micro-story-taan

টান
মহুয়া সমাদ্দার

–এই রিক্সা। জোরে টানো। জোরে। কী চালাচ্ছ সেই থেকে? এই জন্যে রিক্সায় উঠতে ইচ্ছে করে না আমার। এরা মনে হয় ভাত খায় না। ডিসগাস্টিং! 

অল্প বয়সী লাল জামা পরা মেয়েটির কথা শুনে নীল জামার মেয়েটিও সুর চড়ালো এবার। 

–নাহ! ভাত খায় না! খায়। খায়। সবই খায়। আসলে এসব হচ্ছে ওদের বদমায়েশি। এসব ইচ্ছে করেই করে ওরা। 

–ইচ্ছে করে করে! লালা জামা কিঞ্চিৎ অবাক। কেন রে অনু? ইচ্ছে করে আস্তে টানে কেন? 

–ও বাবা! সেটাও বুঝলি না? অনুর গলা বিজ্ঞের মতো শোনায়। 

–না। সত্যিই বুঝিনি। জোরে টানলেই তো ভালো। আগে আগে কাজ শেষ হয়ে যাবে! 

–আসল গল্প অন্য রে রিতু। 

–সেটা কী? সেটা তো বল? 

–এই ধর, আমাদের মতো যারা রিক্সায় উঠছে তাদের বেশিরভাগেরই খুব তাড়া থাকে। কেউ কেউ ধীর গতি দেখে আমাদের মতো বলেও জোরে টানতে। আর তখনই এরা দাও মেরে বসে! 

–কী রকম? 

–তখনই অফার দেয়, আরও জোরে গেলে বিশ টাকা বেশি লাগবে। এ তো সহজ ধান্ধা। 

সিধুর রিক্সায় বসা মেয়েদুটো এখনও একই বিষয় নিয়ে বকবক করে চলেছে। অন্য সময় হলে সে দু এক কথা শুনিয়ে দিত ঠিক। তারা রিক্সা টানে বলে কি কোনও মান সম্মান নেই নাকি? যা খুশি মুখে এলে বলাই যায়! কিন্তু আজ তার শরীর বড় খারাপ। যে রিক্সাকে পঙ্খীরাজ ঘোড়ার মতো ছুটিয়ে নিয়ে যায় সে রোজ, আজ সেই রিক্সার প্যাডেল করতেও ভীষণ কষ্ট হচ্ছে তার। গা হাত পায়ে বিষের মতো ব্যথা। জ্বরটা যে আবারও ফিরে এসেছে, তা সে বেশ বুঝতে পারছে। বোশেখ মাসের গরমেও তার শীত শীত করছে । বুকের মধ্যে শ্বাসের কষ্ট । রাতে এক ফোঁটা ঘুমোতে পারছে না। এক সপ্তাহ পরে রিকশা নিয়ে বেরিয়েছে আজ। ঘরে একমুঠো চালও নেই। মা-মরা  রিঙ্কির জন্যে চাল নিয়ে ফিরবে সে। 

আট বছরের মেয়েটা কাল রান্না করতে গিয়ে হাত বেশ খানিকটা পুড়িয়ে ফেলেছে। কচি হাতে কত না জানি ব্যথা হচ্ছে মেয়েটার! মেয়েদুটোকে কলেজের সামনে নামিয়ে দিয়ে আবারও স্ট্যান্ডে ফিরে এল সিধু। আরও দু চারটে ক্ষেপ না নিলে চাল ডাল কেনা হয়ে উঠবে না। যা দাম!  

ভেঙে পড়া শরীর নিয়ে বাজার সেরে ঘরে ফিরতে ফিরতে দুপুর দেড়টা বেজেই গেল। উঠোনে রিক্সা দাঁড় করিয়ে জোরে হাঁক দিল সিধু। এই রিঙ্কি! মা আমার! শোন এদিকে। চালটা নিয়ে ভাতটা বসিয়ে দে। দুটো ভাত মুখে দিয়ে কষিয়ে জ্বরের ওষুধ খাবো। শরীর ভেঙ্গে আসছে আমার!

বাবার ডাক শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে ছোট্ট মেয়েটা বাবার কাছে এসে দাঁড়াতেই সিধু দেখল মেয়েটার গতকালকে পড়া ফোসকা ফেটে তা থেকে কষ গড়াচ্ছে। সেটা এখন আর শুধু ফোসকা নেই। ঘা হয়ে গিয়েছে। 

সিধু রিঙ্কির পেছন পেছন ঘরে ঢোকার সময়েই গরম ভাতের গন্ধ তার নাকে ঝাপটা মারল।  

দাওয়ার দিকে নজর করতেই সে দেখল দাওয়ার এক কোণে মাটির উনুনের পাশে গামলার ওপরে ভাতের হাঁড়ি উলটানো।  

রাগে দুঃখে দিশেহারা সিধু আর্তনাদ করে উঠলো! বাপকে খাওয়ানোর জন্যে পোড়া হাতটা নিয়ে আজও লোকের বাসন মেজে চাল এনেছিস হতচ্ছাড়ি! তোকে কতবার বলেছি না ওই পোড়া হাত নিয়ে লোকের বাড়ির বাসন মাজতে যাবি না আজ! 

রিঙ্কি মাথা নীচু করে বাবার নিয়ে আসা চালের ব্যাগটা তার উলটে রাখা হাঁড়ির পাশে রাখল। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *