অফবিট
সাথী সেনগুপ্ত
জায়গাটার নাম পানবু দারা। নাহ্, আমি আগে এর নাম শুনিনি। সে অবশ্য আমারই অজ্ঞানতার কারণে। তবে আজকাল ব্লগারদের দৌলতে অফ-বিট পাহাড়ি জায়গাগুলোর কথা আপনারা অনেকেই জানেন। যাই হোক, আমার অজ্ঞানতার অপরাধের জন্য মার্জনা চেয়েই লেখা শুরু করি।
আমরা চারজন তথাকথিত ‘বরিষ্ঠ নাগরিক’ হাওড়া স্টেশন থেকে শতাব্দী এক্সপ্রেসে চেপে যাত্রা শুরু করি। এন জে পি গিয়ে পৌঁছলাম রাত প্রায় পৌনে এগারটা নাগাদ। আগে থেকে বুক করা ছিল স্টেশনের এসি রিটায়ারিং রুম। সেখানে রাত্তিরটা কাটিয়ে সকালে পূর্ব নির্ধারিত গাড়িতে চেপে যাত্রা শুরু করি পানবুর উদ্দেশ্যে। পুরো নাম পানবু দারা। দারা শব্দের অর্থ পাহাড়। কালিম্পং জেলার ইয়াংমাকুম গ্রামের অন্তর্গত এই পানবু দারা ভিউ পয়েন্ট। আমাদের এই ‘বেরু বেরু’র মূল উদ্যোক্তা আমার নন্দাই (আমার খুড়তুতো ননদ নূপুরের স্বামী) শ্রীযুক্ত চন্দ্রনাথ ব্যানার্জি। আমরা সঙ্গী সাথীরা হলাম আমি ,অনিন্দ্য এবং নূপুর।
পাহাড়ি আঁকাবাঁকা চড়াই উতরাই পেরিয়ে আমরা দুপুর একটা নাগাদ পৌঁছলাম পানবুর মঞ্জুশ্রী রিট্রিটে। এটি একটি হোমস্টে। গাড়ি একদম হোমস্টের দুয়ার পর্যন্ত যায়। গাড়ি থেকে নেমে এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি হল। চারপাশে উঁচু উঁচু পাহাড় শ্রেণি বেষ্টিত খোলামেলা ফুলে সাজানো হোমস্টেটিকে দেখলে যেমন মন ভাল হয়ে যায়, তেমনি প্রচুর লোকজনের ভিড় দেখে রীতিমত হতাশ বোধ করি। আপনারা আমাকে অসামাজিক ভাবতেই পারেন। কিন্তু বিশ্বাস করুন শহরের ভিড় এড়িয়ে কয়েকটা দিন শান্ত নিরিবিলি পাহাড়ি প্রকৃতির মাঝখানে কাটাব বলেই এখানে এসেছিলাম। সেখানে এত লোকজনের গ্যাঞ্জাম, হিন্দি গানের সঙ্গে লম্ফ ঝম্প করে নাচ, রিল তৈরির উদ্যোগ মুহূর্তে মনটাকে তিক্ত করে তুলল। রিসেপশানে জানাল – চল্লিশ জনের একটা গ্রুপ এসেছে তাই মূল বাড়িটার সব ঘরগুলিই ভর্তি। আমাদের ওরা এক ধাপ নেমে গিয়ে যে ছড়ানো জমিটা আছে, সেখানে ছটি ছবির মত কটেজ আছে, সেই কটেজগুলির দুটিতে জায়গা দিল। নিচের ধাপটাতে যাওয়া আসা করতে বেশ কিছু সিঁড়ি ভাঙতে হয়। আমার যেহেতু পায়ের অসুবিধে আছে, তাই সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট। সেকারণে আমাদের প্রধান উদ্যোক্তা চন্দ্রনাথ রিসেপশানে বার বার ওপরেই একটা রুমের জন্য অনুরোধ জানাল। ওরা একটা রুম ওপরে ও একটা কটেজ নিচে দিতে রাজি হল। আমি আস্তে আস্তে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলাম। কটেজগুলো দেখে মন ভরে গেল কটেজের বারান্দার সামনে নানারকম ফুলে সাজানো ছোট্ট বাগান। বাগানে চেনা অচেনা নানারকম ফুলের সমারোহ। ছোট বড় নানা রকম শেডের গাঁদা যেমন আছে তেমনি রয়েছে টকটকে লাল রঙের আজালিয়া। গোলাপের মত দেখতে এই ফুলটির সঙ্গে নতুন পরিচয় হল। জানলাম এই ফুলটি রডোডেনড্রন গ্রুপেরই একটি প্রজাতি। আর সামনে ৩৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত দৃশ্যমান অসাধারণ প্রকৃতি। উদার উজ্জ্বল নীল আকাশ, ঝলমলে রোদে ঢাকা ছড়ানো উপত্যকা, চারপাশে ঢেউয়ের মত অসংখ্য পাহাড়। আকাশে খণ্ড খণ্ড সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। কটেজের পেছনে কোনাকুনি দিকে মেঘের সরে ঢাকা আবছা কাঞ্চনজঙ্ঘা – সব মিলিয়ে এক অপার্থিব মায়াবী জগৎ । সবচেয়ে বড় কথা – চারিদিক শুনশান, শান্ত, নিরিবিলি, লোকজনের কোলাহল একেবারে নেই। চন্দ্রনাথ বলল – ‘তাহলে তুমি আর ছোড়দা ওপরের ঘরে থাকো, আমি আর নূপুর এখানেই থাকি।’ আমি পুরোপুরি বেঁকে বসলাম। চারজনে বেড়াতে এসেছি, আমরা পাশাপাশিই থাকব। তাছাড়া এই জায়গাটার অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেন দুহাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরেছে। ওপরটা যতই সুসজ্জিত এবং সুবিধাজনক হোক ওখানে থাকতে চাই না। সুতরাং কটেজই হোক আগামী দুদিনের বাসস্থান। ছটা কটেজের মধ্যে দুটোতে আমরা আছি, চারটে পুরো ফাঁকা। অনিন্দ্য বলল – ‘বাঃ , দুটো নিলে চারটে ফ্রি।’
জিনিসপত্র রুমে রেখে আমরা সিঁড়ি বেয়ে ডাইনিং হলে গিয়ে মধ্যাহ্ন ভোজ সারলাম। চমৎকার বাঙালি রান্না। ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নিতে নিতে ঝুপ করে সন্ধ্যা নামল। চমৎকার সূর্যাস্ত দেখা মিস করলাম। ওরা চা আর স্ন্যাক্স ঘরে ঘরে পৌঁছে দিল। আমাদের খাওয়া দাওয়া আড্ডা চলতে লাগল। কটেজের সামনে পেছনে দুদিকেই ব্যালকনি আছে। ঘরের মধ্যে তিনজন থাকার ব্যবস্থা। মাঝখানে একটি ডাবল বেড আর পেছনের জানালা ঘেঁসে একটি সিঙ্গল বেড। সেখানে শুয়ে শুয়ে পরিষ্কার কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়।
চারদিকে অন্ধকার নেমে এসেছে। দূরে দূরে পাহাড়ি গ্রামগুলোয় বিন্দু বিন্দু আলোর টিপ, ঝকঝকে পরিষ্কার আকাশে অজস্র তারা এবং পূর্ণ চন্দ্র। চারপাশে হালকা কুয়াশার সঙ্গে জ্যোৎস্না মিলিয়ে অপরূপ মায়া সৃষ্টি করেছে। ঠাণ্ডা পড়েছে, গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে বাইরের প্রকৃতিকে অনুভব করছি। ওপরে স্পিকার লাগিয়ে গান বাজনার আওয়াজ হালকা ভাবে আসছিল। ভাগ্যিস আমরা ওপরে নেই। ওরা রুমে খাবার দাবার দিয়ে গেল। হোমস্টের সেট মেনু কিন্তু অত্যন্ত সুস্বাদু ।
পরদিন ভোরবেলা আরও বিস্ময় বাকি ছিল। ‘প্রভাত হল যেই কী জানি হল এ কী! / আকাশ পানে চাই কী জানি কারে দেখি!’ আমার এমনিতেই ভোর বেলা ঘুম ভেঙে যায়। আজও ব্যতিক্রম নয়। জানালার পর্দা ভেদ করে আবছা আলো আসছে। দরজায় মৃদু করাঘাত যেন শুনলাম। ধড় মড় করে কম্বল সরিয়ে লাফিয়ে উঠে দরজা খুলি। বাইরে হিমেল হাওয়া। রাত পোশাকের ওপর চাদর জড়িয়ে বাইরে আসি। তখনো পরিষ্কার সকাল হয়নি। আমার সঙ্গী সাথীরা কান মাথা মুড়ি দিয়ে বাইরে। ওরাই দরজায় নক করেছিল। অনিন্দ্যও ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। সামনের ধূপছায়া রঙ আকাশটায় কোন এক অজানা শিল্পী মোটা তুলি দিয়ে লাল হলুদে মেলানো রঙে একটা পাড় এঁকে দিয়েছে। এখানে দাঁড়িয়ে ৩৬০ ডিগ্রি এঙ্গেলে পুরো আকাশের রূপটাই দেখা যায়। আকাশে তখনও শুকতারাটি সঙ্গে নিয়ে চাঁদ বিদ্যমান। বিপরীত দিকে কোনাকুনি ভাবে দেখা যাচ্ছে তুষার ধবল কাঞ্চনজঙ্ঘা। ধীরে ধীরে ‘জবাকুসুম সঙ্কাসং’ সূর্য উঠল। সূর্যের লাল রঙের ছোঁয়ায় রক্তিম হয়ে উঠেছে কাঞ্চনজঙ্ঘা। রক্ত বিন্দু থেকে ক্রমশ বৃহত্তর হতে থাকা সূর্যোদয়ের ঐশ্বরিক মুহূর্ত দেখার অভিজ্ঞতা মানুষের জীবনে কমই আসে। এমনই একটি অবর্ণনীয় ব্রাহ্ম মুহূর্তের সাক্ষী থাকলাম আমরা। মোবাইলের ক্যামেরায় পর পর ছবি উঠল। কিন্তু যত শক্তিশালী যন্ত্রই হোক জৈবিক চোখ দিয়ে যা দেখলাম তাতে নবকুমারের মত শুধু এটুকুই বলতে পারি – ‘আহা, কী দেখিলাম! জন্ম জন্মান্তরে ভুলিব না।’
বেলা বাড়ল। ঝলমলে রোদে কাঞ্চনজঙ্ঘা রঙ বদলে ঝকঝকে সোনালি। দেখে মনে হল কোন এক তপ্ত কাঞ্চন বর্না নারী অলসভরে পাটা সামান্য ভাজ করে আধশোয়া হয়ে আছেন। আজ ব্রেকফাস্টের পর, লাঞ্চ প্যাক করে নিয়ে সাইট সিইং করতে বেরোব। কিন্তু আমার ইচ্ছে করছিল না। মনে হচ্ছিল সারাদিন কটেজের পেছনের ব্যালকনিতে বসে, কিংবা জানালা ঘেঁষা বিছানায় আধ শোয়া হয়ে চায়ের কাপটি হাতে নিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ দেখে কাটিয়ে দিই। কিন্তু জনমতকে মান্যতা দিয়ে আমরা গাড়ি নিয়ে বেরোলাম। ওখান থেকে আমরা গেলাম লাভা, লোলেগাঁও আর রিষপ। কোন জায়গায় রাত্রিবাস না করলে সেই জায়গার মাধুর্য পুরোপুরি আস্বাদন করা যায় না। লাভা, লোলে গাঁও আগেও গেছি। রিসপ এবারই গেলাম। কিন্তু সবটাই বুড়ি ছুঁয়ে আসা। প্রাপ্তি শুধু পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে ঘন পাইন বনের প্রকৃতি দেখতে দেখতে পথ চলা। পথের দুপাশে অজস্র বুনো ফুল। বিকেলে যখন ফিরলাম তখন সূর্যাস্ত হয়ে গেছে।
পানবুতে আমরা পাব আরও একটি সকাল। সন্ধ্যেটা নিজেদের মধ্যে গল্পগাছায় কাটালাম। আমাদের সৌভাগ্য পরদিন সকালটাকেও একই ভাবে পেলাম। আবার ব্রেকফাস্ট খেয়ে আমদের যাত্রা। গন্তব্য দার্জিলিং। তবে সে গল্প এখানে করছি না। গাড়িতে উঠতে গিয়ে মনে হল – ‘আবার আসিব ফিরে।’
