bibidho-puran-o-poribesh

পুরাণ ও পরিবেশ 
ফিচার
জয়তী রায়

 

 

আজকাল গাছ কেটে ফেলার ধূম চলেছে। গাছ কেটে বাসস্থান তৈরি হচ্ছে। ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশের। ভারতবর্ষের আদিমযুগ থেকে প্রকৃতিকে রক্ষা করার চেষ্টা করা হয়েছে। আদিম আদিবাসীরা বেঁচে থাকত বনজ সম্পদ কেন্দ্র করে পরবর্তী কালে আর্যসভ্যতার সূচনাকালে প্রকৃতির প্রতি সচেতন থাকার জন্যে মাটি, জল, বায়ু, বৃক্ষ সমস্ত কিছু ঘিরে নিদির্ষ্ট করে দিলেন নিয়মের বাতাবরণ। ধর্ম জড়িত থাকলে গুরুত্ব বৃদ্ধি পায় সে কারণে বলা হয়ে থাকল — বাড়িতে তুলসি, আমলকি, অশোক ইত্যাদি গাছ লাগালে ইহলোক. পরলোক দুই ই ভাল থাকে। অশোক গাছ লাগালে নাকি অকাল মৃত্যু হয় না। আকস্মিক কোনো সমস্যায় পড়ে না। বজরংবলীর মন্দিরের সামনে রাখতে হবে পারিজাত। এইভাবে শাস্ত্র জড়িয়ে গেল বৃক্ষ রোপণের সঙ্গে। সবুজ হয়ে উঠেছিল আমাদের দেশ। আলোচ্য নিবন্ধে কিছু তথ্য দিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছি কতখানি পরিবেশ সচেতন ছিল প্রাচীন যুগ। বৃক্ষরোপণের উৎসাহ দেওয়া শুধু নয় প্রতিটি বৃক্ষের ওষধি গুণের আবিষ্কার করে জনসমক্ষে নিয়ে এসে সচেতন করা ছিল প্রধান কাজ। সেই গল্পগুলো হারিয়ে গেছে। বৃক্ষের মাহাত্ম্য আর বর্ণনা করা হয়না ভক্তির মোড়কে। পরিবর্তে আধিভৌতিক ঝাড় ফুঁক, তন্ত্র মন্ত্রের প্রচার বেশি। বৃক্ষের অলৌকিক ক্ষমতা, ওষধি ক্ষমতা, মানসিক অবসাদ কাটিয়ে ওঠার ক্ষমতা — এসব নিয়ে আলোচনা হয় না। সভ্যতার সংকট নেমে আসছে বৃক্ষ ছেদনের মধ্যে দিয়ে। বৃক্ষ ঘিরে পুরাণের গল্প থেকে জানা যায় সেই সময় পরিবেশের প্রতি কত যত্নবান ছিল মানুষ।

জীবকের কথা আমরা সকলেই জানি। শিক্ষার শেষে গুরু বলেছিলেন — এমন একটা উদ্ভিদ, লতা, গুল্ম নিয়ে এসো যার ওষধি গুণ নেই।

তক্ষশীলা মহাবিহারের ছাত্র জীবক কোমারভচ্চ। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন এক গণিকা পুত্র। তক্ষশীলা থেকে মানপত্র নিতে পারলে বদলে যাবে জীবন। তিনমাস সময়ের মধ্যে একটি নির্গুণ উদ্ভিদ এনে হাজির করতে পারলে সব স্বপ্ন পূরণ হবে। কিন্তু, একটাও উদ্ভিদ পায়নি যার ওষধি গুণ নেই।

গুরু খুশি হয়ে আশীর্বাদ করে বলেছিলেন — হে জীবক, প্রকৃত সত্য এটাই। গুণ শূণ্য উদ্ভিদ নেই। পৃথিবী  অচল উদ্ভিদ ছাড়া।

ভারতবর্ষ থেকে লোপ হতে বসেছে প্রাচীন সমস্ত ওষধি গাছ। মানুষের লোভের হাতে বিনষ্ট হতে চলেছে ব্রহ্মকমল। পাহাড়ের চূড়ায় ফুটে বাঁচে মাত্র এক রাতের জন্যে। আজ আর ফুটতে চায় না। কোথায় গেল সেই প্রাণশক্তির গাছ? বিশল্যকরণী? মৃত সঞ্জীবনী? সুবর্ণকরণী আর সন্ধানী?

অজানা – জানা সমস্ত উদ্ভিদকুল আজ অসহায়। সেই প্রেক্ষিতে এই নিবন্ধ রচনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে সচেতনতা। পুরাণের সময়কাল থেকে বৃক্ষ কতখানি আদরণীয় ও সম্মানের ছিল এবং কেন ছিল সেই বিষয়ে আলোকপাত করা।

দুটি ভাগে বিভক্ত এই আলোচনা। প্রথমপর্বের জন্যে কতগুলি বৃক্ষ নির্দিষ্ট করে মহিমা কিভাবে বর্ণিত হয়েছে পুরাণে আলোচনা করা হবে। তবে, মহাত্মা জীবকের কথা অনুসারে মহিমা ধারণ করে আছে সমস্ত বৃক্ষ। সঙ্গে জড়িয়ে আছে গল্প।

ছোটবেলায় দেখেছি, গাছ কাটতে এসে থমকে গেল লোকটা। আপনমনে বিড়বিড় করছে। একসময় কেঁদে ফেলল। গাছ কাটল না। অশ্বত্থ গাছ নাকি দেবতা! কাটলে পাপ হবে। সরল ভাষায় সে বলেছিল, বৃক্ষ ছাড়া বাঁচে না জীবন। তুলসীতলায় পিদিম কেন দেয়? কত ভাবে রক্ষা করে জানো? দরকারে ছাড়া মারতে নাই গাছ।

বড় হতে হতে ভেবেছি, ভারতবর্ষ কেন ভাবে এইভাবে? কোথায় লেখা আছে এমন কথা? অনুসন্ধান শুরু হতে লাগল পুরাণ দিয়ে। পুরাণ তো পুরাতন কথা। পুরাতন কথা জানলে বেশ অবাক হতে হয়। এই যে আজকের পৃথিবী এত পরিবেশ বাঁচাও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন করে চলেছে, প্রাচীনকালের মানুষজন যাতে সতর্ক হয় এবং অযথা ক্ষতি না করে বনজ সম্পদের। সমাজের মাথা হিসেবে জ্ঞানী ঋষি কতগুলি আইন চালু করে দিয়েছিলেন। সেই আইন ভঙ্গ যেন না করে তার জন্যে চাপিয়ে দিলেন ধর্মের আবরণ। পরিবেশ রক্ষার জন্যে কি কি করেছিলেন ঋষিবৃন্দ? আগে বলি, এমন কোনো বিষয় নেই যা পুরাণে নেই! হিন্দু শাস্ত্রে সবচেয়ে আগে আসে বেদ। সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরেই থেকে যায়। তারপর, উপনিষদ। সেখানে কঠিন আধ্যাত্মিক দর্শন বোঝানো হতে থাকল সহজ করে। কিন্তু, গ্রামীণ মানুষ বা সাধারণ মানুষের না আছে সময় না আছে ইচ্ছে! তাহলে উপায়? শুরু হল গল্প কথা। সহজ গল্পের ভিতরে থাকল কঠিন দর্শন।

ভারতবর্ষের সম্পদ পুরাণ। প্রাচীন ভারতের সমাজ, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় জীবনের কথা জানতে যে আনন্দ হয় পুরাণ না থাকলে কি করে সম্ভব হত? পুরা কালের ইতিহাস হল পুরাণ। সংখ্যা অনেক হলেও ১৮ টি মহাপুরাণ ও ১৮ টি উপপুরাণ প্রসিদ্ধ। এখন বিষয় যেহেতু পরিবেশ তখন সরাসরি চলে যাই বিষয়ের মধ্যে। কিভাবে বৃক্ষ হয়ে ওঠে কল্পতরু? বটবৃক্ষ ইচ্ছা পূরণ করে? অশ্বত্থ কল্যাণ করবে?

স্কন্দ পুরাণ বলেছে — যে ব্যক্তি একটি অশ্বত্থ, একটি নিম, দশটি তেঁতুল, তিনটি কৈথ, তিনটি বেল, তিনটি আমলকী ও পাঁচটি আম গাছ লাগান তিনি কখনো নরক দর্শন করেন না।

এই যে বলা হল নরক দর্শন হবে না, এই কথাটি সত্য হোক চাই না হোক, ধর্মগ্রন্থ বলেছে সুতরাং লাগাও এই গাছ! প্রতিটি গাছের কিন্তু ওষধি মূল্য আছে।

ব্রহ্মপুরাণ মতে — বৃক্ষদের আত্মা থাকে। যদি যত্ন করা হয় তবে ফিরিয়ে দেয় আশীর্বাদ। সংসারের মঙ্গল হয়। বাত, পিত্ত ও কফ সারিয়ে তোলে অশ্বত্থের ছায়া।

অর্থববেদ জুড়ে আয়ুর্বেদের নানান শ্লোক ছড়িয়ে আছে। সেখানেও বলা হয়েছে কল্পবৃক্ষ অশ্বত্থ গাছ বাস করেন তেত্রিশ কোটি দেব দেবী। পুরাণকার বলেছেন — এই গাছে জল অর্পণ করলে, রোগ, শোক দুর হয়। গীতায় কৃষ্ণ বলেন — হে পার্থ, বৃক্ষের মধ্যে আমিই অশ্বত্থ।

অশ্বত্থের দর্শন ও পুজো করলে দীর্ঘায়ু ও সমৃদ্ধি লাভ সম্ভব হয়।

বটবৃক্ষের মাহাত্ম্য অনেক, বলেছেন পরিবেশ বিজ্ঞানী ঋষিবৃন্দ।

বট গাছ নিয়ে পুরাণ কথনের সীমা নেই। অমরত্ব ও জ্ঞানের প্রতীক। দীর্ঘ সুস্থ জীবনের প্রতীক। বট গাছ নিয়ে একটা ব্রত কথা প্রচলিত করেছিলেন শাস্ত্রকার জ্ঞানী ঋষিরা। কেন করেছিলেন? এই গাছের ছাল, পাতা, আঠা ও ফল বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় লাগে। ভারতীয় সংস্কৃতির উদার বিশাল মনোভাব ধরা পড়ে বট বৃক্ষের মধ্যে দিয়ে। বলা হয়, বট গাছ হাঁটে। আসলে, বিস্তার করে অনেকটা বড় জায়গা জুড়ে। গাছ নিজের মত করে জায়গা করে নেয়। শ্রীকৃষ্ণ নাকি বট গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ভগবৎ গীতার উপদেশ গুলি অর্জুনকে দিয়েছিলেন। আরো কত সম্মান দিয়েছে হিন্দু পুরাণ। ব্রহ্মা, বিষ্ণু মহেশ্বরের আবাস হিসেবে ধরা হয়েছে। শিকড় স্বর্গে এবং ডালপালা পৃথিবীতে বিস্তৃত। দেবী সাবিত্রী স্বামীকে ফিরে পাবার ব্রত করেছিলেন এই গাছের নিচে বসে। পরাশর মুনির মতে, বট মূলে তপোবাস মানে বটবৃক্ষের নিচে বসে মন্ত্র উচ্চারণ করলে ইচ্ছা পূরণ হয়। সন্তান ধারণের ইচ্ছে থেকেও বটবৃক্ষের পুজো হয়। মহাভারত বলেছে — এক মা ও তাঁর মেয়ে দুটি আলাদা আলাদা বটবৃক্ষকে আলিঙ্গন করেছিল। ফলে তাদের দুই সন্তান হয়েছিল। একজন বিশ্বামিত্র ঋষি। অন্যজন জমদগ্নি।

পুরাণের গল্পে বটবৃক্ষের কথা এসেছে বারবার। মানবজাতির কল্যাণার্থে বটবৃক্ষের রোপণ — বলেছে শাস্ত্র। দেবী দুর্গার আর এক রূপ দেবী অম্বার সঙ্গে পাতালবাসী নাগরাজ বাসুকির ভয়ঙ্কর যুদ্ধ বেঁধে যায় পাতালে অবস্থিত বটবৃক্ষকে কেন্দ্র করে। অম্বা সেই যুদ্ধে প্রাণ হারান। তারপর, দেবী পার্বতীর সহায়তায় অম্বা প্রাণ ফিরে পেয়ে বটবৃক্ষ নিয়ে এলেন পৃথিবীতে।

ক্লান্ত পথিকের আশ্রয় বটবৃক্ষের মহিমা বর্ণনা করে মানব জাতিকে সতর্ক করা হয়েছে এই গাছকে যত্ন করার জন্যে। চরক – শুশ্রুত – আয়ুর্বেদ সংহিতায় বলা হয়েছে, মানুষের বিভিন্ন  নিরাময়ে বট পাশে দাঁড়িয়েছে।

ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বরের আশীর্বাদ আছে যে বৃক্ষে তাঁর দর্শন মাত্রে পাপ দূরে যায়। অক্ষয় অটল আশ্রয়, সমৃদ্ধি ও জীবনের প্রতীক। বটবৃক্ষ: স্থিত: স্থানে — একস্থানে স্থির এই বৃক্ষের পুজো প্রথম কৃষ্ণ অমাবস্যার দিনে করলে সৌভাগ্য স্থায়ী হয়। বাতাসে মধু বয়, নদীর জলে মধুর ক্ষরণ, ওষধীরা মধুময় হোক। পৃথিবীর ধূলি মধু। বনস্পতি, সূর্য, গাভীরা সব মধুময় হোক।

ওম শান্তি শান্তি শান্তি( বৃহদারণ্যক)

মহাজাগতিক আনন্দ ও শান্তির ধারণা প্রকাশ করে বৃক্ষ, বলে ঋগবেদ।

যেমন কদম্ব বৃক্ষ। শ্রবণ মাত্রই মনে পড়ে রাধা – কৃষ্ণের প্রেম, যমুনার জলধারা, ঘনঘোর বর্ষায় অভিসারের কথা। কদম গাছে বর্ষার জল পড়লে তবেই ফোটে ফুল। বৈষ্ণব সাহিত্যের সঙ্গে জড়িত এই গাছ হরিপ্রিয়া নামে পরিচিত। কালীয় দমনের সময় এই গাছ থেকেই যমুনায় ঝাঁপ দেন কৃষ্ণ। মাতা যশোদাকে বিশ্বরূপ দর্শন করানো হয় কদম্ব গাছের নিচে। গোকুলে আছে ছয়হাজার বছরের পুরানো কদম্ব গাছ। কার্তিক পূর্ণিমার সময় যমুনার ঘাটে স্নান করে ভক্তরা এই গাছের পুজো করে। মনের ইচ্ছা পূর্ণ হয়। এই গাছ বাড়ির জন্যে শুভ। বাস্তুশাস্ত্র অনুসারে দক্ষিণ পশ্চিম বা পশ্চিম দক্ষিণ দিকে কদম্ব গাছ লাগানো শুভ বলে মনে করা হয়।

কৃষ্ণ প্রিয় এই গাছের ফল শরীর ও স্বাস্থ্যের জন্যে উপকারী। ভাগবত পুরাণ বলেছে — বাত, পিত্ত, কফ নিয়ন্ত্রণ করে।

কর্নাটকে প্রতি বছর পালন করা হয় কদম্ব উৎসব। বিষ্ণুর পরম ভক্ত ধ্রুব — কদম্ব গাছের নিচে বসে সিদ্ধি লাভ করেছিলেন।

পৌরাণিক কাহিনীর আয়ুর্বেদিক শাস্ত্র অনুসারে মচকে গেলে কদম পাতা গরম করে সেঁক দিলে ব্যথা কমে যায়। পুরুষদের শুক্র শোধনে কদমগাছ খুব উপকারী।

কৃষ্ণলীলার মূল ব্যাপারটি ছিল দেহজ। দেহ অতিক্রম করে আধ্যাত্মিক দিকে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে বৈষ্ণব সাহিত্যে। কিন্তু, দেহজ লীলার সঙ্গে কদম্ব গাছের রেণু থেকে পাওয়া যৌবন এনার্জির সংযোগ অস্বীকার করা যায় না।

আজকাল গ্রাম বাংলায় আছে কদম্ব গাছ। কিন্তু, লোক জানে না তাঁর দৈবী গুণ। কদম গাছের ফুলের রেণু মেখে রাজা রানির দল যৌন ক্ষমতা বৃদ্ধি করত। আজকে তো ডাক্তার ছাড়া গতি নেই। ব্যাধি নিরাময়ের গুণ আছে বলেই শাস্ত্র উপাধি দিয়েছে —হরিপ্রিয়া। সপ্তপর্ণী / ছাতিম গাছ।

সংস্কৃত নাম সপ্তপর্ণী। সাতটি পাতা থাকে আর সময়কালে ( শরৎ / হেমন্ত) ফোটে তীব্র সুগন্ধময় ফুল। যে ফুলের সৌরভ রাতের বেলা হয়ে ওঠে মাদকতাময়। আরো কত যে নাম বলেছে সংস্কৃত সাহিত্য। শারদা, বিশালাবকা, গন্ধিপর্ণা, জীবনী ইত্যাদি। ব্রহ্মপুরাণ বলেছে, সপ্তপর্না নামে এই বৃক্ষ যার সাতটি পাতা থাকে এর ফুল শারদীয় সুগন্ধ যুক্ত এবং এতে ওষধি গুণ রয়েছে। একই কথা বলছে চরকসংহিতা ও সুশ্রুত সংহিতার মত প্রাচীন গ্রন্থ। তরুক্ষীর অর্থাৎ গাছের পাতা, ছাল কাণ্ড থেকে পাওয়া সাদা তরল নির্দিষ্ট মাত্রায় গ্রহণ করলে অমৃত নতুবা প্রাণঘাতী।  সাতজন মহান ঋষির নাম জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যেমন – বশিষ্ঠ, মরিচী, পুলস্ত,পুলহ্, অত্রি, অঙ্গিরা ও ক্রতু। যাঁদের নাম আকাশের সপ্তর্ষিমন্ডলের সঙ্গে জড়িত। কোনো কোনো গল্পে বলা হয় এই ঋষিদের আশীর্বাদ ছিল উক্ত বৃক্ষের সঙ্গে।

সপ্তপর্ণী নিয়ে কত না গল্প, কত না লোককথা ছড়িয়ে আছে, বলে শেষ করা যাবে না। একাধারে ক্যান্সারের মত রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করে যায় এই গাছের ভিতরের রস আবার অন্যদিকে এই গাছকেই বলা হয় শয়তানের গাছ! রহস্যময় গাছটির বাংলা নাম ছাতিম গাছ কারণ সাতটি পাতা সহ ডাল ছিঁড়লে মনে হবে ছাতার মত দেখতে। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের জাতীয় গাছ এইটি একসময় বিপুল সমাদর ছিল  ওষধি গুণের জন্যে। এই গাছের থেকে পাওয়া যায় দুধের মত ল্যাটেক্স, ঘা এবং আলসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। আচার্য ভবামিশ্র রচিত ওষধি গ্রন্থে এই গাছের গুণ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। বিশেষ করে ম্যালেরিয়ার জন্যে ছাতিম বা সপ্তপর্ণীর ছাল ব্যবহার করা হয়।

লোককথা বলে, এই গাছে বাস করে আত্মা। জীবন থেকে মৃত্যুর সঙ্গে সংযুক্ত করতে পারে রাতের বেলার সুগন্ধ। পথিক পথ ভুলে গাছের নিচে চলে গেলে তীব্র শ্বাস কষ্টে মৃত্যু বরণ করে।

দক্ষিণ ভারতে এই গাছ নিয়ে চমৎকার গল্প আছে। একজন সুন্দরী যক্ষী বাসা বাঁধে এই গাছে। পুরুষ গ্রামবাসীর ওজন ধীরে ধীরে কমতে থাকলে সন্দেহ করা হয় সেই পুরুষ প্রেমে পড়েছে যক্ষিণীর। ভারতের গ্রামাঞ্চলে তরুণ যুবকদের সন্তরপর্ণী গাছের নিচে যেতে বারণ করা হয়। বস্তুত, পরাগ রেণুর সংস্পর্শে এলার্জি হতে পারে বলে এই ধরণের সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। হালকা কাঠে কফিন তৈরি হত বলেই কি শয়তানের গাছ অপবাদ বহন করেছিল ছাতিম?

পুরাণ খ্যাত সপ্তপর্ণী আজ কম দেখা যায়।  স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে এই গাছের ডাল দিয়ে সম্মানিত করতেন গবেষকদের। পরিবেশ বিপন্ন হওয়ার আগে সপ্তপর্ণী আবার ফিরে আসুক মহাসমারোহে।

 

 কলা – কথনঃ

গাঙ্গুরের জলে ভেসে চলেছে বেহুলা কলার ভেলায়। মঙ্গলকাব্যের এই দৃশ্য মনে গেঁথে আছে আপামর বাঙালির। বস্তুতঃ, প্রকৃতির মায়াময় উপস্থিতি মন শুদ্ধ করে তেমনি সে ব্যাপারে আলোচনায় সজীব হয়ে ওঠে চিত্ত। চোখের সামনে ভেসে ওঠে সবুজ চিকন বিশাল ভেষজ উদ্ভিদ। পাতাগুলি বড় বড় যেন হাত বাড়িয়ে কাছে ডাকে। মমতার নিবিড় বন্ধনে বেঁধে রাখে কলা গাছ যেন গৃহস্থের মা। আশ্রয়। জুড়িয়ে দেয় প্রাণ। গরীব গৃহস্থ গৃহের অঙ্গনে কলাগাছ লাগায়, দ্রুত বাড়ে, পুষ্টিগুণ ভরপুর গোটা গাছ মায়ের মত সন্তানের রক্ষণা বেক্ষণ করে। ফল দেওয়ার পরে কেটে ফেললে আবার কন্দ থেকে নতুন চারা হয়।

মানবজাতির প্রতি প্রকৃতির অসীম আশীর্বাদ কলা গাছ খনিজ পদার্থ, প্রোটিন, ভিটামিন, শর্করা, চর্বি, লৌহ ইত্যাদি নানান ওষধি গুণ সমৃদ্ধ। কলা ধনীর ঘরে দরিদ্রের ঘরে সমান ভাবে বিরাজ করে। মাতৃত্ব রূপের জন্যে কলা তুলনীয় দেবী পার্বতীর সঙ্গে। এই গাছের প্রতিটি অংশ পবিত্র বলে বিবেচিত হয়। মূল প্রবেশপথের উভয় পাশে দুটি গাছ লাগানো শুভ মানা হয়, দুর্গাপূজার সময় ভগবতীর প্রতীক কলাগাছ নবপত্রিকার নয়টি পাতায় কলা গাছ থাকে। লক্ষ্মী পুজোয় কাণ্ড দিয়ে তৈরি হয় ধন সুখের নৌকা। বিষ্ণু ও লক্ষ্মীর বাসস্থান হচ্ছে কলাগাছ। গাছের নিচে সুন্দর করে পরিষ্কার করে রাখলে, সৌভাগ্য বৃদ্ধি ও বৈবাহিক সুখ বৃদ্ধি পায়। স্কন্দ পুরাণ অনুসারে কলা পাতা ও ফল দেবতাকে অর্পণ করলে পূণ্য লাভ হয়। বৃহস্পতিবার কলা গাছের পুজো করলে ভগবান বিষ্ণু সন্তুষ্ট থাকেন। কলা গাছ জ্ঞান ও বুদ্ধির প্রতীক। বৃহস্পতিবার পুজো করলে স্ত্রীরা পরম সুখ প্রাপ্তি হন। কলাগাছের পুজো বিষ্ণুর সঙ্গে সংযুক্ত। সমৃদ্ধি, উর্বরতা এবং শুভত্বের প্রতীক। পরিষ্কার করে গোড়ায় হলুদ ফুল, প্রদীপ, ফল, মিষ্টি এবং কলা নিবেদন করে পুজো করা হয়। দুর্ভাগ্য থেকে রক্ষা পেতে কলাগাছ পুজো করা ভাল বলে পুরাণ নির্দেশ দিয়েছে।

প্রকৃতির সঙ্গে পুরাণ জুড়ে দিয়ে আপামর দেশবাসীকে প্রকৃতি সচেতন করে তোলা ছিল পুরাণের ইচ্ছা।

 

পারিজাতঃ

মনু সংহিতার ১ ম অধ্যায়ে ৪৯ শ্লোকে বলা হয়েছে – বৃক্ষের অন্তরে চেতনা আছে। জীবনে সুখ দুঃখের বোধ আছে। মনুসংহিতা প্রাচীন ভারতের জীবনধারা, ধর্ম, আইন ও সামাজিক নিয়ম কানুন নিয়ে রচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মগ্রন্থ। যেখানে মানুষের জীবন যাপনের পাশাপাশি প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদান যেমন উদ্ভিদ, জীবজন্তু এবং পরিবেশের উপর আলোকপাত করা হয়েছে যা তৎকালীন সমাজের চিত্র তুলে ধরে।

মানুষের সঙ্গে আছে প্রকৃতির নিবিড় সম্পর্ক। পুজোর কাজে কাঠ কাটলেও পুরোহিত বিনীত কন্ঠে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন গাছের কাছে। মনুসংহিতা বলেছে — যিনি বৃক্ষ রোপণ করেন তিনি স্বর্গে গমন করেন।

মনু বলেছেন, মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ জীব হতে পারে কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে প্রীতি বজায় রেখে চলতে হবে।

অন্ত: সংজ্ঞা ভবন্তে্য সুখদুঃখ সমন্বিতা:।

গাছের সুখ দুঃখ আছে। উদ্ভিদের ক্ষতি হয় এমন কোনো ব্যাপারে মনু অনুমতি দেননি।

মনুর নির্দেশ প্রকৃতির যত্ন করা। এটা মেনে চলার পরিবর্তে মানুষ আজ উল্টো গীত গাইছে। মনুসংহিতার নির্দেশ অনুযায়ী বৃক্ষ প্রকৃতির অংশ। সম্মান দেখানো উচিত। প্রসিদ্ধ বিশাল বৃক্ষকে ডানদিকে রেখে প্রদক্ষিণ করার কথা বলা হয়েছে। ফল পাকলে মরে যাওয়া গাছ, যজ্ঞ এবং পিতৃ দেবতার কাছে বৃক্ষ ছেদন করা যেতে পারে, অন্যথায় নয়। ( মনু / পঞ্চম অধ্যায়) পেশা অনুযায়ী বৃক্ষের ব্যবহার নির্দিষ্ট করা গিয়েছিল। ব্রাহ্মণ পাবে বেল গাছের বা পলাশ গাছের ডাল, ক্ষত্রিয়ের জন্যে বট, বৈশ্যের জন্যে ডুমুর। গ্রামের প্রধান বৃক্ষকে সম্মান দেওয়া উচিত বলে মনু বিধান দিয়েছেন। ( দ্বিতীয় অধ্যায়) বৃক্ষ কেবলমাত্র একটি উদ্ভিদ নয়। ধর্মীয়, সামাজিক ও ব্যবহারিক গুরুত্বের কারণে সম্মান ও শ্রদ্ধার আসনে বসেছে। ( মনুসংহিতা / চতুর্থ অধ্যায়)

আমাদের প্রধান দুটি মহাকাব্যের মধ্যে রামায়ণ মহাকাব্যে মোটামুটি পরিচিত সকল বৃক্ষের উল্লেখ আছে।  বিশেষত, বিশল্যকরণী গাছ উল্লেখযোগ্য। রামায়ণের যুগের পরিবেশ ও প্রকৃতিকে চিত্রিত করা, ধর্মীয়, ওষধি ও সামাজিক গুরুত্ব মনে করিয়ে দেয় বৃক্ষগুলির আলোচনায়। রাবণের অশোক কানন যেখানে সীতা দেবী বন্দিনী ছিলেন, বাল্মীকি রামায়ণে বর্ণিত আছে, সেখানে ছিল অশোক গাছ, শিমুল গাছ, শিংশপা গাছ ( এখানেই সাক্ষাৎ হয়েছিল সীতার সঙ্গে হনুমানের), রামায়ণের সুন্দরকাণ্ড, রামচরিতমানসে উল্লেখ পাওয়া যায় অশোক বাটিকার। এমন সুন্দর ছিল যে দুঃখ দুর হয়ে যেত। অ – শোক — শোক থাকত না উদ্যানে প্রবেশ করলে। তাই নাম ছিল অশোক কানন।

বিশল্যকরণী নামক ভেষজ উদ্ভিদ ক্ষত নিরাময়, শল্য বা আঘাত নিরাময়ে সাহায্য করে। মাটিতে লতিয়ে থাকা লতা। উত্তর ভারতের হিমালয়ে বা পাহাড়ি এলাকায় পাওয়া যায়ই। তবে, একই নামে পাঁচটি গাছ পাওয়া যায়। পশ্চিমবাংলায় পাওয়া যায়। বাড়িতে এই গাছ থাকলে মহা উপকার। ব্যথা কম করতে, চুলকানি, একজিমা, দুর্বলতা, রক্তপাত ইত্যাদি ক্ষেত্রে এই পাতার রস ভীষণ উপকারী।

রামায়ণে বর্ণিত আরো কিছু উল্লেখযোগ্য গাছ হচ্ছে — শাল, শমী, কোভিদার, পিপল, বট ইত্যাদি। যুদ্ধকাণ্ড ( বাল্মীকি রামায়ণ / যুদ্ধ অধ্যায় — শ্লোক ২৯ – ৩৪) সেখানে, বিশল্যকরণীর সঙ্গে মৃতসঞ্জীবনী, সন্ধানকরণী, সাবর্ণকরণী গাছের কথা বলা হয়েছে।

পঞ্চবটি হচ্ছে, পাঁচটি বটবৃক্ষ একসঙ্গে ছিল যেখানে সেই স্থান।

মহাভারত মহাকাব্যে এসেছে বৃক্ষের নাম। শমী বৃক্ষ থেকে বট, আছে সব কিছুই। খাইর গাছ, বিলভা ( বেল) আমলকি, ঢাক ( পলাশ) এসেছে সগৌরবে।

ইতিহাস প্রসিদ্ধ জায়গা দক্ষিণ দিনাজপুরে হতিডোবা গ্রামে আছে কয়েক হাজার বছরের পুরনো মহাভারতের শমী বৃক্ষ। এই গাছের কোটরে নাকি লুকিয়ে রাখা ছিল পাণ্ডবদের অস্ত্র।

রামায়ণ – মহাভারতের পরে আবার ফিরে যাই পুরাণে বর্ণিত সেই গাছগুলির কথায় যা আজকেও বিদ্যমান এবং সেকালের মত একালেও আদর করা উচিত। যেমন, পারিজাত।

পারিজাত গাছের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পৌরাণিক কাহিনীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ অংশ সমুদ্রমন্থন। অমৃতের সন্ধানে দেবতা ও অসুররা মন্দার পর্বতকে মন্থনদণ্ড এবং নাগরাজ বাসুকিকে মন্থনরজ্জু হিসেবে ব্যবহার করে সমুদ্র থেকে তুলে এনেছিল সেই আশ্চর্য বৃক্ষ পারিজাত। দেবরাজ ইন্দ্রের নন্দনকানন আলো করে ফুটে থাকত ফুল। এই গাছ পৃথিবীতে নিয়ে আসেন শ্রীকৃষ্ণ। সত্যভামা ও রুক্মিণীকে সন্তুষ্ট করার জন্যে পারিজাত এসেছিল মর্ত্যে। অন্য আরেকটি কাহিনী বলে, অর্জুন তার মা কুন্তীর জন্যে স্বর্গ থেকে পারিজাত গাছটি পৃথিবীতে নিয়ে আসেন। এই গাছকে সম্মান জানিয়েছে ভারত সরকার। ১৯৯৭ সালে ফুলের ছবি দিয়ে ডাকটিকিট প্রকাশ করে। বলা হয়, আমাদের অতি পরিচিত শিউলিফুলের আরেক নাম পারিজাত। এই ফুল যেন সেই পারিজাত নামের রাজকুমারীর মত যে ভালবেসেছিল সূর্যকে। সেই প্রেম সার্থক হয়নি। আত্মহত্যা করে পারিজাত। তাঁর চিতাভষ্ম থেকে একটি গাছ জন্মায় যার নাম পারিজাত। এই গাছের ফুল রাতে ফোটে। সকালে ঝরে যায়। রাতে সূর্যের তেজ থাকে না। সারারাত নিজের সুগন্ধে পৃথিবী মোহিত করে রেখে সকালে ঝরে যায় আর এটাই একমাত্র ফুল যাকে মাটিতে পড়ে গেলেও দেবতার পায়ে নিবেদন করা হয়।

পারিন সংস্কৃত শব্দের অর্থ সমুদ্র। সমুদ্রজাত বৃক্ষ পারিজাত বা শিউলির ইংরেজি নাম বাবব। ওষধি গুণের সীমা নেই। এত ওষধি গুণ আছে বলেই পারিজাত আজকেও চোখের মণি। শিউলি ফুল ছাড়া শরৎকালে মায়ের পুজো হয় না। সাদা পাঁপড়ি ও কমলা রঙের বোঁটা থাকে। এই বোঁটা দিয়ে প্রাচীন কালে পায়েস ও মিষ্টি তৈরিতে ব্যবহৃত হত।

 

তিলঃ

উদ্ভিদের জগৎ যেন আলিবাবার গুহার মত রত্নরাজি পূর্ণ। প্রকৃত গুণ শেখানোর জন্য জুড়ে দেওয়া হয়েছে পুরাণের গল্প। সামান্য কেউই নয়। বলা যেতে পারে তিল ( sesamun) নীল ফুলের গাছ। প্রতি ফুলে একটি করে ফল থাকে, প্রতিটি ফলে খাঁজকাটা। সেখানে থাকে তিল। তিল বীজ। স্বাস্থ্যকর চর্বি, প্রোটিন, ফাইবার, ভিটামিন — প্রয়োজনীয় পুষ্টি ভরপুর। এত গুণ এই ছোট্ট বীজ ধারণ করে রেখেছে যে পুরাণ অনুসারে তিলের মহিমা কীর্তন করা হয়েছে অসীম। শ্রীবিষ্ণুর ঘাম থেকে সৃষ্ট তিল বহু পুজোর প্রধান অঙ্গ। তিল কোথায় নেই? বিবাহে আছে। শ্রাদ্ধ বাসরে আছে। পুরাণ শুনিয়েছে সুন্দর এক গল্প। স্বয়ং মা লক্ষ্মীর প্রিয় ছিল তিল। একবার পৃথিবীতে এসে তিনি দেখলেন চরাচর ব্যাপী অপূর্ব তিলফুল। কৃষকের অগোচরে কিছু তিলফুল তুলে নেওয়ার ফলে ক্রুদ্ধ বিষ্ণু অভিশাপ দিলেন এই কৃষকের ঘরে থাকবেন তিনবছরের জন্যে লক্ষ্মী। তিনবছর পর বৈকুণ্ঠলোকে ফিরে যাওয়ার আগে আশ্রয়দাতা ব্রাহ্মণ লাভ করলেন প্রচুর ধন রত্ন। এই কাহিনীর ফলে বোঝা যায় লক্ষ্মী যুক্ত তিল কতখানি সমাদৃত ছিল। তিলের পুষ্টিগুণ দেয় স্বাস্থ্য স্বরূপ সম্পদ। কালো বা সাদা — দুটি বীজ পূর্ণ ঐশ্বরিক শক্তিতে। মকর সংক্রান্তির দিনে গুড় ও চালের সঙ্গে মিশিয়ে পূর্বপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। তিল পিতা, চাল মাতা এবং গুড় প্রেম ও সম্প্রীতির প্রতীক। তিলের বীজ গঙ্গার জলের মত পবিত্র। জলে তিল মিশিয়ে স্নান করলে গঙ্গা স্নানের মত পূণ্য হয়। তিল মাতার প্রতি পুত্রের কর্তব্যের প্রতীক, তিল ভগবান বিষ্ণুর ভক্তকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি, তিলের লাড্ডু বিনিময়ের মাধ্যমে পুরোনো শত্রুতা ভুলে যেতে বলা হয়। সমৃদ্ধি এবং প্রাচুর্যের প্রতীক তিল। প্রাণশক্তির উৎস সূর্যদেব সন্তুষ্ট থাকেন তিল দান করলে। স্বয়ং যম আশীর্বাদ করেছিলেন অমরত্বের প্রতীক হিসেবে। হিন্দুধর্মে কালো তিলের দানকে মহাদান হিসেবে বিবেচিত করা হয়। এই দান করলে ঘর থেকে সমস্ত নেতিবাচক দুঃখ দুর হয়ে যাবে। ছোট্ট বীজ — মহিমা অফুরান।

ধর্ম মতে প্রকৃতি ঈশ্বরের প্রথম প্রতিনিধি। প্রকৃতির সমস্ত তত্ত্ব ঈশ্বরের উপস্থিতির বার্তা বহন করে। তাই, প্রকৃতিকে দেবতা ভগবান ও পিতা মনে করা হয়েছে। প্রতিটি দেবী – দেবতার সঙ্গে একটি পশু, একটি পাখি ও একটি গাছ জড়িত। এমনকি, গ্রহ নক্ষত্র জড়িয়ে রয়েছে। ঋষিরা বিধান দিয়েছেন সম্ভব হলে প্রতিদিন পাঁচরকমের যজ্ঞ করতে। ব্রহ্ম যজ্ঞ, দেব যজ্ঞ, পিতৃ যজ্ঞ, মনুষ্য যজ্ঞ এবং ভূত যজ্ঞ। এই ভূত যজ্ঞ টি হল সকল জীব জন্তুর প্রতি দয়া ও সেবা করা, তাদের জন্যে খাদ্য ও জল নিবেদন করা। হিন্দু ধর্ম অনুযায়ী বৃক্ষের আত্মা থাকে। তাঁদের যত্ন করা হলে তাঁরা আশীর্বাদ করে জীবন বদলে দিতে পারে। প্রাচীন কাল শুধু নয় এই সেদিন পর্যন্ত দেশ গাঁয়ের বাড়িতে। আম গাছ লাগানো পূণ্যের কাজ ছিল তাই পাঁচটার বেশি আম গাছ লাগালে দুর্লভ যজ্ঞের ফল লাভ করা যায়।

 

বেল বৃক্ষঃ

তিনটি পাতা। ব্রহ্মা বিষ্ণু ও মহেশ্বরের প্রতীক। শ্রী বা লক্ষ্মীর বাস বলে মনে করা হয়।

স্কন্দপুরাণ অনুযায়ী বেলপাতা শিব পূজায় অপরিহার্য। পুরাণ বলে, এতই পবিত্র বেলপাতা যে একবার ব্যবহার করার পরে ধুয়ে আবার ব্যবহার করা যায়। বেল গাছ কেবল একটি গাছ নয় আয়ুর্বেদ মতে ওষধি গুণের সীমা নেই। বিল্ব বৃক্ষের পৌরাণিক ইতিহাস চমকপ্রদ। শিব পুরাণ থেকে জানা যায়, শুধু মাত্র বেলপাতা দিলেই পুজো হয়। কথিত আছে, দেবী লক্ষ্মীর শরীরের ঘাম থেকে এই গাছের জন্ম দিয়েছেন বলে এর আরেক নাম শ্রীফল বা লক্ষ্মীর বৃক্ষ। বেল গাছ কেন এত প্রাধান্য পেল? কারণ, ওষধি গুণ। হজম, ইনফেকশন, গ্যাস্ট্রিক আলসার কমাতে সাহায্য করে। সুগার নিয়ন্ত্রণ করে। শ্বাস কষ্ট কম করতে সাহায্য করে। বেলপাতা শুকিয়ে ঘরে রাখলে ঘরের বাতাস শুদ্ধ হয়। দীর্ঘদিনের গবেষণার ফলে প্রসিদ্ধ ঋষিদের অক্লান্ত চেষ্টায় বৃক্ষের গুণ এইভাবে আবিষ্কৃত হয়েছে। পুরাণের গল্প দিয়ে সাজিয়ে না দিলে নিজের প্রয়োজনে মানুষ গাছ কাটতে দ্বিধা করত না। শিব পুরাণ বলেছে, লক্ষ্মী দেবী প্রতিদিন ১০০০ পদ্ম ফুল শিবকে অর্পণ করতেন। একদিন কম হয়ে গেল দুটো। তখন নিজের স্তন কেটে পদ্মের অভাব পূরণ করতে গেলে মহাদেব আবির্ভূত হয়ে বললেন যে, দেবীর ভক্তির স্বরূপ শ্রীফল নামে এক পরম পবিত্র বৃক্ষ উৎপন্ন হবে। সেভাবেই বেলগাছ সম্পদ ও ঐশ্বর্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। কালা জাদুর প্রতি ভয় আছে সকলের, বেল গাছ সেই ভয় দূর করে এমত ধারণা প্রচারিত করায় যত্ন আর পুজো বেড়ে ওঠে বেলগাছের প্রতি। বিল্বৎপত্তি মাহাত্ম্য বর্ণনা বা বেলগাছকে পুজো করার রীতি প্রচলিত ঠিক এই কারণেই। বৃহদ্ধর্ম পুরাণ বলেছে, দেবী পার্বতীর দেওয়া নাম ছিল বিল্ব। কামনা সিদ্ধ, সহস্র পাপ নষ্ট, যম যাতনা হবে না। বেলগাছ শ্রেষ্ঠ, পবিত্র ও পাপনাশ কারী। বৈশাখ মাসের শুক্ল পক্ষে আবির্ভূত এই বৃক্ষ ছাড়া পূজার কাজ সম্পন্ন হয় না। শিবরূপ এই গাছ যজ্ঞে লাগে। উপরের পাতায় শঙ্কর, বাম পাতায় ব্রহ্মা ও দক্ষিণ পাতায় বিষ্ণুর অবস্থান। সূর্য ও গণেশ বাদে সব দেবতার পুজো হবে বেলপাতা দিয়ে। এইরকম আরো বহু স্তুতি বলা হয়েছে বেলগাছ নিয়ে। স্তুতি কেন করা হয়? গাছ প্রতিবাদ করতে পারে না। নিজের প্রয়োজনে এই নির্বাক বহু মূল্যবান কল্যাণকারী বৃক্ষ কেটে ফেলতে পারে মানুষ। স্তুতি যেন একটা নিষেধ বাণী। সেইসঙ্গে বুঝিয়ে দেওয়া উপকারী বন্ধুর ক্ষতি করো না।

আলোচনার শেষ করতে গিয়ে দেখি, বাকি রইল আরো কত – শত। আকন্দ গাছ বিষাক্ত বলে মনে করা হয়, শাস্ত্র বলে সেখানে বাস করে গণেশ ঠাকুর! কেন বলে? আছে কারণ। পরবর্তী অধ্যায়ে আলোচনা করব। প্রকৃতি ঈশ্বরের প্রতিনিধি। মানসিক শান্তি দেয় গাছের সঙ্গ। গাছ নিঃস্বার্থ ভাবে মঙ্গল কামনা করে। অক্সিজেন দেয়। বৃষ্টিপাত ও জল চক্র নিয়ন্ত্রণ করে।

বন্ধু গাছ নিহত হচ্ছে প্রতিদিন। গাছে পেরেক লাগিয়ে অত্যাচার করছি। ঋষি বাক্য মিথ্যা হয় না। ওঁরা বলেছেন, পরিবেশ হচ্ছে ঈশ্বর। বাতাবরণ সুন্দর না হলে কল্যাণ হবে কেমন করে? একটি গাছ ১০টি এয়ারকন্ডিশনার সমপরিমাণ শীতল করতে পারে চারিদিক।

বৃক্ষ নিধন না করে বৃক্ষ রোপণ করা হোক। আগামী পৃথিবী হয়ে উঠুক বাসযোগ্য।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *