২০১৯ এর বঙ্গসম্মেলন
শুভশ্রী নন্দী (আটলান্টা)
বিশ্বের সমস্ত বাঙালি দুর্গোৎসবের মধ্য দিয়ে জাতীয় উৎসব পালন করে থাকেন। কিন্তু সাগরপারের বাঙালি তাঁদের নিজস্ব নিয়মে গড়ে তুলেছেন আরেক দ্বিতীয় জাতীয় উৎসব, যার নাম “বঙ্গসাম্মেলন”। ২০১৯ এ সেই বঙ্গসম্মেলনের ৩৯ বছর পূর্ণ হলো। সি.এ.বি ও এন.এ.বি.সি. কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানাতেই হয় এমন একটি বিশালাকার উৎসবকে আয়োজন এবং স্বয়ংসম্পূর্ণতায় সফল করে তোলার জন্য। এই বছর উৎসবের স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল বাল্টিমোর শহরকে। সারা আমেরিকার সংস্কৃতিমনস্ক বাঙালি জড়ো হয়েছিলেন সেখানে।
শুরুর অনুষ্ঠান ছিল সকলকে নিয়ে অনাবাসী ভারতীয় জীবনকে ভিত্তি করে। শঙ্কর মহাদেবন এবং শুভা মুদগল তাঁদের গানের জাদুতে মাতিয়ে দেন সমবেত দর্শকদের। ছিলেন শাহিদ পারভেজ, রূপঙ্কর, রাঘব চট্টোপাধ্যায়, অন্বেষা, তন্ময় বসু প্রমুখ শিল্পীরা, যাঁদের অনুষ্ঠান মুগ্ধ হয়ে শুনেছেন দর্শক। পঞ্চকবির গান নিয়ে উপস্থিত ছিলেন দেবজিৎ ও ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায়। সারেগামাপা থেকে উঠে আসা শিল্পী জিমূত গাইলেন রাগাশ্রয়ী গান। এ ছাড়া ছিলেন শমীক পাল, লাইসা, শুচিস্মিতা দাস, অর্ণব বসু ও কবিতায় অতুলিতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ ছিল “ব্রাত্যজন” পরিবেশিত ও ব্রাত্য বসু পরিচালিত নাটক “সিনেমার মত” এবং “প্রাচ্য” পরিবেশিত ও বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত নাটক “খেলাঘর” মঞ্চস্থ হবার সময়। উপস্থিত দর্শক পিন পতনের নীরবতার সঙ্গে নাটক দুটি উপভোগ করেন। নাট্যব্যক্তিত্বদের মধ্যে ছিলেন দেবশঙ্কর হালদার, বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়, চৈতি ঘোষাল, অঞ্জনা বসু, ব্রাত্য বসু, অনসূয়া মজুমদার প্রমুখ।
বাংলা চলচ্চিত্রে অবদানের স্বীকৃতির পুরস্কার অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অন্যতম সেরা অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, শ্রীলা মজুমদার সহ রুদ্রনীল ঘোষ, অম্বরীশ ভট্টাচার্য, মনামী ঘোষ ও জয় সরকার। দর্শকদের আগ্রহ প্রকাশ পাচ্ছিল মুভি থিয়েটার আয়োজিত প্রেক্ষাগৃহেও।
সাহিত্য আসরে অসাধারণ বক্তব্য রাখলেন শ্রীজাত, নবকুমার বসু ও স্বপ্নময় চক্রবর্তী। বিষয় ছিল “অস্তিত্বের সন্ধানে”। এ ছাড়া সামগ্রিকভাবে সাহিত্য আলোচনায় অংশগ্রগণকারীরা ছিলেন, মন্দাক্রান্তা বোস, কুশনভ চৌধুরী, ভয়েস অব আমেরিকার আনিস আহমেদ, ডক্টর অমৃতা মুখার্জি, কৌশিক সেন, রুদ্রশঙ্কর এবং তাপস কুমার রায়।
বঙ্গসম্মেলনের ইতিহাসে এই প্রথমবার ছিল নাট্যোৎসব ও নাট্য প্রতিযোগিতা ।
বঙ্গসম্মেলনের ইতিহাসে এক নতুন দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করলেন দিব্যেন্দু পালের নেতৃত্বে ২০১৯ এর বঙ্গসম্মেলনের নাট্যকমিটি। প্রতিযোগিতার বিচারকের আসনে ছিলেন দেবশঙ্কর হালদার, বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়। সেরা নাটক নির্বাচিত হয়েছে বস্টনের “ক্রসরোড” পরিবেশিত নাটক “আবর্ত”। সেরা নাট্যপরিচালকের পুরস্কারটি পেয়েছেন আটলান্টার স্বাতী দে। এ ছাড়াও ছিল বহু ব্যক্তিগত পুরস্কার যা স্পনসর করেছেন স্থানীয় সংস্থাগুলো।
প্রতিদিন উপচে পড়েছে দর্শক। দাঁড়িয়ে দেখেছেন অগুনতি মানুষ, পর পর ঢারটে নাটক প্রথমদিনে ও আরো দুটি দ্বিতীয় দিনে। “আজকাল পত্রিকা” ও “বাংলা পডকাস্ট” একযোগে দিয়েছে কাভারেজ।
২০১৯ -এর বঙ্গসম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে (শনিবার) মূলমঞ্চের অনুষ্ঠান শুরু হয় “শতকন্ঠে রবীন্দ্রনাথ ২০১৯ : আনন্দধ্বনি জাগাও ভুবনে” দিয়ে। সমগ্র অনুষ্টানটির পরিচালনায় ছিলেন কমলপ্রিয়া রায়, যিনি ২০১৫ সালে হিউস্টন বঙ্গসম্মেলনে টেগোর সোসাইটি অব হিউস্টন পরিবেশিত প্রথম “শতকন্ঠে রবীন্দ্রনাথ” অনুষ্ঠানটির পরিচালনায় ছিলেন। সেইবারেই প্রথম এই অনুষ্মঠান মঞ্চস্থ হয়। শ্রদ্ধেয় সাহিত্যিক নবকুমার বসু ছিলেন গ্রন্থনা ও পাঠে, যার অন্য পরিচয় সাহিত্যিক সমরেশ বসুর সুযোগ্য পুত্র।
পরদিন রবিবার একই মঞ্চে “জনকন্ঠে নজরুল” অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন কাজী নজরুল ইসলামের পৌত্রী অনিন্দিতা কাজী।
সমাপ্তি অনুষ্ঠান “ভুবনজোড়া আসনখানি” ছিল অত্যন্ত মনোগ্রাহী। রচনা ও গ্রন্থনায় ছিলেন শৌনক চট্টোপাধ্যায়। বাংলার গর্বময় ইতিহাস ছিল মূল বিষয়। ভাষ্যপাঠে ছিলেন কলকাতা থেকে আসা ঘোষিকা রিনি ও বিপ্লব, এবং সমগ্র অনুষ্ঠানটির পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন শৌনক চট্টোপাধ্যায়ও সুদর্শন চক্রবর্তী।
লোকগানের ডালি নিয়ে হাজির ছিলেন বাউল দম্পতি তুলিকা ও গঙ্গাধর। বাংলাদেশের ব্যান্ড “মাইলস্” সাড়া জাগিয়েছে দর্শক হৃদয়ে। নৃত্য পরিবেশনায় ছিলেন স্যাফায়ার নৃত্য সংস্থা।
স্থানীয় উত্তর আমেরিকার ঘোষিকাদের সঙ্গে ২০১৯ বঙ্গসম্মেলনের অনুষ্ঠান উপস্থাপনার কাজ নিয়ে কলকাতা থেকে এসেছেন রিনির সাথে বিপ্লব গাঙ্গুলি।
স্টলগুলোতে আড্ডা-কেনাকাটা ছিল সচল ও প্রাণবন্ত। রি-ইউনিয়নগুলো জুড়ে ছিল স্মৃতিমেদুরতা।চোখের পলকে উড়ে গেল তিনটি দিন। এ বছরের মত বঙ্গসম্মেলনকে বিদায়। আসছে বছর আবার হবে। দেখা হবে লাস্ ভেগাসে।

