অভিবাসন
(আনোয়ার ইকবাল)
পাড়ার গলিতে সাকুল্যে তিনটি বাতি,
কিছুদিন ধরে একটাই শুধু জ্বলত যে সারারাত;
চাঁপা আঁধারের চাদরে গা মুড়ে বারান্দায়,
হাতে ধরে রেখে তোমার দুহাত,
দেখতাম; সানুদের সীমানা ঘেঁষা নারকেল গাছটা
রোজ কি অদ্ভুত প্রেম প্রেম খেলায় মাতে
বাতি জ্বলে উঠলেই, বাবড়ি ঝোলানো উদ্দাম তরুণের মত
এলোমেলো পাতা ঝাঁকিয়ে অবিরাম কথা শুরু করে যত,
লাজুক আলোর ইশারাতে
বেহায়া বাতিটাও সাড়া দিত ওর ডাকে।
মনে হয় আস্তে আস্তে ছুতেও চাইছিল তাকে?
এইতো সেদিন;
এক শীতের ভোরে
তুমি হেসে ভীষণ জোরে
ঠেলাঠেলি করে ঘুমটা ভাঙালে,
টেনে ধরে নিয়ে কি কাণ্ডটাই না দেখালে।
ছোঁয়ার নেশায় পুরো দেয়ালটাই ভেঙ্গে দিল যেদিন,
হেলতে হেলতে দুর্বিনীত গাছটা শেষমেশ।
মন বলছে, প্রেমিকা বাতিটা জ্বলেনি যে আজরাতে
উচ্ছল প্রেমিক গাছ, ঘাড় গুঁজে মাঝরাতে
তাই চেয়ে আছে শুধু অভিমানী, অনিমেষ।
নায়লাদের বাসার গেট হবে নিশ্চয়,
জং ধরা কব্জায় ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ তুলে বন্ধ হল এই,
তাহাজ্জুদ সেরে জব্বার চাচা ফিরলেন মনে হয়?
ওপরের ঘরেও কিছুক্ষণ বেশ,
ভাবিদের সাড়াশব্দ নেই
সিরিয়াল নিয়ে হইচই তবে আজকের মত শেষ!
বড় রাস্তাটা এখন শুনশান নির্জন;
আমাদের বাড়ীর পাশ ধরে, ক্লান্ত দু-পায়ে
ধীরে প্যাডেল চেপে, জমির মিয়া
ঘণ্টি বাজিয়ে চলে গেছে, সেও বহুক্ষণ।
মোড়ের চা স্টলের ফুটফরমাশ খাটা ছেলেটাও
তেল-চিটচিটে তোষক, বালিশের বান্ডিল
খুলে বিলক্ষণ,
রোজকার মতো ফুটপাতের কানা ঘেঁষে
ভীতু কুকুরটাকে বুকে করে অবশেষে
গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে; ভাবচিন্তালেশ।
তুমি?
ঘুমাতে পারছনা জানি;
ঘড়ির কাটা যে দুটো ছোয় ছোয়!
তোমাকে ঘিরে গভীর রাত, চারপাশ শব্দহীন
কি আশ্চর্য, এখানে একদমই রাত নয়;
বরং কোলাহলে আলোময় অদ্ভুত ভর-দিন।
আমি?
কালো ফিতেয় লাইন করা এই গোলকধাঁধায়
কখন থেকে হেটে চলেছি অবিশ্রাম,
কেবলই এক ইতস্তত অনুসরণে
বুকে আঁকড়ে সেই অমূল্য বাদামী খাম।
হলকা বাতাস ঢেউ তুলে যায় বয়ে
তোমারি মতন অক্লান্ত অপেক্ষায় থাকে
দূরে ওই রানওয়ে।
কনকোর্স ঘিরে ঝাঁঝাঁ রোঁদ ঝলসায়
ধুঁকছে দাঁড়ানো ক্লান্ত বিমান
নির্বাক বিষণ্ণতায়।
কাচ ঘেরা ঘরে এই বুঝি ডাক এলো
আমার দীর্ঘ যাত্রা শুরু হলো।
নাকি হলো শেষ?
সন্ন্যাস না বিরহ বেদনার
এই দুর্বোধ্য গৃহপ্রবেশ?
ভার্জিনিয়াঃ নভেম্বর ২৩, ২০১১