পৃথিবীর উষ্ণতা কেবলই বাড়ছে। তার দায় কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর চাপালে চলবে না। কারণ বিশ্ব উষ্ণায়ন পৃথিবীর আবহাওয়াকে উত্তপ্ত করলেও ভেতরের উষ্ণতা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে তার আত্মজনের ক্ষোভে। কোথাও কেউ সন্তুষ্ট নয় আজ। একজীবনে যা প্রয়োজন তার সবটুকু পেয়ে গেছে যারা, তারা আরও কিছু পাওয়ার লোভে থিতু হতে পারছে না; আর যারা বঞ্চিত, তারা ক্ষোভে, হতাশায় ফুটছে। লোভ জন্ম দেয় আরও লোভের, ক্ষমতার স্পর্ধিত হাত ছিনিয়ে নিতে চায় আরও ক্ষমতা। সভ্য দুনিয়ায় তথাকথিত সভ্য মানুষদের তৈরি করা যুদ্ধ সেই দম্ভেরই আস্ফালন।
ইউনিসেফ জানাচ্ছে, প্রতিদিন প্রায় ৫,৭০০ শিশু কেবল যুদ্ধের কারণে অনাথ হচ্ছে। তাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই মুহূর্তে বিশ্বে ১৪০–১৫০ মিলিয়ন শিশু যুদ্ধের বিভীষিকায় হারিয়েছে তাদের পরিবার। তাদের খাবার নেই, নিরাপদ আশ্রয় নেই, শিক্ষার সুযোগ তো দূরের কথা—এক কথায়, তাদের শৈশব লুণ্ঠিত হয়েছে ক্ষমতালোভীদের সংঘাতে। যুদ্ধবাজ শক্তিধর দেশগুলোর অবশ্য সেসবের পরোয়া নেই। তাই যুদ্ধ থামারও কোনো লক্ষণ নেই; বরং নতুন নতুন অজুহাতে প্রতিনিয়ত খুলে যাচ্ছে সংঘাতের নতুন ফ্রন্ট।
আমরা যারা অতি সাধারণ মানুষ, আমরা কেউই আসলে ভালো নেই। ভালো না থাকার সত্যটাকে ভুলে থাকার জন্যই নিজেদের ব্যস্ত রাখছি নানাভাবে। কখনও ফুটবল, কখনও অন্য কোনো উৎসব, কখনও বা ক্ষণিকের বিনোদন। শিল্প, সংগীত ও সাহিত্য থেকে খুঁজে নিতে চাইছি আশা আর ভালোবাসার শেষ সম্বল।
তবু কি পারছি নিজেদের ভোলাতে?
আগুনের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজের সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে কি বলতে পারছি—“তোমাকে দিয়ে গেলাম ভুবনডাঙার মেঘলা আকাশ”? পারছি না। কারণ আকাশ, বাতাস, জল—সবকিছুর মধ্যেই আমরা মিশিয়ে দিয়েছি বিষ। আগামী প্রজন্মের জন্য এ-ই কি আমাদের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার?
অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। আমাদের জানা ছিল—
‘এই ধরণীর যাহা সম্বল
বাসে ভরা ফুল, রসে ভরা ফল,
সুস্নিগ্ধ মাটি, সুধাসম জল,
পাখির কণ্ঠে গান—
সকলের এতে সম অধিকার, এই তাঁর ফরমান।’
ফরমানের কথা কারও অজানা নয়; অভাব কেবল তা মানার সদিচ্ছার। ক্ষোভ জমতে জমতে আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হওয়ার আগেই তার ভাষা বুঝে নিতে হয়। সময়মতো সহমর্মিতা, ন্যায়বিচার ও মানবিকতার জল না দিলে একটি ছোট্ট আগুনের ফুলকিও ভয়াবহ বিস্ফোরণের জন্ম দিতে পারে। তাই আবারও ভেবে দেখার সময় এসেছে—আমরা ঠিক কোন পৃথিবীটি রেখে যেতে চাই আগামী প্রজন্মের জন্য।
এই সংখ্যার অপরবাংলা সেই প্রশ্নেরই অন্য এক উত্তর খোঁজার ক্ষুদ্র প্রয়াস। বাংলা ভাষার বিভিন্ন প্রজন্মের সৃষ্টিশীল লেখকেরা তাঁদের অভিজ্ঞতা, অনুভব ও স্বতন্ত্র লেখনী দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন এই সংখ্যা। প্রথিতযশা কথাসাহিত্যিক তপন বন্দ্যোপাধ্যায়-এর উপন্যাসিকার পাশাপাশি গল্প, অণুগল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, ভ্রমণ, অনুবাদ, রম্যরচনা, চলচ্চিত্র-সমালোচনা ও রান্নার মতো বিচিত্র বিভাগে অংশ নিয়েছেন দেশ-বিদেশের একঝাঁক সৃষ্টিশীল লেখক। এই সংখ্যায় কলম ধরেছেন—রাজশ্রী বসুঅধিকারী, সুস্মিতা নাথ, রেহান কৌশিক, বিতস্তা ঘোষাল, কামরুল হাসান বাদল, মৌসুমী বন্দ্যোপাধ্যায়, মহুয়া সমাদ্দার, পিউ ভট্টাচার্য্য মুখার্জী, অমিতা মজুমদার, বিভাস রায়চৌধুরী, পার্থজিৎ চন্দ, গৌতম কুমার ভাদুড়ি, উপাসনা সরকার, রোহিণী ধর্মপাল, ছন্দা বিশ্বাস, পায়েল চট্টোপাধ্যায়, চুমকি চট্টোপাধ্যায়, অজন্তা রায় আচার্য, অর্পিতা বোস, অদিতি বসুরায়, সুরশ্রী ঘোষ সাহা এবং প্রিয়ব্রত দত্ত। তাঁদের প্রত্যেকের প্রতি রইল আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।
বিশ্বাস করি, এই সংখ্যার প্রতিটি লেখা পাঠকের মনে নতুন চিন্তার দুয়ার খুলে দেবে, প্রশ্ন করতে শেখাবে, আবার একই সঙ্গে ভালোবাসা, সৌন্দর্য ও মানবিকতার ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনবে। কারণ শেষ পর্যন্ত, মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয় যুদ্ধ নয়, ক্ষমতা নয়—শিল্প, সাহিত্য আর মানুষের প্রতি মানুষের অটুট বিশ্বাস।
আনন্দ হোক!
শুভ নাথ
সম্পাদক
অপারবাংলা ত্রৈমাসিক বাংলা সাহিত্য পত্রিকা
