micro-story-maa-ab

মা

অ্যাঞ্জেলিকা ভট্টাচার্য

আমার একটা রথ ছিল। আসলে রথটা দিদির ছিল। হাত ঘুরে আমার কাছে এসেছিল। রথের একটা চাকা ছিল না। তাই এক জায়গায় দাঁড়িয়েই থাকত। কিছুতেই অন্য রথের মতো গড়গড় করে এগিয়ে যেত না। আমার অবস্থাটাও এখন তেমন হয়েছে। এক জায়গায় আটকে গেছি। কিছুতেই এগোতে পারছি না। শহর ছাড়িয়ে যে নদী সে চিরকাল অভাগা আমার মতো। গ্রীষ্মের তৃষ্ণার্ত পথিককে সে জল দিতে পারে না। অথচ গর্ভবতী মেঘের জন্য আঁচল পেতে রাখে। তার খেয়াল থাকে না দু’ ধারের সন্তানদের কথ। ভেসে যায় ঘর বাড়ি গ্রাম। সেবার মৃত গরুর ভাসমান দেহ দেখে বমি পেয়ে গেছিল। তাহলে নদীর নাম দামোদর কেন?

সন্তান ধারনের ক্ষমতা নেই আমার। লোকে আমায় বাঁজা লক্ষ্মী বলে। শেষ পর্যন্ত নামটা উবে যাবে। লোকে আমায় বাঁজা মেয়ে মানুষ বলেই পরিচয় দেবে। আমায় বিয়ের শুভ কাজে ডাকে না। সাধের বাড়িতে পোয়াতি বউ আমার ছায়া এড়িয়ে চলে। যদিও সেখানে ডাক পড়ে না।  অন্নপ্রাশনের ভাত মুখে খোকা খিলখিল করে হাসলে আমি ভাবি দুচোখ ভরে দেখব। কিন্তু তার আগেই কানের কাছে কেউ বলে বাঁজা মেয়ে মানুষের নজর ভালো না।

সেই বাঁজা লক্ষ্মীর একটা কাজ জুটেছে। শহরের বাবুর বাড়িতে তার পাঁচ বছরের সন্তানকে সারাদিন রাত দেখতে হবে। বাচ্চাটা জড় বস্তুর মতো সারাদিন বিছানায় পড়ে থাকে। কথা বলতে পারে না। খালি ড্যাবড্যাব করে দেখে। কিন্তু দেখতে কৃষ্ণ ঠাকুরের মত।

বাচ্চাটার নাম সৃজন। লক্ষ্মী এই নাম উচ্চারণ করতে পারে না। সে ডাকে সাজু বলে। ডাকলে তো এমনিতেও কোন সাড়া দেয় না। তবু লক্ষ্মী তার বাড়ির কথা তার ছেলেবেলার কথা অনর্গল বলতে থাকে। কোনো প্রতিউত্তর আশা করে না। আসলে চুপ থেকে সারাদিন কাজ করলে লক্ষ্মী মরে যাবে। জীবনে কিছু রয়ে যায় সে তো কথা। এখানে লক্ষ্মীর বেশ আরাম। নিজের টালির ঘরের কথা মনে পড়লে কষ্ট হয়। গরমের দিনে গরম বাতাসের দাপটে তার যেন দম নিতেও কষ্ট হত। ফ্যানের হাওয়া থেকে আগুন ঝরত। এখানে সাজুর ঘরে রাতদিন এসি চলে। এখানে তাকে বাঁজা বলে খোটা দেওয়ার লোক নেই। স্বামীর হাতে মার খাওয়ার ভয় নেই।

এখন লক্ষ্মী যেন সাজুর মা। প্রায় দুবছর হতে চলল। সাজু এখন লক্ষ্মীর গায়ের গন্ধ চেনে। বৌদির ছুটি থাকলেও তার হাতে খেতে চায় না। লক্ষ্মীর মতো এমন গল্পের ঝাঁপি নিয়ে বসার সময় নেই সাজুর মায়ের। একদিন দাদাবাবু বলেছিল লক্ষ্মী তুই জন্ম না দিলেও তুই সৃজনের মা।

লক্ষ্মী সকাল হলেই ডাকে – “সাজু এবার উঠে পড়। আমরা মাঠে দৌড়তে যাব। কালিবুরির দিঘিতে সাঁতার কাটতে যাব। আসার পথে তাল কুড়িয়ে নিয়ে আসব।আমাদের সাজু তালের বরা খাবে। সাজু এসব বোঝে কিনা লক্ষ্মী বুঝতে পারে না। কিন্তু চুপ করে গেলেই মুখ থেকে অদ্ভুত আওয়াজ করতে থাকে।

লক্ষ্মী সাজুর সঙ্গে কথা বলতে বলতে পৌঁছে যেত অন্য জগতে। সেখানে লক্ষ্মী মুক্ত বিহঙ্গ। বাগানে ছুটে বেড়ায়। নদীতে মাছ ধরে। বালির চরে চড়ুইভাতি করে। লক্ষ্মী আর নিঃসন্তান নয়। সে সাজুর মা। “সাজু, সাজু আয় মায়ের কাছে দৌড়ে আয়। ওই যে, ওই ঢিপির উপর আমাদের উঠতে হবে। সামনেই রথের মেলা। একটা নতুন রথ কিনব। সাজু আর আমি সেই রথ টানব।”

কথাগুলো শুনে সাজুর চোখগুলো উজ্বল হয়ে উঠত। লক্ষ্মীর মনে হত সাজু হাসছে। বউদিমনিকে ডেকে লক্ষ্মী বলত “সাজু আমার সব কথা বুঝতে পারে। দেখো কেমন হাসছে!”

বউদিমনি ম্লান মুখে বলত “প্যাস্টিক চাইল্ড। নারে তোর কথা বোঝার ক্ষমতা নেই ওর।”

বউদিমনি চলে যাবার পর সাজুর কানে কানে লক্ষ্মী বলতো “এটা আমাদের দুজনের গোপন কথা। অন্য কারোর জানার দরকার নেই।

কয়েক বছর বেশ কাটল। কিন্তু সেই যে নিউমোনিয়াতে ধরল সাজুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হল। পনেরদিন পর ডাক্তার জবাব দিয়ে দিল। সাজু আর ফিরল না। এই বাড়িতে লক্ষ্মীর দরকার ফুরিয়ে এলো। লক্ষ্মীর কল্পনার আকাশ আবার হারিয়ে গেল। মনে হল বুঝি সে নিজের ছেলেকে হারিয়েছে। তার রথের চাকা আজ আবার থমকে গেল।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *