এমা
তুলিকা মজুমদার
আপনাদের পরিবার তো সম্পূর্ণ নয় আলফ্রেড! কেউ একজন মিসিং আছেন। তাকে সমর্যাদায় বাড়ি ফিরিয়ে আনুন, তা না হলে আপনার ছেলের বিবাহিত জীবন সুখের হবে না!
রেনো নামক অন্ধ সাইকিকটি দৃঢ়তার সঙ্গে কথাগুলো বলে আমাদের উত্তরের অপেক্ষা করতে লাগল। কিন্তু ওর কথাগুলো শুনে আমি আর ফ্রেডা ততক্ষণে দরদর করে ঘামতে শুরু করেছি! লোকটা জানল কী করে এমা’র কথা? এ তো চোখেও দেখতে পায় না, শুধুমাত্র ওই ক্রিস্টাল বলটার উপর হাত রেখে আমাদের জীবনের এত কষ্টে ধামাচাপা দেওয়া সত্যটা বলে দিল! আমি নিজেকে সামলে নিয়ে সবে মাত্র ধমকের সুরে উড়িয়ে দিতে যাচ্ছিলাম কথাটা কিন্তু ফ্রেডা আমার হাত চেপে ধরল। ও আমাকে একটা কথাও বলতে না দিয়ে সটান টেনে নিয়ে রেনোর চেম্বার থেকে বাইরে নিয়ে এল, তারপর রাস্তার উল্টোদিকের রেস্তোরায় ঢুকে গেল। ফ্রেডার মুখে জমে থাকা আষাঢ়ের কালোমেঘ জানান দিছিল সেও আমার মতোই বিচলিত কিন্তু স্বভাবে সে আমার থেকে অনেক কঠোর হওয়ার দরুন নিজেকে সামলে নিয়েছে।
ওয়েটার আমাদের অর্ডার নিয়ে যাওয়ার পরই চাপা গলায় ফ্রেডা বলল, – রেনো এই শহরের বিখ্যাত সাইকিক আর তার ওপরে জুলিয়ানের হবু শ্বশুরবাড়ির অত্যন্ত বিশ্বাসভাজন। তুমি ওকে ধমকে চুপ করিয়ে দিলে ও আর মুখ খুলবে না ভেবেছ? আমরা অস্বীকার করলেও ও মার্থাদের পরিবারকে সবটাই জানাবে আর তখন ওরা যদি খোঁজ করা শুরু করে তাহলে এমা’র ঘটনা আর চাপা থাকবে নাকি? সর্বনাশ হয়ে যাবে আমাদের আর জুলিয়ানের বিয়ে ভেস্তে গেলে মার্থার বাবার, মানে শহরের শেরিফের সাহায্যের হাতও আমাদের পরিবারের উপর থেকে উঠে যাবে! ফ্রেডার কথার যুক্তি থাকলেও আমি আতঙ্কে চোখে অন্ধকার দেখছিলাম। শুষ্ক স্বরে ওকে জিজ্ঞেস করলাম,
– তাহলে?
উইসকনসিন থেকে তুমি এমা’কে নিয়ে এসো, তারপর ওর যথাবিহিত ব্যবস্থা করতে হবে …! আমি বোকার মত মাথা নাড়লেও আমার হাত পা অবশ হয়ে যাচ্ছিল। দীর্ঘ আঠেরো বছর আগে উইসকনসিন থেকে আমাদের দৈন্যদশা ঘোচাতে হ্যারোতে চাকরি নিয়ে আসার সময় আমার চিররুগ্ন, অসুস্থ পাঁচ বছরের এমাকে ঘুমন্ত অবস্থায় আমরা স্বামী-স্ত্রী নির্দয়ীর মত ঘরের পিছনের আন্ডারগ্রাউন্ড চেম্বারে বন্ধ করে দিই, কাকপক্ষীও টের পায় না। বেচারী বুঝতেও পারেনি ওর সঙ্গে কী হচ্ছে। আমি প্রথমে রাজি না হলেও ফ্রেডা আমায় বোঝায়, এমা, আজ নাহয় কাল মরেই যাবে। ওর অসুখের চিকিৎসা নেই। ওকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলে যা কিছু রোজগার করব সবটাই ওর চিকিৎসায় খরচ হয়ে যাবে। হ্যারোতে আসার সময় ছোট্ট জুলিয়ানকে বলেছিলাম এমা হারিয়ে গেছে। এরপর কোনোদিন আমরা ওর কথা আলোচনা করিনি। আমাদের জীবন থেকে ওর অস্তিত্ব মুছে ফেলেছিলাম।
পরদিন একটা বস্তা নিয়ে উইসকনসিনে রাতের অন্ধকারে পৌঁছালাম। ইচ্ছা ছিল চেম্বার থেকে সকলের অগোচরে ওর ছোট্ট কঙ্কালটা তুলে নিয়ে যাব, তারপর হ্যারোতে বেরিয়াল করব। একটা ছোট টর্চ নিয়ে, চেম্বারের ঢাকনা খুলে কাঁপাকাঁপা পায়ে সিঁড়িগুলো দিয়ে নিচে নামলাম। অন্ধকারে চোখ মোটামুটি সয়ে গেলে স্মৃতির উপর নির্ভর করে যেই কোণে এমাকে শুইয়ে দিয়েছিলাম। সেদিকে টর্চের আলো ফেললাম আর ঠিক সেই মুহূর্তেই আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল, ফুলফুল ছোপের আমার গায়ের ফ্রকটা একদন অটুট আর সেই ফ্রকের দিক থেকে মিহি স্বর ভেসে এল,
– পাপা, তুমি এসেছ! সেই যখন থেকে ঘুম ভেঙেছে দেখি এই অন্ধকারে আটকে গিয়েছি। খুব খিদে পেয়েছে পাপা, নিঃস্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। আমায় এখান থেকে নিয়ে চল না গো, আমি একদম তোমাদেরকে জ্বালাতন করব না…!
