দশভূজার দশ পদ
পাঞ্চালী দত্ত
অন্নপূর্ণে সদাপূর্ণে শঙ্করপ্রাণবল্লভে।
জ্ঞানবৈরাগ্যসিদ্ধ্যর্থং ভিক্ষাং দেহি চ পার্বতি॥
হে মা অন্নপূর্ণা, তুমি সর্বদাই পূর্ণ এবং দেবাদিদেব মহাদেবের প্রাণপ্রিয়া। আমাদের জ্ঞান ও বৈরাগ্য লাভের জন্য তুমি অন্ন ভিক্ষা দাও।
মা অন্নপূর্ণা – যাঁকে দুর্গা, কালী, অম্বা, জগদ্ধাত্রী এরকম নানা নামে ডাকি, পুজো করি … তাঁকে প্রার্থনা জানিয়ে শুরু করলাম আমার পুজো সংখ্যার লেখা। স্বয়ং মহাদেব যাঁর কাছে অন্ন ভিক্ষা চেয়েছিলেন পৃথিবীর দুর্ভিক্ষে তাই তাঁকে আজ লেখাটি নিবেদন করলাম নৈবেদ্য রূপে।
সনাতন ধর্মে দেব দেবীর পূজার্চনার ষোড়শোপচারের মধ্যে অন্যতম হল নৈবেদ্য। বাঙালির সবচেয়ে বড় দুর্গাপুজোতেও নানাপ্রকার ভোগ সাজিয়ে মাকে অর্পণ করা হয়। লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে কোনো পুজোয় যখন আমরা ভোগ দেই সেই নিয়ম বা ভোগের মধ্যে থাকে আঞ্চলিক ফল, সবজি, মশলা ইত্যাদি। শুধু তাই-ই নয় রান্নাশৈলীতে তার ছাপ পড়ে পুরোপুরি। মজার ব্যাপার হল আমাদের দৈনন্দিন জীবনে খাবারে প্রভূত পরিবর্তন হলেও পুজোতে ‘সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে’। আজ সেরকম রান্না বা ভোগ নিয়ে কিছু কথা লিখব।
বাঙালির রান্নাবান্না বিভিন্ন জাতির আগমনে বঙ্গে তার রূপ, গন্ধ, বর্ণ, স্বাদে পরিবর্তন ঘটেছে এবং ধীরে ধীরে সেগুলো কিভাবে ট্র্যাডিশনাল খাবারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে ইতিহাস ঘাঁটলে অবাক লাগে।
শুক্তো: সংস্কৃত শব্দ শুক্তি থেকে উৎপত্তি। বাংলায় ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে শুক্তোর একটা বিশেষ যোগ আছে। শীত পেরিয়ে বসন্ত আগমনে কিছু রোগকে প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহার করতে শুক্তোর সৃষ্টি। খনার বচনে পাই, আগে তিতা, পরে মিঠা। শুক্তো শুরুতে পরিবেশন করা হয় এইজন্য যে, তেতো জিভের স্বাদ ও খিদে বাড়িয়ে তোলে।
বাংলার কাব্যগ্রন্থে, বৈষ্ণব সাহিত্যে শুক্তো শব্দটির উল্লেখ পাওয়া যায় বহুবার। বেগুন, কুমড়ো, কাঁচকলা, থোড়, মেটে আলু, ওল, পলতা পাতা বা নানাধরনের তেতো পাতার সঙ্গে মিশিয়ে তৈরি হতো শুক্তো। তাতে দেওয়া হতো সাদামাটা মশলা যেমন হিং, জিরে, মেথি, কালোজিরে। পর্তুগীজদের আগমনের ফলে বঙ্গে খাবারের পরিবর্তন হয় প্রভূত। শুক্তোতে যোগ হলো আলু, মিষ্টি আলু, শিম, পেঁপে ইত্যাদি।
মাছপ্রধান জায়গা বলে প্রথমে দেওয়া হত মাছের মুড়ো, কাঁটা। যার ফলে তার স্বাদ বেড়ে যেতো বহুগুণ। তখন বঙ্গে ছিল না নানারকম মশলা ও সবজি। তবে বৌদ্ধ ও বৈষ্ণব প্রভাবে নিরামিষ খাবার প্রচলনের ফলে স্বাদ বাড়াতে মশলা হিসেবে দেওয়া হল পোস্ত বাটা, দুধ ও বড়ি। ধীরে ধীরে শুক্তো আমিষ থেকে নিরামিষ পদে এগোলো এবং ভোগেও যোগ হল সেই পদ।
পোস্ত : এই উপকরণকে বাঙালি কতভাবে, কত নমুনায় রান্না করেছে তার ইয়ত্তা নেই। তরকারির স্বাদ বাড়াতে গ্রেভি হিসেবে, বড়া, বাটা, ভাপা সবেতেই সে সগর্বে হাজির। কিন্তু এই আকাশছোঁয়া দামের পোস্ত আগে যে ছিল বর্জনীয় পদার্থ, ভাবা যায়!
আঠারো শতকের মাঝামাঝি ভারতবর্ষের রইলো না কোনো বাঁধন। জোরকদমে শুরু হল অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক শক্তিকে ইংরেজরা ভালোভাবেই গ্রাস করতে শুরু করল। আন্তর্জাতিক ব্যবসা। সুজলম সুফলম দেশ থেকে রপ্তানির পাশাপাশি চিন থেকে বহুল পরিমাণে যে দ্রব্যের আমদানি শুরু হল সেটা ছিল চা। তার সঙ্গে চিনা বাসন। চায়ের নেশায় ইংরেজরা এতটাই মজে গেল যে বিপুল পরিমাণে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হল চা রপ্তানির ফলে। ব্রিটিশ বণিকেরা এই নেশা থেকে মুক্ত হতে উপায় নিল আরেক নেশার। যে নেশায় মজলে একটা সমাজ, রাষ্ট্র ধ্বংস হয়ে যায় অতি শীঘ্রই এবং সেটা হলো আফিম বা পপি। সেইমতো শুরু হলো প্ল্যানিং। বঙ্গে তখন ধান, গম, ডাল চাষ হচ্ছে ভালোভাবে। কিন্তু ১৭৭৩ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস আফিম চাষের ওপর কোম্পানির একচেটিয়া অধিকার কায়েম করলেন। শুরু হলো দাদন প্রথা। কৃষকদের অগ্রিম সামান্য টাকা দিয়ে বাধ্য করা হতো আফিম চাষ করতে ধান, গম, ডালের পরিবর্তে। বর্তমান বিহার, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, মালদহ অঞ্চলে আফিম চাষ করিয়ে পাঠানো হতো গুপ্তভাবে চীনে। আফিমের নেশায় তখন চীনাদের জীবন বিপন্ন, দেশ পিছিয়ে পড়ছে। এই নিয়ে যুদ্ধ বাধে ইংরেজদের সঙ্গে চীনাদের দুবার। সে গল্প নাহয় হবে আরেকদিন।
এদিকে বঙ্গে প্রধান খাদ্য উৎপাদন বন্ধ আফিমের চাষে। গরীবদের বাড়িতে খাবার নেই। উৎপাদন বন্ধের কারণে শুরু হলো তীব্র খাদ্য সংকট। দেখা দিল দুর্ভিক্ষ। খিদের পেটে চাষিরা আফিমের ফেলে দেওয়া ফুলের ভেতর থেকে ধূসর রঙের সাদা দানার আশ্রয় নিল। যদি কিছু তৈরি করে সেটা খেয়ে বাঁচা যায়! বাড়িতে এনে প্রথমে পশুকে খাইয়ে পরীক্ষা করে দেখা গেল যে তারা দিব্যি বেঁচে আছে। রান্না করে খেয়ে বোঝা গেল যে সেখান থেকে কোন নেশার দ্রব্য তৈরি হচ্ছে না। স্তূপ করে ফেলে দেওয়া এই জিনিস তখন কুড়িয়ে শুরু হল রান্না। এক একটা পরিবার বেঁচে গেলো পোস্তর আশীর্বাদে।
আমরা যখন পুজোতে পনির বা ছানা রান্না করি, তাতে পোস্তবাটা অবশ্যই যোগ করি যার ফলে স্বাদ বেড়ে যায় বহুগুণ।
ছানার ডালনা : ছানার ডালনা ভোগে আমাদের ‘মাস্ট’ রেসিপি। কিন্তু যে ছানা আমাদের কাছে অপবিত্র ছিল সেই ছানাই একদিন হয়ে গেল ভোগের পদ। শুধু তাইই নয় ছানার তৈরি রসগোল্লা, সন্দেশ জায়গা করে নিল নৈবেদ্যে। সংস্কৃত অভিধানে ছানার তিনটি নাম পাওয়া যায় – আমিক্ষা, কিলাট, দুগ্ধকর্চিকা। ছানা যেহেতু দুধকে বিকৃত করে তৈরি করা হয় তাই বাঙালির কাছে এই খাবার মোটেও গ্রহণযোগ্য ছিল না। দুধকে ক্ষীর, মিষ্টি কিংবা পায়েস করে ভোগে দেওয়াটাই ছিল প্রথা।
পর্তুগীজ আগমনে আবারও বাঙালির পাতে এলো বিপ্লব। পর্তুগীজদের যেহেতু চিজ একটি প্রধান খাদ্য ফলতঃ চিজ উৎপাদন করতে তারা দুধকে ছানা তৈরি করতে শুরু করল। পর্তুগীজদের হাত ধরে ‘মগ রাঁধুনি’ রা শিখল ছানা তৈরির পদ্ধতি। ধীরে ধীরে অপবিত্র ছানা জায়গা করে নেয় বাঙালির হেঁশেলে। শুধুমাত্র ছানা নয়, দুধ থেকে দই তৈরি করে সেই দই দিয়ে বানানো হতো চিজ যা আজও ব্যান্ডেল চিজ নামে খ্যাত।
খিচুড়ি : পুজোর ভোগ মানেই খিচুড়ি। এটা বাঙালির একটা অলিখিত নিয়ম বা চুক্তিও বলতে দ্বিধা নেই।
সিন্ধু সভ্যতায় নানারকম প্রমাণ পাওয়া গেছে খিচুড়ি নিয়ে। চাল, ডাল ও ঘি সহযোগে খিচুড়ি রান্নার কথা বেদেও উল্লেখ পাই। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে খিচুড়ির বিশেষ উল্লেখ রয়েছে ত্রিদোষ নাশক (বাত, পিত্ত, কফ) হিসেবে। হজমে যেমন সহজ, তেমনি শক্তিতে ভরপুর ও খরচ সামান্য। তাই দরিদ্র থেকে ধনী সবজায়গায় খিচুড়ি ছিল সমাদৃত। সেলুকাসের বিবরণীতে পাওয়া যায় খিচুড়ির কথা। তিনি লিখেছিলেন, ভারতীয় উপমহাদেশে এক অনবদ্য রান্না হয় যা চাল ও নানারকম ডালের সংমিশ্রণে। গ্রিকেরা খিচুড়ির নাম দিল – পিণ্ডা। মেগাস্থিনিসের ইন্ডিকা গ্রন্থেও খিচুড়ি ভুয়সী প্রশংসিত হয়েছে। মুঘল আমলে খিচুড়িতে মেশানো হত নানারকম শুকনো ফল, জাফরান এবং সেই পরিমাণে ঘি ইত্যাদি। অনেকের মতে, সেটা থেকেই পরবর্তীকালে রূপ নেয় ভুনা খিচুড়ির।
ইংরেজরাও খিচুড়ির স্বাদে মুগ্ধ হয়েছিল। উপকরণে সামান্য যোগ বিয়োগ করে নাম দিল কেজরি। যোগ হয়েছিল তাতে সেদ্ধ ডিম, স্মোকড ফিশ, মাখন, ক্রিম।
বাংলায় ডাল এসেছিল বা উৎপাদন শুরু হয়েছিল বহু পরে। ষোড়শ শতাব্দীতে ‘চন্ডীমঙ্গল’ কাব্যে প্রথম ডালের উল্লেখ পাওয়া যায়। মনসামঙ্গল কাব্যে আমরা দেখতে পাই যে শিব পার্বতীকে ডাবের জল দিয়ে খিচুড়ি রাঁধতে বলছেন। কিন্তু তার আগে কোনও বাংলা সাহিত্যে ডালের উল্লেখ পাওয়া যায় না। নীহাররঞ্জন রায়ের লেখনীতেও আমরা পাই যে প্রাচীন বাংলার খাদ্যতালিকায় ডালের উল্লেখ বা খাবারের প্রচলন ছিল না। তাম্রযুগে সিমের বীজ, কুলুত্থ কলাই যা পান্তা সহযোগে খাওয়া হতো সেগুলোর ইঙ্গিত প্রত্নতাত্ত্বিক বিচারে রয়েছে। মূল কারণ ছিল বাংলার আবহাওয়া। বর্ষা, বন্যা, মাটির আর্দ্রতা সবমিলিয়ে রবিশস্য ডালগুলো এখানে উৎপাদন করা ছিল অসুবিধে। পরবর্তীকালে কৃষিকাজের উন্নত অবস্থা হলে ডাল ফলন শুরু হয় বাংলায় এবং মুগডাল যেহেতু অন্যান্য ডাল থেকে বঙ্গের আবহাওয়াতে মানানসই ছিল কিছুটা বেশি তাই মুগডাল যোগ হল দৈনন্দিন খাবারে এবং সেইসঙ্গে ভোগের খিচুড়িতেও। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষদিকে চৈতন্যদেবের প্রভাবে সমাজে বৈষ্ণব ধারার প্রচলন হলে নিরামিষ পদ হিসেবে মুগডাল আরও জনপ্রিয় হয় যা ছিল সস্তা, পুষ্টিকর ও সহজপাচ্য।
বাসন্তি পোলাও : পোলাওয়ের বিষয়ে যদিও ভারতবর্ষের বেদ কিংবা মহাভারতে উল্লেখ রয়েছে, তবে পোলাও বিশেষভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে মুঘলকালে। তার কারণ, সুগন্ধি মশলা ও শুকনো ফলের আগমন ঘটে সেইসময়ে। আতর, গোলাপজল, জাফরান, নানারকম ফুলের পাপড়ি থেকে তৈরি নির্যাস ও শুকিয়ে নেওয়া পাপড়ির সুগন্ধ পোলাওকে করে তোলে একেবারে রয়েল ফুড বা রাজকীয় খাবার। মাংস দিয়ে পোলাও সাধারণত তৈরি হতো সেইসময়। তাই পোলাওয়ের আরেক নাম ছিল পলান্ন (পল অর্থাৎ মাংস +অন্ন)। মাংসকে সুস্বাদু করতে পশুদের ভালো খাবার খাওয়ানো, বিশেষ যত্ন করা হতো তাদের যাতে মাংসের কামড়ে স্বাদ গন্ধ ও কোমলতায় পোলাওতে আনবে এক নৈসর্গিক জাদু।
বাসন্তি পোলাও, জর্দা পোলাওয়ের একটি সাদামাটা রূপ যা জনপ্রিয় হওয়ার কারণ অতি কম খরচে পোলাওয়ের কিছুটা স্বাদ অন্ততঃ সাধারণ লোকের কাছে পৌঁছনো যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাই রেসিপিকে একটু পাল্টে পুরো ঘি তে রান্না না করে সেখানে মেশানো হল সাদা তেল। নানারকম দামি সুগন্ধি মশলার পরিবর্তে বাঙালির রান্নাঘরের চিরাচরিত দারচিনি, এলাচ ও লবঙ্গ দিয়ে ফ্লেভার আনার চেষ্টা হল। কাজু তখন আমাদের হেঁশেলে সেভাবে ঢোকেনি। চিনাবাদামকে ভেজে খোসা ছড়িয়ে দেওয়া হল পোলাওতে। কিশমিশের দাম বা যোগানে তেমন সমস্যা না থাকায় পোলাও তে কিশমিশের উপস্থিতি মন্দ ছিল না। পরবর্তীকালে কাজু সহজলভ্য হল এবং মানুষের কেনার সামর্থ্য বাড়লে চিনাবাদাম সরে গিয়ে কাজু চলে আসে পোলাওতে। ব্যস্, দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো গেল। বাংলার সুগন্ধি গোবিন্দভোগ চালকে ব্যবহার করা হল বাসমতির পরিবর্তে। বাঙালি তার বাঙালিয়ানায় সৃষ্টি করল নতুন পদ, যার নাম বাসন্তি পোলাও। বাসন্তি রং আনতে দামি জাফরানের বদলে ব্যবহার হল হলুদ। পোলাওয়ের মধ্যে একটা পবিত্র সুবাস ও বর্ণ পাওয়া যায় যা পুজোর জন্য মনে হয় পদটি যথাযথ। তাই বাঙালি দেরি করেনি। ভোগে চলে এলো বাসন্তি পোলাও।
লুচি : বাঙালির উচ্চবিত্ত সমাজের শৌখিন খাবার একসময় ছিল লুচি। ময়দার ব্যবহার বা জনপ্রিয়তা তখনও ভারতবর্ষে এসে পৌঁছয়নি। তাই প্রাচীন বাংলা কাব্যগুলিতে লুচির নাম পাওয়া যায় না।
মেহেরগড় সভ্যতায় পাওয়া যায় গমের চাষ এবং সেখান থেকে সিন্ধু অববাহিকা, হরপ্পা হয়ে গঙ্গা যমুনা তীর ধরে পৌঁছয় বাংলায়। বাংলার জলবায়ুর কারণে গম চাষ তেমন পরিমাণে হত না। যার জন্য পাঞ্জাব, মহারাষ্ট্র, বিহার ইত্যাদি রাজ্যে রুটি প্রধান খাদ্য আর আমাদের ভাত। কৃষিকার্যের উন্নতির পর গমের ফলন বাড়তে লাগলো এবং পর্তুগীজদের অবদানে তৈরি হল ময়দা। গমের ওপরের আবরণকে ফেলে দিয়ে আরও মিহি গুঁড়ো করে ময়দা সাদা ধবধবে সাজে এলো বাজারে। পর্তুগীজদের অসুবিধে রইলো না পাউরুটি বানাতে আর তেলখেকো বাঙালির গবেষণা চলল রান্নাঘরে ময়দা নিয়ে। পাউরুটির স্বাদ কি আর তাদের জিভে ধরে! ফলস্বরূপ সৃষ্টি হলো লুচির। তাই একটা জিনিস লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাই ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রান্তে আটা দিয়ে তৈরি হয় পুরি। পুরি রান্নার বিষয়ে প্রাচীন যুগের বইতে পাই যেখানে তার নাম ছিল শষ্কুলী বা লোচক। বেশি ময়ান দিয়ে বানানো হত মুচমুচে খাস্তা, ময়ান ছাড়া সাপ্তা ও আটা দিয়ে পুরি।
লুচির জনপ্রিয়তায় যার অবদান রয়েছে তিনি হলেন বিখ্যাত বাঙালি আয়ুর্বেদ চিকিৎসক চক্রপানিদত্ত। তিনি ছিলেন দ্বাদশ পাল সম্রাট নয়পালের চিকিৎসক। তিনি টিকা গ্রন্থে শষ্কুলীর উল্লেখ করেছেন। তার বাবা নারায়ণ দত্ত ছিলেন রন্ধনশালার উপদেষ্টা। পাল সম্রাট রাজত্ব করতেন বিহার ও বঙ্গে। ফলতঃ একসময় পাটুলিপত্রে রাজধানী থাকায় সেই অঞ্চল বা তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের খাবারের প্রতিফলন দেখা যায় বাঙালির থালায়। শষ্কুলী নিয়ে আলোচনা পাওয়া যায় তাঁর গ্রন্থে। তাই ধারণা করা হয় লুচির জন্মের পেছনে যথেষ্ট অবদান রয়েছে শষ্কুলীর। বাঙালি অভিজাত পরিবারে লুচি খাবারের টুকটাক প্রচলন শুরু হলেও সাধারণ বা দরিদ্র শ্রেণির পক্ষে এই পদ তৈরি করাটা ছিল খরচ সাপেক্ষ। তাই বাংলার ঘরে ঘরে ফুলকো লুচি খাবারের অভ্যেসটা শুরু হয়েছিল বহু পরে। পরিশেষে লুচিশীল বাঙালির আবেগের এই পদটি চলে এলো পুজোর ঘরে, আদরে ও সোহাগে।
লাবড়া : লাবড়ার আদিরূপ লাফরা শব্দটি পাই চৈতন্যচরিতামৃতে। পাঁচমেশালি এই তরকারি অত্যন্ত প্রিয় ছিল মহাপ্রভু চৈতন্যদেবের। লাবড়া বাঙালি হেঁশেলের প্রাচীন একটি পদ যার মধ্যে নানারকম সবজি, সামান্য সর্ষের তেল, ফোড়ন, কাঁচালঙ্কা, হলুদ আর হাতের জাদুতে মাত করে দেয় রসনা। খিচুড়ির সঙ্গে লাবড়ার জুটি সুপারহিট হওয়াতে তাদের একসূত্রে বেঁধে ভোগ দেওয়া হয় পুজোতে।
পান্তা : বেঁচে যাওয়া আগের দিনের ভাতকে সংরক্ষণ করতে জন্ম হল পান্তার। মাটির হাঁড়িতে জল দিয়ে ভাত ভিজিয়ে রাখার পর দেখা গেল দিব্যি ভাত ভাল থাকছে এবং সেটা খেলে শরীর ঠান্ডা থাকছে। শুধু তাইই নয়, দেখা গেল পান্তা খেয়ে পাওয়া যাচ্ছে প্রচুর শক্তি। প্রধানতঃ চাষীদের ঘর থেকে শুরু হল পান্তা খাওয়ার চল। গ্রীষ্মপ্রধান দেশে গরিবের বাড়িতে সকালবেলা ভেজানো ভাত, পেঁয়াজ লঙ্কা সহযোগে পেট ভরে খেয়ে ক্ষেতে কাজ করা সারাদিন, পান্তার মতো ভাল খাবার আর কি হতে পারে! এছাড়া বাড়ির উঠোনে যদি শাকপাতা কিছু ফলে, সেটা দিয়ে ঝাল ভর্তা করে পান্তার সঙ্গে খাওয়া হলে তো ব্যাপারটাই আলাদা। এভাবে ধীরে ধীরে বাংলায় পান্তা খাবারের চল বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ল। সঙ্গত হিসেবে আজকাল কতকিছু খাওয়া হয় যে পান্তা এখন আর গ্রামবাংলার খাদ্যে আটকে নেই, একেবারে রয়েল ডিশ হয়ে রেস্তোরাঁর টেবিলে জায়গা করে নিয়েছে। পান্তা ভাতের উপকারিতা নিয়ে ডাক্তাররা পর্যন্ত পরামর্শ দিচ্ছেন।
পশ্চিমবঙ্গেও বহু বনেদি বাড়িতে দশমীতে মাকে পান্তা ভোগ দেবার রীতি চালু আছে। সঙ্গে দেওয়া হয় ভাজা, কচু শাক ইত্যাদি। আসলে মূল বিষয়টা হল আমরা যা খাই সাধারণত সেটাই নিজের মতো করে মাকে ভোগে দিতে পারলে এক অনাবিল আনন্দে মেতে ওঠে মন। সেখানে কোন শক্ত নিয়ম খাটে না। অনেকের মতে সাধারণ মেনু রাখার কারণ প্রথমত, মাকে তাড়াতাড়ি যাত্রা করতে হবে কৈলাশে তাই হাতে সময় খুব কম থাকে। দ্বিতীয়ত, ভরাক্রান্ত মন নিয়ে সেদিন রান্নার ইচ্ছেটুকু থাকে না। তারপর থাকে সিঁদুর খেলা। তাই ছোট্ট মেনুতেই সেরে নিতে হয় দশমী। অনেক বাড়িতে এটাও মানা হয়, মা তার সন্তানদের নিয়ে অনেক দূর যাত্রা করবেন তাই শরীর ঠান্ডা রাখতে পান্তা ভোগে দেওয়া হয়। মায়ের আঁচলে বেঁধে দেন তারা খই, চিঁড়ে, মুড়ি, মুড়কি, বাতাসা, শুকনো মিষ্টি যাতে রাস্তায় খিদে পেলে অসুবিধে না হয়। বিশ্বাস, ভালবাসা দিয়ে মাকে যখন আমরা সেই ভাবনায় দেখি তখন ‘আমার বাড়ির মেয়ে’ বলেই তাকে অনুভব করি। নাহলে যিনি প্রকৃতির নিয়ন্তা তার খাবারের জন্য ভাবনা!
পায়েস : ক্ষীর বা পায়সম ভারতবর্ষের বহু প্রাচীন খাবার। পায়েসের উল্লেখ আমরা রামায়ণে পাই যেখানে যজ্ঞের পায়েস খেয়ে দশরথের তিন রাণী সন্তানের জন্ম দেন। ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে প্রাচীনকাল থেকে পায়েস সমানভাবে সমাদৃত। রাজা নল যিনি রান্নায় অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন তার রেসিপিগুলোর মধ্যে আমরা পাই নানারকম পায়েস। যখন থেকে শুকনো ফল সহজলভ্য হল তখন থেকে পায়েসের স্বাদ আরও উন্নত অবস্থায় পৌঁছলো। বাংলার গোলা ভরা ধান ও গোয়াল ভরা গরু থাকায় সুগন্ধি যুক্ত গোবিন্দভোগ চাল ও দুধ দিয়ে তৈরি হল পায়েস। পুজো এবং যেকোন অনুষ্ঠানে পায়েস শুধুমাত্র একটা আইটেম নয় এটা বাঙালির আবেগ ও সংস্কৃতিতে জুড়ে নিয়মের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ল। ঘন ক্ষীর ও চালের সঙ্গে যখন মেশানো হয় পাটালি গুড়, পাবেন কি এমন স্বাদের খোঁজ গোটা পৃথিবী ঘুরে নিলেও?
চাটনি : চেটে খাওয়া থেকে তার নাম হয় চাটনি। ইতিহাসবিদের মতে তিনহাজার বছর আগে ভারতে মূলত ওষুধ বা পাচক হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল চাটনি। নানারকম পাতা, আদা, তেঁতুল ও ভেষজ উপাদান বেটে তৈরি হতো চাটনি।
বাংলার চাটনি বহু পুরোনো ও ঐতিহ্যমণ্ডিত একটি পদ। তবে বাংলোর চাটনি বর্তমান চাটনির মতো ছিল না। নানারকম টক ফল, পাতা ও গুড় সহযোগে পাতলা ঝোলের মতো করে বানানো হত চাটনি বা অম্বল।
কিন্তু ইংরেজ খাদ্যের প্রভাবে বাঙালির চাটনিতে এল বিপুল পরিবর্তন। মার্মলেড এবং জ্যাম থেকে উৎসাহিত হয়ে চিনি ফুটিয়ে মিষ্টি, ঘন ও চটচটে করে তৈরি করল চাটনি। তাতে পরে যোগ হলো নানারকমের শুকনো ফল। আম ও তেঁতুলের চাটনি খেয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নাবিকেরা অভিভূত হয়ে মাংসের একঘেয়েমি স্বাদকে দুর করতে সেই চাটনি নিয়ে যেত জাহাজ যাত্রায়। শেষমেশ সেটা ইংল্যান্ডে পৌঁছলে এতটাই জনপ্রিয়তা পায় যে Major Grey’s Chutney নামে বাণিজ্যিকভাবে স্বীকৃতি লাভ করে।
বাঙালির চাটনি পরিবেশন ভারতবর্ষের অন্যান্য জায়গা থেকে আলাদা। মশলাদার খাবারের পর প্যালেট ক্লিনজার হিসেবে চাটনি সার্ভ করা হয়।
তেষ্টা মেটাতে দেওয়া হয় ডাবের জল। ভোগের থালিতে মাকে পর পর আইটেমগুলো সেইভাবে সাজিয়ে দেওয়া হয় ঠিক যেমনটা অনুষ্ঠান বাড়িতে আমরা খেয়ে থাকি।
পুরোহিত মন্ত্র পড়েন ভোগ নিবেদন করে —
ওঁ চতুর্বিধানং সঘৃতং সুবর্ণপাত্রে ময়া দেবী সমর্পিতং তৎ। সংবীজ্যমানং মরুবৃন্দকৈস্তবং জুষস্ব মাতর্দয়য়া অবলোকম্
হে দেবী! চতুর্বিধ (চর্ব্য, চোষ্য, লেহ্য, পেয়—এই চার প্রকার) খাদ্য ঘি-সহ শুদ্ধ পাত্রে আমি আপনাকে সমর্পণ করলাম। ভক্তগণ চামর ও পাখা দিয়ে আপনাকে বাতাস করছে এবং আপনার স্তব-স্তুতি করছে। হে মাতা, দয়া করে এই ভোগ গ্রহণ করুন এবং আমাদের প্রতি আপনার কৃপাদৃষ্টি নিক্ষেপ করুন।
ওঁ শান্তি, শান্তি, শান্তি।
