দেশ এবং আমি
তসলিমা নাসরিন
দেশটার হয়েছে কী?
দেশটা কাঁদছে কেন এত?
যাকেই পাচ্ছি, জিজ্ঞেস করছি।
কেউ মুখ ফুটে বলছে না কী হয়েছে দেশের।
দেশটার ধারে কাছে যেতে আমার মানা,
আমার হাত জোড়ায় শিকল,
পা জোড়ায় শিকল,
আমি যে দৌড়ে গিয়ে দেশটাকে বাঁচাবো,
দেশটার চোখের জল মুছিয়ে দেব,
কোলে নিয়ে, দুহাতে জড়িয়ে,
পিঠে হাত বোলাবো, আর বলবো, আর কাঁদতে দেব না তোকে,
বলবো, কেউ তোর গায়ে আর থাবা বসাবে না—পারছি না।
থাবা যারা বসিয়েছে, তাদের আমি দূর থেকে দূর দূর করে তাড়াচ্ছি,
দেশটার গায়ে যারা আগুন লাগিয়েছে,
দেশটাকে পুড়িয়ে ছাই করতে চেয়েছে যারা,
তারা যেন দেশের নাগাল না পায় আর, দূর দূর করে তাড়াচ্ছি!
দেশটার গায়ে কালি লেপেছে যারা,
তাদের বলছি নিজেদের মুখ বুক কালিতে লেপে প্রায়শ্চিত্য করতে!
দেশটাকে চাবুক মেরে মেরে রক্তাক্ত করেছে যারা,
তারা কেন নিজেদের গায়ে চাবুক মারছে না!
দেশটাকে মাটিতে ফেলে পায়ে পিষছে যারা,
তাদের আমি ক্ষমা করতে পারছি না।
দেশটাকে যারা যার-তার কাছে বিক্রি করে দিয়েছে,
নিজেরাই যেন স্তম্ভিত হয়ে দেখে তারা নিজেরাই বিক্রি হয়ে গেছে,
অচেনা লোকের কাছে, অচেনা দেশে।
দেশটা কাঁদছে। আমি আমার শিকল ছিঁড়তে চাইছি, পারছি না।
দেশটা কাঁদছে।
আমার দিকে বড় করুণ চোখে তাকিয়ে আছে দেশ,
আমি তাকে বাঁচাতে পারছি না।
অথচ আশ্চর্য!
দেশটাই দূর থেকে বললো, দেশটা নাকি নিজের জন্য নয়,
কাঁদছে আমার জন্য, আমাকে স্পর্শ করতে পারছে না বলে কাঁদছে।
দেশটা নাকি কাঁদছে আমার মতো আরও শিকল-পরা অনেকের জন্য,
আমাদের চোখের জল মুছিয়ে দিতে পারছে না বলে কাঁদছে।
