অপত্য
তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
সান্যাল সাহেব খুঁটিয়ে দেখছিলেন অবাঙালি যুবকটিকে৷ মহকুমার নতুন মহকুমাশাসক মণীশ আগরওয়াল, ভারী হ্যান্ডসাম, বেশ লম্বা, ফরসা গায়ের রং, নাকের নীচে ঘন কালো পুরু গোঁফ, আগ্রায় বর্ন অ্যান্ড ব্রট আপ৷
এই মহকুমাটিতে সাধারণত আইএএসদেরই পোস্টিং হয় এসডিও হিসেবে৷ তাঁরা অধিকাংশই অবাঙালি৷ ফলে এখানকার পরিবেশে মানিয়ে নিতে একটু সময় লাগে৷ মণীশ আগরওয়াল এ রাজ্যে প্রবেশনার ছিলেন দক্ষিণবঙ্গের এক জেলায়, সেখানে দু–বছরেই বাংলাটা রপ্ত করে নিয়েছেন মোটামুটি৷ এখানে জয়েন করার পর দিন সাতেক ধরে বুঝে নিলেন অফিসের কাজকর্ম, তারপর সান্যাল সাহেবকে ডদ্দেশ করে বললেন, আপনি তো শুনলাম অনেকদিন আছেন এখানে? জায়গাটা কেমন?
দেবরূপ সান্যাল এই মহকুমার সেকেন্ড অফিসার, তাঁর চাকরি হয়েছে বছর আটেক, এই মহকুমায় আছেন সাড়ে চার বছরের ডপর, হেসে বললেন, আমার তো এখানে অনেক ক–টা বছর হয়ে গেল, এখনও একটুও বোর ফিল করিনি৷ যেমন এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য, তেমনই চমৎকার মানুষজন৷
––তাই নাকি? দেন আই অ্যাম লাকি৷ ওয়েল, মি. স্যানিয়েল, তা হলে চলুন, আপনার সঙ্গে এবার সাবডিভিশনের এলাকাটা একটু দেখব৷
নতুন এসডিওর ধরনধারণ বেশ পছন্দ হল সান্যাল সাহেবের৷ অফিসের কাজ বুঝে নিয়ে এলাকা দেখতে বেরোনোর প্রস্তাব দিলেন যা তাঁর চাকরির পক্ষে সঙ্গত৷ বললেন, ঠিক আছে, কাল সকালেই বেরিয়ে পড়ি দুজনে৷
শীত এখানে একটু আর্লি, পুজোর পর থেকেই ঠাণ্ডার একটা আমেজ বাতাসে৷ চূড়ায় বরফ মাখানো পাহাড়ের গা ছুঁয়ে আসা হাওয়ার স্পর্শে শরীর তো একটু শিরশির করবেই
এলাকাটা সমতলভূমি হলেও এই মহকুমার সীমানা যেখানে শেষ, সেখান থেকেই শুরু হয়েছে পাহাড়ি এলাকা৷ রাস্তার দুপাশে মাইলের পর মাইল চা–বাগান৷ ধু ধু করতে থাকে চমৎকার সবুজ৷ হঠাৎ দূর থেকে দেখলে কারও মনে হতে পারে একটা সবুজ মাঠ, ‘দু–দণ্ড বডি ফেলে দিয়ে আকাশের দিকে মুখ করে শুয়ে থাকি৷’ সেই অনন্ত সবুজের যেখানে শেষ, সেই সীমানায় কালো আর নীলে মেশা পাহাড়ের দীর্ঘ শ্রেণি৷
ফলে মহকুমার যে–প্রান্তেই দুজনে পৌঁছোলেন, সাক্ষাৎ ঘটল কোনও না কোনও পাহাড়ের সঙ্গে, আর পাহাড়ের নিয়মই হল তারা শৃঙ্গ উঁচিয়ে ডাক দিতে থাকে মানুষজনকে দেখতে পেলে৷ মণীশ আগরওয়ালও তাঁর সেকেন্ড অফিসার দেবরূপ সান্যালকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরেঘেরে দেখলেন অনেকখানি এলাকা৷ দিনচারেক ঘোরাঘুরি করার পর একদিন হাসি–হাসি মুখে বললেন, মি. স্যানিয়েল, গভর্নমেন্ট আমাকে বেশ ভালো পোস্টিং দিয়েছে৷ কী চমৎকার সিনিক বিডটি বলুন? একদিন পাহাড়টাও ঘুরে এলে বেশ হয়।
সান্যাল সাহেব জানেন অবাঙালি এসডিওরা এখানে পোস্টিং পেলে এলাকার প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে বিমোহিত হন, তাঁর কথায় সায় দিয়ে বললেন, সে তো আপনি যাবেনই৷ আপনার এলাকার দুদিকে দুটো সাবডিভিশন আছে, দুটোই পাহাড়ি এলাকা, সেখানকার এসডিওদের সঙ্গে দেখা করতে পারেন৷ আমাদের চাকরির প্রধান সমস্যা ল অ্যান্ড অর্ডার ট্যাকল করা৷ এখানে অনেক আইন–শৃঙ্খলার সমস্যা আছে যা দুই সাবডিভিশনের মধ্যে কমন, সে–বিষয়ে আলোচনা থাকতে পারে, আরও কত কাজ থাকতে পারে––
আইন–শৃঙ্খলার গল্প শুনে এসডিও একটু ব্যস্ত হয়ে বললেন, এখানে ল অ্যান্ড অর্ডার প্রব্লেম কীরকম?
––তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু নয়৷ খুব পিসফুল এলাকা৷ কালেভদ্রে সে সব ঝামেলা ঘটে৷
আগরওয়াল সাহেব ডজ্জীবিত হলেন, বাহ তা হলে তো আরও সুখবর৷
––হ্যাঁ, মাসছয়েক আগে শহরের হাইস্কুলের সামনে একটা বাম্প করে দিতে হবে এই নিয়ে পথ অবেরোধ হয়েছিল, স্পটে গিয়ে হাজির হয়ে প্রতিশ্রুতি দিতে দশ মিনিটের মধ্যে অবরোধ শেষ৷ তার আগে একটা কলেজের ছাত্রছাত্রীদের দাবিদাওয়া নিয়ে সমস্যা হয়েছিল, সেও আমি গিয়ে আলোচনায় বসতেই মিটে গিয়েছিল৷ ব্যস––
বলে সান্যাল সাহেব হাসলেন হা হা করে৷
মণীশ আগরওয়াল সাহেবও হাসলেন জোরে, বেশ দিলখোলা হাসি৷ বললেন, ল অ্যান্ড অর্ডার প্রব্লেম না থাকলে তো অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের চাকরি খুব এনজয়েবল৷
কয়েদিনের মধ্যে নতুন এসডিও বেশ সহজ হয়ে উঠলেন সবার সঙ্গে৷
এখানকার এসডিও অফিসটি একটা বড়ো কমপ্লেক্সের মধ্যে৷ অফিসের মেন বিল্ডিংটার একটু দূরে এসডিওর বেশ বড়োসড়ো বাংলো৷ তার কিছু দূরে সাবডিভিশনের আরও দুই ম্যাজিস্ট্রেটের বাংলো৷ সে দুটি অবশ্য দৈর্ঘ্যে–প্রস্থে ছোটো৷ সবই ব্রিটিশ আমলে তৈরি৷
একই কমপ্লেক্সে বাংলোগুলি হওয়ায় এসডিওর সঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেটদের দেখা হয় অফিস–আওয়ারের বাইরেও৷ কোনও জরুরি বিষয়ে আলোচনা থাকলে এসডিও অনেক সময় খবর পাঠান ম্যাজিস্ট্রেট্দের, বাড়িতে খুব জরুরি কাজ না থাকলে একবার আসবেন?
হাতে জরুরি কাজ থাকলেও এসডিও ডেকে পাঠালে যেতেই হয় ম্যাজিস্ট্রেটদের৷ ক্বচিৎ–কদাচিৎ কেউ হয়তো যেতে পারলেন না, বাড়ি থেকে টেলিফোনেই জেনে নেন যা জানার৷
আবার উল্টোটাও ঘটে৷ মণীশ আগরওয়ালেরও এটাই প্রথম পোস্টিং, এবং তিনি ব্যাচেলর৷ ব্যাচেলর হওয়াতে অফিস–আওয়ারের বাইরে সময় কাটানো সমস্যা হয় কারও কারও৷ কেউ বই পড়েন, কেড অবসর পেলে চেম্বারে অন্যদের সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা দেন, ঘন ঘন চায়ের অর্ডার দেন ও কখনও আনিয়ে নেন সিঙ্গাড়া বা মুড়ি–তেলেভাজা৷
সেকেন্ড অফিসার দেবরূপ সান্যাল অন্য অফিসারদের মধ্যে সিনিয়র, কাজেকর্মে যথেষ্ট অভিজ্ঞও, ফলে সব এসডিও–ই এখানে এসে তাঁর উপরই নির্ভরশীল হয়ে ওঠেন অনেকটা৷ মণীশ আগরওয়ালেরও ঠিক একই রকমভাবে অন্তরঙ্গতা হল দেবরূপ সান্যালের সঙ্গে৷ বেশ কয়েকদিন এসডিওর বাংলোয় চা–সিঙ্গাড়া খাওয়ার পর একদিন দেবরূপ সান্যাল বললেন, এসডিও সাহেব, তা হলে আজ সন্ধের পর কাজকর্ম সারা হয়ে গেলে আসুন না আমাদের বাংলোয়৷ চায়ের সঙ্গে আড্ডাও হবে৷
মণীশ আগরওয়াল প্রথমে একটু কিন্তু–কিন্তু করে রাজি হয়ে গেলেন, বললেন, কিন্তু ওই অনলি টি৷ মিসেসের ডপর বেশি লোড দেবেন না৷
––তাই হবে৷
দুপুরে টিফিন আওয়ারে বাংলোয় এসে দেবরূপ তাঁর স্ত্রী শ্রাবস্তীর কাছে বিষয়টা ব্যক্ত করতে ভারী ব্যস্ত হয়ে পড়ল সে৷ তটস্থ হয়ে বলল, এ মা, আমাদের ঘরগুলো তো খুব অগোছালো৷
দেবরূপ চারদিকে চোখ পেতে বললেন, তেমন অগোছালো কোথায়? তুমি তো সারাক্ষণ ঝাড়ন দিয়ে মুছে টিপটপ করে রাখো ফার্নিচারগুলো৷
শ্রাবস্তী তবু খুঁতখুঁত করে, বলল, তা ছাড়া আমাদের বাংলোটার কী অবস্থা প্লাস্টার খসে–খসে পড়ছে রং চটে কী বিশ্রী হয়ে গেছে এরকম হুট করে কেড ঘরে আসতে বলে কতদিন বলেছি, বাংলোটা রিপেয়ার করাও৷
দেবরূপ তার কথায় গুরুত্ব না দিয়ে বললেন, বাংলো তো আমার তৈরি নয়, অফিসের৷ তা ভাঙাচোরা হলে আমি কী করব!
––কিন্তু বাড়িতে কিছু তো নেই কী খেতে দেব ওঁকে অন্তত দুটো–তিনটে দিন সময় না দিলে কী করি বলো তো।
––এ সব নিয়ে ব্যস্ত হয়ো না নতুন এসেছেন এখানে, ভালো করে চা করে দিলেই এনাফ৷ সঙ্গে ওই যে চৌকোনা বিস্কুট এনেছি সেদিন, বিস্কুট দিলেই হবে৷
শ্রাবস্তী বিব্রত হয়ে ঘাড় নাড়ে, দুর, নতুন এসডিও আসছেন বাংলোয়, শুধু চা দিলে কি সম্মান বজায় থাকে!
দেবরূপ ইতস্তত করে বললেন, আমি কি একটু মিষ্টি এনে রাখব?
এর আগেও অন্য এসডিওরা এসেছেন শ্রাবস্তীর আতিথ্য নিতে৷ বিষয়টা যদিও গা–সওয়া হয়ে গেছে শ্রাবস্তীর, ঘাড় ঝাঁকিয়ে জানাল, দোকান থেকে কিনে আনা মিষ্টি দিয়ে লৌকিকতা করলে কি তোমার সম্মান বজায় থাকবে আমি বরং একটু নিমকি–টিমকি বানিয়ে রাখি৷
দেবরূপ খুশি হয়ে বললেন, তাই রেখো৷
সেদিন সন্ধের কিছু পরে অফিস থেকে বাংলোয় ফিরে দেবরূপ দেখলেন প্রায় এলাহি কাণ্ড বাধিয়েছে শ্রাবস্তী৷ শুধু নিমকিই বানিয়েছে বিশাল একটা পাত্র ভর্তি করে৷ তার সঙ্গে সুজির ডপ্মা আর পেস্তা–বাদাম–কিসমিস্ দিয়ে মস্ত একখানা কেক৷ আয়োজন দেখে দেবরূপ আঁতকে উঠে বললেন, এ করেছ কি এত খাবারদাবার!
মায়ের কাছেই ঘুরঘুর করছিল তাঁদের সাড়ে তিন বছরের মেয়ে রুমকি, তার দুই খুদে হাত পিছনদিকে ন্যস্ত করা, ঠিক যেমনটি তার বাবা সকালে পায়চারি করে ঘরের ভিতর, সে রকমই তার পোজ৷ বাবাকে ঘরে ঢুকতে দেখে আস্তে আস্তে এসে বলল, বাবা, নতুন এসডিও কি রাক্ষস?
দেবরূপ মস্ত জিব কেটে বললেন, চুপ, চুপ৷ হঠাৎ এ কথা কেন?
––না, সেই দুপুর থেকে মা কত কিছু বানাচ্ছে, এক গামলা তাই––
দেবরূপ তাকে কোলে নিয়ে বললেন, তোর মায়ের কাণ্ডই ওরকম৷ দেখসিনি, আমরা তিনজনে খাব, রোজই এত বেশি–বেশি বানায় যে, তিনজনে খাওয়ার পর রোজ উদ্বৃত্ত হয়ে যায় খাবার
শ্রাবস্তী তখন তার খাবারের আইটেম কিচেনের র্যাকে সাজিয়ে রাখছে যত্ন করে৷ দেবরূপকে দেখে হাসি–হাসি মুখ, বলল, উফ্, যা ঝক্কি গেল এতক্ষণ!
দেবরূপ বিব্রত হয়ে বললেন, কেন যে, এত কিছু করতে গেলে!
শ্রাবস্তী তেমনই হাসি মুখ নিয়ে বলল, তুমি তো ‘এসডিও আসবেন’ বলেই খালাস৷ কিন্তু তিনি প্রথম আসবেন, তাঁকে একটু যত্নআত্তি না করলে চলে।
পাঁচ বছর আগে শ্রাবস্তীকে যখন বিয়ে করে এনেছিল, ব্যুরোক্রেসির এই জগৎ সম্পর্কে কোনও ধারণাই ছিল না তার৷ একবার এক মন্ত্রী আসার আগের দিন থেকে অফিসসুদ্ধ লোককে এমন রাত জেগে রিপোর্ট তৈরি করতে হয়েছিল তা দেখে শ্রাবস্তী অবাক৷ তার বাবা চাকরি করতেন কলকাতার এক প্রাইভেট কম্পানির অফিসে, সেখানেও বসের হুকুম তামিল করতে হত, কিন্তু এতটা সমীহ করতে হত না যা এই প্রশাসনের চাকরিতে করতে হয়৷
কখনও মন্ত্রী, কখনও ডিএম ইত্যাদির আগমনে নীচের লেভেলের অফিসাররা এমন তটস্থ হয়ে থাকে দেখে একদিন হেসে বলেছিল, বাব্বা, তোমাদের দেখে মনে হয় যেন ভগবান আসছেন ট্যুরে৷
দেবরূপ হেসে বলেছিলেন, আরে ভগবানকে ট্যাকল করা তবু সোজা৷ যারা মন্ত্রী হন তাঁরা নিজেদের ভগবানের চেয়েও ক্ষমতাবান মনে করেন।
বিয়ে হয়ে আসার পর আগের স্টেশনে শ্রাবস্তী মাত্র ছ–মাস থাকার পর এখানে বদলি৷ কলকাতা থেকে অনেকটা দূরবর্তী জায়গায় পোস্টিং বলে কলকাতার মন্ত্রীরা খুব কমই আসেন এখানে৷ কিন্তু দু–বছর আগে এমন একজন ডিএম এসেছিলেন খুব কড়া৷ তিনি সাবডিভিসনে ট্যুরে আসবেন শুনলে রাত জেগে পড়াশুনা করতে হত অফিসারদের৷ তিনি বদলি হওয়ায় এখন কিছুটা নিশ্চিন্ত৷ কিন্তু এই ক–বছরে শ্রাবস্তী একটু একটু করে বুঝে গেছে হায়ারার্কির গোলমেলে স্তরগুলি৷
রাত্রি আটটা নাগাদ নতুন এসডিও এলেন বাংলোর সামনে৷ দেবরূপ তাঁকে অভ্যর্থনা জানিয়ে নিয়ে এলেন বাইরের ঘরে৷ সোফায় বসে মণীশ আগরওয়াল কিছুক্ষণ দেখলেন ছবির মতো সাজানো বাইরের ঘরটা৷ তারপর অবাক হয়ে বললেন, ওয়ান্ডারফুল এত সব হাতের কাজ কার করা?
দেবরূপ দেখলেন নতুন এসডিও–র দেখার চোখ যথেষ্ট তীক্ষ্ণ৷ দেবরূপও যেন নতুন করে দেখলেন সোফায়, ঘরের পর্দায়, টিভির কভারে, টেবিলের ডপর পাতা সাদা কাপড়টির উপর––সর্বত্র জ্বলজ্বল করছে শ্রাবস্তীর হাতের কাজ৷
শ্রাবস্তী তখনও বাইরের ঘরে আসেনি, নিশ্চয় ব্যস্ত রান্নাঘরের শেষ আইটেমটির ফিনিশিং–এ৷ উত্তর দিলেন দেবরূপই, এ সব মিসেসই করেছে৷
––তাই নাকি মণীশ আগরওয়াল আর একবার বললেন, ওয়ান্ডারফুল৷
তাঁদের কথোপকথনের মধ্যে শ্রাবস্তী ঢুকে পড়ল দু–হাতে দুই প্লেট ভর্তি খাবারদাবার নিয়ে৷ সেগুলি সেন্টার টেবিলে সাজানো হতেই আবার ফিরে গেলেন রান্নাঘরে, পরের বারে এক হাতে আরও একটি প্লেটভর্তি খাবার, অন্য হাতে চায়ের কাপপ্লেট৷ সেগুলি পর পর সাজানো হতে মণীশ আগরওয়াল বিস্ময়ে হতবাক, শ্রাবস্তীর দিকে তাকিয়ে বললেন, এ সব কী, ম্যাডাম, মনে হচ্ছে কোনও ম্যারেজ বাড়িতে এসেছি৷ সামনে সাজানো রয়েছে অনেকগুলো প্লেট৷ বুফে সিস্টেমে খেতে হবে।
শ্রাবস্তী লজ্জা–লজ্জা গলায় বলল, তেমন কিছু করে, উঠতে পারিনি৷ আপনি প্রথমবার এলেন তো
––হ্যাঁ, কিন্তু এরকম প্লেট সাজালে প্রায়ই আসতে ইচ্ছে করবে আমার৷
––নিশ্চয় আসবেন৷ এ সব খাবার তৈরি করতে খুব বেশি সময় লাগে না।
অবশেষে কোনটা খাবেন, কোনটা না–খাবেন ইত্যাদি করার পর মণীশ আগরওয়াল যখন বাংলো থেকে বেরোলেন রাত্রি সাড়ে দশটা৷ শ্রাবস্তী প্রচুর নিমকি তৈরি করেছিল, সেগুলো খেয়ে এসডিও এত উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেন যে, তাঁর খাওয়ার পর যা উদ্বৃত্ত হল সেগুলো একটা টিফিন কৌটোর মধ্যে ভরে তাঁকে দিয়ে দিল শ্রাবস্তী৷
বেরোনোর সময় এসডিও বললেন, শুধু আজ রাতে আর হোটেল থেকে ডিনার আনিয়ে খেতে হল না তাই নয়, এখন বেশ কয়েকদিন চায়ের সঙ্গে নিমকি খাওয়াও অ্যাসিওর্ড হল।
এসডিও তাঁর বাংলোর দিকে চলে গেলে শ্রাবস্তী অবাক হয়ে বলল, কেন, রোজ হোটেল থেকে আনিয়ে খান কেন? একটা রান্নার লোক রাখতে তো পারেন? আগের এসডিও–রা তো তাই করতেন।
দেবরূপ বললেন, প্রথম কয়েকদিন বোধ হয় রান্নার লোক রেখেছিলেন, কিন্তু তার রান্না বোধ হয় পছন্দ হয়নি সাহেবের৷
শ্রাবস্তী জিবে চুকচুক শব্দ করে বলল, আহা, বেচারা।
দিনকয়েক পরে নিজেদের জন্য মাটন রেঁধেছিল শ্রাবস্তী, একটা টিফিন কৌটোয় ভরে দেবরূপকে বলল, তোমার আর্দালি বকুকে একটু পাঠিয়ে দিও তো সাহেব রোজ হোটেলের খাবার খান, একদিন বাড়ির রান্না খেলে মুখটায় রুচি হবে৷
দেবরূপ হেসে বললেন, ঠিক আছে, আমি গিয়েই পাঠিয়ে দিচ্ছি৷
সেদিন মাটন খেয়ে খুব। উচ্ছ্বসিত এসডিও সাহেব৷ দেবরূপকে বললেন, মি. স্যানিয়েল, আপনি অনেক ভাগ্য করে এরকম ওয়াইফ পেয়েছেন৷ মাটন খেয়ে মনে হল গ্রা্যান্ড হোটেল থেকে খাবারটা আনিয়েছেন আপনি ভেরি ভেরি ডিলিসিয়াস আপনার মিসেসকে বলে দেবেন ওয়ান্ডারফুল প্রিপারেশন।
দেবরূপ খুশি হয়ে বললেন, তা হলে আপনি আমার রেসিডেন্সের টেলিফোনে ফোন করে বলে দিন মিসেসকে৷ তা হলে আরও খুশি হবে৷
––একজ্যাক্টলি মণীশ আগরওয়াল বললেন, আমি ঠিক এরকমটাই ভাবছিলাম কত যেন নম্বরটা?
বলে তাঁর টেবিলের কাচের নিচে রাখা টেলিফোন নম্বরের তালিকাটায় চোখ রেখে খুঁজে বার করলেন নম্বরটা, নিজেই বাটন টিপে ধরলেন শ্রাবস্তীকে, বললেন, ম্যাডাম৷ কী চমৎকার আপনার রান্নার হাত? বলুন তো আপনার বোনটোন আছে কি না তা হলে একটা বাঙালি মেয়ে বিয়ে করি
তারপর ফোন রেখে দেবরূপকে বললেন, ইড আর রিয়্যালি এ লাকি পার্সন এরকম একজন মিসেস পেয়েছেন।
তার কয়েকদিন পরে দেবরূপ ঘরে ফিরতে শ্রাবস্তী বলল, এসডিও সাহেব কিছু বললেন তোমাকে?
দেবরূপ ঘাড় নেড়ে বললেন, কই, না তো।
––কী মুশকিল আমাকে হঠাৎ ফোন করলেন দুপুরে৷ বললেন, ম্যাডাম, আমার নিমকি ফুরিয়ে গেছে৷ এ ক–দিনে এমন হ্যাবিট হয়ে গেছে যে, আপনার হাতের নিমকি না খেলে আমরা চা খাওয়াাই মনের মতো হচ্ছে না।
দেবরূপ হেসে বললেন, আমিও লক্ষ করছি মানুষটা বেশ সহজ সরল৷ যা মনের মধ্যে আসে, অমনি প্রকাশ করে দেন সবার সামনে৷ তা তুমি নিমকি তৈরি করে দাও, আমি বকুকে বলছি ওঁর বাংলোয় পৌঁছে দিয়ে আসবে৷
শ্রাবস্তী বহুক্ষণ ধরে, অশেষ পরিশ্রমে ভেজে ফেলল প্রায় তিন–চারটে বড়ো বড়ো কৌটো ভর্তি নিমকি৷ দেবরূপ বললেন, এত?
শ্রাবস্তী হেসে বলল, বেশি করেই করলাম, নইলে তিনদিন পরেই তো আবার চাইবেন৷ এগুলো দশ–পনেরো দিন দিব্যি থেকে যাবে, নষ্ট হয় না৷
সেই নিমকি খেয়ে এসডিও নাকি বার দশেক ফোন করে শ্রাবস্তীকে জানিয়েছেন তাঁর ভালো লাগার কথা৷ শ্রাবস্তীও তার কাজের প্রশংসা পেয়ে গলে আপ্লুত৷
দেবরূপকেও শ্রাবস্তী বারতিনেক বলল সেই কথা, তোমাদের এসডিও এতবার ‘ভালো হয়েছে ভালো হয়েছে’ বলছেন যে–– ৷
দেবরূপ হেসে বললেন, শুধু কি তোমাকেই বলেছেন অফিসেও সিএ–কে বলেছেন, ‘মিসেস স্যানিয়েল আমার ফুড হ্যাবিট এমন বদলে দিচ্ছেন যে, হোটেলের মাটনও আর মুখে রুচছে না, দোকানের বিস্কুটও মুখে দেওয়া যাচ্ছে না’ শুনে সিএ বলেছেন, স্যার, তা হলে এবার আপনাকে একটা বিয়ে করে নিতে হবে৷
এই পর্যন্ত শুনে শ্রাবস্তী হেসে গড়িয়ে পড়ে আর কি বলল, তা হলে একটা মেয়ে দেখতে হয়
দেবরূপও মজা করে বললেন, হ্যাঁ, এমন মেয়ে দেখতে হবে যে তোমার মতো নিমকি ভাজতে পারে৷
তা শুধু নিমকিতেই আর দেওয়া–নেওয়ার অবসান ঘটল না৷ একদিন ছুটির দিনে মণীশ আগরওয়ালের মাটন খাওয়ার খুব ইচ্ছে হল, তার আগের দিন তিনি শ্রাবস্তীকে ফোন করে বিষয়টি জানিয়েছেন ও পরদিন সকালে তাঁর আর্দালি কার্তিককে দিয়ে বাজার থেকে মাংস কিনে পাঠালেন শ্রাবস্তীর কাছে৷
শ্রাবস্তী মুখে আলো ফুটিয়ে বলল, দেখেছ, তোমাদের এসডিও–র কাণ্ড।
দেবরূপ বললেন, উনি তো সবাইকে বলছেন, মিসেস স্যানিয়েল আমার অভ্যাস খারাপ করে দিয়েছেন তুমি এমন ভালো রান্না করেছ যে––
সেদিনও মাটন এসডিওর কাছে পৌঁছোতে তিনি আবার উচ্ছ্বসিত৷ দুপুরে স্যানিয়েল সাহেবের বাংলোয় টেলিফোন করে শ্রাবস্তীকে জানালেন উপর্যুপরি প্রশংসা৷
সন্ধের পর দেবরূপ বাংলোয় ফিরলে শ্রাবস্তী ছদ্ম অসন্তুষ্টি দেখিয়ে বলল, বেশ মুশকিল হল তো মাটন খেয়ে ভালো লেগেছে, এখন বলছেন, আপনি কি চিকেন চাঁপ করতে পারেন?
দেবরূপ উদাসীন ভঙ্গিতে বললেন, একবার যখন রসনা সন্তুষ্ট করেছ––
দেবরূপ বুঝতে পারেন প্রতিদিন দুপুরে শ্রাবস্তীর সঙ্গে মণীশ আগরওয়ালের নানা রকম কথা হয়, বেশিরভাগই বোধ হয় খাওয়া সংক্রান্ত, তার দু–একটা শ্রাবস্তী হঠাৎ বলে ফেলে দেবরূপকে৷ হেসে হেসে বলে, জানো, তোমাদের এসডিও সাহেব আমার পাঠানো চাওমিন খেয়ে কী বলেছেন? বলেছেন, গ্র্যান্ড হোটেলের রান্নাও নাকি এত ভালো নয়।
দেবরূপ জানেনও না কখন চাওমিন তৈরি করেছে শ্রাবস্তী, কীভাবে পাঠাল এসডিওর বাংলোয়।
২
গায়ে একটা সবুজ–রঙা ফ্লানেলের জামা, মাথা–কান ঢেকে সাদা স্কার্ফ, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে এসেছে রুমকি, তাকে দেখাচ্ছে ঠিক যেন একটা ডল পুতুল৷ শীত এখনও পুরো পড়েনি, তাতেই রুমকিকে এরকম ঢেকেঢুকে দিয়েছে তার বাবা৷ না হলে নাকি ঠাণ্ডা লাগবে তার৷ কী আর করে রুমকি সোফায় বসে সেন্টার টেবিলে ঝুঁকে পড়ে রংপেন্সিল বক্সের মধ্যে হালকা হলুজ রংটা খুঁজছিল রুমকি৷
তার সামনে ছবি আঁকার বড়োসড়ো খাতাটা৷ তার এক–এক পৃষ্ঠায় এক–একরকম ছবি এঁকেছে রুমকি৷ আজ তারই একটি পৃষ্ঠায় একটা বাংলোবাড়ি আঁকার চেষ্টা করছিল রুমকি৷
যে–বাংলোটায় তারা থাকে সেটা একতলা, তার উপরে মেটে রঙের টালি বসানো ছাদ৷ কিন্তু বাংলোটা তার মায়ের মোটেই পছন্দ নয় অনেকদিনের পুরোনো কিনা! রুমকি তাই রংপেন্সিলগুলো দিয়ে একটা বাংলো আঁকছিল যাতে একদম নতুন মনে হয় বাংলোটা৷
কিন্তু যতবারই আঁকছিল, পছন্দ হচ্ছিল না তার৷
খাতার পাতায় বড়ো করে একটা চিকে দিয়ে চলে যাচ্ছিল পরের পাতায়৷
শ্রাবস্তী সোফার পাশ দিয়ে চলাফেরা করার সময় নজরে পড়ল দৃশ্যটা, দেখে মুখটা কীরকম করে বলল, বাংলোটা তুই নতুন করে আঁকলেই কি আমাদের বাংলো নতুন হয়ে যাবে? তোর বাবাকে কতদিন ধরে বলছি অফিসে বলে বাংলোটা সারিয়েসুরিয়ে রং করে নাও৷
রুমকি জানে তাদের বাংলোর প্লাস্টার খসে যাচ্ছে বলে তার মায়ের ভারী অশান্তি৷ কিন্তু বাবা প্রতিবারই বলে, দাঁড়াও, এখন অফিসে টাকা নেই।
তাতে মা খুশি হয় না, বলে, কেন, এসডিওর বাংলো রং করার সময় তো অফিসের টাকার অভাব হয় না দেখেছ, কীরকম ঝকঝক করে এসেডিওর বাংলোটা।
বাবা মুখ গোমড়া করে বলে, এসডিওর বাংলোর সঙ্গে কী আমাদের বাংলোর তুলনা হয়
মা কিছু বলে না, মুখটা ভার করে থাকে।
সেই কারণেই রুমকির এই বাংলো আঁকার চেষ্টা৷ কিন্তু আঁকতে পারছে কোথায়!
খাতার পাতাটা খুলে নিয়ে এল বাবার কাছে, দ্যাখো তো, এই জায়গাটা ঠিক হচ্ছে না৷ তুমি একটু ছাদের উপরের টালির জায়গাটা ঠিক করে দাও তো লাল রং লাগালে হবে না৷ লালের মতোই, কিন্তু একটু যেন অন্য রকম৷ রংপেন্সিল বক্সে এই রংটা নেই।
৩
চিকেন চাঁপ আইটেমটি মাত্র একবারই কলকাতার এক রেস্টুরেন্টে খেয়েছিল শ্রাবস্তী৷ চিকেনের প্রিপারেশনটা দারুণ হয়েছিল, কিন্তু ঠিক কী করে তৈরি হয় ওটা তখন জানা হয়নি তার৷ এখন এসডিও সাহেবের জন্য সেই চিকেন চাঁপ তৈরি করতে হবে জেনে বেশ ফাঁপরে৷
কিন্তু ‘করতে জানি না’ বলাও তো ঠিক হবে না।
অনেক ভেবেচিন্তে তাদের বইয়ের র্যাকে রাখা দু–তিনটে রান্নার বই পেড়ে তার পৃষ্ঠায় চোখ রাখল শ্রাবস্তী৷ বইগুলোর প্রথম থেকে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত খুঁজে খুঁজে হল্লা হল, চিকেনের অনেকগুলো প্রিপারেশন লেখা আছে, কিন্তু চিকেন চাঁপ নেই৷
শ্রাবস্তী বেশ ফ্যাসাদেই পড়েছে, কিন্তু বুঝে উঠতে পারছে না এই সমস্যা মোকাবিলা করার কী উপায় মাঝেমধ্যে দেখছে দেবরূপ তাকাচ্ছে তার দিকে, বোঝার চেষ্টা করছে শ্রাবস্তী কী করতে চাইছে।
শ্রাবস্তী মিটিমিটি হাসছে নিজের মনে, এখনই দেবরূপকে কিছু বলতে চাইছে না, একেবারে চিকেন চাঁপ রেঁধে তাকেও সারপ্রাইজ দেবে৷
খুঁজতে খুঁজতে একটা ছোটোমোটো লেখা পেয়ে গেল, সেই প্রিপারেশনটা পড়ল দু–তিনবার, কিন্তু সেই লেখা পড়েও ধন্দ কাটে না তার। ঠিক বুঝে উঠতে পারল না প্রসেসটা আসলে কী বইয়ের লেখা পড়ে রাঁধতে গিয়ে শেষে কি হাস্যাস্পদ হবে।
না, বইয়ে হবে না। বই ছেড়ে শেষে খুঁজে পেল হালফিলের কয়েকটা পত্রিকা, সেখানে চিকেনের নতুন নতুন আইটেম শিখিয়েছেন নামী হেটেলের একজন শেফ৷ চিকেন চাঁপ পেয়ে লাফিয়ে উঠল৷ লেখাটা মন দিয়ে পড়ল বার কয়েক৷ না, তাতেও হল না বড়ো আকারের একটা গেট টুগেদার হলে এই লেখাটা অনুসরণ করা যায়, কিন্তু সে তো রাঁধবে মাত্র তিন–চারজনের জন্য সেরকমটা শেখানো হয়নি লেখাটায়৷
পত্রিকা ঘাঁটতে গিয়ে অনেকটাই রাত হয়ে গিয়েছিল৷ ইতিমধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছে রুমকি, কিন্তু দেবরূপের ঘুম আসছে না চোখে৷ নিশ্চয় টেবিল লাইট জ্বেলে রাখায় চোখে আলো পড়ছে তার৷
আলো নিবিয়ে বিছানায় শুতে এলে দেবরূপ বললেন, কী এত রাত জেগে লেখাপড়া করছ? সামনে পরীক্ষা নাকি।
শ্রাবস্তী হেসে বলল, আর তোমার এসডিও সাহেবের জ্বালায় আমার এখন ত্রাহি মধুসূদন চিকেন চাঁপ আমি কখনও রান্না করেছি নাকি।
––জানো না যখন ছেড়ে দাও৷
শ্রাবস্তী বলল, কী করে ছেড়ে দিই উনি খেতে চেয়েছেন, তুমিই তো বলো তোমাদের সার্ভিসে বসের যে কোনও আদেশকে ইয়েস বলাই নিয়ম৷
দেবরূপ চুপ করে থাকেন৷
শ্রাবস্তী হঠাৎ বলল, এখানে কেউ কি আছেন যার কাছে গিয়ে শিখে আসা যায়?
দেবরূপ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, দ্যাখো রবিনদার স্ত্রী জানেন কি না!
মহকুমার থার্ড অফিসার রবিনদা বয়স্ক মানুষ৷ অন্য সার্ভিস থেকে প্রমোশন পেয়ে ডবলিউবিসিএস হয়েছিলেন অনেক বেশি বয়সে৷ বেশ ক–বছর বিডিও থাকার পর সদ্য জয়েন করেছেন এই মহকুমায়৷ তাঁর স্ত্রীর কাছে চিকেন চাঁপ শিখতে যেতে হবে শুনে শ্রাবস্তী এই মুহূর্তে কোনও কথা বলল না৷ কিছুক্ষণ এলেমেলো ভাবতে থাকে, অনেকক্ষণ পরে বলল, হুঁ, মনে পড়েছে, দোলনদি জানতে পারেন।
দেবরূপ বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন, দোলনদি মানে?
––বাহ, তুমি ভুলে গেলে? এসডিজেএম সাহেবের স্ত্রী৷ এই তো গত মাসেই ঘুরে এলাম ওঁদের কোয়ার্টার থেকে।
দেবরূপ চুপ করে থেকে বললেন, আসলে আমি ওঁকে মিসেস রায় বলি৷ ওঁর নাম যে দোলন তা মনে ছিল না আমার।
শ্রাবস্তী পরদিন বিকেলেই চলে গেল এসডিজেএম সাহেবের কোয়ার্টারে৷ হ্যাঁ, এবার তার অনুমানই ঠিক৷ দোলনদিকে চিকেন চাঁপের কথা বলতেই হেসে বললেন, হঠাৎ দেবরূপদার চিকেন চাঁপ খাওয়ার ইচ্ছে হয়েছে নাকি?
শ্রাবস্তী চেপে গেল তার উদ্দেশ্য, হেসে বলল, ওই আর কি সব কিছু শিখে রাখা ভালো৷ কখন যে কোনটা কাজে লাগে তার ঠিক কি!
অতঃপর দোলনদির কাছে ভালো করে শিখে নিল কী করে চিকেন চাঁপ তৈরি করতে হয়, তারপর হাসি–হাসি মুখে বলল, বুঝলেন দোলনদি, খুব গাড্ডায় পড়ে গিয়েছিলাম৷ ভাবলাম এই বিদেশে কোথায় যাই কার কাছে যাই এটা শিখতে তারপর মনে পড়ল আপনার কথা আমি আন্দাজ করেছিলাম আপনি ঠিক জানবেন এটা আপনি কত হাই সোসাইটিতে মিশেছেন, জানবেনই তো
তার পরের দিন এসডিও সাহেবের আর্দালি কার্তিক এসে হাজির শ্রাবস্তীদের বাংলোয়৷ তার হাতে বাজার করার একটা ব্যাগ৷ শ্রাবস্তী জানত চিকেন আসবে আজ৷
দেবরূপ একটু অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, ওঁকে চিকেন কিনে পাঠাতে হল কেন? তুমি বললেই তো বকু কিনে আনত বাজার থেকে৷
শ্রাবস্তী একটু অপ্রতিভ হয়ে বলল, সে ওঁর ইচ্ছে হয়েছে কিনে আনতে, আমি কি বারণ করব
সেদিন মহা উৎসাহে চিকেন চাঁপ তৈরি করে শ্রাবস্তী হাসি–হাসি মুখে ফোন করল এসডিও সাহেবকে, ইয়েস, স্যার, চিকেন চাঁপ রেডি৷ আপনি কি আপনার আর্দালিকে একবার আমাদের বাংলোয় পাঠাবেন?
৪
শীত তখন মধ্যপথে৷ হিমালয়ের বরফ ছুঁয়ে উত্তুরে বাতাস কাঁপ ধরিয়ে দিচ্ছে হাড়ে৷ বাংলোর একটা জানালাও আর খুলে রাখা যাচ্ছে না একটা মোটা শাল গায়ে চাপিয়ে খবরের কাগজে মন দিয়েছেন দেবরূপ, হঠাৎ ফোন করলেন মণীশ আগরওয়াল, স্যানিয়েল সাহেব, একবার আসবেন আমার বাংলোয়?
দেবরূপ একটু অবাক হলেন এই সাতসকালে তাঁর তলব হওয়ায়, বললেন, হ্যাঁ, যাচ্ছি৷
পরক্ষণে ফোনের ভিতর ভেসে এল, একেবারে তৈরি হয়ে আসবেন, স্যানিয়েল সাহেব৷ ল অ্যান্ড অর্ডার প্রব্লেম৷ আমাদের বর্ডার এলাকায় একটা আদিবাসী পাড়া আছে৷ সেখানে বাইরের একদল ট্যুরিস্ট এসে ঝামেলা বাধিয়েছে৷ আদিবাসীরা ট্যুরিস্টদের আটকে রেখেছে একটা ঘরের মধ্যে৷
জায়গাটা এখান থেকে অনেকটা দূরে৷ গাড়িতে যেতেই লাগবে এক ঘন্টার মতো
দেবরূপ শঙ্কিত হয়ে বললেন, খুব চিন্তার বিষয়।
––হ্যাঁ, আমি লোকাল ওসিকে পাঠিয়ে দিয়েছি স্পটে৷ কিন্তু মনে হচ্ছে তিনি ট্যাকল করতে পারছেন না৷ মেসেজ পাঠিয়েছেন টু সেন্ড মোর ফোর্স৷
–– তা হলে তো এসডিপিওকে বলতে হয়।
––হ্যাঁ, আমি একটু আগেই ফোন করেছি রায়চৌধুরিকে৷ দু প্লাটুন ফোর্স রেডি করেছে৷ এখন বলছেন একজন ম্যাজিস্ট্রেটকে সঙ্গে দিতে৷
দেবরূপ বুঝে গেলেন তাঁর এখন কী করণীয়, বললেন ঠিক আছে এসডিও সাহেব৷ আমি রেডি হয়ে এখনই চলে যাচ্ছি৷ ওখানকার সার্কেল ইনস্পেক্টরকেও চলে যেতে বলুন স্পটে৷ মনে হচ্ছে ঝামেলা হবে৷
––হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি এসডিপিওকে বলে দিচ্ছি৷
একটু পরেই প্রস্তুত হয়ে বেরিয়ে পড়লেন দেবরূপ৷
আর ড্রাইবাল প্রব্লেম হলে যা হয়, প্রচুর সময় লাগল বিষয়টা নিয়ন্ত্রণে আনতে৷ আদিবাসীদের মগজে কিছু ঢুকলে তাতে এককাট্টা হয়ে থাকে ওরা৷ আসলে সব কিছুতেই তারা এতটা বঞ্চিত হয়ে থাকে যে, প্রশাসনের উপর তাদের কোনও আস্থাই থাকে না বহুক্ষণ বুঝিয়ে–বাঝিয়ে যখন সেই ট্যুরিস্টদের মুক্ত করতে পারলেন, বিকেল হয়ে এসেছে প্রায়৷
সেখান থেকে ঘেমেনেয়ে, ক্লান্ত শরীরে সন্ধে নাগাদ ফিরলেন বাংলোয়৷ ফিরে দেখলেন ঘরে কাজের মেয়ে বাসন্তী সামলাচ্ছে রুমকিকে, শ্রাবস্তী ঘরে নেই রুমকির মুখ ভার৷ কাজের মেয়েটি ঠিক বলতে পারল না তার বউদিমণি কোথায় গেছে, তবে বলল ঘন্টাখানেক আগে শ্রাবস্তী একটা টিফিনকৌটো হাতে নিয়ে গেছে কোথাও৷
শ্রাবস্তী ফিরল আরও আধঘন্টা পরে, দেবরূপকে দেখে অবাক হয়ে বলল, তুমি এর মধ্যে এসে গেছ? এসডিও সাহেব বললেন, খুব গোলমালের মধ্যে গেছ, ফিরতে রাত হবে।
দেবরূপ কিছু বললেন না শ্রাবস্তীকে৷
একটু পরেই চা করে নিয়ে এল শ্রাবস্তী, হাসি–হাসি মুখে বলল, এসডিও সাহেব হঠাৎ বললেন, ম্যাডাম, নিমকি ফুরিয়ে গেছে৷ তাই অনেকটা ভেজে নিয়ে গেলাম যাতে দশদিনের মধ্যে আর চাইতে না হয়।
দেবরূপ চায়ের কাপে ঠোঁট ছোঁয়ালেন, কিন্তু চুমুক দিয়েই বুঝলেন চা করা বোধ হয় ভুলে গেছে শ্রাবস্তী, বললেন, ইস্, এখনও তো ডায়াবেটিস হয়নি আমার!
শ্রাবস্তী জিব কেটে বলল, চিনি দিইনি, না?
বলেই ছুটল রান্নাঘরে, চামচে করে চিনি এনে ঢালল চায়ের কাপে৷
দেবরূপ জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি চা নিলে না?
––আমি তো এসডিও সাহেবের বাংলোয় খেয়ে এলাম এক্ষুনি৷ উনি কিছুতেই ছাড়লেন না।
দেবরূপ চায়ের কাপে চুমুক দেওয়া থামিয়ে শ্রাবস্তীর হাসি–হাসি মুখখানা দেখলেন ভালো করে৷ শ্রাবস্তীর মুখমণ্ডলে রক্তের সঞ্চার কি একটু বেশি এতদিন ঠিক খেয়াল করেননি, এখন মনে হল শ্রাবস্তীর অভিব্যক্তিতে যেন অন্য কোনও ছায়া।
শ্রাবস্তী তার কাজে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলে হঠাৎ রুমকি আস্তে আস্তে তার কাছ ঘেঁসে দাঁড়ায়, হঠাৎ বলল, বাবা, তুমি কোথায় গিয়েছিলে?
দেবরূপ হেসে বললেন, কয়েকটা লোক দুষ্টুমি করছিল, তাই টাইট করে দিয়ে এলাম৷
রুমকি ভুরুতে কোঁচ ফেলে, কী করে টাইট করলে?
––একশো চুয়াল্লিশ ধারা জারি করে দিলাম যাতে তারা কেউ ওই জায়গাটার আশেপাশে না আসতে পারে৷ তারপর উদ্ধার করে নিয়ে এলাম কয়েকজন ট্যুরিস্টকে৷
রুমকি হঠাৎ বলে ডঠল, তোমার এসডিও লোকটা খুব দুষ্টু৷
দেবরূপ একটু চমকে উঠলেন মেয়ের কথা শুনে৷ ছোট্ট মেয়ে, তার চোখেও কি ধরা পড়েছে মায়ের এই ব্যতিক্রমী আচরণ৷
৫
শীতের দুপুরগুলো বেশ আলসেমিতে কাটে শ্রাবস্তীর৷ বিছানায় আড় হয়ে শুয়ে ম্যাগাজিন পড়া ছাড়া আর কী কাজ একই পত্রিকার পাতা দশবার করে উল্টে যায়, কিন্তু দুপুর যেন আর শেষ হয় না,
দুপুর দুটো নাগাদ বেজে ডঠল টেলিফোনের ক্রিরিং ক্রিরিং একটানা শব্দ৷ অবশ্য শব্দটা বেশিক্ষণ বাজতে দিল না শ্রাবস্তী, তার আগেই শীতের আলসেমিতে ওতপ্রোত শরীরটা স্প্রিংএর মতো লাফ দিয়ে উঠে ধরে ফেলল রিসিভারটা, হ্যালো––
––ম্যাডাম কি রিল্যাক্স করছেন?
শ্রাবস্তী হেসে উঠল, ইয়েস স্যার৷ লাঞ্চ হয়ে গেলে দুপুরে মেয়েদের আর কী কাজ!
––তোমার মুখে স্যার শুনতে বেশ লাগে কিন্তু৷
––আমারও বেশ লাগে, স্যার৷ কাউকে তো এ জীবনে স্যার বলতে হল না৷
––শোনো, যে জন্যে ফোন করলাম৷ আজ বিকেলে শহর থেকে বাইরে সুন্দর একটা রেস্তোরাঁর উদ্বোধন হচ্ছে৷
––তাই নাকি, গ্রেট একদিন যেতে হবে৷
––একদিন কেন, আজই যাব ভাবছি৷ রেস্তোরাঁর মালিক আমাকে ইনভাইট করে গেলেন৷
––তাই নাকি? তা তো করবেই৷ এলাকার এসডিও তো সর্বময় কর্তা৷
––তুমি যদি সঙ্গে যেতে চাও নিয়ে যাব৷
––আমি! শ্রাবস্তী খুবই অবাক, বলল, আমি কী করে যাব? মি. সান্যাল তো অফিস সেরে কোয়ার্টারে ফিরে চা চাইবেন৷
––না, ম্যাডাম, চাইবেন না তাঁকে একটা বিশেষ কাজ দিয়ে জেলা সদরে পাঠাচ্ছি৷ ফিরতে রাত হবে৷
শ্রাবস্তী রিসিভার হাতে নিয়ে মাথা নাড়ে, হবে না, স্যার৷ রুমকি একা থাকতে পারবে না।
––রুমকিকে তুমি কাজের লোকের হেপাজতে রেখে যাও ঘন্টা দেড়েকের জন্য৷ সেদিন যেমন রেখেছিলে৷
শ্রাবস্তী ইতস্তত করে, একটু পরে বলল, খুব মুশকিল হয়৷ মেয়ে বড়ো হয়েছে তো।
––একদিন বেরোলে কিছু হবে না৷ তুমি ঠিক চারটের সময় আমার বাংলোর সামনে চলে এসো৷ আমি অফিস থেকে বেরিয়ে ওই সময় বাংলোর সামনে এসে তোমাকে তুলে নেব৷ মি. স্যানিয়েল তার আগেই সদরে বেরিয়ে যাবেন অন্য একটা গাড়ি নিয়ে৷
শ্রাবস্তী বিব্রত বোধ করে, কিন্তু সে কিছু বলার আগেই তারের ও–প্রান্ত থেকে ভেসে এল, ম্যাডাম, নো এক্সকিউজ দিস টাইম৷ চলে এসো কিন্তু––
ফোন রেখে শ্রাবস্তী কিছুক্ষণ বসে রইল মোহগ্রস্তের মতো৷ তারপর আলমারি থেকে ভালো একটা শাড়ি পরে প্রস্তুত হয়, দরজা খুলে দেখে কাজের মেয়ে বাসন্তী এসে পৌঁছোল কিনা! অস্থির হয়ে পায়চারি করতে থাকে যতক্ষণ না বাসন্তী এসে পৌঁছল৷ বাসন্তীকে দেখে তাড়াহুড়ো করে বলল, বাসন্তী আমি একটু বেরোচ্ছি৷
––কোথায়, ম্যাডাম?
শ্রাবস্তী অস্বস্তিতে পড়ে, একটু পরে সামলে নিয়ে বলল, একটু শপিংএ যাচ্ছি৷ সন্ধের মধ্যে ফিরে আসব৷ তুমি রুমকিকে একটু দেখো৷
কিন্তু একবার বাইরে গেলে যা হয়, রেস্টুরেন্টে খেয়েদেয়ে বাংলোয় ফিরতে একটু রাতই হয়ে গেল তার৷ এসে দেখল দেবরূপ ফিরে এসেছে এর মধ্যে৷ তার মুখ গম্ভীর৷ রুমকিও তার সঙ্গে কথা বলছে না। শ্রাবস্তীর একটু অস্বস্তি হচ্ছিল, রুমকিকেই জিজ্ঞাসা করল, বাসন্তী ছিল না তোর কাছে?
রুমকি মুখগোঁজ করে বলল, হ্যাঁ, ছিল৷ বাবা আসার পর গেল৷
দেবরূপ হঠাৎ জিজ্ঞাসা করল, তুমি শপিং করতে গিয়েছিলে, কিন্তু তোমার হাত তো খালি? দোকানে কিছু পাওয়া যায়নি।
আচমকা প্রশ্নে শ্রাবস্তী কোনও উত্তর দিতে পারল না৷
৬
ছুটির দিনে বিছানায় উপুড় হয়ে স্কুলবইয়ের পাতা ওল্টায় রুমকি৷ কিছুক্ষণ ওল্টানোর পর তার হাই ওঠে৷ বইটা ডল্টে রেখে বিছানায় গড়িয়ে নেয় এত পাক৷ তারপর ছবি আঁকার খাতাটা খুলে রাখে সামনে৷ ছবি আঁকতেই সবচেয়ে বেশি পছন্দ তার৷
অন্যমনস্কভাবে একটা খাঁচার ছবি আঁকতে থাকে৷ খাঁচাটা ক–দিন আগে দেখে এসেছে একটা কাকুদের বাড়িতে৷ খাঁচার ভিতরে একটা সবুজ টিয়াপাখি৷
কিন্তু খাঁচাটা যাও বা আঁকতে পেরেছে, তার ভিতরের পাখিটা কিছুতেই ঠিকমতো আঁকতে পারছে না আঁকতে না–পারায় কীরকম একটা কান্না পাচ্ছিল তার৷
বহুক্ষণ সাদা পাতায় কাটাকুটি করল নিজের মনে৷ খাঁচার চেহারাটা যাও বা মনে করতে পারছে, টিয়ার গড়নটা মনে করতে পারছে না কখনও মাথাটা ঠিক আঁকল তো পেটের কাছটা মোটা এঁকে ফেলল৷ আবার পেটটা ঠিক আঁকল তো মাথাটা কীরকম ঝোঁকানো হয়ে গেল।
বাবা অফিসে চলে গেছে, নইলে বাবাকে বললে উডপেন্সিল দিয়ে রেখাটা এঁকে দিত ঠিক৷
মাকে বলতে পারবে না, মা এখন টেলিফোন করছে৷ রোজ এই সময়টায় টেলিফোন করে মা৷ কথায় কথায় খিলখিল করে হাসতে থাকে, হাসতেই থাকে৷ মাকে এখন কিছু বললেই বকা দিয়ে বলবে, এখন আঁকতে হবে না, কালকের হোমটাস্ক করে ফেলো এখন৷
রুমকি জানে কাকে টেলিফোন করে মা৷
৭
পাহাড়ের দেশ নয় এটা, কিন্তু পাহাড়ের ছায়া দীর্ঘ হয়ে পড়ে এখানে৷ চা–বাগানের মাইল মাইল দৃশ্য কীরকম মনমরা হয়ে থাকে রাস্তার দুপাশে৷ শীত যাই–যাই করেও যেন যায় না।
কয়েকদিন ধরে খুব অন্যমনস্ক থাকছিলেন দেবরূপ৷ একদিন এজলাসে বসে হিয়ারিং করার সময় লইয়ারদের সওয়াল কিছুই তাঁর কানে যাচ্ছিল না৷ তার পেশকার শুভরঞ্জনবাবু তাঁকে দেখছেন দীর্ঘদিন ধরে, অনুমান করছিলেন আজ যেন শুনানিতে মন বসছে না ম্যাজিস্ট্রেটের৷ হঠাৎ তাঁর কাছে এসে ফিসফিস করে জানতে চাইলেন, স্যার, আপনার শরীর কি ভালো নেই?
দেবরূপ চমক ভেঙে বললেন, না, না ঠিক আছে৷
পেশকারবাবু তবুও বললেন, যদি সেরকম অসুবিধা থাকে, তা হলে আজ শুনানি অ্যাডজার্ন করে দিন, স্যার৷
––না, না ঠিক আছে৷
সওয়াল চলতে থাকে দু–পক্ষে, কিছুক্ষণ পরে দেবরূপের মনে হল খুবই অসহ্য লাগছে উকিলবাবুদের চেঁচামেচি, উক্তি–প্রত্যুক্তি৷ সেই কেসটা কোনক্রমে শুনে রায় লিখতে শুরু করলেন জাজমেন্ট–শীটে৷ কী লিখলেন তাও যেন বোধগম্য হল না নিজের৷ লেখা মুলতুবি রেখে হঠাৎ মুখ উঁচু করে বললেন, আজ জাজমেন্ট দিচ্ছি না৷ কাল সকালে জানাব আপনাদের৷
উকিলবাবুরা একটু বিস্মিতই হলেন কেন না তাঁরা গত সাড়ে চার বছর ধরে দেখছেন ম্যাজিস্ট্রেট দেবরূপ সান্যালকে৷ খুবই বিচক্ষণ অফিসার হিসেবে এই মহকুমায় তাঁর পরিচিতি৷ দু–পক্ষের সওয়াল শোনার পর চটপট রায় লিখে পেশকারবাবুকে ফাইল ফিরিয়ে দেন, পরক্ষণে বলেন, নেক্সট৷
আজই হঠাৎ তার ব্যতিক্রম৷
সেদিন অন্য কোনও কেসও আর শুনলেন না দেবরূপ৷ বাকি কেস ‘আগামীকাল শুনব’ বলে এজলাস ছেড়ে ফিরে এলেন নিজের চেম্বারে৷ কিন্তু স্বস্তিতে বসা হল না, পরক্ষণে টেবিলে বেজে উঠল ইন্টারকম, ওপাশে এসডিওর গলা, মি. স্যানিয়েল, পীরগঞ্জ ব্লকের বিডিও ঘেরাও হয়েছে, লোকাল ওসি ফোর্স নিয়ে গেছে, কিন্তু যারা এজিটেট করছে, তাদের সামলাতে পারছে না৷ এসডিপিও বললেন একজন ম্যাজিস্ট্রেট পাঠাতে৷ আপনি যদি একটু যান৷
দেবরূপের মনে হল এসডিওকে বলেন আজ তাঁর শরীরটা ভালো নেই৷ যদি থার্ড অফিসার রবিন সামন্তকে পাঠান৷
কিন্তু বলতে পারলেন না কেন না কোনও কাজেই কখনও না বলতে শেখেননি, আজ হঠাৎ বলবেনই বা কেন, সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন পীরগঞ্জের উদ্দেশে৷
ভাবলেন অফিস থেকে বাইরে বেরিয়ে এলে যদি মনটা বশে আনা যায় হঠাৎ তাঁর সংসারে এমন সব ঘটনা ঘটছে যা কখনও ঘটবে এমন ভাবতে পারেননি৷ কিন্তু যা ঘটছে তা আয়ত্তে আনতেও পারছেন না।
পীরগঞ্জ তাঁদের সাবডিভিশনাল অফিস থেকে প্রায় তিরিশ কিলোমিটার পথ, যাওয়ার রাস্তাটাও খুব এবড়ো খেবড়ো, সেই রাস্তায় জিপে যেতে গিয়ে আজ মনে হল বেশ কষ্ট হচ্ছে তাঁর৷ হঠাৎ মেজাজটা খিঁচড়ে গেল খুব৷ মহকুমায় এসডিও ছাড়া দুজন ম্যাজিস্ট্রেট আছে, কিন্তু যাবতীয় ল অ্যান্ড অর্ডারের ডিডটি অর্পিত হয় তাঁর উপরই।
এতকাল এমনটা মনে হয়নি, ইদানীং মনে হচ্ছে তাঁর উপর একটু বেশিই প্রেশার পড়ছে এখানে
পীরগঞ্জের সমস্যাটা তেমন জটিল নয়, অথচ বিডিও অনভিজ্ঞ হওয়ার কারণে সহজসরল বিষয়টি অহেতুক জটিল আকার ধারণ করেছে আজ৷ গোটা বিষয়টি শুনে, সরকারি সার্কুলারে যা যা বলা আছে তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা করে দিতে ঘেরাও উঠে গেল অমনি৷
বিডিওকে বিষয়টি ভালো করে বুঝিয়ে দিয়ে যখন সেখান থেকে বেরোতে পারলেন, সন্ধে অতিক্রান্ত৷ জিপের ড্রাইভারকে বললেন, নীলেশ, একটু জোরে চালাও তো৷
নীলেশ স্টিয়ারিঙে একটু মোচড় দিয়ে অ্যাকসিলেরেটরে চাপ দিয়ে একটু অবাক হয়ে তাকায় দেবরূপের দিকে৷ সেকেন্ড অফিসার সাহেব তো কখনও গাড়ি জোরে চালাতে বলেন না, বরং জিপে স্পিড তুললে সাবধান করেন, নীলেশ, জীবন একটাই৷ জোরে চালিয়ে বাংলোয় পৌঁছোতে গিয়ে সোজা উপরে না চলে যাই।
আজ সেই স্যার কি না––
তবু বাংলোয় পৌঁছোতে রাত আটটা৷ ভিতরে গিয়ে মনে হল বাড়ির পরিবেশ যেমন থাকত তেমনটি আর নেই৷ শ্রাবস্তীকে কীরকম অন্যমনস্ক আর উদাসীন মনে হচ্ছিল আজ৷
তবে প্রতিদিনকার মতো চা করে এনে দিয়ে গেল তাঁর সামনে৷ শ্রাবস্তী অন্যদিন তাঁর সঙ্গে চা নিয়ে বসে, আজ বসল না, রান্নাঘরে ঢুকে গেল কাজ করতে৷
তিনি যেই একটু একলা হলেন, রুমকি আস্তে আস্তে এসে বসল তাঁর পাশে, ফিসফিস করে বলল, বাবা, তুমি একশো চুয়াল্লিশ ধারা জারি করে দাও তো।
দেবরূপ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, হঠাৎ?
––তুমি যখনই বাইরে কোথাও ট্যুরে যাও, এসডিও চলে আসে আমাদের বাড়ি৷ তুমি এমন একশো চুয়াল্লিশ ধারা জারি করে দাও যেন দুষ্টু লোকটা আর না আসতে পারে এ বাড়ি৷
দেবরূপ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন মেয়ের মুখের দিকে৷ বুকের ভিতরটা কেমন যেন করে উঠল৷
৮
উত্তুরে হাওয়ার দিন শেষ হয়ে তীব্রতা বাড়তে থাকে সূর্যকণার৷ হাওয়ায় শুরু হয় গুমোটপর্ব৷ আইঢাই করতে থাকে ভিতর–শরীর৷ মাথার উপর ফ্যানের প্রবল ঘূর্ণনও স্থির হতে দেয় না মনোযোগ৷ কয়েকদিন খুব এলোমেলো কাটল দেবরূপের৷ কোথাও ভিতরে একটা মন খারাপ, অথচ সেই মন খারাপটা টোকা দিয়ে উড়িয়ে দেবেন তা পারছেন না। চিনচিনে একটা ব্যথা কোন অলক্ষ্য থেকে গড়িয়ে নামছে মনের গহনে, চেষ্টা করেও উপেক্ষা করতে পারছেন না যন্ত্রণাটা৷
অফিসে গিয়ে খুবই উদাসীন থাকার চেষ্টা করছেন, ফাইলের পৃষ্ঠা খুলে কলম ধরে আছেন তার উপরে, কিন্তু কী আশ্চর্য, কী লিখবেন তা যেন ভেবে পাচ্ছেন না এ ক–দিন কলমের ডগা থেকে উবে গিয়েছে যাবতীয় অক্ষরমালা৷
দিন কয়েক পরে অফিসের চেয়ারে বসেছেন, রুমাল দিয়ে মুছছেন ঘামসিক্ত কপাল–ঘাড়–গলা, সে সময় হঠাৎ একটা আশ্চর্য সংবাদ এল দেবরূপের কানে৷ টিফিন আওয়ারের দিকে থার্ড অফিসার রবিনদা হঠাৎ তার চেম্বারে এসে বললেন, শুনেছ, এসডিও সাহেব বদলি হচ্ছেন!
দেবরূপের কানে শব্দগুলো যেন দুর্বোধ্য ঠেকল এই মুহূর্তে৷ যেন বুঝে উঠতে পারলেন না কী বলতে চাইছেন রবিনদা, অনেকক্ষণ পরে বিস্মিত হয়ে বললেন, তাই নাকি?
––হ্যাঁ৷ গভর্নমেন্ট কী একটা অ্যালিগেশন পেয়েছে তাঁর নামে৷ কী একটা রেস্তোরাঁ উদবোধন করতে গিয়েছিলেন, তার মালিকের অ্যান্টিসিডেন্ট ভালো নয়৷ সেই ব্যাপারেই অভিযোগ৷ তাই তাঁর টার্ম শেষ হওয়ার আগেই বদলি৷ নইলে নিয়মমতো আরও মাস চারেক থাকার কথা এখানে৷
দেবরূপ যেন বিশ্বাস করতেও পারছেন না সংবাদটা।
সেদিন বাংলোয় ফিরে অবশ্য এসডিওর বদলির খবর ভাঙলেন না শ্রাবস্তীর কাছে৷
কিন্তু শ্রাবস্তীর মুখ গম্ভীর দেখে অনুমান করলেন খবরটা জানে শ্রাবস্তী৷ হয়তো দুপুরে এসডিওর কাছ থেকে টেলিফোনে জেনে গেছে তাঁর বদলি হওয়াটা৷ দেবরূপ ঘরে ফিরতে চা করে নিয়ে এসে বসল তাঁর সামনে, কিন্তু চায়ের কাপে চুমুক দিতে ভুলে যাচ্ছিল যেন।
দেবরূপ অবশ্য কোনও আলোচনাও করলেন না সে–বিষয়ে৷
তবে দেবরূপের ভিতরে যে–কাঁটাটা খচখচ করছিল তার কোথাও যেন একটা উপশম৷ আগের চেয়ে সহজ হওয়ার চেষ্টা করছিলেন, শ্রাবস্তীর সঙ্গে কথা বলছিলেন খুব কম, কিন্তু যে–কথাই বলছিলেন স্বাভাবিক কণ্ঠে৷
কিন্তু বিস্মিত হয়ে লক্ষ করছিলেন এসডিওর বদলির অর্ডার আসতে শ্রাবস্তীকে মনে হচ্ছে একেবারেই অচেনা৷
দেবরূপ তাঁকে ঘাঁটাতে চাইছিলেন না আপাতত৷
উপরমহল থেকে কী অর্ডার হয়েছে কে জানে, তবে মহকুমার চার্জ বুঝিয়ে খুব দ্রুত চলে যেতে হল মণীশ আগরওয়ালকে৷
সেদিন রাতে শুয়ে খেয়াল করছিলেন শ্রাবস্তী বারবার উসিবিসি করছে, তার চোখে ঘুম নেই৷ দেবরূপের মনে হচ্ছিল যে–শ্রাবস্তীকে গত পাঁচ বছরেরও বেশি সময়কাল চিনেছিলেন, এই শ্রাবস্তী সে নয়, এ এক অন্য শ্রাবস্তী৷ এমনকি এও দেখছিলেন রুমকির উপরও যেন তার সামান্য হলেও অবহেলা৷
কিন্তু সমস্যাটার গভীরতা ঠিক কতখানি তা একটুও বুঝে উঠতে পারেননি দেবরূপ৷ দিনতিনেক কাটল এক অসহনীয় পরিস্থিতির মধ্যে৷ বাংলোর মধ্যে সৃষ্টি হল ভীষণ থমথমে অবস্থা৷ শ্রাবস্তী একটা কথাও উচ্চারণ করছিল না, শুধু নিঃশব্দ থেকে ঘরের কাজগুলো করে চলেছিল, যেন এ–বাড়িতে সে আছে ঠিকই, কিন্তু থেকেও যেন নেই।
দেবরূপের যেমন অস্বস্তি হচ্ছিল, তার চেয়েও বেশি করুণ অবস্থা রুমকির৷
সেদিন বাড়ি ফিরতে রুমকি বলল, জানো, বাবা, এখনও রোজ দুপুরে কার সঙ্গে কথা বলে মা। আজ বেশ জোর জোরে কথা বলছিল।
দেবরূপ চমকে ডঠে বললেন, তাই নাকি!
কিছুক্ষণ চোখ বুজে কিছু যেন ভাবতে চাইলেন দেবরূপ৷
কিন্তু ভাবনার আর দরকার হল না৷
চতুর্থ দিনের মাথায় হঠাৎ ভোরে ঘুম ভেঙে দেবরূপ দেখলেন শ্রাবস্তী বিছানায় নেই৷ সাধারণত সে একটু দেরি করে বিছানা ছাড়ে, কিন্তু এত ভোরে কেন উঠেছে তা দেখতে বিছানা ছেড়ে ডঠে আবিষ্কার করলেন ঘরের দরজার ছিটকিনি খোলা, কিন্তু ভেজানো৷ দেবরূপ কেন যেন অস্থির হয়ে উঠলেন ভিতরে ভিতরে, দরজা খুলে দেখলেন বাংলোর গেটের তালাও খোলা৷
তক্ষুনি ঘরের ভিতর ঢুকে এদিক ওদিক চোখ চালাতে নজরে পড়ল ড্রেসিং টেবিলের উপর এক টুকরো চিরকুট৷ পেপারওয়েট দিয়ে চাপা দেওয়া৷ পেপারওয়েট সরিয়ে চিরকুট তুলে দেখলেন, তাতে লেখা, এখানে আর থাকতে পারলাম না৷ চললাম৷ রুমকিকে তুমি দেখো৷
দেবরূপের ভিতরে এক ঝটকায় অনেক কিছু ভেঙে পড়ল, হাত থেকে খসে পড়ল চিরকুটটা, বিছানায় তাকিয়ে দেখলেন ঘুমন্ত রুমকির দিকে৷ রুমকি ঘুমিয়ে আছে নিশ্চিন্তে, কিছুই জানল না
দেবরূপের বুকের ভিতরটা ফাঁকা হয়ে গেল হঠাৎ৷ কী আশ্চর্য, শ্রাবস্তী তাদের ছেড়ে চলে গেল চলে যেতে পারল!
তাঁর জন্য না হোক, রুমকির মায়া কাটিয়ে শ্রাবস্তী চলে যেতে পারল তা যেন ভাবতেই পারছেন না এই মুহূর্তে।
গত কয়েকমাস ধরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো ভাবতে গিয়ে অনেক কিছু মনে উদয় হচ্ছিল তাঁর৷ শ্রাবস্তীকে কিছু বলবেন–বলবেন ভেবেও কিছু বলে উঠতে পারেননি, ভেবেছিলেন শ্রাবস্তী একসময় নিজেই বুঝতে পারবে তার ভুলটা, কিন্তু আজ এই মুহূর্তে উপলব্ধি করে উঠতে পারছেন না শ্রাবস্তী কী করে এরকম একটা চরম সিদ্ধান্ত নিতে পারল। শ্রাবস্তী একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে তা বুঝতে পেরেও হঠাৎ তাঁকে আর রুমকিকে ছেড়ে একেবারে চলে যাবে এ–ঘটনা তাঁর ভাবনার ত্রিসীমানায় ছিল না।
হঠাৎ কিছুক্ষণ শূন্য হয়ে গেল তাঁর মাথার ভিতরটা৷ প্রথমেই যে–ভাবনাটা তাঁকে বিদ্ধ করল তা হল রুমকিকে নিয়ে তিনি এখন কী করবেন। আর একটু পরেই রুমকি ঘুম ভেঙে উঠে প্রথমেই তো খুঁজবে তার মাকে।
হ্যাঁ, আর একটু পরেই ঘুম ভাঙল রুমকির৷ প্রতিদিনের মতো ঘুম ভেঙে উঠে বাবাকে দেখে মিষ্টি করে হাসল, তারপর বিছানা থেকে নামল৷ প্রথমে একটা পা ঝুলিয়ে দিল নীচে, তারপর শরীরটা টেনে নিয়ে গেল বিছানার প্রান্তে, তারপর বেশ কায়দা করে অন্য পা–টা ঝুলিয়ে দিয়ে ছোট্ট করে একটা লাফ৷
বিছানা থেকে নেমে অভ্যাসবশত রান্নাঘরের দরজার কাছে গিয়ে উঁকি দিল, সেখানে না দেখে তাকাল বাথরুমের দিকে, বাথরুমের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ দেখে কী ভাবল কে জানে, তারপর কিছুক্ষণ এলোমেলো ঘুরে বেড়াল এ–ঘর ও–ঘর, তারপর গিয়ে দাঁড়াল দেবরূপের কাছে, আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসা করল, মা কোথায়?
দেবরূপ তখন প্রবল সমস্যায়, কী উত্তর দেবেন ভেবে না পেয়ে বললেন, যাও, বাথরুমে যাও৷ হিসি করে এসো৷
রুমকি কী ভেবে বাথরুমে গেল, সেখান থেকে ফিরে এসে আস্তে আস্তে কাছে এসে দাঁড়াল বাবার কাছে, বলল, মা কোথায়?
দেবরূপকে আপাতত একটা মিথ্যে বলতেই হল, বললেন, মা এক জায়গায় গেছে––
বলে এক গেলাস জল পুরে নিয়ে এসে বললেন, তোমার জন্য নিউট্রিশন ড্রিঙ্কস করে আনি৷ ওটা খেয়ে একটু বই নিয়ে বোসো৷ তারপর আমি তোমার জন্য নুড্ল্স করে দিচ্ছি৷
রুমকি নিশ্চয় অবাক হচ্ছে হঠাৎ মায়ের পরিবর্তে বাবাই তার সকালের খাবারের ব্যবস্থা করছে দেখে কিছুক্ষণ তার রঙিন বইটইগুলো নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখতে লাগল, কিন্তু তার আজ পড়ায় মন বসছে না, কিছুক্ষণ পরে সেই প্রশ্নটিই আবার করল, বাবা, মা এখনও আসছে না কেন?
দেবরূপের সবচেয়ে সমস্যা হল রুমকিকে রাখা৷ সকালটা না হয় তিনি রুমকিকে সঙ্গ দিলেন, তার খাওয়ার ব্যবস্থা–ট্যাবস্থা করলেন, কিন্তু একটু পরেই তো তাঁকে প্রস্তুত হয়ে যেতে হবে অফিসে৷ এদিকে রুমকির স্কুলের এখন ছুটি৷ স্কুল খুলতে আরও দিনপাঁচেক৷ এ কয়েকদিন তাকে কী করে একলা রেখে অফিসে যাবেন?
একটু পরেই তাঁদের বাড়ির কাজের মেয়ে বাসন্তী আসতে তাকে বললেন, বাসন্তী, তুমি ক–টা দিন দুপুরের সময়টা এ–বাড়িতে থাকতে পারবে?
বাসন্তী এদিক ওদিক চোখ চালিয়ে শ্রাবস্তীকে খুঁজছিল৷
তাকে নিরস্ত করতে দেবরূপ আবার বললেন, আসলে ম্যাডাম আগামী ক–দিন এখানে থাকবেন না৷ তুমি যদি দুপুরের দিকে রুমকিকে সামলাও, আমি তা হলে একটু সকাল–সকাল বাংলোয় ফিরে ওকে দেখব৷
কিন্তু বাসন্তীরও ঘর সংসার আছে, তার পক্ষে সময় দেওয়া মুশকিল৷
––তা হলে দু–বেলার মতো রান্নাটা করে দেবে?
বাসন্তী রাজি হয় রান্না করে দিতে৷ জিজ্ঞাসা করে, ম্যাডাম কোনদিন ফিরবেন?
দেবরূপ কী করে চেপে রাখবেন এরকম একটা বিশ্রী ঘটনা। বললেন, কী জানি কবে ফিরবেন?
বাসন্তী এই কোয়ার্টারে কাজ করছে সেই প্রথম থেকে৷ সে কিছু কি আন্দাজ করেছে বিষয়টা! না কি সেও ভাবতে পারছে না ম্যাডাম আর কোনও দিন ফিরবেন না!
বাসন্তী অবশ্য আর কিছু জিজ্ঞাসা করল না এই মুহূর্তে, দেবরূপ অনুমান করছেন নিশ্চয় ক–দিন পর থেকে তার মনে ভিড় করবে অজস্র প্রশ্ন৷ কী উত্তর দেবেন তাকে কী করে বলবেন শ্রাবস্তী আর কোনও দিন ফিরবে না এই কোয়ার্টারে।
রুমকির অজস্র প্রশ্নই বা কী করে সামলাবেন।
সত্যিই রুমকি বহু প্রশ্ন করে জর্জরিত করে তুলল তার বাবাকে, তার একটিই জিজ্ঞাস্য, ‘মা কোথায়?’ দেবরূপ যত বলেন, ‘মা বেড়ু করতে গেছে’ তাতে সে মোটেই সন্তুষ্ট হয় না৷ দিন কয়েক সারাদিনে অসংখ্যবার প্রশ্ন করার পর একদিন কী ভেবে সেও চুপ করে গেল, মা বিষয়ে আর কোনও প্রশ্ন করে না৷ দেবরূপের মনে হল বাচ্চাদেরও বোধ হয় একটা অদ্ভুত ইনস্টিংক্ট আছে, তারা একসময় ঠিকই বুঝে যায় তার মা আর তার কাছে আসবে না৷
তবু ঘরের মধ্যে একটি দৃশ্য দেখে দেবরূপ মুষড়ে পড়লেন খুবই৷ বাইরের ঘরে ব্যস্ত ছিলেন একটা ফাইল নিয়ে, হঠাৎ পাশের ঘরে ফোঁপানির আওয়াজ শুনে ডঁকি দিয়ে দেখলেন রুমকি খাটের ওপাশে দেওয়ালে টাঙানো শ্রাবস্তীর একটা ফটোর সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছে আর বলছে, মা, তুমি ফিরে এসো৷ মা, তুমি ফিরে এসো৷
৯
দীর্ঘ সময়কাল যে–ফিসে চলাফেরা করেছেন স্বচ্ছন্দে, হঠাৎ কয়েকদিনের মধ্যে সেই পটভূমিই অচেনা–চেনা ঠেকল দেবরূপের চোখে৷ চলার পথের ঘাসগুলো গেছে ছিঁড়েখুঁড়ে, বাংলোর পলেস্তারা খসে পড়েছে আরও, অফিসের চেম্বারের দরজাটার ক্যাঁচকোঁচ আওয়াজ ঢ়ের বেড়ে গেছে আগের চেয়ে৷ নড়বড় করছে বসার চেয়ারটাও৷
তার পরের কয়েকদিন দেবরূপের জীবনে এক প্রবল এলোঝড়৷ যেমন ঘরে, তেমনই বাইরে৷ বাংলো থেকে বেরিয়ে বাইরের জগতে পা দিয়ে অনুভব করলেন বাইরেটা সামলানো আরও কঠিন৷ শ্রাবস্তী কোথায় গেছে, কেন, এই প্রশ্ণের ডত্তর রুমকিকে যেভাবে বুঝিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করলেন, সেই প্রশ্ণ যে আরও বৃহত্তর জগতে অপেক্ষা করছিল তাও অনুমান করছিলেন অফিসে গিয়ে৷ বিষয়টা আজ না হোক কাল, কাল না হোক পরশু নিশ্চয় জানাজানি হবে, সেই সহস্র জিজ্ঞাসার জবাব তিনি কীভাবে দেবেন তা ভেবে কোনও থই পাচ্ছিলেন না৷
অফিসে কাজ করছিলেন একেবারে নিথর শরীরে৷ কেড তাঁকে কিছু জিজ্ঞাসা করছে না, বুঝতেও পারছেন না কতখানি জানাজানি হয়েছে
প্রথম দুদিন কাটল এরকমই এক অচেনা নৈঃশব্দ্যের মধ্যে৷ তারপর অনুমান করছিলেন তাঁর দিকে সবাই তাকাচ্ছে একটু আড়চোখে৷ কেড তাঁর সামনে হুটহাট চলে আসছে না আগের মতো৷ কেড ফাইল নিয়ে এলেও অপেক্ষা করছে কখন সেই ফাইলে সই হবে, সই হলেই নিঃশব্দে চলে যাচ্ছে ফাইল নিয়ে৷
সেদিন টিফিন আওয়ারে হঠাৎ তার চেম্বারে এলেন থার্ড অফিসার রবিনদা৷ চেয়ারে বসে কিছুক্ষণ তিনিও নিঃশব্দ৷ তারপর একটু গলা নামিয়ে জানতে চাইলেন, কী হয়েছে বলো তো? কী সব শুনছি৷
দেবরূপ কী ডত্তর দেবেন বুঝে ডঠতে পারলেন না, তারপর বললেন, রবিনদা, আমি তো ভাবতেই পারছি না এরকমটা কী করে হল
––তুমি তার খবরটবর নিয়েছ?
দেবরূপ চুপ করে রইলেন, তারপর বললেন, কোথায় খবর নেব? কার কাছে খবর নেব?
তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কী করে জানলেন?
––ঘটনাটা অফিসে কেড কেড আলোচনা করছে আসলে মণীশ আগরওয়াল দু–জন কনটিনজেন্ট মিনিয়ালকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন নতুন স্টেশনে৷ কয়েকদিন তাদের রেখেও ছিলেন নতুন বাংলোটা গুছিয়ে দিতে৷ তারা যখন ফিরে আসছে, হঠাৎ সেখানে দেখেছে শ্রাবস্তীকে ঘোরাফেরা করতে৷ কীরকম ডদভ্রান্ত চেহারা৷ এখানে ফিরে এসে তারা ঘটনাটা কাডকে–কাডকে বলে৷ তারপর যা হয়, তারা প্রথমে হতভম্ব, তারপর এখানে খোঁজ নিয়ে জানতে পারল শ্রাবস্তী এখানে ফেরেনি৷
দেবরূপ চুপ করে থাকেন৷ বুকের ভিতরে কোথাও জলপ্রপাতের ঝরে পড়ার হু হু শব্দ৷ শ্রাবস্তীর ডদভ্রান্ত চেহরা শুনে একই সঙ্গে বিস্মিত ও ডদবিগ্ণ৷
––মনে হচ্ছে একবার খবর নিলে ভালো হত
দেবরূপ বুঝতে পারছেন না শ্রাবস্তীর খবর নেওয়া যুক্তিযুক্ত কি না যে স্বেচ্ছায় ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে পারে, তার খবর কি আর নেওয়া ডচিত
অফিসে তখন বিষয়টি নিয়ে চলছে ঘোর আলোচনা৷ আকারে ইঙ্গিতে দেবরূপ জানতে পারলেন অফিসের অনেকেই বিষয়টা আগেই অনুমান করেছিল, কিন্তু মণীশ আগরওয়ালের সঙ্গে দেবরূপ আর শ্রাবস্তীর সম্পর্ক ঠিক কোন পর্যায়ের তা বুঝে ডঠতে না পেরে দেবরূপকে কিছু বলতে সাহস পায়নি৷
১০
মণীশ আগরওয়াল বিদায় নেওয়ার পর নতুন এসডিও এলেন রীনা চ্যাটার্জি৷ মুসৌরি থেকে ড্রেনিং নিয়ে দু–বছরের শিক্ষানবিশির পর এখানেই প্রথম পোস্টিং৷ সাতাশ–আঠাশের মতো বয়স, রং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ হলেও বেশ আলগা শ্রী আছে চেহারায়৷ ব্যবহারে খুবই সহজ সরল৷ সাবডিভিশনে জয়েন করেই শুনে নিয়েছেন দেবরূপ সান্যাল এখানে অনেকদিন আছেন, অতএব অন্য এসডিওরা যা করতেন, ইনিও প্রথম কয়েকদিন দেবরূপকে তাঁর চেম্বারেই ধরে রাখছেন, যে–বিষয়েই খটকা লাগছে, অমনি জিজ্ঞাসা করছেন, এটা কী হবে বলুন তো, সান্যালদা?
সান্যালদা ডাকটা দেবরূপকে খুবই অবাক করছে, কারণ আইএএস অফিসাররা তাঁদের পদমর্যাদা সম্পর্কে খুব সচেতন, তাঁরা কেড মি. সান্যাল বলেন, কেড বলেন সান্যলসাহেব৷
অফিস–চত্বরে তখনও মণীশ আগরওয়াল আর শ্রাবস্তীকে নিয়ে চলছে ফিসফাস, কানাকানি৷ বিরাজ করছে অস্বস্তির আবহাওয়া৷ দেবরূপ খবর নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি, কিন্তু তাঁর অতিউৎসাহী স্টাফদের কেউ কেউ খবর নিয়েছিলেন মণীশ আগরওয়ালের নতুন অফিসে৷ সেখান থেকে যে–খবর পেয়েছেন তা বিস্ময়কর৷ মণীশ আগরওয়ালের নতুন বাংলোয় একজন অপরিচিত মহিলা নাকি এসেছিলেন, কিন্তু মণীশ আগওয়াল তাঁকে বাংলোয় ঢুকতে দেননি, বলেছেন, ‘কে আপনি? এখানে কেন এসেছেন?’ সেই মহিলা ফিরে গিয়েছেন গেট থেকেই৷ কিন্তু তার পরেও সেই মফস্বল শহরটিতে নাকি কয়েকদিন ঘোরাঘুরি করেছিলেন অসহায়ভাবে, তার পর একদিন চলে গিয়েছেন কোথাও, কেউ আর তার খবর পাননি৷
দেবরূপের কানে পৌঁছে গেল সব খবর, শুনে তিনি মর্মাহত৷ সমস্ত ব্যাপারটাই যেন অদ্ভুত, অবাস্তব শ্রাবস্তী কোন মোহে পড়ে এরকম একটি অসম্ভব সিদ্ধান্ত নিল তা ভেবে অস্থির হচ্ছেন ভিতরে ভিতরে৷ তার এখানে সাজানো সংসার ছিল, সেই সংসার ফেলে রেখে এভাবে কেড––
বিষয়টা এখানকার অফিস চত্বরে এখন ঘোর আলোচনার বস্তু৷ দেবরূপ সবই বুঝতে পারেন, জানতে পারেন, হঠাৎ চোখে পড়ে দু–তিনজন একত্র হয়ে কী যেন আলোচনা করছে, তাঁকে দেখে চুপ করে গেল তৎক্ষণাৎ৷
ঘটনাটা এখন এমন আলোচিত হচ্ছে যে, দেবরূপ মুখ দেখাতে পারছেন না কারও কাছে
কিন্তু সমস্যা হয়েছে রুমকিকে নিয়েও৷ কাজের মেয়ে বাসন্তীর কাছে কন্যাকে রেখে অফিসে যান, স্কুল থাকলে রুমকিকে নিয়ে তাঁর আর্দালি বকু তুলে দিয়ে আসে স্কুলবাসে৷ স্কুল না–থাকলেই মুশকিল বাসন্তী চলে যাওয়ার পর রুমকিকে থাকতে হয় একেবারে একা৷ ফলে তাঁর অফিসের কাজের মধ্যে বারবার মনে রাখতে হয় মেয়েটা একা আছে৷ অফিসের কাজের মধ্যে এক–একবার গিয়ে দেখে আসেন সে খাওয়াদাওয়া করছে কি না, খাওয়ার পর ঘুমোচ্ছে কি না
আশ্চর্যের বিষয় এই যে, রুমকি ভারী চুপচাপ হয়ে গেছে ইদানীং, একবারও তার মায়ের কথা ডচ্চারণ করছে না শুধু মাঝেমধ্যে বলছে, রোজ অফিসে যাও কেন? ছুটি নাও৷
দেবরূপ তাকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন, নতুন এসডিও এসেছেন, এখন কি ছুটি নিলে চলে? আমি তাড়াতাড়ি ফিরে আসব৷
কিন্তু দেবরূপ যে চাকরি করেন, তাতে অফিসে একবার ঢুকলে আর বেরিয়ে আসাই মুশকিল৷ দেরি হলেই রুমকি বেশ রাগ–রাগ স্বরে বলে, তোমার নতুন এসডিও কি দুষ্টু?
দেবরূপ তার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলেন, না, দুষ্টু নন, খুব ভালো৷
––তা হলে এসডিও–কে বলো না আমার মেয়ে একা থাকতে পারে না।
দেবরূপ হেসে তাকে সান্ত্বনা দেন, ঠিক আছে বলব৷
রুমকিকে এত সব বলে ঠাণ্ডা করতে চান, কিন্তু নতুন এসডিওর কাছে তাঁর সাংসারিক সমস্যা নিয়ে একটি কথাও বলেননি এ ক–দিন৷ তিনি না–বললেও বুঝতে পারেন রীনা চ্যাটার্জি এর–ওর কাছ থেকে বিষয়টা জেনে ফেলেছেন৷ কিন্তু বুদ্ধিমতী মেয়ে, এখনও পর্যন্ত এ–বিষয়ে একটা কথাও জিজ্ঞাসা করেননি বা আলোচনা করেননি৷
দেবরূপ খুব টেনশনে আছেন যদি কখনও বিষয়টি উত্থাপন করেন, তিনি কীভাবে মোকাবিলা করবেন।
তবে খেয়াল করছেন অফিসটাইম শেষ হওয়ার আগেই এসডিও কখনও বলেন, ব্যস, আপনি এবার বিশ্রাম নিন, সান্যালদা৷ আমি তো আছিই৷ কোনও সমস্যা হলে আপনাকে ফোন করে জেনে নেব৷
১১
বাংলোর গেটের কাছে কি খুট করে একটা শব্দ হল, বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে ছবি–আঁকার খাতায় কালো রং মাখাচ্ছিল রুমকি৷ সমস্ত পাতাটিতে শুধু কালো রং৷ কিন্তু একটা গোটা পেন্সিল ক্ষয়ে গেল পাতাটিতে, কিন্তু তবু পুরো কালো যেন হচ্ছেই না৷
সপ্তাহের বাকি ক–টা দিন তবু কাটানো যায়, শুধু শনিবারটা হয় মুশকিল৷ বাবার হাফ ছুটি, কিন্তু তার পুরো ছুটি৷ বাসন্তীমাসি কাজ সেরে তাকে খাইয়ে দিয়ে চলে গেলে অনেকটা সময় একা থাকতে হয় তাকে৷
শব্দটা কানে যেতে রুমকি আস্তে আস্তে বিছানার উপরে সোজা হয়ে বসে, তড়াক করে নামে মেঝেয়, তারপর দরজা খুলে তাকায় গেটের দিকে৷
না, কেড নেই৷
রুমকি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে গেটের বাইরের রাস্তার দিকে৷ দুপুরের এই সময়টা এদিকে কেউ থাকে না৷ অফিসে যাওয়ার সময় বাবা বারবার বলে গেছে বাসন্তীমাসি কাজ সেরে চলে গেলে সে যেন চুপটি করে শুয়ে থাকে বিছানায়৷
রুমকি ঠোঁট ফুলিয়ে বলে, কিন্তু আমার যে ঘুম অসে না একা–একা কি ঘুমোনো যায়!
তার বাবাকে কীরকম অসহায় দেখায়, তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, তা হলে ছবি আঁকবি৷
রুমকি আরও ঠোঁট ফোলায়, বলে, কত ছবি আঁকব বলো? এই তো ক–দিন আগে একটা নতুন খাতা কিনে দিয়েছ, এর মধ্যে শেষ।
––তা তুই একটু ভালো করে আঁকবি৷ এক–একটা ছবিতে অনেক সময় দিবি৷ তা হলে ছবিটাও ভালো দেখতে হবে, পাতাও কম খরচ হবে৷
রুমকির মুখটা বেজার দেখায়, বলে, স্কুলটায় শনি–রবি দুদিন ছুটি দেয় কেন বলো তো?
গেটের দিকে অনেকক্ষণ একটা মন খারাপ নিয়ে তাকিয়ে থাকে রুমকি৷ যখন সে একা থাকে, মাঝেমধ্যে এরকম খুট করে একটা আওয়াজ কানে যায় তার৷ প্রতিবারই বিছানা থেকে লাফ দিয়ে নেমে দরজা খুলে তাকিয়ে থাকে ফাঁকা রাস্তার দিকে৷
তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ৷ কিন্তু কোথাও কেউ নেই।
বুকের ভিতরটা কেমন যেন করতে থাকে৷
বিছানায় উঠে চুপ করে শুয়ে থাকে৷ কালো পেন্সিলটা কিছুক্ষণ ঘসল আবার, একটু পরে আর দাগ পড়ল না৷
কালো রংপেন্সিলটা ফুরিয়ে যেতে কিছুক্ষণ বিছানায় মুখ গুঁজে শুয়ে রইল, কখন যেন ঘুমিয়েও পড়ল হঠাৎ৷ ঘুম ভাঙল বাবা এসে মাথায় হাত বুলোনোয়৷
রুমকি চোখ মেলে তাকাতেই বাবা বলল, বাহ্, ভালোই তো ঘুমিয়েছিস আজ।
রুমকি তবু শুয়ে থাকে৷ তার যেন আজ উঠতেই ইচ্ছে করছে না।
বাবা হঠাৎ ঝুঁকে পড়ল তার খাতার উপর, জিজ্ঞাসা করল, আজ এটা কী আঁকছিলি?
রুমকি তার আঁকাটার দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে বলল, অন্ধকার৷
––অন্ধকার! তার বাবা হতভম্ব৷
––হ্যাঁ৷ কিন্তু দ্যাখো না, বাবা, কিছুতেই পুরো অন্ধকার আঁকতে পারলাম না একটা কালো রংপেন্সিল ঘসে ঘসে শেষ, তাতেও না একটু–একটু আলো রয়েই গেল তবু৷
তার বাবা হাসলেন, বললেন, পুরো অন্ধকার তো কেউ আঁকতে পারে না এমনকি অমাবস্যার রাতে পৃথিবীটাও পারে না একটু আলোর সংকেত রয়ে যায় কোথাও না কোথাও সেই আলোর হাত ধরেই তো আবার ভোর চলে আসে৷ তার পরেই আবার একটা সুন্দর দিন।
১২
শিক্ষানবিশির কাল শেষ হওয়ার পর উত্তরবঙ্গে পোস্টিং পেতে একটু দ্বিধাগ্রস্ত ছিল রীনা৷ এই পোস্টিংটা ঠিক যেন মনের মতো হয়নি তার৷ মুসৌরি যেতেও এত অস্থির হয়নি, যা এখানে আসার সময় হয়েছিল কিন্তু এখানে এসে সাবডিভিশন অফিসের কমপ্লেক্সটা দেখে ও তার ঝকঝকে বাংলোটায় ঢুকে হঠাৎ পছন্দ হয়ে গেল তার৷
তবে যতটা ঠাণ্ডার দেশ শুনে এসেছিল, এখন সেরকমটি নয় সকাল–সন্ধেটা নাতিশীতোষ্ণ হলেও দুপুরের দিকটা জেরবার হতে হয় গরমে৷ তবে রাত্রিটা প্লেজান্ট৷
কিন্তু যেটা ভালো লেগে গেল তা এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য৷ রকমারি গাছগাছালির দৃশ্য জুড়িয়ে দিচ্ছে চোখ৷ বাংলোর বারান্দায় একজোড়া বেতের চেয়ার আছে, তার একটায় বসলে দূরে দিগন্তরেখায় দেখা যায় নীল–কালো ছোপ ছোপ যা কি না হিমালয় রেঞ্জের কয়েকটা চূড়া৷
পাহাড়তলি বলা না–গেলেও বলা যায় মহকুমার শিয়রে পাহাড়৷
এটাই তার প্রথম পোস্টিং, সুতরাং অফিসের কাজ বুঝে নেওয়াটা প্রথম জরুরি বিষয়৷ শিক্ষানবিশি থাকতে যা কিছু দেখেছে সবই বাইরে থেকে৷ এখন দেখছে ভিতর থেকে৷ ভিতর থেকে দেখলে অনেক স্পষ্ট হয় এলাকার সমস্যাগুলো৷
এসডিও ছাড়া এখানে দুজন ম্যাজিস্ট্রেট আছেন, দুজনেই মোটামুটি সিনিয়র অফিসার৷ তাঁদের নিয়ে আলোচানায় বসেছে কয়েকবার৷ একটু একটু করে পরিষ্কার হচ্ছে কাজের ধরনধারণ৷
বিশেষ করে সেকেন্ড অফিসার দেবরূপ সান্যালের বেশ নাম আছে অফিসার হিসেবে৷ যে কোনও সমস্যা হলেই তাঁর সঙ্গে কথা বলে নেয় ফোনে৷ বিষয়টা খুব জরুরি বুঝলে দেবরূপ ফোনে বলেন, ‘দাঁড়ান ম্যাডাম, আমি আপনার চেম্বারে গিয়ে কথা বলছি’৷ চেম্বারে এসে বিষয়টা প্রাঞ্জল করে হেসে বলেন, আসলে আমার এখানে পাঁচ বছরের উপর হয়ে গেল, এলাকার নাড়িনক্ষত্র চেনা হয়ে গেছে৷ কেউ হা বললে বুঝে যাই হাবড়া বলছে না হালুয়া বলছে।
রীনা হেসে উঠলেন সশব্দে, কিন্তু দেবরূপ সান্যাল সেরকম শব্দ করে বোধ হয় হাসতে পারলেন না৷ হাসি থামিয়ে ভিতরে ভিতরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন রীনা৷ অনুভব করতে পারলেন দেবরূপ সান্যালের ভিতরে একটা ব্যথা রক্তক্ষরণ করছে সারাক্ষণ৷
রীনা পরক্ষণে বললেন, দাঁড়ান, দু–কাপ কফি আনাই৷
এর আগে পর পর দুদিন সান্যাল সাহেবকে কফি খাইয়েছেন, আজ আবার৷ কফি আসতে দেবরূপ বললেন, কফিটা কি আপনি একটু বেশি পছন্দ করেন।
রীনা হাসলেন, ঠিকই বলেছেন, স্যান্যালদা৷ আসলে আমি ছোটো থেকেই চা খাওয়ার বিরোধী ছিলাম৷ ভাবতাম চায়ে তো পেট ভরে না, কেন খায় লোকে কিন্তু কারও বাড়ি গেলেই সবাই জোরাজুরি করে চা খাওয়ার জন্য৷ বাধ্য হয়ে খেতে হত৷ এভাবেই চা খেতে শিখেছি৷ অফিসে মিটিং–টিটিং হলেও সেই চা৷ তাই যখনই সুযোগ থাকে চায়ের পরিবর্তে কফি খাওয়াটাই প্রেফার করি৷
দেবরূপ রীনার অভিব্যক্তি লক্ষ করতে করতে চুমুক দিচ্ছিলেন কফির কাপে৷
রীনা হঠাৎ বললেন, আপনাদের নিশ্চয় খাওয়াদাওয়ার খুব অসুবিধে হচ্ছে, সান্যালদা? রুমকি নিশ্চয় খুব জেদ–বায়না ধরছে?
দেবরূপ একটু চমকে ডঠলেন৷ অনুমান করলেন রীনা ইতিমধ্যে এক বা একাধিক জনের কাছ থেকে জেনে ফেলেছেন তাঁর পারিবারিক সমস্যার কথা৷ বিশেষ করে সিএ রোহিণীবাবু, এসডিওর সবচেয়ে কাছের লোক, সম্ভবত তিনিই জানিয়েছেন কোনও এক একান্ত সময়ে৷
দেবরূপ বিব্রত বোধ করলেন হঠাৎ৷ এসডিওর সঙ্গে আলোচনায় কোনও পারিবারিক প্রসঙ্গ ডঠলে তিনি কী বলবেন, কীভাবে সামলাবেন নিজের অসহায়তা তা ভেবে এ ক–দিন অস্থির হয়েছেন ভিতরে ভিতরে৷ একটু থমকে গিয়ে বললেন, রুমকি প্রথম কিছুদিন খুব মুষড়ে পড়েছিল, কিন্তু ও খুব বুদ্ধিমতী, এখন সামলে নিয়েছে৷
রীনা বোঝার চেষ্টা করছিলেন বিষয়টা, বললেন, হ্যাঁ, বাচ্চাদের ইনস্টিংট খুব প্রখর হয়৷ আমরা অনেক সময় ওদের যতটা ছোটো ভাবি, অনুমান করে নিই ওরা সব বোঝে না, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ব্যাপারটা বোধ হয় সেরকম নয়।
দেবরূপ ঘাড় নাড়লেন, ঠিক তাই কিন্তু আপনি বাচ্চাদের সাইকোলজি এতখানি বুঝলেন কী করে?
রীনা হাসলেন একটু, বললেন, কী জানি কী করে বুঝলাম বোধ হয় এটা আমার বর্ন–ইনস্টিংক্ট৷ তবে কারও কোলে বা সঙ্গে বাচ্চা থাকলে তাদের দিকে তাকাই, লক্ষ করি তাদের আচার–আচরণ, বোঝার চেষ্টা করি তারা কী চাইছে, বা কী বলছে।
দেবরূপ বিস্মিত হয়ে বললেন, তাই নাকি?
রীনা হাসলেন, বললেন, আমার কী মনে হয় জানেন, শিশুরা হল পৃথিবীর অন্যতম সেরা বিস্ময়৷ যে কোনও শিশুর দিকে তাকালে মনে হয় এটাই তো আমি৷ একদিন আমিও তো ওর মতো ছিলাম।
দেবরূপের চোখে অপার কৌতূহল৷
রীনা তখন শেষ করছেন কফির কাপ, কাপ টেবিলের উপর নামিয়ে রেখে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন, হঠাৎ বললেন, ঘটনাটা শুনে খুব কষ্ট পেয়েছি আমি৷
দেবরূপ সামান্য অস্থির হলেন কেন না অনুমান করলেন রীনা সেই বিষয়টিই উত্থাপন করেছেন যা তিনি এড়িয়ে থেকেছেন এ ক–দিন কিন্তু এড়ানো যাবেও না আর৷ কিছুক্ষণ মৌন থেকে বললেন, ম্যাডাম, প্রথম–প্রথম আমিও কষ্ট পেয়েছিলাম৷ কিছুদিন একটা প্রবল ট্রমার মধ্যে কাটিয়েছিলাম৷ মনে হয়েছিল এই পৃথিবীর কেডই তা হলে আর বিশ্বস্ত নয় মনের যে কোনও বিশ্বাসই টলে যেতে পারে এক মুহূর্তে৷ তারপর একসময় স্বাভাবিক করে তুলেছি নিজেকে৷ আস্তে আস্তে কাটিয়ে উঠছি সেই ট্রমা৷
রীনা কিছুক্ষণ দেবরূপকে নিরীক্ষণ করলেন, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, এ ধরনের ট্রমা থেকে আপনি যদিও বা মুক্ত হতে পারেন, কোনও বাচ্চার পক্ষে নিজেকে মুক্ত করা খুব কঠিন!
––আমারও প্রথম কয়েক দিন খুব অসহনীয় মনে হয়েছিল, পরে ভাবতে শুরু করলাম, শ্রাবস্তী নিশ্চয় আমাকে ভালোবাসতে পারেনি৷ ভালোবাসতে পারেনি তার আত্মজা রুমকিকেও৷ সমস্ত ব্যাপারটাই আমার কাছে মনে হচ্ছিল অ্যাবসার্ড৷ অবিশ্বাস্য৷ অনেক, অনেকগুলো দিনের প্রতিটি মুহূর্ত মনে হয়েছিল অসহনীয়৷ পরে নিজেকে বোঝাতে শুরু করলাম, যে আমাদের মন থেকে ভালোবাসতে পারেনি, আপন করে নিতে পারেনি, অবলীলায় নিজের সন্তানকে ফেলে চলে যেতে পারে, তার সঙ্গে বাকি জীবন থাকার গ্লানি থেকে আমাদের মুক্ত করেছেন ঈশ্বর৷
রীনা চুপ করে রইলেন, এক চোখ বিস্ময় নিয়ে দেখছিলেন দেবোপম চেহারার দেবরূপকে৷
১৩
নভেম্বর থেকেই এ তল্লাটে শুরু হয় শীতের আনাগোনা৷ একটু একটু করে হাওয়ায় মাখামাখি হচ্ছে হিমের টুকরো৷ এদিকে শীতের দিনগুলি যেমন হ্রস্ব, তেমনই রোদহীন৷ গাঢ় শীতের দিন আবার হাড়–কাঁপানো৷ দেবরূপ আলমারি খুলে বার করতে থাকেন তাঁর আর রুমকির শীতের পোশাক৷
কিন্তু তিনি ঠিক জানেনও না কোন আলমারির কোন তাকে থাকে সোয়েটার–কার্ডিগান–স্কার্ফগুলি৷ রুমকির আবার ভারী পছন্দ একটা কমলা রঙের স্কার্ফ৷
প্রতিবার শীত আসি–আসি হলেই শ্রাবস্তী এ কাজটা শুরু করে দিত ঠিক সময়ে৷ এখন একটা গোটা রবিবারের সকাল ব্যয় করতে হল এ–আলমারি ও–আলমারি হাঁটকে ডলের পোশাকগুলি খুঁজে বার করতে৷ রুমকি হাঁ করে দেখতে থাকে তার বাবার অনভ্যস্ত ভঙ্গিতে আলমারি খোঁজার দৃশ্য৷ একসময় নিজেই বলল, আমাকে একটু উঁচু করে ধরো৷ আমি জানি কোন জায়গায় সেই কমলা রঙের স্কার্ফটা থাকে।
অবশ্য রুমকির সাহায্য নিতে হয় না তাঁকে৷ শেষমেশ পেয়েও যান সেটি৷
তাঁর আর্দালি বকু হঠাৎ অসুস্থ হওয়ায় সকালের দিকটা সমস্যায় পড়ে গেছেন দেবরূপ৷ রুমকির এখন পুরোদমে স্কুল চলছে৷ দুজনে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া সেরে নেন, তারপর একহাতে নিজের অ্যাটাচি, অন্য হাতে রুমকির স্কুলব্যাগ নিয়ে চলে যান বড়ো রাস্তার মোড়ে, সেখানে রুমকিকে নিয়ে অপেক্ষা করেন স্কুলবাসের জন্য, তাকে বাসে তুলে দিয়ে ফিরে আসেন অফিসে৷ সামান্য একটু দেরি হচ্ছে অফিসে ঢুকতে৷
স্কুলের ছুটির পর রুমকিদের স্কুলবাস এসে পৌঁছোয় সাড়ে তিনটে নাগাদ৷ দেবরূপ তাঁর নতুন আর্দালি ভূষণকে পাঠান রুমকিকে বাস থেকে নামিয়ে বাংলোয় পৌঁছে দিতে৷ তার একটু পরেই দেবরূপ কিছুক্ষণের জন্য বাংলোয় ফেরেন তার খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করতে৷ রুমকিকে বলেন, তুমি কিছুক্ষণ ছবি আঁকো মামণি, একটু পরেই তো বাসন্তীমাসি এসে পড়বে৷ তার মধ্যে আমি এসে যাব৷
কিন্তু সমস্যা হয় যদি কোনও জরুরি কাজে আটকে পড়েন অফিসে।
তখন আর্দালি ভূষণকেই নির্দেশ দেন রুমকির খাবার কোথায় থাকে সেখান থেকে নিয়ে রুমকিকে দিতে৷ রুমকি প্রথম–প্রথম বায়না ধরত বাবা ঘরে না ফিরলে সে খাবেই না, বলত, আমার এখন খিদে নেই, কাকু৷ তুমি অফিসে যাও৷
ক্রমে সেও অভ্যস্ত হয়ে গেল এই ব্যবস্থাপনায়৷
তখন প্রত্যেকটা দিনই যেন ভারী পাথরের মতো চেপে বসছে দেবরূপের বুকের উপর৷ অফিসের একে–ওকে বলছেন একজন সারাক্ষণের কাজের লোক খুঁজে দিতে৷ নইলে অচল হয়ে যাচ্ছে তাঁর সংসার৷ তারই মধ্যে একদিন বিকেলে হঠাৎ দেবরূপকে চেম্বারে ডেকে পাঠালেন এসডিও, দেবরূপ তাঁর চেম্বারে ঢুকতেই বললেন, একটা ঝামেলা বেধেছে, সান্যালদা৷
দেবরূপ এলাকার খুঁটিনাটি বিষয়ে খুবই সচেতন, চেয়ারে বসে বললেন, কোথায়?
––চিতলমারির কলেজে একটা ঝামেলা হয়েছে, তারই আফটার এফেক্ট প্রিন্সিপাল ঘেরাও৷ বিষয়টা কি আপনার নলেজে আছে?
দেবরূপ তৎক্ষণাৎ বিষয়টি সম্পর্কে তাঁকে সংক্ষেপে জানিয়ে বললেন, হ্যাঁ, এর আগেও দু–তিনবার যেতে হয়েছে কলেজের ঝামেলা মেটাতে৷ ঠিক আছে, আমি থানার ওসি–কে নিয়ে ঘুরে আসছি৷
রীনা চ্যাটার্জি হেসে বললেন, মনে হচ্ছে এটা মাইনর প্রব্লেম৷ কিন্তু আপনাকে যেতে হবে না৷ আমি আপনাকে ডাকলাম বিষয়টি সম্পর্কে একটা ফার্স্টহ্যান্ড নলেজ মগজে ভরে নিতে৷ আমি এসডিপিওকে বলেছি রেডি হতে৷ ওঁকে নিয়ে আমিই দেখে আসছি৷
দেবরূপ তাঁকে ব্যস্ত হতে নিষেধ করে বললেন, ছোট্ট ব্যাপার, আপনি কেন যাবেন? আগের এসডিপিওকে নিয়ে আমি ওখানে বহুবার গিয়েছি৷ নতুন এসডিপিও এখনও এলাকাই চিনে উঠতে পারেননি আপনি অফিসে থাকুন, আমি চট করে সমাধান করে আসছি৷
রীনা চ্যাটার্জি হেসে বললেন, এখন বিকেল চারটে৷ আপনি গেলে রাত আটটা সাড়ে আটটার আগে ফিরতে পারবেন না৷ তার চেয়ে আমি এখন ফ্রি আছি, বিষয়টা জানাও হবে৷ আপনি হেডকোয়ার্টারে থাকুন৷
দেবরূপ বুঝে উঠতে পারলেন না এসডিও হঠাৎ নিজেই কেন ল অ্যান্ড অর্ডার সামলাতে ছুটলেন স্পটে৷ এই সাবডিভিশনটা মোটামুটিভাবে শান্ত, ঝঞ্ঝাট–ঝামেলা খুব কম৷ যা দু–একবার টুকটাক গন্ডগোল হয়েছে, তিনিই সামলে এসেছেন গত সাড়ে পাঁচ বছর৷ এই সময়কালে তিনজন এসডিও এসেছেন এই সাবডিভিশনে, কিন্তু মাত্র একবার ছাড়া কখনও কোনও এসডিওকে মাথা ঘামাতে হয়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে৷ হঠাৎ রীনা চ্যাটার্জি নিজেই কেন––
দেবরূপ ভাবতে বসলেন, তা হলে কি এসডিও তাঁর কর্মদক্ষতা বিষয়ে সন্দিহান।
১৪
এসডিপিও রামলাল সিংকে নিয়ে রীনা যখন বেরোলেন চিতলমারির উদ্দেশে, বিকেলের আলো ফুরিয়ে এসেছে প্রায়৷ সবুজ চা–বাগানের রঙে এখন কালচে ছোপ৷ হাওয়ায় ঠাণ্ডা আমেজ৷
এসডিপিও দিব্যি ভালোমানুষ টাইপের, তিনি এসডিও অফিসে পৌঁছোতেই রীনা বললেন, ‘দুটো গাড়ি নিয়ে যাওয়ার কোনও মানে হয় না, এসডিপিও–সাহেব, চলুন আমার গাড়িতেই দুজনে যাই৷’
অতএব এসডিপিও–র গাড়ি পড়ে রইল মহকুমাশাসকের অফিসের সামনে, রীনা রামলাল সিংকে নিয়ে চললেন পাশাপাশি বসে গল্প করার বাসনা নিয়ে৷
মহকুমার দুই সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আধিকারিকের মাঝেমধ্যে এরকম মুখোমুখি হওয়াটা অতি আবশ্যক, তাতে মহকুমার কোথায় কোন সমস্যা ধারণ করছে জটিলতা, তা নিরসন করতে কী দাওয়াই দিতে হবে তা আলোচনা করে নেওয়া যায় একান্তে৷
গাড়ির ড্রাইভার পদম বাহাদুরের হাত খুব ভালো, একটুও জার্কিং হচ্ছে না গাড়িতে৷ অবশ্য তার ড্রাইভিংএর সঙ্গে তেল–চকচকে রাস্তার অবদানও যে খুব কম নয় তা বোধগম্য৷
পিচরাস্তাটা অস্বাভাবিক রকমের মসৃণ যা কলকাতা থেকে এত দূরে ভাবাই যায় না। আসলের উত্তরবঙ্গের কিছু কিছু বিষয় হার মানিয়ে দিতে পারে দক্ষিণবঙ্গকে৷ যেমন এই মুহূর্তে রাস্তার দুপাশে দীর্ঘ চা–বাগানের দৃশ্য ঢেউ তুলছে মনের গহনে৷ সবুজ রংটারই যে কত রকমফের আছে তা উপলব্ধি করা যাচ্ছে রাস্তার দুপাশে তাকিয়ে৷ চা–গাছগুলির দৃশ্যের পাশে কখনও একটা দীর্ঘ সেগুন, কখনও স্বল্পদৈর্ঘ্য শালগাছের সারি, কখনও একটা ঝাঁকড়া শিশু বা রাস্তার ধার ঘেঁষে নানা গুল্মলতার ঝোপ৷ প্রতিটি সবুজই আলাদা৷ দূরে পাহাড়ের একটা শ্রেণি মনে হচ্ছে শিল্পীর তুলিতে আঁকা ঘন নীল আর কালো মিশিয়ে চমৎকার করে আঁকা৷
রীনা একবার ভাবলেন রামলাল সিংয়ের সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করবেন, কিন্তু পরক্ষণে হাসলেন মনে মনে, রামলাল কীরকম নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে জানলার বাইরে৷ তার কাছে সবুজ শব্দটাই হয়তো অচেনা আর অনুত্তেজক৷
পরক্ষণে রীনার এও মনে হল পাশে তরুণী এসডিও বসে আছে, এতক্ষণের মধ্যে রামলাল লঘু স্বরে আলাপ করতেও ডদ্যোগী হয়নি।
একবার মনে হল সান্যালদা সঙ্গে থাকলে নিশ্চয় এরকম নৈঃশব্দ্যে কাটত না সময়টা৷
অতএব নিজেই ডদ্যোগী হয়ে বললেন, আপনি কি এর আগে এই কলেজের কোনও গোলমাল ঠেকাতে এসেছেন, মি. সিং?
রামলাল সিং দুদিকে মাথা ঘুরিয়ে জানালেন আসেননি৷
রীনা চ্যাটার্জি ভাবতে লাগলেন মেসেজে তেমন পরিষ্কার করে লেখা নেই। কী কারণে প্রিন্সিপালকে ঘেরাও করেছে ছাত্ররা অফিসে সান্যালদার কাছে যেটুকু জানলেন তাতে মনে হল ছাত্ররা নানা দাবিদাওয়া নিয়ে প্রিন্সিপালের কাছে মাঝেমধ্যে ডেপুটেশন দিতে চায়, প্রিন্সিপাল অরাজি হলেই ধর্নায় বসে যায় প্রিন্সিপালের চেম্বারের সামনে৷ যতক্ষণ না প্রিন্সিপাল হ্যাঁ বলেন, ঘেরাও চলতে থাকে৷ তাদের দাবি একেবারে অন্যায্য হলে তখন প্রশাসনের শরণাপন্ন হন প্রিন্সিপাল৷ আজকের ঘেরাওয়ের বিষয় নাকি পরীক্ষা একমাস পিছোনোর৷
আজকেও নিশ্চয় প্রিন্সিপাল বাধ্য হয়েছেন বলেই––
মিনিট পঁয়তাল্লিশ এক গাড়িতে যাওয়ার মধ্যে মাত্র তিনটি বাক্য বলানো গেল রামলাল সিংকে দিয়ে৷ প্রায় সেই ‘ইয়েস’ ‘নো’ ‘ভেরি গুড’ জাতীয় না–বললে নয় এমন উত্তর৷
রীনা হাসলেন মনে মনে৷ এক ইনড্রোভার্ট যুবক অল ইন্ডিয়া সার্ভিসে এসে প্রথম দিকে ঠিক স্বচ্ছন্দ বোধ করছে না কিন্তু তার ঘেঁটি ধরে কথা বলিয়ে নেবে এলাকার মানুষজন৷ প্রশাসনের চাকরিতে এরপর রামলালকে হাজার হাজার কথা বলতে হবে তা বোধ হয় উপলব্ধি করতে পারেনি এখনও৷
কলেজে পৌঁছে দেখলেন প্রিন্সিপালের ঘরের সামনে প্রায় একশো ছেলেমেয়ে বসে আছে গোটা বারান্দা জুড়ে৷ কে যেন ‘এই পুলিশ এসেছে’ বলতে হাত–পা ছড়িয়ে বসে থাকা ছাত্রছাত্রীরা একটু গুটিয়ে বসে পথ করে দিল দুজনের ভিতরে যাওয়ার৷
প্রিন্সিপালের ঘরেও পনেরো–কুড়িজন ছাত্রছাত্রী৷ তারা তখনও তড়পাচ্ছে প্রিন্সিপাল ও তাঁর জনা তিনেক সহশিক্ষকের উপর৷
এসডিও–এসডিপিওকে দেখে প্রিন্সিপাল ও শিক্ষকরা উঠে দাঁড়িয়ে তাঁদের বসতে বললেন পাশেই রাখা দুটি খালি চেয়ারে৷ সেখানে বসে, দু–চার সেকেন্ড মারমুখী ছাত্রছাত্রীদের অভিব্যক্তি জরিপ করে রীনা বললেন, হ্যাঁ, তোমরা বলো কী তোমাদের দাবিদাওয়া?
চিবুকে একটুকরো দাড়ির শোভা নিয়ে যে–ছেলেটি নেতৃত্ব দিচ্ছিল, মহিলা অফিসার দেখে থমকে গিয়ে বলল, আপনি কে?
রীনা কিছু বলার আগেই প্রিন্সিপাল বলে উঠলেন, উনি এখানকার নতুন এসডিও৷ আর তাঁর পাশে এসডিপিও৷
চিবুকে–দাড়ি ছেলেটি হঠাৎ বলে উঠল, আপনাকে বললে কি আপনি কিছু করতে পারবেন? সান্যালসাহেব কোথায়? তিনি এলেন না কেন?
রীনা কিছুটা বিব্রত, কিন্তু সামলে নিয়ে বললেন, সান্যাল সাহেব অন্য একটা কাজে ব্যস্ত আছেন৷ তিনিই আমাকে বললেন, আপনি যান৷ ওখানকার ছাত্র ইডনিয়নের নেতারা খুব লড়াকু৷ কিন্তু আসলে সবাই ভালো৷ আপনি গেলে সবার সঙ্গে আলাপও হয়ে যাবে৷
লড়াকু শব্দটা নেতা–ছেলেটির খুব মনে ধরল, তার তড়পানির গর্জনেও একটু ক্ষান্তি, বলল, আমাদের প্রিন্সিপাল ছাত্রছাত্রীদের কোনও কথাই কানে নেন না৷ যে দাবির কথাই বলি, উনি সঙ্গে সঙ্গে নাকচ করে দেন৷
তার বলা শেষ না হতেই বাকি ছাত্রছাত্রীরাও চেঁচিয়ে ওঠে, সব নাকচ করে দেন৷
রীনা তাঁর মুখের হাসিটি বজায় রাখছেন, জানেন হাসিমুখের মানুষদের সঙ্গে লড়তে সমস্যায় পড়ে প্রতিপক্ষ৷ বললেন, ঠিক আছে৷ তবে সবাই একসঙ্গে কথা বললে কারও কথাই কানে ঢোকে না৷ তোমাদের মধ্যে যে কোনও একজন কথা বলো৷
ছাত্ররা চুপ করে থেকে বলল, ঠিক আছে কৌশিক বলবে৷
ছাত্রনেতাটির নাম কৌশিক জেনে রীনা বললেন, ঠিক আছে, কৌশিক, তুমি বলো তোমাদের দাবি কী কী?
কৌশিক নামে ছেলেটি তার স্বরে বলতে শুরু করল, আপনারা সবাই জানেন সারা বছর কলেজে তেমনভাবে ক্লাস হয় না৷ বছরের একেবারে শেষদিকে স্যাররা কোনও ক্রমে কোর্স শেষ করে বলেন, সামনেই পরীক্ষা৷ তাঁরা একবারও চিন্তা করে দেখেন না ছাত্রছাত্রীরা কীভাবে না–পড়ে পরীক্ষায় বসবে৷ আমরা সমস্ত ছাত্রছাত্রীর তরফ থেকে চিঠি দিয়েছিলাম টেস্ট পরীক্ষাটা এক মাস পিছিয়ে দিতে৷ এটা উনি পারেন৷ কিন্তু আমাদের প্রিন্সিপাল অনড়৷ বলেছেন একদিনও পরীক্ষা পিছোবে না৷ এখন যতক্ষণ না আমাদের দাবি মিটমাট হচ্ছে, আমরা কাউকেও এ ঘর থেকে বেরোতে দেব না
রীনা একবার চোখ ফেললেন প্রিন্সিপালের দিকে, পরক্ষণে জরিপ করে নিলেন অন্য সহ–শিক্ষকদের মুখ, তারপর বললেন, পরীক্ষার তারিখ কবে?
প্রিন্সিপাল বললেন, আগামী মাসের সতেরোই৷
রীনা হিসেব করে দেখলেন এখনও তিন সপ্তাহ বাকি, বললেন, সব ছাত্রছাত্রীই এই একই দাবি করছে?
ছাত্রনেতা ও তার সঙ্গীরা হই হই করে বলল, হ্যাঁ, সবাই তাই চায়৷ মাত্র এক মাস পিছিয়ে দিলেই হবে৷
প্রিন্সিপাল তৎক্ষণাৎ বললেন, কিন্তু এক মাস পিছিয়ে দিলে ইউনিভার্সিটির ফাইনাল পরীক্ষার ফর্ম ফিল আপ করারই সময় থাকবে না৷
রীনা জিজ্ঞাসা করলেন, আশেপাশের অন্য কলেজেও কি পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে?
ছাত্রনেতা তড়িগড়ি বলে ডঠল, না, না, সেখানে তো কোর্স শেষ করেছেন স্যারেরা৷ শুধু আমাদের কলেজেই কোনও কোর্স সময়ে শেষ করা হয়নি৷ শেষ একমাসে তাড়াহুড়ো করে––
রীনা বললেন, সময়ে কোর্স শেষ না করাটা খুব অন্যায়৷ কিন্তু এতদিনে নিশ্চয় শেষ হয়েছে? কবে শেষ হয়েছে কোর্স?
প্রিন্সিপালের পাশে বসে থাকা ধুতি–পাঞ্জাবি পরা একজন শিক্ষক বললেন, মাত্র ইতিহাসের একটা পেপার নিয়েই ওদের অভিযোগ৷ তাও শেষ হয়েছে দিন দশেক আগে৷
ছাত্রনেতারা হই হই করে উঠতেই রীনা বললেন, দেরি করে কোর্স শেষ না করাটা খুবই অন্যায়৷
তারপর প্রিন্সিপালের উদ্দেশে বললেন, আপনি দেখবেন পরের বছরের ছেলেমেয়রা যেন এরকম কোনও অভিযোগ আর না করতে পারে৷ তবে এ বছরের একটি বিষয়ের কোর্স যখন সময়ে শেষ হয়নি, ছেলেমেয়েদের পক্ষে পরীক্ষায় বসাটা খুবই কঠিন৷ তা কৌশিক, শুধু ইতিহাসের পরীক্ষাই পিছোবে না, সব পরীক্ষা?
––সব সব, সমবেত স্বরে দাবি৷
রীনা বললেন কিন্তু একটা বিষয়ের কোর্স দেরি হয়েছে, তাতে সব পরীক্ষা পিছোবে কেন?
তার কথায় কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ৷ রীনা পরক্ষণে বললেন, আচ্ছা, শুধু তোমাদের কয়েকজনই পরীক্ষা পিছোতে চাইছে, না সবাই?
ছাত্রটি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে, তারপর কয়েকজন বলল, সবাই৷ সবাই৷
রীনা বললেন, ঠিক আছে, তা হলে একটা সমীক্ষা করা যাক, ঠিক কতজন পরীক্ষা পিছানোর পক্ষে৷ যদি পঞ্চাশ ভাগের বেশি ছাত্র চায়, তবেই পরীক্ষা পিছানো হবে৷
তারপর প্রিন্সিপালকে উদ্দেশ করে রীনা বললেন, আপনি সব ছাত্রছাত্রীকে বলুন, এক টুকরো কাগজে লিখে আপনাকে জানাতে তারা সময়ে পরীক্ষা দিতে রাজি, না পিছানোর পক্ষে আমি আপনার চেম্বারে কয়েক ঘন্টা বসছি, তারপর ছাত্রছাত্রীদের মনোভাব বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে৷
ছাত্র নেতা কৌশিক বেশ থতমত খেয়ে গেল এসডিও–র এই সিদ্ধান্তে৷ চোখোচোখি করল অন্য ছাত্রনেতাদের সঙ্গে৷ তারপর বলল, ঠিক আছে, আমরা বাইরে গিয়ে একটু আলোচনা করে এসে আপনাকে জানাচ্ছি৷
কিছুক্ষণের মধ্যে প্রিন্সিপালের ঘর ফাঁকা৷ রীনা এবার হাসলেন প্রিন্সিপালের দিকে তাকিয়ে, বললেন, দেখবেন, ওরা রাজি হয়ে যাবে ঠিক সময়ে পরীক্ষায় বসতে৷ আসলে যারা ঘেরাও করেছে, সেই গুটিকয় ছাত্র লেখাপড়ায় মন না দিয়ে ইডনিয়ন করে সময় কাটায়৷ ফলে তারাই পরীক্ষার ভীতিতে ভোগে৷ অন্যরা পড়াশুনো করেছে, তারা ঠিক সময়ে পরীক্ষা দিতে চায়, কিন্তু ইউনিয়নের পাণ্ডাদের ভয়ে কিছু বলতে পারছে না৷ গোপান ব্যালট হলেই তারা নির্ভয়ে বলতে পারবে ঠিক সময়ে পরীক্ষা দিতে চায়৷
রীনার অনুমানই ঠিক হল৷ একটু পরেই অন্য একজন ছাত্রনেতা এসে জানাল তারা মিটিং করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রিন্সিপাল আর এসডিও–র সম্মান রক্ষার্থে ঠিক সময়ে পরীক্ষা হোক৷
রীনার মুখে হাসির উদ্ভাস৷ প্রিন্সিপালের চেম্বারে এক কাপ চা খেয়ে আবার উঠে বসল গাড়িতে৷
ফেরার পথে রামলাল হঠাৎ মুখ খুললেন, মিস চ্যাটার্জি, আপনি নিজে কেন আসতে গেলেন? সিম্পল ম্যাটার৷ আপনার সেকেন্ড অফিসারকে বললেই তো চলে আসতেন।
রীনা হেসে বললেন, সেকেন্ড অফিসার তো বরাবরই আসেন৷ মাঝেমধ্যে এসডিও–র তো ল অ্যান্ড অর্ডার ডিডটিতে আসা ডচিত, মি. সিং৷ স্পটে গেলে সমস্যাগুলো বোঝা যায় ঠিকঠাক৷
রামলাল সিংএর হয়তো লেডি অফিসার বিষয়ে কিছু অন্য ভাবনাচিন্তা আছে, কিন্তু সেটা প্রকাশ করতে পারছেন না লেডি এসডিওর সামনে৷ বিষয়টি উপলব্ধি করে রীনা বললেন, আপনি তো বেশ কয়েকবার ল অ্যান্ড অর্ডার ডিডটি করলেন এখানে আসার পর, তাতে এলাকার সংকটের জায়গাগুলো নিশ্চয় পরিষ্কার হয়েছে আপানার কাছে।
রামলাল সিং সে–কথার উত্তর না দিয়ে হঠাৎ বললেন, ম্যাডাম, আপনি নিশ্চয় শুনেছেন ইয়োর প্রিডিশেসর হ্যাড অ্যান অ্যাফেয়ার ডইথ দি ওয়াইফ অফ ইয়োর সেকেন্ড অফিসার?
রীনা চ্যাটার্জি হঠাৎ অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন এসডিপিও–র অহেতুক কৌতূহল প্রকাশে৷ কিন্তু এই মুহূর্তে চুপ করে থাকাই যথাযথ ভাবলেন৷
পরক্ষণেই এসডিপিওর মুখে মৃদু হাসি, জানেন, সেদিন ডিস্ট্রিক্টের একজন অ্যাডিশনাল এসপি বলছিলেন, মণীশ আগরওয়াল হ্যাড সাক্ড দি হানি অ্যান্ড থ্রু অ্যাওয়ে দি লেডি৷
রীনা চ্যাটার্জি স্তম্ভিত হয়ে গেলেন এসডিপিও–র কথায়৷ ‘আপনার পূর্ববর্তী এসডিও সেই মহিলাকে ভোগ করেছেন, তারপর ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন’ এই মন্তব্যের মধ্যে কতখানি হীন মনোবৃত্তির পরিচয় নিহিত আছে তা কি বোঝার মতো ক্ষমতা নেই রামলাল সিংয়ের?
রামলাল সিং হয়তো অনুমান করলেন বিষয়টি শুনতে পছন্দ হচ্ছে না রীনার, অন্য বিষয় নিয়ে কথা বললেন দু–একটা৷
তার সঙ্গে বাকি পথ আর কোনও কথা বলতে ইচ্ছে হল না রীনার৷
১৫
এসডিও ঝামেলা সামলে বাংলোয় ফিরলেন রাত্রি পৌনে আটটা নাগাদ৷ দেবরূপ খবর রাখছিলেন এসডিও কখন ফেরেন, তৎক্ষণাৎ তাঁর বাংলো–চেম্বারে গিয়ে হাজির, গিয়ে দেখলেন এসডিও স্পট থেকে ফিরে তখনও বিশ্রাম নিতে তাঁর ঘরে যাননি, টেবিলে জিরোতে থাকা কিছু ফাইল নিয়ে বসেছেন, তাঁকে দেখেই হেসে বললেন, কী হল, সান্যালদা, আপনি খবর নিতে এসেছেন এসডিও ঠিকমতো ল অ্যান্ড অর্ডার ডিডটিতে সাকসেসফুল হতে পারলেন কি না!
দেবরূপ হাসলেন, বললেন, না, সেই সাহস বা স্পর্ধা নেই আমার কিন্তু কলেজের লিডারদের তো আমি চিনি, ওরা নিজেদের অস্তিত্ব টিঁকিয়ে রাখার জন্য মাঝেমধ্যে একটা না একটা ঝামেলা বাধায়৷ সব ক–জন লিডার আমার চেনা হয়ে গেছে৷ আমাকে দেখলেই ওরা নিজেদের সামলে নিয়ে মিটমাট করার দিকে এগোয়৷ কিন্তু আপনি এখনও নতুন, কী রিয়াকশন দেখাল তা ভাবছিলাম এতক্ষণ।
––ঠিকই বলেছেন, সান্যালদা৷ আপনি তে জানেন এসপিডিও সাহেব খুব চুপচাপ মানুষ৷ আর সেই যে আমার সঙ্গে গেলেন, একটা টুঁ শব্দও উচ্চারণ করলেন না। যা করার আমাকেই করতে হল প্রথমে মহিলা দেখে পাত্তাই দিতে চাইছিল না কিন্তু একটু পরেই কথার কৌশলে বুঝে নিলাম ওদের উদ্দেশ্য৷ তখন বুঝল আমি ঠিক সহজ মানুষ নই৷ আস্তে আস্তে মিটিয়ে নিল৷
দেবরূপ আশ্বস্ত হলেন, কিন্তু স্বস্তি পেলেন না ঠিক৷ তাঁর কেবলই মনে হতে লাগল এসডিও বোধ হয় ঠিক আস্থা রাখতে পারছেন না তাঁর উপর এ–কথা সে–কথার পর সেখান থেকে উঠে ফিরে এলেন নিজের বাংলোয়৷ তাকে দেখে রুমকি একটু ঠোঁট ফোলাল, বলল, বাবা, তোমাকে কি এসডিওকাকু ধরে রেখেছিল?
নতুন এসডিও যে কাকু নন, সেই তথ্যটা এখনও জেনে ডঠতে পারেনি রুমকি৷ আসলে এসডিও শব্দটাই তার কাছে এখন ভীতিপ্রদ৷ দেবরূপের মনে হল তার এই ভুলটা ভাঙানো প্রয়োজন৷ বললেন, মামণি, নতুন যিনি এসডিও হয়ে এসেছেন, তিনি কাকু নন, একটা মাসি৷
––মাসি রুমকির অভিধানে এরকম কোনও ছবি নেই৷ তার এই চার প্লাস বয়সে যে–টুকু স্মৃতি রক্ষিত হয়েছে মগজে তা পুরুষ এসডিও–রই৷ কিছুক্ষণ মনের ভিতর হয়তো নতুন একটা ছবি আঁকতে চেষ্টা করল, কিন্তু পারল বলে মনে হল না। পরক্ষণে জিজ্ঞাসা করল, মাসিরা কি এসডিও হয়?
দেবরূপ বিষয়টা বোঝানোর চেষ্টা করলেন রুমকিকে৷
রুমকির পরবতী প্রশ্ন, এসডিও–মাসিটা কি দুষ্টু?
দেবরূপ হেসে বললেন, কী জানি সবে তো এসেছেন এখনই বোঝা যাচ্ছে না।
১৬
পরের দিন ছিল ছুটি, দেবরূপ রুমকিকে একটা ছবি আঁকার খাতা আর রং–পেন্সিল দিয়ে বসিয়ে দিয়ে নিজে মুখ ডুবিয়েছিলেন খবরের কাগজে৷ হঠাৎ বাইরে গেটের শব্দ শুনে জানালা দিয়ে দেখলেন এসডিওর আর্দালি কার্তিক দরজা খুলে ভিতরে আসছে, তার পিছনে এসডিও৷
দেবরূপ কিছুটা অবাক, পরক্ষণে দ্রুত উঠে গিয়ে খুললেন ঘরের দরজা৷ অভ্যর্থনা জানিয়ে বললেন, দিস ইজ অ্যা সারপ্রাইজ৷
রীনা চ্যাটার্জি হেসে বললেন, এই প্রবাসে এসে মাঝেমধ্যে সারপ্রাইজ না থাকলে বেঁচে থাকব কী করে? শুধু ফাইল সই করব আর টেলিফোনে অভিযোগ শুনব?
রীনা চ্যাটার্জিকে সোফায় বসিয়ে দেবরূপ জিজ্ঞাসা করলেন, কফি হোক?
––থাক না এ সব লৌকিকতা সে তো আপনাকেই বানিয়ে দিতে হবে৷
দেবরূপ হাসলেন, চা–কফি নিজে তৈরি করা অভ্যাস করে ফেলেছি৷ সকাল–সন্ধে দুবার নিজেই বানিয়ে নিয়ে খাই৷ দু–বেলা মেয়েকেও তো কোনও একটা হেলথ–ড্রিঙ্কস বানিয়ে দিতে হয়, এগুলো কোনও সমস্যা নয়।
রীনা চ্যাটার্জি মন দিয়ে শুনলেন কথাগুলো, তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, আর রান্না? রান্নার ভালো লোক পেয়েছেন?
––আমার কাজের মেয়েটা আগে ঘরের কাজ করত, এখন রান্নার কাজটাও চাপিয়ে দিয়েছি, তাকে একটু–আধটু নির্দেশ দিতে হয়, তাতেই চালিয়ে নিচ্ছি যা–হোক, বলে দেবরূপ হাসলেন, হাসতে গিয়েও মনে হচ্ছিল কীরকম একটা কষ্ট বুকের কোথাও বেধে গেছে, সেই মন–খারাপ সামলাতে উঠে পড়লেন সোফা থেকে, বললেন, দাঁড়ান, চট করে দু–কাপ কফি করে আনি৷
উঠেই খেয়াল করলেন দরজার ওপাশে চুপিচুপি মুখ বাড়িয়ে নতুন এসডিওকে দেখছে রুমকি৷ তার বাবা যেই সোফা থেকে উঠেছে, অমনি চট করে মিলিয়ে গেল ও–ঘরে৷ এসডিও সেদিকে পিছন ফিরে থাকায় দেখতে পেলেন না রুমকিকে৷ দেবরূপ তৎক্ষণাৎ ডাকলেন, মামণি, এদিকে এসো৷
কিন্তু রুমকি ততক্ষণে কোথায় মিলিয়ে গেছে ভিতরে৷ দেবরূপ তার কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বললেন, চলো, সেই এসডিও–মাসি এসেছেন৷ তোমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই৷
রুমকি জোরে জোরে ঘাড় নেড়ে বলল, না, এসডিও–মাসি দুষ্টু৷
দেবরূপ ঠোঁটে আঙুল রেখে বললেন, এই চুপ চুপ৷ শুনতে পাবেন৷
––শুনতে পাক৷ দুষ্টু৷
দেবরূপ তাকে কিছুতেই রাজি করাতে পারছেন না, সেসময় হঠাৎ শুনলেন পিছনে রীনা চ্যাটার্জির গলা, কী হল, মামণি, তুমি আমার কাছে আসবে না? এই দ্যাখো, তোমার জন্য একটা চকোলেট নিয়ে এসেছি৷
রুমকি থমকে গিয়ে তীক্ষ্ম চোখে নিরীক্ষণ করতে লাগল নতুন এসডিওকে৷ তার দুই ভুরুতে জমে আছে বড়ো বড়ো কোঁচ৷
রীনা চ্যাটার্জি তখন এগিয়ে গেছেন ভিতরের ঘরে, হাসি–হাসি মুখে বললেন, আমি আজ এসেছি কেন বলো তো, মামণি? তোমার সঙ্গে গল্প করতে৷ তোমার বাবার সঙ্গে তো রোজই দেখা হয় অফিসে, কিন্তু তোমার সঙ্গে তো হয় না তাই আজ ছুটির দিনে ভাবলাম মামণির সঙ্গে গল্প করে আসি৷
দেবরূপও বললেন, যাও, তুমি ততক্ষণ নতুন মাসির সঙ্গে গল্প করো৷ আমি কফি করে নিয়ে আসি৷ না কি কফি হয়ে গেলে আমি তোমাকে ডাকব৷ তুমি হাতে করে কফি নিয়ে যাবে মাসিকে দিতে?
রুমকি তখনও পরখ করছে নতুন এসডিওকে৷ তার দিকে বাড়ানো প্রিয় চকোলেটের প্রতি তার যেন কোনও আকর্ষণই নেই। রীনা চ্যাটার্জি আরও একটু এগিয়ে দু–হাত বাড়িয়ে দিলেন তাকে কোলে নেওয়ার জন্য, কিন্তু রুমকি এতক্ষণে তার ক্ষোভ উগরে দিল রাগ–রাগ কণ্ঠস্বরে, না, যাব না, তোমরা দুষ্টু।
দেবরূপ খুব লজ্জিত হয়ে পড়লেন রুমকির এই অশোভন ব্যবহারে৷ একটু গলা চড়িয়ে বললেন, রুমকি, এটা কি খুব ভালো হল?
রীনা চ্যাটার্জি দেবরূপকে বললেন, ওকে একটুও বকবেন না ওর তো রাগ হওয়ারই কথা৷ আপনি নিশ্চয় ওর সাইকোলজিটা বুঝতে পারছেন। আমি কিন্তু একটুও রাগ করিনি৷ ও নিশ্চয় একটু পরেই বুঝতে পারবে আমি মোটেই দুষ্টু নই৷ আসুন, ততক্ষণে আমরা কফি খাই৷
তিনি বাইরের ঘরে চলে যেতেই দেবরূপ তাকালেন রুমকির দিকে, কী রে, তুই এরকম করছিস কেন? একটু গল্প কর, দেখবি কী ভালো একটা মাসি।
রুমকি সেই একইরকম ভাবে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল, না, মোটেই ভালো না।
দেবরূপ তখন কফি তৈরি করে ফেলেছেন, দু–কাপ কফির একটি কাপ ট্রের উপর বসিয়ে রুমকির দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন, উনি এখন আমাদের গেস্ট৷ তুমি কি ওঁর কফির কাপটা দিয়ে আসবে?
বাংলোয় কেউ এলে রুমকি প্রায়ই আবদার ধরত তার মায়ের কাছে, ‘দাও না আমি চা দিয়ে আসি৷’ কিন্তু শ্রাবস্তী তাকে নিষেধ করত, বলত, ‘না, তুই পারবি না, ফেলে দিবি’, কিন্তু রুমকি জেদ ধরে শেষপর্যন্ত দিয়েই আসত, আর পারতও ঠিকঠাক৷ দেবরূপ ভাবলেন আজ হয়তো এই কাজটা করতে আপত্তি করবে না রুমকি৷
রুমকি কিছুক্ষণ কফির কাপ–প্লেট রাখা ট্রেটার দিকে তাকাল, হঠাৎ কী মনে হতে দু–হাত দিয়ে ধরল ট্রে–টা৷ তারপর টলমল করতে করতে এগিয়ে গেল বাইরের ঘরে, সেন্টার টেবিলের উপর ধপ করে কফির কাপটা রেখেই দৌড়ে চলে এলে ভিতরের ঘরে৷ তার সশব্দে ট্রে রাখার ফলে কাপ উপচে কিছুটা কফি পড়ল প্লেটের মধ্যে৷
দেবরূপ লক্ষ করছিলেন রুমকির অভিব্যক্তির পরিবর্তন৷ চা বা কফি দিয়ে আসার কাজটা তার খুব প্রিয়, কিন্তু যাকে দিয়ে আসবে তিনি প্রিয় না হওয়ায় মুখে অটল গাম্ভীর্য মাখিয়ে ট্রে নিয়ে গেল বাইরের ঘরে, তারপর তার মনের রাগ প্রকাশ করতে ওভাবে ফেলল কফি–টা৷
দেবরূপ কিছু বললেন না কেন না তিনি জানেন রুমকির কিছু নিজস্ব দর্শন আছে এই মুহূর্তে যা তাঁর বকাবকির ঊর্ধ্বে৷ রুমকিকে কিছু সময় দিতে হবে, যতক্ষণ না ওর অন্তরের ক্ষোভ, ক্রোধ ও যন্ত্রণার উপশম না হয়। তবে বাচ্চা তো, যে কোনও মুহূর্তে বদলে যেতে পারে ওর অন্তঃকরণ৷
রুমকির কফি রেখে যাওয়ার পর্বটি লক্ষ করলেন রীনা, তাঁর মুখে ফুটে ডঠল এক ম্লান হাসি৷
পরের কয়েকটি মুহূর্ত সামান্য নীরবতা বিরাজ করল দুজনের মধ্যে, একটু পরেই অবশ্য সহজ হয়ে উঠে ফিরে গেলেন নিজেদের কথায়৷ কথা বলতে অফিসেরই কথা৷ এসডিও ও তাঁর সেকেন্ড অফিসারের মধ্যে আর কী আলোচনাই বা হবে এখন।
তাঁরা দুজন যখন কফির কাপের উষ্ণতার মধ্যে নিবিষ্ট, সহজভাবে কথা বলে চলেছেন সামনে বর্ষা আসছে, এলাকার সম্ভাব্য সমস্যা কী কী হতে পারে, কীভাবেই বা তার মোকাবিলা করতে হয় প্রশাসনের তরফ থেকে, সেই নিমগ্নতার মধ্যে দেবরূপ দেখছেন রুমকি পাশের ঘর থেকে ডঁকি দিয়ে বারবার দেখছে নতুন এসডিওকে, হয়তো বোঝার চেষ্টা করছে তিনি কতখানি দুষ্টু, না কি––
বেশ কিছুক্ষণ এরকম জরিপ করার পর তার কী মনে হল, হঠাৎ এক–পা এক–পা করে ঢুকে পড়ল এসডিওর পিছনদিক থেকে, একেবারে নিঃশব্দে চলে এল সেন্টার টেবিলের কাছে, তারপর প্রায় ছোঁ মেরে তুলে নিল সেন্টার টেবিলে এতক্ষণ অবহেলায় পড়ে থাকা চকোলেটটি৷ পরক্ষণে দৌড়ে ঢুকে গেল পাশের ঘরে৷
দেবরূপ চমৎকৃত৷ রীনার মুখেও ফুটে ডঠল তৃপ্তির হাসি৷ কিন্তু এ–বিষয়ে দুজনের কোনও কথা হল না এই মুহূর্তে৷ কফি –পান শেষ হলে রীনা উঠে পড়লেন সোফা থেকে, বললেন, বেশ কাটল ছুটির সকালটা৷ এ ক–দিন বাংলোয় যা বোর হচ্ছিলাম একা–একা।
বেরোনোর আগে পাশের ঘরের অদৃশ্য রুমকির উদ্দেশে গলা বাড়ালেন, মামণি, আমি এবার যাচ্ছি৷ তোমার সঙ্গে একটাও কথা হল না আজ।
কিন্তু রুমকির অস্তিত্ব অনুভব করা গেল না, সে নিশ্চয় আরও গহনে লুকিয়ে আছে৷
রীনা পরমুহূর্তে আবার বললেন, মামণি, ঠিক আছে, আমি তা হলে পরের কোনও ছুটির দিন এসে তোমার সঙ্গে আলাপ করে যাব৷
১৭
রীনার সঙ্গে গেটের বাইরে বেরোলেন দেবরূপ, হাঁটতে হাঁটতে আরও অনেকটা এগিয়ে দিয়ে বাংলোয় ফিরে এলেন, গেট পেরিয়ে ভিতরে ঢুকতেই রুমকি রাগ–রাগ মুখে তাকাল বাবার দিকে, বলল, নতুন এসডিও আমাকে মামণি বলল কেন? আমার নাম তো রুমকি৷
দেবরূপ হেসে কোলে তুলে নিলেন তাকে, রুমকির দুই ঠোঁটের কোণে তখনও চকোলেটের দাগ৷ রুমাল দিয়ে দাগটা মুছিয়ে দিয়ে বললেন, আমি তোমাকে মামণি বলে ডাকছি সেটা শুনে ফেলেছেন, তাই৷
––কেন, তুমি বলোনি আমার নাম রুমকি?
––ওই যাহ্, সেটাই তো ভুলে গেছি।
––তা হলে পরদিন যখন আসবে, তুমি বলে দিও যেন রুমকি বলে ডাকে৷
দেবরূপ বোঝার চেষ্টা করছিলেন মেয়েকে৷ কিছুক্ষণ তার অভিব্যক্তি নিরীক্ষণ করে বললেন, কেন, মামণি বলে ডাকলে কী অসুবিধা?
––না, মামণি বলে শুধু তুমি ডাকবে৷ রুমকির স্বরে বেশ দৃঢ়তা৷
দেবরূপ হাসলেন, বললেন, তা তোকে আর উনি ডাকবেন কী করে? তুই তো ওঁর সামনে বেরোতেই চাইছিস না।
রুমকি চুপ করে থাকে৷ দেবরূপ বুঝতে পারছেন রুমকির ভিতরে একটা লড়াই চলছে নতুন এসডিওকে নিয়ে৷ ততক্ষণে ঘরের কাজ ও রান্না করতে এসে গেছে বাসন্তী৷ কী রান্না হবে তা তাকে বুঝিয়ে দেওয়ার মধ্যে এসে গেল ভূষণ৷ তার উপর দেওয়া আছে বাজার করার দায়িত্ব৷ কী কী আনতে হবে তার একটা তালিকা করে তার হাতে বুঝিয়ে দিলেন টাকা৷
১৮
পাহাড় ছুঁয়ে ভেসে আসা সকালের বাতাসে সাম্যন্য হিম–হিম৷ নরম রোদ এসে ছুঁয়ে আছে দীর্ঘ বারান্দা, বারান্দা পেরিয়ে রোদের লেজ এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে সোফার সামনে রাখা তাঁর পা–দুটি৷ এ সময়ের রোদ ভারী মনোরম৷
দেবরূপের হাতে ধরা একটা তিন–পৃষ্ঠার সরকারি সার্কুলার৷ সাইক্লোস্টাইলড চিঠির অর্ধেক ধেবড়ে গেছে মেসিনের উপচে পড়া কালিতে৷ তাতে মনোযোগ দিয়েছেন বেশ কিছুক্ষণ, বোঝার চেষ্টা করছেন সরকারের কী অভীষ্ট, হঠাৎ টেলিফোনে বেজে ডঠল রিরিং রিরিং৷ এসডিওর ফোন, সান্যালদা, একটা সমস্যায় পড়েছি৷ জরুরি আলোচনা, কিন্তু টেলিফোনেই সেরে নিই।
সমস্যার রকম শুনে দেবরূপ বললেন, সমস্যাটা টেলিফোনে আলোচনা করে মিটবে না৷ ঠিক আছে, আমি এখনই যাচ্ছি, ম্যাডাম৷
ওদিক থেকে রীনার ব্যস্ত কণ্ঠস্বর, না, না আসতে হবে না। এত সকালে নিশ্চয় কাজের মেয়েটি আসেনি মামণিকে তো একা থাকতে হবে।
দেবরূপ হঠাৎ বললেন, দেখি মামণিকে নিয়েই তা হলে যাই৷
ওপাশ থেকে রীনার কণ্ঠে উল্লাস, বললেন, ও আসতে চাইবে?
––দেখি কথা বলে৷
––তা হলে তাই আসুন৷
রিসিভার রেখে দেবরূপ খোঁজ করলেন রুমকির৷ সে তখন একটা ছবির বই নিয়ে দেখছে মনোযোগ দিয়ে, একটু পর পর পৃষ্ঠা উল্টে মনঃসংযোগ করছে নতুন ছবিতে৷ তার কাছে গিয়ে বললেন, এসডিও মাসির হঠাৎ কী দরকার পড়েছে আমাকে৷ তাঁর বাংলোয় যেতে হবে আমাকে৷
রুমকি বই থেকে মুখ তুলে বলল, না, তুমি যাবে না তা হলে আমি কার কাছে থাকব?
––তা হলে তুই আমার সঙ্গে চল৷
––না, আমি ওই বাংলোয় কক্ষনো যাব না।
দেবরূপ বুঝলেন রুমকির ব্যথার জায়গাটা, তবু বললেন, কিন্তু মাসি যে বলল তোকে নিয়ে যেতে৷
রুমকি একটু থমকে গিয়ে হঠাৎ বলল, মাসি আমাকে বকবে না তো?
দেবরূপ অবাক হয়ে বললেন, কেন, বকবে কেন?
––বাহ, সেদিন কফির কাপ থেকে কফি পড়ে গেল না।
––ও, এই ব্যাপার দেবরূপ হেসে ফেললেন, তুই ছোটো মানুষ৷ ভর্তি কাপ কফি নিয়ে যেতে গিয়ে পড়ে যেতেই পারে একটু৷
রুমকি রাগ দেখিয়ে বলল, মোটেই আমি ছোটো নেই৷ আমার তো কবেই চার বছর হয়ে গেছে৷ তুমি তো সেদিন কাকে বললে।
––তা বলেছি ঠিকই৷ তুমি এখন সাড়ে চার৷ কিন্তু সাড়ে চার হয়ে গেলেই তো কেউ বড়ো হয়ে যায় না।
রুমকি এত সব মারপ্যাঁচ বুঝল না, হঠাৎ ছুটে গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজের মুখটা দেখে নিল একবার৷ চিরুনিটা তুলে নিজের চুলগুলো ঠিকঠাক করে নিয়ে দেবরূপের হাত ধরে বলল, চলো৷
১৯
দেবরূপ এসডিওর বাংলোয় গিয়ে দেখলেন রীনা হাসি–হাসি মুখে বসে আছেন বাংলো চেম্বারের চেয়ারে৷ তাঁর সঙ্গে রুমকিকে দেখে আরও খুশি হয়ে বললেন, এই তো মামণি এসেছে৷ আজ তোমার সঙ্গে আমার আলাপ হবে৷
রুমকি গম্ভীর হয়ে তাকাল তার বাবার দিকে, তারপর এসডিওর দিকে ফিরে বলল, আমার নাম রুমকি৷
––তাই নাকি?
––হ্যাঁ, আমাকে রুমকি বলে ডাকবে।
রীনা একটুও অপ্রতিভ না হয়ে বললেন, কিন্তু মামণি বলে ডাকতে যে আমার বেশি ভালো লাগছে।
রুমকি কিছুক্ষণ গুম হয়ে রইল, তারপর জিজ্ঞাসা করল, তোমার নাম কী?
রীনা চমৎকৃত হয়ে বললেন, আমার নাম রীনা৷
রুমকি কিছুক্ষণ নিজের মনে বিড়বিড় করল, রিনা রিনা রিনা––
তারপর হঠাৎ উচ্চারণ করল, রিমা রিমা রিমা–––রি––মা রি––মা––
কী যেন ভাবল চুপ করে, তারপর বলল, তুমি আমাকে মামণি বলে ডাকতে পারো, কিন্তু তা হলে তোমাকে আমি ‘রি–মা–’ বলে ডাকব৷
দেবরূপ তাঁর কন্যার কথাবার্তা শুনে যেমন বিস্মিত হচ্ছিলেন, তেমনই রীনাও পুলকিত৷ সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ঠিক আছে, তোমার কথাই শিরোধার্য৷
রুমকি তৎক্ষণাৎ জিজ্ঞাসা করল, শিরোধার্য মানে কী?
রীনা হেসে বললেন, মানে তুমি যা বললে তা আমি মেনে নিলাম৷
রুমকি হঠাৎ ভীষণ খুশি হয়ে হেসে ফেলল ফিক করে৷
দেবরূপ লক্ষ করছিলেন রুমকির পরিবর্তনের পর্যায়গুলি৷ দেখলেন সে হঠাৎ খুব কাছাকাছি হতে চাইছে রীনার৷ কারণে–কারণে রীনার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করছে এটা–ওটা, তার শাড়ির আঁচল হাতের মুঠোয় নিয়ে পাকাচ্ছে নিজের মনে ঠিক যেমনটি করত শ্রাবস্তীর আঁচল নিয়ে৷ আর কী আশ্চর্য রীনাও তার এই অস্বাভাবিক ব্যবহারকে মনে করছে স্বাভাবিক৷ রুমকি যখন যা আবদার করছে তার কাছে, সে তক্ষুনি মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছে৷
আরও আশ্চর্যের বিষয়, রুমকি কোনও কারণ ছাড়াই ডেকে উঠছে, ও রিমা, রি––মা––
তার এই রিমা ডাক দীর্ঘায়ত করার মধ্যে মা শব্দটার উপর জোর দিচ্ছে রুমকি৷ আর সেই ডাকটা বেশ ডপভোগ করছেন রীনা৷
গল্পগুজবের মধ্যে দেবরূপ হাতের ঘড়ি দেখে চঞ্চল হয়ে উঠলেন, ম্যাডাম, এবার ফিরতে হবে৷ কাজের মেয়েটি হয়তো এসে গেছে এতক্ষণে৷ রুমকিকেও রেডি করতে হবে স্কুল যাবে বলে৷
রীনাও হেসে বলল, তাই তো৷ মামণির স্কুলবাস এসে হর্ন দিতে শুরু করবে৷
রুমকি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, তুমি জানো বাসটা রোজ হর্ন দেয়?
––হ্যাঁ, আমি তো চেম্বারে বসেই শুনতে পাই হর্নের শব্দ৷ তখনই বুঝতে পারি মামণি এবার গুটি গুটি পায়ে স্কুলে চলেছে৷
রুমকি খুবই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে এসডিও–র দিকে৷
দেবরূপ ততক্ষণে ডঠে দাঁড়িয়ে রুমকিকে বললেন, চলো, মামণি––
রুমকির অভিব্যক্তিতে যেন ইতস্তত ভাব৷ রীনা তার গালে একটা হামি দিয়ে বললেন, আবার এসো৷
––আসব৷ তুমিও এসো কিন্তু রি––মা৷ বলার সময় রুমকির গলা যেন বুজে আসতে চাইছে৷
বাংলোয় ফেরার সময় দেবরূপ খেয়াল করলেন রুমকির পা যেন চলতেই চাইছে না দেখলেন দুটি চোখ যেন ছলছল করছে মুখে কিছু বলল না, মাথা নিচু করে চলে এল বাবার হাত ধরে৷
২০
সকালের কয়েকটি ঘন্টা রুমকির লেখাপড়ার সময়৷ সেই সময়টুকু তার সামনে বসে থাকেন তার বাবা৷ কিন্তু বাবা সারাক্ষণ ‘পড়্ পড়’ বলে মাথা খারাপ করে দেয় না তাই যখন ইচ্ছে হয় তার পড়ে, যখন পড়তে ভালো লাগে না, ছবি আঁকার খাতা খুলে ইচ্ছেমতো ছবি আঁকে আর রং করতে থাকে৷
সেদিনও ডলের একটা পঞ্চ গায়ে দিয়ে রংপেন্সিল দিয়ে একটা বাংলোর মতো বাড়ি আঁকার চেষ্টা করছিল রুমকি৷ আসলে এই বাংলোটা সে আঁকতে শুরু করেছিল অনেকদিন আগে৷ তখন শেষ করতে পারেনি ছবিটা৷ এতদিন পরে আবার রং দেওয়া শুরু করেছে যাতে বাংলোটা দেখায় একদম ঝকঝকে, নতুন৷ কিন্তু আগেরবারেও যেমন একটা রং ছিল না বলে আঁকতে পারেনি, আজও তাই৷ তাদের বাংলোর বারান্দার ছাদে মেটে রঙের টালি দিয়ে ছাওয়া, সেই রংটা কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছে না তার রংপেন্সিলগুলোর মধ্যে৷
ঠিক সেই মুহূর্তে তাদের বাংলোর গেট খোলার শব্দ৷
বাড়িতে কেড এলে রুমকি–ই সোফা থেকে লাফ দিয়ে নেমে দরজা খুলতে চলে যায়৷ আজও দরজা খুলে দেখল বাইরে গেট খুলে ভিতরে এসেছে কার্তিককাকু৷ নিশ্চয় তার বাবার কাছে, সে ঘরে ঢুকতে যাবে, হঠাৎ কার্তিককাকু ডাকল, রুমকি, শোনো––
রুমকি অবাক হয়ে পিছনে ফেরে৷
কার্তিককাকুর হাতে কাগজে মোড়া একটা কী যেন, সেইটে রুমকির দিকে বাড়িয়ে গিয়ে বলল, এটা তোমার৷ ম্যাডাম পাঠিয়ে দিয়েছেন৷
রুমকি অবাক হয়ে সেটা হাতে নেয়, কার্তিককাকু গেট দিয়ে বেরিয়ে গেলে কাগজের মোড়কটা নিয়ে ঘরে ঢ়োকে, বলে, বাবা, রি––মা দিয়েছে৷
তার বাবা খবরের কাগজ থেকে চোখ তোলে, কী ওটা?
রুমকি ততক্ষণে খুলে ফেলেছে কাগজের মোড়কটা৷ ভিতরে একটা জলরঙের বাক্স৷
রুমকি লাফিয়ে উঠে বলে, এই তো, আমি তো এটাই চেয়েছিলাম তোমার কাছে৷ তুমি বললে আমি এখনও বড়ো হইনি, এখন জলরং আমার দরকার নেই৷ কিন্তু রি––মা বুঝেছে আমি বড়ো হয়েছি৷
বলতে বলতে জলরঙের ট্রেটা খুলে কী যেন দেখে লাফিয়ে ডঠল, এই দ্যাখো, আমি পোড়ামাটির রং খুঁজছিলাম৷ পোড়ামাটির রং না হলে কি বাংলোর টালিতে রং করা যায়।
বলে অমনি একটা কাপে জল ভরে নিয়ে এল রান্নাঘর থেকে, তাতে তুলি ভিজিয়ে রঙের ট্রে থেকে পোড়ামাটির রং লাগিয়ে বোলাতে লাগল বাংলোর টালিতে৷
এতক্ষণে বাংলোটা সুন্দর দেখতে হল৷
রুমকি নিজের আঁকা বাংলোর ছবিটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল কয়েকবার, তারপর খাতাটা মেলে ধরল বাবার দিকে, বাবা, দ্যাখো––
২১
দিনকয়েক পরে এক ছুটির দিনে দূরবর্তী ব্লকের এক পঞ্চায়েত প্রধানকে ঘেরাও করা হয়েছে এই মর্মে ফোন এল এসডিওর কাছে৷ রীনা ইন্টারকমে ধরলেন দেবরূপকে, বিষয়টা জানিয়ে বললেন, সান্যালদা, ওখানকার বিডিও আজ হেডকোয়ার্টারে নেই৷ থানার ওসি বলছেন তিনি যাচ্ছেন স্পটে, কিন্তু একজন ম্যাজিস্ট্রেট পাঠালে ভালো হয়৷
দেবরূপ ব্যস্ত হয়ে বললেন, তা হলে আমিই যাচ্ছি।
––তা না হয় গেলেন৷ কিন্তু রবিবারে আপনার কাজের লোকটি আসে না৷ মামণিকে কী করবেন?
দেবরূপ সে–কথাই ভাবছিলেন এসডিওর ফোন পেয়ে, অবাকও হচ্ছিলেন একজন আইএএস অফিসার তাঁর অধীনস্থ একজন অফিসারের ব্যক্তিগত সমস্যার কথা ভেবে ফেলেছেন এর মধ্যে
তিনি কিছু ভেবে ওঠার আগেই ওপাশ থেকে সমাধানও পেয়ে গেলেন, আপনি যাওয়ার সময় মামণিকে আমার কাছে দিয়ে যান৷
দেবরূপ ইতস্তত করে বললেন, কিন্তু আমি কখন ফিরব না–ফিরব তার কোনও ঠিক নেই
––সেই কারণেই তো আমার কাছে রেখে যেতে বললাম৷ আর হ্যাঁ, আপনি চলে গেলে আপনার রাঁধুনি কি এসে ফিরে যাবে?
দেবরূপ সে–কথাও ভাবছিলেন না তা নয়, আমতা আমতা করে বললেন, হ্যাঁ, তা যাবে৷ কী আর করা যাবে খাওয়ার একটা অন্য ব্যবস্থা করে নেওয়া যাবে৷
ওপাশ থেকে অন্য এক রকম সমাধানের প্রস্তাব এল, আমার রাঁধুনি এর মধ্যেই এসে গেছে৷ তাকে বরং আর একটু চাল বেশি নিয়ে নিতে বলি৷ আপনি স্পট থেকে ফিরেই আমার এখানে চলে আসবেন৷ আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করব৷
দেবরূপ হাঁ হাঁ করে উঠলেন, না না, আমার ফিরতে কত দেরি হবে তার ঠিক নেই৷ কেন অপেক্ষা করবেন? আমি অন্য ব্যবস্থা করে নেব৷
––তা হয় না, সাান্যালদা, আপনি যাচ্ছেন এসডিওর–ই কাজে৷ আপনি সারাদিন না–খেয়ে ডিউটি করবেন, আর আমি চর্বচোষ্য খেয়ে বিশ্রাম নেব তা হয় না আপনি যখনই ফিরবেন, সোজা এখানে চলে আসবেন৷
২২
সেদিন পঞ্চায়েতের প্রধানকে ঘেরাও মুক্ত করে দেবরূপ যখন এসডিও বাংলোয় ফিরলেন বিকেল চারটে৷ ফিরে বেশ অবাক হলেন, দেখলেন রুমকি দুপুরের খাওয়া সেরে দিব্যি ঘুমোচ্ছে রীনার বিছানায়৷ দেবরূপ আসতেই রীনা একরাশ হেসে বললেন, জানেন, মামণি কী আনন্দে ছিল এখানে আমার বাংলোয় তো খেলার সরঞ্জাম নেই৷ একটা পেন আর সাদা কাগজ দিলাম তা নিয়ে বহুক্ষণ ছবিটবি আঁকল, আমার সঙ্গে কিছুক্ষণ ইঁকিড়মিকিড় খেলল৷ তারপর যখন যা দিলাম খেল, কিছুক্ষণ পেপারওয়েটগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করল, বেলা একটা নাগাদ ভাত দিলাম, খেয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘বাবা কখন আসবে?’ তারপর ঘুমিয়ে পড়ল বিছানায়৷
রীনার ধারাবিবরণী শুনে দেবরূপ যত না চমৎকৃত হলেন, তার চেয়েও বেশি নিশ্চিন্ত৷ ভাবছিলেন এরকম লম্বা একটা সময় রুমকি এখানে থাকতে গিয়ে অস্থির হয়ে পড়বে কি না!
কিন্তু দেবরূপ তার চেয়েও বেশি বিস্মিত রীনা চ্যটার্জির এলাহি ব্যবস্থাপনায়৷ জানালেন আজকের বেশিরভাগ রান্না তিনি নিজে করেছেন, রান্নার মাসির হাতে ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকেননি৷ দেবরূপ খাওয়ার টেবিলে বসে সেই ডপাদেয় রান্নার স্বাদ গ্রহণ করতে করতে বললেন, যে–মেয়ের কেরিয়ার এত ভালো, তার রান্নাও যে এত চমৎকার হয় সেই অভিজ্ঞতাও আজ হল৷
প্রায় পাঁচ বছরের কাছাকাছি এখানে আছেন। কখনও কোনও এসডিওর বাংলোয় তাঁর সঙ্গে দুপুরের খাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়নি এমনকি মণীশ আগরওয়ালের সঙ্গে যা কিছু অন্তরঙ্গতা হয়েছিল তা শ্রাবস্তীর সঙ্গে, তাঁর সঙ্গে নয়৷
খাওয়াদাওয়া শেষ হতে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইলেন দেবরূপ৷ শ্রাবস্তী তাঁকে ছেড়ে চলে গেছে প্রায় ছ–মাস, এই সময়কালে তাঁর ও রুমকির নিঃসঙ্গ জীবন কাটছিল ঘোর দুঃসময়ের মধ্যে৷ রীনা তাঁদের এই সংকটের কারণ উপলব্ধি করেছেন, তাঁর পূর্বসূরীর কৃতকর্মে একটি সংসারে যে–ভাঙন হয়েছে তা তিনি মেরামত করতে পারবেন না, কিন্তু চেষ্টা করছেন তাদের যন্ত্রণার কিছু উপশম করতে৷ বিশেষ করে তিনি বুঝতে পারছেন মা–হারা মেয়েটির অনিরাপত্তার জায়গাটা৷
রীনা তাঁর কিছু হাতের কাজ সেরে এসে বসলেন দেবরূপের সামনের সোফায়, হেসে বললেন, কী ভাবছেন এত?
দেবরূপ হঠাৎ বলে ফেললেন, ভাবছি আপনি তো দশভূজা৷ অফিসে এত কাজ সামলেও আপনার বাংলোর ভিতরটা এত সাজানোগোছানো তা প্রায় অবিশ্বাস্য৷ তার উপর এমন রন্ধনপটিয়সী তাও জানা হয়ে গেল আজ৷
––দেখুন সান্যালদা, ঘর–সাজানো বা রান্না এগুলো মেয়েদের সহজাত৷ এ নিয়ে বেশি বললে আমি লজ্জা পেয়ে যাব৷ সে যাই হোক, মামণিকে সারাদিন কাছে রেখে আমার একটা কথা মনে হচ্ছিল৷
দেবরূপ আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করেলন, কী কথা?
––তার আগে বলুন তো, মামণির মায়ের কোনও খবর কি পেলেন?
দেবরূপের অভিব্যক্তিতে কোথাও এক টুকরো পাথর, শুধু ঘাড় নেড়ে জানালেন, না৷
––আপনার কি মনে হয় তিনি কখনও আবার ফিরে আসতে পারেন?
দেবরূপ একই রকম শক্ত গলায় বললেন, না৷ আপনার কি মনে হয় তার আর ফিরে আসার মুখ আছে? না কি সে এলেই আর আমার ঘরে থাকার অধিকার অছে তার।
রীনা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন, তারপর বললেন, কিন্তু মামণির কোনও দোষ নেই তার সুন্দর শৈশব কেন এভাবে নষ্ট হবে একজন শিশুর মা না–থাকা মানে কিছুই না–থাকা৷ বাবাকে সে ভালোবাসে, কিন্তু বাবার পক্ষে কখনও মায়ের ভূমিকা পালন করা সম্ভব নয়।
দেবরূপ চুপ করে থাকেন৷ তাঁর ভিতরে কোথাও ভাঙচুর হতে থাকে৷ ভিতরের জমে থাকা কষ্টটা গাঢ় হতে থাকে আরও৷ আস্তে আস্তে বললেন, কখনও স্বপ্নেও ভাবিনি আমার সংসার এমনটা হবে৷ এখন কী আর করা মামণির ভাগ্যে যা আছে তাই হবে৷
রীনার কণ্ঠে একটু প্রতিবাদের স্বর, বললেন, মামণি আজ সারাক্ষণ আমার সঙ্গে বকবক করেছে, খেলেছে, কখনও আমার উপর রাগ করেছে, কখনও বুকের ডপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আদর করেছে৷ আবার কী বলেছে জানেন, বলেছে, আমার তো মা নেই৷ তুমি যদি আমার মা হতে তো বেশ হত।
দেবরূপ স্তব্ধ হয়ে গেলেন তাঁর অনুপস্থিতিতে রুমকি এত সব কাণ্ড করেছে জেনে৷ কী বলবেন, কী করবেন বুঝে উঠতে পারলেন না।
––আরও কী বলেছে জানেন? বলেছে এই জন্যে আমি রি––মা–– বলে ডাকি৷ নামটার শেষে তো একটা মা আছে৷
দেবরূপ ক্রমশ আশ্চর্য হচ্ছিলেন রুমকির আচরণে৷ শুধু বলতে পারলেন, ও কিন্তু আমার কাছে এত সব বলেনি কখনও৷ খুব চাপা মেয়ে এখন বুঝতে পারছি৷
রীনা হেসে বললেন, বাবার কাছে মেয়েরা কখনও সব বলে নাকি? মেয়েরা মায়ের কাছেই প্রকৃত আশ্রয় চায়৷ আজ অনেকদিন পরে মামণি তার মাকে ফিরে পেয়েছিল৷ তাই ওর মধ্যে লক্ষ করছিলাম এক আশ্চর্য উচ্ছ্বাস৷
দেবরূপ বিহ্বল হয়ে পড়ছিলেন রীনার কথায়৷ বললেন, আগে মামণি মাঝেমধ্যে একা হলেই শ্রাবস্তীর ফোটোর দিকে তাকিয়ে বলত, ‘মা, তুমি ফিরে এসো৷’ কিন্তু ইদানীং আর বলতে শুনিনি
রীনা আবার হাসলেন, বললেন, আসলে ও তার মাকে ফিরে পেয়েছে বলেই আর বলে না আপনি নিশ্চয় খেয়াল করেছেন মামণি এই বাংলোয় এলে আর আপনার ওখানে যেতে চায় না।
––হ্যাঁ, তা বুঝতে পারি৷ কিন্তু করার তো কিছু নেই৷
রীনা হঠাৎ বললেন, বোধ হয় কিছু করার আছে৷ একটা শিশুর শৈশব এভাবে শেষ হয়ে যাক তা আমার মন চাইছে না৷
দেবরূপ ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না রীনা কী বলতে চান।
রীনা বলেন, আসুন না, আমরা দুজনে মেয়েটাকে মানুষ করি৷
দেবরূপ কিছুক্ষণ বিহ্বল হয়ে রইলেন রীনার প্রস্তাবে৷ তাঁর কাছে এ এক অসম্ভব দুরাশা।
তাঁদের কথোপকথনের মধ্যে রুমকির ঘুম ভেঙে যায়৷ সে পায়ে–পায়ে চলে আসে এপাশের ঘরে, বাবাকে দেখে আনন্দে ঝলমল করে ওঠে তার মুখ, বলে, বাবা, রি––মা না খুব ভালো৷
একটা শিহরন বয়ে যায় দেবরূপের ভিতরে।
উজ্জ্বল হয়ে ওঠে রীনার মুখ৷
