binodan-hanuman-ansh

হনুমান অংশ
ফিল্ম রিভিউ
সুরশ্রী ঘোষ সাহা 

সাধনার ক্ষমতাকে আমি বিশ্বাস করি। বিশ্বাস করি সাধনার মাধ্যমে কীভাবে মূলাধার চক্র থেকে সহস্রার চক্র পর্যন্ত খুলে গেলে সাধক মানুষ জীবন্ত অবতারে পরিণত হন। বিশ্বাস করি শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস, স্বামী বিবেকানন্দ কী লোকনাথ বাবার মতো আরো অজস্র সাধক পুরুষের ঐশ্বরিক ক্ষমতাকে।

যখন ‘হনুমান অংশ’ দেখতে গিয়েছিলাম তখন ছবিটা সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। কিন্তু তারপর গোটা ছবিটাই দেখলাম ভেজা চোখে, চশমা মুছতে মুছতে।

এই ছবি সাধক পুরুষ নিম করোলি বাবার জীবনের উপর নির্মিত। ছবিটি পরিচালনা করেছেন ও লিখেছেন, বিশাল চতুর্বেদী। ছবিটি তৈরির আগে নিম করোলি বাবার জীবনের উপর ভিত্তি করে তিনি যে বইটি লিখেছিলেন, তাঁর নাম ‘ডিভাইন ডিট্যুর: দ্যাট চেঞ্জড মাই লাইফ’।

কতগুলো নতুন মুখকে দিয়ে অভিনয় করিয়ে, বিনা প্রচারে একজন সাধক পুরুষের জীবনের এই গল্প বিগ বাজেটের ছবিকে টেক্কা দিয়ে প্রথম থেকেই হাউসফুল হতে শুরু করে। কারণ চলচ্চিত্রটি দর্শকদের মুখে মুখেই ইতিবাচক সাড়া পায়। শোনা যাচ্ছে, এটি সর্বকালের সবচেয়ে লাভজনক ভারতীয় চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে একটি হয়ে উঠেছে, যা ২ কোটিরও কম বাজেটে নির্মিত হয়েছিল। এখনো পর্যন্ত এটা ২০২৬ সালের তৃতীয় সর্বোচ্চ আয়কারী ভারতীয় চলচ্চিত্র এবং দেশীয়ভাবে ১৭তম সর্বোচ্চ আয়কারী হিন্দি চলচ্চিত্র বলেও জানা যাচ্ছে।

সাধনা মানুষের ভিতর থেকে আসে। একটা বালকের যখন কিছুতেই মন লাগে না, সে পড়তে ও খেলতে নয়, শুধুই ধ্যান করতে ভালবাসে তখন বড়রা সহজে তাকে বোঝে না। জানতে পারে না কেন সে সবার থেকে আলাদা। আর সেটা ঘটাই স্বাভাবিক। তেরো বছর বয়সী লক্ষ্মীনারায়ণ শর্মাও তেমন ভাবেই তাঁর প্রিয় মায়ের মৃত্যুর পর একদিন জন্মস্থান ছেড়ে চলে যান। মনের মধ্যে একটাই বিশ্বাস কাজ করে, একমাত্র শ্রীরামই তাঁকে তাঁর মায়ের সঙ্গে পুনর্মিলন ঘটাতে পারেন। হনুমান চালিসা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে, তিনি হনুমানের মাধ্যমে রামের সঙ্গে মিলন কামনা করেন। গুজরাটের রাজকোটের একটি বৈষ্ণব মন্দিরে, বৃদ্ধ মহন্ত তাঁর এই আধ্যাত্মিক প্রবণতা বুঝতে পারেন এবং তাঁকে পরীক্ষা করেন। লক্ষ্মীনারায়ণ শান্ত ও নিরহংকার থাকেন। সান্ত্বনা এবং প্রশংসাকে ফিরিয়ে দিয়ে সেখান থেকেও চলে যান। কারণ ঐ বালক তখন ঐটুকু বয়সেই আর কোনো বন্ধনে ও মায়ায় জড়াতে চান না।   

এই ছবিতে বালক লক্ষ্মীনারায়ণ থেকে নিম করোলি বাবা হয়ে ওঠার সময়ের বেশ কিছু সত্য ঘটনা দেখানো হয়েছে বলেই জানতে পারা যাচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে লক্ষ্মীনারায়ণ কীভাবে ঘুরে বেড়ান, গাছের নিচে ধ্যান করেন, নদীর ধারে ঘুমান এবং ভিক্ষা করে জীবনধারণ করেন সেই সবকিছুই এই ছবিতে আছে। কীভাবে প্রকৃতির মাধ্যমে তাঁর আধ্যাত্মিকতার বিকাশ ঘটে এবং তিনি বেশ কয়েকজন তপস্বীর, বিশেষ করে নাথ সম্প্রদায় এবং নাগ সাধুদের সংস্পর্শে আসেন তাও জানতে পারা যায়। একবার তিনি এত দীর্ঘক্ষণ জলের নিচে থাকেন যে গ্রামবাসীরা মনে করে তিনি ডুবে গেছেন, এরপর তিনি আবার ভেসে ওঠেন। পঁচিশ বছর বয়সে তিনি টিকিট ছাড়াই একটি প্রথম শ্রেণীর যাত্রীবাহী ট্রেনে চড়ে বসেন। একজন ঔপনিবেশিক কর্মকর্তা তাঁকে ট্রেন থেকে ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দেন। আর তার পরপরই রহস্যজনকভাবে ট্রেনটি চলে না। কর্মকর্তারা কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি খুঁজে পান না। রেলওয়ে ম্যানেজার পুরো ঘটনা শুনে বোঝেন, লক্ষ্মণদাসই (যে নাম তিনি পরে গ্রহণ করেন) এর জন্য দায়ী। কর্মকর্তারা তাঁর কাছে ক্ষমা চান। আর তিনি অলৌকিকভাবে চারটি প্রথম শ্রেণীর টিকিটও দেখান। কর্মকর্তারা শেষে ক্ষমা চেয়ে তাঁকে ট্রেনে ফিরে আসতে বললে লক্ষ্মণদাস বলেন, যে তাঁর কিছুরই প্রয়োজন নেই, কারণ হনুমানজিই তাঁর ভরণপোষণ করেন। তবে ভবিষ্যতে ভারতে কোনো সাধুকে যেন টিকিট না থাকার কারণে ট্রেন থেকে নামিয়ে দেওয়া না হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য সেখানে একটি রেলস্টেশন তৈরি করারও দাবি করেন।

এবং সেই স্টেশনটিই পরবর্তীকালে বর্তমান ফারুখাবাদ জেলার বাবা লক্ষ্মণদাস পুরী হল্ট স্টেশন নামে পরিচিত হয়। লক্ষ্মণদাসও এরপর থেকে নিম করোলি বাবা নামে পরিচিত হন।  

এই ছবির মাধ্যমে আমরা সেই আগের সময়কার বাল্যবিবাহ প্রথার কথা জানতে পারি। যে সামাজিক নিয়ম মেনে রামবেতি নামের এক মেয়ের সঙ্গে লক্ষ্মীনারায়ণের বাল্যকালে বিয়েও হয়েছিল। একজন গ্রামবাসী লক্ষণদাসকে ব্রজের প্রাক্তন বাসিন্দা হিসেবে চিনতে পেরে তাঁর বাবাকে খবর পৌঁছে দেন এবং তাঁর বাবা তাঁকে খুঁজে বের করে বাড়ি ফিরিয়ে আনেন, পুনরায় সেই বাল্যকালে বিয়ে করা বৌয়ের সঙ্গে বিয়ে দেন। কিন্তু সাধকের কি ঘরে মন টেকে? একটা কম্বল আর লাঠি হাতে আবার বেরিয়ে পড়েন তিনি। নীবকরোরি দর্শনে চলে যান। কিন্তু সেখানে মন্দিরের জমির মালিকের সঙ্গে বিবাদের জেরে আর থাকেন না। চলে যান নৈনিতালের নিকটবর্তী কাইঞ্চি পর্বতে।

এই ছবিতে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠার মতো বেশ কিছু অলৌকিক ঘটনা দেখানো হয়েছে। যে মানে সে বিশ্বাস করে। কাঁদে। ঘোরের মধ্যে থাকে। আর যে মানে না তার কাছে সবকিছুই বানানো কল্পকাহিনির মতো লাগে। তবু সব শেষে বলব, এই ছবি সেই সকল আধ্যাত্মিক মানুষের জন্য, যারা জানে ও মানে সাধনার ক্ষমতা কী! সাধক পুরুষের জীবন কেমন হয়!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *