short-story-lassyomoyee

লাস্যময়ী

কণা বসু মিশ্র

জীবনটা যেন সার্কাসের ট্র্যাপিজের দড়ির ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া। ব্যালেন্স রেখে চলা, একটু এদিক ওদিক হ’লেই ঝপাং। যতদিন টাকা ততদিন তুমি, টাকা নেই তুমি ফক্কা। একথা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পেরেছে কেষ্ট কলোনির সুখলতা মন্ডল। ডিগ্রীর কোন ছাপ না থাকলে ও মাধ্যমিকে দু দু বার ফেল করা সুখলতার এই এলেমটুকু আছে। কি করে পাহাড়ের ধাপে উঠতেঝ হয় সে জানে। পটলা ওর চার নম্বর প্রেমিক তোলা বাজির ব্যবসা করত, কিন্তু প্রায়ই পুলিশের খাতায় নাম। শ্রীঘরে চালান। তারপর ওকে ছাড়িয়ে আনতে প্রেমিকার জান কয়লা। বছর খানেক আগে পটলার বউ পালিয়েছে দুমকার রাজ মিস্ত্রী সীতারামের সঙ্গে। সেই থেকে পটলা একেবারে ফ্রি। সুখলতার সঙ্গে পটলার যখন তখন প্রেমে আর কোন বাধা রইল না। এখন এই বৃষ্টি বাদলে সুখলতার সুখ আসছে। সেই মুক্তির উল্লাসে পটলা তার পেয়ারের পোষা ময়নাটাকে খাঁচার দরজা খুলে দিল উড়িয়ে। তারপরই অনুশোচনা। আকাশে উড়ন্ত ময়নার দিকে সে জলভরা চোখে তাকিয়ে থাকল বেশ কিছুসময়। পাখিটা ছিল বড্ড হিংসুটে। সুখলতার সঙ্গে পটলার ঢলাঢলি ময়না একেবারেই সইতে পারত না। পটলার ঘরে সুখলতা ঢুকলে ও মুখ ঘুরিয়ে থাকত। সুখলতা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতে গেলে ও ঘ্যাঁক করে কামড়ে দিত। কি পটলার বেলায় খাতিরই ছিল আলাদা। পটলা সামনে এলেই ময়না উত্তেজিত ভাবে ডানা ঝাপটাতো। আদর খাবার জন্য খাঁচার গরাদের ভেতর থেকে গলা বাড়িয়ে দিত। পটলা খাঁচা খুলে ওর আল্হাদ মেটাত। ময়না ছিল পটলার যেন দু নম্বর প্রেমিকা।এখন শূণ্য খাঁচার দিকে তাকিয়ে পটলার পরাণ পোড়ে।আবার জৈবিক ক্ষিধে মেটাতে সুখলতার আশায়। পটলা হাপিত্যেসে অপেক্ষাও করে। লাস্যময়ী সুখলতা যতই তার পেয়ারের লোক হোক না কেন ময়নার খালি জায়গা সে কোনদিনই দখল করতে পারবে না। পটলা বিড় বিড় করে। তবে সুখলতার ঘাড় ভেঙে বাংলা মদ আর বিড়ির পয়সাটা জুটে যায়। জৈবিক ক্ষিধেটাও মেটে।

সওদিকে সুখলতা খালপাড়ের গলি গলি তস্য গলির পাকা ঘর থেকে যখন বের হল তখন হুড়মুড় করে বৃষ্টি নামল। আকাশ ফালা ফালা করে বিদ্যুতের ঝিলিক। কড় কড় কড়াৎ কাছেই কোথায় বাজ পড়ল সেই আগুনের হল্কায় পুড়ে ছারখার পড়শীর বাঁশের ছোট্ট দোকান খানা। সুখলতা ছাতাটা খুলতে না খুলতেই ফুরুৎ করে উড়ে গিয়ে পড়ল খালের নোংরা জলে। আবর্জ্জনায় ভরা ওই খালের কালো জলের পচা দুর্গন্ধ ওর নাকে আসছিল। ওর বমি পাচ্ছিল। যেন অন্নপ্রাশনের ভাত উগরে উঠবে। তবু নিজেকে ও সামলে নিল। ছাতাটা ওকে যেন-তেন প্রকারেণ উদ্ধার যে করতেই হবে। এইতো গত র্নিবাচনের সময় সে রোদে পুড়তে  পুড়তে, জান কয়লা করে ছুটেছিল। ঝড়, বৃষ্টি মাথায় নিয়ে পতাকা হাতে মাইলকে মাইল স্লোগান দিতে দিতে মিছিলে হেঁটেছিল। তাতে কিছু টাকা পয়সা পেয়েছিল। পার্টির দলের লোক হওয়ায়। ওই ছাতা, শাড়ি, মাথা গোঁজার জায়গা ওই পাকা ঘর খানা সব তার কপালে জুটেছিল পার্টির দলবাজির জন্য। তো পার্টি যদি হারে সেকি তার দোষ? ওর কপাল ফাটল। পার্টিও গেল ওউ মরল। ওর বন্ধুরা বেইমানি করে চলে গেল নতুন দলে। সুখলতা শোলার কাজে লেগে পড়ল।পটলার সঙ্গে। মন্দ রোজগার নয়। কিন্তু পটলার কি কাজে তেমন মন আছে? মেয়ে ছেলে দেখলেই ছুক ছুকানি।সুখলতা না পারে ওকে ফেলতে না পারে গিলতে। যৌবনের জ্বালা মনের জ্বালা দুই জ্বালা মেটানোর নাগর আরো জুটলেও তাদের যে ঘরে বউ রয়েছে। দু পয়সা দেবার মুরোদ নেই। পটলার থেকেও নেই। নেশাভাঙেই পকেট গড়ের মাঠ। সুখলতার ভাগ্য উল্টে আরো টু পাইস ভরো। তবু শান্তি, ঘরটা তো ফাঁকা! কোঁদলবাজ বউ তো নেই। যদিও বউ নেই তো কি, বউয়ের বারা! ঝগড়াটে ময়নাটা তো রয়েছে। হতচ্ছাড়া পাখির কত ক্ষমতা! ওকে দেখলেই জ্বলে ওঠে। বলে, দূর হ! দূর হ! হারামজাদি! আমার সোয়ামীর ঘর ভাঙতি এইচিস? সুখলতা বেজায় রেগে বলে, কত ঢং! তুই কি পটলার বউ? সুখলতা ভুলে যায় ওটা মানুষ নয়, ওটা পাখি! নেশার ঘোরে পটলা যা শেখায়, ও তাই তো শেখে। কিন্তু কোপটা ওর পটলার ওপর না পড়ে ময়নার ওপর পড়ে! পটলা ব্যঙ্গের হাসি হাসে। দুই সতীনের ঝগড়ার মত ব্যাপারটা সে উপভোগ করে। আবার কোনদিন পাখি অন্যরকম ভীমরতি ধরে, সে পটলার আগের বউয়ের নাম ধরে ডাকে, আশা! আশা! ঘরে আয়! আয়! সুখলতা রেগে বলে, আহা! তুই যেন আশার শাউড়ী! পটলা বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে ট্যারা চোখে তাকায় আর মুখ টিপে হাসে। সুখলতা বুঝেও বোঝে না যে না ওটা মানুষ নয়, পাখি! তবুও ওর হিংসে হয়, সে কেন ওর পটলার প্রেম সোহাগের ভাগীদার হতে যাবে?

খাঁচার পাখি খাঁচায় থাক, তোর কি দরকার সুখলতা আর পটলার প্রেমে নজর দেবার? সুখলতার পটলার ওপরেও রাগ হয়, ওর কি দরকার পাখিটাকে এত আস্কারা দেবার? লাই দিয়ে দিয়ে ওকে একেবারে মাথায় তুলেছে। পটলা যখন সুখলতাকে জড়িয়ে ধরে আদর করে ময়না তখন হিংসেয় ছটফট করে। রাগে গর্ গর্ শব্দ করতে থাকে। পটলা পটলা! বলে চেঁচানি ধরে। সুখলতার তখন এইসা রাগ হয়! ইচ্ছে করে ময়নাকে ঠ্যাঙাতে। কিন্তু পটলা বাগড়া দেয়। ময়নাকে কিছু বললেই ওর যেন বড্ড জ্বালা। এইরকম সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে আর নিজের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ছাতার কথা প্রায় ভুলেই যাচ্ছিল সুখলতা। ডান কাঁধে ভ্যানিটি ব্যাগ, ডান হাত দিয়ে চেপে ধরে কোমরে আঁচল গুঁজে হাঁটু পর্যন্ত তোলা গোলাপী নাইলের শাড়ীর কুঁচি বাঁ হাতে ধরে রেখে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে জল কাদা ভেঙে হাটতে হাটতে ওর ছাতার কথা মনে হতেই ফের শোক উথলে উঠল। সেই মুহূর্তেই বস্তির মস্তান হারাণের সঙ্গে একেবারে মুখোমুখি দেখা। হারান এক ঝলক হেসে বলল, আর তো তোর পালাতি দোবনি। সেই কবে থিকে আমি তোর আশায় রইছি। সুখলতার বুক কেঁপে উঠল। ওর প্রতি যে হারানের দুর্বলতা রয়েছে তা ওর জানা। তবুও কোনদিনই সে ওকে পাত্তা দেয়নি। তবু সুখলতার মুখে হাসি টেনে আজ এই মুহূর্তের জন্য ভোল পাল্টে বলল, সবুরে মেওয়া ফলে বুঝলি? আমুও কি মনে মনে তোরে খুঁজিনি হারান? মাইরি বলতিছিস? ট্যারা চোখে তাকাল হারান। সুখলতা বলল, আমি কি মিথ্যে বলতিছি? তুই আমার কতবড় পিয়ারের নোক প্রমাণ দিতি পারিস?

হারান বলল, তুই ঝা বলবি আমি তাই করতি পারি। সুখলতা সুযোগ বুঝে বলল, ওই খালের জলে আমার ছাতা উড়ে গেছে তুলে এনে দে। হারান নাক সিটকে বলল, এই মইরেছে! পোচা গোন্ধ, মরা কুকুর ভাসতেছে তোর ছাতার সঙ্গে। বিস্টিতি খালের জলও তো খুব বেইরেছে রে। ওই পাঁকের গোন্ধ এক বুক জলে নামতি হোবে? জীনসির নতুন প্যান্টখানা আজই পড়লুম!

সুখলতা মুখে হাসি টেনে বলল, পেরেম করতি চাস আর আমার জন্যি এটুক কষ্ট করতি পারবেনে? ওর কথা শেষ হতে না হতেই পড়ি কি মরি করে খালের লতা পাতাময় নোংরা কাদা জলে ঝাঁপ দিল হারান।তারপর সারা গায়ে মাথায় নোংরা র্দুগন্ধ কাদার দলা নিয়ে ভূতের মত চেহারায় হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে খাল থেকে উঠে এলো সুখলতার ছাতাটা হাতে নিয়ে।

প্রেমের বদলে সুখলতার তখন বমি ওয়াক থুঃ। হারান রে! ছাতাটা ওই টিউকলের জলে ধুয়ে আনতো। ওটা ধরতিউ আমার ঘিন্না করতেছে। সুখলতার এই আব্দাদেরে ঢং রাখতে হারান টিউবয়েল পাম্প করে ওর ছাতাটা ধুয়ে দিল। সুখলতা হারানের হাত থেকে ছাতাটা নিয়ে একটু মুচকি হাসি ছুঁড়ে ওকে বোকা বানিয়ে হাত নেড়ে টা টা করে চলে গেল। বস্তির ক্ষুরধার মস্তান হারান কাদা মাখা শরীর নিয়ে জোকার সেজে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। সুখলতা মনে মনে বলল, তোর ঘরে দজ্জাল বউ রইচে রে হারান! তার হাতে ঝেঁটার বাড়ি খেতি যাব কোন দুঃখ্খী? তুই ঘরে ফিরে যা! যে মদ্দা তার বউ সামলাতি পারেনে সে আবার মানুষ!দু দু বার মাধ্যমিক ফেল হলেও নয় ক্লাশ পাশ সুখলতা ওর বৃষ্টিভেজা শরীর, মাথায় ছাতা নিয়ে দেমাকি চালে হাটতে লাগল। আর একবারও পেছন ফিরে তাকাল না। পুরুষ মানুষের গতরের সুখ জানা আছে। সুখলতার মনে পড়ল, পটলার কথা। সে ফের বিয়ের পিঁড়িতে বসতে চায় সুখলতার সঙ্গে। একথা সুখলতা কে সে প্রায়ই বলে। সুখলতার ঠোঁটে ব্যঙ্গের হাসি। ও উত্তর দেয়, তাই না তাই! ন্যাড়া কবার বেলতলায় যায় রে! বল দিকিনি? তোর সুখির কপালে ছাই ঢেলে চলে গেল তোর বউ!

আবার টোপর পইরবি? আমুও যদি কেটে পড়ি? পটলা দাঁত বের করে হেসে বলে, সে আমুও তো কাটতি পারি? সুখলতার মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি বলে, ওহ! হো রে! ব্যাটা ছাওয়ালের মুরোদ আমার জানা! আমার জন্যি সেখন লাইন দিতি হবে জানলি? লাইনির ভিড় থাইকবে প্রচুর তার মধ্যি লাইন সুজা কথা নয়রে পটলা! এখন তোর কাছে রইচি কিনা তাই চিন্তি পারতিছিস নে।

পটলার ফের দেঁতো হাসি। সে বলে, আমার বেলাতেও তো তাই হতি পারে। সুখলতা ভুরু কুঁচকে তাকায় খেতি দিতি পারবি? তোর পকোটের জোর রয়েচে? তোরে পুষতিছি আর তারে পারবোনি? সুখলতা জ্বলে উঠল, মুখ সামলে কোথা বলবি পটলা। তুই আমার পুষতিছিস না আমি তোর পুষতিছি? কাজে যাসনি কতদিন? নিশা কইরে পইরে থাকিস? পটলা চোখ পাকিয়ে বলে, তাই বলে কি আমার ময়নার একলা থুয়ে যাবো? এমনিতিই তো কত নোকের চোখ নাগতেছে, কেউ যদি ওরে নে যায়? সুখলতা বলে, দরজায় তো তালাই থাকে। পটলা বলে, তালা ভাইঙতি কতক্ষণ? সুখলতা বলে, মানষির আর খেইয়ে দেইয়ে কাজ নেই তোর ঘরের তালা ভাইঙে ময়না চুরি করতি আইসবি। পটলা বলল, কথা কওয়া পাখির বাজারে ময়নার অনেক দাম, রে সুখলতা! আমার ময়নার কি বুদ্ধি! সে মিস্টি কথার ফুলঝুরি! একেবারে মাতিয়ে রাখে। সুখলতা চোখ পাকিয়ে বলল, মিষ্টি কথা না ছাই। কুচুটে নাম্বার ওয়ান। আমার উপর তোর ময়নার পেটে পেটে যা হিংসে! পটলা এক গাল হেসে বলল, কি করব ও যে তোরে সইতে পারে না! সুখলতা বলল, ও আপদ রেখে লাভ কি? দূর! দূর করে তেইড়ে দে। আমারও জ্বালা জুড়োবি, তোরও সমস্যা মিটবি! পটলা ফোঁস করে উঠল। বলল, আহা! বুদ্ধির ঢেঁকি! তোর কথা শুনে আমার পরাণের পাখিটারে দিই ছেইড়ে আর কি? পটলা এখন কপাল চাপড়ে ভাবল, হায়রে! আজ সেই পাখিকে উড়িয়ে দিল? সুখলতা জানতে পারল না। সে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিল, পটলার কাছে গিয়েই কি ওর শান্তি আছে? তারচেয়ে একটা সিনেমায় গেলে ভাল হত। বেশীর ভাগ সিনেমা হলগুলিই তো সব বন্ধ হ’য়ে গেছে। সেখানে বহুতল বাড়ি। আজকাল সিনেমা চলে মলএর হল এ। টিকিটের মেলা দাম!

গড়িয়ার পাঁচপোতা থেকে হাঁটতে হাঁটতে সুখলতা পৌঁছোল গড়িয়া ইস্টিসনে।রাস্তায় থই থই করছে জল। সুখলতা গড়িয়া বাজার পেরিয়ে ভাবল, ও কি ট্রেনে চেপে বালিগঞ্জ ইস্টিসনে যাবে? তারপর সেখান থেকে বাস কিম্বা অটোয় করে দেশপ্রয় পার্কে। প্রিয়া সিনেমা হল? ভাবতে ভাবতেই ও উঠে পড়ল ট্রেনে। রেল লাইন ভেসে যাচ্ছিল জলে। সমানেই মুষলধারে বৃষ্টি চলছে। ট্রেনের জানালার বাইরে থই থই জল। তবু ট্রেন চলতে লাগল ঢিমেই তালে। ও কোনরকমে পৌঁছোল বালিগঞ্জ স্টেসনে।সেই মুহূর্তেই মাইকে ঘোষনা হল, শিয়ালদহ থেকে দক্ষিণ দিকের সমস্ত লোকাল ট্রেন চলাচল আপাততঃ বন্ধ! ইলেকট্রিসিটি ফেল করেছে।

প্ল্যাটফর্মময় নোংরা জল কাদা ভিজে কুকুরগুলো কুঁই কুঁই করছে। প্ল্যাটফর্মে চায়ের স্টলে ভীড়। কাক ভেজা নারী পুরুষ! কেউ কেউ চাকরীজীবি, কেউ বা স্কুল, কলেজের পড়ুয়ার দল। বিক্রি হচ্ছে, ঘটিচানাচুর! আলুকাবলী, মশলা মুড়ি, হাঁক পারছে লজেন্স, পান, বিড়ি, খইনী, সিগ্রেট, ছুরি, কাচি, সেপটিপিন হরেক রকম জিনিস, নীলামঅলা, প্লাস্টিক টুল, বালতি, মগ, বাটি, ছোটকার্পেট, পাপোশ ভিজে সব চুপসে গেছে। ক্রেতা, বিক্রেতার তবু হাঁক ডাকের শেষ নেই। এক কোণে ভিজে কুঁকড়ে নোংরা ন্যাকড়ার দলার মত তালগোল পাকিয়ে ভাঙা লাঠি হাতে পড়ে আছে এক অন্ধ ভিখিরী, তার সামনে রয়েছে রং চটা কলাইকরা একটা থালা। তার ওপরে খুচরো কিছু পয়সা। সুখলতাও একটাকার কয়েন ছুঁড়ে দিল। তারপর স্টেশন ইয়ার্ড পেরিয়ে এসে যা দেখল, তাতে ওর চক্ষু চরক গাছ। চারদিক জলে জলাকার যেন বান!  ইস্টিসনের নীচে দিয়ে ঘোলা জলের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে মরা মাছের সঙ্গে কিছু জ্যান্ত মাছের সারি, জলে জলাকার এমন ভয়াবহ অবস্থা যেন ছোট নদী। কত যে শাক, সব্জী, ফল ভেসে যাচ্ছে! রাস্তা ঘাট ট্রাম বাস চলাচল বন্ধ। অটোও আর চলতে পারছে না। মুখ থুবড়ে পড়েছে, ট্যাক্সি, প্রাইভেট কার! প্রায় ডুবে রয়েছে মানুষ টানা রিক্স! কাপড় তুলে কোমর ভাঙা জল ভেঙে সুখলতা হাঁটতে থাকে। ওর মনে পড়ে, ছেলেবেলার কথা। বালিগঞ্জ রেল লাইনের ধারে ওই ঝুপড়ির বস্তিতে ওর জন্ম। ওর খুব ইচ্ছে হচ্ছিল, যাবে নাকি উঁকি মারতে! সুখলতার তো নিজের বলতে কেউ নেই ওখানে। বাপ, মা সবাই যে মরেছে সেবার করোনারে। ঝুপড়ি প্রায় সাফ। তবু বস্তির কেউ কেউ তো বেঁচে রয়েছে! সেই মুহূর্তেই ও ওদিকে এগোতে চেষ্টাও করল। কিন্তু কোমর সমান জল, ডুবন্ত ঠেলা গাড়ির ধাক্কা খেয়ে ও পড়ে গেল। হঠাৎ বস্তির ঘর থেকে জল ভেঙে ওর হাত ধরে টেনে তুলল ওর সেই ছোটবেলার বন্ধু অসীম, বৃষ্টির জল জমলে ও যার সঙ্গে কাগজের নৌকো ভাসনোর খেলা খেলত। যে ছিল সুখলতার প্রথম প্রেমিক। সে এক গাল হেসে বলল, সুখ! তুই?

কদ্দিন পর দেখলুম, রে তোকে! আমি এখন নৌকোর মাঝি। চল না মোর সঙ্গে ভেসে বেড়াবি! সুখও হাসল বড় মুক্তির হাসি। বলল, চল যাব তুই যেথা নে যাবি।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *