travel-uttarbanger-3-gram

উত্তরবঙ্গের তিন অনামী গ্রাম:- মামরিং, সমলবং, দাওয়াইপানি
পায়েল চট্টোপাধ্যায়

কাঞ্চনজঙ্ঘা ভিউ পয়েন্ট

 

ট্রেন থেকে নেমেই মন খারাপ। সেই ঘ্যানঘ্যানে বৃষ্টি পিছু ছাড়ছে না। ফাল্গুন মাসের সঙ্গে বৃষ্টির যে কবে থেকে এত বন্ধুত্ব হল কে জানে! সকালের নিউজলপাইগুড়ি মেঘমাখা। ‘দার্জিলিং দার্জিলিং’ করে গাড়ির চালকদের হাঁকডাক শুনে আনন্দ হচ্ছিল না। প্রায় এক যুগ পর ওই পথে যাব। দার্জিলিং-এর মনোমুগ্ধকর সঙ্গী কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার ইচ্ছে নিয়ে। উদ্দেশ্য এতটুকুই। একেবারে নিখাদ পাহাড় প্রেম। হঠাৎ করেই বেরিয়ে পড়া। কোন হোটেল বুক করে আসিনি। দু’রাত-তিন দিন পাহাড়ের বুকে থাকব। কাঞ্চনজঙ্ঘাকে সাক্ষী রেখে পাহাড় প্রেম ঝালিয়ে নেওয়া। যেখানে সব থেকে ভালো কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাওয়া যায় তেমন কোন ভিউ পয়েন্টের কাছাকাছি থাকতে চাইছিলাম। মার্চ মাসে সেই উদ্দেশ্য নিয়েই বেরোনো। কিন্তু বৃষ্টি, কুয়াশা সেই ইচ্ছের পাশে বড় গণ্ডি টেনে দিয়েছে। ইচ্ছে করছিল ফিরতি ট্রেনে পালিয়ে যাই। সে উপায়ও নেই। ফেরা সেই দুদিন পরে। “কোথায় যাবেন, ম্যাডামজি? আপনিতো দার্জিলিং মেল থেকে নামলেন। দার্জিলিঙ যাবেন! এখানে চলে আসুন।” ট্রেকার জাতীয় গাড়িটায় মোটামুটি দশজন বসার জায়গা রয়েছে। একটা মাত্র সিট ভর্তি হতে বাকি। আমায় একা দেখে গাড়িচালক তাই একটু বেশি জোরে চিৎকার করছেন। “দার্জিলিং দার্জিলিং”। এদিকে আমার মেজাজ সকাল থেকেই খিটখিটে। দুম করে বলে বসলাম, “কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে চাই, দেখাতে পারবেন?” ইচ্ছে করেই এমন একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলাম। “ম্যাডামজি আসুন, দার্জিলিংয়ের কাছে কোন ভালো হোমস্টেতে নিয়ে যাব আপনাকে, ওখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার ব্যবস্থাও করে দেব।” এতোটুকু বলার সময় দেখলাম গাড়ি চালকের মুখে আলো ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু আমার মনের মেঘ কাটেনি। বেশ রেগে বললাম “এই বৃষ্টিতে কী করে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখাবেন আপনি?”

 “বারিষ থেমে যাবে, দেখবেন ম্যাডামজি, খবরে দেখিয়েছে। এই বারিষ একদিনই হবে।”

-“সেই খবর কি তুমি একাই দেখেছো?” আমার রাগ থামেনি গাড়িচালকের কথাতেও।

-“কোথাও তো আপনাকে থাকতে হবে, ম্যাডামজি, স্টেশনে তো আর থাকবেন না।” গাড়ির চালক তখনও শান্ত হয়েই কথা বলে চলেছেন।

খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে উঠে বসলাম তাঁর গাড়িতে। বৃষ্টির কারণে রাস্তা যথেষ্ট জ্যাম ছিল। সকাল ন’টায় গাড়িতে উঠেও দার্জিলিং পৌঁছতে দুপুর হয়ে গেল। বাকি যাত্রীদের হোটেল বুক করাই ছিল। সকলে নিশ্চিন্ত মনে এগিয়ে গেলেন। “আপনার কোন হোটেল তো বুক করা নেই, আমি হোমস্টে দেখে দিলে যাবেন? একেবারে অজানা একটা গ্রাম। নাকি এই ম্যালের কাছেই কোথাও থাকবেন?” আমায় প্রশ্নটা করে চুপ করে রইলেন গাড়ির চালক। বুঝতে পারছিলাম আমার উত্তরের ভিত্তিতেই উনি ঠিক করে নেবেন যে আমায় নিয়ে যাবেন কিনা। ওঁর কথায় ভরসা করতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু কমফোর্ট জোনের ভেতর আটকে পড়া মন চট করে মেনে নেয় না এটা। বললাম “আমি কয়েকটা হোটেল খুঁজে নিই, না পেলে তোমায় বলছি।” এই বলে ব্যাগ নিয়ে নেমে পড়লাম। ম্যালের কাছে প্রায় দু’ঘণ্টা ধরে হেঁটে হেঁটে হোটেল খুঁজে বেড়ালাম। একটি হোটেলেও তিল ধারণের জায়গা নেই। দেখে মনে হচ্ছিল হয় সমগ্র কলকাতা দার্জিলিঙে উঠে এসেছে নইলে দার্জিলিং শহরটা কলকাতাকে গ্রাস করে নিয়েছে। ঘড়ির কাঁটা তখন বিকেল চারটে ছুঁই ছুঁই। ভেবেছিলাম একলা বেড়াতে বেরোচ্ছি, ঠিক কোন হোটেলে জায়গা জুটে যাবে। বাস্তবটা এক্কেবারে অন্যরকম। যথেষ্ট খিদে পেয়েছে। থাকার ব্যবস্থা না করে খেতে ইচ্ছে করছিল না। ভাবলাম সেই গাড়ি চালককে ফোন করে বলি তার অজানা গ্রামেই নিয়ে যেতে। হঠাৎ মনে হল তার নামটুকুও জিজ্ঞেস করার সময় হয়নি। এমনকি ফোন নাম্বারও নেওয়া হয়নি। আমার দিক থেকে আগ্রহ না থাকায় গাড়ির চালক নিজেও ফোন নম্বরটি দেননি। কী করব বুঝতে না পেরে আপাতত পেটের দাবি মেটানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। এক প্লেট মোমো খেয়ে সবে ব্যাগ-পত্র নিয়ে পরবর্তী গন্তব্য দেখার জন্য মোবাইলটা হাতে নিয়েছি দেখি একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসছে। একটি হোটেল থেকে বলেছিল একখানা ঘরের ব্যবস্থা হয়তো করে দিতে পারে। তবে সেই মুহূর্তে নিশ্চিত করতে পারেনি। ভেবেছিলাম সেখান থেকেই ফোন এসেছে। সেই আশাতেই ফোন ধরলাম।  

-“ম্যাডামজি, আপনি একটু আগে আমাদের ফোন নাম্বার দিয়ে গেলেন না? আপনাকে খুঁজতে একজন এসেছেন। আপনি ঘর পাননি তো? একবার এখানে চলে আসুন।”

হোটেলটা ম্যাল থেকে খুব একটা দূরে নয়। মনে আশার আলো নিয়ে দার্জিলিং-এর ম্যাল চত্বরের ১৫ মিনিটের পথ পেরোলাম সাত থেকে আট মিনিটে। রীতিমতো হাঁফাচ্ছিলাম। তবে পৌঁছে আবার হতাশ হলাম। ওই হোটেলটিতে ঘরের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। হোটেলের রিসেপশনে যিনি দাঁড়িয়ে তিনি সেই গাড়িচালক যে আমায় নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিং এনেছেন। ওঁর নাম জানলাম। প্রমোদজি।

-“আপনি একা একা এখানে এসেছেন, প্রমোদ আমাদের চেনা, আপনি ওর গাড়ি থেকেই নামছিলেন, তাই আমরাই প্রমোদকে ফোন করেছিলাম যে ও যদি আপনাকে কাছাকাছি কোন হোটেল বা হোমস্টে দেখে দেয়।”

অচেনা হোটেলের রিসেপশনিস্টের গলায় যথেষ্ট চিন্তা। কী করব বুঝতে পারছিলাম না। তখন প্রমোদজি এগিয়ে এসে বললেন “ম্যাডাম ভরসা রাখুন, আমার সঙ্গে আসুন, আপনাকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখানোর চেষ্টা করব।” সেই মুহূর্তে যে খুব ভরসা করতে পারছিলাম তা নয়, তবুও সাহসে ভর করে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। “নিয়ে চলুন আপনি, কিন্তু কোথায় নিয়ে যাবেন?”

-“আমার গ্রামের পাশেই একটা গ্রাম আছে, আপনার কলকাতার লোকেরা এখনো জানেই না।”

প্রমোদজির গলায় গল্প বলার সুর।

-“কি নাম গ্রামের?”

আমি উদাস হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

প্রমোদজি গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতেই বললেন “মামরিং”

 

দাওয়াইপানি
দূরবীন ভিউ পয়েন্ট

 

 

দার্জিলিং-এর একটি অনামী উপত্যকা ‘মামরিং’। হাতেগোনা কয়েকটা হোমস্টে রয়েছে এখানে। দার্জিলিং থেকে দু-আড়াই ঘন্টা সময় লাগে পৌঁছতে। উপত্যকা ধরে গাড়ি যখন এগোচ্ছে বিকেলের পাহাড়ি সূর্য উপত্যকার বুকের উপর লুটিয়ে পড়ছে। শিলিগুড়ি থেকে এই গ্রামটির দূরত্ব ৭০ কিলোমিটার। সন্ধ্যেবেলায় পাহাড়ের বুকে জোনাকির মতো জ্বলতে থাকে দার্জিলিং শহরের আলো। যে হোমস্টিটিতে প্রমোদজি নিয়ে এলেন তার মালিকের নাম কৌশল। সুন্দর, ছিমছাম ব্যবস্থা। উপত্যকাটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য সমগ্র উপত্যকা জুড়ে সবুজের সমারোহ। ঝাড়ু গাছ দিয়ে ঘেরা উপত্যকা। এই গাছের পাতা থেকে ঝাঁটা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী তৈরি হয়। শহরে পাঠানো হয় সেসব। এখানকার মানুষদের জীবিকা এটি। মোটামুটি ৩০০টি পরিবার বাস করে গ্রামটিতে। ঝাড়ু গাছের পাতা থেকে বিভিন্ন দ্রব্য তৈরি ছাড়াও অন্যান্য ব্যবসাও করেন সকলে। তিনটি হোমস্টে রয়েছে উপত্যকাটিতে। অনাবিষ্কৃত গ্রাম হিসেবেই ধরা যেতে পারে মামরিংকে।

গ্রামের সৌন্দর্য অনেক কিছু ভুলিয়ে দিলেও ঘ্যানঘ্যানে বৃষ্টি ভুলতে দেয়নি যে কাঞ্চনজঙ্ঘার সঙ্গে এবারের মোলাকাত হয়তো হবে না। আকাশের মন ঠিক হওয়ার কোন লক্ষণই দেখা যাচ্ছিল না।। হোমস্টের চিকেন মোমোতেই সন্ধ্যেবেলা মনোনিবেশ করা যুক্তিসঙ্গত মনে করলাম। “ম্যাডামজি আসবো?” পরিচিত কণ্ঠস্বর। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে প্রমোদজি। আমার অনুমতি পেয়ে ঘরে এসে জানালেন কাল হয়তো বৃষ্টি থাকবে। আর একই বৃষ্টি চললে আমায় আর একটা এমন অনামী গ্রাম ঘুরিয়ে দেখাবেন। হ্যাঁ বলা ছাড়া উপায় ছিল না। কাল সকাল সকাল বেরোনোই ঠিক হলো। যাওয়ার সময় আমার দিকে তাকিয়ে প্রমোদজি হঠাৎ বললেন “ম্যাডামজি ভরসা রাখুন, আমার মন বলছে আপনি ঠিক রোদ দেখতে পাবেন আর কাঞ্চনজঙ্ঘাও।” শান্ত গলায় কথা বলছেন। ‌ একপ্রকার অবিশ্বাস করেই ওঁর গাড়িতে উঠেছিলাম। একেবারে অনাত্মীয় মানুষ। এখনো পর্যন্ত এই বেড়ানোর প্যাকেজ নিয়ে একটি কথাও হয়নি। অথচ বারবার বিশ্বাসের কথা বলছেন। যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বিচ্ছিন্ন পাহাড়ী একটা গ্রামে এমন সহজেই বোধহয় বিশ্বাস খুঁজে পাওয়া যায়। শহরের মানুষেরা শুধু প্রকৃতি দেখতে ছুটে আসি। হঠাৎ করে মোমোটা এমন বিস্বাদ লাগছিল কেন কে জানে!

পরের দিন গরম কফির ধোঁয়ার থেকেও বেশি কুয়াশা ছিল সকালবেলায়। তবে যত বেলা বাড়ছিল ধীরে ধীরে কুয়াশার সরে যাওয়া বুঝতে পারছিলাম। সকালের মামরিং গ্রামও যথেষ্ট নির্জন। উপত্যকাটিকে সকালবেলা কুয়াশায় মোড়া পরীর মত দেখতে লাগছিল। প্রমোদজি গাড়ি নিয়ে হাজির। কৌশলজি তখনো ব্রেকফাস্ট রান্না করছেন। মোটামুটি সকাল ন’টার মধ্যেই প্রাতরাশ খাওয়া হয়ে যায় এখানে। খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলাম

-“হোমস্টেতে আর কেউ থাকে না? আপনার তো আরো কয়েকজন গেস্ট রয়েছে। একা একাই সব করেন?”

-“আমার ওয়াইফ আছে ম্যাডাম। তবে ওর বাচ্চা হবে কদিনের মধ্যেই। আখরি মাহিনা চলছে। এখন ওকে কোন কাজ করতে বারণ করেছি।”

প্রমোদজির এক বন্ধুর বাড়ি হোমস্টের লাগোয়া। আজ ওখান থেকেই এলেন। তবে আমায় নামিয়ে নিজের গ্রামে ফিরে যাবেন। এই হোমস্টের বাগানে রঙিন অর্কিডগুলো রোদের অপেক্ষায়। বোঝা যাচ্ছে রোদ উঠলেই ফুল ফুটবে। খাওয়া-দাওয়া, স্নান সেরে গাড়িতে উঠতে যাব দেখি কৌশলজি গাড়ির সামনে কাঁচু-মাচু মুখে দাঁড়িয়ে।  

-“কিছু বলবেন, কৌশলজি?”

-“ম্যাডামজি এই মামরিং গ্রামে পানির খুব সমস্যা। পাইপ দিয়ে পুরো গাঁওকে জোড়ার কাজ চলছে। তাই জল একটু বুঝে খরচ করবেন।”

স্নানের পর অনেকগুলো জামা-কাপড় কেচেছিলাম। নিজের কাজে লজ্জিত হলাম। মাথা নেড়ে ওঁর কথার সায় দিয়ে যখন উপত্যকার এবড়ো-খেবড়ো পথ দিয়ে এগোচ্ছি কৌশলজির স্ত্রীর কৃতজ্ঞতা ভরা চোখের দিকে নজর পড়ল। বারান্দায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। অনাগত সন্তানের অপেক্ষারত পাহাড়ি ফুল। একটু আলো পেলেই ঝলমল করবে। সকলের দায়িত্ববোধ আর সচেতনতার আলো।

 

মামরিং থেকে রাতের দার্জিলিং
মামরিং

 

সেদিন যে গ্রামটিতে কাটিয়েছিলাম তার নাম সমলবং। কালিম্পং-এর একটি অপরিচিত গ্রাম। কুয়াশা আর মেঘ একেবারে পাহাড়ের বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এখানে। এই গ্রামের মধ্যে দিয়েই বয়ে চলে রিয়াংখোলা নদী। দূরবীন দ্বারা ভিউ পয়েন্ট আর মহানন্দা অভয়ারণ্য দেখা আগে থেকেই স্থির করা ছিল। মূলত পাহাড়ী পাখিদের দেখা পাওয়া যায়। তবে কুয়াশা থাকায় পাখিদের দেখা সেভাবে পাওয়া যায়নি। গ্রামটা অপরূপ সুন্দর। ভিউ পয়েন্টের সামনে একটি ছোট্ট চায়ের দোকানে খাওয়া-দাওয়ার জন্য ঢুকতেই দেখি আবার ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমেছে। গরম চাউমিনেও মন ভালো হলো না। মামরিং উপত্যকা, কুয়াশা, অচেনা সমলবং খানিকটা মনের মেঘ কাটালেও স্বস্তি পায়নি। এবার কাঞ্চনজঙ্খার সঙ্গে দেখা হবে না, বুঝতেই পারছিলাম। হাতে আর একটা মাত্র দিন। ফেরার পথে প্রমোদজিকে জিজ্ঞেস করছিলাম ”আপনি বলেছিলেন রোদ উঠবে, দেখুন বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।” আলগা হেসে শান্তভাবে প্রমোদজি উত্তর দিলেন “আমার মনে হচ্ছে ম্যাডামজি আপনি কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখবেন। আর কাল আপনাকে দাওয়াইপানি নিয়ে যাব। দার্জিলিং থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে। দার্জিলিংয়ের একটা সুন্দর গ্রাম। কাল যদি রোদ ওঠে ওখানকার ভিউ পয়েন্ট থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখবেন। কী সুন্দর।”

দাওয়াইপানির নাম এখন পর্যটনের ক্ষেত্রে শোনা যাচ্ছে। শিবালিক পর্বতমালা পাখিদের যাতায়াত চলে এখানে। এতোটুকুই জানা ছিল আমার। বললাম “হ্যাঁ সারাদিন ঘরে থাকার থেকে কোথাও আসাই ভালো।” মনে মনে জানতাম পাহাড়ের রানি এবার ধরা দেবে না। তাই শুধু পাহাড়, মেঘ, কুয়াশা ছুঁয়ে বেড়ানো।

ক্লান্তি, হতাশা আর বৃষ্টি তাড়াতাড়ি ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিল। কালকের দিনটা কাটলেই পরের দিন সকালে বেরিয়ে পড়া। হঠাৎ দরজার ওপারে ঠকঠক আওয়াজ। একা বেড়াতে এলে যে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ এড়িয়ে চলাই ভালো। ঘুম ভাঙলেও দরজা খুলিনি। কুকুর বা কোনো জীবজন্তুও হতে পারে। খানিকক্ষণ চুপ করে রইলাম। এমনিতেও রাত বেশি বাকি নেই। ভোর হয়ে আসছে। জানলার পর্দা সরিয়ে দেখলাম আলো ফোটা শুরু হয়ে গেছে। “ম্যাডামজি একবার দরজা খুলুন, খুব দরকার।” কৌশলজির গলা। ভেতর থেকেই বললাম “কী ব্যাপার বলুন!”

-“আমার ওয়াইফের খুব শরীর খারাপ, একবার আসবেন। হোটেলে অন্য কোন মহিলা গেস্ট নেই আপনি ছাড়া। প্রমোদকে একবার ফোন করবেন! আমার ফোনে ওর নাম্বারটা নেই।”

এঁদের আন্তরিকতার মুগ্ধ হয়েছিলাম। সন্দেহ, অবিশ্বাস ঝেড়ে ফেলে অবশেষে দরজা খুললাম। কৌশলজির চোখমুখ লাল। চোখে জলের স্পষ্ট দাগ। ওদের ঘরে গিয়ে দেখলাম নিস্তেজ হয়ে পড়ে রয়েছে ওর স্ত্রী। গায়ে জ্বর। যন্ত্রণায় কাহিল। “দেখুন এই বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা নেই, আপনি ওকে হাসপাতালে নিয়ে যান, দেরি করবেন না। আমি প্রমোদজি কে ফোন করে দিচ্ছি।”

প্রমোদজিকে ফোন করে বললাম আজ আমায় কোথাও নিয়ে যাওয়ার দরকার নেই, হাসপাতাল যেতে হবে। পাশের গ্রাম থেকে প্রমোদজির আসতে আধঘণ্টা সময় লাগল। সেটুকু সময় কৌশলজি ছটফট করছিল। ‌ওঁর স্ত্রীকে মাথায় জলপট্টি দিয়ে জ্বর নামানোর চেষ্টা করছিলাম। নিরাপদে ওদের হাসপাতালে পৌঁছনোর খবর শুনে আবার শুয়ে পড়েছিলাম। পরেরদিন এখানেই থাকব ভেবে বেশ বেলা করে ঘুম থেকে উঠলাম। আকাশ দেখেই মনটা ভালো হয়ে গেল। ঝলমলে রোদ। কুয়াশা কেটে আকাশ স্বচ্ছ নীল। সকালে এদিক-ওদিক হাঁটাচলা করছি এর মধ্যে দেখি প্রমোদজি খাবারের প্লেট হাতে হাজির। “ম্যাডামজি ভাবীর বেটি হয়েছে, আর আপনি আজ আমার সঙ্গেই লাঞ্চ করবেন। এই মোমো আমি বাড়ি থেকে এনেছি। মিঠাইও আছে। খেয়ে নিন, আমরা বেরবো।”

-“আপনি বোধহয় এই ফিরলেন, ভালো করে ঘুমাননি।”

প্রমোদজির ক্লান্ত চোখ-মুখ দেখে বললাম

-“কিছু হবে না ম্যাডাম জি, দাওয়াইপানি এখান থেকে খুব একটা দূরে নয়। দেখে আসি চলুন।”

দাওয়াইপানি শিবালিক পর্বতের পাখিদের বিশ্রামের জায়গা। জোড়বাংলো পেরিয়ে যাওয়ার সময় বহু নাম-না-জানা পাখি দেখেছিলাম। লামাহাটা, তাকদার চা বাগানের সবুজ দেখে যখন কাঞ্চনজঙ্ঘা ভিউ পয়েন্টে পৌঁছলাম, সাদা তুষারমাখা, পাহাড়ের রানি কাঞ্চনজঙ্ঘা দুহাত বাড়িয়ে আলিঙ্গন করছে আমায়। খানিকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ক্যামেরা বা ফোন বের করতে ইচ্ছে করেনি। প্রমোদজির ডাকে চটক ভাঙলো “ম্যাডামজি বিশ্বাস রাখলেন বলেই তো কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পেলেন, আপনাকে বলেছিলাম না কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখাবোই।” আমার যাবতীয় কথা তখন হারিয়ে গেছে। পর্বত-রানির মোহে আচ্ছন্ন। তার স্নিগ্ধ রূপের ছটা আমার ভেতর তখন মিশে যাচ্ছে।

সমলবং

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *