short-story-sthobir-prithibi

স্থবির পৃথিবী
রাজশ্রী বসু অধিকারী

“আরে ও শ্যামাদাস, চললি কোথা? একটু দাঁড়িয়ে যা না বাপু” জানলার গ্রীলে গাল ঠেকিয়ে প্রাণপণ জোরে ডাকেন সুসীমবাবু। রাস্তা দিয়ে হন হন ছুটছিল শ্যামাদাস। ন’টা বারোর ননস্টপ বাসটা বেরিয়ে না যায়। অফিসে লেট হওয়াটা লজ্জার। কিন্তু জানলা থেকে কাতর ডাক ভেসে আসছে। অবহেলা করে এগিয়ে যাওয়া যায় না। শ্যামাদাস মুখের বিরক্তি সাবধানে মুছে কাছে এসে দাঁড়ায়।

“কাকু, অফিস যাচ্ছি। দেরি হয়ে গেছে ।”

“দেরি করিস কেন? ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠতে পারিস না? রোজ ঘুমের আগে একগ্লাস জলে দুচামচ বেকিং সোডা মিশিয়ে খাবি… ঘুম সক্কালবেলা ভাঙ্গবেই।”

শ্যামাদাস ছটফট করে। কানের ওপর ভাসন্ত অসম্ভব ঘুমভাঙ্গানিয়া প্রেসক্রিপশন ইগনোর করে বলে, “কাকু কিছু যদি দরকার না থাকে তো আমি যাচ্ছি। পরে আসব।”

“আরে না না, দরকার আছে বৈ কী। হোমিওপ্যাথি দোকানটা থেকে একশিশি বেলেডোনা এনে দিয়ে যা বাবা। বড্ড পেটে ব্যথা করছে কাল থেকে।”

নিরুত্তর শ্যামাদাস দৌড়ে সরে যায়। স্ট্যান্ডে এসে প্রায় ছুটন্ত বাসটা কোনমতে ধরে ফেলে হাঁফ ছাড়ে। দরকারি কথাটা শুনতে গেলে আজও বাসটা পেত না। মনটা একটু যে খচখচ না করছে তা নয় । কিন্তু কী বা করার ছিল!

ছেলেটা এত পাল্টে গেল কিকরে? সুসীমবাবু অবাক হয়ে চিন্তা করেন, যাকগে ভেবে আর কী হবে? অবক্ষয়ের যুগ! আবার জানলায় স্থিত হন পরবর্তী দৃশ্যের আশায়। তারপরেই একগাল হেসে উঁচু গলায় ডাকেন, “আরে ঝুন্টাই যে! কতদিন পর এলে মা! একবার এদিকে এসো, একটু দেখি তোমাকে! ছেলে তো বড় হয়ে গেল!”

ঝুন্টাই ছেলে কোলে নিয়ে জানলার কাছে এসে দাঁড়ায়, “কেমন আছেন, কাকু? পা টা এখন ঠিক আছে? হাঁটতে পারছেন তো?”

“ঐ চলছে মা। ঘরের মধ্যেই যেটুকু পারি…”

“ও ও ও… তাহলে তো খুব অসুবিধা।” ঝুন্টাই কথা বলতে বলতেই ছেলেকে একটা চাপড় মারে, “দেখুন না কাকু ছেলেটা খুব দস্যি হয়েছে। একটু দাঁড়াতে দেবে না। কথা বলছি দেখে ঘাড়ের কাছটা কেমন খিমচে ধরেছে। তার মানে হল বাড়ি চল, দিম্মা চল…”

“নরানাং মাতুলক্রমঃ। এই বয়সে তোমার বড়ভাই সোম ছিল একেবারে বিচ্ছু। একদিন করেছে কী বুঝলে…”

“কাকু, আমি পরে আসব। এখুনি বাড়ি যেতেই হবে। নাহলে ছেলে রেগে গিয়ে গায়েই পটি করে দেবে। কেমন কোঁত পাড়ছে…” বলতে বলতেই ঝুন্টাই পা চালিয়ে বাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। হতাশ সুসীমবাবু একা ঘরের ভেতরে পায়চারি করেন। ভাবলেন ঝুন্টাইয়ের অফিস নেই। পাশের পাড়ার শ্বশুরবাড়ি থেকে বাপেরবাড়ি এসেছে। ওর সঙ্গে কিছুটা গল্প করেও একটা ঘন্টা সময় কাটবে। তা কোলের ছেলেটাই টেনে নিয়ে গেল। কপাল সবই কপাল। নইলে কাজের বৌ বিন্দুই বা এত দেরি করবে কেন আসতে। ওর সঙ্গেও কিছুটা সময় কাটে।

খবরের কাগজও নেই আজ । কাল বিশ্বকর্মা পুজো গিয়েছে। কাগজ ছাপাই হয়নি। একবার চা খেয়েছেন। আরেক কাপ করে নেবেন কী? তাতে আবার শরীর খারাপ হবে না তো? এই একলা বাজারে তাহলে ভারি মুশকিল। ধুর একদিন খেলে কী আর হবে! ইলেক্ট্রিক কেটলিতে জল গরম করে তাতে একটা গ্রিন টি লিফ ফেলে দেন। সেটুকু করতে গিয়েও হাতে ছ্যাঁকা লাগে। গা হাত নাড়ানোর অভ্যাসটাই কেমন দুম করে চলে গেল। অথচ সারাজীবন কত কাজই না করেছেন। রিটায়ারের পর কী সবারই এমন হয়! 

চায়ে চুমুক দিতে দিতে আফশোস হয়। বয়সকালে একটা বিয়ে করলেই হত। তখনও এত মেয়ের আকাল ছিল না। দোজবড়ে তেজবড়ে হদ্দবুড়ো সবার জন্যই একটু খুঁজলে পাত্রী পাওয়া যেত। এই তো, অফিসের জুনিয়র কলীগ হরেনবাবুই তো তার ছোট বোনটাকে গছিয়ে দিতে কত চেষ্টাই করেছে। তিনিই ঘাড় পাতেননি। সে মেয়েও কি আর পড়ে আছে? চায়ের তলানিটুকু গলায় ঢেলে আবার পায়ে পায়ে জানলায় এসে দাঁড়ান। এই জানলাটাই জগৎ পৃথিবীর সঙ্গে একমাত্র যোগসূত্র। নইলে এতদিনে বেঁচে থেকেও নেই হয়ে যেতেন তিনি। সত্যি! ভাবলে অবাক লাগে। রিটায়ারের পর দুটো মাস গেল না একেবারে জনহীন প্রান্তর হয়ে পড়ল জীবনটা। সারাদিনে ওই রান্না কাজের বৌ বিন্দু ছাড়া আর একটা মানুষ পাওয়া যায় না কথা বলতে। অথচ এই সেদিন অবধি ছিল কত না ব্যস্ততা! পাড়ার লোকে তখন আসত যেচে পড়ে কিন্তু সময়ের অভাবে সুসীম কতরকম ফন্দিফিকিরেই না তাদের অ্যাভয়েড করতেন। 

ভাবনায় যতি পরে রাস্তার দিকে দৃষ্টি যেতেই। বাব্বা, ইস্তিরি প্যান্ট জামা পরে চোখে গগলস লাগিয়ে কে যাচ্ছে সামনে দিয়ে?  কেমন দুলকি চালে খোসমেজাজে চলেছে, কে এটা? বরুণ নাকি? মাথাজোড়া টাক। চকচকে গালে কিন্তু তার কোন আভাষ নেই। দিব্যি রসে টম্বুর মুখচন্দ্র। পিঠে আবার হাল আমলের ছোকরাদের মত একখানা ব্যাগও রয়েছে, যার নাম নাকি ব্যাকপ্যাক। সুসীম গলা ছেড়ে ডেকে ওঠেন, “ওহে ভায়া বরুণ, চললে কোথায় সেজেগুজে? চেনাই তো যাচ্ছে না!” 

বরুণ মাত্র বছরখানেকের ছোট হবে তার থেকে। বরাবর একই পাড়ার প্রতিবেশি, একই অফিস। এই বছরের গোড়াতেই রিটায়ার করেছে বরুণ সরকারি কেরানির পদ থেকে। তার ওপরের ছোট অফিসার হয়ে সুসীম গতবছর রিটায়ার করলেন।

শেষদিনের অফিসের পর ডাক্তারখানা বাদে সুসীম ক’দিন বাড়ির বাইরে গিয়েছেন গুনে বলা যাবে। একবছরের মধ্যেই চেহারাখানা হয়েছে যেন সাত কাল পেরোনো বৃদ্ধের মত। অথচ দেখো, এই বরুণকে তো যেন আবার বিয়ে দেওয়া যাবে। কেমন সুন্দর চকচকে দেখতে লাগছে। আবার একমুখ হাসি। বাহবা বাহবা বাঃ। কি করে হয় এমন আজব কাণ্ড! নাঃ, এই রহস্য তো জানতেই হবে। বরুণ কি শুনতেই পেল না? আরো জোরে ডাকেন সুসীম, “কই হে বরুণ, শোন একবার এদিকে। এই যে এখানে আমি…”

বরুণ ঠিকই শুনতে পেয়েছে। হাসি হাসি মুখ করে এগিয়েও এসেছে জানলার ধারে। মুখে কোন তাড়াহুড়ো বা বিরক্তির ছাপ নেই। তার মানে ওর হাতে সময় আছে। সুসীমবাবু খুশি হন।

“কী হে? চললে কোথায় ফুলবাবুটি সেজে? বড্ড চেকনাই ছেড়েছে তো!”

বরুণের মুখে লজ্জার আভা, “একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় যাচ্ছি দাদা। সত্যি বলছ, ভাল লাগছে আমাকে? মানিয়েছে এই পাঞ্জাবীটায়? বেখাপ্পা লাগছে না তো?” উদগ্রীব হয়ে সুসীমের মতামতের জন্য তাকিয়ে আছে বরুন। আহা, এতদিনের মধ্যে পাড়াশুদ্ধ লোকের কেই বা কোনো ব্যাপারে এভাবে সুসীমের মতামত জানতে চেয়েছে! বেশ খুশি হন সুসীমবাবু। না, রিটায়ার করলেও তার মতের এখনও দাম আছে সংসারে।

জানলা দিয়ে যতটা পারা যায় মুন্ডু ঝুঁকিয়ে বরুণকে আগাপাশতলা দেখে নিয়ে মাথা নাড়েন তিনি, “সবই ভাল কিন্তু ওই ময়লাটে কেডসখানা বাপু মানাচ্ছে না এই পোষাকের সঙ্গে। একটা ভাল চামড়ার নাগড়া টাগড়া পেলে না? সাদা চিকন কাজের চুড়িদার পাঞ্জাবির সঙ্গে সেটাই তো যাবে নাকি? কিচ্ছুই জান না দেখছি।”

বরুণ কাতর মুখে বলে, “ছিল তো। সবই ছিল। কিন্তু পা দু’খানা যে আমার বড্ড কোদাল কালো একেবারে। দেখা গেলেই নম্বর কাটা। বুটজুতো তো আর পড়া যায় না। তাই নরম কেডসটাই …”

“নম্বর? কিসের নম্বর? কোথায় যাচ্ছ বল তো তুমি?”

“ওহ হো সেটাই তো বলিনি তোমায়। যাচ্ছি ইন্টারন্যাশনাল অ্যাবাভ সিক্সটি বিউটি কম্পিটিশনে। জয়েনিংয়ের জন্য অবিশ্যি দিতে হয়েছে দশহাজার টাকা। কিন্তু একখানা প্রাইজ পেলেই এক লাখ পেয়ে যাব । সেই সঙ্গে গোয়া ট্রাভেল ফ্রি, তিন দিন দু’রাত দুজনের সব খরচ দেবে। তোমার বৌমা ওই লোভেই তো এতদিন ধরে বেসন মধু পচাকলার প্যাক মাখিয়ে কেমন ঝকঝকে করে তুলেছে আমাকে। চলি এখন কেমন? আমার জন্য একটু প্রে কর বরং।”

বরুন আত্মপ্রসাদের হাসি দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। সুসীমবাবু আবার পিছু ডেকে থামান, “কী বললে? কিসের কম্পিটিশন? বিউটি? এসব তো মেয়েদের জন্য হয় শুনেছি …”

“আরে না রে বাবা, বড্ড সেকেলে রয়ে গেলে তুমি দাদা। বিউটি এখন ছেলে মেয়ে বুড়ো বুড়ি সকলের। কাগজপত্তর দেখবে না, ঘর থেকে বেরোবে না, পাঁচ জায়গায় যাবে না, তুমি জানবে কি করে? আমি তো রিটায়ারের আগে থেকেই খোঁজ নিয়ে রেখেছিলাম। চাকরি শেষ হতে না হতেই বসে গেছি পচাকলার প্যাক নিয়ে।”

সুসীমবাবুর মুখ শুকিয়ে যায়। গলায় সুরসুর করে। মনটা বেশ খারাপ হয়ে যায় বরুনের হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে। ইসস, বয়সকালে সবাই তাকে কত হ্যান্ডসামই না বলেছে। সারাজীবন বিয়েও করেননি, কারুর কথায় কানও দেননি। কোনদিন এক মিনিটের বেশি আয়নার সামনে দাঁড়াননি। শুধুই টাকা গুনেছেন। এখন সব টাকা ফিক্সড রেখে ডাল রুটি খেয়ে জীবন কাটাচ্ছেন। সারাদিনে একটা কথা বলার লোক পাননা। ডেকে ডেকে লোকের দয়ার ওপর কন্ঠযন্ত্র সচল রাখা প্র্যাকটিস করেন। কিন্তু পুরনো লোকজন চলে গিয়ে পাড়া যেভাবে নতুন নতুন ফ্ল্যাটবাড়িতে ভরে যাচ্ছে, চারদিকে লাল নীল বেগুনী চুলওয়ালা অদ্ভুত ছাঁট লাগানো মাথার ভিড়, কতদিন এভাবে চলবে কে জানে!

শুকানো গলার ভেতর থেকে আর্ত প্রশ্ন বেরিয়ে আসে, “এখানে আমিও কী জয়েন করতে পারব বরুণ?”

বরুণ এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তার কান ষাট বছরের তুলনায় অবিশ্বাস্য রকমের ভাল। আবার ফিরে আসে সে। জানলায় মুখ লাগিয়ে বলে, “আবার সামনের বছর দাদা। তুমি বরং আজ থেকেই কলা চটকানো মাখা শুরু করে দাও। চুলটা আমি সঙ্গে নিয়ে গিয়ে ছাঁটিয়ে আনব। কিছু মডার্ন ড্রেস বাবদ হাজার দশেক টাকা নাহয় বের করে রেখো। ফিরতি পথে নিয়ে যাব। এবার আসি?”

সুসীমবাবুর মুখটা এখন ঠিক কেমন হয়েছে তিনি নিজেই জানেন না। আয়না দেখলে হয়তো তোলা হাড়ির সঙ্গে মিল পেতেন। বরুণ চলে গেছে অনেকক্ষণ। সেই থেকে আর জানলার দিকেও মন যায়নি। পচা কলা পেতে অসুবিধে হবে না। ডজন দরে কমদামে কিনলে তার মধ্যে দু একটা পচেই যায় প্রতি সপ্তাহে। কিন্তু পোষাকের জন্য দশহাজার? কভি নেহি। তাহলে কী করা যায়? তাহলে কী কোনদিনই উনি পারবেন না বিউটি কম্পিটিশনে যোগ দিতে? সুসীমবাবু মাথায় হাত দিয়ে চিন্তা করেন।

ভাবতে ভাবতেই বলিরেখাঙ্কিত মুখে হাসি ফোটে। কালই জানলা দিয়ে দেখেছিলেন একদল মেয়েকে। প্রত্যেকেই গামছার পোষাক পড়ে আছে। কেমন ধুতি শাড়ি ব্লাউজ পেটিকোট মেলানো মেশানো সেই পোশাক। সেসবের নাম টাম জানা নেই। আশ্চর্য্য হয়ে ভেবেছেন, গামছা দিয়ে তৈরি পোশাক! এমনও হয়! একটু বেশি তাকিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি যে ওদের দেখছিলেন বয়স্ক বলে সেটা কেউ রেয়াত করেনি। শুনিয়ে শুনিয়ে বলেছিল বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো। বলে একে অন্যের ঘাড়ে হেসে ঢলে পড়তে পড়তে চলে গিয়েছিল।

এখন কথাটা মনে পড়ায় নিশ্চিন্ত। খাটের তলার পুরনো ট্রাঙ্ক বেরিয়ে আসে। এতেই আছে মডার্ন ড্রেসের মেটেরিয়াল। বাবা মায়ের শ্রাদ্ধে বামুনদের দান করেও বাকি থেকে যাওয়া, নিজের ব্যবহারের জন্য সস্তায় হাট থেকে এক লটে কিনে ফেলা, এইসব করে বহু গামছা জমানো আছে। এগুলো দিয়ে একখানা মডার্ন ধুতি পাঞ্জাবির সেট তৈরি হয়েই যাবে। এবার শুধু পচা কলার অপেক্ষা। নাহয় বাজারে গিয়ে দেখে দেখে কয়েকটা পচা কলাই কিনে আনবেন। দুধ আর বেসনটা বিন্দুকেই বলবেন। ঐটুকুর জন্য কী আর পয়সা চাইবে? 

বহুদিনের স্থবিরতা ত্যাগ করে বাজারে যাওয়ার জন্য উঠে পড়েন সুসীমবাবু। রাস্তায় পা দেওয়া মাত্র পেছন থেকে ডাক ভেসে আসে, “ও কাকু, কোথায় চললেন!”

ঘাড় না ঘুড়িয়ে মাথার ওপর হাত নাড়েন তিনি, “একটু তাড়া আছে রে, পরে কথা বলব।” বাজারের দিকে এগোতে এগোতে মনে মনে বরুণকে ধন্যবাদ দিতেও ভোলেন না। ওর জন্যই আজ তার স্থবির পৃথিবীটা সচল হয়ে উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *