রম্যরচনা
উল্লাস মল্লিক
আমার নাম পরিচয় মিত্র। দুপুরবেলা একটু ফেসবুক ঘাঁটছিলাম। খাওয়া দাওয়ার পর এই সময়ে ফেসবুক ঘাঁটা আমার অভ্যাস। আমার একটা অ্যাকাউন্ট আছে। সেখানে আমার সম্পর্কে যে সব তথ্য আছে তার একটা বাদে সবগুলোই ঠিক। জন্ম- তারিখ, নিবাস, স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি, হবি সব ঠিকঠাক। শুধু পেশার ব্যাপারটা– ইতি গজ। আমি প্রাইভেট টিউশন করি। কিন্তু ফেসবুকে লেখা আছে–টিচার। মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। অনেকেই জিজ্ঞেস করে–কোন স্কুল? আমি হেয়ালি করে উত্তর দিই – বিশ্ব জোড়া পাঠশালা মোর ……! কেউ প্রশ্ন করে, হাই, না হায়ার সেকেন্ডারির? আমি বলি, এসবই সেকেন্ডারি আমার কাছে।
এই মুহূর্তে আমি তন্দ্রা মজুমদারের একটা পোস্ট দেখতে পাচ্ছি। তন্দ্রা আমার ফ্রেন্ড লিস্টে আছে। ব্যক্তিগত পরিচয়ও আছে ওর সঙ্গে। তন্দ্রা একটা ছুঁচোর ছবি দিয়েছে। লিখেছে– কাল জলের বালতিতে পড়ে গিয়েছিল ছুঁচোটা। কতক্ষণ পড়েছিল কে জানে, আমি যখন দেখতে পেলাম তখন অবস্থা খুবই কাহিল। অতি কষ্টে উদ্ধার করে ওকে বাইরে নিয়ে আসি। মর মর অবস্থা। প্রাণটুকু শুধু ধুকধুক করছে। তিতির তো কেঁদেই ফেলল। বলল, মা ও কি আর বাঁচবে না? আমি উত্তর দেব কী, নিজেই তো চোখের জলে ভেসে যাচ্ছি। তারপর সারারাত ধরে গরম সেঁক দিলাম। রাতে কিছু খেলাম না, তিতিরের বাবাও তাই। চোখের সামনে একটা জীবের মরণ বাঁচন সমস্যা, তার মধ্যে কি খাওয়া যায়! সকালে দেখলাম ছুঁচোটা বেশ চনমনে হয়ে উঠেছে। তিতির অবশ্য ওর একটা নাম দিয়েছে। খুসবু। নামটা আমাদেরও বেশ পছন্দ। একটু বেলা হতেই আমরা খুসবুকে বাগানে ছেড়ে দিলাম। তিতিরের আবার একচোট কান্না। আমারও চোখে জল এসে যাচ্ছে। আসলে সবারই মায়া পড়ে গেছে খুসবুর ওপর। অবলা জীব তো! তোমরা সবাই একটু প্রার্থনা করো ওর জন্যে। ও যেন খুব ভাল থাকে। ওর যেন কোনও বিপদ না হয়।
দেখলাম, এরই মধ্যে প্রচুর লাইক আর কমেন্ট। অনেকেই লিখেছে, আপনাদের মতো মানুষই প্রকৃত মানুষ। কিছু লিখেছে, আপনাদের মতো মানুষ আছেন বলেই পৃথিবীতে এখনও ছুঁচো আছে। কেউ লিখেছে, এখন মানুষের জীবনেরই দাম নেই, সেই জায়গায় আপনারা ছুঁচোর জীবন দান করলেন। অনেকে ছুঁচোর ছবি পাঠিয়েছে। কেউ কেউ ছুঁচোর জায়গায় ইঁদুর পাঠিয়ে ফেলেছে। এটা নিয়ে তর্কাতর্কি। কেউ বলছে, দুটো একই গোত্রের, সুতরাং সমস্যার কিছু নেই। একজন আবার প্রতিবাদ করেছেন, না না, দুটো ভিন্ন প্রজাতির প্রাণী। এদের স্বভাব চরিত্রে বিস্তর ফারাক। সেই জন্যেই ল্যাবরেটারিতে ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা করা হয়, ছুঁচোর ওপর নয়। তারপর তিনি ছুঁচো আর ইঁদুরের কিছু আচরনের উল্লেখ করেছেন। প্রত্যুত্তরে কয়েকজন বলেছেন, ঋব্ধ হলাম। আপনার কমেন্ট আর পোস্ট থেকে অনেক কিছু শিখি। আপনার কাছ থেকে টিকটিকি বিষয়ক একটা পোস্ট আশা করছি। ‘বাবা তারকেশ্বর’ নামে একজন লিখেছেন, আপনারা কিন্তু ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করছেন। ইঁদুর আমাদের দেবতার বাহন। আমরা ইঁদুরকেও পুজো করি। তাই ইঁদুর নিয়ে মস্করা বন্ধ করুন। পারবেন, অন্য ধর্ম নিয়ে এমন মস্করা করতে! আগামীতে ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা নিরিক্ষা বন্ধের জন্যে আমরা সরকারকে চিঠি লিখব। প্রয়োজন হলে, বৃহত্তর আন্দোলনের পথেও যেতে পারি।
বেশ কয়েকজন R I P দিয়েছেন। কেউ কেউ লিখেছেন, ছুঁচোর আত্মার শান্তি কামনা করি। ও যেখানেই থাকুক ভাল থাকুক। একজন বলেছেন, আরে ছুঁচোটা তো মরেইনি। আপনারা পোস্ট ভাল করে আগে পড়ুন। প্রজ্জ্বল সাহা নামে একজন তো তন্দ্রা মজুমদারকে উদ্দেশ্য করে বেমক্কা লিখে দিয়েছেন– কে তুমি তন্দ্রাহরণী-ই-ই-ই…….। তন্দ্রা মজুমদার পাল্টা কমেন্ট করেছেন, প্রজ্জ্বলবাবু এটা একটা সিরিয়াস ব্যাপার। কোনও রকম অসভ্যতা চলবে না। আপনাকে তাই ব্লক করতে বাধ্য হলাম। একজন তো আবার লিখেছেন, সরকার ছুঁচোদের ব্যাপারে এত উদাসীন কেন। সরকারের সদিচ্ছা থাকলেই এদের জন্যে একটা ব্যবস্থা নিতে পারে। প্রথমে একটা কমিটি গঠন করতে হবে।
পরের পোস্টে এলাম। গোবিন্দ মাইতি পাশাপাশি দুটো ছবি পোস্ট করেছেন। একটাতে দেখা যাচ্ছে একদল বাচ্চা বাচ্চা আধ ন্যাঙটো ছেলেমেয়ে খিচুরি খাচ্ছে। অন্যটায় লাল জামা গায়ে গোবিন্দবাবু একটা আলুর বস্তায় হাত ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। গোবিন্দ মাইতি জানিয়েছেন, প্রতি বছর পাড়ায় যে কাঁঙালি ভোজন হয়, তাতে আমি এক বস্তা আলু ডোনেট করি। এ বছরও করছি। ওদের আনন্দই আমার আনন্দ। ওদের হাসিমুখ দেখলে আমার বুক ভরে যায়। মনে হয়, বেঁচে থাকাটা সার্থক। ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করি, জীবনের বাকি দিনগুলো যেন এভাবেই আলু দিয়ে ওদের মুখে হাসি ফোটাতে পারি।
প্রচুর হাত জোড় করা ইমোজি এসেছে। কেউ লিখেছেন, আপনার দর্শন পাওয়া মানে ঈশ্বরের দর্শন পাওয়া। কেউ লিখেছেন, আপনি প্রকৃতই ঈশ্বরের সন্তান। কেউ লিখেছেন, ঈশ্বর আপনাকে দু’হাত ভরে দিক, আর আপনি এভাবেই ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে অন্ন জুগিয়ে যান। একজন লিখেছেন, অন্ন নয়, আলু। তাতে কয়েকজন থামস আপ দিয়েছেন। একজন লিখেছেন, আপনাদের পিকনিক কোথায় হয়। পরের বার আমাকে আগে থেকে বললে আমিও যাব। একজন লিখেছেন, কলকাতার মধ্যে হলে আমিও যেতে পারি। ‘আমি নীলকন্ঠ’ নামে একজন লিখেছেন, একশো বছর পর আপনি মন্দিরে মন্দিরে পূজিত হবেন। একজন লিখেছেন, এই লাল জামাটা পরে আপনাকে দারুন হ্যান্ডসাম লাগছে। তার পরেই একজন লিখেছেন, এই জামা পরে আপনাকে কিন্তু পুরো রাঙাআলুর মতো দেখাচ্ছে। একজন লিখেছে, বউদি কোথায়? সঙ্গে বউদি থাকলে আরও ভাল লাগত। আর একজন– কোনও পরিচালকের চোখে পড়লে আপনাকে লুফে নেবে। একদিন হয়তো আপনি বড় নায়ক হয়ে উঠবেন। তখন এই দরিদ্র লাঞ্ছিত মানুষগুলোকে ভুলে যাবেন না যেন। ‘পদ্মফুলে ভ্রমর’ নামে একজন লিখেছে, এই জন্যই রাজা রামমোহন রায় বলেছেন, শুধু অর্থ থাকলেই হয় না, থাকা চাই শিক্ষা। শিক্ষা আনে চেতনা / চেতনা আনে বিপ্লব / বিপ্লব আনে মুক্তি। দিকচক্রবাল নামের একজন লিখেছেন – আমার নামের শেষ দুটো অক্ষরের মতো কথা বলবেন না, কথাটা রামমোহনের নয়, রবীন্দ্রনাথের। জ্ঞানপাপী নামে একজন লিখেছেন, না জেনে উল্টো পাল্টা কমেন্ট করবেন না। এই কথা বহুদিন আগেই মাও–সে–তুং বলে গেছেন। একটু পড়াশোনা করুন। ব্যস, নারদ, নারদ! অনেক নাম এল। নেতাজি থেকে শিবাজি, সম্রাট বাবর থেকে বাঘাযতীন, লিঙ্কন থেকে শিব্রাম। একজন লিখেছেন, এই লাইনগুলো অন্য কারও নয়, বাবা রামদেবের। ‘ছিন্নমস্তা’ নামে এক মহিলা লিখেছেন, আপনাদের এই পুরুষতান্ত্রিকতা আর গেল না। মেয়েদের সাফল্য আপনারা কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না। সবাই জানে, এটা খনার বচন। এরই মধ্যে ‘ চন্দ্রযান’ নামে একজন লিখে দিয়েছেন, আমি আপনার পাশের পাড়ায় থাকি। আপনি তো মশাই ভিখিরিকে ভিক্ষে পর্যন্ত দেন না। একবার বাজারে আলু চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে পাবলিকের বেধড়ক প্যাঁদানি খেয়েছিলেন। আপনি দেবেন আলু! আমি নিশ্চিত, আলুর একটা খোসাও আপনার হাত দিয়ে গলবে না। আমার তো মনে হচ্ছে, বস্তার ভেতরে আলুর বদলে ইট পাটকেল আছে। পরেরজন কমেন্ট করেছেন, আপনি ঠিকই বলেছেন চন্দ্রযানবাবু, আমি ওঁর পাড়ায় থাকি, ওঁর নিজেরই তো আলুর দোষ আছে। একবার পাড়ার এক বউদির সঙ্গে লটঘট করতে গিয়ে ঝাড় খেয়েছিলেন। সেই ভিডিও আমার কাছে আছে। বেশি বাতেলা করলে ভাইরাল করে দেব। একজন লিখেছেন, ভিডিওটা কীসের, শয্যাদৃশ্যের নাকি!
দেখলাম, প্রচুর হা হা রিঅ্যাক্ট পড়েছে। ‘উদাস হাওয়া’ নামে একজন লিখেছেন, আরে ভাইরাল করে দেব কেন, করে দিন। আমরা সবাই একটু দেখি। এসব জিনিস একা একা উপভোগ করতে নেই।
একটু স্ক্রল করলাম। হঠাৎই থমকে গেলাম। এটা কার অ্যাকাউন্ট! সাদা কালো ছবি এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোকের। পরনে ধুতিপাঞ্জাবি, গায়ে হালকা সুতির চাদর। প্রশস্ত ললাট। দৃপ্ত চোখমুখ। খুব চেনা চেনা লাগছে। নামটা দেখে চমকে গেলাম। শ্রী শ্রী ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা। দেখে খুবই লজ্জিত হলাম। ইশ, আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল। তারপর মনে হল, দেখি তো, একটু ঘাঁটাঘাঁটি করে। লক করে রাখেননি যখন তখন দেখা যেতেই পারে। এই তো একটা পোষ্ট। দেখি, কী লিখেছেন। লিখেছেন— অদ্য একটি মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী হইতে হইল। একটি বিশেষ কার্যোপলক্ষে এক স্থানে গমন করিতেছিলাম। পথিমধ্যে এক শববাহক দলের সহিত সাক্ষাত হইল। শুনিলাম, মৃত ব্যক্তি নিতান্তই যুবক। বয়ঃক্রম মাত্র সাতাশ বৎসর। নিদারুণ দারিদ্র। তাঁর মৃত্যুতে তাঁর পরিবার খুবই আতান্তরে পড়িবে। আমি কিছু কৌশল অবলম্বন করিয়া ওই মৃত ব্যক্তির নাম ও ঠিকানা জানিয়া লইলাম। তারপর মৃত ব্যক্তির গৃহের সম্মুখে উপস্থিত হইলাম। ব্যক্তির নাম ধরিয়া ডাকিতে তাহার বিধবা বাহির হইয়া আসিলেন। আমি তাহার স্বামীর খোঁজ করিলাম। তিনি উচ্চস্বরে ক্রন্দন করিয়া উঠিলেন। এবং ক্রন্দনরতা অবস্থায় ঘটনা বিবৃত করিলেন।
আমি বলিলাম, আমি তাহার স্বামীর বিশেষ পরিচিত। বেশ কিছুদিন পূর্বে আমি তাহার স্বামীর নিকট হইতে কিছু ঋণ করিয়াছিলাম। অদ্য পরিশোধ করিতে আসিয়াছি। এরূপ পরিস্থিতি হইবে তাহা কল্পনাও করিতে পারি নাই। এমতাবস্থায় আপনি যদি সেই অর্থ গ্রহণ করিয়া আমাকে ঋণমুক্ত করেন তাহা হইলে অশেষ কৃতজ্ঞ থাকিব। ইহা বলিয়া আমার কাছে তখন যাহা ছিল সবটাই মৃতের পত্নীর হস্তে তুলিয়া দিলাম। তিনি আবারও ক্রন্দন করিয়া উঠিলেন। আমি আর দাঁড়াইলাম না।
দেখলাম, একটি ছবিও পোস্ট করেছেন বিদ্যাসাগর মশাই। ঘোমটা দেওয়া মলিন শাড়ি পরিহিতা এক মহিলা হাত পেতে বিদ্যাসাগরের কাছ থেকে কিছু নিচ্ছেন। কী নিচ্ছেন তা অবশ্য ছবিতে স্পষ্ট নয়। আমি কমেন্টে গেলাম। প্রথম কমেন্ট– কত টাকা, সেটা তো আগে উল্লেখ করুন। পরের কমেন্ট– একদম ঠিক। ছবিতে টাকার অঙ্ক স্পষ্ট নয়। অনেকেই পাঁচ টাকা দিয়া পাঁচশত টাকার গল্প বানায়। আজকাল অসৎ মানুষে দেশ ভরিয়া গিয়াছে। কাহাকেও বিশ্বাস করা করা যায় না। একজন বলেছেন– সহমত। আজ সকালেই আমার পরিচিত এক মৎস্য বিক্রেতা আমাকে পচা মৎস্য দিয়াছে। তাছাড়া, এই ঈশ্বরচন্দ্র নামক ব্যক্তিটির চেহারা কেমন যেন সন্দেহজনক বোধ হইতেছে। পুলিশের উচিত ওঁকে জেরা করা। একজন লিখেছেন, আপনার বিশেষ কোনও উদ্দেশ্য নাই তো মশাই। এইভাবে ওই বিধবার আস্থা অর্জন করিয়া ঘনিষ্ঠ হইবার চেষ্টা করিতেছেন না তো! সম্প্রতি আমাদের পাড়ায় এইরূপ একটি কেলেঙ্কারি ঘটিয়াছে। এক দুরাত্মা, একজন অসহায় বিধবাকে সাহায্য করিবার ছলে তাহার যৌবন ভোগ করিয়াছিল। সেই মহিলা কিছুদিনের মধ্যেই অন্তঃসত্ত্বা হইয়া পড়ে এবং আত্মহত্যা করিতে বাধ্য হয়। একজন লিখেছেন, দেখুন, অহেতুক মনুষ্যকে অবিশ্বাস করা যেন আমাদিগের রীতি হইয়া পড়িয়াছে। ঘটনার সত্যাসত্য যাচাই না করিয়া কাহাকেও দোষারোপ করা যায় না। আমি নিজেই এইভাবে কত অসহায় মানুষকে সাহায্য করি। আমি নিতান্তই প্রচারবিমুখ, তাই পূর্বে কখনও বলি নাই, আজ প্রসঙ্গক্রমে বলিলাম।
পরের পোস্টে এলাম। বিদ্যাসাগর মহাশয় লিখিয়াছেন– অদ্য কুসুমপুরে বালিকাদের জন্য একটি বিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করিলাম। বেশ কিছু উৎসাহী ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। বিদ্যালয় ভবন নির্মানের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করিতে হইবেক। তদুপরি, আমাকে মাঝেমধ্যেই এই স্থানে গমন করিতে হইবেক। শুনিলাম স্থানীয় কিছু ব্যক্তি, যাঁহাদের মধ্যে অনেক প্রভাবশালীও আছেন, তাঁহারা এই বালিকা বিদ্যালয়ের ঘোর বিরোধী। তাঁহারা অপপ্রচার শুরু করিয়াছে। মানুষের বাড়ি বাড়ি প্রবেশ করিয়া তাহাদিগের পিতামাতাকে বিদ্যালয় সম্পর্কে বীতরাগ করিয়া তুলিতেছেন। বলিতেছেন, মেয়েদের পক্ষে বিদ্যাচর্চা অতিশয় বিষম বস্তু। ইহাতে তাহাদের কপালে অকাল বৈধব্য নামিয়া আসে। এইরূপ অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আমাদিগকেও লড়াই করিতে হইবেক। সকলকে অনুরোধ, অনুগ্রহপূর্বক একটি লাইক দিবেন। আপনার একটি লাইক আমার কাছে অনেক।
লাইকের সঙ্গেই বেশ কিছু কমেন্টও এসেছে। প্রথমেই একজন লিখেছেন, বলি, বিদ্যাসাগর মশাই, আপনার কি খেয়েদেয়ে কাজ নাই। হাতে কাজ না থকিলে ভ্যারেন্ডা ভাজুন। যত্তসব! তার পরেই একজন বলেছেন, আচ্ছা বাপু, এই যে ভ্যারেন্ডার প্রসঙ্গ উঠিল, তা বাপু, ভ্যারেন্ডা জিনিসটা কী! চুষিয়া খায় না দাঁতে কাটিয়া। আপনি কি কখনও খাইয়াছেন? আর একজন লিখল, আপনার কথা ইদানীং খুব শুনিতেছি। শুনিয়া বুঝিয়াছি, বিদ্যাসাগর মশাই, আপনি মানুষ হিসাবে বেশ গন্ডগোলের। চারিদিকে আপনার অলক্ষণে কান্ড-কারখানায় লোকজন অতিষ্ঠ হইয়া উঠিতেছে। মেয়েছেলে বিদ্যালয়ে গিয়া লেখাপড়া শিখিয়া কি হাতিঘোড়া মারিবে। ছিঃ ছিঃ; আপনার কি নরকের ভয় নাই! আপদ একটা। অন্য একজন লিখলেন, সহমত। চিরকাল দেখিয়াছি, মেয়েছেলে রান্নাবান্না করিবে, পতিসেবা করিবে, সন্তান পালন করিবে, ব্রত উপবাস করিবে। এখানে লেখাপড়ার কথা আসিতেছে কেন! আমারও মনে হয় ওই ব্যক্তির অন্য কোনও উদ্দেশ্য আছে। সকলের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
আরও অনেক কমেন্ট আছে। প্রায় সবই বিদ্যাসাগরের প্রতি কুৎসা আর অভিসম্পাত। দু’চারজন অবশ্য সমর্থন জানিয়েছেন। কিন্তু তাদেরও আক্রান্ত হতে হয়েছে।
পরের পোস্ট। বিদ্যাসাগর লিখেছেন- আজ মনে আমার কিঞ্চিত প্রশান্তি অনুভব করিতেছি। গতকল্য দুইটি বিধবা বিবাহ সুসম্পন্ন হইয়াছে। দুটোতেই উপস্থিত ছিলাম। দুই দম্পতিকেই আশীর্বাদ করিয়া আসিয়াছি। এখন আপনাদের নিকট হইতে একটি ‘লাইক’ প্রত্যাশা করি।
এখানেও অকথা কুকথার বন্যা। একজন লিখেছেন– ইনিই কি সেই পন্ডিত ব্যক্তি, যিনি বিধবাদের বিবাহ দেন! তাঁর উত্তরে একজন লিখেছেন– যিনি বিধবাদের বিয়ে দেন, তিনি যদি পন্ডিত হন, তাহলে মূর্খ কে! একজন লিখেছেন– আচ্ছা, এত লোকের মরণ হয়, তোর হয় না কেন! অন্য একজন লিখেছেন– মরণ হবে কী করিয়া; ওই অনামুখো যমেরও অরুচি!
দেখলাম, প্রচুর হ্যা হ্যা রিঅ্যাক্ট পড়েছে।
পরের পোস্টে গেলাম। বিদ্যাসাগর মশাই লিখিয়াছেন, আমার পরের পুস্তক প্রকাশের অপেক্ষায়। পুস্তকের নাম– সীতার বনবাস। রাবণ প্রকাশনী। ছয় নম্বর রাজা দশরথ স্ট্রিট। কলিকাতা-1010101010, আগামীকল্য হইতে এই পুস্তকের প্রি-বুকিং শুরু হইবেক। পুস্তকটির মুদ্রিত মূল্য আট আনা। যাহারা প্রি বুকিং করিবেক তাহারা মাত্র এক সিকিতেই পাইবেক। প্রতিটি পুস্তকে আমার স্বাক্ষর থাকিবেক। প্রত্যেক ক্রেতার জন্য থাকিতেছে আমার ছবি সম্বলিত আকর্ষক একটি বুকমার্ক। আর একটি কথা, কিছুদিন বর্ণপরিচয় দ্বিতীয় ভাগের সরবরাহতে বিঘ্ন ঘটিয়াছিল। আসলে হট কেকের ন্যায় উহা বিক্রি হইয়াছে। সকল ক্রেতাকে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা। আপনাদের ভালবাসাই আমার পাথেয়। উনবিংশতি সংস্করণ (দশ হাজার) শেষ। বিংশতি সংস্করণ এখন আবার পুস্তক বিপণীগুলিতে লভ্য। যাঁহারা সংগ্রহ করিতে চান, সংগ্রহ করিতে পারেন। আর যাঁদের শিশুদের এখনও অক্ষর পরিচয় হয় নাই, তাঁহারা আমার বর্ণপরিচয় প্রথম ভাগ সংগ্রহ করিতে পারেন। হলপ করিয়া বলিতে পারি– শিশুশিক্ষার পক্ষে এমন আদর্শ বই আর নাই।
পরের পোস্ট–আজ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার সাক্ষী হইলাম। এক পেঁচি মাতালের পাল্লায় পড়িয়াছিলাম। সে মদ্যপান করিবা নিমিত্ত আমার নিকট অর্থ সাহায্য চায়। আমি অস্বীকৃত হইতে, সে বলিল, আপনি মাইকেলকে তো মদ্যপানের জন্য টাকা দেন, তাহলে আমি কী অপরাধ করিলাম! আমি বলিলাম, ব্যাটা, তুই একখানি ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ লিখিয়া আন, তখন তোকেও মদ্যপানের নিমিত্ত টাকা দিব। লাইক দাও লাইক; আমাকে একটা লাইক দাও পরিচয়। সমাজের জন্যে কতকিছু করিয়াছি। আমি প্রচার বিমুখ, তাই সামান্য দু’চারিটা ঘটনার কথা উল্লেখ করিলাম মাত্র, যাহাতে তোমরা উৎসাহিত হও! আমি তোমাদের বিদ্যাসাগর! –কেউ একটা চিৎকার করে বলল আমাকে। আমার চটকা ভেঙে গেল। আসলে ফোন ঘাঁটতে ঘাঁটতে কখন যেন দু’চোখের পাতা এক হয়ে গেছে। ফোন হাতে। মাথাটা যেন বোমভোলা হয়ে আছে। কী সব দেখলাম এতক্ষণ!
কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম। তারপর আমি আমার প্রোফাইলে গেলাম। পরপর কটা পোস্ট। একটাতে আমি রাস্তার একটা কুকুরকে বিস্কুট খাওয়াচ্ছি সেই ছবি। পাড়ার একটা গরীব ছেলের হাতে টেস্ট পেপার তুলে দিচ্ছি, তারপর একটা ভিখারিকে বাজারে কচুরি খাওয়াচ্ছি। অনেক অনেক লাইক আর কমেন্ট পড়েছে। সেখানে আমাকে উদার মহান হৃদয়বান দয়ালু মহানুভব দানশীল ইত্যাদি ইত্যাদি বিশেষণে ভূষিত করা হয়েছে। অনেকে আমার পদধূলি চেয়েছে। কতজন বলেছে, তারা আমাকে দেখে অনুপ্রাণিত। তারাও চেষ্টা করবে গরীব দুঃখী মানুষ বা অবলা প্রাণীদের পাশে দাঁড়াতে। আমাকেই আদর্শ করে এগোতে চায় তারা।
শব্দগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি আমি। মহান উদার হৃদয়বান মহানুভব। হঠাৎ মনে হল শব্দগুলো কাঁপছে। ছটফট করছে। কিছু বলতে চাইছে। আমি কান পেতে শোনার চেষ্টা করি। বলছে– এখানে আমাদের দমবন্ধ লাগছে। আমরা থাকতে পারছি না। বড় কষ্ট! আমাদের মুক্তি দাও।
আমিও কেঁপে উঠলাম। বুঝলাম, কী নিদারুন কষ্ট ওদের। তারপর মন শক্ত করে মোবাইল স্ক্রিনে আঙুল ছোঁয়ালাম। ডিলিট!
