aparbangla-editorial-edition-30

সম্পাদকের কলমে

বাঙালি হুল্লোড়বাজ। এ নিয়ে তাদের যথেষ্ট গর্ব আছে। হুল্লোড় সঙ্গে নিয়েই তারা গোটা জীবনটা কাটিয়ে দিতে পছন্দ করে। চারদিন ধরে দুর্গাপুজো ফূর্তিবাজ বাঙালির প্রাণের আরাম মনের ফূর্তি প্রকাশের সবচাইতে বড় একটা প্ল্যাটফর্ম। নামে চারদিন হলেও কখনও সেটাকে পাঁচদিন এবং সুযোগ থাকলে ছয়দিন পর্যন্ত টেনে বাড়ানো যায় বাবলগামের মতো, উদযাপনকে দীর্ঘায়িত করার কত না ছল রয়েছে!

পুজোর চারদিন একদিকে আর বছরের বাকি তিনশো একষট্টি দিন অন্য দিকে রেখে সমীকরণ মিলিয়ে দিতে বাঙালি কার্পণ্য করে না। কী নেই এই চারদিনে? নিয়মভাঙা খাওয়াদাওয়া, সাজগোজ, আড্ডা, বেড়ানো, সর্বোপরি বাঙালির আইডেনটিটি, প্রেম। পুরোনো প্রেম ঝালিয়ে নেওয়া, ভাঙবে ভাঙবে করছে এমন প্রেমে ঝালাই লাগিয়ে জুড়ে নেওয়া, নতুন প্রেমে পড়া। সেই প্রেম চারদিনের ও হতে পারে, চারবছরেরও হতে পারে বা সারাজীবনের। এখন তো আবার ‘পুজোর কদিন প্রেম করার জন্য সঙ্গী পেতে আমাদের নম্বরে যোগাযোগ করুন’- এরকম বিজ্ঞাপনও বার হচ্ছে। প্রেমিক বা প্রেমিকার হাত হাতের মুঠোয় ধরে প্যান্ডেল হপিং না করলে মজাটাই মাটি, তাই এই ব্যবস্থা। বাঙালি শিল্পসংস্কৃতি প্রিয়। পুজোর চারদিন মায়ের সামনে নৈবেদ্য হিসাবে তার নিদর্শন রাখাটাও তার পরম্পরা। এই তো কিছুদিন আগেও পুজোয় নতুন গানের অ্যালবাম বার হওয়াটা ছিল মাস্ট। তারও আগে বেরোত বিখ্যাত সব শিল্পীদের রেকর্ড। সারাবছর সঙ্গীতপ্রিয় বাঙালি অপেক্ষা করে থাকত সেই রেকর্ডের জন্য। তাই বলে অ-বিখ্যাত শিল্পীরা কিন্তু মায়ের প্রসাদ লাভে বঞ্চিত হয়নি তখনও, এখনও হয় না। পঞ্চমী থেকে পাড়ায় পাড়ায় বিচিত্রানুষ্ঠানের এমন আয়োজন হত যে ডেকরেটরের লোকজন শ্বাস ফেলার ফুরসৎ পেত না। অনেককিছু গেলেও সেই কালচার এখনও আছে। উদীয়মান শিশুশিল্পী, অস্তগামী প্রৌঢ়শিল্পী কে না থাকে পুজোর বিচিত্রানুষ্ঠানে!

মায়ের সামনে যখন বাঙালিয়ানার সবটাই নিবেদন করা হল, তবে লেখাপড়ার যে কালচার রয়েছে বাঙালিরক্তে, সেটাই বা বাদ থাকে কেন? অতএব শারদ সাহিত্য প্রকাশের বন্দোবস্ত। মাসিক পত্রপত্রিকা, সাময়িকী তো আছেই, তাছাড়া এমনও অনেক পুজোসংখ্যা প্রকাশ হয়, যারা কেবল বছরে একটিবারের জন্য মুখ দেখিয়ে যায়। পুজোর গন্ধ কেবল শিউলি ফুলে থাকে না, থাকেনা ধূপধুনো কর্পূরে। নতুন জামাজুতোর গন্ধের সঙ্গে নতুন বই, তাতে প্রিয় লেখক লেখিকাদের নতুন লেখা, তবেই না পুজোর আসল গন্ধ! এই গন্ধের জন্যই তো বছরভর অপেক্ষা!

‘অপারবাংলা’ও পুজোর আনন্দে নতুন একটা মাত্রা যোগ করতে চলে এসেছে সেরা শারদসাহিত্য নিয়ে।

এবারের শারদীয়া অপারবাংলার আয়োজন নেহাত ছোটখাটো নয়। তিনটি উপন্যাস, আঠারোটি ছোটগল্প, উনিশটি কবিতা, ন’টি অণুগল্প, সঙ্গে প্রবন্ধ, রম্যরচনা, মুক্তগদ্য, ফিচার, অনুবাদ, ভ্রমণ, রান্নাঘর আর বিনোদন মিলিয়ে বেশ জমজমাট আয়োজন। সব মিলিয়ে সত্তরেরও বেশি লেখা। পাঠকের পাতে এতরকম পদ সাজিয়ে দেওয়ার পর কোনটা ছেড়ে কোনটা পড়বেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব অবশ্য পাঠকেরই।

উপন্যাসের আসরে রয়েছেন অমর মিত্র তাঁর ‘অলীক স্বপ্নভূমি’ নিয়ে, রাজশ্রী বসু অধিকারীর ‘ভিক্টোরিয়ার নেকলেস’ এবং অজিতেশ নাগের ‘শ্যাডো অফ দ্য র‍্যাডক্লিফ লাইন’। ছোটগল্পের সম্ভারও বেশ সমৃদ্ধ। তিলোত্তমা মজুমদারের ‘বিস্মর’, হর্ষ দত্তের ‘প্রেমজ কোরক’, কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘বড়বাবা’, নলিনী বেরার ‘কুঞ্জ সাজায়ে রেখ গো’, কণা বসু মিশ্রের ‘ল্যাস্যময়ী’, জয়ন্ত দের ‘অমিয়ের তৃষ্ণা’, ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ‘বহ্নিশিখা’, ভাস্বর চট্টোপাধ্যায়ের ‘অতিথি দেব ভব’, দীপান্বিতা রায়ের ‘মাতৃদেবী নিরুদ্দেশ’ সহ আঠারোটি গল্প। প্রতিষ্ঠিত লেখকদের সঙ্গে রয়েছেন আরও অনেক প্রতিভাবান কথাসাহিত্যিক। গল্পের স্বাদ একেকজনের কাছে একেকরকম, তাই পছন্দের গল্প খুঁজে নেওয়ার স্বাধীনতা রইল পাঠকের হাতে।

কবিতার আসরও কম আকর্ষণীয় নয়। তসলিমা নাসরিনের ‘দেশ এবং আমি’, স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর ‘মিথ্যে’, মন্দাক্রান্তা সেনের ‘হাই সেক্সি’, অংশুমান করের ‘মিমিজান ১৫’, রতনতনু ঘাটীর ‘তোমাকেই দেখছি’, রুদ্র শঙ্করের ‘ভালোবাসা এলে’ সহ উনিশটি কবিতা। কবিতা যাঁদের প্রিয়, তাঁদের জন্য যথেষ্ট রসদ রয়েছে। অণুগল্পের আয়োজনেও রয়েছেন নয়জন লেখক। অল্প কথায় অনেকখানি বলে ফেলার যে মুন্সিয়ানা, অণুগল্পের সেটাই তো আসল মজা।

বাঙালি হাসতে ভালোবাসে, আবার অন্যকে নিয়ে হাসতেও তার জুড়ি নেই। তাই রম্যরচনার আয়োজন বাদ দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। উল্লাস মল্লিকের ‘ফেসবুকে বিদ্যাসাগর’, ভগীরথ মিশ্রের ‘হংসমধ্যে বক যথা’, চুমকি চট্টোপাধ্যায়ের ‘ফিল্টার’, প্রিয়াঙ্কা কর্মকারের ‘গতির যুগে হাঁপিয়ে ওঠা জীবন’ রয়েছে এই বিভাগে। সুপ্রিয় চৌধুরী লিখেছেন ‘বিষয় যখন বিশ্বকাপ’, নবকুমার বসুর কলমে ‘ছেলেবেলা ডাকে অনন্তের পথে’, আর বিতস্তা ঘোষাল লিখেছেন ‘প্রকাশনার জগতে বাঙালি কন্যারা’।

প্রবন্ধ বিভাগে রম্যাণী গোস্বামীর ‘ইতিহাস বিস্মৃত নামগুলো’, নন্দিতা মিশ্র চক্রবর্তীর ‘সুগন্ধের ইতিবৃত্ত’, কৃষ্ণা রায়ের ‘অ্যামি কারমাইকেল’ এবং ড. শিবশঙ্কর পালের ‘জীবনানন্দ কবিতার ভৌগোলিক পরিসর’। রয়েছে চারটি অনুবাদ সাহিত্যও। ভ্রমণপিপাসু বাঙালির জন্য ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের ‘রবিঠাকুর, ওকাম্পো ও মেসির আর্জেন্টিনায়’, সাথী সেনগুপ্তের ‘অফ বিট’ এবং সুমেধা চট্টোপাধ্যায়ের ‘স্বল্পচেনা ডাউকি’। পুজোর সময় বেড়াতে না যেতে পারলেও লেখার হাত ধরে ঘুরে আসতে বাধা কোথায়!

আর পুজোয় খাওয়াদাওয়া থাকবে না, তা কি হয়? রান্নাঘরে সাবিনা ইয়াসমিন রিংকুর ‘ছুটির আয়োজন’ আর পাঞ্চালী দত্তের ‘দশভূজার দশ পদ’। বিনোদন বিভাগে প্রিয়ব্রত দত্তের জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘স্মৃতির ষ্টুডিও পাড়া’ পৌঁছেছে একুশতম পর্বে। সঙ্গে রয়েছে দুটি চলচ্চিত্র আলোচনা।

বাংলা সাহিত্যের প্রতিষ্ঠিত লেখকদের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের লেখকদের একই মঞ্চে নিয়ে আসার চেষ্টা অপারবাংলার শুরু থেকেই। এবারেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আটলান্টা থেকে প্রকাশিত এই ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকার শারদীয়া আয়োজন পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়তে পারবেন আপনারা। লেখকরা তাঁদের সেরা লেখাগুলো আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন, এবার সেগুলো পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়ার পালা। আপনাদের ভালো লাগা, মন্দ লাগা, মতামত সবকিছুর অপেক্ষায় থাকলাম।

শারদীয়ার আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক সকলের জীবনে। ভালো কাটুক পুজোর দিনগুলো, ভালো থাকুন আপনারা।

আনন্দ হোক!

শুভ নাথ
সম্পাদক
অপারবাংলা ত্রৈমাসিক বাংলা সাহিত্য পত্রিকা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *