bibidho-gotir-yugay

গতির যুগে হাঁপিয়ে ওঠা জীবন
রম্যরচনা
প্রিয়াঙ্কা কর্মকার

সকাল ছ’টার অ্যালার্মটা বাজার বহু আগেই মাথার মধ্যে একটা অবুঝ টিকটিক আওয়াজ শুরু হয়ে যায়। এ যুগে মানুষের ঘুম ভাঙার প্রক্রিয়াটা আর পাখির ডাকে বা জানলা গলে আসা নরম রোদে হয় না, হয় অ্যালার্মের কানের পর্দা ফাটানো রিংটোন বা ফোনের নোটিফিকেশনের ঘ্যানঘ্যানে আওয়াজে। চোখ খুলেই প্রথম যে প্রশ্নটা অবচেতন মনে উঁকি মারে, তা হলো—”আজ কটা কাজ বাকি?” প্রাতঃস্মরণীয় হওয়ার দিন কবেই শেষ হয়েছে; এখন সকাল মানেই এক বিশাল যুদ্ধক্ষেত্রের মহড়া, যেখানে প্রতি মুহূর্তে ডিফেন্স আর অ্যাটাক সামলাতে হয়। চিরায়ত উপন্যাসের চেনা চরিত্রগুলোর মতো আমাদের জীবনেও এক অদ্ভুত অস্থিরতা সবসময় কিলবিল করে, কেবল তফাত একটাই—তখনকার গল্পে তবুও একটা মধ্যবিত্ত মনস্তত্ত্বের ধীরস্থির মেলবন্ধন ছিল, আর এখন আমরা সবাই যেন এক অদৃশ্য রকেটের সওয়ারি।

 

মধ্যবিত্ত ফ্ল্যাটের রকেট সাইন্স –

শহর কলকাতার বা ততোধিক মফস্বলের কোনো এক মাঝারি মাপের ফ্ল্যাটে সকালবেলাটা দেখলে মনে হবে কোনো আধা-সামরিক ক্যাম্প চলছে। রান্নাঘর থেকে ড্রয়িংরুম—সব জায়গাতেই একটা অদৃশ্য সেকেন্ডস কাঁটা টিকটিক করতে থাকে। প্রেশার কুকারের চারটে সিটি বাজার আগেই গ্যাস বন্ধ করার মারাত্মক তাড়া, বাসের লাইনে দাঁড়িয়ে লজেন্স খাওয়ার মতো দ্রুত ব্রেকফাস্ট গলায় ঢেলে ফেলা, তারপর মেট্রোর টোকেন বা স্মার্ট কার্ড স্ক্যান করে প্ল্যাটফর্মে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়া—এটাই তো আমাদের প্রাত্যহিক রুটিন।

এককালে মানুষ জীবনকে উপভোগ করত, এখন জীবনকে যেন ‘ডেলিভার’ করা হয়। ডেডলাইন, টাইমলাইন, ইমেইল, হোয়াটসঅ্যআপের ব্লু টিক—সব মিলিয়ে আমাদের অস্তিত্বটাই একটা টাইম বোমার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা যেকোনো মুহূর্তে ফেটে পড়তে পারে। অফিস যাওয়ার তাড়া, বাসের ভিড় ঠেলে ওঠার মারামারি, ট্রেনের দরজায় ঝুলতে ঝুলতে সহযাত্রীর সঙ্গে রাজনীতি বা আইপিএল নিয়ে একপ্রস্ত কলোনিয়াল বকবক—এই সবই তো আমাদের রোজনামচা। কিন্তু কেউ কি কখনো থেমে ভেবেছি, আমরা আসলে কোথায় যাচ্ছি?

 

টেকনোলজি ও ‘সময় বাঁচানোর’ মহা ধোঁকাবাজি –

আগেকার দিনে দাদিমার ঝুলি বা মায়ের হাতে তৈরি সুক্তো বানাতে অনেক সময় লাগত। তখন জীবনটা এত ফাস্ট ছিল না ঠিকই, কিন্তু তাতে একটা নিজস্ব সুবাস ছিল। এখন ইন্সট্যান্ট নুডলস থেকে শুরু করে ইন্সট্যান্ট প্রেম—সবকিছুর গায়েই একটা “২ মিনিট” বা “এক ক্লিকে উপলব্ধ” ট্যাগ মারা আছে। টেকনোলজি নাকি আমাদের সময় বাঁচিয়েছে! কী সাংঘাতিক রসিকতা! যে টেকনোলজি সময় বাঁচানোর কথা ছিল, সেটাই আজ আমাদের জীবনের চাবিকাঠি কেড়ে নিয়ে আমাদের তার দাসে পরিণত করেছে।

আগে চিঠি আসার অপেক্ষায় মানুষ মাসের পর মাস জানালার দিকে তাকিয়ে থাকত, সেই অপেক্ষার মধ্যেও একটা অদ্ভুত মিষ্টি মাধুর্য, একটা মানসিক প্রস্তুতি থাকত। আর এখন? মেসেজ পাঠানোর তিন সেকেন্ডের মধ্যে রিপ্লাই না এলে দুশ্চিন্তায় প্রেসার লো হয়ে যায়—”কী ব্যাপার, ব্লক করে দিল নাকি!” বা অফিস থেকে একটা মেল পাঠিয়ে দশ মিনিট পর বসের ফোন চলে আসে—”মেলটা দেখলেন?” গতির এই বাড়বাড়ন্তে আমরা তথ্য পাচ্ছি প্রচুর, কিন্তু অনুভূতিগুলো সব জং ধরে যাওয়া সাইকেলের শেকলের মতো আটকে গেছে। আমরা ইমোশনগুলোকে টেক্সট মেমে বা ইমোজিতে সংকুচিত করে ফেলেছি। ভালোবাসাও এখন ফাস্টফুডের মতো—তাড়াতাড়ি অর্ডার দাও, তাড়াতাড়ি খাও, আর খিদে মিটলেই প্লেট ধুয়ে মুছে সাফ!

 

কর্পোরেট সিঁড়ি ও ইঁদুর দৌড়ের মোহ –

অফিস পাড়ার দিকে তাকালে তো আর কথাই নেই। সল্টলেক সেক্টর ফাইভ বা রাজর্ষি গোল্ডেন পার্কের চারপাশের রাস্তাগুলো যেন একটা ম্যারাথন ট্র্যাক। স্যুট-বুট পরা এক্সিকিউটিভ থেকে শুরু করে ল্যাপটপ কাঁধে ঝোলানো কর্পোরেট সুন্দরীরা যেভাবে ফুটপাথ দিয়ে পা চালিয়ে হাঁটেন, দেখলে মনে হয় পৃথিবীর কোনো গুরুত্বপূর্ণ সামিট এখনই পণ্ড হতে চলেছে। লিফটের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর মুখের দিকে তাকালে মনে হয়, তারা যেন কোনো বিচারালয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন।

“তাড়াতাড়ি করুন, মিটিং শুরু হয়ে গেছে!”—এই চারটে শব্দ যেন একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিশালী মন্ত্র। এই মন্ত্র জপ করতে করতে আমরা আসলে পৌঁছাচ্ছি কোথায়? প্রমোশন নামক গাজরটার পেছনে ছুটতে ছুটতে খোদ ঘোড়াটাই যে একদিন ক্লান্ত হয়ে টেম্পো হারিয়ে ফেলবে, সে খেয়াল কার আছে? হাইপারটেনশন, ডায়াবেটিস, স্পন্ডোলাইসিস—এগুলো এখন আর কোনো রোগ নয়, এগুলো হলো কর্পোরেট সমাজে সাফল্যের মেডেল! যার যত বেশি রোগ, সে তত বেশি ‘ডেডিকেটেড’ কর্মী। কী অদ্ভুত আমাদের মাপকাঠি!

 

আমাদের ছোটদের ছোটবেলা ও ইটের বোঝা –

বড়দের এই গতির ছোঁয়া থেকে আমাদের কচিকাঁচারাও রেহাই পায়নি। একটা আট বছরের শিশুর স্কুল ব্যাগের ওজন তার নিজের শরীরের ওজনের চেয়ে বেশি। সকাল ছটায় ঘুম থেকে উঠে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, তারপর ড্রইং, ক্যারাটে, মিউজিক ক্লাস, আর সন্ধ্যায় হোমটিউটরের ফৌজি প্যারেড। ছোটবেলা মানে যে বিকেলে রোদে দৌড়ে ধুলোবালি মাখা—সেটা এখন মিউজিয়ামের জিনিস। বাচ্চাদের শৈশবটাও এখন আর সবুজ ঘাসে গড়ায় না, গড়ায় আইপ্যাড বা ট্যাবের স্ক্রিনে।

প্রশ্ন করলে পেরেন্টসরা বলবেন, “ওকে কম্পিটিটিভ ওয়ার্ল্ডে টিকতে হবে তো!” আরে মহাশয়া, টিকিয়ে রাখতে গিয়ে মানুষটাকেই তো নিখোঁজ করে ফেলছেন! যে শিশুটার এখনো ঠিকমতো আকাশ চেনাই হয়নি, তাকে আপনি জিমে পাঠিয়ে সিক্স প্যাক অ্যাবস বানানোর স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। গতির এই জোয়ারে বাচ্চারাও আজ বড়দের মতো রোবট হয়ে গেছে। তাদের মুখে ক্লান্তি, চোখে রিলসের নেশা আর পিঠে বিশালাকার বইয়ের ব্যাগ।

 

সোশ্যাল মিডিয়া ও হাইপার-কানেক্টিভিটির নিঃসঙ্গতা –

আর সোশ্যাল মিডিয়ার গতি? ফেসবুকে একটা ছবি পোস্ট করার দশ সেকেন্ডের মধ্যে লাইক না পড়লে মনে হয় পৃথিবী রসাতলে গেল। ইনস্টাগ্রাম রিলসে সেকেন্ডে সেকেন্ডে মুখ বদলাচ্ছে, আমাদের মনোযোগের স্প্যান এখন একটা গোল্ডফিশের চেয়েও নিচে নেমে গেছে। সামনাসামনি বসে আড্ডা দেওয়ার সময় কারও নেই, কারণ সবারই ভার্চুয়াল দুনিয়ায় হাজারটা কাজ বাকি।

কফি শপে মুখোমুখি বসেও দুজনেই স্মার্টফোনে বুঁদ হয়ে থাকেন—”আরে দেখ না, ও একটা দারুণ রিল বানিয়েছে!” এই যে দূরত্ব কমিয়ে দেওয়ার গতির মোহ, তা আসলে মানুষকে আরও বেশি নিঃসঙ্গ করে দিয়েছে। আমরা সবার সাথে যুক্ত, অথচ ভেতরে ভেতরে পুরোপুরি একা। ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়েও আমরা সাহারার মরুভূমির মতো নিঃসঙ্গতা অনুভব করি।

 

উপসংহার: একটু থামার বিলাসিতা

তাহলে এই লাগামছাড়া গতির পরিণতি কী? আমরা ছুটছি, ছুটেই চলেছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, গন্তব্যটা কোথায়? পেটে গ্যাস, চুলে পাক, চোখে মোটা পাওয়ারের চশমা আর মনে অফুরন্ত ক্লান্তি নিয়ে একদিন যখন আমরা থামব, তখন হয়তো দেখব যে রেলগাড়িটা অনেক দূর চলে গেছে, আর আমরা ভুল স্টেশনে নেমে পড়েছি।

মহাত্মা গান্ধীর সেই অমর বাণীটি আজও আমাদের পথ দেখায়: “There is more to life than increasing its speed.” — Mahatma Gandhi

বাংলা অর্থ হলো —- 

জীবনের অর্থ কেবল তার গতি বাড়িয়ে চলা নয়।” তাই মাঝে মাঝে একটু থেমে যাওয়া দরকার। থামার মধ্যে কোনো অপরাধ নেই, ক্লান্তি মোচন করার মধ্যে কোনো লজ্জা নেই। স্পিডোমিটারের কাঁটাটাকে মাঝেমধ্যে শূন্যে নামিয়ে এনে নিজের হৃদস্পন্দনটা একটু শোনা দরকার। জীবন তো কোনো ফিকশন বা স্পিড থ্রিলার মুভি নয় যে প্রতি দৃশ্যে টুইস্ট চাই। জীবন হলো একটা সুন্দর নদী, যা এঁকেবেঁকে, আপন ছন্দে, ধীরেসুস্থে বয়ে চলে। চলুন না, আজ একটুখানি স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে হলেও নিজের মতো করে একটু নিশ্বাস নেওয়া যাক! জীবন তো একটাই, তাকে বুলেট ট্রেনের গতিতে বরবাদ না করে, একটু রিকশার ছন্দে উপভোগ করলেই বা ক্ষতি কী?

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *