড়ি চড়ে রোজ রোজ হাওয়া খেতে বেরোয়! মাস কয়েক যেতে না যেতেই অন্য খবর। গ্রামের লোক এসে আক্ষেপ করে বলে -আহা, সেই – “এসব তোরা ভাসায়ে দে গো, কালিন্দী যমুনার জলে এসব তোরা ভাসায়ে দে গো” -গান আর শোনা যাবে না! গানের ব্যবসা ছেড়ে গিরিবালা এবার দেহের ব্যবসা শুরু করেছে। কাঠমহাজনকে ছেড়ে সে এবার শহরবাজারে ঘর নিয়েছে! আমাদের ঘরের মেয়ে গিরি বেবুশ্যে বাজারিয়া মেয়েমানুষ হয়ে গেল গো! বাজারিয়া মেয়েমানুষ – ছিঃছিঃ –

 

২

 

 শীতের মরশুম। হাটে হাটে পুঁই-পালং-বাঁধাকপি-ফুলকপির যেমন আমদানি খুব, তেমনি আমদানি নতুন বইয়ের। ইস্কুলে ইস্কুলে রেজাল্ট আউট হয়েছে, বুকলিস্ট ছাপা হয়ে ছাত্রদের হাতে হাতে ঘুরছে। গরম গরম নতুন বুকলিস্টের গন্ধ শুঁকে ছাত্ররা দৌড়ুচ্ছে এ বইয়ের দোকান থেকে সে বইয়ের দোকানে।

 বুকলিস্টের পাতায় গোল গোল কালির দাগ মেরে গছিয়ে দিচ্ছে পুস্তকবিক্রেতাদের হাতে। বলছে -দাদা, এই বইগুলো একবার দেখুন তো, দেখুন না ও ভাই। বুকলিস্ট হাতে নিয়ে হয়তো পুস্তকবিক্রেতা বড়োই অমনোযোগ দিয়ে, মন দেওয়ার দরকারই হয় না কারণ সব তাদের মুখস্ত! বলল না, এস. রায়ের ইতিহাস ছাপা নেই।

হতাশ-হতোদ্যম ছাত্রটি এবার মনে মনে বলল – ঠিক বলছে তো দোকানী? বলেই অবিশ্বাসী সে হয়তো পরের দিন তাদের বাঁধাকপির গাড়ি হাটে গেলে সেও সঙ্গে যাবে – মনস্থ করল। সেখান কার মল্লিক পুস্তকালয়ে হেন বই নেই যা পাওয়া যাবে না!

 এভাবেই আমি, সুনীল আর নির্মল কুলটিকরির হাটে এসে ছিলাম বই কিনতে। নির্মলের কী বই জানি না, সুনীলের পি. কে. দে সরকার, আমার ল্যাডলিমোহন মিত্রের কেমিস্ট্রি, একটা জিওমেট্রিবক্সেরও দরকার ছিল।

আমরা বাঁধাকপির গাড়িতে চড়ে হাটে এসে ছিলাম, ফিরবও গাড়িতে। ধাঁচাবাঁধা গরুর গাড়ি। ধাঁচা অর্থাৎ ছই। তলায় পরিপাটি করে খড় বিছানো। তার উপর শতরঞ্জি পেতে এই শীতের মরশুমে বেশ ওম নিতে নিতে, চাই কি ঘুমোতে ঘুমোতে বাড়ি ফিরব। গরুর গাড়ির গতিবেগ শ্লথ হলেও বেশ মধুর , একটা মৃদু মধুর ছন্দ আছে। তার উপর বলদজোড়া যদি বলবান ও তাগড়াই হয় তো কথাই নেই!

 গাড়ি এসেছে অনাদি খাটুয়া, দিগো দলুই, দঁড়পাট আর দত্ ঘরের। বাঁধাকপির গাড়ি – একেকটাতে কপি ছিল দু শো তেতাল্লিশ দু শো পঞ্চাশ দু শো ছিয়াত্তর, কোনও কোনওটায় তার চেয়েও বেশি। বড় বড় সাইজের কপি। ফলন খুউব ভালো। তবে মরশুম শেষ হয়ে আসছে বলে পাতাগুলো বুড়ো হলদেটে, দামও তেমন লাভজনক নয়।

তবু হাট ভাঙবার অনেক আগেই গাড়ি গুলো ধাঁ ধাঁ করে আজাড় হয়ে গেল। পাইকাররা হামলে পড়ে কিনে নিল। এসব কপি চালান হয়ে যাবে খড়্গপুর, হাওড়া, কলকাতার বাজারে। হাওড়া-শিয়ালদার হোটেল-রেস্তোঁরায় পোকামোকা বুড়ো বাঁধাকপির তরকারি খদ্দেররা পয়সা দিয়ে খাবে।

কপি বেচা তো হল এবার জিনিসপত্র কেনাকাটার পালা। কেউ একটিন সরিষার তেল কিনবে, ক লিটার কেরোসিন, পয়সা কুলোয় যদি তো মোহিনী মিলের একটা ধুতি কিনবে, একজোড়া শাড়ি। এখানে নয়, আরেকটু এগিয়ে বেলদা-খাকুড়দায় কেউ মন কতক ধান কিনবে। তার চাষ এবার আশানুরূপ হয়নি, তাই।

এসব কথা আমরা তিন বন্ধুতে ছাড়া-গাড়ির পাশটিতে দাঁড়িয়ে অল্পবিস্তর শুনছিলাম। আমাদের বইকেনা শেষ, গাড়ি চড়েই বাড়ি ফিরব, তাই গাড়ি মালিক ও গাড়োয়ানদের জন্যই এখন শুধু অপেক্ষা! একটা মস্ত ইঁদারার পাশেই গাড়িগুলো ছাড়া, বলদগুলো গাড়ির জোয়ালেই বাঁধা। তাদের মুখের চারপাশে খড়, বুড়ো কপিপাতা ছড়ানো। হাটে কোনও কোনও গাড়ির মালিক ও গাড়োয়ান দু জনেই এসেছে, আবার কোনও গাড়ির কেবল গাড়োয়ানই ভরসা।

মনো সিং জাতে ভূমিজ। সে দত্ ঘরের জনমজুর। অনন্ত দত্তের বাঁধা কপির গাড়ি নিয়ে সে হাটে এসেছে। কালো, তাগড়াই চেহারার মনো ভারি লাজুক আর সাদাসিধে প্রকৃতির। মুখ দিয়ে সহজে কথা বেরোয় না, কোনও কিছু জিজ্ঞাসা করলে সে বড়োজোর হাসে। বয়সও খুব বেশি নয়। এই কুড়ি-বাইশ! আজ মোট দু শো সতেরো টাকার কপি বেচেছে। তার থেকে তিন টাকার মাংসভাত খেতে সে গেছে অন্নপূর্ণা হিন্দু হোটেলে। আচমকা একরাশ লাল ধুলো উড়িয়ে হাটতলায় এসে ঝাড়গ্রাম-কুলটিকরি বাসটা থেমে গেল। ধোঁয়া আর পোড়া ডিজেলের গন্ধে, বাস থেকে হুড়মুড়িয়ে নামা যাত্রীদের কোলাহলে হাটতলা মুহূর্তেই সরগরম! গুপ্তমণি হয়ে ঝাড়গ্রাম-খড়্গপুরের প্যাসেঞ্জার নিয়ে বাকড়া-পেঁচাবিঁধা-কেশিয়াপাতা-কাঁটাবনীর ভিতর দিয়ে বাসটা মোকাম কুলটিকরিতে এসে পড়ে। এই পড়ন্ত বেলায় যারা বাস থেকে নামে তারা সবাই কাছাকাছির যাত্রী, দূরের যারা তারা হাটবার হাটবার বাসে চড়ে আসে যাতে করে হাটুরে লোকজনের সঙ্গে রাত হলেও নির্ভাবনায় বাড়ি পৌঁছাতে পারে! পরনে লাল ছাপা শাড়ি, হাতে পলিথিনের ঝুড়ি, ব্যাগে ভরে, কিছু কাগজ ঠোঙা, কেক-পাঁউরুটি, মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে কে একজন মহিলা বাস থেকে নেমে এদিকেই আসছে আমরা তিন বন্ধুতে সচকিত হলাম।

বাসস্ট্যান্ডের এদিকে চায়ের দোকান, চপ-ফুলুরিও বিক্রি হয়। কাঠবেঞ্চির উপর এঁটো শালপাতা, ঠোঁটের দাগধরা গ্লাস। দোকানের বয়গুলোও অলস, অপরিষ্কার। মাছি ভনভন। মাছির মতোই খদ্দেররা সেখানে গুন গুন করে রাজা-উজীর মারে, পার্টি-পলিটিক্স করে। এতদূর থেকে দেখেও আমার মনে হল -সেই তারাও যেন বাস থেকে নামা মহিলাকে দেখে কেমন একটু নড়ে বসল!  তাদের ভিতর যেন বাঁকা ঠোঁটে হাসি আর ফিসফিসানি শুরু হল। দোকানদার যেন তার দোকানের বয়কে ঠেলে পাঠিয়ে দিল -যা যা -শিগগির যা স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছি চায়ের দোকানের নোংরা অপরিষ্কার ছেলেটি মহিলার পিছু পিছু ছুটে আসছে। কাছাকাছি এসে বলল – ও দিদি, আসুন না আমাদের দোকানে একবারটি, এককাপ চা খেয়ে যান –

মহিলা ঘাড় না ঘুরিয়েই বলল- ন্না।

 তবুও নাছোড় ছেলেটি মহিলার প্রায় পিঠের উপর হুমড়ি খেয়ে সমানে বলে যাচ্ছে – আসুন না, ও দিদি, এককাপ চা – মাইরি বলছি মালিক আপনেকে ডাকতিছে।

 এইবার বিদ্যুৎ চমকের মতো ঘুরে দাঁড়িয়ে পা ঠুকে মহিলা উত্তর করল – মুঁয়ে আগ্গুন!

 মুহূর্তে আমরাও চিনে গেলাম গিরিবালাকে। তাহলে -এতদিন পরে গাঁয়ে ফিরছে গিরিবালা? পানের রসে রাঙানো ঠোঁট? নাকি বাজারিয়া রঙ মেখেছে গিরি? কুঁচি দিয়ে শাড়ি পরা, গায়ে চোখ ধাঁধানো আবিররঙা ব্লাউজ। পায়েও ম্যাচ করা জুতো। রীতিমতো লেডি হয়ে গেছে গিরিবালা!

 আর কেউ না হোক আমি অন্তত মিলাতে চেষ্টা করলাম – সেই একরাতে অনেকদিন আগে আমাদের গাঁয়ে অনুষ্ঠিত ‘শ্রীরাধার মানভঞ্জন’ পালায় দেখা গিরিবালাকে, যে কী না, হ্যাজাকের আলোয় ঝলকিত যার শাড়ির কুঁচকানো-মুচকানো দাগ আমার অন্তর ব্রহ্মাণ্ড নাড়িয়ে দিয়েছিল থরথর করে!

 এখন সেই গিরিবালার আগুয়ান উপস্থিতিতে গাড়ি মালিক ও গাড়োয়ানদের ভিতর দেখা দিল এক অদ্ভুত পরিস্থিতি ও অস্থিরতা। আমরা তিন বন্ধুতে পরস্পর কাঁধে হাত দিয়ে তাই লক্ষ্য করলাম -যারা এতক্ষণ বসেছিল তারা উঠে দাঁড়াল, কেউ কেউ জল খাওয়ার অছিলায় ইঁদারার দিকে সরে গেল, আর কেউ ঠোঁট টিপে হাসতে লাগল।

অতকিছু দেখল না গিরিবালা, সে এগিয়ে এসে আব্দার করে বলল –

মুই ঘর যামু মোকে কার গাড়িতে কে নিবু ক?

আমি বাড়ি যাব, কার গাড়িতে আমাকে কে নিয়ে যাবি বল?

শোনামাত্র গাড়োয়ানরা চুপ মারল, পরস্পর ঠোঁট কামড়ে হেসে এ ওকে ঠেলতে লাগল। দিগম্বর দলুই হাটে নিজে আসেনি, তার মুনিশ একাই বাঁধা কপির গাড়ি এনেছে। দলটার ভিতর সেই প্রথম আমাদের দিকে উঠে এল। বলল –

কী করে বলি, বলো তো ললিন? মাহাজন আসেনি, তার গাড়িতে একটা বারো-ভাতারি বেবুশ্যে মে ‘মানুষকে তুলি কী করে, যেদি মাহাজন মোকে বকে?

ওদিকে দিগম্বর দলুইয়েরগাড়ি জেনে গিরিবালা মহাখুশি। বলল –

অ, চঁদরপুরের দিগো দলুইয়ের গাড়ি? দিগোদাদা অতবা থাইনে গাড়ি তো গাড়ি মোকে মাথায় করিনি যাইতান কই? কে আছু রে গাড়ুয়ান, আয় মোকে টিকে বেলাবেলি ঘর নি চল! বলেই কাপড় তুলে সাবধানে গাড়িতে উঠতে গেল গিরিবালা –

 বেলাবেলি অর্থাৎ দিন থাকতে ঘরে পৌঁছাতে চায় গিরিবালা। এখান থেকে তার বাড়ির যতটা দূরত্ব, গাড়ি এখনই রওনা দিলেও পৌঁছুতে রাত হবে। হয়তো রঞ্জিতপুর কী কদমডিহার কাছাকাছি সূর্য ডুবে গিয়ে অন্ধকার নেমে আসবে।

গিরিকে গাড়িতে উঠতে দেখে আমাদের পরামর্শ না শুনেই দিগো দলুইয়ের মুনিশ গাড়ির কাছে ছুটে গেল। হাঁই হাঁই করে বলল গাড়ি ছাড়তে মোর রাত হিবে, কিছো সওদা করতে অখনও বাকি। তাছাড়া রাস্তায় মোকে ধান কিনতে হিবে। আরও তো গাড়ি আছে মেলাই। তুমি অন্য গাড়ি খুঁজো না, খুঁজো! আমরা তিন বন্ধুতে পরস্পর বলাবলি করলাম ছিঃ, অতটা মিথ্যে না বললেই পারত দিগোর মুনিশ! কেউ না বললে জানত কী করে তার মহাজন?

এখন মহা ফাঁপরে পড়ে গেল গিরিবালা! মুখ দেখে আমার তো তাই মনে হল। মনে পড়ল মানভঞ্জন পালায় দেখা কৃষ্ণবিরহে পাগলিনী রাধার মুখখানি –

 “বৃন্দা।। ওগো বিনোদিনী, আমি যদি তোর বন্ধুকে

 এনে দিতে পারি তুই আমাকে কি দিবি?

 রাধা।। তুই যা চাইবি তাই দেব। দে আমার বন্ধুকে

 এনে দে।

 বৃন্দা।। যদি আমি ‘তাকে’ চাই? দিবি কীনা বল?

 (গীত) যদি আমি চাই, তোদের যুগল চরণখানি

 আমার মনের সাধ পুরাইলে, এনে দিব তোর

 চিন্তামণি।।

 রাধা।। বৃন্দে তার জন্যে কোনও চিন্তা নাই। তাই দেব।”

 মনে হল এখন এই মুহূর্তে যদি কেউ তাকে গাড়িতে নিয়ে যেতে রাজি হয়, তবে তাকে তার সবকিছু উজাড় করে ঢেলে দেবে গিরিবালা। সে অতঃপর হাজির হল দঁড়পাটদের গাড়ির কাছে। এতক্ষণে বেলাও ঝিরি ঝিরি। একটা অদৃশ্য অন্ধকারের মলিন ডানা যেন ইতিমধ্যেই গোটা হাটটার উপর ছায়া ফেলতে শুরু করেছে। হাটের লোকজনও ধীরে ধীরে কমে আসছে।

এইমাত্র একটিন সরিষার তেল, একজোড়া মোহিনী মিলের ধুতি ও শাড়ি কিনে এনে গাড়িতে উঠে জায়গা মতো রেখে দিচ্ছিল রাখাল দঁড়পাটেরছোটভাই দিবাকর দঁড়পাট। রাখাল আসেনি, দিবাকরই নিয়ে এসেছে গাড়ি খানা। আজ হাটে সবচেয়ে বেশি দামে কপি বেচেছে দিবাকর দঁড়পাট। সে বড় লক্ষ্মীমন্ত! রাখালের সঙ্গে তার মুখের বড়ো মিল। আমরা তিন বন্ধুতে খুব কাছেই দাঁড়িয়ে আছি।

 অনেকের মতো গিরিবালাও প্রথমে ভুল করল। বলল রাখালদাদা না?

দিবাকর বলল না, মুই দিবাকর।

তাই শুনে গিরিবালার সে কী হাসি!

এত বিপাকে পড়েও হাসছে কী করে মেয়েটা! আমরা ভাবলাম যাক, এই হাসি দেখে যদি দিবাকর দঁড়পাট ভোলে! রাখালদাদা তাইনে আসেনি? বড়ভাই ভালা আছে ত দিবা? বলেই গুটিশুটি উঠে গাড়িতে বসতে যাচ্ছিল গিরিবালা। দিবাকর বলল আহা করেন কী, করেন কী! গাড়ি আজ যাবেনি। আজ গাড়ি যাবে ঢেরাছাড়ায় দাদার শউরাঘরে!

ইস! দিবাকর দঁড়পাটও দাদার শ্বশুরঘর দেখাল গিরিবালকে! আমরা ভাবলাম আজ তবে আর গরুর গাড়ি করে বাড়ি যাওয়া হল না গিরিবালার! বিশেষত আমাদের গাড়োয়ান মনো সিং যে প্রকৃতির এমনিতে মেয়েদের মুখের দিকে তাকায় না চোখ তুলে, সে আবার গিরিবালার মতো বাজারিয়া মেয়ে-মানুষকে নিয়ে রাতের অন্ধকারে ফাঁকা জনবিরল রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরবে? হরগিজ না মরে গেলেও না! এক এই যদি আমরা সঙ্গে আছি। কিন্তু সে তো সেই যে গেছে তিনটাকার মাংসভাত খেতে অন্নপূর্ণা হিন্দু হোটেলে। গেছে তো গেছে ফিরছে কই? তবে কী তিনটাকায় হল না? এক হোটেলেও হল না? আরও অতিরিক্ত খরচ করে সে মহামায়া কী মহালক্ষ্মী হোটেলে গেল? এদিকে নিরুপায় হয়ে গিরিবালা আবার গোড়া থেকে রিপিট করল। কিন্তু কথায় বলে- চাষার গোঁ আর গাড়োয়ানদের গোঁ! কেউই চলল না। কাউকেই টলাতে পারল না গিরিবালা! অগত্যা সে আমাদের কাছে, আমাদের গাড়োয়ানের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকল। বন্ধুরা পি. কে. দে সরকারের গ্রামার বইয়ের কথা আলোচনা করছিল। নাকি ফাইনালে ইংরেজির বহু প্রশ্নই হুবহু এ বই থেকেই চলে আসে!

আমার একটুও মন ছিল না গ্রামারে। বারে বারেই চোখ চলে যাচ্ছিল গিরিবালার হাতে ধরা পলিথিনের ঝুড়ি ব্যাগে। ঝুড়ি ব্যাগে কিছু জামাকাপড়, কেক-পাঁউরুটি, মিষ্টির প্যাকেট। আচ্ছা ধরা যাক রাজি হল না মনো সিং, গরুর গাড়ি করে বাড়ি যাওয়া হল না গিরিবালার তখন একা মেয়েমানুষ এই বিদেশ বিভুঁইয়ে কী করবে? ফেরার বাস নেই যে ফিরে যাবে শহরে! তখন? তারবেলা? তবে কী এঁটো শালপাতা ছড়ানো কাঠবেঞ্চি, নোংরা ঠোঁটের দাগধরা গ্লাসে ভরতি, অপরিষ্কার অপরিচ্ছন্ন বয় আর মালিকের চা-চপ-পকৌড়ার দোকানে রাত কাটাবে গিরিবালা? “কুঞ্জ সাজায়ে দে গো “কোথায় গেল সেই কুঞ্জ, নূপুরনিক্কন, সখি সমভিব্যাহারে মল্লিকা-মালতী, কুসুম চয়ন, কালিন্দী যমুনার জলে সিনান-

এক ঝটকায় বন্ধুদের আলোচনা থামিয়ে দিয়ে বললাম এখন তোদের পি. কে. দে সরকার রাখ, দেখছিস বেলা যে ডুবু ডুবু! মনোকে চ্যাঙদোলা করে হোটেল থেকে তুলে আনি চ!

বেশি দূর যেতে হল না, মনো সিং হোটেল থেকে ভরপেট খেয়ে হাটের একধারে উবু হয়ে বসে ফিতাখেলা দেখছিল। কুঁচকানো-মুচকানো ফিতার গোলকধাঁধা, তার ভিতর গুঁজতে হবে কাঠি, ফিতা খুলে গেলেই পাঁচটাকা দশটাকার ফকোটিয়া লাভ! মনোকে ডেকে গিরিবালার কথা পাড়তেই মনোর সে কী মনোবিকার! বলল – উসব রেণ্ডি ফেণ্ডি নেহি চলে গা! শুনলে মালিক হামাকে জানে খতম করে দিবেক ললিনভায়া! বললাম -আমরা তো আছি, অনন্ত দতের পো কে আমরা বলব যা বলার, তুই মনো ভেবে দ্যাক একটা অসহায় মেয়ে অবশেষে, অনেক ভালো ভালো কথা বলার পরে রাজি হল মনো সিং। আমরা ইঁদারার কাছে ফিরে এসে দেখি -অনাদি খাটুয়া, দিগো দলুই, দঁড়পাটদের গাড়ি চলে গেছে। গিরিবালা নেই! আমরা অতঃপর টিটকিরি দিয়ে বলতে লাগলাম ও, এই তাহলে তোমাদের চরিত্র! মুখেনা না আর মনে মনে ষোল আনা! বেবুশ্যে মেয়ে গাড়িতে তুললে গাড়ি অপবিত্র হয়ে যায় আর সেই মেয়েমানুষকেই গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে বেশ ফুর্তিতে রসিয়ে রসিয়ে যাওয়া মনো সিং দাঁত বের করে হাসতে হাসতে গাড়ি জুততে চলে গেল। আমরাও তড়িঘড়ি গাড়িতে উঠতে যাব আর দেখি কী গাড়ির ভিতর খড়ের উপর শতরঞ্জি পেতে রীতিমতো পান সাজছে গিরিবালা!

আমাদের উঠতে দেখে বলল কই, এসো ভায়ারা -নাম তো জানি না তাই ভায়া বলছি তুমারকার মধ্যি কউ পান খাও যেদি খাও না? মুই পানে চুন টিকে বেশি খাঁও।

আমরা পান না খেয়ে চুপচাপ বসে থাকলাম। গাড়ি ছেড়ে দিল মনো সিং। দু দিকে টিকরোল ভূঁই আর মাঝে মাঝে কাঁটা ঝোপ তার ভিতর দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে। অনন্ত দত্তের বলদজোড়া বেশ সরেস! অস্তমান সূর্যের আলো গায়ে-মুখে মেখে দুলকি চালে হেঁটে চলেছে। কখনও কখনও রোদ ছইয়ের ভিতর ঢুকে পড়ে তির্যক আলো ফেলছে গিরিবালার মুখে। হলুদ আলোয় মুহূর্তে গৌরবর্ণ গিরিবালার ‘ঢল ঢল অঙ্গের লাবণি ‘যেন ঝলসে উঠছে কাঁচা সোনার মতো! ভুর ভুর করে বাসতেল আর বাজারিয়া সেন্টের গন্ধ এত কাছে গিরিবালা! এত কাছে! কতক্ষণ আর কথা না বলে থাকা যায়? গিরিবালাই শুরু করল আমরা কে ? কোন পাড়ায় থাকি? আমাদের বাবা-দাদাদের নাম কী? নাম জেনে উচ্ছ্বসিত গিরিবালা বলল অ, তুমি অমুকের ভাই? দাদার বিয়ে হল কোথায় ভাই? বউদিদি বুঝি খুউব সুন্দরী? সন্তানাদি কজন? অম্মা রে! বড়টি দৌড়ি বুলেটে?

অ মা রে! বড়টি হেঁটে বেড়াচ্ছে?

সুনীল, নির্মল আবার শুরু করল পি. কে. দে সরকার। ফ্রেজেস অ্যান্ড ইডিয়মসগুলো দেখেছিস? আর কোথাও না পাস পাবি পি. কে. দে সরকারে। সেই বলে না? যাহা নাই ভারতে তাহা নাই ভারতে। কথার কথা আমি বললাম সেনগুপ্ত-মুখার্জিও ভালো, দেখেছিলাম সেই কলকাতা না মেদিনীপুরের ছেলেটার কাছে। খুউব ভালো। বলেই আমি ঝোলা থেকে সদ্য কেনা কেমিস্ট্রি বই আর জিওমেট্রি বক্সটায় হাত বুলালাম – কী পেলব! কী মনোরম! নাকের ডগায় রেখে গন্ধ শুনলাম, বাসতেল আর বাজারিয়া সেন্টের গন্ধ!

টিকরপাড়া-রঞ্জিতপুর ছাড়িয়ে রোহিণী গাঁ মুড়োয় গাড়ি ঢুকতে না ঢুকতেই সূর্যটা ডুবে গেল। এতক্ষণ দুধারের ন্যাড়া ধানবিল থেকে রিম্ রিম্ করে হিম ধোঁয়া উঠছিল। ফিতার মতো হিম কুয়াশার চাদর ধেয়ে আসছিল গাড়ির পিছু পিছু। এবার সব যেন মুছে গেল গাঢ় অন্ধকারে! বাঁশঝাড় বেগুনাঝাড়ের ফাঁক-ফোকর দিয়ে দেখা যাচ্ছিল রোহিণী গ্রামের গ্রামবাসীদের ঘরে ঘরে জ্বলে ওঠা হেরিকেন, ডিবা-ডিবরির আলো। সন্ধ্যারতির মতো শোনা যাচ্ছিল মানুষজনের কোলাহল।

রোহিণী চাঁপাতলায় এসে পথ আবার বিভক্ত হয়ে গেল দু ভাগে -হাঁটা পথ আর গাড়ি চলার পথ। হাঁটা পথ দিয়ে সোজা বাবুঘর পেরিয়ে অতিদ্রুত গড়কাটা খালের কাছে আসা যায়। গরুর গাড়ি আসে ঘুরপথে। ফাঁকা মাঠের ভিতর দিয়ে। সেখানে জনবসতি শূন্য। শুধু গাড়ির লিকের দুধারে ঘন বেগুনা আর লাল ভেরেণ্ডার বনঝাড়। দিনমানেও আঁধার-অন্ধকার। আমরা তিন বন্ধুতে ঠাকুর দেখার অছিলায় নেমে দাঁড়ালাম চাঁপাতলায়। বললাম বাবুঘরে সরস্বতী প্রতিমা তৈয়ের হচ্ছে, তৈয়ের করছে কুমোরটুলির কালী পাল। আমরা এদিক দিয়ে হাঁটা পথেবাবুঘরের ঠাকুর দেখে ঠিক সময়ে গরুর গাড়ি আসার অনেক আগেই গড়কাটা খালের কাছে হাজির থাকব। তুই মনো ওনাকে নিয়ে সাবধানে ধীরেসুস্থে গাড়ি চালিয়ে আয়!

আসলে গিরিবালাকে নিয়ে মনোকে আমরা ইচ্ছে করেই যেতে দিলাম। যাক, বেগুনা আর ভেরেণ্ডা বনঝাড়ের ঘন গহীন অন্ধকারে গরুর গাড়ির ছইয়ের ভিতর একা বেবুশ্যে গিরিবালাকে নিয়ে মনোবেটা তার চরিত্র সামলাক। গিরিকে নিয়ে তো চলে গেল মনো সিং। আমরাও একদৌড়ে বাবুঘরের ঠাকুর না দেখে অদম্য কৌতূহল নিয়ে সোজা গড়কাটা খালের কাছে! খালধারে বঁইচি বনে অন্ধকার বাড়ছে। আমরা তিন বন্ধুতে গাড়ি আসার পথের দিকে চোখ রেখে ঠায় দাঁড়িয়ে আছি। কখনও চাপা স্বরে কথা বলছি, কখনও হাসছি। এসময় দূরে দূরে লবকেশরপুর, হাতিবাঁধি, আঁধারির গ্রামগুলোয় আলো দেখা যাচ্ছে জোনাকির মতো। খালের জল একহাঁটুর বেশি নয়। খালের ঘাটে উপুড় করা আলকাতরা মাখানো আপাতত প্রয়োজনহীন ডিঙিটাকে এখন দেখাচ্ছে ভূতের মতো। খালের জলে ভাসমান টুরি ব্যাঙগুলো মাথা উঁচিয়ে অযথা নিথর হয়ে পড়ে আছে। শির শির করে কী একটা পোকা পায়ের গোড়ালি ছাড়িয়ে উপরের দিকে উঠবার উপক্রম করলে লাথি ছোঁড়ার ভঙ্গিতে পা ছুঁড়ে সুনীল অকস্মাৎ বলে উঠল দু-শ-শা-লা! একটা সাপ হল হল করে এঁকে বেঁকে খালের জলে নেমে গেল। তার দিকে একটা ঢিল ছুঁড়ে বললাম নির্ঘাত ঢোঁড়া। টুরিব্যাঙগুলোকে এবার খাবে। অসহিষ্ণু নির্মল বলে উঠল আর কতক্ষণ? মনোবেটা কী গাড়ি থামিয়ে রাখল? আমরা তিনজনেই হো হো করে হেসে উঠলাম! এসময় অনতিদূরেই গাড়ি দেখা গেল। দুটো বলিষ্ঠ বলদ জোয়াল কাঁধে তালে তালে হেঁটে আসছে। দু ধারের বেগুনা আর লাল ভেরেণ্ডার বনঝাড়ের অন্ধকারে ঢাকা ধাঁচা বাঁধা গরুর গাড়ির ছইয়ের ভিতর গিরিবালাকে দেখা যাচ্ছে না। মনোও কী চুপচাপ? তার মুখে গরু খেদানোর হিঁ-হিঁ হঁ-হঁ শব্দও শোনা যাচ্ছে না কেন? আমরা এর-ওর গা টিপে ফের হাসাহাসি করলাম। গরুর গাড়ির পিছন পিছন একটা কুকুর আসছিল। আমাদের কাছাকাছি আসামাত্র কেন জানি আমরা তিনজনেএকসঙ্গেই ঢিল ছুঁড়ে কুকুরটাকে তাড়া করলাম। তারপর সুড় সুড় করে উঠে বসলাম গাড়িতে।

 গিরিবালা শুয়েছিল। এবার উঠে বসে জিজ্ঞাসা করল খোকামেনে তুমারকার ঠাকুর দেখা হিলা? কীর’ম ঠাকুর গড়েটে কালী পাল? চাপা হাসির জন্যে এসময় আমাদের ঠোঁটগুলোচাপা ছিল। তবু যথাসম্ভব মিথ্যে করে বললাম, সেই সঙ্গে এও জুড়ে দিলাম কালী পালকে মাটির ভাঁড়ে রঙ গুলতে দেখে এসেছি আমরা। নদী পেরিয়ে ডাঙায় উঠে গিরিবালাকে নামিয়ে দিল মনো সিং। এইটুকু পথ সে হেঁটেই যাবে। আমরা কিছুদূর যেতে দিলাম গিরিবালাকে । তারপর আমাদের চাপা হাসি গাদা বন্দুকের ছররার মতো এদিক ওদিক ছুটতে লাগল। আমরা কেউ মনো সিং য়ের পাঁজরার নীচে খোঁচা মেরে, কেউ তার থুতনি নেড়ে, কাতুকুতু দিয়ে উপর্যুপরি বলতে লাগলাম এই যে মনো, কী হল রে মনো, যাওয়ার সময় খুব যে ফ্লাইং কিস খেয়ে ঢপী বলে গেল মনু, তোর দিসরু আজ ঘরে আসা হিলা! মনো থেকে মনু কবে হলি রে? কী খেল্ দেখালি মনো রাধা হেন গুনোধনো –

“তোমার ললাটে সিন্দুর বিন্দু অধরে কাজল হে

কোন ধনী বিহনে নাগর আঁখি ছল ছল হে।

বলি, কোথা বা ছিলে

কার কুঞ্জে নিশি প্রভাত করলে, কোথা বা ছিলে?”

আমাদের এত আস্ফালনেও মনো সিং কিন্তু একটি কথাও বলল না। কিছুক্ষণ পাথরের মতো নিরেট থেকে হাসতে লাগল -তার সেই সরল সাদাসিধে হাসি!

 

৩

 

শীতের মরশুম পড়েছে আবার। আবার হাটে হাটে পুঁই-পালং-বাঁধাকপি-ফুলকপির আমদানি বাড়ছে। তবে এবার মরশুমের শেষ নয়, শুরু। কপির পাতা বুড়ো হলদেটে নয়, কচি ও সবুজ। কাঁচায় কচমচিয়ে চিবিয়ে খেলেও দারুণ স্বাদ। দামও চড়া। কুলটিকরির হাটে ধাঁই ধাঁই করে বাঁধাকপি ফুলকপির গাড়ি আসছে আর হাট ভাঙবার অনেক আগেই গাড়ি আজাড় হয়ে চলে যাচ্ছে। খাটুয়া আর দঁড়পাটরা কপি থেকে খুব কামাচ্ছে এবছর।

আজও মনো সিংয়ের গাড়িতেই কুলটিকরির হাটে এসেছি। এর মধ্যে বেশ কটা বছর দেখতে দেখতে কেটে গেছে, মনো আর সে-মনো নেই। অনন্ত দত্তের কাজ ছেড়ে সে এবার ধরেছে পাতরদের কাজ। পাতারাও চাষের কাজে খুব দড়! তার উপর মনো সিং য়ের মতো তাগড়াই জোয়ান মুনিশ পেলে উন্নতি অবধারিত। ফুলে ফেঁপে উঠছিল পাতররাও। আমিও বদলে গেছি যথেষ্টই। কখনও অবচেতন মনে সেদিনকার সেই ঘটনাটির কথা মনে এলে অ্যাডোলেসেন্স পিরিয়ডের ভুলভ্রান্তি বলে উড়িয়ে দিই। তবে মনোর নামে কিছুটা কলঙ্ক রটে গেছে ইতিমধ্যেই। আমরাই রটিয়েছি। গিরির সঙ্গে মনোর সেদিন প্রকৃত কিছু ঘটেছিল কী না – একথা জিজ্ঞাসা করলে মনো আজও কিছুক্ষণ পাথরের মতো নিরেট থেকে হাসে তার সেই সরল সাদাসিধে হাসি! না-ও বলে না, হ্যাঁ-ও বলে না মনো। সুতরাং রহস্যই থেকে যায়। গ্রামে ঘরে নতুন কতকিছু রহস্যই তো আমদানি হয় -পুরাতন নিয়ে কে আর অত মাথা ঘামায়! অতএব, মনোর কলঙ্কের উপরও চাপা পড়ে যায় ধামা।

আজ মনোর সঙ্গে কপির গাড়িতে আসার সময় মনোকে বলেছি -তুই মনো কপিগাড়ি আজাড় হয়ে গেলে গাড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরে যাস। আমার জন্যে অপেক্ষা করার তোর দরকার নেই -আজ আমি ফিরব না। অ্যাঁ? আজ তবে কুথায় থাকা হবেক গো, ললিনভায়া? মনোর বিস্মিত চোখের সামনে একটা চাবি দুলিয়ে বলেছিলাম -অখিল মাস্টারের ভাড়াঘরের চাবি -বড়দিনের ছুটিতে অখিল বাড়ি গেছে, তার ওখানেই রাতটা থেকে যাব। কাল সকালে বাস ধরে মেদিনীপুর – মেদিনীপুর টাউনে আমার খুব জরুরি কাজ আছে, মনো।

অখিল আমাদের পাশের গ্রামের ছেলে। কুলটিকরির কাছে বিনন্দপুর গ্রামে সে মাস্টারি করে। বাড়ি থেকে যাতায়াতের সুবিধে নেই বলে এই ক মাস হল কুলটিকরিতে ঘর ভাড়া নিয়ে সে থাকে। বাজার সংলগ্ন ছোট্ট ঘর একসঙ্গে দু-তিনজনের বেশি থাকা যায় না। হাটে বা কোনও কাজে এলে ফিরতে না পারলে অখিলমাস্টারের ভাড়াঘরে কোনও মতে ঠেলে গুঁজে স্থান সংকুলান হয়। অখিলমাস্টারের ভাড়াঘর তাই সকলের চেনা। পেশায় মাস্টার হলেও অখিল ছেলে ভালো। হয়তো আর কদিন বাদেই আমিও তার মতোই মাস্টার হব আর সেই সুবাদেই কাল আমার মেদিনীপুরে যাওয়া। মনো সিং য়ের কপিগাড়ি থেকে নেমে কিছুক্ষণ হাটের ভিতর ঘুরে বেড়ালাম। সেই চা, চপ-ফুলুরির দোকান, কাঠবেঞ্চি, এঁটো শালপাতা, ঠোঁটের দাগধরা গ্লাস, মাছি ভনভন একরকমই আছে। শুধু এই ক বছরের হাটতলায় এদিক সেদিক আরও খানকতক ঘুগনি, চা-পাঁউরুটি- লেড়ো বিস্কুটের দোকান হয়েছে। আড়ে-দীর্ঘ হাট বেড়ে গেছে আরও কয়েক শো গজ। মল্লিক পুস্তকালয়ের সামনে এখনও উপছে পড়ছে ইস্কুল ছাত্রদেরভিড়। পিঠের উপর কালো কুচকুচে চুলের বেণী দুলিয়ে রঙচঙে সাইকেল চালিয়ে মেয়েরা ঝুপ ঝুপ নেমে পড়ছে এ দোকান সে দোকানের সামনে। মল্লিক পুস্তকালয় ছাড়াও কুলটিকরিতে এতদিনে দি নিউ বুকস্টোর্স, মহাদেবালয়, কুইলা কো-অপারেটিভ নামের আরও দু-তিনটে বইখাতার দোকান হয়েছে। আমার নতুন বই কেনার আপাতত আর প্রয়োজন নেই, হাইয়ার সেকেণ্ডারি পাশ করেই প্রাইমারি স্কুলে টিচারশিপের জন্যে অ্যাপ্লাই করে দিয়েছি, যোগাযোগ চলছে, হয়তো এক-দু মাসের ভিতর হয়েও যাবে -দরকার নেই, তবু বই দোকানেরসামনে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করলাম। আহা, নতুন বইয়ের গন্ধ, একেকটা জিওমেট্রি বক্সের ডিজাইন কী! কিছুটা মনখরাপ নিয়ে চাবি খুলে অখিলমাস্টারের ভাড়াঘরে ঢুকলাম। আগেও এসেছি অনেকবার। চেনা মহল -ওই তো মুড়ির টিন, রূপালী রঙকরা

হেরিকেন। একটা তালাবদ্ধ বাক্স, জলের কুঁজো, দাঁতমাজা ‘আকবর’ গুড়াখুর কৌটো, তক্তপোশের উপর গোটানো বেডিং, দেওয়ালে হেলান দেওয়া মশারি খাটানোর বাঁশবাতা, একটা প্যাকিং বক্সের কাঠ দিয়ে তৈরি আলনা, তার উপর দুটো-চাট্টা বই। হেরিকেন জ্বেলে উত্তরের জানলাটা এক মুহূর্ত খুলে দিলাম। হু হু করে উত্তুরে ঠাণ্ডা হাওয়া চোখে মুখে ঝাপটা দিল। জমি জমি করেও শীত এখনও জমেনি! মাটির বাড়ি, ভিতর-ঘরে ঢোকার আগে হাফ-দেওয়াল তোলা এক চিলতে বারান্দা, একটা হাতল-ভাঙা চেয়ার, একটা কাঠবেঞ্চি। এখানে বসেই অখিলমাস্টার হয়তো টিউশনি করে। অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে অখিল এখন এখানে অখিলবাবু।

ঘরে আছো নাকি হে, অখিলবাবু? মনে মনে হাঁক ছেড়ে গুড়াখুর কৌটো খুলে ডানহাতের তর্জনীতে একদলা তামাক লটকে ভিতরের পাতকোতলায় বসলাম আয়েস করে দাঁত মাজতে অখিল-ককিল কেউ নেই। আমিই এখন সুবে বাংলা-বিহার-ওড়িশার নবাব সিরাজদ্দৌলা, বাছুরখোঁয়াড়ের ললিন। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে এসে ঘর-বারান্দা-কুয়োতলা, চারানো একটা দুটো গাঁদা-গুলাজের গাছকে অন্ধকারে ঢেকে ফেলল। তারপর দরজায় কড়া নাড়া। দাঁতে স-তামাক ঘষতে ঘষতেই বলে উঠলাম কে?

হামি নো একটুন খুল দরজা! গলা শুনেই বুঝেছিলাম মনো, মনো সিং। কানে খাটো নাকি মনো? এই তো তাকে বলে এলাম আজ আর ফিরছি না, কাল জরুরি কাজে যেতে হবে মেদিনীপুর, তবু! তাছাড়া কোথায় থাকবএই নিয়েও তো কথা হল! চেঁচিয়ে বললাম দাঁড়া, মুখ ধুয়েই আসছি মনো। তড়িঘড়ি কুলকুচো করে মুখ ধুলাম। তামাকের রাগী গন্ধ মুখ থেকে সহজে যেতে চায় না মাথার ভিতর ঝিম ঝিম ভাব। হেরিকেন হাতে দরজা খুলেই বললাম, তুই এখনও যাস নি মনো? আমি তো বলে এলাম আজ আর ফিরছি না কথা শেষ করতে দিল না মনো, তার আগেই বলল সে তো হামি জানি ললিনভায়া, কিন্তুক বলেই ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল মনো সিং। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখলাম হাটতলায় নয়, গরুর গাড়িটাকে এই বাড়ির খুব কাছেই নিয়ে এসেছে মনো সিং।

ওই তো এ বাড়ির ঢোকার মুখে গেটের কাছেই ছেড়ে রেখেছে গাড়িটাকে। অন্ধকারে গরুগুলোর কান ঝাড়ার লটপট শব্দ। অবাক হয়ে বললাম কিন্তু কী মনো? শরীর খারাপ? কালো, তাগড়াই চেহারার ভুসভুসে মানুষটা দুধের মতো সাদা দাঁতে হাসল। তার সেই সরল সাদাসিধে হাসি। তারপর ডানহাতের পাঁচটা আঙুল এক জায়গায় জড়ো করে ঝুমকো ফল দিয়ে দরজার চৌকাঠে গেরুমাটির ছোপ লাগানোর মতো চৌকাঠে ঠুকতে ঠুকতে বলল, উসব তো ঠিক আছে ললিনভায়া, শরীলের কথা ভাবছি না, ভাবছি –

 -কী?

 -উ যে ফের এতদিন বাদে হামার গাড়িতেই উঠেঁ বসেছে। হাতে ধরে টানলেও আর উঠছে নাই।

 -কে? এতদিন বাদে কে আবার তোর গাড়িতে উঠে বসল মনো আমি যে মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝছি না। মনো সিং পাথরের মতো কিছুক্ষণ নিরেট থাকল, তারপর হাসল। ধীরে ধীরে বলল ওই যে গিরিবালা না ফিরিবালা!

গিরিবালা? মুহূর্তে কোথাও ভূমিকম্প হয়ে গেল বুঝি বা! এমনিতেই সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হতে না হতেই শীতকালীন অন্ধকার নিরেট পাথরের মতো চাপ চাপ জমতে শুরু করে দিয়েছে। তার ভিতর ভুসভুসে কালো পাহাড়ের মতো মনো সিং এ আবার কী খবর বয়ে আনল ? হাট ভেঙে গেছে একটু আগেই, হাটতলা অন্ধকার, শুধুমাত্র চালাঘরগুলোয় হ্যাজাক লাইট-হেরিকেন-কেরোসিনের কুপি জ্বলছে। হয়তো ব্যাপারির দল এতক্ষণ বিক্রিবাটার হিসাব নিয়ে বসে আছে। গলায় ঝুলানো কাপড়ের বটুয়া থেকে মুঠো মুঠো খুচরো পয়সা বের করে গুনতে লেগেছে। অখিল- ভাড়া করা ঘরটি বাজার সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত হলেও আশপাশে দুটো-চাট্টা গৃহস্থ বাড়ি যে নেই -এমন নয়। রীতিমতো আড়ষ্ট হয়ে নীচু স্বরে বললাম, গিরিবালা? সে এখন কোথায় মনো?

দেখতে বড়ো কৌতূহল হল বৈকি! এতদিন বাদে আবার এ কী প্রত্যাবর্তন গিরিবালার! না জানি এতক্ষণ দিনের আলোয় হাটচালায় তাকে নিয়ে দঁড়পাট-দত্ত-দলুই-বেহারা-পাত্রদের ভিতর, অনার্য গাড়োয়ানদের ভিতর কী রকম হাসা-হাসি লুফোলুফি খেলা চলেছে! শাড়ি তুলে সাবধানে গাড়িতে উঠতে গেলে হাঁই হাঁই করে বলে উঠেছে -এ গাড়ি যাবেনি, এ গাড়ি ঘুরপথে ঢেরাছাড়া হয়ে মনো বলল মহারানী তো গাড়িতেই গ্যাঁট হয়ে বসে আছে গো!

গাড়িতেই গিরিবালা? বলে কী মনো সিং? গলার স্বর নামিয়ে ফিস ফিস করে বললাম তা এখানে কেন নিয়ে এসেছিস মনো?

মনো বলল হামি উ বারো-ভাতারিকে গাড়িতে লিবো নাই!

তার আমি কী করব?

মনো যেন কিছুটা হতাশ হল। ধীরে ধীরে বলল -লিতে পারি, তবে একশত্তে-

কী?

তরহা যদি সঙে যাও! অর্থাৎ, তুমি যদি সঙ্গে যাও।

আমি? আমি কেন? হাত নেড়ে বললাম –

না না, সে কী করে সম্ভব মনো? কাল আমার মেদিনীপুরে জরুরি কাজ আছে, আমাকে যে যেতেই হবে!

মনে মনে বললাম – কোথায় কী! গিরিবালা তো গিরিবালা, তারসঙ্গে আমার কী যতসব উটকো ঝামেলা! আমাকেই বা এত করে সঙ্গে নিতে চায় কেন মনো সিং? এতক্ষণে বুঝলাম আগের বারে রোহিণী গ্রামের চাঁপাতলার মোড় থেকে ওইটুকু বেগুনা- বাবলাগাছের ছায়ায় ঢাকা অন্ধকার পথ অতিক্রম করতে মনো সিংকে সেবারে তার চরিত্রের অনেকটাই খোয়াতে হয়েছে, আর, এবারে তো কুলটিকরি থেকেই অতটা পথ, তার চরিত্রের অবশিষ্ট আর কিছুই তাহলে থাকবে না সেই ভয়ে আমাকেও সঙ্গে নিতে চায় মনো সিং! অন্তত একজন তো সাক্ষী থাকবে! ভারি আশ্চর্য হয়ে মনোর দিকে চকিতে চোখ তুলে দেখছি আর পাহাড়সদৃশ মনো সিংয়ে র অন্ধকারময় ছায়াটুকু চুপিসাড়ে অতিক্রম করে কখন গাড়ি থেকে নেমে হেরিকেনের আলোয় এসে দাঁড়িয়েছে গিরিবালা আমরা কেউই টের পাইনি।

ঠিক তেমনি আছে গিরিবালা। যেন ‘ঢল ঢল অঙ্গের লাবণি’ টসকায়নি এতটুকু। বরং দেহের যেখানে যতটুকু খামতি ছিল – সব বুজিয়ে ফেলে এতদিন বাদে হাজির হয়েছে পরিপূর্ণা গিরিবালা। নাকি এতগুলো বছর বাদে আমার বয়সটাই বেড়ে দাঁড়িয়েছে নারীকে আরও ভালো ভাবে ভালো চোখে অবলোকন করার ? কে জানে – তার উপর গ্রামে-ঘরে হেরিকেনের আলোয় এমন একটা মাদকতার সৃষ্টি হয় যে, তা মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। গ্রামে-ঘরে তাই লোকে তাই অত ঘন ঘন ভূত দেখে – জীন হুরি পরী দেখে ফেলে।

 গায়ে একটা সাদা রঙের নকশাদার শাল , মুখেও এতদিনের শহরে প্রসাধন নিপুণতায় নিটোল সেই কোন ছেলেবেলা থেকেই তো কপাল- ভ্রূ-চোখ -মুখে আঁকিবুকি কেটে আসছে গিরিবালা! জীবনে কতরকম সাজই তো তাকে দিতে হল। আগবাড়িয়ে এসে বলল, তাই চ না খোকা। তুই গেনে মোর ভি ঘর যাবা হয়।

খোকা? তাবলে এখনও আমাকে খোকা বলবে গিরিবালা? এত , এতগুলো বছর বাদেও ? গিরির আর দোষ কী, কী করে বা জানবে গিরিবালা – আর কদিন বাদেই আমি রীতিমতো ইস্কুলমাস্টার, এতদ্ অঞ্চলের লোকজন বলাবলি করবে, ললিনমাস্টার , ললিনমাস্টার –

 মুহূর্তেই মনে পড়ল আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে কথা বলছি। চারিদিকে অন্ধকার, জানি অন্ধকার ভেদ করে কারোর শ্যেনচক্ষু এতদূরে এসে পৌঁছাবে না। তবু গ্রামে-ঘরের লোকেদের বিশ্বাস নেই – কোথায় কে আড়ি পেতে বসে আছে! একজন কালো ভুসভুসে প্রোটো অস্ট্রলয়েড মানুষ, একজন সদ্য সদ্য হয়ে ওঠা যুবক , পরনে পাজামা গায়ে স্যাণ্ডো গেঞ্জি, ব্যাগ খুলে চাদর কী সোয়েটার এখনও গায়ে দেওয়া হয়নি -দুজনে মিলে একজন অপরূপা সুন্দরী মহিলার সঙ্গে গ্রামের মাথায়, এই বাজার এলাকায় অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ফিস ফিস করে কথা বলছে – দেখলেই আগে দরদামের কথাই এসে পড়ে। ভেবে শিহরিত আমি বলে উঠলাম -বাইরে কেন, ভিতরে আসুন না! ঘর-অ যাবার একটা কিছো ব্যবস্থা হেই যাবে –

ঘরে ঢুকেই গিরিবালা জিজ্ঞাসা করল- এ কার ঘর-অ?

অখিলমাস্টারের।

কুন অখিল?

অখিল মাস্টারের বিবরণ দিলাম। অখিলমাস্টারের প্রসঙ্গ ছেড়ে দিয়ে শশব্যস্ত ভাব দেখিয়ে গিরিবালা বলল, ভাইটি রে, চ না মোর সাঙে? আমার সঙ্গে চল্ না ভাই!

বললাম, আর কদিন বাদেই অখিলমাস্টারের মতো আমিও একজন মাস্টার হব। আর, তার জন্যে কাল ভোরেই আমাকে যেতে হবে মেদিনীপুর।

সব শুনে গিরিবালা বলল -হঁ, তাইনে ত যাইতেই হয়। বলেই সে মনো সিংকে ধরে বসল –

মুই বাঘ না ভালুক? মোকে গাড়ি করিনি যাইতে তোর অত ডর কেনে মনু?

মনো সিং সত্যি সত্যি ভয় পাওয়া আর্তকন্ঠে বলে উঠল -উরি আব্বাস!

উরি ব্বাপ কাঁহি কি?

গিরিবালা অবলীলায় মনো সিংয়ের থুতনি ধরে নেড়ে দিল। আমি আড়ালে মুখ লুকিয়ে হাসলাম। অখিলমাস্টারের গুমোট ঘর এখন বাজারিয়া বাসতেল, বাসসাবান ও সেন্টের গন্ধে মহকাচ্ছে। সেই পলিথিনের ঝুড়িব্যাগ আর নেই তার জায়গায় কারুকাজ করা চামড়ার থলি ব্যাগ। হাতে আবার স্টিলের সরু ব্যাণ্ডঅলা হাত ঘড়ি! কী জানি কেন আমার কেবলই সন্দেহ ঘড়িটা ঠিকঠাক চলছে না! হয়তো টাইম কত জিজ্ঞাসা করলেই গিরিবালা মুখে চুক চুক শব্দ করে বলে উঠবে, মোর মুঁয়ে আগ্গুন! দম দিতে ভুলনু!

মনো সিংকে বললাম, তাই যা না মনো, এখনও গাড়ি ছাড়লে পৌঁছাতে রাত খুব বেশি হবে না।

মনোর সেই এক কথা -তুমি সঙে যাও যদি ত গাড়ি হুঁকরে লিয়ে যাব ললিনভায়া, হঁ।

হুঁকরে, তারমানে হুঙ্কার দিয়ে। বুঝলাম, যেন তেন প্রকারেণ তার হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনতে চায় মনো সিং। কোনও অনুরোধ উপরোধেও আর এখন কাজ হবে না হাল ছেড়ে দিয়েছিল গিরিবালাও। সে এখন অখিলমাস্টারের গোটানো বিছানার উপর হেলান দিয়ে শুয়ে আছে। মানঅভিমানে বিদুর ঠোঁট দুটো যেন নড়ছে, যেন এক্ষুনি সে গেয়ে উঠবে – “আমার কানাই ভালো, আমার কানা-ই ভালো গো।”

 কতদিন হয়ে গেল শ্রীরাধার মানভঞ্জন ঢপযাত্রায় গিরিবালার সেই রাধিকা সাজা – তবু ভাব-ভঙ্গিমা এখনও অবিকল তেমনি আছে। হয়তো আগের মতোই এক্ষুনি পায়ের কাপড় সরিয়ে গিরিবালা বলে উঠবে, পা টিপে দে তো সুরো! কিন্তু কোথায় বা সেই বিন্দে সাজা সুরোবালা, ললিতা বিশাখা চন্দ্রা অপরাপর সুধা-কন্ঠী সখিগণ? এখন কার পা কে টিপে দেয়। পারলে গিরিবালাই চেপে ধরবে না অনার্য মনো সিংয়ের পা? চ না রে সিংয়ের পো! বিছানার উপর খাড়া হয়ে বসল গিরিবালা। বলল, খরো খরোনি যাইতে পারু যদি, মুই তোকে একটা কিছো দিমু। কী?

আঘে ত নি চল। আঘে কাম, তা বাদে পুরস্কার, কী কও ললিন? মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বললাম, হ্যাঁ, ঠিকই তো। মেঝেতে বসেছিল মনো সিং। তড়াক করে উঠে দাঁড়াল। বলল, কী দিবে সে জানি। উসমে হামার দরকার নাই বাবা। বলেই দরজা খুলে গাড়িটা ঠিকঠাক আছে কিনা দেখতে ঝটিতি বেরিয়ে গেল মনো সিং। আমি ঘাড় নীচু করে ভাবতে লাগলাম ‘ইস! মনোটা কীরকম অশিক্ষিত, বর্বর! ‘একটা কিছো’ বলতেই অমনি সে বুঝে গেল – সেই – সেই জিনিসটা? কেন, তাছাড়া আর কী কিছু হতে পারে না? বেবুশ্যে মেয়েমানুষ বলেই কী তার মুখের উপর অমনিধারা অশ্লীল অমার্জিত কথা বলতে পারল মনো সিং? কোনও ভুল নেই মনোটা একটা মাকড়া। এরপর রাতের অন্ধকারে গাড়িতে গিরিবালাকে নিয়ে যেতে মনো রাজি হলেও তার উপর ভরসা করে একা মেয়েমানুষকে ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে কি?

 ভাবতে ভাবতে মাথা নীচু করেই বললাম, এত রাতে আপনার অতদূর যাওয়া বোধকরি ঠিক হবে না। রাস্তাঘাটও আগের মতো নিরাপদ নয়। তাইনে কঁঠে থাকমু?

একটু ভেবেচিন্তেই বললাম, কেন? এখানেই থাকুন না? যাতে অন্য কিছু ভেবে না বসে গিরিবালা তাই একটুও না থেমে একটানা বলতে লাগলাম আজকের রাতটা এখানেই থাকুন, কাল ভোর ভোর, মনোকেও আটকে দিচ্ছি, গাড়ি তুলে রাখুক মনো আজকের মতো, কাল ভোর ভোর ঝিঁজকা থাকতে থাকতেই, তারমানে রাত না পোহাতেই গাড়ি জুতে আপনাকে নিয়ে রওনা হয়ে যাবে সে – কেউই টের পাবে না। মনো সিং এসে পড়েছিল। তাকে বললাম, কী মনো, রাজি তো?

মনো বলল হঁ, বুঝেছি। বলেই দাঁত বের করে সে হাসল। উল্টো পাল্টা কী বুঝছে মনো সেই জানে। একটু বাদেই বলল, কিন্তুক হামার গিরিহা – গিরিহা অর্থাৎ মালিক। রাইতের ভিতর ফিরতে না পারলে সে ত পইনা দিয়েঁ হামার পিঠ ভেঙে দিবেক ললিন। রাতের মধ্যে ফিরতে না পারলে মালিক গরু খেদানোর লাঠি মেরে পিঠ তার ভেঙে দেবে। সে তো সত্যি কথা, আশঙ্কার কথাই বটে। মালিকই বা এতসব আদর-আব্দার শুনবে কেন? তবে, পাতর মহাজন লোক ভালো। একেবারে সদাশয় ব্যক্তি। তার কাছে একটা কিছু যুক্তিযুক্ত অজুহাত খাড়া করতে পারলেই হল। তার উপর আমিও ফিরে গিয়ে সাক্ষী হিসেবে, বললাম – আচ্ছা বললে হয় না, রাস্তায় ভেঙে গিয়েছিল গাড়ির ‘ধুরি’? ধুরি অর্থাৎ একটি লম্বা কাঠ যার দু মাথায় গাড়ির চাকাদুটো পরানো থাকে।

মনো বলল, সে হয়তো হতে পারে। কিন্তুক ধুরি দেখলে সাঁচাই না পেঁদ, সে যে ধরা যাবেক গো ললিনভায়া? বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে ধুরিটা যাহোক করে ভেঙে দিলেই তো হয় মনো? হয় না? ধুরি ভাঙার কথায় মনো এবার সত্যি সত্যিই বেজার-বিরক্ত হয়ে বলে উঠল -হঁ, কোথাও কিছু নাই একটা হয়তো বলতে গিয়েছিল একটা বারো-ভাতারি বেবুশ্যে মেয়েমানুষের জন্যে, সামলে নিয়ে বলল হঁ, হামার আসনাকাঠের অত সুন্দর ধুরিটা! শুধুমুদু গাড়োয়ান গাড়ির দরদ বোঝে! নিজের হাতে ইচ্ছে করে তার একটা কিছু মুচড়ে ভেঙে দিক সেরকম কুযুক্তি সে শুনবে কেন?

বললাম – বেশ, সে না হয় হল না, কিন্তু গরুর অসুখবিসুখ তো আচমকা হতেই পারে মনো, পারে না?

হঁ। মনো সিংয়ের মুখে এখন সরল সাদাসিধে হাসি। হ, ছেরানি। গরুর পেট ছাড়লে কাহার বা কী করার আছে? এক কবরেজ ছাড়া? বেড়ে যুক্তি, সরেস যুক্তি গো ললিনভায়া। হঁ, তা’লে তাই হোক।

আমাদের কথার মাঝখানে অখিলমাস্টারের বিছানার উপর নমথম হয়ে শুয়ে পড়েছিল গিরিবালা। চুড়ি-ঘড়ি পরা একটা নিটোল সুডৌল সুগৌর হাত ভাঁজ করে কপালে, ঠিক চোখের উপরে রাখা। চোখদুটো বোজা। মুদ্রিত নয়ন -যেন মান করে আছে শ্রীরাধা –

 “না না, কালো বরণ আমি আর হেরবো না” –

আমার গায়ের রঙ যদিও কালো নয়, তবে তামাটে। কিন্তু মনোটা এত কালো যে, ভুসভুসে – গায়ে হাত দিলে বুঝি হাতের চেটোয় কালো রঙ উঠে আসবে! তার কথা বলার ঢঙটিও কর্কশ, কৃষ্ণকায়। থাকার কথা একরকম ঠিক হয়ে যেতেই সে বলে উঠল, কিন্তুক খাবাদাবা?

এই তো মাত্র কিছুক্ষণ আগে মনো সাত কী আট টাকার বিনিময়ে অন্নপূর্ণা, মহামায়া কী যোগমায়া হিন্দুহোটেলে হয়তো পেটপুরে খেয়ে এসেছে মাংসভাত। এরমধ্যেই সে আবার খেতে চায়? চুপিচুপি জিজ্ঞাসা করলাম, খাসনি মনো? মনোও ফিস ফিস করে উত্তর দিল, সে তো আড়বেলায় গো, কোন যুগে! হঁ, তা বলে রাতভর উপাস্য? তাছাড়া তরহা খাবে নাই? আর উ – তাই তো! গিরিবালার খাওয়ার কথা তো ভাবতে হয়। আগের বারে পলিথিনের ঝুড়ি ব্যাগে কেক-পাঁউরুটি, মিষ্টির প্যাকেট ছিল বটে। কিন্তু এবারে কারুকাজ করা চামড়ার থলি ব্যাগে কী আছে মণ্ডা-মিঠাই বাইরে থেকে বুঝবার উপায় নেই।

অখিলমাস্টারের ভাড়াঘরেও রান্নাবান্নার তৈজস নেই সে হয়তো দু বেলা মান্থলি হিসাবে বাজারের কোনও একটা হোটেলে খায়। অতএব, আমাদেরও হোটেলেই রাতের খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু গিরিবালাকে সঙ্গে নিয়ে হোটেলে অত লোকের মাঝখানে খেতে বসার হ্যাঙ্গামা অনেক। তারচেয়ে থাকুক গিরিবালা একলা এই ঘরে আমি আর মনো হোটেলে গিয়ে খেয়ে আসি। গিরির জন্যও ঠোঙায় মুড়ে নিয়ে আসি কিছু খাবারদাবার। কিন্তু আমিষ না নিরামিষ?

আমাদের ফিস ফিস করে কথা বলায় কিছু হয়তো আঁচ করেছিল গিরিবালা, উঠে বসে আড় ভেঙে বলল মুই কিছো খামুনি, ললিন। বললাম, তা কী করে হয়? এত বড় রাত! একটা কিছু মুখে না দিয়ে গিরিবালা চামড়ার ব্যাগ দেখিয়ে বলল, মোর পাখে কলা-আপেল রহিছে, আর কিছো লাগবেনি, ললিন। তুমারমেনে যাও, হোটেলে খাই আসো! গ্রামে-ঘরে ফলাহারের তেমন বিশেষ গুরুত্ব নেই। ফলপাকুড় -সে তো জঙ্গলে গরু চরাতে গিয়ে গরুবাগালরা খায়। বললাম -বাঃ! আমরা হোটেলে আকন্ঠ মাছ, মাংসভাত খাব আর আপনি স্রেফ ফলাহার? গিরিবালা আত্মস্থ হয়ে বলল, তুমারমেনে দেখি থাকব মুই এককালে বালাকীর্তন, রাধাকিষ্টোর নামগান করি থাঁও। সোউ সময়রু মাছমাংস –

মাছমাংস ছেড়ে দিয়েছে গিরিবালা। একবার মনে হল জিজ্ঞাসা করে বলি, গান ছেড়ে দিলেন কেন? তারপর মনে হল কী হবে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিয়ে? কী থেকে কী হয়েছে সবই তো আমাদের জানা, শোনা বৃত্তান্ত। এ তল্লাটে কে না জানে! আমাদের গ্রামের মেয়ে ঘরের মেয়ে গিরিবালা রাতারাতি বেবুশ্যে বাজারিয়া মেয়েমানুষ হয়ে গেল! মনো সিং থেকে থেকে অকারণে হাসছিল। তার পায়ের পাতায় পা দিয়ে চাপ দিলাম। তারপর গিরিবালাকে বললাম, বেশ, আপনার জন্যে নিরামিষই নিয়ে আসব। আপনি দরজা বন্ধ করে ততক্ষণ থাকুন। অচেনা কারোর ডাকে দরজা খুলবেন না। বলেই মনোকে নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। শীতের রাত, একটু একটু করে উত্তুরে হাওয়া দিচ্ছিল। মনো সিং গাড়ির জোয়াল থেকে গরুগুলোকে খুলে এনে বারান্দায় খুঁটিতে বেঁধে দিল। গরুগুলোর মুখের সামনে গাড়ি থেকে খড় টেনে এনে বিছিয়ে দিল। কান লটপট করে জীবগুলো খড় খেতে লাগল মসমসিয়ে আরামসে। বাইরে বাজারের দিকে রুগড়িভরা রাস্তায় হাঁটতে শুরু করে হাত চেপে ধরলাম মনোরে, এমন কেন করলি মনো? মনো কোনও কথা বলল না, বড়জোর হাসল। তার সেই সরল সাদাসিধে হাসি। এত থাকতে তোর গাড়িতেই উঠে বসল? নাকি তুই তোর গাড়িতেই গিরিবালাকে সেধে তুললি? এবারে মুখ খুলল মনো। রীতিমতো ঝাঁজের সুরেই বলল, হঁ, উ মাগীকে হামি হাত ধরে আদর করে টেনে তুললম আয়, আয় সজনী চাঁদবদনী! অত্ত ন্নাই, হাটচালায় আর কুনো গাড়ি ছিল কি? সব ত আগেভাগেই বেলাবেলি -তুমার ত জানা ললিনভায়া, হামার খাওয়াটা একটু বেশিই। হোটেলে খেতে খেতেই লেট হয়ে গেল। ফিরে এসে দেখলম, উ মাগী ত। মনোর কথা বলার ঢঙে হেসে ফেললাম, বেশ বেশ, আর কেউ না দেখে থাকলে একরকম ভালোই হল মনো। সবদিক থেকেই আমরা নিরাপদ।

তুমি আবার উকে ঘরে ডেকে বিছানায় তুললে? বললাম, তুই-ই তো নিয়ে এলি মনো, এখন আমার দোষ? মনো বলল, আনলম আনলম, তুমি ঘাড় ধরে তাড়াঁই দিলে নাই কেনে? তাও কী হয় মনো? হাজার হোক, কুলটিকরি বিদেশ-বিভুঁই আর গিরিবালা আমাদের একরকম গাঁয়ের মেয়ে, তাকে তাড়িয়ে দেব কোন যুক্তিতে? তোর-আমার মনুষ্যত্ববোধ নেই নাকি? আমরা মানুষ তো? ভালো ভালো কথার বশ মনো সিং। তার পরীক্ষা আগেও হয়েছে অনেকবার। সে আর কোনও কথা না বলে চুপচাপ হাঁটতে লাগল। আমরা হাটতলার এদিক দিয়ে ঘুরে মহামায়া হিন্দু হোটেলে যাব। মহামায়াই এখন সেরার সেরা। হাটতলা অন্ধকার, দুয়েকটা চালাঘরগুলোয় ডিবরি জ্বলছে, দূরের দূরের ব্যাপারীরা আজ ওই চালাঘরগুলোয় রাত কাটাবে। কাল ভোর ভোর বাস ধরে যে যার বাড়ি ফিরবে। আলু-পেঁয়াজের দোকানগুলোয় স্থানীয় লোকেরা এখনও সওদা করছে। ল্যাঙ ল্যাঙ করে দু-চাট্টা কুকুর এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে, কখনও কখনও তাদের ভিতরই চেঁচামেচির ধূম পড়ে গেলে হৃদয়বিদারক শব্দের উৎপাতে বেজার বিরক্ত ব্যবসায়ী লগুড় হাতে চালা থেকে নেমে ছোটাছুটি ফেলে দিচ্ছে। এমনি এক কুকুরবিতাড়ক ব্যাপারীর মুখোমুখি হতেই সে বলে উঠল, কে যায় হে? নিবাস কঁঠে? কোনও মতে গ্রামের নাম বলে মনোর হাথ ধরে দ্রুত এগিয়ে এলাম। কোন কথার সূত্র ধরে কখন কী প্রকাশ হয়ে পড়ে ওই ভয়! অন্যান্য দিনের মতো আজও সূর্যাস্তের পরে পৃথিবীর বুক অন্ধকারে ঢেকে গিয়ে মেঘপাতালের গায়ে ফুটি ফুটি করে অজস্র তারা ফুটে উঠে মুহূর্তের পর মুহূর্ত জমা হয়ে দানা বেঁধে ক্রমে রাত গতানুগতিক ঘন হয়ে উঠলেও এ রাত অন্য রাত, এমন রাত সচরাচর আসে না, বহু বহু বছর বাদে ঘুরে ফিরে একেকবার আসে। বাইরে লম্বমান হিম পড়ে শরীরের ত্বক শীতার্ত করে তুললেও ভিতরে ভিতরে দাফন ছুঁচ দিয়ে পিন ফুটিয়ে কে যেন ত্বকের নীচে সহস্র শিরা উপশিরাকে মুহুর্মুহু জীবিত-উজ্জীবিত করে চলেছে।

মহামায়া হিন্দু হোটেলে মনো সিং আবার পেটপুরে মাংসভাত খেল। আমি কোনও মতে এটা-ওটা মেখে ক-গ্রাস ভাত মুখে তুললাম। মাঝেমাঝে ডানহাতের পাঁচটা আঙুলই পর্যায় ক্রমে চুষতে চুষতে মনো সিং বলতে লাগল, খালি তো মুরগির মতো এঁচরাচ্ছ ললিনভায়া, খাচ্ছ কাই? হামার মতো

হাঁপরে খাও! তবে নো শরীল ফুলবেক! বললাম, শরীর ফুলিয়ে আজ আর কাজ নেই মনো। জলদি খা ওদিকে যে হঁ, গরুগুলাও বাইরে বাঁধা আছে। বলেই তাড়াহুড়ো করে খেতে লাগল মনো। গিরির চেয়ে গরুর প্রতি তার এখন প্রবল টান। আমার গরু নেই, তবে আজ রাতের মতো গিরি আছে, ইস! কতদিন বাদে আবার সেই গিরিবালা! গিরিবালা, গিরিবালা! একদিন এমনও তো হয়েছিল একরাত্রে হ্যাজাক লাইটের আলোয় ঝলকিত গিরি তো গিরি, গিরিবালার শাড়িটাই অন্তর ব্রহ্মাণ্ড থর্ থর্ করে নাড়িয়ে দিয়েছিল আমার। মনে হয়েছিল একছুটে গিয়ে ছুঁয়ে দেখি একটু। সেই গিরিবালা ঘটনার ফেরে অদ্য রজনীতে আমার কাছেই উপস্থিত নাটক নভেলের চেয়েও অবাস্তব বাস্তবিকতায়! এই গিরিকে এখন আমি কী করব? খালিপাতায়, অর্থাৎ শালপাতার ঠোঙায় ডালভাত আর সব্জি নিয়ে গামছায় বেঁধে অখিলমাস্টারের ভাড়াঘরে নির্বিঘ্নে ফিরে এলাম। গাড়িটা তেমনি আছে। গরুগুলো তেমনি ঘাড় নীচু করে খড় চিবোচ্ছে। আকাশে জ্বল জ্বল করছে অজস্র গ্রহ-নক্ষত্র-মানুষের চোখে নাম পাল্টে পাল্টে কোন গ্রহ কখন যে সন্ধ্যাতারা, কখন যে পোহাতারা, দধিভারিয়া, কালপুরুষা, সপ্তর্ষিমণ্ডল, কখন বা রাবণরাজার সিংদরজার তারা হয়ে যায় এখন তারাভরা সেই আকাশের দিকে মুহূর্তমাত্র চেয়ে থেকেই বিভ্রমে মাথা ঘুরে গেল আমার! ঘরের দিকে একলা আমাকে ঠেলে দিয়ে মনো সিং বলল, হামার বেদম নিঁদ পাচ্ছে ললিনভায়া! হামি গাড়িতেই শুয়ে পড়ছিন -তুমি যাও, মহারানী ভিক্টোরিয়া ফের ওদিকে কী করছে, দ্যাখো। মনো গরুর গাড়িতেই শুয়ে পড়বে শুনে তারাভরা আকাশ দেখার নেশা আমার মুহূর্তে কেটে গেল! গাড়িতেই শুয়ে পড়বে কী মনো -তারপর আমরা ঘুমিয়ে পড়লে গাড়ি নিয়ে চুপিসারে যদি সে কেটে পড়ে? মনে হতেই ফিরে গেলাম গাড়ির কাছে। গাড়ির ধুরির দুদিকের চাকা আটকানোর দু-দুটো খিল খুলে নিয়ে মনোকে বললাম, মাঝরাত্তিরে ওকে ফেলে রেখে যাতে না পালাতে পারিস তার জন্যে এই খিলদুটো খুলে রাখলাম, মনে রাখিস। মনো সিং কিছুক্ষণ নিরেট থেকে হাসল তার সেই সরল সাদাসিধে হাসি।

কিছু কিছু এমন ঘটনাও সংসারে ঘটে যার আসন্ন জটিল পরিস্থিতি এক মুহূর্ত আগেও বিন্দুবিসর্গ মনে আসে না। না – দরজা খুলে রেখে কোথাও উধাও হয়ে যায়নি গিরিবালা। কোথায় আর পালাবে সে হতভাগা? বরঞ্চ আমাদের অনুপস্থিতিতে অখিলমাস্টারের তক্তপোশের উপর নির্ভাবনায় সে একপ্রস্থ ঘুমিয়েও নিয়েছে। ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলে দিয়ে হাত মুখ ধুতে ভিতর-উঠোনে বেরিয়ে গেল গিরিবালা। আমিও গোটানো বিছানাটা ভালো করে পাততে বসলাম। পাততে গিয়ে মনে হল – এখানে তো শোবে গিরিবালা। তাহলে রাতটুকু আমি কাটাব কোথায়? এরকম পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে এতো জানা কথা। কিন্তু একটু আগে ও এ আশঙ্কার কথা আমার মনে আসেনি কেন? কেন? গিরিবালাকে আজ রাতের মতো আটকে দেওয়ার পরিকল্পনার সময়ই তো ভাবা উচিত ছিল, এই আমি, আমার রাত কাটানোর অলটারনেট ব্যবস্থা কী? গ্রামে-ঘরে হঠাৎ হঠাৎই দু-পাঁচজন আগন্তুক এসে পড়ল, তার জন্যে গৃহস্থের অত ভাবাভাবি কী -আদতে ভাবে নাকি সে? ঢেঁকিশাল, গোয়ালঘর, খামারবাড়ি, স্বজন বিজনের ঘরদুয়ার -সবই তো খোলা থাকে তার জন্যে! সেই হতে পারে, অসময়ে একজন উপরি এসে পড়ল, সে থাকবে কোথায় তার চিন্তা তাই মনেই আসেনি। এখন মনে আসায় ভারি মুস্কিলে পড়া গেল! হাত-মুখ ধুয়ে এসে শাড়ির আঁচলায় মুখ মুছতে মুছতে গিরিবালাই বলল, মোকে শতরঞ্জিটা দও ললিন, তুমি খাটে শুয়ো। গিরিবালা মাটিতে শোবে কি! অমন ‘ঢল ঢল অঙ্গের লাবণি’ ধূলায় ভুলুণ্ঠিত তাও কী হয় কখনও? নাকি হতে পারে? বললাম, না না, তা হয় না। আপনার অসুবিধা হবে। খাটেই শোন আপনি! গিরিবালা খাওয়া ছেড়ে হাঁই হাঁই করে উঠে এসে বাঁ হাত দিয়ে আমার ডান হাতের কব্জি ধরল। গিরিবালা আমার হাত ধরল? সুন্দর নিটোল সুগৌর একটা হাত, ছোট ছোট ঈষৎ মোটা তুলোর মতো আঙুল দিয়ে আমার মণিবন্ধ চেপে ধরেছে? নাড়ির স্পন্দনবেগ এত বেড়ে গেল যে শিরা বুঝি ফেটে গিরিবালার হাতের চেটোতেই আছড়ে পড়বে। বললাম, বেশ, এখন তো পাততে দিন! কথামতো শতরঞ্জিটা টেনে খুললাম। গিরিবালা আবার খেতে বসল। খেতে খেতেই জিজ্ঞাসা করল, মনু কঁঠে শুলা? মনু কোথায় শুলো? বললাম, ও মাকড়াটা গাড়ি ছেড়ে আসবে মনে করেছেন? গাড়িতেই শুয়ে পড়ে এতক্ষণে নাক ডাকাচ্ছে দেখুন! গিরিবালা হাসল। হাসছেন আপনি? জানেন, ইচ্ছে করলে ও আপনাকে তখনই নিয়ে যেতে পারত। সেই বলে না, মাকড়াদের গোঁ – গোঁ ধরে বসল -রাতের বেলা একলা একটা স্ত্রীলোককে সঙ্গে নিয়ে অতদূরের পথ, পাছে তার চরিত্রে – চরিত্রের কথা তুলেই মনে হল ওসব না তুললেই হত। কেমন ঘাড় নীচু করে বিমর্ষ হয়ে গিরিবালা শালপাতার থালি থেকে একটা-দুটো ভাত তুলে দাঁতে খুঁটছে, খাচ্ছে না মনে মনে নিজেরই দু গালে দু-দুটো থাপ্পড় মেরে দরজা খুলে বাইরে এলাম। মনোকে মাকড়া বলে গিরিবালার সামনে ভর্ৎসনা করেছি, আমি নিজেও মাকড়া বৈ আর কি! বাইরে বেরিয়ে দেখলাম, মনো সিংয়ের গরুগুলো তেমনি খসরমসর খড় খাচ্ছে, কান তাদের নড়ছে লটপট করে। বারান্দায় যেখানে অখিলমাস্টারের টিউটোরিয়াল হল, সেখানে একটা হাতলভাঙা চেয়ার। সেই চেয়ারেবসে কিছুক্ষণ বাইরের দিকে চেয়ে থাকলাম। অন্ধকার রাতের ধরিত্রী। মনো সিংয়ের গাড়িখানা অন্ধকারে মিশে আছে। প্রথমে ঠিক ঠাহর হল না। চোখ সয়ে গেলে পরিষ্কার পরিস্ফুট হয় ধাঁচাবাঁধা গাড়ির ভিতরে ঘনীভূত কালো মিশমিশে অন্ধকার, তারও ভিতরে একটা কালো ভুসভুসে মানুষ। ঘুমে এখন কাদা। আকাশে অন্যমনস্ক চোখ তুলে দেখলাম সবকিছুই কেমন গুলিয়ে যায়। কে যে সন্ধ্যাতারা, দধিভারিয়া, কালপুরুষা, সপ্তর্ষিমণ্ডল -আলাদা করে চেনা দুষ্কর। আকাশ থেকে হিমের গুঁড়ো না ঝরলেও বাতাসে এখন শীত শীত ভাব। খাওয়া শেষ হলে দরজা সামান্য ফাঁক করে গিরিবালা ডাকল বাহারে কেনে? ভিতরি আইসো না? মন্ত্রমুগ্ধের মতো ভিতরে প্রবেশ করলাম। ততক্ষণে মাটিতে শতরঞ্জি পেতে গিরিবালা শোওয়ার জোগাড় করছে। বললাম – আপনাকে ওখানে শুতে হবে না। এই ঠাণ্ডায় মাটিতে শোওয়া -সকাল হলে আর দেখতে হবে না , সারা গা হাতে-পায়ে ব্যথা তাইনে? গিরিবালা সোজা চোখ ফেলল আমার চোখের উপর। মুচকি হাসি যেন লটকে আছে ঠোঁটজোড়ায়! মুখ ধুয়ে ক্রিম মেখেছে গিরিবালা। একটা বাজারিয়া গন্ধ ঘরময় ঘুরে বেড়াচ্ছে। মুহূর্তে চোখ সরিয়ে মাথা নীচু করলাম। ধীরে ধীরে বললাম, আপনি বিছানাতেই শুয়ে পড়ুন!

মাটিতে পাতা শতরঞ্জি-শয়ান থেকে বাধ্য মেয়ের মতো ধীরে ধীরে উঠে গেল গিরিবালা। পায়ের ধুলো ঝেড়ে বিছানায় গুটিশুটি পা তুলে কুঁকড়ে শুয়ে পড়ল। আমার রাগ হল, ভয়ানক রাগ। কম স্বার্থপর তো নয় গিরিবালা? একবারও জিজ্ঞাসা করল না -তুমি কোথায় শোবে ললিন? আমিও রাগ দেখিয়ে শতরঞ্জিটা মাটি থেকে তুলে হেরিকেনের পলতেটাকে মিচকে দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসার তোড়জোড় করছি -গিরিবালার সঙ্গে একঘরে রাত কাটানো যায় নাকি? বললাম, দরজায় হুড়কোটা লাগিয়ে দিন, আমি বরঞ্চ বাইরে কোথাও শুয়ে পড়ছি। গিরিবালা প্রায় লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে পড়ল। বলল, এ কী কথা কহট ললিন? তুমি টকামানুষ বাহারে ঠাণ্ডায় কষ্ট করি শোবো আর মুই মুখপুড়ী ঘরের ভিতরি গদী বিছানায় আরাম করমু? ছি ছি! মোর সাঙে শুতে তুমার আপত্তি আছে ললিন?

 এ কী বলল গিরিবালা? এক বিছানায় তার সঙ্গে শোওয়া, টকামানুষ -টকামানুষ তারমানে ছেলেমানুষ। আমি কী এখনও সত্যি সত্যি ছেলেমানুষ আছি? আজ বাদ কাল আমি না পুরোদস্তুর মাস্টার হব? আধা নয়, ছেলেমানুষ নয়, পুরোপুরি মানুষ সেই তার সঙ্গে কী না গিরিবালা একত্রে শোবে? মনে মনে ভাবলাম – বেশ্যা, বেশ্যা। পুরোপুরি বেশ্যা না হলে এমন কথা কেউ কী মুখ ফুটে বলে? ঘৃণা, রীতিমতো ঘৃণাই জন্মালো গিরিবালার উপর। ভয়ও হল ওদিকে হয়তো মনো সিং গরুর গাড়িতে মটকা মেরে পড়ে আছে। একঘরে এক বিছানায় রাত কাটালে পরের দিনই গ্রামে ফিরে সে হুলিয়া জারি করবে – জোর খবর! জোর খবর!! আমাদের শিক্ষিত ললিন বেবুশ্যে গিরিবালার সঙ্গে নিজের উপর ন্যস্ত এতদিনকার কলঙ্কের ভার আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে মুখে কুলকুলি মেরে হেসে খেলে বেড়াবে না মনো সিং? একরকম জোর করেই হাতে শতরঞ্জি নিয়ে ঘরের বাইরে এলাম। দরজা ভেজিয়ে বেরোতেই একরাশ হিম অন্ধকার মুখের উপর আছড়ে পড়ে বলল – আসুন, আসুন ললিনবাবু!

 মনো সিংয়ের গরুদুটো কান লটপট করে বলে উঠল, এই-ই ভালো হল ললিনভায়া। গাড়িতে সত্যি সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছিল মনো সিং। তাকে ধাক্কা দিতেই সে ‘উঁ’ বলে হাত-পা আরোই ছড়িয়ে চিৎপাত হয়ে শুয়ে পড়ল। গাড়িতে তবুও জায়গা কিছুটা ফাঁকাই ছিল, কিন্তু ‘বাবুঘর’-এর ছেলে হয়ে একটা কালো-কর্কশ-কুশুণ্ডে মুনিশের সঙ্গে গায়ে গা ঠেকিয়ে একত্রে শোওয়া, ঘুমের ঘোরে সে কখনও পা তুলে দেবে গায়ের উপর, হয়তো মুখের চ্যাটচ্যাটে লালাই মাখিয়ে ছাড়বে বুকে পিঠে ততোধিক ঘৃণায় শতরঞ্জি হাতে গাড়ি ছেড়ে ফের উঠে এলাম বারান্দায়। কোনওমতে হাতলভাঙা চেয়ারে আরেকটা কাঠবেঞ্চি জুড়ে তার উপর শতরঞ্জি পেতে সোয়েটার গায়েই ঘুমোবার জোগাড় করছি , ঘরের ভেজানো দরজাটা খুলে গেল ক্যাঁচ করে, মিচকানো হেরিকেনটা হয়তো নিভেই গিয়েছিল, ভিতরে ঘোরতর অন্ধকার, বললাম – এখনও ঘুমোননি? উত্তর নেই, বড়জোর হাতের চুড়িগুলো রিনঠিন করে বেজে উঠল।

একমুহূর্ত চুপ থেকে পুনরায় জিজ্ঞাসা করলাম – কী ব্যাপার? হেরিকেনটা কি নিভি গেলা? জ্বালি দিমু?

না।

নিঁদাও। রাত ত ঢের হেলা!

হঁ, তুমারমেনে জাড়ে ঠক ঠক ঠক করি কাঁপবো, আর মুই ঘরে লেপমুড়ি দিই শুমু? অমন ঘুমে আগ্গুন!

আচ্ছা ঝামেলায় পড়া গেল তো! আচ্ছাই মেয়ে তো গিরিবালা! নিজেও শোবে, অপরকেও শুতে দেবে না! বললাম কোথায় শীত! শীত এখনও পড়েইনি। আমার কোনও অসুবিধাই হচ্ছে না, আপনি ভিতরে যান, কে কখন দেখে ফেলবে! বলেই মনে হল অতটা রূঢ় হওয়া ঠিক হল কী? অন্ধকে অন্ধ, খোঁড়াকে খোঁড়া বললে সে যেমন কষ্ট পায়, গিরিবালা যে বেশ্যা, তার সঙ্গে এই রাতে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে কথা বললে কলঙ্ক রটে যেতে পারে সে কথা মনে করিয়ে দেওয়ায় গিরিবালা বোধকরি দুঃখ পেল। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে দরজা ভেজিয়ে ভিতরে ঢুকল গিরিবালা। তার আর কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। মনে হল দরজাটা সে ভেজিয়ে রেখেছে মাত্র, হুড়কো দেয়নি। আরেকবার মনে হল শুধু ভেজিয়ে দেয়নি দরজাটা, খিলও তুলে দিয়েছে গিরিবালা। দরজাটা ভেজানো না হুড়কো দেওয়া – একবার ঠেলা দিয়ে দেখব কি? ঠেলতে হাত উঠিয়েও মনে হল এ আমি কী করছি! বেশ্যাবাড়ির দরজায় ঠেলা মারবে হবু ললিনমাস্টার?

তাহলে হুড়কো দরজায় হুড়কোই তুলে দিয়েছে গিরিবালা। মনে হতেই রাগ হল, ভয়ানক রাগ। ওই মুখে কেন – হাত ধরে হিঁচড়ে টেনে নিয়ে যেতে পারছে না এত যখন দরদ! রাগ করে দেওয়ালের দিকে পিঠ রেখে বারান্দার হাফ-দেওয়ালের ফাঁক দিয়ে দূরে মেঘপাতালের পানে চোখ মেলে মটকা মেরে পড়ে থাকলাম। জ্বল জ্বল করছে মেঘহীন মেঘপাতালে তারার দল। তারা গুনতে শুরু করলাম, এক, দুই, তিন, চার -ওই তো সপ্তর্ষিমণ্ডল, সাতভায়া ওই, ওই তো দধিভারিয়া, কাঁধে দধির ভার নিয়ে হেঁটে চলেছে। রাত গভীর হলে তবেই তো দধিভারিয়া উঠে আসে? অতএব রাত বাড়ছে, রাত বাড়ছে, রাত বাড়তে লাগল। ফের মেঘপাতালে তারাগুলো গুলিয়ে গেল কে যে কখন সন্ধ্যাতারা, পোহাতারা, কে যে দধিভারিয়া, সাতভায়া, সপ্তর্ষিমণ্ডল সব একে একে গুলিয়ে যায়! একবার মনে হল ওই, ওই তারাটা দিয়েই তো শুরু করেছিলাম সাতভায়া সাতটি তারা এক, দুই, তিন -আসতে না আসতেই কোথায় যেন হারিয়ে গেল প্রথমটা, সাতভায়া আর হয়ে উঠল না, হয়ে ওঠে না। ধুস! ভাঙাচেয়ার, কাঠবেঞ্চির পালঙ্ক ছেড়ে উঠে পড়লাম। মনোর গরুগুলো আবার খড় খাওয়া সেরে বসে বসে জাবর কাটছে। আমাকে উঠতে দেখেই তারা বোধকরি গলা দিয়ে একরকম আওয়াজ দিল। হয়তো বলল উঠলে ললিনবাবু? বললাম -হুঁ, যাই দেখে আসি অলম্ভুস মনোটা এখন কী করছে। না ঘুমিয়ে সেও কী আমার মতো গরুর গাড়ির ধাঁচার ভিতর দিয়ে মেঘপাতালের তারা গুনছে – “একথালা সুপারি গুনতে নারি” ফের গাড়ির অতদূরও যেতে হল না, তার আগেই পা দুটো গেঁথে গেল মাটিতে -নাক ডাকার আওয়াজও যে অমন বীভৎস লম্পট হতে পারে একরাত্রি মনোর কাছাকাছি না ঘুমোলে জানতাম না। ইস, মনোবেটা আমাকে সম্পূর্ণ ফাঁসিয়ে দিয়ে নিজের চরিত্রের সবটুকু এখনও অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরে পরম নির্ভাবনায় নিশ্চিন্তে পড়ে পড়ে কীরকম ঘুমোচ্ছে দ্যাখো!

 ফের কাঁটার শয্যায় ফিরে এলাম। পায়ের দিকে কাঠবেঞ্চির তলায় একটা টুরিব্যাঙ মাঝে মাঝেই ডেকে উঠছে -“ট্রু ট্রু !” ঘুমোতে চাইলেও ঘুমোতে দিচ্ছে নাকি? মাটিতে নয় বেঞ্চিতেই পা ঠুকে তাড়া করলাম। এক-দু মিনিট থামল বটে, তারপর আবার “ট্রু ট্রু” -ধর! এবার যদি ডাকতে আসে গিরিবালা তো লাজ-লজ্জা-ভয় সবকিছুই বিসর্জন দিয়ে ঘরের ভিতর, একদম বিছানার উপর উঠে যাব সুট সুন ভেজানো দরজা সামান্য ফাঁক করে গিরিবালা বলল, ঘুমাওনি সে জানি ললিন -উদমা ডাঙায় শুইনে ঠাণ্ডায় কী ঘুম আইসে? মটকা মেরে পড়ে আছি, গায়ে হাত রাখল গিরিবালা। বলল টকামানুষ, মোর চায় তুমার কেতে কম বয়স! মোর সাঙে শুই পড়তে নজ্জা কী? আইসো!

অপ্রশস্ত বেঞ্চির উপর সাবধানে অতি সাবধানে পাশ ফিরে শুলাম। মনে মনে বলছি -যাব? যাই তবে? আচমকা মনে হল -বেবুশ্যে, বারো জনের সঙ্গে শোওয়ার অভ্যাস, একলা ঘরে ঘুম তার আসবে কেন? তাই বারে বারে উঠে এসে আমাকে ডাকা! এতটা আলগা চরিত্রের লোক ভেবেছে আমাকে গিরিবালা? টকামানুষ -হুঁ! ঘুমের ভান করে জড়িত স্বরে বললাম, উঁ, আমি বেশ ঘুমোচ্ছি। একলা শুতে পারছেন না তো ডাকুন না মনো সিংকে! মনে মনে বললাম, সেবার রোহিণীর চাঁপাতলার মোড় পেরিয়ে বেগুনা আর লাল ভেরেণ্ডার ঘনগহীন অন্ধকারে গাড়ির লিক বরাবর আসতে গিয়ে গাড়ির অন্ধকার ছইয়ের ভিতর মনোর সঙ্গে আমার গা থেকে কুসুমকোমল হাতটা ধীরে ধীরে উঠে গেল। একটু উষ্ণতা যেন ধীরে ধীরে অন্তর্হিত হল! কিছুক্ষণ অন্ধকারে পাষাণের মতো দাঁড়িয়ে থেকে দরজা ভেজিয়ে ঘরের ভিতর চলে গেল গিরিবালা। ইস্! কী বলতে কী বলে ফেললাম গিরিবালাকে। হয়তো গিরিবালার মনে কোনও কু ছিল না। হয়তো সরল মনেই গিরিবালা –

 রাগ হল, মনোমাকড়াটার উপর ভয়ঙ্কর রাগ, চরিত্র দেখানেওয়ালা চরিত্র দেখাবার আর জায়গা পেল না? মনে হল – দৌড়ে গিয়ে অলম্ভুসটাকে ঘুম থেকে টেনে হিঁচড়ে তুলি। বলি বেশ তো নিজের চরিত্র অটুট রেখে নাক ডাকিয়ে ভঁসভঁস করে ঘুমোচ্ছিস, আমি এদিকে আমার চরিত্র যে খোয়াতে বসেছি মনো তারবেলা? প্রতিজ্ঞা করলাম – আরেকবার ডাকতে আসে যদি গিরিবালা, তো সবকিছু জলাঞ্জলি দিয়ে গিরিবালার সঙ্গে এক বিছানায় রাত কাটাবই কাটাব।

 ফের ঘুমোতে চেষ্টা করলাম। হিম আসছিল বারান্দার হাফ-দেওয়ালের ফাঁক-ফোকর দিয়ে, সেদিকে চোখ রাখতেই আবার সেই সাতভায়া, কালপুরুষা দধিভারিয়া- গুঁড়ি গুঁড়ি হিমকুয়াশার চাদর শীতার্ত ধরিত্রীর বুক ঢেকে ক্রমশ ঊর্দ্ধে আরও ঊর্দ্ধে তারালোকে ধাবিত হচ্ছে। তারাদের আলো সে-ধোঁয়া ধোঁয়াশার ভিতর দিয়ে আসতে আসতেই মাঝপথে হারিয়ে যাচ্ছে। সে আলো আজ আর পৃথিবীতে এসে পৌঁছাল না! তবে কী শেষ হয়ে এল রাত? পোহাতারা উঠল বলে পূব আকাশে? কখন যে পশ্চিমের সাঁঝতারা হয়ে গেল পূবের পোহাতারা! জ্বলজ্বলে শুক্র ধ্রুবতারা হয়ে গেল কখন! কে যে কখন কী হয়ে যায়! কে যে কখন কার রূপ ধারণ করে কিছুতেই টের পাই না। সব কিরকম গুলিয়ে যায়, গুলিয়ে যেতে থাকে –

 বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুমের চটকা ভেঙে গেলে দেখি আমার গায়ের উপর ধীরে ধীরে তার গায়ের চাদরটা পেতে দিচ্ছে গিরিবালা।

 কে?

 কেত্তেবার বলনু -ঘরের ভিতর মোর সাঙে শুয়ো! মেদিনপুরে যাব – ঠাণ্ডা নাগি শরীল খারাপ হিনে কে দেখবে?

 ভোর ভোর। তখনও জনপ্রাণী জাগেনি। মনো সিং আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলল। বলল -দও ললিনভায়া!

 কী?

 গাড়ির খিলখাড়ি।

 গাড়ির খিলকাঠি দিতেই গাড়ি জুতে ফেলল মনো সিং। লাফ দিয়ে চড়ে বসল গাড়ির ডগায়। তার পা দুটো দুদিকে ঝুলে থাকল -মোটা ধ্যাবড়া পা- জোড়া! গাড়িতে আগেই উঠে বসেছিল গিরিবালা। ইস্! তার চাদরটাই যে এখনও দেওয়া হয়নি। মনে হতেই একদৌড়ে গিয়ে চাদরটা দিয়ে এলাম। গিরিবালা হাসল। এতক্ষণ বাজারিয়া গন্ধটা আমাকেই ঘিরে ধরেছিল এবার হারিয়ে যেতে লাগল তারাগুলানোর মতো, গুলিয়ে যেতে থাকল, গুলোচ্ছে, গুলোচ্ছে –

 গাড়ি ছেড়ে দিল মনো সিং।

 গাড়ির তলা দিয়ে তার ঝুলন্ত পাজোড়া দেখা যাচ্ছে। চাদরটা ঘোমটার মতো গায়ে মাথায় জড়িয়ে এদিকেই চেয়ে বসে আছে গিরিবালা। আমার মনে পড়ল বালকসঙ্গীতের সেই গানটা –

 “বলি কোথা বা ছিলে

 কার কুঞ্জে নিশি প্রভাত করলে,

 কোথা বা ছিলে!”

  নিজের চরিত্র যে ঠিক আছে তাই দেখাতে আহা, আমাকে সাক্ষী মানতেই বেবুশ্যে গিরিবালাকে আমার বাসায় তুলে এনেছিল মনো সিং। তার সে-চরিত্র অটুটই থেকে গেল। গিরিবালাও তার চরিত্র থেকে এতটুকু টসকায়নি। আমার কাছে ওরা দুজনেই বড়।

মনে মনে হাতদুটো কপালে ঠেকিয়ে দুজনকেই গড় করলাম।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *