micro-story-backspace

ব্যাকস্পেস
পিউ ভট্টাচার্য্য মুখার্জী

খুট করে শব্দটা আচমকা বেশ চমকে দিল লিপিকে। রুডি, মানে ওদের গ্রুপের রুদ্রজিৎ সান্যাল বিয়ে করছে। সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে তারই সেলিব্রেশনের পোস্ট। টকটকে লাল একটা বেনারসি শাড়ী গায়ে চড়িয়ে ইন্সটাগ্রামে ওর হবু বৌ পোস্ট করেছে, “can’t wait to be official” সেইসবই বিভোর হয়ে দেখছিল লিপি। এমন সময় ওর ঘরেই বেশ জোরে শব্দটায় হকচকিয়ে গিয়েছিল ও। মালতী, মানে ওর গৃহ সহায়িকা, খানিক বন্ধু, অর্ধেক মা সব মিলিয়ে দারুণ এক মহিলা, ঘর ঝাঁট দিতে এসে ঝাঁটাটা হাত থেকে জোরে ফেলেছে মেঝেতে, তারই শব্দ। লিপি দেখল মহিলা কেমন যেন রণংদেহী মূর্তি নিয়ে তাকিয়ে আছ ওর দিকে।

কী হল?

কী হল মানে? তুমি আবার ওই রুডিদাদার ছবি দেখছ আর কাঁদছ? তোমার লজ্জা নেই গো?

না না, আছে লজ্জা, এই লাস্ট।

তড়িঘড়ি চোখের সব জল মুছে নিল লিপি। শেষ দশমিনিটে এত যে কেঁদেছে ও, নিজেই জানত না। তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, তাছাড়া এত মনখারাপই বা করব কেন পিসি? আমাদের কি প্রেম ছিল নাকি? ও তো আমার সিচুয়েশনশিপ ছিল।

শোনো বাপু, অত শিপ-ফিপ বুঝি না। এই বিছানাটায়, এই যে ঠিক এই বিছানাটায় কমবার তোমাদের মাখামাখি হয়েছে? আমি কিছু বুঝি না ভেবেছ? নিজে হাতে বিছানার চাদর কাচি আমি এই বাড়ির…

ঘরটা থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এল লিপি। বাথরুমে ঢুকে কলটা চালিয়ে দিয়েই আবার হাউ মাউ করে কেঁদে উঠল। কি আশ্চর্য! মাত্র একুশ বছরের জেন-জি একটা মেয়ে। একজনের সঙ্গে সিচুয়েশনশিপ ছিল তো ছিল। সে এখন তার বাড়ির রীতি মেনে মাত্র তেইশ বছরে বিয়ে করে পারিবারিক ব্যবসায় থিতু হতে চাইছে, তো করুক। তাতে ওর এত বুক ফেটে যাচ্ছে কেন? ছটফট করছে কেন খবরটা জানার পর থেকে? নিজের গালেই নিজে সপাটে এক চড় কষাল লিপি। তারপর নিজেকেই বলল, ‘আধুনিক প্রজন্মের একজন মানুষের এত ন্যাকামো মানায় না, ওকে?’  

একটা কফিশপে একা বসে কফি খাচ্ছিল রুডি। ন্যানোশিপ, বেঞ্চিং, ব্রেডক্র্যাম্পিং, সিচুয়েশনশিপ এই সব মিলিয়ে রুডির প্রায় প্রচুর মহিলাসঙ্গ ছিল একসময়। জেন-জিদের সব হিজিবিজি ব্যাপারস্যাপার। বড়দের যা মাথায় ঢোকে না। কিন্তু এই বিয়েটা ঠিক হবার কিছুদিন আগে থেকে ও কেমন যেন চুপ মেরে গেছে, কাওকে আশেপাশে ঘেঁষতে দেয় না আর। এখন এই কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে সেইসবই ভাবছিল, হঠাৎ টিং করে ফোনে একটা মেসেজ ঢুকল, আর্য্যা, ওর হবু বৌ, “লিপিকে দেখলাম অভিকের সঙ্গে ‘Intimate coffee’ ক্যাফেতে ঢুকল।”

নাহ, আর দেরি করা যাবে না। এখনই সেরে ফেলতে হবে সব। ঝড়ের গতিতে উঠে দাঁড়িয়ে বিল মিটিয়ে বেরিয়ে বাইক ছুটিয়ে দিল রুডি ওই ক্যাফের দিকে। ঠিক আট মিনিট লেগেছে পৌঁছতে। তারপর পার্কিং এরিয়ায় বাইকটা রেখেই একছুটে ক্যাফের ভিতর ঢুকে সোজা লিপিদের টেবিলের সামনে গিয়ে লিপির হাতটা ধরে টেনে তুলে ওকে এক হ্যাঁচকায় কাছে এনেই একটা গভীর চুমু!

গোটা ক্যাফের সবাই থ! অভিক হাঁ করে দেখছে ওদের দুজনকে! লিপি ব্যাপারটা বুঝে উঠতেই এক ধাক্কায় রুডিকে সরিয়ে দিয়ে প্রায় গর্জে উঠল, কী অসভ্যতামি এটা? তোর হবু বৌ দেখলে কী ভাববে?

আমার কোনও হবু বৌ নেই, কোনওদিন ছিলই না, ওইসব ফলস, তোকে বোঝানোর জন্য।

হোয়াট? কী বোঝাবি?

যে আমরা ভুল সময় জন্মে গেছি। এইসব বেঞ্চিং ফেঞ্চিং তোর আমার জন্য নয়। শোন না…

কী?

এর উত্তরে রুডি আবার কাছে টেনে নিল লিপিকে, তারপর চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করল, “বুড়ো হবি আমার সঙ্গে?”

না, জনসমক্ষে ওদের সেইদিন ওই চুমু আর ভালোবাসা দেখে আশপাশের কোনও কাকু থানায় কমপ্লেইন করেননি। ওরা দুজন সেইমুহূর্তে বয়সের থেকে একটু বেশি বুড়ো হয়ে উঠেছিল, আর আশপাশের বাকি সবাই একটু বেশি ইয়াং। আসলে ভালোবাসার কোনও প্রজন্ম হয় না, ভালোবাসা নিজেই একটা প্রজন্মের নাম! 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *