travel-robithakur-okampo

রবিঠাকুর, ওকাম্পো ও মেসির আর্জেন্টিনায়

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

Ocampo Grave

 

আমরা চলেছিলাম চিলি থেকে আর্জেন্টিনায়। সান্তিয়াগো বিমানবন্দর থেকে সকালবেলার ফ্লাইটে ঘন্টা তিনেক লাগল বুয়েনোস আইরেস পৌঁছতে। হাতে মাত্র দু’টো দিন। আমাদের রাত ছোটো, তামাশা বড়। কাজেই হোটেলে চেক-ইন করব কী পথেই পড়ল এক মিউজিয়াম Casa Victoria Ocampo। সে সময়কার কলোনিয়াল স্থাপত্যের প্রচলিত ধারা থেকে সম্পূর্ণ সরে এসে আধুনিক রীতিতে অতি সাধারণ একটি বাড়ি নির্মাণ করিয়েছিলেন রবীন্দ্রভক্ত ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। সেখানে আমাদের অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের মতই সাহিত্য-শিল্পকলার আঁচ দেখলাম। আর্জেন্টিনার নারীবাদী বুদ্ধিজীবি, লেখিকার মিউজিয়াম এটি। এবাড়িতে ভিক্টোরিয়া নিয়মিত থাকলেও এখানে রবিঠাকুরের পায়ের ধুলো পড়েনি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গ এলেই ভিক্টোরিয়া ধন্য আর্জেন্টিনার এই স্থান যে কতখানি মাহাত্ম্যে ভরপুর তা কেবল বাঙালিরাই বুঝবে। হালকা ঠান্ডা। বাস থেকে নেমে প্রবেশদ্বারে। বাড়ির সামনে ছবি তুলেই মিউজিয়ামের ভেতরে। ঢুকতে ঢুকতে প্রশ্ন করলাম…

‘হে বিদেশী ফুল, যবে আমি পুছিলাম, ‘কী তোমার নাম’’।

সেখানে ওকাম্পো ব্যবহৃত অনেক জিনিসপত্র রাখা আছে সযত্নে। শুনেছিলাম তাঁদের মধ্যে চিঠি আদানপ্রদানের কথা। সেখানে প্রচুর চিঠিপত্র রাখা আছে তবে ইংরেজিতে লেখা চিঠি একটিও চোখে পড়ল না। সব স্প্যানিশ ভাষায় লেখা।

মাথায় কেবলি ঘুরছিল ‘পুরবী’ কাব্যগ্রন্থ। রবীন্দ্রনাথের প্রশ্ন ছিল যাকে নিয়ে সেই বিদেশী ফুলের কথা…

‘হে বিদেশী ফুল, যবে তোমারে শুধাই ‘বলো দেখি মোরে ভুলিবে কি’’

হ্যাঁ, ৬ নভেম্বর, ১৯২৪-এ ৬৩ বছরের রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় জাহাজ পৌঁছেছিল বুয়েনোস আইরেস বন্দরে। ভগ্নস্বাস্থ্যের কবি তখনও জানতেন না, দশ বছর ধরে তাঁর জন‌্য অধীর অপেক্ষারত এক মহিলা যিনি ছিলেন এই বাড়ির মালকিন। এই বাড়ির নকশা করেছিলেন স্থপতি আলেহান্দ্রো বুস্তিয়ো আর এখানেই ভিক্টোরিয়া সম্পাদিত ‘সুর'(Sur) পত্রিকাটির জন্ম। 

‘নোবেল প্রাইজে ভূষিত ‘গীতাঞ্জলি’ কাব‌্যগ্রন্থের অনুবাদ পড়ে যিনি অনুরাগী হয়ে উঠেছিলেন ভারতীয় রবীন্দ্রনাথের। আর ভারতীয় কবির সাহিত্যে এহেন নোবেল প্রাপ্তিতে সুদূর আর্জেন্টিনাতেও আলোড়ন ফেলেছিল তার ইংরেজি অনুবাদ ‘Song Offerings’। সংবাদপত্রের পাতায় রবীন্দ্রনাথের ছবিও দেখেছিলেন সেই আর্জেন্টিনার তরুণী। ইংরেজি, স্প্যানিশ, ফরাসি সব অনুবাদের মধ্যে আঁদ্রে জিদের ফরাসি ভাষায় গীতাঞ্জলির অনুবাদ ছিল তাঁর প্রিয়। রবীন্দ্রনাথের লেখা তাকে এতটাই ছুঁয়ে গিয়েছিল যে, ‘La Nacion’ পত্রিকায় ‘La alegría de leer a Rabindranath Tagore’ বা ‘রবীন্দ্রনাথ পড়ার আনন্দ’ নামে বিখ্যাত প্রবন্ধ লিখে ফেলেছিলেন এই মেধাবী সাহিত্যিক।

 

Ocampo House

 

‘আমার মাঝে তোমার লীলা হবে / তাই তো আমি এসেছি এই ভবে।’

এই দু’টি লাইনের স্প‌্যানিশ অনুবাদে চোখ আটকেছিল ভিক্টোরিয়ার ঈশ্বরহীন মন। ঈশ্বরে বিশ্বাসী রবীন্দ্রনাথের লেখায় ধাক্কা খেয়েছিলেন তরুণী। আর যতই এগোলেন গীতাঞ্জলির অভ্যন্তরে ততই রবীন্দ্রনাথকেই অলক্ষ্যে নিজের অদেখা নিভৃত প্রাণের দেবতা বলে মেনে নিলেন। কলকাতার ৪৯তম বইমেলায় থিম দেশ হিসাবে আর্জেন্টিনা গতবারেই ফিরিয়ে দিয়েছিল সেই গভীর স্মৃতি। বইমেলা সরগরম হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ এবং ওকাম্পো নিয়ে আলোচনাচক্রে।

রবিঠাকুর ও ওকাম্পো স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে হোটেলে চেক-ইন করে মালপত্র রেখে শহরের ম্যাকডোনাল্ডসের চিকেন বার্গারে কামড় দিয়েই ঝটিতি শুরু হল সিটি ট্যুর।

প্রথমেই গিয়ে বাস থামল এক বিশাল সেমেটারিতে। সেখানে সরকারিভাবে আর্জেন্টিনার নামীদামী বিখ্যাত মানুষ থেকে মূলত প্রভাবশালী ধনী ব্যক্তিদের পারিবারিক সমাধিক্ষেত্র অত্যন্ত সুন্দরভাবে সংরক্ষিত। যেমন স্থাপত্য তেমনি নজরকাড়া সংরক্ষণ। বংশপরম্পরায় পূর্বতনদের স্মৃতি আঁকড়ে উত্তরসুরীরা বিশেষ দিনে এখনও ফুল, মোমবাতি রেখে যায় সেখানে। হয়ত এখনও সেই স্থানে বিদেহী সব আত্মারা ঘুরে বেড়ায় নির্জনে। নিস্তব্ধ পরিবেশে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, ইতিহাস যেন এখনও এই সমাধিক্ষেত্রের প্রতিটি কোণে নীরবে বেঁচে আছে। অলিগলির ভেতরে দিয়ে সবুজ গাছগাছালি পরিবেষ্টিত এই অঞ্চলটির মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে আমরা ঠিক সেমেটারির ম্যাপ দেখে হেঁটে পৌঁছাই আমাদের সেই চিরচেনা বিদেশী ফুলের সমাধিক্ষেত্রটির দিকে। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো সহ তাঁর পরিবারের সকলের স্মৃতিসৌধটির ছবি তুলি। ছায়াসুনিবিড় Rekoleta সেমেটারিতে গিয়ে আবারও স্মরণ করি তাঁকে ও আমাদের রবিঠাকুরকে। দীর্ঘ জাহাজযাত্রার পর অসুস্থ রবীন্দ্রনাথকে নিজের হাজারও পারিবারিক ঝড়ঝাপটা সত্ত্বেও বুয়েনোস আইরেসের প্লাজা হোটেল থেকে এনে তিন মাসের জন্য এক ভাড়াবাড়িতে রেখে সুস্থ করে তুলেছিলেন যিনি।

আর্জেন্টিনার হাওয়ায় তখন হালকা শীতের পরশ। আর পথেঘাটে মেপল, জারকান্দা গাছের পাতায় বসন্তের হলুদ রঙ। তাদের পাতা খসানোর সময় শুরুর মরশুম। এগিয়ে চলি মারাদোনা ও মেসির শহরের সেই বিখ্যাত ফুটবল স্টেডিয়ামকে এক ঝলক দেখে নিতে। শহরের দেওয়াল জুড়ে এক রঙিন গ্র্যাফিতির মাদকতা। প্রতিটি দেওয়াল যেন এক এক শিল্পসত্তায় স্বমহিমায় বিকশিত। আনাচেকানাচে কোনও আবর্জনা নেই। Plaza de Mayo চত্বরে বড় বড় সরকারি আপিস, কাছারি।

বড় রঙচঙে সে শহর। কিন্তু বড়ই দৃষ্টিনন্দন। ক্যাফে, পিৎজেরিয়া, রেস্তোরাঁর বারান্দায় ফুটবল প্লেয়ারদের নীল সাদা জার্সিতে বড় বড় মূর্তি বসানো। একটি ক্যাফে কাম লোক্যাল হ্যান্ডিক্রাফটের দোকানে ঢুকে পড়ি আমরা। এখানকার জনপ্রিয় লোকাল স্ন্যাকস এমপানাদায় কামড় দিই ক্যাপুচিনোর সঙ্গে। এমপানাদা অনেকটাই আমাদের সিঙাড়ার মত। পেরাকির মত অর্ধচন্দ্রাকার এই পেস্ট্রি ল্যাটিন আমেরিকা, স্পেন এবং পর্তুগিজ সংস্কৃতির খাবার। ময়দা বা ভুট্টার গুঁড়ো দিয়ে তৈরি খাস্তা ডো’র মধ্যে মাংস, চিজ বা সবজীর পুর। কখনও ডিপফ্রায়েড বা বেকড। বেশ লাগে বেকড এমপানাদায় কামড় দিয়ে।

 

Ocampo House

 

ক্রমশঃ এগিয়ে চলি বুয়েনোস আইরেসের প্রাচীনতম ও ঐতিহ্যবাহী এলাকা সান টেলমোয়। ঔপনিবেশিক স্থাপত্য, কবলস্টোন রাস্তা, বোহেমিয়ান আবহ আর ট্যাঙ্গোর ছন্দে ভরপুর এই পাড়া যেন শহরের অতীতকে আজও বাঁচিয়ে রেখেছে। রেস্তোরাঁ, কফিশপ আর শিল্পীদের আনাগোনায় মুখর সেই পরিবেশ ছেড়ে অল্প এগোতেই পৌঁছে গেলাম ঐতিহ্যবাহী বন্দরাঞ্চল লা বোকায়। আর সেখানেই চোখে পড়ল বুয়েনোস আইরেসের বিখ্যাত রঙিন গলি—ক্যামিনিতো।কবলস্টনের পুরনো রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলি। এক দোতলা বাড়ির বারান্দায় হাত নাড়ছেন আর্জেন্টিনার আইকনিক থ্রি মাস্কেটিয়ার্স… দিয়েগো মারাদোনা, ইভা পেরন এবং আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ট্যাঙ্গো গায়ক-সুরকার কার্লোস গারদেল (Carlos Gardel)। আর্জেন্টিনার সংস্কৃতির তিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। মারাদোনাকে ঘিরে যেমন ফুটবলের আবেগ ইভা পেরন বা Evita আর্জেন্টিনার রাজনীতিতে ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অধিকার লড়াইয়ের প্রতীক আর ঐতিহ্যবাহী ‘ট্যাঙ্গো’ (Tango) সঙ্গীত ও সংস্কৃতির বিশ্বখ্যাত কার্লোস গারদেল।

La Boca র Caminito গলির সেই ক্যাফে বারের দোতলার বারান্দা থেকে এই তিনজনের মূর্তি একসঙ্গে পর্যটকদের উদ্দেশ্যেই হাত নেড়ে ওয়েলকাম করার।

কী শৈল্পিক চিন্তাভাবনা! বাড়িঘরের উজ্জ্বল রঙ। কিন্তু মোটেও চক্ষুশূল নয় বরং আরামদায়ক।

La Boca-র Caminito যেন একটি স্ট্রিট মিউজিয়াম। এখানে বসে রাস্তার শিল্পীরা ছবি আঁকেন। আবার কিছুদূর যেতে খোলা প্রান্তরে সারেসারে চিত্রশিল্পীদের প্রদর্শনী। এমন ওপেন আর্ট দেখিনি কোনোদিন। কেনাকাটিও করা যায়। অ্যান্টিক জিনিসপত্রও বিক্রি হচ্ছে। তবে সাধ্য থাকলে কেনা যাবে।

আর এরপরেই আমাদের বহু প্রতীক্ষিত প্লাতা নদীর রিভার ক্রুজ। এবার এগিয়ে চলি Puerto Madero র দিকে। এই পথ দিয়েই বুয়েনোস আইরেসের প্রধান বন্দরের দিকে যাওয়া যেটি সংযুক্ত প্লাতা নদীর সঙ্গে। বিশাল সে নদী! বুয়েনোস আইরেসের এই আধুনিক ওয়াটারফ্রন্ট এলাকার নাম Puerto Madero। সেখান থেকেই বিভিন্ন ধরণের বোট ট্যুর এবং ক্রুজ পরিচালনা করা হয়। প্লাতা নদীর ওপর থেকে শহরের চমৎকার স্কাইলাইন দেখার জন্য আদর্শ স্থান এটি। প্লাতা নদীর ওপর জাহাজে ভেসে সূর্যাস্ত দেখার টিকিট কাটাই ছিল আগে থেকে। জেটির ওপর উঠে গিয়ে জাহাজের ডেকে শান্তিতে নিজের আসন গ্রহণ করে এক দৃষ্টে নদীর দিকে চেয়ে থাকি। কখন আর্জেন্টিনার পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুববে সেই মুহূর্তের অপেক্ষায়। আর নাকে আসে আবারও সেই ৩৪ বছরের বিদেশী ফুলের ঘ্রাণ। এই সেই প্লাতা নদী যার ধার দিয়ে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো হয়ত কোনও এক গোলাপী কুয়াশার ভোরে রবিঠাকুরকে নিয়ে হেঁটেছিলেন। কেউ বলেন, নিজের গয়না বিক্রি করে এই প্লাতা নদীর ধারেই সান ইসিদ্রোয় ওকাম্পো ভাড়া করেছিলেন ‘মিরালরিও’ নামের এক বাগানবাড়ি। নদীতীরের বাসভবন মিরালরিওর অর্থ ‘স্রোতস্বিনীকে দেখা’। রবীন্দ্রনাথের চিকিৎসা থেকে নিজের হাতে সেবাযত্ন করেছিলেন সেই বাড়িতেই। ‘পূরবী’-র অনেক কবিতাই সান ইসিদ্রোতে বসেই লেখা। আর এই কাব্যগ্রন্থটি রবিঠাকুর উৎসর্গ করেছিলেন তাঁর বিজয়া বা ভিক্টোরিয়াকেই। কবিপ্রয়াণের কিছুদিন পরে ১৯৬১ সালে ভিক্টোরিয়া লিখেছিলেন ‘Tagore en las barrancas de San Isidro’ নামের স্মৃতিকথন যা কবি শঙ্খ ঘোষ বাংলায় অনুবাদ করেন ‘সান ইসিদ্রোর শিখরে রবীন্দ্রনাথ’ নামে।

 

Maradona Stadium

 

ওকাম্পো পরিবারের নিজস্ব পৈতৃক এবং গ্রীষ্মকালীন বাসভবন ছিল আরেক স্থানে। তাঁর নাম ভিলা ওকাম্পো। মিরালরিওতে থাকার সময় কবি এই ভিলা ওকাম্পোর মাঠে ও বাগানে প্রচুর সময় কাটিয়ে গেছেন। কিছুদিন আগেই গতবছরে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী রবীন্দ্র-স্মৃতিধন্য ‘ভিলা ওকাম্পো’-তে গিয়ে তাঁর আবক্ষ মূর্তিতে মালাও দিয়েছেন। কিন্তু ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সেই মূল বসত বাড়িটিতে আমাদের যাওয়া হল না কারণ সেটি একমাত্র উইকেন্ডে খোলা থাকে।

মাত্র ৫৮ দিনের অসম বয়সের বন্ধুতায়, ভাষার অন্তরায় দূরে সরিয়ে রেখে কবির অনুরাগী এই ‘বিজয়া’ বড়ই আপন করে নিয়েছিলেন তাঁর গুরুদেবকে। শুধু তাইই নয়। লেখার মধ্যে কাটাকুটিকেও শিল্প করে তোলার দক্ষ কারিগর এই রবিঠাকুরকেও উদ্বুদ্ধ করেছিলেন ওকাম্পো। তার ফসল স্বরূপ প্যারিসের পিগ্যাল গ্যালারির আর্ট এক্সিবিশনে বড় ক্যানভাসে রবীন্দ্রনাথের ছবির প্রদর্শনীরও ব্যাবস্থা করে দেন ওকাম্পো। আর সেই ১৯৩০ সালে দু’জনের শেষ দেখা প্যারিসে। তারপরেও চিঠির মাধ্যমে তাঁদের বন্ধুত্ব অটুট ছিল।

তা সেই রিও দে লা প্লাতার ওপরে জাহাজে ভাসমান হয়ে সানসেট ক্রুজে চলেছিলাম। কিন্তু আর্জেন্টিনার দু’টো দিন শয়নে স্বপনে, জাগরণে রইলেন রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো।

বুয়েনোস আইরেস থেকে ৩০০ কিলোমিটার দূরে পারানা নদী। ব্রাজিলের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল থেকে যাত্রা শুরু করে প্যারাগুয়ে ও আর্জেন্টিনার ভেতর দিয়ে গড়িয়ে পারানা এসে মিশেছে রিও দে লা প্লাতায়। আর মিশেছে ফুটবলার মেসির অন্তর আত্মার সঙ্গেও। আজকের মেসির উত্তরোত্তর সাফল্যে সর্বকালের পারানা নদীর বুকও গর্বে প্রশস্ত হয়েছে বারেবারে! পারানার গতিপ্রকৃতি বেশ জটিল। দক্ষিণ আমেরিকার দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী, অ্যামাজনের পরেই যার অবস্থান। দীর্ঘপথের নুড়িপাথরের সখ্যে, নানা দেশ পেরোতে পেরোতে পারানা নদীকে অতিক্রম করতে হয় আরও সব জটিল পথ। ফলে এর প্রবাহ কখনো শান্ত, আবার কখনো প্রবল। ঠিক যেন মেসির জীবনের মতোই। ওঠানামার কঠিন পথ পেরিয়েই মেসি আজ কিংবদন্তি।

জন্মের পর থেকেই পারানা নদীর সঙ্গে যেন মেসির একাত্মতা, এই নদীর বুক চিরেই যেন তাঁর আবির্ভাব। এই নদীর শান্ত জল চিরে জাহাজের চলাচল দেখে কেটেছে তাঁর শৈশব। পারানার সঙ্গে যোগাযোগ শুধু ভৌগোলিক নয়, মেসির মনের মোহনাতেও আত্মসমর্পণ পারানার।

কারণ কিংবদন্তি লিওনেল মেসির উত্তরণের সাক্ষী এই নদী। যার জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই পারানা নদীতীর ঘেঁষা শান্ত রোজারিও শহরে। সেখানেই ফুটবলের হাতেখড়ি আর তাই বুঝি অ্যামাজনের পর দক্ষিণ আমেরিকার দ্বিতীয় দীর্ঘতম এই পারানা নদীকে প্লাস্টিক দূষণ থেকে রক্ষা এবং এর সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ‘Join The Planet’ নামক একটি আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংস্থার প্রথম দূত হিসেবে যুক্ত হন। কোথা দিয়ে কেটে গেল ঘন্টাখানেক সময় সেই প্লাতা নদীর ওপর ভাসমান হয়ে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে। আর একবার ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো তো আরেকবার মেসি অনুষঙ্গ এসে ধরা দিল আমার ভাবনায়।

 

Three Heroes

 

কোথা দিয়ে গোটা একটা ঘণ্টা কেটে গেল সানসেট ক্রুজে। প্লাতানদীর পশ্চিম আকাশে সূর্য তখন আপন মনে রঙ ছড়িয়ে পাটে যেতে ব্যাস্ত। ধীরে ধীরে নেমে আসি জেটি পেরিয়ে নদীর পাড়ে। আবারও বাসে চড়ে আর্জেন্টিনার পথেঘাটে মেপল, পাতার হলুদ রঙের খেলা দেখতে দেখতে ফিরে আসা হোটেলে। সেদিনের মত বিশ্রাম। রাতে বেরোনো হল ডিনার খেতে। আশপাশ ঘুরে দেখতে আর টুকটাক শপিং। সেখানেই আবারও চমক। শ’য়ে শ’য়ে ফ্রিজ ম্যাগনেট, উপহার সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে। একটিমাত্র দোকানে চোখে পড়ল অসামান্য এক আর্ট ওয়ার্ক। চিত্রশিল্পীর সই সহ অরিজিনাল একটুকরো নিখুঁত পেন্টিং এর সূক্ষ্ম আর্ট দিয়ে যে এভাবে ফ্রিজ ম্যাগনেট বানানো যায় তা এই প্রথম চাক্ষুষ করলাম। আর্জেন্টিনার আইকন  সুউচ্চ ওবেলিস্ক থেকে ফুটবলের নীল সাদা ঐতিহ্য, মারাদোনা থেকে ট্যাঙ্গো ডান্স…এমন সব ছবির বিষয়। কিনেই ফেলি তা দেখে।

সেদিন হোটেল থেকে পায়ে হেঁটে শহর দেখতে গিয়ে প্লাজা দে লা রিপাবলিকার সামনেই চোখ পড়েছিল সেই সুউচ্চ এক মন্যুমেন্ট যা এখানকার সবচেয়ে বিখ্যাত জাতীয় ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ এল ওবেলিস্কো (El Obelisco) বা ওবেলিস্ক অব বুয়েনস আইরেস (Obelisco de Buenos Aires)।

পরদিন একটু বেশি রাতেই আমাদের যে টিকিট কেটে রাখা ছিল ট্যাঙ্গো ডান্স শোয়ের। স্বাভাবতই কিউরিওসিটির বশেই ট্যাঙ্গো ডান্সের সেই আইকনিক ছবিটি কিনেই ফেলি।

আরেকটি জিনিস বিক্রি হচ্ছিল সব দোকানে। জিগেস করেও ভাষার কারণে সদুত্তর মেলেনি। দেশে ফিরে বিষয়টি নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়েই জানলাম।

শরীরকে চাঙা রাখতে মেসি এক অদ্ভূত স্ট্র ‘বম্ববিলা’ দিয়ে যে গবলেটে করে নিজের পছন্দের এক ভেষজ পানীয়তে চুমুক দেন তার রেপ্লিকাই ছিল সে দোকানে থরে থরে সাজানো। বড় দাম নকশা কাটা কাঠ ও ধাতু দিয়ে তৈরি সে পাত্রের। বাজালচলতি এনার্জি ড্রিঙ্ক নয়। দক্ষিণ আমেরিকার সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে এই পানীয়ের নাম ‘ইয়ারবা মাতে’ যা এক ধরনের গাছের শুকনো পাতা থেকে তৈরি হয় ঠিক চায়ের মত। ভেষজটির নাম ইয়ারবা আর মাতে হল সেই বিশেষ কাসকেডে ভরা পানীয়।

লাউয়ের শুকনো খোলাকে বিশেষ আকারে কেটে তার সঙ্গে কাঠ, ধাতু মিশিয়ে বিশেষ রকম গড়ন দিয়ে বাইরে চামড়ায় মুড়ে দেওয়া হয় এই পাত্র। সিলিকন ও কাচের নকশা কাটা থাকে পাত্রের গায়ে। মানে কিছুটা থার্মোফ্লাক্সের মতো কাজ করে। আর বিশেষ ধরনের ধাতব স্ট্র বা ‘বম্ববিলা’র নীচের অংশে লাগানো থাকে ছাঁকনি বা ফিল্টার যার সাহায্যে ইনফিউশড হয়ে ছেঁকে সেই পানীয় মুখের মধ্যে ঢোকে।

 

Shoreline Plata

 

ট্যাঙ্গো (Tango) কেবল একটি নাচ নয়, এটি আর্জেন্টিনার ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে। ১৮৮০-এর দশকে বুয়েনোস আইরেস এবং উরুগুয়ের সীমান্তবর্তী অববাহিকায় আফ্রিকান, ইউরোপীয় এবং স্থানীয় সংস্কৃতির মিশ্রণে এই যুগল নৃত্যের উৎপত্তি। শুরুতে এটি নিম্নবিত্ত ও অভিবাসীদের নাচ হিসেবে পরিচিত থাকলেও, পরবর্তীতে এটি বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত মার্জিত এবং জনপ্রিয় শিল্প রূপ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ডান্স শোয়ের আসন সংগ্রহ করতেই পর্দায় ফুটে উঠল এই নৃত্যশৈলীর হালহকিকত। ট্র্যাডিশন মেনে কিছু আদিবাসী নৃত্যের জন্য ঢাক, ড্রাম এমন সব বাদ্যযন্ত্রের অভূতপূর্ব জাগলিংও দেখলাম। সেগুলোও ছিল একসময়ের ট্যাঙ্গোনাচেরই অংশ। তারপর শুরু হল সাহেব বিবিদের ট্যাঙ্গো নাচ।

এই নাচে একজন পুরুষ থাকে লিডার এবং নারী তার ফলোয়ার। লিডার তার আলিঙ্গন এবং শরীরের সামান্য ইশারায় পরবর্তী পদক্ষেপের আমন্ত্রণ জানান, আর ফলোয়ার সেই অনুযায়ী সাড়া দেন। এই হল মূল প্রতিপাদ্য বিষয়।

তবে গভীর মনোযোগ এই নাচের অন্যতম প্রধান শর্ত। ব্যাকগ্রাউন্ডে চলে উদ্দাম মিউজিক। নৃত্যের তালে তালে ছন্দ মিলিয়ে নাচিয়েদের সম্মিলিত এক্সিকিউশন। পোশাকগুলি দেখবার মত। মেয়েরা সাধারণত হাই হিল এবং একপাশে Slit পোশাক পরে যাতে পায়ের দ্রুত ও জটিল মুভমেন্টে হয়। আর ছেলেদের পোশাকে থাকে ফর্মাল স্যুট ও হ্যাট।

নানান প্রকারভেদ আছে এই বিশেষ নৃত্যশৈলীর। আমরা সেদিন যে Tango de Escenario বা স্টেজ ট্যাঙ্গো দেখলাম তাতে অ্যাক্রোবেটিক মুভমেন্ট, শূন্যে লাফ দেওয়া এমন সব কোরিওগ্রাফি ছিল। মধ্যবয়সে এসব দেখলে কেবলি পা হড়কে পড়ে যাবার ভয় করে আমাদের। কিন্তু অভ্যেসে হয়ত সব হয়। এই স্টেজে নিয়মিত গান গেয়ে প্রতিষ্ঠিত এমন এক বৃদ্ধ সঙ্গীতশিল্পী এসে কিছু কথা বললেন আর গানও গাইলেন সেরাতে। ট্যাঙ্গো ডান্স দেখে বাসে করে রাতের বুয়েনোস আইরেসে শহরের ঘড়িওয়ালা স্তম্ভ, আলো ঝলমলে ঝাঁ চকচকে পথঘাটকে শেষবারের মত বিদায় জানিয়ে ফিরে আসি হোটেলে।

রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি, ওকাম্পোর আবেগ, মেসির ফুটবল, ট্যাঙ্গোর ছন্দ আর রিও দে লা প্লাতার নীল জল—সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনা আমার কাছে শুধু একটি দেশ নয়, এক গভীর সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা হয়ে রইল।

 

Obelisk

রবীন্দ্রনাথ, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো এবং লিওনেল মেসির যাবতীয় তথ্যঋণ

পুরবী- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (বিশ্বভারতী)
ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ- শঙ্খ ঘোষ (দে’জ পাবলিশিং)
কবিমানসী- জগদীশ ভট্টাচার্য (ভারবি)
এবং আনন্দবাজার পত্রিকা, সংবাদ প্রতিদিন, বঙ্গদর্শন, ইন্সক্রিপ্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *