travel-pahar-r-lake

পাহাড় আর লেকের অনুপম যুগলবন্দীঃ আর্থ গোল্ডাউ
ছন্দা বিশ্বাস

মাউন্ট রিগি


 নাম শুনে যার এত প্রেম জাগে

সুইজারল্যান্ডের একটি জনপ্রিয় শহর, আর্থগোল্ডাউ। নামটা শুনে জায়গাটার প্রতি ভালবাসা জন্মে।

সুইজারল্যান্ড থেকে ইতালি যাওয়ার পথে পড়বে এই স্টেশনটি।

সেবার রোম ভ্রমণের সময় হাতে সময় কম থাকায় যাওয়ার সময় নামতে পারিনি। ট্রেনে বসেই মনে মনে ঠিক করে ফেলি ফেরার পথে একবার নামতেই হবে।

তাই আগে রোম ঘুরে ফেরার পথে নেমে গেলাম আর্থগোল্ডাউতে। আমাদের যাত্রাসূচীতে জুরিখ থেকে ট্রেন পাল্টাতে হবে ফ্রাংকফুর্ট যাওয়ার জন্যে। আর্থগোল্ডাউ থেকে জুরিখ যেতে মাত্র ত্রিশ মিনিট সময় লাগে ট্রেনে। দূরত্ব বাহান্ন কিলোমিটার। ইউরোপে ট্রেনে কিংবা বাসে এটা তেমন কোনো দূরত্বের ভিতরে পড়ে না। যেখানে পাঁচশ কিলোমিটার পথ অনায়াসে পাড়ি দিচ্ছি।

আর্থ একটা মিউনিসিপ্যালিটি শহর। একেবারে পিকচার কার্ডের মতো সাজানো গোছানো চমৎকার শহর। এই মিউনিসিপ্যালিটি গঠিত হয়েছে তিনটি ভিলেজ নিয়ে। আর্থ, ওবারার্থ এবং গোল্ডাউ ভিলে নিয়ে। স্টেশন চত্বর থেকে বেরিয়ে সামনের দিকে তাকাতেই নজরে পড়ল সুউচ্চ পর্বত, মাউন্ট রিগি। মাউন্ট রিগি আল্পস পর্বতমালার অন্তর্গত একটা পর্বত। এর সর্বোচ্চ অংশ হল, রিগি কুলম। রিগিকে বলা হয়,‘কুইন অফ দ্য মাউন্টেন

 

জুরিখ লেকের সৌন্দর্য


আলো
ঝিলমিল স্বপ্ন রঙিন

সকালের উজ্জ্বল রোদে ঝলমল করছে রিগি কুলাম। এখানে তিনটে বিখ্যাত লেক আছে,- লেক লুসার্ণ, লেক জুগ এবং লেক লুর্জ। মধ্য সুইজারল্যান্ডের ভিতরে অবস্থিত এই রিগি পর্বত। উচ্চতা ,৮৯৯ ফুট। এর আগে লুসার্ণ লেক দেখে এলাম। লুসার্ণ থেকে রিগি কুলমকে দেখে এসেছি। আল্পসের পদতলে লুসার্ণ লেক সমহিমায় বিরাজমান।

আর্থের পশ্চিমদিকে অবস্থিত এই রিগি পর্বত। এই পর্বতের ঢালে অবস্থিত রিগি কুলম, রিগি ফার্স্ট, রিগি কস্টারলি এবং রিগি স্টাফেলএই চারটে ভিলেজআর্থ মিউনিসিপ্যালিটি অংশ। মাত্র ষোল বর্গ মাইল এলাকা নিয়ে এই আর্থ মিউনিসিপ্যালিটি গড়ে উঠেছে। যার চল্লিশ শতাংশ কৃষিভূমি, ছেচল্লিশ শতাংশ অঞ্চল জুড়ে আছে বনভূমি এবং বাকি আট শতাংশে জন বসতি গড়ে উঠেছে। বাকি যে ক্ষুদ্র অংশ আছে সেখানে নদী, পাহাড়, হিমবাহ ইত্যাদি। শোয়েজ জেলা এবং শোয়েজ ক্যান্টনের অন্তর্গত এই আর্থ শহর।

ট্রেনে আসার পথে দেখা যাচ্ছিল স্বচ্ছ নীল জলের হ্রদটিকে। এটাইলেক জুগ রেল লাইন এই লেকের পাড় ধরে এগিয়ে চলেছে। রেল লাইন আর সড়ক পথ পাশাপাশি। এই পথ ধরে ছুটে চলেছে ট্রেন, বাস এবং আরো নানা যানবাহন। দৃষ্টিনন্দন এই লেক দেখতে দেখতে যাত্রা পথের ক্লান্তি উধাও হয়ে গেল। শিল্পীর নিখুঁত তুলিতে আঁকা এই লেক জুগ। যেন আল্পসের সঙ্গে গল্প করতে করতে করতে লেক এগিয়ে চলেছে। পাহাড়ের ঢালে ছবির মত সব ঘরবাড়ি। চোখের পলক ফেলতেও ইচ্ছা করছে না। উজ্জ্বল নীলাকাশের সমস্ত নীল রং যেন লেকের গায়ে জড়িয়ে একাকার হয়ে গেছে। লেকের জল এমন ঘন নীল দেখে নয়ন মন সার্থক হয়ে গেল। কোনো কষ্টকেই এখন আর কষ্ট বলে মনে হচ্ছে না।

যদিও ইউরোপ ভ্রমণে ট্রেন কিংবা বাস জার্ণিতে কখনো তেমন কষ্ট হয় না। শীততাপ নিয়ন্ত্রিত এবং ঝাঁকুনি বিহীন ট্রেনে গল্প করতে করতে এগিয়ে চলেছি।

আমাদের সঙ্গে পরিচয় হল একজন রেলওয়ে অফিসারের। আমাদের কতাহ শুনে তিনি এগিয়ে আসেন। বলেন, আপনারা কি বেঙ্গল থেকে এসেছেন?

আমরা হেসে জানাই, কলকাতা থেকে আসছি।

ভদ্রলোকের পরিষ্কার বাংলা শুনে আমরা উৎসাহিত হয়ে জিজ্ঞেস করি, আপনি এখানে চাকরি করেন দেখছি? কোথায় বাড়ি আপনার?

ভদ্রলোক জানালেন, কুড়ি বছর আগে তিনি ঢাকা থেকে ইতালি এসেছিলেন চাকরি করতে। বর্তমানে মিলানে থাকেন স্ত্রী পুত্র কন্যা সহ। মিলান টু রোম এই রুটে তাঁর ডিউটি পরে।

কত মানুষের সঙ্গে রোজ দেখা হয় কথাবার্তা হয়।

আমাদের সঙ্গে বেশ কিছু সময় গল্প করলেন। আমরা ফ্লোরেন্স, রোম, ভেনিস এবং মিলান সম্পর্কে অনেক তথ্য দিলেন। কথা প্রসঙ্গে তিনি আর্থ গোল্ডাউ শহরটির কথা বললেন। এমন সুন্দর শহর না দেখে ফিরে যাওয়াটা সত্যি দুর্ভাগ্যের। তাই ভদ্রলোকের কথা রাখতে ফেরার সময় একটা দিন এখানে কাটাবো মনস্থির করে ফেলি। ভদ্রলোক এতটুকু বাড়িয়ে বলেননি দেখলাম।

পথের দুই ধারে এমন মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যে মগ্ন থেকে ভুলেই গেলাম কত পথ পেরিয়ে এসেছি। প্রতিদিনই প্রায় ছয়শসাতশ কিলোমিটার পথ ঘুরে বেড়াচ্ছি। এক দেশ থেকে থেকে আর এক দেশ এক রাজ্য। এক শহর থেকে অন্য আর এক রাজ্যের শহরে চলে যাচ্ছি কিন্তু কখনও কোনোরকম ক্লান্তিবোধ করছি না। সারাটাদিন বিশ্রামের ফুরসৎ নেই। ঘোরাঘুরির মাঝে খাওয়ার সময়ে যতটুকু বিশ্রাম হচ্ছে সেইটুকুই অনেক। অথচ আমাদের দেশে এর দশ শতাংশ পথ অতিক্রম করতে গিয়ে হাঁসফাঁস করি। মনে হয় কখন হোটেলে নয়তো বাড়িতে ফিরব।

আর্থ গোল্ডাউ ১


যেখানেই
হাত ছোঁবে সে নদীগিরির
অজ্ঞাত শিল্পীর আঁকা দৃশ্যের বিস্ময়

স্টেশন থেকে বেরিয়ে পা রাখলাম আর্থগোল্ডাউতে। কয়েক মিটার যেতেই চোখে পড়ল অদূরেই জুগ লেক। এই প্রথম খুব কাছ থেকে দুই চোখ ভরে দেখতে লাগলাম জুগ লেককে। এই লেককে ঘিরে গড়ে উঠেছে অপূর্ব সুন্দর এই আর্থগোল্ডাউ শহর।

হ্রদের দক্ষিণ তীরে অবস্থিত আর্থ শহরটি। বেশ সাজানো গোছানো একেবারে ছবির মতো সুন্দর শহর। যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা হ্রদ, পাহাড় আর সবুজ উপত্যকা। হ্রদকে ঘিরে গড়ে উঠেছে জনবসতি, দোকানবাজার, অফিসকাছারি। লেকের ধারে গড়ে উঠেছে চোখ ধাঁধান সব হোটেল। লেকের জলে ভাসমান বাহারি ক্রুজে রাত্রিবাসের ব্যবস্থা। এক রাতের ভাড়া ত্রিশ থেকে চল্লিশ ডলার। পর্যটকদের জন্যে সাজানো হয়েছে এই সব বাহারি ক্রুজগুলো। ভিতরে ঢুকলে বোঝা যায় কেমন বিলাস বহুল এর কক্ষগুলো। পাঁচতারা, সাত তারা হোটেলের মতো আভিজাত্যে মোড়া। সমস্ত রকম বিনোদনের উপাদান সাজানো আছে। ফেল কড়ি, মাখো তেলএমনই সব ব্যাপার।

হোটেল ব্যবসা সুইজারল্যান্ডের একটি প্রধান অর্থকরী ব্যবসা। আর্থে মানুষ স্রেফ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন। সারাদিন ঘুরে ঘুরে দেখেও আশ মেটে না। এখানকার অধিবাসীদের লেক কেন্দ্রিক জীবন। লেকের নীল জলে গোটা আকাশ যেন হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। অসংখ্য ছোটো বড়ো সুন্দর সুন্দর পাল তোলা নৌকা ভেসে বেড়াচ্ছে যাত্রীদের নিয়ে। চলেছে সাদা রঙ্গের বাহারি ক্রুজগুলো। লেকের জলে সাঁতার কাটছে রাজহাঁস। মহানন্দে জল বিহার করছে পর্যটকরা। লেকের ধারে নানা মরসুমি ফুল নজর কাড়ছে।

সারাটাদিন কেউ শহরের বাজার চত্বরে দোকানগুলোতে ঢু দিচ্ছে, পসারিদের সঙ্গে বিভিন্ন জিনিস নিয়ে দরদাম করছে, কেউ ক্রুজে চেপে ঘুরছে, কেউ বোটিং করছে। পর্যটকেরা শহরটাকে দেখছে বিভিন্ন কোণ থেকে। ঘুরতে ঘুরতে বেশ কিছু মাল বোঝাই নৌকা নজরে পড়ল।

ক্রুজ ঘাটে বেশ ব্যস্ততা দেখলাম। আর্থের রাস্তাঘাট, উদ্যান, ঘরবাড়ি সবই ছবির মতো। অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন শহর এটা। লোক সংখ্যা জায়গার অনুপাতে অনেকই মনে হল। এমন জন ঘনত্ব দেখে শহরের অর্থনৈতিক পরিকাঠামো সহজেই আন্দাজ করা যায়। মূল শহরের কেন্দ্রে যা কিছু দোকানপাট, রেস্ট্যুরেন্ট এবং অফিস। লোকজন খুবই ভদ্র, শান্ত এবং স্বল্পবাক, রুচিশীল। আর্থ গোলাডাউয়ের বাড়িঘরগুলো খুব সুন্দর। সুন্দর সাজানো গোছানো বাড়িগুলো।

ঘুরতে ঘুরতে পাহাড়ের অনেকটা উপরের দিকে চলে আসি। অনেকটা বাগান ঘিরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রায় হাজার দুয়েক বাড়ি। সর্বসাকুল্যে দেড় হাজার পরিবারের বাস। কোনো পরিবারের লোকসংখ্যা মাত্র এক জন। মোট জন সংখ্যা মেরে কেটে বারো হাজার। আয়তনের তুলনায় খুবই সামান্য। বিভিন্ন ভাষাভাষীর মানুষের বাস এখানে। কিছু জার্মান ভাষী কিছু আলবেনিয়ান এবং কিছু আছেন ক্রোয়েশিয়ানভাষী মানুষ।

আর্থ গোল্ডাউ স্টেশান ১


খুলে
দিই কপাটের খিল

আর্থ গোল্ডাউ স্টেশনে পা রেখে চারিদিক এক নজর দেখে নিয়েছিলাম। শান্ত নিস্তরঙ্গ একটি পাহাড়ি স্টেশন। লোক সংখ্যা সীমিত হলেও আর্থ গোল্ডাউ স্টেশনের গুরুত্ব কম নয়। প্রতিদিন বিভিন্ন দিকের প্রচুর ট্রেনে চেপে হাজার হাজার মানুষ এই স্টেশনের উপর দিয়ে চলাচল করেন। সুইজারল্যান্ডের মানুষ এমনিতেই বেশ শান্ত, রুচিশীল এবং পরিচ্ছন্ন। কোনোরকম হৈচৈ ঝুট ঝামেলা পছন্দ করে না। তাদের চেহারা এবং চলাফেরার ভিতরে অপূর্ব সংযম আর পরিচ্ছন্নতা লক্ষ করেছি। যে যার নিজের কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকে।

রোমে যাওয়ার পথে সেই বাঙ্গালি অফিসারবাবুর মুখে শুনলাম এই আর্থ গোল্ডাউ স্টেশনটি সুইস ফেডারেল রেলের অন্তর্গত। এটি এটি গুরুত্বপূর্ণ রেল জংশন। ভোরাল পেন এক্সপ্রেস ট্রেন লুজার্ণ আর গ্যালেনের সঙ্গে সংযোগ করে দেয়। আমরা লুসার্ণ থেকে ইতালি যাব ঠিক ছিল। পরে সিদ্ধান্ত পাল্টাই। এখান থেকে একদিকে যেমন সুইজারল্যান্ডের লুগানো, জুগ, জুরিখ, বাসেলের ট্রেন যাতায়াত করে। অন্যদিকে তেমনি ইতালির বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার ট্রেন এই পথেই যাচ্ছে।

আর্থ গোল্ডাউ আছে সুন্দর দুটি ক্যাথলিক চার্চ। একটি ক্রিস্টান ক্যাথলিক চার্চ এবং অপরটি হল রোমান ক্যাথলিক চার্চ। বেশির ভাগ মানুষ রোমান ক্যাথলিক ধর্মে দীক্ষিত। খুব কম সংখ্যক মানুষ আছেন যারা খ্রিস্টান ক্যাথলিক ধর্মী। মোট জন সংখ্যার মাত্র আড়াই শতাংশ মানুষ অর্থোডক্স। হাতে গোণা কয়েকজন হলেন ইহুদি। বাকী সামান্য কিছু ইসলামভাষী মানুষ। ঝকঝকে দিন, নীল আকাশে সাদা মেঘেদের ভেসে চলা সবই লেকের জলে চোখ রেখে দেখতে পাচ্ছি। একদিকে ঢেউ খেলান পাহাড়ের অপূর্ব সৌন্দর্য অন্যদিকে শহরের সুন্দর সুন্দর ঘর বাড়ি দোকান পাট পার্ক, সব যেন ছবির মতো।

হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা পথ চলে আসি। লেকের পাড়ে নানা ধরনের ফুলে সেজে উঠেছে। পর্যটকেরা  আর্থের এই অবর্ণনীয় সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েই বেড়াতে আসে। সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন গ্রাম কিংবা শহরে ভ্রমণ মানেই এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা। ঐতিহাসিক এবং ভৌগলিক গুরুত্ব থাকলেও সুইজারল্যান্ড বিখ্যাত এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যেই। পথ চলতে চলতে যে কোনো জায়গার ছবি চোখ বন্ধ করে তুললে সেটাই মনে হবে অসাধারণ। আর্থ গোলডাউ তেমনি একটা জনপদ। লেক, পাহাড় আর শহরের ত্রয়ী বন্ধন জায়গাটাকে অপূর্ব মাধুর্য দান করেছে। পাহাড়ের গায়ে সাজানো ঘর বাড়ি, সবুজ গাছে ঢাকা উপত্যকায় চরে বেড়াচ্ছে গবাদি পশুর দল। বছরের অধিকাংশ সময়ে বরফে ঢাকা থাকে রিগ পর্বত। রিগ যদিও আমাদের হিমালয়ের মতো উঁচু নয় তবু এর অনন্য সাধারণ রূপ পর্যটকদের মুগ্ধ করে। 

জুগ লেকের অপরিসীম সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়নি এমন হতে পারে না। এমন গাঢ় নীল জলরাশি এর আগে লেক লুসার্ণ এবং জেনেভা লেকে দেখেছিলাম। সুইজারল্যান্ডে ছোট বড় মিলিয়ে কয়েকশলেক আছে।

প্রতিটা লেকই সৌন্দর্যে অতুলনীয়। এই শহরের অন্যতম আকর্ষণীয় বিষয় হল হ্রদ এবং মাউন্ট রিগি।

এই রিগি পর্বতকে নিয়ে অসংখ্য গল্প, উপন্যাস, চিত্রকলার জন্ম হয়েছে। স্বয়ং মার্ক টোয়েন সুইজারল্যান্ড ভ্রমণে এসেছিলেন ১৮৭০ সালে। তিনি তাঁর ভ্রমণ কাহিনিতে লিখে ফেললেন ‘A tramph Abroad’ রিগি কুলামে একটা বিখ্যাত রিসর্ট আছে যার নামক্যাটসকিলস রিসর্ট‘ (CATSKILLS RESORT)

এইক্যাটসকিলসরিসর্টকে নিয়ে আব্রাহাম ক্যাহন্স লিখে ফেলেন বিখ্যাত উপন্যাস, ‘The Rise of David Levinsky’(1917) 

নতজানু হয়ে কারো পদতলে বসি ইচ্ছে হয়

আমরা সেপ্টেম্বরের শুরুতে ইউরোপ ভ্রমণে বের হই। জার্মানির বেশ কিছু শহর ঘুরে ফ্রান্স এবং তারপরে সুইজারল্যান্ডে আসি। এখানে শরৎকাল। আকাশ মেঘমুক্ত, ঝকঝকে। গাঢ় নীল আকাশের বুকে ক্রীড়ারত মেঘ হরিণীর দল। হেমন্ত আসতে খুব দেরী নয়। তখন আল্পস পর্বতমালা ছিল বরফমুক্ত। পর্বতগাত্রে সবুজ উপত্যকাভূমি নজরে পড়ল। কর্মসূত্রে আমার ছেলে সুইজারল্যাণ্ডে থাকে। তাই প্রতি বছর একবার ইউরোপে আসি। অক্টোবরের পর থেকে শুরু হয় বরফ পরা। আস্তে আস্তে গোটা আল্পস ঢেকে যায় বরফের চাদরে।

শুধু আল্পস কেন গোটা সুইজারল্যান্ড মুড়ে যায় বরফে। তখন এই সব অঞ্চলকে মৃত জগৎ মনে হয়। পাইন, ফার, মেপল গাছগুলো যেন এক একজন টোপর পরা বর। গোটা জনপদ, বনভূমি, লেক, উপত্যকা সমস্ত অঞ্চল পুরু বরফের আচ্ছাদনে আবৃত। সে এক অবর্ণনীয় সৌন্দর্য। কোনোটার সঙ্গে কোনোটার তুলনা করা যায় না। শীতের সময়ে একবার তুষার ঢাকা আল্পস এবং সুইজারল্যান্ডকে দেখালাম। সেই সৌন্দর্য বর্ণানাতীত।

এবারে শরৎকালের শেষের দিকে আর্থে ঘুরতে ঘুরতে প্রকৃতির অন্য এক রূপ প্রত্যক্ষ করি।

গোটা একটা দিন ঘুরে কাটালাম এই কাব্যময় শহরে। খুব শান্ত কোলাহল বর্জিত এই আর্থ গোল্ডাউ। এর শান্ত নীরব পরিবেশ, এখানকার মানুষের ধীর স্থির চলাফেরা, নিরীহ ছন্দময় জীবন যাপন আমাকে সুদূর অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। যেখানে যান্ত্রিক জীবনের কোলাহল, জীবন সংগ্রাম, হানাহানি অনুপস্থিত। নিত্যকার কঠিন জীবন ঘিরে ঘনীভূত লোভ, প্রতিযোগিতা থেকে বহুদূরে এক শান্ত নিরিবিলি তীর্থভূমি। সুন্দর প্রকৃতির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ এই শহর তার অধিবাসী আমার হৃদয়ে স্থায়ী আসন পেতে রাখল। অনেকটা সময় কাটিয়ে মন অপার আনন্দে ভরে উঠল। সামনে সুমহান আল্পস, যতদূর চোখ যায় শ্যামল শোভা ছড়িয়ে আছে। ধ্যান গম্ভীর আল্পসের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হল হাতে গোণা এই ক্ষুদ্র জীবনে এত লোভ হিংসাবিদ্বেষকপটতা সত্যিই অর্থহীন।

দুদণ্ড শান্তি যদি নাই পেলাম তাহলে কিসের এই মানব জীবন। কারো আনন্দ লুকিয়ে আছে অন্যের হিত সাধনে, নিজেকে উজাড় করে দিচ্ছে পরের জন্যে, কেউ আবার বিত্তের বাসনায় মগ্ন।

কারো জীবন কেটে যায় পৃথিবীর রূপরস আস্বাদনে আবার কেউ লোক জীবন থেকে সংগ্রহ করে বিষ। কেউ হয়ে ওঠে মধুকর আর কেউ হয় ভ্রমর। এমন স্নিগ্ধ পরিবেশে খুব বেশি সময় কাটালে মনে এক দার্শনিক প্রতীতি জন্মায়। প্রকৃতিই যেন তার মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে ধরে। বলে, ‘যেতে নাহি দিব

আরো কিছুটা সময় কাটাতে পারলে সত্যি খুব ভাল লাগত। হাতে সময় খুবই অল্প। সামান্য সময়কে সম্বল করেই চলে গেলাম রিগি কুলামে। মাত্র এক ঘন্টার রাস্তা। এখান থেকে বরফে মোড়া রিগি পর্বতকে খুব সুন্দর দেখা যায়। এখান থেকে আল্পসের ৩৬০ ডিগ্রি প্যানোরামিক ভিউ পাওয়া যায়।

ইউরোপের প্রাচীন রেলপথ ধরে যাওয়া এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। মাউন্ট রিগিকে বলা হয় পাহাড়ের রানি। সময় থাকলে আরো কিছু ধনঐশ্বর্য সঞ্চয় করে নিয়ে আসতাম। সময় সংক্ষিপ্ত। হাতে গোণা দিন। প্রতিটা ঘণ্টা হিসাব করে চলতে হচ্ছে। তবু যতটুকু বৈভব সঞ্চয় করলাম তার সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনা চলে না।

প্রকৃতির এই রূপের কাছে সমস্ত অর্থ, বিত্ত তুচ্ছ। কী দাম আছে অর্থের? প্রকৃতি পূজারীদের কাছে এই বিত্তের সমকক্ষ আর কিছু হতে পারে না।

 

লেক লুর্জ


নক্ষত্ররাজি
গেছে আকাশে সোনালি শিল্প রুয়ে

অবশেষে বিদায় জানাতে হল আর্থগোল্ডাউকে। প্রায় দৌড়ে এসে ট্রেন ধরতে হল। ট্রেনে পা দিতেই দরজা বন্ধ হয়ে গেল। এখানে একেবারে ঘড়ির কাঁটা ধরে ট্রেন আসে এবং ট্রেন ছেড়ে দেয়। ধন্যবাদ জানাতে হচ্ছেডি বিঅর্থাৎডয়েস বান’(DOYES BAHN) সংস্থাকে। এটি হল জার্মানির দ্বিতীয় বৃহত্তম পরিবহন সংস্থা। এত হাজার হাজার মাইল ভ্রমণ করে এলাম কোথাও এর ব্যতিক্রম ঘটতে দেখিনি। সময়ের ব্যাপারে এরা এতটাই সচেতন। যদি কখনো দুই চার মিনিট পথে লেট করে সেটাও গতির সঙ্গে সমঝোতা রেখে নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেবে।

ট্রেন আস্তে আস্তে গতি বাড়াতে লাগল। দীর্ঘ বেলা ক্রমে সন্ধের কাঁধে মাথা রাখল। একটু একটু আল্পস, লেক দূরের জলছবি সব আঁধারে ঢেকে গেল। সোনার জরিতে বাদশাহী কারুকাজ করা আলোয়ান গায়ে জড়িয়ে আলপ্স রাতের মৌতাতে মগ্ন এখন।


পথসূচীঃ

দিল্লি থেকে ফ্রাংকফুর্ট। ফ্রাংকফুর্ট থেকে জুরিখ হয়ে ইতালি। জুরিখ থেকে আর্থ গোলডাউ মাত্র ত্রিশ মিনিটের রাস্তা। ট্রেন ছাড়াও নিয়মিত বাস চলছে।

আর্থ স্টেশানে নেমে কয়েক পা হাঁটলেই বাস স্ট্যাণ্ড। ট্রামে চেপে আর্থের বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া যায়। এছাড়া ট্যাক্সিও আছে।

 

লেক জুগ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *