short-story-anandabari

আনন্দবারি
সুস্মিতা নাথ

 

বুদ্ধু কারও নাম হয় না। কাকারও নাম বুদ্ধু নয়। নামটা ছিল বুদ্ধ। কিন্তু নীরেট বোকা মানুষটার নাম ‘বুদ্ধ’ যেন অনেকটা কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন-এর মতো শোনাত। ফলে যা হয়, সবার মুখে মুখে অপভ্রংশ হয়ে বুদ্ধ হয়ে গেল বুদ্ধু। আমাদের বুদ্ধুকাকা। আমার একান্ন বছরের জীবনে তাঁর মতো মাথামোটা লোক আমি দেখিনি।

বুদ্ধুকাকা বাবার এক অকাল বিধবা পিসির একমাত্র সন্তান। আমাদের যৌথ পরিবারেই সে মানুষ। শুনেছি, বাবা ও জেঠুর মতো তাঁকেও লেখাপড়া শেখানোর চেষ্টা করেছিল বাড়ির লোক। কিন্তু হয়নি। লেখাপড়া তো দূর, মাথা খাটাতে হয় এমন কিছুই শেখানো যায়নি বুদ্ধুকাকাকে। তবে হ্যাঁ, মাথা না হলেও শরীর খাটাতে সে ওস্তাদ। গাধার মতো খাটতে পারে বুদ্ধুকাকা। এখনও, এই সত্তরোর্দ্ধ বয়সেও।

সবসময় চোখের সামনে দেখলেও বুদ্ধুকাকাকে কেউ কখনও ধর্তব্যের মধ্যে রাখিনি আমরা। কাকা বুঝে বা না-বুঝে হেহেহে করে হাসে, জোরে জোরে কথা বলে, সবার হ্যাঁ-তে হ্যাঁ, আর না-তে না বলে। তাঁর নিজের কোনও মতামত নেই, ব্যক্তিত্ব নেই। এতে অবশ্য সবার সুবিধেই হয়েছে। বোকা বলে তাকে দিয়ে যাবতীয় কাজ করিয়ে নেওয়া যায়। সংসারের কুটকাচালি বা কথার মারপ্যাঁচ ধরতে পারে না বলে প্রয়োজনে তাঁর ঘাড়ে বন্দুক রেখে অনায়াসে চালানো যায়। ফলে কাকাকে নিয়ে কারও তেমন সমস্যা ছিল না, এখনও নেই। 

বুদ্ধুকাকাকে আমরা কাঁদতে দেখিনি কোনদিন। এমনকি কখনও কোনও কারণে মন খারাপ করে থাকতে, বা কোনও কিছুর জন্যে অভিযোগ করতেও দেখিনি। বরং সর্ব অবস্থাতেই সে হাসে এবং হাসতে পারে। সবসময়ই যেন সে মহাসুখে আছে। বোকা লোকেদের এই এক সুবিধে। সুখ-দুঃখের বোধটাই তাদের কম। নইলে এর উল্টোটাই তো হওয়ার কথা ছিল। কাকার জীবনে খুশি থাকার মতো আছেটা কী? জন্মেই পিতৃহারা, বালক বয়েসেই মাকেও হারানো, আজীবন মাতুলালয়ে পড়ে থাকা, অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে বাঁচা, নিজের স্ত্রী-সন্তান-সংসার নেই, উঠতে-বসতে ধমক ধামক খাওয়া …এও একটা জীবন হল? তবু কাকা সদা হাসিখুশি। কটুকথা, তাচ্ছিল্ল্য, অপমান, বঞ্চনা সবকিছুতেই অদ্ভুত ভাবে হাসতে দেখেছি কাকাকে। কিছুই যেন গায়ে লাগে না তার। আমার বদ্ধ ধারণা, কাকা এতটাই নির্বোধ যে, দুঃখ, অপমান আদি বোঝার ক্ষমতাও তাঁর নেই।

এত সত্ত্বেও কিন্তু তিরস্কার ও অবজ্ঞার হাত থেকে রক্ষা পায় না বুদ্ধুকাকা। কারণটা তাঁর নীরেট মাথা। পান থেকে চুন খসলেই তাকে গালাগালি করা আমাদের বাড়িতে আম ঘটনা। বোকা লোককে কেউ গুরুত্ব দেয় না। কাকাও পায়নি। চোখের সামনে সর্বক্ষণ দেখলেও কাকার অস্তিত্ব আমরা উপেক্ষাই করে চলি। একবারের কথা মনে পড়ছে। প্রথম চাকরি পেয়ে বেতনের টাকায় বাড়ির সকলের জন্যে কাপড় নিয়ে এলাম। কেবল বুদ্ধুকাকা বাদ পড়ল। কাকার কথা যে মনে ছিল না তা নয়। কিন্তু বাবাদের কাপড় কিনতে অনেক টাকা বেরিয়ে গিয়েছিল। ভেবেছিলাম পরে একসময় দিয়ে দেব। এতে অস্বাভাবিকতা কিছুই ছিল না। কেন না ছোটবেলা থেকেই এমনটা দেখে এসেছি আমি।

আমাদের বাড়িতে সবার জন্যে নতুন কাপড় কেনা হত দুটো অনুষ্ঠানে। পুজো আর পয়লা বৈশাখে। এই সময়গুলোতে মা ও জেঠিমার হাতে একগুচ্ছ টাকা দিয়ে দাদু বলতেন, এই টাকায় বাড়ির সবার জন্যে কাপড়-চোপড় কিনে এনো।

তখনই সবার সঙ্গে কাকারও নতুন কাপড় হত। কিন্তু এর বাইরেও কেনাকাটা হত। বাবা ও জেঠু উভয়েই আলাদা করে বাজার করতেন। কিনতয় বাবা বা জেঠু কারও বাজারের তালিকাতেই বুদ্ধুকাকার নাম রহাকত না। ফলে পুজোয় আমাদের সবার একাধিক পোশাক, মা জেঠিমার বেশ ক’টি শাড়ি হত। কেবল বুদ্ধুকাকারই একসেট ড্রেস। ওটা নিয়েই দারুণ খুশি থাকত কাকা। পুজোর ক’টাদিন দিনরাত্রি ঐ পোশাকটাই পরে থাকত।

পয়লা বৈশাখেও অনেকটা একই ছবি। আমাদের সবার দামী পোশাক, বাবা ও জেঠুর জন্যে দামি পাঞ্জাবি এলেও কাকার জন্যে বরাদ্দ ছিল সবসময় পরার একটা ফতুয়া। সেটা পেয়েই কাকার কী খুশি! গায়ে চড়িয়ে গদগদ হয়ে বড়দের সাষ্ঠাঙ্গে প্রণাম করত। শিশুর মতো উচ্ছ্বাসে আমাদের বলত, ‘বুঝলিরে, নতুন কাপড়ের গন্ধই আলাদা।’  

এসব দেখে দেখে বড় হওয়া আমি। ফলে বুদ্ধুকাকার জন্যেও যে একটা কিছু কেনা উচিত ছিল, সেটা আমার মনেই আসেনি।

বাড়িতে গিয়ে যখন সবাইকে উপহারগুলো তুলে দিলাম, কাকাও সেখানে উপস্থিত। তাঁর জন্যে কিছু আনা হয়নি বুঝতে পেরে মা হঠাৎ কাকার পেছনে দাঁড়িয়ে আমাকে ইশারা করে বলে উঠেছিল, ‘ঠাকুরপোর জন্যে রবি ইচ্ছে করেই আনেনি। এখান থেকে ঠাকুরপোর পছন্দমতো কিনে দেবে বলেছে। বুঝলে ঠাকুরপো?’ 

ততক্ষণে আমিও ভুলটা বুঝে গিয়েছি। তাই মায়ের কথার লেজ ধরে বলে উঠলাম, ‘হ্যাঁ কাকা, তোমারটা এখান থেকে কিনে দেব ভেবেছি।’

বুদ্ধুকাকা হেহেহে করে হেসে বলেছিল, ‘দিস নে, দেওয়ার কি সময় চলে যাচ্ছে? কখন এত পোশাক পরি বল তো? এক গাদা জামা জমে আছে বাক্সে। পড়ে পড়ে নষ্ট হচ্ছে।’

এক গাদা জামা বাক্সে পড়ে থাকার গল্পটা যে অতিরঞ্জিত, সে কে না জেনে! তবু তখনকার মতো কাকার কথায় স্বস্তি পেয়েছিলাম।  বুঝেছিলাম, দায়মুক্ত হয়েছি। কাকা মনে কিছু করেনি। তবে হ্যাঁ, পুজোতে আর ভুল করিনি। কাকাকে একটা শার্ট দিয়েছিলাম।

কাকাকে আমরা সবাই তরকারিতে তেজপাতার মতো গণ্য করতাম। থাকলে ভালো, না থাকলেও সমস্যা নেই। কিন্তু আমাদের ধারণা যে ভুল, সেটা প্রমাণ হল যেবার কাকা কোমরের হাড় ভেঙ্গে বিছানা নিল। বুঝলাম তেজপাতা নয়, তরকারিতে লবনের মতোই আমাদের সংসারে দরকারি কাকা। কাকা বিছানা নেওয়ায় বাড়ির তখন একেবারে বেহাল অবস্থা। দীর্ঘদিনের অনভ্যাস হেতু সংসারের ভারী ভারী কাজগুলো সারতে গিয়ে মা ও জেঠিমার নাজেহাল পরিস্থিতি। পাত সাজিয়ে খাওয়া, যখন যেমন ইচ্ছে টিফিনের ফরমায়েশ, চব্যচোষ্যের আবদার, সবসময় ঝকঝকে ইস্তিরি করা পোশাক পরা, সব স্থগিত হয়ে গেল অনির্দিষ্ট কালের জন্যে। প্রায় মাস তিনেক পরে কাকা যখন কিছুটা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরল, ঘরটাও আবার আগের ছন্দে ফিরতে শুরু করল।

সময়ের সঙ্গে বাড়ির চিত্রপটও বদলের প্রক্রিয়ায় চলছিল। আমার জেঠতুতো দাদা অস্ট্রেলিয়ায় সেটেল করে জেঠু ও জেঠিমাকেও সেখানে নিয়ে গেল। বাড়িতে থেকে গেল শুধু আমাদের পরিবার। একসময় আমার এবং বোনেরও বিয়ে হয়ে গেল। বাড়িতে থাকার মধ্যে তখন কেবল মা বাবা এবং কাকা। আমি থাকি কর্মস্থল মুম্বাইতে। আমার স্ত্রী অনিমা একটা স্কুলে শিক্ষকতা করে। সন্তানসম্ভবা থাকাকালীন কিছু কমপ্লিকেসি দেখা দিয়েছিল অনিমার। কমপ্লিট বেডরেস্টে থাকতে বলেছিল ডাক্তার। তখন আমি বাড়ির থেকে কাকাকে আমার এখানে নিয়ে আসি। এরপর আমাদের ছেলে রেহান এল। কাকার প্রয়োজন আরও বেড়ে গেল। শুধু রেহানের দেখাশোনাই নয়, পুরো সংসারই সামলাতে লাগল কাকা। কাকার কাছে ছেলেকে নিশ্চিন্তে রেখে চাকরিটা চালাতে পারছিল অনিমাও। রেহানও আমাদের থেকে ছোটদাদুরই লেজ ধরা ছিল বেশি।

রেহানের যখন সবে ছ’বছর চলছে, তখন আকস্মিক মা মারা গেলেন। বাবা একেবারে একা হয়ে গেলেন। অগত্যা শ্রাদ্ধকাজ সেরে ফেরার সময় কাকাকে আর সঙ্গে আনলাম না। কাকা থেকে গেল বাড়িতেই, বাবার সঙ্গে। আমাদের খুব অসুবিধে হয়েছিল কিছুদিন। রেহানও খুব কান্নাকাটি করত। ছোটদাদুকে ছেড়ে থাকতে খুব কষ্ট হয়েছিল বেচারার। পরে অবশ্য মেনে নিয়েছে। এমনিতে রেহান খুব বোঝদার ছেলে। যদিও একটু অন্তর্মুখী এবং স্বল্পভাষী। বাবা মা উভয়েই চাকরি করে বলে ওকে অনেকটা সময় একা থাকতে হয় বাড়িতে। নিজের কাজও নিজেকেই করে নিতে হয়। ফলে খুব তাড়াতাড়ি স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছে।

রেহানের এখন ষোল বছর বয়স। সদ্য মাধ্যমিক দিয়েছে। ছবি আঁকা ওর নেশা। এরই মধ্যে রাজ্যস্তরের এক অঙ্কণ প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে সে। সার্টিফিকেট, ট্রফি এবং তিন হাজার টাকার ক্যাশ প্রাইজ পেয়েছে। সেই টাকার থেকে গেল রবিবার লাঞ্চে অনলাইনে বিরিয়ানি আনিয়ে খাওয়াল আমাদের। ছেলের সাফল্য অর্জিত টাকায় আনা বিরিয়ানির স্বাদই যে আলাদা, সে তো বলাই বাহুল্য।

রেহানের পড়াশোনা এবং নিজেদের চাকরির ব্যস্ততার দরুন অনেকদিন বাড়িতে যাওয়া হয়নি। সে জন্যে ওর পরীক্ষার পরেই প্ল্যান করে বেরিয়ে পড়েছি। পয়লা বৈশাখ সামনে। তাই আসার আগে বাবার জন্যে চিকনের কাজ করা কুর্তা ও পাজামা কিনলাম। বুদ্ধুকাকার জন্যেও কিনলাম। ফুটপাথ থেকে সস্তার একটা ফতুয়া।  

বাড়ি পৌঁছে বাবা ও কাকার হাতে তাঁদের জন্যে আনা কাপড়গুলো তুলে দিল অনিমা। আমার বাবা রাশভারী মানুষ। খুশি বা আনন্দের তেমন বহিঃপ্রকাশ নেই। কিন্তু রংচঙে ফতুয়াখানা পেয়ে কাকা যারপরনাই খুশি। আনন্দে তখনই খুলে পরে নিল সে। আর তখনই খেয়াল হল, জামার পেছনে মস্ত গোলাকার এক ছিদ্র। ভাঁজ করা ছিল বলে কেনার সময় নজরে পড়েনি। বুঝতে বাকি রইল না, ঠকিয়ে দিয়েছে ফুটপাথের দোকানি। একেই বলে সস্তার তিন অবস্থা। আমি ও অনিমা দুজনেই অপ্রস্তুত। তবে অনিমা আমার চাইতে চালাক। নিখুঁত অভিনয়ে বিলাপের সুরে বলে উঠল, – “ইশ! এত দামী জিনিসটা আমাদের ঠকিয়ে দিল? ভাবতেই পারছি না।”

যদিও এতে না ভাবতে পারার কিছুই নেই। না এটা দামী কাপড়, না আমাদের খুব বেশি ঠকিয়েছে। অত কম দামে কেনার সময় আমাদেরই বোঝা উচিত ছিল, এত সস্তায় যখন দিচ্ছে, নিশ্চয়ই কোনও গড়বড় আছে।

কিন্তু যাকে নিয়ে ভয় ছিল, সেই বুদ্ধুকাকার মোটেই ভাবান্তর নেই। বরং মুখে স্বভাবসুলভ হাসি খেলিয়ে বলে উঠল, – “ও তুমি ভেবো না বৌমা। দরজিকে দিয়ে তালি বসিয়ে দিব্যি পরা যাবে।”  

আমি ও অনিমা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছিলামই, অমনি রেহান প্রায় গর্জে উঠল, – “না, ঐ জামা তুমি আর পরবে না ছোটদাদু।”

এরপরেই ছুটে গিয়ে নিজের স্যুটকেস থেকে একটা প্যাকেট নিয়ে এল। তারপর সেটা খুলে বের করল দামী একজোড়া কুর্তা পাজামার সেট। আমাদের বিস্ফোরিত চোখের সামনে সেটা কাকার হাতে তুলে দিতে দিতে রেহান বলল, – “তুমি এই ড্রেসটা পরবে ছোটদাদু। আমার প্রাইজের টাকায় শুধু তোমার জন্যে এটা কিনেছি আমি।”

স্তম্ভিত আমরা। তিনজোড়া বিস্মিত চোখ রেহানের দিকে তাকিয়ে আছে। কাকা কাপড়টা হাতে নিয়ে পলকের জন্যে স্থাণু হয়ে গেছে। তাঁর পরেই কাঁপা কাঁপা স্বরে বলে উঠল, “আ-আমার জন্যে এনেছিস ভাই! শুধু …শুধু আ-আমার জন্যে? এত ভালোবাসিস আমাকে?” এঁর পরেই রেহানকে জড়িয়ে ধরে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল কাকা।

রেহানও জড়িয়ে ধরেছে ওর আদরের কাকাদাদুকে। চোখে জল ওরও। বলে চলেছে, “তুমিই তো আমাকে প্রথম আঁকতে শিখিয়েছ কাকাদাদু। মনে আছে? স্লেটে ফুল পাখি মাছ … কত কী একে দিতে তুমি? আর আমি সেগুলো দেখে আঁকার চেষ্টা করতাম। মনে আছে তোমার? আবার আমাকে পড়তে, লিখতেও তো তুমিই শিখিয়েছ। তুমিই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছ। তা হলে তোমার জন্যে না আনলে আর কার জন্যে আনব?”

উপস্থিত বাকি তিনজন বুঝতে পারছিলাম, এই দাদু ও নাতির মাঝে আমরা ব্রাত্য। তবু কেন কে জানে, বড় ভালো লাগছিল। অনুভব করলাম, বুকের থেকে একটা বড় ভার নেমে যাচ্ছে।

জীবনে এই প্রথম বুদ্ধুকাকাকে কাঁদতে দেখছি। কাকাও তা হলে কাঁদে! আসলে এত কাছে থেকেও যে মানুষটিকে চিনিনি আমরা, চিনতেই চাইনি, তাঁকে কচি বয়সেই রেহান ঠিক চিনে নিয়েছিল।   

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *