জ্যোতির্ময়
কামরুল হাসান বাদল
“নানাভাই, তুমি কি ইসকন?”
১২ বছরের আদিলার মুখে প্রশ্নটি শুনে ভেতরটা কেঁপে উঠল জ্যোতির্ময় চৌধুরীর। তবে তিনি তা বুঝতে দিলেন না। পাঠ্যপুস্তকের কোনো প্রশ্নের মতো স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার চেষ্টা করলেন। প্রতিদিন আদিলাকে পড়াতে বসে অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় তাঁকে। উত্তর জানা না থাকলেও তাতে তাকে বিচলিত হতে হয় না। তিনি ‘একটু সময় দাও’ বলে বই ঘেঁটে উত্তরটি বের করে বলতেন।
তবে আজ এমন একটি প্রশ্ন তাঁকে আমূল কাঁপিয়ে দিয়েছে।
তিনি আদিলার চোখের দিকে তাকাচ্ছেন না। তবে না তাকিয়েও বুঝতে পারছেন একজোড়া নিষ্পাপ চোখ গভীর আগ্রহে তার দিকে মেলে আছে। তিনি একবার কোনো বইয়ের পাতা ওলটাচ্ছেন তো একবার খাতা খুলে কিছু একটা দেখার ভান করছেন।
আদিলা আবার ডাকল, “নানাভাই।”
জ্যোতির্ময় সরাসরি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল, “হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন? ইসকন নামটা কোথায় শুনলে?”
“আমার ক্লাসের বন্ধুরা বলেছে, ‘ইসকন খুব খারাপ।’ সত্যি না-কি নানা ভাই?” চোখ দুটো স্থির রেখেই আবারও প্রশ্ন করল আদিলা।
“তাই?” আদিলার চোখের দিকে তাকালেন না জ্যোতির্ময়। টিউবলাইটের পাশে একটি টিকটিকি। আলোর আকর্ষণে লাইটের পাশে কোনো পোকা উড়ে এসে বসলেই টিকটিকি সেটা শিকার করছে। সেদিকে দৃষ্টি পড়তেই জ্যোতির্ময় ভাবলেন, কী বিচিত্র পৃথিবীর খাদ্য সার্কেল। সবসময় বড়দের খাদ্য হবে তার চেয়ে ছোটরা। দুর্বল অত্যাচারিত হবে সবলের দ্বারা। এই অমোঘ নিয়ম ভাঙবার কোনো শক্তি নেই মানুষের। প্রাণীদের মধ্যে একমাত্র মানুষ যারা এ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটাতে চায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারে না। উপমহাদেশের বিখ্যাত লেখক ইশমাত চুগতাইয়ের উক্তিটি মনে পড়ল, “দুনিয়া মে সিরফ দো হি জাতেঁ হ্যায়—এক ওহ জো সুততি হ্যায় (শোষক), অউর দুসরি ওহ জিসকা সুষণ হোতা হ্যায় (শোষিত)।” জ্যোতির্ময় ভাবলেন, একই ধরনের উক্তি বঙ্গবন্ধুও করেছিলেন, “বিশ্বের মানুষ দু ভাগে বিভক্ত, শোষক ও শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।”
সম্বিত ফিরল আদিলার জবাবে। ভাবলেন এখন এসব মনে এলো কেন তাঁর।
“হ্যাঁ, বলেছে ‘হিন্দুরা খারাপ। ওরা সবাই ইসকন’।”
জ্যোতির্ময় বললেন, “পড়া শেষ করো তারপর বুঝিয়ে বলব।”
মুখে বললেন বটে কিন্তু মনে মনে তিনি শঙ্কিত হয়েছেন। এ মেয়েকে খুব সহজে বুঝ দেওয়া সম্ভব নয়। ক্লাস এইটে পড়লেও মেয়েটি চিন্তাভাবনায় অনেক অগ্রসর। যেকোনো কিছু জানা ও পড়ার অসম্ভব আগ্রহ আছে। ফলে ওর সমবয়সীদের চেয়ে অনেকগুণ ম্যাচিউরড মেয়েটি।
অন্যদিকে এ আগ্রহটি তার জন্য আপাতত ক্ষতির কারণও হয়ে উঠছে। ছাত্রী হিসেবে মেধাবী হওয়া সত্বেও গতবছর ক্রমিক নম্বরে সে তিন ধাপ পিছিয়ে গেছে। আর এসব ব্যর্থতার ভার এসে পড়ে তাঁর ওপর।
“গল্প-উপন্যাস পড়তে দিয়ে ওর মাথাটা খেলেন আপনি” আদিলার মায়ের এমন অভিযোগ প্রায়ই শুনতে হয় তাঁকে।
অভিযোগটি অবশ্য একেবারে মিথ্যেও নয়। কয়েকবছর ধরে তিলে তিলে তিনি আদিলাকে রপ্ত করিয়েছেন ক্লাসের বইয়ের বাইরের বই পড়তে। তিনি নিজেই নানা জায়গা থেকে বই সংগ্রহ করে আনেন। পড়ার পর আদিলার সঙ্গে তিনি সে বই নিয়ে আলাপও করেন।
তবে কয়েকমাস ধরে বিশেষ করে গত পরীক্ষায় খারাপ করার পর একটা দোটানায় পড়ে গেছেন জ্যোতির্ময় চৌধুরী। ভাবছেন, এবার লাগাম টানতে হয় কিনা!
প্রায় ৭৫ বছর বয়েসী জ্যোতির্ময় চৌধুরীর আপাতত জগৎ-সংসারে আপন কেউ নেই তেমন। অনেকে ওপার বাংলায় থিতু হয়েছেন। আর এপারে যারা আছেন তাদের সঙ্গে তিনি নিজে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছেন নাকি ওরা করে দিয়েছেন সে ব্যাপারে নিশ্চিত নন তিনি। এই চট্টগ্রাম শহরেই তাঁর বিশাল পারিবারিক সম্পত্তি বেহাত হয়ে গেছে দেখভালের অভাবে। সেসব নিয়ে তাঁর ভেতর কোনো আক্ষেপ নেই। একাত্তরের টগবগে যৌবন এখন নেই। ভগ্ন শরীর, ভগ্ন আশা নিয়ে তাঁর বেঁচে থাকা। জীবন সায়াহ্নে আশ্রয় নিয়েছেন তাঁর বাল্যবন্ধুর ছেলের সংসারে। এ সময়ে নিজের সন্তান যেখানে বাবা-মাকে ঠাঁয় দিতে চায় না সে সময়ে বন্ধুর সন্তান তা-ও আবার মুসলিম পরিবারে তা এক চরম বিস্ময়।
আদিলাকে উত্তর না দিয়ে রেহাই নেই কিন্তু কী বলবেন তা নিয়ে সমস্যায় পড়ে গেলেন।
মাত্র কয়েকদিন আগে বাংলাদেশে এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটে গেছে। ছাত্র আন্দোলনের মুখে সাড়ে পনের বছরের শাসকদল আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়েছে। সারাদেশে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়েছে। গণভবন থেকে শুরু করে অনেক সরকারি-বেসরকারি ভবন, সরকারের মন্ত্রী-এমপি ও দলের নেতাকর্মীদের বাড়িঘর লুটপাট করা হচ্ছে। জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। জাতির পিতার ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা হয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের সূতিকাগার ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সে সঙ্গে কিছু জায়গায় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের বাড়িঘরও আক্রান্ত হচ্ছে। জুলাইতে যখন শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন শুরু হয় তখন প্রাথমিক অবস্থায় সেটি একটি ছাত্র আন্দোলনই মনে করেছিল অনেকে। মূলত কোটাবিরোধী আন্দোলন বলে সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে নাগরিকদের একটি অংশ আন্দোলনের পক্ষে রাজপথে নেমেছিল। কিন্তু ক্রমেই তা সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয় এবং নেতৃত্ব চলে যায় দেশের দক্ষিণপন্থীদের হাতে। যদিও আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোও।
সরকার পতনের পরপরই যেভাবে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙা হয়েছে, বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের আঁতুড়ঘর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির উত্থান ঘটছে তা দেখতে দেখতে ভেতরে ভেতরে জ্যোতির্ময় চৌধুরীও ভেঙে পড়েছেন। এ কয়েকদিন ধরে কেবলই ভাবছেন, একাত্তরে কি এমন একটি দেশের জন্য যুদ্ধ করেছিলেন? তবে বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই সত্তরোর্ধ জ্যোতিময়ের ভেতরে কী প্রবল ভাঙচুর চলছে।
এরমধ্যে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে আক্রমণের প্রতিবাদে শহরের চেরাগি পাহাড় চত্বরে ইসকন বড় সমাবেশ করেছে। চট্টগ্রাম নিউমার্কেট চত্বরেও বিশাল সমাবেশ করেছে তারা। এরপর আরও দুয়েকটা জেলায় সমাবেশ করে চট্টগ্রাম ফেরার পথে বিমানবন্দর থেকে ইসকনের গুরু চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে আটক করা হয়। এ ইস্যুতে চট্টগ্রামে এখন উত্তেজনা চলছে। হিন্দু-মুসলিম দু সম্প্রদায়ের মধ্যে দিনদিন তিক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে দেখে জ্যাোতির্ময় ভীষণ বিপন্ন বোধ করছেন।
এ মুহূর্তে একটা সিগারেট টানতে ইচ্ছে করল তাঁর। কিন্তু এখন সেটা সম্ভব নয়। তিনি ঘরে ধূমপান করেন না। বাইরে করে আসতেও ভাবতে হয় তার গন্ধ তাঁর নাতনি পাচ্ছে কিনা?
আদিলার দিকে তাকালেন। আদিলার চোখ বইয়ের ওপর। চুলের মাঝখানে সিঁথি। দুটো ছোট্ট বিনি কানের দুপাশ দিয়ে কাঁধ পর্যন্ত নেমে এসেছে। ঘরের একমাত্র লাইটটি তার পেছনে হওয়ায় বইয়ের ওপর আলো পড়লেও তার মুখে আলো যথেষ্ট নয়। জ্যোতির্ময় চৌধুরী গভীরভাবে আদিলাকে দেখার চেষ্টা করছেন এবং একসময় লক্ষ্য করলেন, সে কচি মায়াবী মুখটি ক্রমেই একটি আদলে রূপ নিচ্ছে। দেখতে দেখতে তা স্থির হলো একটি মুখে। অরুন্ধতী, তাঁর আত্মজা, যাকে শেষ দেখেছিলেন ৪০ বছর আগে হাতিরপুলের ছোট্ট দু কামরার বাসায়। তখন প্রায় বারো বছরের দাম্পত্য জীবন তাঁর ভেঙে যাচ্ছে। কামিনী, মুক্তিযুদ্ধের পরপর তাঁর হাত ধরে এদেশে চলে এসেছিলেন, কলকাতার জৌলুশপূর্ণ জীবন ফেলে, সে কামিনী আবার ফিরে যাচ্ছেন তবে তাঁর হাত ধরে নয়, তাঁর জীবনের সবচেয়ে দামি সম্পদকে সাথে নিয়ে। ছাড়াছাড়ির পর কামিনী কোনো যোগাযোগ রাখেননি জ্যাোতির্ময়ের সঙ্গে। এমনকি তাঁর কন্যার সঙ্গে দেখা করা তো দূরের কথা কোনোপ্রকার যোগাযোগও রাখতে দেননি। অনেক চেষ্টা তদবিরের পর ব্যর্থ হয়ে আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি। আজ অনেক অনেক বছর পরে সে অরুন্ধতী যেন বসে আছে তারই সামনে। বুকের ভেতর অসহ্য এক তোলপাড় নিয়ে তিনি ডাকলেন, “আদিলা।”
আদিলা বই থেকে মাথা তুলে তাকাল। জ্যোতির্ময় চৌধুরী অনেকক্ষণ ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আদিলাকে দেখতে থাকলেন। নানাভাইয়ের এমন আচরণ আগে কখনও দেখেনি সে। তাই খানিকটা ভড়কে গেল। আবার বলল সে, “নানাভাই তুমি কি মনে কষ্ট পেয়েছ?”
হাতিরপুলের সে ছোট্ট দু কামরা থেকে বর্তমানে ফিরে এলেন জ্যোতির্ময়। খুব ইচ্ছে হল আদিলাকে বুকের মাঝে জড়িয়ে রাখতে। বুকের খাঁচা যেন গেয়ে ওঠে, ‘শূন্য এ-বুকে পাখি মোর
আয় ফিরে আয় ফিরে আয়!
তোরে না হেরিয়া সকালের ফুল
অকালে ঝরিয়া যায়॥
তুই নাই ব’লে ওরে উন্মাদ
পাণ্ডুর হ’ল আকাশের চাঁদ,
কেঁদে নদী-জল করুণ বিষাদ ডাকে
আয় ফিরে আয়।’
কিন্তু পারেন না। কোথাকার কোন সংকোচ, কোন এক অদৃশ্য দেয়াল জ্যোতির্ময়ের পথ আগলে দাঁড়ায়।
মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া টগবগে যুবক জ্যোতির্ময় স্বাধীন দেশে ফিরে যুক্ত হলেন সাংবাদিকতায়। একাত্তরে কলকাতায় পরিচয় হওয়া কামিনীর সঙ্গে ভালোবাসার পরিণতিতে ঘর বাঁধলেন একসময়। কিন্তু সংসার যেন জ্যোতির্ময়ের জন্য নয়। কিছু পাখি খাঁচায় পোষ মানে না। মানাতে গেলে ঝরে যায়। জ্যোতির্ময় সেই পাখি যে শুধু দূর থেকে গান শুনিয়ে যায়। কামিনী খুব অনুনয় করে বলেছিল, “চলো কলকাতায় ফিরে যাই। যাঁর ডাকে যুদ্ধে গিয়েছিলে তাঁকে তো হত্যা করেছো তোমরাই।”
কামিনী তাঁকে ছেড়ে যাওয়ার বছরখানেকের মধ্যে ঢাকা অধ্যায়ের ইতি টেনে ফিরে এলেন চট্টগ্রামে। স্থায়ীভাবে আর কোনোকিছু করা সম্ভব হলো না তাঁর। একসময় নিজের পরিবার-পরিজন থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে এ পরিবারে একজন অভিভাবক হিসেবে আছেন কয়েক বছর ধরে। আদিলার বাবা কাকা ডাকলেও আদিলার মা তাঁকে বাবা বলেই সম্বোধন করে। আশেপাশে সবাই জানে জ্যোতির্ময় আদিলার নানা। হিন্দু হয়ে একটি মুসলিম পরিবারে সদস্য হয়ে আছেন অথচ আদিলা, নাতনি হলেও যাকে নিজের কন্যা বলে মনে হল আজ, তাকে জড়িয়ে ধরে প্রাণটা ঠান্ডা করতে পারলেন না। তিনি ভাবলেন, এ সংকোচ কেন, এত দ্বিধা কেন তাঁর।
স্থবিরতা ভাঙলেন নিজেই, “না, হিন্দুরা খারাপ না। ওরা একটা ধর্মের অনুসারী। অনেক অনেক পুরনো বলে তাদের সনাতন ধর্মাবলম্বীও বলে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ইসকন নামে একটি ধর্মীয় সংগঠনের সদস্য।”
এক নিঃশ্বাসে বলে গেলেন তিনি।
“ধর্মের কারণে কাউকে খারাপ বলা ঠিক না” যোগ করলেন শেষে।
“এই যে আমি প্রায় তিন বছর ধরে তোমাদের সঙ্গে আছি কোনো সমস্যা হয়েছে কখনও। আমার কোনো আচরণ কি তোমাদের কষ্টের কারণ হয়েছে আজ পর্যন্ত। আমারও কোনো সমস্যা হয়নি কোনোদিন।”
আদিলা চেয়ার ছেড়ে নানাভাইকে জড়িয়ে ধরে বলে, “তুমি অনেক ভালো নানা ভাই। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। মাকে বলে আসি তোমাকে চা দিতে।”
আদিলা ভেতরে যেতেই গভীর এক নিঃশ্বাস ফেললেন জ্যোতির্ময় চৌধুরী।
আদিলা ফিরে এলো মাকে নিয়ে।
“বাবা তোমার শরীর খারাপ? তাহলে আজ আর পড়ানোর দরকার নেই। আমি চা নিয়ে আসছি” বলে আদিলার মা চলে গেলেন। জ্যোতির্ময় না বলারও সুযোগ পেলেন না।
চা খেতে খেতে জ্যোতির্ময় চৌধুরী খেয়াল করলেন বই-খাতা ভাঁজ করে রেখে আদিলা তার পাশের চেয়ারে বসল এবং চায়ে শেষ চুমুক দেওয়া পর্যন্ত তার দিকেই তাকিয়ে রইল।
“ধর্মটা কী নানা ভাই? তুমি কেন হিন্দু আর আমরা কেন মুসলিম?”
অন্যদিন হলে হয়ত তিনি এখানেই আদিলাকে থামিয়ে দিতেন; কিন্তু আজ পারলেন না। কেন আজ মনে হল এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া দরকার।
“আসলে ধর্ম বলতে আমরা যা বুঝি বা বোঝাই তা হল মতবাদ। প্রতিটি ধর্মই তার নিজস্ব মতবাদ ব্যক্ত করেছে। অনুসারীরা সে মতবাদে বিশ্বাস করে এবং তা মেনে চলে। কিন্তু ধর্ম বলতে কোনো কিছুর স্বকীয় গুণ বা প্রকৃতিকে বোঝায়।”
নিশ্চয়ই বুঝতে পারনি? আচ্ছা আরেকটু সহজ করে বলি, কোনো বস্তুর অস্তিত্ব যে গুণের ওপর নির্ভর করে বা যা ছাড়া বস্তুটির পরিচয় থাকে না, সেটিই তার ধর্ম। যেমন, আগুনের ধর্ম কী? উত্তাপ বা দহন করা। আগুন যদি গরম না হয়, কিংবা কিছু না পোড়ায় তবে তাকে আর আগুন বলা যায় না। তেমনি জলের ধর্ম তারল্য বা শীতলতা। চিনির ধর্ম মিষ্টি হওয়া। পাখির ধর্ম ওড়া। বাঘের ধর্ম শিকার করে বনের অন্য পশুদের খাওয়া।
আর মানুষের ধর্ম হল মানবতা বা মনুষ্যত্ব।
মাথায় ঢুকল কিছু?’ বলে আদিলার মাথায় একটা টোকা মারলেন তিনি।
“ভালো-খারাপ নিয়ে প্রশ্ন করেছিলে, এবার বলি, মানুষের মধ্যে এত ভেদাভেদ নেই। মানুষ আসলে দু প্রকার, ভালো মানুষ ও খারাপ মানুষ।”
আদিলা বিহ্বল চোখে তাকিয়ে আছে নানা ভাইয়ের দিকে।
জ্যোতির্ময় ভাবলেন, আর পারা যাবে না। একটা সিগারেট এখন টানতেই হবে। তিনি ঘড়ির দিকে তাকালেন। রাত পৌনে নয়টা বাজে। আদিলাকে বললেন, তোমার ছুটি। আমি একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি।
দরজা খুলতে যাবেন সে সময় শুনতে পেলেন গলির ভেতর থেকে স্লোগানের শব্দ। তিনি থমকে দাঁড়ালেন।
আর তখনই আদিলা এক ঝটকায় এসে দরজা আগলে দাঁড়িয়ে বলল, “তুমি এখন বাইরে যাবে না কিছুতেই!” তার চোখে যুগপৎ আতঙ্ক আর জেদ।
আদিলার কণ্ঠস্বর কাঁপছে, কিন্তু তাতে যেন এক অমোঘ আদেশের বার্তা।
জ্যোতির্ময় থমকে দাঁড়ালেন। সেই মুহূর্তে আবার বাইরে এক দীর্ঘ স্লোগান তারপরই একটা শব্দ—তীব্র, তীক্ষ্ণ। কিসের শব্দ ওটা? গুলির?
ঘরের দেওয়ালগুলো যেন ঝাপসা হয়ে এল। টিউবলাইটের ধবধবে সাদা আলোটা ফিকে হয়ে হঠাৎ হ্যারিকেনের কাঁপা কাঁপা হলদেটে আলোয় রূপ নিল। জ্যোতির্ময় দেখলেন, তার সামনে আদিলা দাঁড়িয়ে নেই। দাঁড়িয়ে আছেন তার মা। সাদা থান পরা সেই চেনা অবয়ব। বাইরে তখন একাত্তরের কালরাত। চারদিকে গুলির শব্দ, আগুনের হলকা আর বারুদের গন্ধ।
মা দুই হাত বাড়িয়ে পথ আগলে বলছেন, ‘জ্যাোতি যাসনে। আজ রাতটা ঘরে থাক বাবা।”
জ্যোতির্ময় বিড়বিড় করলেন, “মা, আমাকে যেতে হবে।”
মা’র মুখটা হঠাৎ বদলে গেল। সেখানে এখন কামিনীর অভিমানী মুখ ভেসে ওঠে। কামিনী বলছে, “সবাই তো ওপারে চলে গেল, তুমি কেন পড়ে আছো এই পোড়া দেশে? চলো কলকাতা ফিরে যাই।”
আবারও সেই স্লোগানের গর্জন। একাত্তর আর চব্বিশের মাঝখানের দীর্ঘ ৫৩ বছর যেন এক নিমিষে মুছে গেল। সময়ের দুই প্রান্ত এসে এক বিন্দুতে মিশেছে। জ্যোতির্ময় বুঝতে পারছেন না তিনি কি এখন একাত্তরে, নাকি চব্বিশে? তিনি কি এখন হাতিরপুলের সেই ছোট্ট বাসায়, নাকি চট্টগ্রামের এই অজানা গলির ভেতর?
“নানাভাই! কী হয়েছে তোমার? ওভাবে তাকিয়ে আছো কেন?”
আদিলার চিৎকার তাকে বর্তমানে ফিরিয়ে আনল। হ্যারিকেনের আলো নিভে গিয়ে আবার টিউবলাইট জ্বলে উঠেছে। সামনে আদিলাই দাঁড়িয়ে—তার নাতনি, তার অরুন্ধতী। যার চুলের সিঁথি আর ডাগর চোখ যেন একটি গভীর দীঘি, যেখানে সাঁতার জানলে মরে যাওয়ার ভয় নেই।
জ্যোতির্ময় ধীরে ধীরে আদিলার মাথায় হাত রাখলেন। তার হাত কাঁপছে। তিনি বুঝলেন, বাইরে যে অন্ধকারই থাকুক না কেন, এই ছোট্ট মেয়েটির বুকের ভেতর যে মমতা, সেটাই তার আসল স্বদেশ। একাত্তরে মা আগলেছিলেন তার প্রাণ, আর আজ আদিলা আগলে রাখছে তার শেষ বিশ্বাসটুকু।
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “ঠিক আছে নানাভাই, যাব না। আজ আর কোথাও যাব না।”
বাইরে তখন স্লোগান ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত স্তব্ধতা। যেন এক মহাকালের ক্লান্তি নিয়ে দুই অসম বয়সী মানুষ একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে—যাদের মাঝে ধর্মের দেয়াল নেই, আছে শুধু এক গভীর আত্মীয়তা।
