গুপ্তধন
শুভমানস ঘোষ
সকলের জীবনের এক-একটা থিম সং থাকে। জীবন গড়ানোর সঙ্গে তা বদলে বদলে যায়। তবে সব কিছুর ব্যতিক্রম হয়।
সন্দীপন ব্যতিক্রমীদের দলে নয়। বিয়ের বছর কাটতেই সন্দীপনের থিম সং দাঁড়িয়েছিল, “ভাল লেগেও লাগছে না!” দু’বছর পরে ‘লেগেও’ কথাটা ছেঁটে ফেলে। মনে স্পষ্ট হয়ে বাজছে, “ভাল লাগছে না।”
এত তাড়াতাড়ি এমন হওয়ার কথা নয়। কিন্তু হচ্ছে। গড়পরতার পুরুষের মতো নয় বলেই ফেসবুকে উৎপন্ন হয়ে, ভায়া ম্যাসাঞ্জার মোবাইলের ওয়টস্যাপে ঘটা করে প্রেম ও তারপর ধাপে ধাপে ছোটখাটো ঝামেলা ফেস করে কাজরিকে বিয়ে করেছিল সে। বিয়ের পরে দেখছে, শ্বশুর বাড়ির লোক নয়, ঝামেলা বৌকে নিয়ে।
কাজরির মুখের আর শরীরের গড়ন-গঠন যথেষ্ট সুন্দর। অতিরিক্ত হিসাবে একটা ‘কী যেন আছে! কী যেন আছে!’ ভাব সজাগ হয়ে জেগে আছে সর্বাঙ্গে। এমন ভাব অবশ্য সব মেয়ের মধ্যেই কম-বেশি থাকে। কিন্তু কাজরির মধ্যে যেন বেশ চড়ে আছে।
বিয়ের আগের জীবনটা কেটেছে সন্দীপনের ঘাড় গুঁজে পড়াশোনা করে। চাকরি পেতে দেখল, ভবিতব্য কিছু বদলায়নি। অফিসের নিঃসঙ্গ কিউবিকলে বসে ঘাড় গুঁজে খাটতে হচ্ছে।
ভবিতব্যের লিখন পাল্টাতে, অফিস থেকে ফিরে রাতে ওই ঘাড় গুঁজেই ফেসবুকে বন্ধু সার্চ করতে করতে, কাজরিকে দেখে চমকে গেছিল। আবিষ্কার করার মতো সম্পদই বটে। ঝাঁপিয়ে পড়ে বিয়ে করে ঘরে তুলে হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছিল।
কিন্তু বাঁচা যদি এতই সুলভ হয়, তা হলে আর এত জটিল ডায়মেনশনের পৃথিবীতে জন্ম নেওয়া কেন? তবু আশায় বাঁচে চাষা। ভেবেছিল, কাজরিকে নিজের করে পেলেই একঘেয়ে জীবনে হাই ভোল্টেজ বিদ্যুৎ লাগবে। দিনের হাড়ভাঙা খাটুনি রাতে গায়ে-বসা মশা-মাছির মতো উড়ে যাবে। মণিমানিক্যে ভরা জাদুঘরের দরজা খুলে নতুন নতুন রত্ন আবিষ্কার করতে করতে আরামসে জীবনটা কাটিয়ে দেবে।
কিন্তু এখন বুঝেছে, কাজরির শরীরটাই শুধু নারীর, যা আছে বলে ভেবেছিল, তা সব সময় ধরা দিয়ে বসে আছে। ফুলশয্যার রাত থেকেই সে সাদাসাপটা একটা খোলা বই। কিছুই আবিষ্কারযোগ্য নেই।
রোমাঞ্চ-রহস্য, কমসে কম উচ্চাকাঙ্ক্ষা দূর, বিছানা আর টিভির সিরিয়াল– এই নিয়ে লাট্টুর মতো ঘুরপাক খাচ্ছে। সন্দীপনকে কাছে পেলে এমন করে, পুরুষ যেন চোখেই দেখেনি।
তার মানে গুপ্তধনের সন্ধানে বেরিয়ে ভুল গন্তব্যে চলে গেছে। নেহাতই প্লাস্টিকের গোলাপকে ঘরে এনে বসিয়েছে। সাজানো-গোছানো নকল সত্য। আসল যে সুরভি, সেটাই নেই। ভাল লাগে না! ভাল লাগে না!
কিন্তু ভাল লাগে না বলে ব্যতিক্রমী মানুষের মতো হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার ছেলে নয় সে। কিছু দিন হল, বিকল্প জায়গা খুঁজে নিয়েছে, বদনদার ড্যান্স বার।
ঘরে যে-গন্ধটা মিস করে, বদনদার নৃত্যমুখর মদিরালয়ে তার ছড়াছড়ি। তরঙ্গিত যৌবনের ঝরনা ব্যান্ডের চড়া মিউজিকে ধাক্কা দিয়ে ফোয়ারার মতো ছিটকে-ছড়িয়ে পড়ছে। সঙ্গী জুটলে ভাল। নইলে অফিস থেকে বেরিয়ে একাই চলে যায়।
আসা-যাওয়া করতে করতে একটা মেয়েকে মনে ধরে গেছে সন্দীপনের। রুমা। নজর-টানা হাইট। টাইট স্বাস্থ্য। মাছি পিছলে-যাওয়া গোল গোল হাত-পা। সন্দীপনকে এমন বিলোল কটাক্ষ ছোড়ে, তার মনে হয়, হাতে একটা চুম্বন রেখে ফুঁ দিয়ে তার দিকে ভাসিয়ে দেয়।
বাউন্সারের ভয়ে তিন পেগের আগে সাহস না পেলেও, ঝটকা খেয়ে বুকের থিম সং বদলে যায়, “বেশ ভাল লাগছে! নাইস! নাইস!” যত পেগ বাড়তে থাকে, সুরও চড়তে থাকে। টলতে টলতে চলে যায় মেঘাদির কাছে।
মেঘাদি নাচের পরিচালিকা। স্টেজের নীচে ক্যাশ বাক্স নিয়ে বসে শুধু ক্যাশ নয়, সব দিক নজরে রাখে। নৃত্যমুগ্ধ খদ্দেররা কোনও মেয়ের নাচে মুগ্ধ হয়ে পুরস্কার দেওয়ার সময় খুচরো না থাকলে, বাক্স খুলে ভাঙিয়ে দেয়।
বয়েস হয়েছে মেঘাদির। দেখতে অ্যাভারেজ বাঙালি মেয়ে। ঠমক-চমক নেই। আবিষ্কারযোগ্য গুপ্তধনও নেই। তবে মনটা ভাল। সন্দীপন মনের কথা ও হৃদয়ের কথা উজাড় করে দেয় তাকে।
মেঘাদি তাকে আশ্বস্ত করে, সে সন্দীপনের ইচ্ছের কথা অলরেডি রুমার কাছে পেড়েছে। তাতে খুব যে অখুশি হয়েছে রুমা, তা নয়। তবে সে চাইছে, আর ক’দিন যাক। আকুলতা আর একটু বাড়ুক তার। রুমা আর একটু পরীক্ষা করে নিতে চায় তাকে। ভাল ছেলে নিশ্চিত না হলে, তারাই বা রিস্ক নেবে কেন?
ঠিক তাই। বার ড্যান্সার হলেও এদেরও ঘর-সংসার আছে। বাচ্চা আছে। হুট বলতে যার-তার সঙ্গে বেরিয়ে পড়তে পারে না। তবে সে সিরিয়াসলিই ভাবছে। পরীক্ষায় পাস করলে দু’দিন সময় বের করে সন্দীপনকে একেবারে দিঘায় নিয়ে চলে যাবে।
দু’চার ঘা নয়, একেবারে দিঘা! মাথা খারাপ হতে শুধু বাকি ছিল সন্দীপনের। রক্ত গাঁজিয়ে উঠে মাথায় ধাক্কা দিয়েছিল।
তারপর থেকে একেবারে জোঁকের মতো পড়ে আছে এখানে। এক দিনও বাদ দেয় না। অফিসের পরে নিশি যেন আঙুল নেড়ে ডাকে তাকে, “আয়! আয়!”
বারে এসে মদিরাপাত্র নিয়ে অপলকে চেয়ে থাকে রুমার দিকে। তার বৌয়ের গুপ্তধন শরীরেই শেষ। তার বাইরেও যে ধন-সম্পদের গোপন কুঠুরি থাকে, এখানে না এলে জানতেই পারত না। এমন গভীর ইঙ্গিতময় মৃদু-আন্তরিক হাসিতে মাখা মায়াবি চোখ, শরীরের এক-একখানা জাদুকরি মোচড়! মন গার্ডেন গার্ডেন হয়ে যায়। নকল গোলাপের নয়, জ্যান্ত গুলবাগিচায় ঢুকে পড়েছে মনে হয়।
খুব ইচ্ছে করে এমন সুগন্ধী সৌন্দর্যের কস্তুরীমূল গায়ে-মুখে মেখে যাবতীয় ভাল না লাগাকে দীর্ঘ এক “আহ্!” ধ্বনিতে ফুৎকারে উড়িয়ে দেয়।
কিন্তু গোলাপ সুন্দর হলেও, একটাই সমস্যা, তাতে কাঁটা থাকে। বাঙালির জীবনে এই কাঁটার নাম বৌ। মাঝে মাঝেই রসভঙ্গ করে তার কল ঢুকে যায় মোবাইলে। সে কোথায়? কী করছে? কখন আসবে?
তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে সন্দীপন। রুমাকে অসহায় চাউনি ছুড়ে, টলতে টলতে গেট ঠেলে বারের বাইরে গিয়ে চাপা গলায় বলে, “তোমায় বলেছি তো অফিসে অডিট চলছে। ব্যস্ত আছি। এখন ক’দিন রাত হবে ফিরতে।”
কিন্তু অডিট দিয়ে আর কতদিন চলে? সাত দিন চুপচাপ। তারপরে ফের গোলাপ বাগিচায় মত্ত হাতির উৎপাত হয়ে ঢুকতে থাকে কাজরির কল। আর কতদিন অডিট চলবে?
ফের আবার নতুন ছল আমদানি করতে হয় সন্দীপনকে। বলে, “অডিট আজই শেষ হয়ে যাবে কাজরি। তবে কাল থেকে নতুন ঝামেলা। বেঙ্গালুরু থেকে পার্টি আসছে। ফাইভ স্টার হোটেলে উঠছে। কন্ট্যাক্ট সাইন হবে। হাই অফিসিয়ালদের সঙ্গে আমাকে থাকতে হবে। ফিরতে রাত হবে।”
প্রথম প্রথম মদের গন্ধ নিতে পারত না কাজরি। সন্দীপন বুঝিয়েছে, অফিসে কাজের এত লোড থাকে, দু’পাত্র না খেলে পাগল হয়ে যাবে।
কাজরি আর কী করে জানবে, ঠিক কোথায় তার নিশ্চিত জীবনসঙ্গী পাগল হতে বাকি রেখেছে। অগত্যা মেনে নিয়েছে।
এদিকে যত দিন যাচ্ছে, পাগলামি বাড়ছে সন্দীপনের। বারে এসে উদভ্রান্ত চোখে রুমাকে দেখতে থাকে। দেখতেই থাকে। মনে মনে ভাবে, কবে যে ভাবা শেষ হবে রুমার! আর কতদিন যে পরীক্ষা দিতে হবে! দূরে বসে তার দিকে চেয়ে মুচকি মুচকি হাসতে থাকে বারের মালিক বদনদা।
বদনদার বয়েসের গাছ-পাথর নেই। সব সময় কলপ-টলপ করে ধুতি-পাঞ্জাবিতে ফিটফাট। কিন্তু তাতেও মুখের খানাখন্দ ঢাকা পড়ে না। কালোর ওপর বেঁটেখাটো চেহারা। মস্ত নাকে লাল আঁচিল।
এই বয়েসেও দাপটের সঙ্গে দু’-দুটো বার চালাচ্ছে। এটা ড্যান্স বার। অন্যটা প্লেন বার। তার হিসেব বুঝে, ব্যান্ড শুরু হওয়ার আগে চলে আসে। ওয়াইন সেলারের কাছে সিংহাসন টাইপের স্পেশাল চেয়ারে বসে কাস্টমারদের জ্বলজ্বলে চোখে দেখতে থাকে।
বয়েস তো এমনি এমনি হয়নি। সন্দীপনের অধীরতা দেখে সবই বোঝে বদনদা। কাকে কীভাবে সামলাতে হয়, তার পাঠ পড়াই আছে তার।
সেই মোতাবেক ছেলে-ছোকরাদের আবেগ যতই নাছোড় হোক, কী করে তাদের গলাতেই অ্যারেস্ট করে রাখতে হয়, প্রথম দিনে সন্দীপনকে ক্লাস করে ভাল করে বুঝিয়ে দিয়েছে। তারপর থেকে সে ভয়ে ভয়ে থাকে। চট করে তার কাছে ঘেঁষে না।
বদনদা পোড়-খাওয়া লোক। ইংরেজি কিছু কিছু আয়ত্ত করেছে। অর্ধেকই ভুলে ভরা হলেও, কে কী ভাবল ফিরেও না চেয়ে, এমন স্মার্টলি বলে যায়, খদ্দেররা ঘায়েল হয়ে যায়।
ইংরেজির চেয়েও ইউনিক গুপ্তধন হল তার স্বরচিত কবিতার চর্চা। বারের লভ্যাংশের বেশ খানিকটা পুলিশ, নেতা ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা শুকনো শুকনো খেয়ে বেরিয়ে যায়। তাই তাদের নামে গালাগালি দিয়ে কবিতা লিখে, মুখে মুখে আবৃত্তি করে মনের জ্বালা ও কাস্টমারদের বুকের জ্বালা জুড়িয়ে দেয়।
এই কবিতা শুনিয়ে বদনদা প্রথম দিনেই হাত করেছিল সন্দীপনকে। তার মনে হয়েছিল, লোকটা আর পাঁচজন বার মালিকের মতো নয়। শিক্ষায় গলদ থাকলেও, হাফ কালচার্ড লোক।
এটাই ইউএসপি বদনদার। যখন দেখে কাস্টমার কিছুটা হলেও প্রভাবিত হয়েছে, নেতা ও দেশের শ্রাদ্ধ দিয়ে তো পেট ভরে না, কাব্য প্রতিভায় নতুন সাবজেক্ট অ্যাড করে, নারী। ফুলের সঙ্গে তুলনা করে তাদের ছাড়া পুরুষ কতটা অথর্ব, তা কাব্য করে বুঝিয়ে কাস্টমারের তাগিদ তুঙ্গে তুলে দেয়।
সেই মতো প্রথম দিনে সন্দীপনকে পাশে বসিয়ে, ভুল ইংরেজির ফান্ডা দেখিয়ে বলেছিল, “হেয়ার ইয়াংম্যান, এমন টাটকা যৌবন ঘরে বসে বরবাদ করার জন্য নয়। নারীফুলে বসে যে পুরুষ মধুপানই না করল, তার জন্মই বৃথা। গোলাপ ফুলের গার্ডেন সাজিয়েছি, সি! সি! যাকে ইচ্ছে পেড়ে নিন। এভরি ডেস আসবেন, অ্যাঁ? বন্ধুদেরও আনবেন। আপনাদের সেবায় আই অ্যাম অলওয়েজ হাজির।”
এ যে মেঘ না চাইতেই জল! নিজের কানকেই বিশ্বাস হয়নি সন্দীপনের। বলেছিল, “যাকে ইচ্ছে? এরা সার্ভিস দেয়?”
“এভরিবডিকে দেয় না,” বদনদা বলেছিল, “তবে ইউ আর ওয়ান কাইন্ড অফ ভদ্র টাইপের ছেলে। এরা এমন কাস্টমারই খোঁজে। যাকে-তাকে আনবেন না। আপনার স্ট্যান্ডার বুঝে ছেলেদের আনবেন।”
শুনতে শুনতে সন্দীপনের মনে হচ্ছিল বলে, “দয়া করে ইংরেজি ছেড়ে সাদা বাংলায় কথা বলুন দাদু!”
কিন্তু তাতে পাছে গুপ্তধনের বাড়া ভাতে ছাই পড়ে, সব সঙ্কোচ ও দ্বিধা ঝেড়ে তারপর থেকে সন্দীপন মেঘাদিকে ধরে আছে। উৎকণ্ঠা-ব্যাকুলতা গলাতেই ঠেসে-চেপে ভাবে, তার পছন্দের গোলাপের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে কবে যে দিঘায় যাবে!
কিন্তু দিল্লি দূর জানত। দিঘা যে তার চেয়েও দূর, ক’দিন পরেই টের পেল সে।
রোজ রোজ সে নাচের মুজরা হিসাবে রুমাকে দুশো-পাঁচশো টাকা ধরিয়ে দিচ্ছে দেখে হঠাৎ করে এক দিন একটি ছেলে জুটে যায়। বেশ ডাকাবুকো, হেঁকো-ম্যাচো ফিগার। সমানে জ্বালাতে শুরু করে। সন্দীপন দুশো দিলে সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়ে। নগদ পাঁচশো টাকা ধরিয়ে দিয়ে বাউন্সারের তোয়াক্কা না করে রুমার সঙ্গে হাত মিলিয়ে চলে আসে।
প্রতিদ্বন্দ্বী জুটে গেছে দেখে বুক জ্বলে যায় সন্দীপনের। পাছে গোলাপ দিঘার বদলে হাতছাড়া হয়ে মন্দারমণি চলে যায়, ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায় তার। একটা এসপার-ওসপার করার জন্য তেড়েফুঁড়ে ওঠে।
স্যালারি থেকে বাঁচিয়ে বছর পাঁচ ধরে একটা রেকারিং অ্যাকাউন্ট করেছিল সন্দীপন। ছেলেটাকে বিট করতে মোটা ফাইন দিয়ে ভেঙে ফেলে। ছেলেটা পাঁচশো টাকা দিলে সে উঠে গিয়ে রুমাকে হাজার টাকা ধরিয়ে দিয়ে আসে।
কেটে যায় আরও কয়েক দিন। সমানে টাকা ওড়াচ্ছে আর মেঘাদিকে জপাচ্ছে। কিন্তু পরীক্ষায় পাস করেছে কিনা বুঝতে পারছে না, ছটফট করছে, তখনই এক দিন ঘটে যায় একটা ঘটনা।
২
মুখে যতই বানিয়ে বলুক, কখনও কখনও তা সত্যি হয়ে যায়। সেদিন সত্যিই অফিসে অডিট চলছিল সন্দীপনের। প্রোজেক্ট ম্যানেজারের ঘরে বসে কাজ করতে করতে থেকে থেকেই চোখের সামনে রুমার মুখখানা ভেসে উঠছিল। কাজে ভুল হচ্ছিল। সময় যাচ্ছিল।
টেলিপ্যাথি বলে একটা জিনিস আছে। হঠাৎ কানে গোঁজা মোবাইলটা জ্যান্ত হয়ে গেল। নির্ঘাত কাজরি।
কাজের সময় কল এলে বিরক্তই হয় সন্দীপন। “ধ্যার!” বলে মোবাইল হাতে নিয়ে দেখল, কাজরি নয়, অপরিচিত নাম্বার। ট্রু কলারে যে-নাম দেখাচ্ছে, চেনে না। স্ক্যাম কি না ভেবেও শেষ পর্যন্ত লাইনটা নিতে চমকে উঠল। টেলিপ্যাথিই।
ও-প্রান্তে রুমা। এতদিন চোখে চোখে কথা হয়েছে। পাছে নাচের ছন্দ কেটে যায়, ভাল করে গোটা বাক্যও খরচ করতে পারেনি। এখন কথা বলছে। গলাটাও কী যে সুন্দর! যেন মধু ঝরে ঝরে পড়ছে। নিথর হয়ে বসে যা শুনল, তার মনে হল, যেন শূন্যে উঠে গেছে। একেবারে মেঘের রাজত্বে চলে গেছে।
তীর্থের কাকের মতো বসেছিল। ফল ফলেছে এতদিনে। সময় বের করেছে রুমা। পরীক্ষায় পাস করেছে সন্দীপন। আজ রাতটা সে তাকে দিতে চায়। তার জন্য হোটেলের ব্যবস্থা হয়েছে। রাত দশটায় সে কি যেতে পারবে?
পারবে না মানে? স্থিরতা অস্থিরতায় বদলে যাচ্ছে সন্দীপনের। হেডসেট বিক্ষিপ্ত হচ্ছে। তাড়াতাড়ি স্পিকার মুখের কাছে এনে পারলে তাতেই ঢুকে পড়ে, “কোন হোটেল? কোন হোটেল? রুট ম্যাপটা পাঠাও রুমা! তোমার চেনা হোটেল তো?”
“তর সইছে না, অ্যাঁ?” রুমা খিলখিল করে হেসে বলল, “হ্যাঁ গো আমাদের চেনা। ড্যান্সার শট পড়লে সেখানেও মাঝে মাঝে পারফর্ম করতে যেতে হয় আমায়। কাস্টমারদের স্যাটিসফাই করার জন্য ওখানে আলাদা ঘর আছে। আমি বলে দিয়েছি। গ্রাউন্ড ফ্লোরে সেভেন এ রুমে সাড়ে ন’টার মধ্যে চলে এসো মাই জান!”
“তা হলে তো হোটেল কাম ড্যান্স বার,” সন্দীপনের গলাও কাঁপছে, “ওয়ান নাইটের জন্য কেমন চার্জ নেবে?”
“আরে ঘাবড়াচ্ছ কেন? পনেরো প্লাস জিএসটি। তোমার কাছে কিছুই নয়।”
সদ্য সদ্য জমানো টাকা ভেঙেছে। পকেট ভারী। অ্যাপেও যথেষ্ট টাকা। স্বস্তির শ্বাস ছেড়ে সন্দীপন সব দিক দেখেশুনে নিতে চাইছে, “সেফ জায়গা তো? ফেঁসে যাব না তো!”
“তুমি দেখছি বড্ড ডরপুক ছেলে! বললাম তো আমার চেনা। এতই যখন ভয়, তা হলে থাক। তোমার দৌড় বোঝা গেছে।”
গুপ্তধনের দরজার পথ খুলেছে। ফের যদি ‘নো এন্ট্রি’ হয়ে যায়, মরেছে! তাড়াতাড়ি “না! না! যাব! যাব!” বলে চেঁচিয়েই উঠল সন্দীপন। এসি-তে আছে। তাও অনুভব করল হাত ঘেমে যাচ্ছে।
“হ্যাঁ যাবে কিন্তু। পুরুষ মানুষ হয়েছ, ইচ্ছা যখন হয়েছে, লুকিয়ে লুকিয়ে কেন, যা করার বুক ফুলিয়ে করবে। একদম ভয় পাবে না,” রুমা বলল, “এই নাম্বারে টাকাটা পাঠিয়ে দাও। তোমার ব্যাঙ্কের অ্যাপ আছে তো?”
“আছে। পাঠাচ্ছি,” বলেও বলবে না বলবে না করে বলেই ফেলল সন্দীপন, “আর তোমার চার্জ? তার জন্য কত?”
আবার হাসির ঝরনা ছুটল। হাসতে হাসতে রুমা বলল, “এই বললাম, তাও ‘কত? কত?’ করছ? এখন থেকে ব্রেক মারলে দিঘা যাবে কী করে ডার্লিং? বাবা রে, বাবা! তোমাকে যে আমারও পছন্দ হয়েছে। ওতেই ধরা আছে গো!”
তা হলে তো আর কথাই নেই। ভাল মেয়ে। কথাতেও তো বেশ মাধুরী! অনেক সম্পদ! অনেক সম্পদ! মুগ্ধতা আরও বেড়েছিল সন্দীপনের।
আর কথা বাড়ায়নি। টাকা পাঠিয়ে, দু’-একটা প্রয়োজনীয় কথা সেরে, চার পাশে তাকিয়ে চাপা স্বরে রুমার সঙ্গে একটু হৃদয় বিনিময় করে ছেড়ে দিয়েছিল ফোন।
আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে উঠেছে তার। এত সময়, এত কষ্ট আর পেগের পর-পেগ গেলার মূল্য আজ পেতে চলেছে। হোটেলের ঘর দিয়েই নয় গুপ্তধনের কক্ষ খুলল। দিঘা তো পড়েই আছে। তার মনে হল নাচে।
কিন্তু নাচার আগে আছে কাজ। উত্তেজনা আর রোমাঞ্চ ঠোঁটেই সিল করে, অফিসের কাজ মিটিয়ে বেরিয়ে কাজরিকে ফোন করল। রাতে ফিরতে পারবে না। তার একটা জবরদস্ত রিজন চাই।
ভাবতে ভাবতে মনে পড়ল বদনদার বেদবাক্য, নারী ছাড়া পুরুষ অচল। স্বপ্নের নারীকে পেতে চলেছে। পুরুষত্ব দমক দিয়ে উঠল। খুলে গেল মাথা। রীতিমতো সিরিয়াস রিজন বের করে ফেলল।
ইন্সপেকশন। গুরগাঁও থেকে কাল ফার্স্ট আওয়ারে হাই অফিসিয়াল আসছে। তাই আজ সারারাত কাজ করতে হবে। পেপার-ফাইল ঠিকঠাক করতে হবে। ফেরা হচ্ছে না আজ।
কাজরি একটু গাইগুঁই করলেও আটকাল না। “দিন-রাত অফিসই করো!” বলে একটু রাগ দেখিয়ে ছেড়ে দিল ফোন।
আজ আর চেনা বারে গেল না সন্দীপন। যে-হোটেলের ঠিকানা দিয়েছিল রুমা, সেখানেই চলে গেল। ঠিক কলকাতায় নয়। এক্সটেন্ডেড কলকাতা। অ্যাপে গাড়ি বুক করে মিনিট পঁয়তাল্লিশ লাগল।
ঠিকই আইডিয়া করেছিল সন্দীপন। হোটেল কাম ড্যান্স বার। সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠে আজ আর পানীয় নিল না। সেরা আনন্দের খোঁজে এসেছে। শরীর-মাথা ফিট রাখতে ভাল করে টিফিন করতে করতে গণেশ পুজো শুরু হয়ে গেল। জ্বলে উঠল মঞ্চের রঙিন আলো।
পুজো শেষ হতেই ড্যান্সারদের আনাগোনা শুরু হয়ে গেল। খদ্দেরদের সংখ্যাও বাড়তে থাকল। বেজে উঠল মিউজিক সিস্টেম। চাঞ্চল্য পড়ে গেল চারপাশে। কাঁটায় কাঁটায় রাত ন’টা।
পানীয়ের জন্য মন উসখুস করছে। কিন্তু রুমা আসছে। তার ওপর এখানে থাকলে যদি মনের সেট আপ নড়ে যায়, উঠেই পড়ল। পেমেন্ট করে নীচে নেমে সেভেন এ রুমের খোঁজ করতে শুরু করল।
রিসেপশনে কেউ নেই। নাচ শুরু হতে সব চলে গেছে। আবার ওপরে উঠে খোঁজ-খবর করে একটা লোককে ধরে আনল। রুমের নাম বলতে তাকে নিয়ে গেল গ্রাউন্ড ফ্লোরের এক্সট্রিম কর্নারের একটা রুমে।
হুঁ, এই সব রুমই এসব কাজের জন্য আদর্শ। লোকটা সন্দীপনের পরিচয় জানতে চাইল না। সে আসবে জানত। তাকে ভাল করে এক বার দেখে নিয়ে, ঘর খুলে দিয়ে চলে গেল। ওপরে উদ্দাম নৃত্য শুরু হয়েছে।
কিন্তু ভেতরে ঢুকে মন দমে গেল সন্দীপনের। লো পাওয়ারের একটা বালব জ্বলছে ঘরে। এসি-র বালাই নেই। ফ্যান। রেগুলেটর চড়িয়েও বিশেষ স্পিড বাড়ল না। বিছানায় চাদরটাও কয়েক দিনের পুরনো।
উপায় নেই দেখে, তাতেই বসে রুমাকে ফোন করল সন্দীপন। লাইন সঙ্গে সঙ্গেই নিল রুমা। হাসছে, “এখনই ঢুকে গেছ! পারোও বটে! আমি মেক আপ নিচ্ছি। তোমাদের তো আবার একটু না সাজলে-গুজলে মন ওঠে না। অস্থির হয়ো না! শেষ করেই আধঘণ্টার মধ্যে আসছি।”
এই হতশ্রী ঘরে আরও আধঘণ্টা! কী করে রাত কাটাবে, ভেবে চিন্তা হচ্ছিল সন্দীপনের। এমন জানলে আরও খরচ করে ভাল হোটেলই নিত। এই আলোয় গুপ্তধন উদ্ধার কতদূর কী হবে, কে জানে!
কিন্তু হাত থেকে তির বেরিয়ে গেছে। উপায় নেই। মোবাইল ঘাঁটতে শুরু করল সন্দীপন। মেসেজ করছে রুমাকে। রুমাও সাজতে সাজতে উত্তর দিচ্ছে। মিলনের আনন্দে সেও খুশিতে ডগমগ। প্রেমের চোখা চোখা হিন্দি ডায়ালগ ইংরেজি অক্ষরে লিখে সেন্ড করছে।
এ তো ভার্সেটাইল জিনিয়াস! অনেক গুণের আধার। উদ্দীপনা ফিরল সন্দীপনের। মিলনকুঞ্জ যেমনই হোক, আজ এক অবিস্মরণীয় রাত উপহার পেতে চলেছে।
ঝড়ের মতো উড়ে গেল সময়। এক সময় টাইপিং অফ হয়ে গেল। দরজায় টোকা পড়ল।
এসেছে! এসেছে! লাফিয়ে উঠে খুলে দিল দরজা সন্দীপন। কিন্তু বাইরে চেয়ে থতমত খেল। রুমা নয়। তার বদলে খোলামেলা, চোখ ধাঁধানো পোশাক-পরা একটা নয়, দু’-দুটো মেয়ে। এই বারেরই মেয়ে সম্ভবত।
“আপনারা কে?” সন্দীপন শুধোল, “রুমা কই?”
মেয়ে দুটি ক্ষিপ্র গতিতে তাকে ঠেলে ঢুকে পড়ল রুমে। একটি মেয়ে ছিটকিনি এঁটে দিল। অন্যটি তার হাত চেপে ধরে বলল, “আসছে! আসছে! কখন থেকে ডাকছ! বুকে যে ব্যথা ধরে গেছে বেচারির! দাও! দাও! বাকি পেমেন্টটা করে দাও!”
সন্দীপন বিরক্ত হল, “সতেরো হাজার টাকা পেমেন্ট তো আগেই করেছি।”
“মেয়েছেলে নিয়ে রাত কাটাবে, সতেরো হাজার টাকায় হয় সোনামানিক? সত্তর হাজার বলেছিল রুমা। সতেরো হাজার দিয়ে কাজ সারার মতলব? বাকি টাকা ছাড়ো! রুমাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।”
এসব হচ্ছেটা কী? “দাঁড়াও! দাঁড়াও!” করে রুমাকে কল করতে সন্দীপন মোবাইল বের করে কল লগের দিকে চেয়ে হতবাক হয়ে গেল। রুমার নাম্বার অদৃশ্য হয়ে গেছে।
“ফোন রাখ বে!” দ্বিতীয় মেয়েটি রসালাপের দিকেই গেল না। চেহারাটা বেশ শক্তপোক্ত। হেডসেটে টান দিয়ে সন্দীপনের মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে চোখ পাকাল, “ছাড়! পয়সা ছাড়!”
একেবারে তুই! আনন্দের সাগরে দোলা খাচ্ছিল, সন্দীপন বুঝল, মত্ত ঢেউ নিষ্ঠুর ভাবে শুকনো বালুচরে ছিটকে ফেলেছে তাকে। বিশ্রী ধরনের ট্র্যাপে পড়ে গেছে।
হুঁ, ঠিক তাই। মেয়েটি সন্দীপনের ফোনটা অন্য মেয়েকে ধরিয়ে দিয়ে, কাঁধের ব্যাগ থেকে নিজের মোবাইল বের করে ভিডিও মোড অন করে দিল। স্ক্রিনে এক বদখত চেহারার পুরুষের ছবি ফুটল। মেয়েটি সন্দীপনের দিকে ফোকাস করতেই সে উল্লাসে ফেটে পড়ল, “ছিন লে! সব কুছ ছিন লে! গলে মে সোনে কা হার। ছোড়না মত!”
কে লোকটা? বদনদা? না, তার বারের বাউন্সার? এত বড় বিপদ। তাও চোখ স্থির সন্দীপনের। স্ক্রিনের দিকে চেয়ে আকুল ভাবে খুঁজছে, লোকটার পেছনে একবারটি যদি রুমাকে দেখা যায়!
৩
ফ্ল্যাটে ফিরতেই ছুটে এল কাজরি। অবাক হয়েছে। ভুরু নাচাল, “এই যে বললে ফিরবে না রাতে! কাজ হয়ে গেল?”
হুঁ, কাজ তার নয়, যাদের ছিল তারা সুন্দর ভাবে করে বেরিয়ে গেছে। অচেনা-অজানা হোটেল, মান-সম্মান, পুলিশ ও মার খাওয়ার ভয়ে সতেরো হাজার টাকা আগেই গেছিল, সঙ্গে যা ছিল সোনার হার, নগদ বিশ হাজার টাকা– সব গেছে। বাকি টাকা জোর করে পাসওয়ার্ড আদায় করে তার অ্যাপ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে। সামনের মাসে ফ্ল্যাটের ইনস্টলমেন্টের টাকাও দিতে পারবে না।
“কী হল? কী দেখছ আমার দিকে?” কাজরি সচকিত হল, “হঠাৎ কী হল তোমার? আজ যে গায়ে গন্ধ নেই।”
কী করে থাকবে? এই গন্ধই তো তার সর্বস্ব হরণ করেছে। গোলাপ ফুলের গন্ধ নিতে গিয়ে কাঁটার খোঁচায় রক্তাক্ত হয়ে ফিরেছে।
মেয়েদের পায়ে ধরে, মোবাইলটা অনেক কষ্টে বাঁচিয়েছিল। হোটেল থেকে বেরিয়ে ফোনে ধরেছিল মেঘাদিকে। সব শুনে মেঘাদি আকাশ থেকে পড়েছিল। জানিয়েছিল, রুমা তো বারেই নাচছে। সে তাকে ফোন করেছিল, হতেই পারে না।
হতে পারে না। তাও হয়। হয়েছে। শুধু নারীর সান্নিধ্য নয়, তার থেকে নিষ্ঠুর ভাবে বঞ্চিত হলেও পুরুষ জেগে ওঠে। আচ্ছন্ন বুদ্ধির মেঘ কেটে-সরে গেল। সন্দীপন বুঝল, সবটাই বদনদার নিখুঁত চিত্রনাট্য। এক বার তার মনে হল, চলে যায় বারে। চেপে ধরে তাকে। এক বার মনে হল, থানায় যায়। কিন্তু সে যে ‘ওয়ান কাইন্ড অফ ভদ্র টাইপের ছেলে!’ উল্টে তারই হাটে হাঁড়ি ভাঙবে। চার দিকে “ছি! ছি!” পড়ে যাবে।
চতুর কবি বদনদা বিজনেস চেয়েছিল, গোলাপের টোপ দিয়ে, তার মাথা মুড়িয়ে কড়ায়-গণ্ডায় উসুল করে নিয়েছে। পুলিশ তার হাতে। কিছুই করতে পারবে না। একটা কবিতা লেখা শেষ হয়েছে। এবার বদনদার নতুন কবিতা লেখার পালা।
কাজরির কথার উত্তর না দিয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে ঘরে গিয়ে খাটে বসে পড়ল সন্দীপন। চেয়ে আছে কাজরির দিকে।
গুপ্তধন থাকে মাটির তলায়, দেওয়ালের ঠাসা গভীরে অথবা আলোহীন বদ্ধ কুঠুরিতে। তাতেও আবার অভিশাপ মিশে থাকে। তা আবিষ্কার করতে গিয়েই তার কষ্ট করে জমানো সব গুপ্তধন হাতছাড়া হয়েছে। আর কেন তার মায়া? যা প্রকাশ্য, যা স্পষ্ট, তা সাজানো-গোছানো নকল সত্য নয়, চিরন্তন আশ্রয়। রুমা রুমা করে কতদিন ফিরেও চায়নি কাজরির দিকে! হতাশ হয়ে টিভির সিরিয়ালে মুখ গুঁজে পড়েছে বেচারি! তার ইচ্ছে হচ্ছিল কাজরিকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।
