bibidho-prokashanar-jogote

প্রকাশনার জগতে বাঙালি কন্যারা 
ফিচার
বিতস্তা ঘোষাল

মানবসভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি সমাজ বিকাশের প্রতিটি স্তরে নারীর অবদান অনস্বীকার্য। সভ্যতার রথচক্রকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ সমান শ্রম ও মেধা ব্যয় করেছেন। কালক্রমে সম্পত্তির ওপর ব্যক্তিমালিকানার উদ্ভব এবং পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বিস্তারের কারণে নারী তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে থাকে। অবদমন, বঞ্চনা ও শোষণের এক দীর্ঘ অমানিশায় ডুবে যায় নারীসমাজ। এই শৃঙ্খল থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় যুগে যুগে নারীরা লড়াই করেছেন, প্রতিবাদ জানিয়েছেন ও সংগঠিত হয়েছেন। প্রাচীন ভারতবর্ষে, বিশেষত দ্রাবিড় সমাজে মাতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রচলন ছিল। সেই সমাজে নারীর প্রাধান্য ও স্বাধীনতা ছিল প্রশ্নাতীত। বংশপরিচয় নির্ধারিত হতো মায়ের দিক থেকে। উৎপাদন ব্যবস্থায়, বিশেষত কৃষি ও পশুপালনে নারীর সরাসরি অংশগ্রহণের কারণে সমাজে তাঁদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বজায় ছিল। বেদে গার্গী, মৈত্রেয়ী প্রমুখ বিদুষী নারীর উল্লেখ পাওয়া যায়।

এরপর বহিরাগতদের আগমনের পর সমাজকাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। গোত্রভিত্তিক সমাজ ভেঙে যখন ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা প্রবল হয়ে ওঠে, তখনই নারীর সামাজিক মর্যাদার অবক্ষয় শুরু হয়। জমির মালিকানা ও উত্তরাধিকার নিশ্চিত করার তাগিদে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ নিজ সন্তানের রক্তের বিশুদ্ধতা রক্ষার নামে নারীকে গৃহের চারদেয়ালে বন্দি করার প্রক্রিয়া শুরু করে। এই অর্থনৈতিক ও সামাজিক পালাবদলের ফলেই নারী পরিণত হন পুরুষের সম্পত্তিতে।

উনিশ শতকে বাংলায় সংঘটিত রেনেসাঁ বা নবজাগরণ বাংলার সমাজজীবনে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে আসে। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, প্রমুখ মনীষীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সমাজসংস্কারের এক নতুন যুগের সূচনা হয়। সতীদাহ প্রথা রদ এবং বিধবা বিবাহ আইন পাসের মাধ্যমে নারীর প্রতি চরম অমানবিকতার আইনি অবসান ঘটে। পাশাপাশি প্রয়োজন হয় মানসিকতার পরিবর্তন ও শিক্ষার প্রসার। এর ফলে ১৮১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘দ্য ফিমেল জুভেনাইল সোসাইটি’ এবং পরবর্তী সময় মেরি অ্যান কুকের নিরলস প্রচেষ্টায় মেয়েদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নারীশিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। শুরুতে কেবল দরিদ্র ও নিম্নবর্ণের মেয়েরাই এসব স্কুলে আসত। সমাজের উচ্চবিত্ত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়েরা পর্দা প্রথা এবং ধর্মান্তরিত হওয়ার ভয়ে শিক্ষা থেকে বঞ্চিতই থেকে যায়। এই অচলায়তন ভাঙতে এগিয়ে আসেন জন এলিয়ট ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বেথুন বালিকা বিদ্যালয় হিন্দু সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়েদের শিক্ষার দ্বার উন্মোচন করে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মদনমোহন তর্কালঙ্কার প্রমুখ বিদ্যানুরাগী নিজেদের কন্যাদের এই স্কুলে পাঠিয়ে সমাজে এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। পরবর্তী সময় বেথুন কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নারীদের উচ্চশিক্ষার পথ প্রশস্ত হয় এবং কাদম্বিনী বসু ও চন্দ্রমুখী বসুর মতো নারীরা স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। একই সঙ্গে গৌরী মায়ের সারদেশ্বরী বালিকা বিদ্যালয়, নিবেদিতার রামকৃষ্ণ সারদা মিশন ভগিনী নিবেদিতা বালিকা বিদ্যালয়, ব্রাহ্মসমাজের উদ্যোগ, বিশেষ করে ‘বামাবোধিনী’ পত্রিকার প্রকাশনা নারীদের নিজেদের কথা বলার ও সাহিত্যচর্চার এক অনন্য প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দেয়।

আর এই পর্বে এসেই আমরা দেখতে পাই সাহিত্য জগতে নারীর অংশ গ্রহণের পাশাপাশি সম্পাদনার কাজেও এগিয়ে আসছেন মেয়েরা। আর সম্পাদনার সূত্র ধরেই অনেকেই প্রবেশ করছেন প্রকাশনার জগতে। প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় স্বর্ণকুমারী দেবীর।

ঠাকুর পরিবারে ১৮৭৭ সালে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ পারিবারিক পত্রিকা ভারতী চালু করেন। এই পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি সাত বছর এই পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলেন। এরপর এগারো বছর সম্পাদনা করেন স্বর্ণকুমারী দেবী। তিনি এই পত্রিকার স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টি করতে কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন। নিয়মিত প্রকাশিত ‘ভারতী’র ভাষাও ছিল সহজ সরল। সমালোচকেরা এই পত্রিকার উচ্চ প্রশংসা করতেন। তিনি যখন সম্পাদনার দায়িত্ব নেন, তখন কেবল লেখা নির্বাচন বা সম্পাদনাই করেননি, বরং এর মুদ্রণ ও প্রকাশনার সমস্ত বাণিজ্যিক দিক দক্ষতার সঙ্গে সামলেছেন। তাঁর এই উদ্যোগ তৎকালীন নারীদের ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে আসার প্রথম প্রেরণা ছিল।

এর পরেই যাঁর নাম আসে তিনি হলেন বেগম রোকেয়া হোসেন। তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক কোনো বড়ো প্রকাশনা সংস্থা না থাকলেও, নিজস্ব অর্থায়নে এবং উদ্যোগে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ নারীবাদী গ্রন্থ যেমন—’সুলতানার স্বপ্ন’, ‘মতিচূর’ ইত্যাদির প্রকাশনা ও প্রচারের ব্যবস্থা নিজেই করেন। কারণ একে মুসলিম নারী, অন্য দিকে লিখছেন। তাই নিজের বইয়ের জন্যই তাঁকে সরাসরি ভাবে না হলেও প্রকাশনা সংক্রান্ত কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে হয়।

আধুনিক বাংলা বইয়ের অঙ্গসজ্জা, উন্নতমানের ছাপা এবং রুচিশীল বিপণনের ক্ষেত্রে যে সংস্থাটি ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল, তা হলো সিগনেট প্রেস। ১৯৪৩ সালে দিলীপকুমার গুপ্তের সঙ্গে যৌথভাবে এই সিগনেট প্রেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন নীলিমা গুহঠাকুরতা। প্রকাশনা সংস্থাটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছিল ১০/২, এলগিন রোডে নীলিমা গুহঠাকুরতার বাড়িতেই। উদ্বোধনী উৎসবে উপস্থিত ছিলেন প্রফুল্লকুমার সরকার, সজনীকান্ত দাস, প্রেমেন্দ্র মিত্র, শিবরাম চক্রবর্তী, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুপ্রভা রায় প্রমুখ ছেচল্লিশজন আমন্ত্রিত অতিথি। ১৯৪৪ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত চার দশকে ১৩১টি বই বেরিয়েছে সিগনেট থেকে। এর মধ্যে আটটি বই মুদ্রণ ও বাঁধাই বিভাগে সর্বভারতীয় পুরস্কার জিতেছিল। ১৯৪৫-এ জওহরলাল নেহরুর ‘ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া’ প্রথম ছেপেছিল সিগনেট। দিলীপকুমারের প্রয়াণের পর নীলিমা গুহঠাকুরতা একাই শক্ত হাতে সিগনেটের হাল ধরেন। জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন, সুকুমার রায়ের খাই খাই, বা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আম আঁটির ভেঁপু-র মতো কালজয়ী বইগুলোর বিপণন ও প্রকাশনা সিদ্ধান্ত তাঁর হাত ধরেই বাস্তবায়িত হয়েছিল। তাঁকে বাংলা প্রকাশনা দুনিয়ার প্রথম দিকপাল নারী অভিভাবক বা প্রকাশক ধরা হয়। চল্লিশের দশকে যুদ্ধকালীন তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মাঝে এবং রক্ষণশীল সমাজের বিধিনিষেধ ভেঙে একজন বাঙালি নারীর প্রকাশনা ব্যবসার মতো কঠিন ক্ষেত্রে এমন বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দেওয়া তৎকালীন সময়ে এক অনন্য নজির ছিল।

এরপরেই যাঁর নাম অপ অপরিহার্য তিনি হলেন ‘প্রতিক্ষণ’-এর স্বপ্না দেব (১৯৪১-২০২৫)। তিনি ছিলেন এডিটর, নিছক সম্পাদক নন। অভিধান বলবে এডিটর-ই তো সম্পাদক। ইংরেজি ‘editor’ শব্দের যে-ল্যাটিন উৎস ‘edere’, তার মানে ‘টু ব্রিং আউট’ বা ‘টু পুট ফোর্থ’। সম্পাদক দিনগত পাপক্ষয়ের মতো তাঁর দৈনিক-সাপ্তাহিক-পাক্ষিক-মাসিক পত্রটি চালিয়ে যাওয়ার কর্মটি সম্পাদন করেন মাত্র, এডিটর তাকে প্রতিটি সংখ্যায় সামনে আনেন, অগ্রবর্তী করেন। কী থেকে সামনে আনেন- এক্ষেত্রে এই কথাটি গুরূত্বপূর্ণ। একজন কুম্ভকার যেমন একতাল মাটি থেকে সামনে আনেন বিশেষ রূপকে, হীরককার যেমন আনকাট হিরে থেকে অজস্র বিচ্ছুরণময় হীরককে, এডিটরও শব্দ আর চিত্রের জঙ্গল থেকে সামনে আনেন একটি স্মরণীয় প্রকাশকে। ১৯৮৩-তে পত্রিকার বিজ্ঞাপনে ‘ফিচার’-এই বিভাগটি সম্পর্কে লেখা হয়েছিল, ‘ফিচার মানেই ফিচলেমি নয়’। মাঝ-সত্তরের উত্তাল দিনগুলির কিছু পরে এ পত্রিকার জন্ম। বাঙালি সংস্কৃতির বিলীয়মান আর উদীয়মান– এই দুই সময়কেই সমান মমতায় জড়িয়ে ধরতে চেয়েছে প্রতিক্ষণ। প্রথম বর্ষের ১৯-তম সংখ্যায়, ২ মে ১৯৮৪, প্রকাশিত হচ্ছে বিশেষ ফিচার ‘এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে’। অরিন্দম চট্টোপাধ্যায় সেখানে লিখছেন, “যতদিন যাচ্ছে, যুবক-যুবতীরা নীতি আদর্শ ব্যক্তিত্ব রুচি সব হারাচ্ছি। চাকুরি নেই বা বাপের পয়সা আছে এই অজুহাতে হীনমন্যতা কাটানোর চেষ্টায় বুকের লকেটে কখনো সাঁইবাবা, কখনো ক্রস, কখনো মা-কালী ঝোলে। গেঞ্জি বা জামার পেছনে ‘Follow Me’, তরলপদার্থের চেয়ে ট্যাবলেট সস্তা, পছন্দ তাই। সুন্দরী বিনম্র মেয়েদের আর গুডবয়দের প্যাঁচ দিই আমরা, রবীন্দ্র সদনে শান্তিদেব বা ইণ্ডোরে রবিশঙ্কর যেমন শুনি তেমনি বচ্চনের নাচ দেখতেও যাই। আমাদের প্রিয় খাদ্য চাইনিজ। বাংলা ছবি? ফুঃ। অথচ আস্তে আস্তে আমরাই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছি। পাতালরেল কলকাতার বুকে যে ডানা লাগাতে ইচ্ছুক আমরা তার পালক, রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যে সব গুরুজনেরা পাতলা ‘আদ্দি’ ঘামে লেপ্টে সংস্কৃতি করেন, আমরা তাঁদের ধুতির কাছা খুলতে চাই। রাজনীতি? হ্যাঁ পাড়ার দাদার কাছে নাম লেখানো আছে, তবে লাইন বিশাল বড়।”

তাই যখন সাংবাদিক এবং এডিটর অবসরের গৃহস্থ জীবনযাপন করেন তখনও সেই খবর খোঁড়ার দিনলিপি সংকলিত করতে গিয়ে লেখেন, ‘সাংবাদিকের প্রতিবেদন, বেশির ভাগই তাৎক্ষণিক। আমি বলি, মিউনিসিপ্যালিটির রাস্তা সারাইয়ের মতো। একটা বর্ষার ধকল সয় না। কিন্তু আজ প্রায় ছাব্বিশ বছর পর মনে হচ্ছে, সব কিছু শেষ হয়ে যায়নি তো।”

ভূপাল গ্যাস দুর্ঘটনার দুঃসাহসিক সংবাদ বা দেশের জ্বলন্ত খবর, ভিন্দ্রানওয়ালের গোপন ডেরায় গিয়ে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়ে ফেরার পর স্বপ্না দেব তখন কলকাতার সাংবাদিক মহলে চর্চার বিষয়। কিন্তু একজন সম্পাদক কি কেবল নিজের লেখা বা অন্যদের কথা পত্রিকায় ছেপেই খুশি থাকতে পারেন? না কি তার বাইরে গিয়ে নতুনভাবে তাকে পাঠকের দরবারে পৌঁছে দিতে চান? আর এসব ভাবনা থেকেই জন্ম নিয়েছিল শুধু একটি পত্রিকা নয়। প্রতিক্ষণ নামক প্রকাশনা সংস্থাটিও। নিছক ব্যবসার বদলে প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক ও মননশীল বইপত্র প্রকাশই ছিল এর ইউ এস পি। সম্ভবত ১৯৮৪ সালে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল, এখনও তা অব্যহত।

মূলত ফরাসি ভাষার ও সাহিত্যের প্রতি প্রগাঢ় প্রেম ও ভালোবাসা থেকেই গড়ে উঠেছিল ‘বিংশ শতাব্দী’ নামে প্রকাশনা সংস্থা, যার কর্ণধার শ্রীমতী কাঞ্চনা মুখোপাধ্যায়। কলকাতার ফরাসি বইপ্রেমী ও সংস্কৃতিচর্চার জগতের সাথে গভীরভাবে জড়িত এই সংস্থা। ১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত কলকাতার এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি বিদেশি ভাষা এবং বিশেষ করে ফরাসি বই আমদানির জন্য সুপরিচিত। শিক্ষাগত দিক থেকে কাঞ্চনা মুখোপাধ্যায় একজন ইতিহাসবিদ। তিনি ফরাসি ভাষা থেকে বহু গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম বাংলায় অনুবাদ করেছেন। তাঁর অনুবাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য— তাহির বেন জেলুনের ‘Le Racisme Expliqué à ma Fille’ (বাংলা অনুবাদ: জাতিবিদ্বেষের অ আ ক খ) এবং জে. এম. জি. লে ক্লেজিও-র উপন্যাস ‘Marubhumi’ (Desert) তিনি কলকাতার ফরাসি সংস্কৃতি কেন্দ্র ‘অ্যালায়েন্স ফ্র্যাঞ্চাইজ ডু বেঙ্গলি’ (Alliance française du Bengale)-র সভাপতি (President) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

উল্লেখিত এই প্রবাদপ্রতীমদের পাশাপাশি বেশ কিছু নবাগত নারীর নাম এই মুহূর্তে প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত। যেমন কাগজের ডোঙার প্রিয়াঙ্কা গুহ ও সুপর্ণা দত্ত।দুই বন্ধু মিলে ঠিক করেছিলেন শুধু একটি পত্রিকা নয়, বই প্রকাশ করতে হবে এবং নামকরা সাহিত্যিকদের পাশাপাশি একেবারেই নতুনদের। কিন্তু সবার ক্ষেত্রেই তিন ফর্মা প্রযোজ্য হবে। সেই ভাবনা থেকেই প্রকাশনা, যা আজও একইভাবে কাজ করে চলেছে।

এছাড়াও উল্লেখযোগ্য কাজ করছেন ‘শব্দ’-এর সুদীপ্তা কিম্বা অনুষার শুক্তি রায়। কেবল ব্যবসায়িক লক্ষ নয়, ভালো বই পড়াবই এই লক্ষ থেকেই ক-বছর হল তাদের পথ চলা শুরু। আরও অনেকেই আসছেন, কিন্তু এই স্বল্প পরিসরে উল্লেখ করতে পারছি না। 

শেষ করছি নিজের কথা দিয়ে। ১৯৭৫ সাল থেকে প্রকাশিত, অনুবাদ সাহিত্যের এক মাত্র পত্রিকা অনুবাদ পত্রিকার দপ্তরে ২০০৩ সাল থেকে ক্রমাগত যাওয়ার সূত্রে অনুভব করেছিলাম মাত্র ছটি সংখ্যা যতই কলেবরে বাড়াই না কেন সারা বিশ্ব সাহিত্যকে তাতে স্থান দেওয়া অসম্ভব।তাছাড়া এটাও দেখেছিলাম মেয়েরা আবার বই প্রকাশের কী জানে! তার লে আউট, বিপনন, বিজ্ঞাপন, এডিটিং, প্রুফ রিডিং এর কি বোঝে এবং চাকরির বাইরে গিয়ে একটা অন্য কিছু ভাবা- এটা কখনোই একটি মেয়ের স্বপ্ন হতে পারে না।পিছনে অন্য কেউ আছেন, সামনে একজন মহিলাকে রাখা হচ্ছে, এমনকি মেয়েদের বিশেষ করে একজন নতুন লেখক লেখিকার বই ছাপার পিছনের গল্পগুলো শুনতে শুনতেই ঠিক করেছিলাম সবকটি প্রচলিত ধারণাকে বদলে দিতে গেলে মেয়েদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। আর সেই মেয়েটা না হয় আমিই হব।

সেই ভাবনা থেকেই শুরু করি ‘ভাষা সংসদ’। এর আগে যার নাম ছিল ‘নীল সরস্বতী’।প্রথম থেকেই নিয়মিত অনুবাদ বই প্রকাশের পাশাপাশি লেখিকাদের এবং একেবারেই নতুনদের লেখা প্রকাশের মধ্যে দিয়ে যে পথ চলা শুরু করেছিলাম, তার যাত্রা পথ মোটেই সহজ ছিল না, বিশেষ করে ওই সময় একটা অল্প বয়সী মেয়েকে প্রকাশক হিসাবে ভাবাটা পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিতে মেতে নিতে অসুবিধাই ছিল। আমি অবশ্য প্রথম থেকেই তাই জোর দিয়েছিলাম মেয়েদের লেখা ছাপায়। আর আজ এতটা পথ পেরিয়ে এসে মনে হয় ‘তোমার এই বিশ্বে কিছু হারায় না তো কভু…।’

জানি না কতটা সফল হয়েছি, তবে যেটুকু করেছি সেই পথে আরও অনেক নারী এগিয়ে এসেছেন, আরও অনেকেই আসুন, এই স্বপ্ন দেখি।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *