রম্যরচনা
চুমকি চট্টোপাধ্যায়
আজ ফ্ল্যাটের কমিটি মিটিং ছিল। অলোক এবং ফ্ল্যাটের আরো দুজন, যারা তিনতলা এবং চারতলায় থাকে, তারা প্রবলভাবে লিফ্ট বসানোর পক্ষে দাবী তুলেছে। এদিকে বাকি ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা, বিশেষ করে সেক্রেটারি মিস্টার সাহা, একেবারেই লিফ্ট বসানোর বিপক্ষে।
এই ফ্ল্যাটের বিল্ডিংটি স্ট্যান্ড আলোন অর্থাৎ একটাই চার তলা বিল্ডিং, তাতে ষোলোটা ফ্ল্যাট। যে সময়ে এটি তৈরি হয় তখন চারতলা বিল্ডিঙে লিফ্ট বসানোর অনুমতি পাওয়া যেত না। সেই নিয়ম এখন উঠে গেছে। ফলে লিফ্ট নেই শুধু নয়, বিল্ডিঙের ভেতরে লিফ্ট বসানোর কোনো জায়গাও নেই।
এদিকে তিন এবং চারতলায় যারা থাকে তাদের মধ্যে বয়স্ক, হাঁটুর সমস্যা আছে এমন মানুষজন রয়েছে। লিফ্ট বসলে তাদের খুবই সুবিধে হয়।
ইঞ্জিনিয়ার ডাকা হয়েছিল। তারা এসে পুরো বিল্ডিং ভালো করে ছানবিন করে বলে গেছে, বিল্ডিঙের ভেতরে কোনোভাবেই লিফ্ট বসানো যাবে না। বসালে, বাইরে থেকে ক্যাপসুল লিফ্ট বসাতে হবে। আর সেখানেই সেক্রেটারির প্রবল আপত্তি। বাইরে থেকে লিফ্ট বসলে নাকি বিল্ডিঙের সিকিয়োরিটি ব্যাহত হবে। যে কেউ ওপরে উঠে যেতে পারবে। এই বক্তব্যে কিছু বাসিন্দারও সায় আছে। ফলে লিফ্ট বসানোর পরিকল্পনা এই মুহূর্তে ঝুলে রয়েছে।
এই ফ্ল্যাটটা অলোকের জেঠামশাইয়ের। তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। উইল করে ফ্ল্যাট অলোকের নামে লিখে দিয়ে গেছেন। বিল্ডিংটা খুবই শক্তপোক্ত। কিন্তু ওই একটাই খামতি, লিফ্ট নেই। অলোকের বাবা মা এই কারণেই এখানে আসতে চান না। সিঁড়ি ভেঙে চার তলায় উঠতে ওঁদের বেশ কষ্ট হয়। সে কারণেই অলোক লিফ্ট বসানোর দাবীতে এঁটে আছে।
রুমির সঙ্গে এই নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয় অলোকের।
‘এই সেক্রেটারি লোকটার মাথাটা নিরেট। ইঞ্জিনিয়ার যিনি এসেছিলেন, তিনি বারবার বলছেন যে, রাত্রিবেলা লিফ্ট ওপরে তুলে লক করে দিলে কেউ নীচে নামাতে পারবে না। ভয়ের কিছু নেই। সাহা বলে কিনা, দিনের বেলাতেই যদি কেউ উঠে লুকিয়ে থাকে, তখন? কী বলবে বলো তো একে?’
‘কিছুই বলার নেই। সঙ্গে ঢাক ঢোল বাজাবার লোক আছে বলেই জোর পাচ্ছে। কী করবে তুমি।’
‘বিরক্তিকর লোকজন সব। সেরকম হলে এই ফ্ল্যাট বেচে দিয়ে অন্য জায়গায় ফ্ল্যাট নেব।’
২
‘হ্যালো? অলোক স্যার বলছেন?’
‘বলছি। আপনি কে বলছেন?’
‘আমি তন্দ্রা বসাক বলছি, স্যার। আপনার লেখার একনিষ্ঠ পাঠক। আপনার ‘জানলায় কার মুখ’ বইটা আমি তিন চারবার পড়েছি। অ্যাত্তো ভালো লেগেছে, কী বলব স্যার।’
‘অনেক ধন্যবাদ ম্যাডাম। খুব ভালো লাগল জেনে।’
‘বয়েসে আপনি আমার চেয়ে অনেকটাই ছোট, আমার এই ৬৯ বছর হবে দুই মাস বাদে। আমাকে ম্যাডাম বলবেন না।’
‘আপনিও আমাকে স্যার বলবেন না। নাম ধরেই বলুন।’
‘আচ্ছা অলোকবাবু, আপনার প্যাঁচার ওপর যে বইটা আছে, কী যেন নাম, ওহো… পেটে আসছে মুখে আসছে না… হ্যাঁ মনে পড়েছে, ওই ‘প্যাঁচা আমার ভালোবাসা’ বইটাতে যে বর্ণনা আছে, সে সব কি সত্যি? মানে, আপনার ব্যক্তিগত সংগ্রহে সত্যিই অত প্যাঁচা আছে?’
‘আমাকে অফিস যেতে হবে দিদি। ছুটির দিকে ফোন করবেন, বলব আপনাকে।’
তিন দিন পর রবিবার। সকাল ৭.১০। অলোকের ফোন বেজে ওঠে। রুমি, সবে বিছানা ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, বলে ওঠে, ‘রবিবার সাত সকালে কে ফোন করছে তোমায়?’
রাত্রে শোবার আগে ইন্টারনেট অফ করে রাখে অলোক, যাতে ইনসমনিয়ায় ভোগা পাব্লিকদের হোয়াটসঅ্যাপের অত্যাচার না সহ্য করতে হয়। কিন্তু ফোনের ভল্যুম কমিয়ে রাখলেও ফোন বন্ধ করে না তার প্রধান কারণ তার বয়স্ক বাবা মা, যাঁরা দেশের বাড়িতে থাকেন। যদি রাতে তাদের কোনো প্রয়োজন হয়, তাই।
ফোন শুনেই অলোক বলে, ‘দেখো তো কে? বাড়ির ফোন কি?’
‘আননোন নম্বর দেখছি তো।’
‘ও, তাহলে থাক।’ পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে অলোক।
ঘন্টাখানেক বাদে আবারও ফোন বাজে। অলোক তখন গভীর ঘুমে। রবিবার দিন ৯.৩০ বাজিয়ে ওঠে সে।
ঘুম থেকে উঠে মোবাইল হাতে নিয়ে অলোক দেখে একই নম্বর থেকে তিনটে মিসড কল।
ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্ট করতে করতে খবরের কাগজের পাতা ওল্টাচ্ছিল অলোক। মোবাইল বেজে উঠল। সেই আননোন নম্বর। ‘কোনো জরুরি কিছু না কী রে, বাবা। এতবার ফোন করছে কেন!’ ফোন ধরে সে।
‘হ্যালো?’
‘সুপ্রভাত অলোকবাবু, আমি তন্দ্রা বসাক বলছি। আপনি বলেছিলেন ছুটির দিনে ফোন করতে, সকাল থেকে অনেকবার করেছি, আপনি ধরেননি।’
‘রবিবার সাত সকালে কেউ…’ বলতে গিয়েও ঢোঁক গেলে অলোক। যতই হোক, একনিষ্ঠ পাঠক বলে কথা। অলোকের সব বই-ই ওর পড়া৷ খারাপ ভাবে কিছু বলা যাবে না। ‘আসলে ফোনটা সাইলেন্ট করা ছিল বলে শুনতে পাইনি। বলুন দিদি।’ রুমির দিকে তাকিয়ে চোখ টেপে অলোক৷
‘ওই প্যাঁচার কথা। সত্যিই কি আপনার বাড়িতে অত প্যাঁচা আছে?’
‘হ্যাঁ মানে, অনেক ধরনের প্যাঁচার সংগ্রহ আছে।’
‘ইস কী ভালো। আপনার লেখা পড়ে আমি যাকে বলে, মুগ্ধ হয়ে গেছি। যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি সবটা। আমিও প্যাঁচা ভীষণ পছন্দ করি। যদি কিছু মনে না করেন, একটা কথা বলব?’
‘বলুন।’
‘আপনার ওই সংগ্রহ দেখতে একদিন যেতে পারি আপনার বাড়ি? আপনি রবীন্দ্র নগরে থাকেন তো?’
কী জবাব দেবে ভেবে পায় না অলোক। এরকম গায়ে পড়া পাঠক এ পর্যন্ত দেখেনি সে। একেবারে বাড়িতে আসতে চাইছে!
‘রাগ করলেন নাকি অলোকবাবু? আসলে আপনার লেখাগুলো এতটাই জীবন্ত, আমাকে ভয়ানক টানছে জানেন তো। আমিও দুটো প্যাঁচা নিয়ে যাব। আপনি মানা করলে আমি যাব না।’
‘না ঠিক আছে, ছুটির দিন দেখে আসবেন। আমাকে আগে জানাবেন, সব ছুটির দিনে বাড়ি থাকি না।’ নীরস গলায় বলে অলোক।
‘অনেক ধন্যবাদ অলোকবাবু। আপনার বাড়ির পুরো ঠিকানাটা যদি দেন তো খুব ভালো হয়। আমি লিখে নেব। খাতা পেন নিয়েই বসেছি।’
‘লিখুন… আকাশবাড়ি, ১৪/৩…।’
কী ভয়ঙ্কর মহিলা রে বাবা। না এসেই এই অত্যাচার, এলে কী হবে! দুশ্চিন্তায় পড়ে যায় অলোক। রুমিকে বলতে সে বলে, ‘না করে দিলেই তো পারতে। কী এসে যেত একজন পাঠক অসন্তুষ্ট হলে? তাছাড়া, যারা তোমার লেখার ভক্ত, তারা যে কোনো অবস্থাতেই বই কিনে পড়বে। এদেরকে এন্টারটেন করাই উচিত নয়৷’
‘আরে বয়স্ক মানুষ, কী বলি বলো। যাকগে, একবার ঘুরে যান, তারপর আসতে চাইলে কাটিয়ে দেব।’
দশ মিনিট যেতে না যেতে আবার ফোন। যারপরনাই বিরক্ত অলোক। এবার কড়া হতেই হচ্ছে। এ কী! সারাদিন ওঁর সঙ্গে কথা বলেই কাটবে নাকি ছুটির দিনটা?
‘বলুন।’ একটু গম্ভীর গলায় বলে অলোক।
‘আপনার ফ্ল্যাট কি চারতলায়? লিফ্ট আছে তো?’
‘হ্যাঁ দিদি, চারতলায়। না, লিফ্ট নেই। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হবে।’
‘সে কী? চারতলায় ফ্ল্যাট, লিফ্ট নেই?’
‘না, লিফ্ট নেই।’
তাহলে আর হল না, অলোকবাবু। আমার হাঁটুর অবস্থা ভালো নয়, সিঁড়ি ভাঙা বারণ।’
‘তাই নাকি?’ উচ্ছ্বসিত অলোকের গলার আওয়াজ হঠাৎ করেই বদলে যায়। তারপরেই মনে হয়, এটা ঠিক হচ্ছে না। তাই সামলে নিয়ে বলে, ‘ওহো হো, সেই তো। কী আর করা যাবে। খুব অসুবিধে হলে হাঁটু অপারেশন করিয়ে নিন। তখন আসতে পারবেন।’
‘দেখি।’ তন্দ্রা বসাকের গলায় হতাশা। ‘আচ্ছা, রাখি তাহলে। এর পরের বইটার অপেক্ষায় রইলাম।’
‘নিশ্চয়ই। ভালো থাকবেন দিদি।’
ফোনটা ছেড়েই ‘ইয়া হু উ উ উ’ করে চিৎকার ছাড়ে অলোক। বারান্দা থেকে দৌড়ে আসে রুমি। ‘কী হল?’
‘ও সিঁড়ি সোনা সোনা…’ হাঁটুতে ব্যথা বলে তন্দ্রা বসাক দিদি সিঁড়ি ভাঙতে পারবেন না, তাই আসছেন না। হেহেহেহে।’
অলোকের বলার ভঙ্গি দেখে হেসে ফেলে রুমি। ‘সিঁড়ি ফিল্টার হয়ে আরও কত কিছু আটকে দেবে দেখো।’
‘ঠিক ঠিক। আপাতত লিফ্ট বসানোর আবদার আর করব না।’
