bibidho-bisoy-jakhan-biswacup

বিষয় যখন বিশ্বকাপ 
মুক্তগদ্য
সুপ্রিয় চৌধুরী

গত দুটো শারদীয়া সংখ্যায় ফুটবল নিয়ে লিখেছিলাম। মানে কলকাতা ময়দানের ফুটবল। বাংলার ফুটবল। তবে শুধুমাত্র এই খেলাটাকে নিয়ে নয়। খেলাটার বাইরেও খেলাটার সাথে জড়িয়ে থাকা টুকরোটাকরা সব স্মৃতির কোলাজ! যা সত্তরের এই বার্ধক্যের দোরগোড়ায় পা দিয়েও হৃদয় আর মস্তিষ্কের কোষগুলোকে অধিকার করে রেখেছে আজও। তো স্মৃতির সেই প্যান্ডোরা বাক্স খুলে কোলাজগুলো ছড়িয়ে দিয়ে ভেবেই ফেলেছিলাম, নাঃ! অনেক হয়েছে, আর নয়। এবার অন্য কিছু নিয়ে লিখবো। পরমুহূর্তেই মনে পড়লো, আরে! এই তো মাত্র মাসতিনেক আগে তো বিশ্বকাপ হয়ে গেল। আর যে দেশটায় হলো সেখান থেকেই তো অপার বাংলা প্রকাশিত হয়। এমন কি যে শহরটা থেকে হয়, সেখানেও তো গোটাকয়েক খেলা হয়েছে (একটা সেমিফাইনাল সহ) ফলে এইবারটাও আমার লেখার বিষয় হোক সেই ফুটবল। যে একটিমাত্র চর্মগোলক নিয়ে বাইশজনের এত লাথালাথি, মরণপণ ছোটাছুটি গোটা মাঠ জুড়ে, যা শুধুমাত্র একটা খেলাই নয়, better to say, a way of life! একটা অন্তহীন যাপনচিত্র! যাকে ঘিরে বিশ্বজোড়া হাজার হাজার কোটি মানুষের আবেগ আর উন্মাদনা জড়িত, এহেন একটা বিষয়কে নিয়ে যদি আবার লিখি, অপার বাংলার পাঠকরা সে লেখা পড়বেন না? নিশ্চিত পড়বেন! পাঠকদের ওপর সেই দৃঢ় বিশ্বাস এবং অগাধ ভরসা নিয়েই এ লেখাটা লিখতে বসলাম।

প্রথমেই বলে রাখি, এ লেখা কলকাতা ময়দানের সীমানায় মোটেই আটকে থাকবে না। সময়ের নিখুঁত সোয়ার্ভিং ফ্রিকিকে সোজা এসে আছড়ে পড়বে সুবিশাল আন্তর্জাতিক আঙিনায়। তবে শুধুমাত্র হালফিলের এই ফিফা বিশ্বকাপের গন্ডিতেই তা সীমাবদ্ধ না থেকে ছড়িয়ে পড়বে ব্যাপকতর বিষয় বৈচিত্র্যে।। আসুন সেই বৈচিত্র্যময় পথে পা বাড়ানো যাক এবার।

 

নামের আড়ালে

এক্ষেত্রে নামের আড়াল মানে ছদ্মনামের কথা বলছি আর কি। সাহিত্যে যেমন কালীপ্রসন্ন সিংহ ‘হুতোম’, শরৎচন্দ্র ‘অনীলা দেবী’, সমরেশ বসু ‘কালকূট’, বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় ‘বনফুল’, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘সনাতন পাঠক’, ঠিক সেভাবেই সমগ্র বিশ্ব জুড়ে বহু ফুটবলারও একইভাবে নানাবিধ ছদ্মনামে খ্যাত ছিলেন অথবা আছেন। চলুন এবার সেরকম বেশ কিছু চরিত্র ও তাদের ছদ্মনাম থুড়ি অন্য নামের সন্ধানে বেরোনো যাক। 

ফুটবল কিংবদন্তি পেলে যে তাঁর দুনিয়াজোড়া ভক্তদের কাছে ‘ব্ল্যাক পার্ল’ নামে খ্যাত ছিলেন, এ তথ্য তো আমরা অনেকেই জানি। কিন্তু এবার যদি প্রশ্ন করা হয় ‘ব্ল্যাক স্পাইডার’, ‘ব্ল্যাক প্যান্হার’, ‘ফ্লাইং স্যামন’, ‘ম্যাজিক টো’, ‘গ্যালপিং মেজর’ ‘এল বুয়েত্রো’, ‘এল ফ্ল্যাকো’, ‘অরেঞ্জ প্রিন্স’, ‘কাইজার’, ‘ইয়েলো হ্যারিকেন’, ‘লিটল বার্ড’, ‘ক্রাই বেবি’, ‘হোয়াইট পেলে’…এহেন সব নামে কাদের চিনতো ফুটবল জগত? উঁহু! স্মার্টফোনে হাত দেবেন না প্লিইজ! বিখ্যাত বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা কৌতুকভরে তাঁর একান্ত নিজস্ব সেই পূর্ববঙ্গীয় ভোকাবুলারিতে বলতেন – “ব্যাদে (বেদে) সব আছে।” আজও বেঁচে থাকলে নিশ্চিতভাবে বলতেন, “গুগলে সব আছে।” ফলে দোহাই আপনাদের, বাবা গুগলনাথের শরণাপন্ন হবেন না এখুনি। সেই কবে ছেষট্টি সালে বাড়িতে জি ই সি রেডিও সেটটায় শোনা ইংল্যান্ড বনাম পশ্চিম জার্মানির (তখনো বার্লিন ওয়াল ভাঙ্গেনি, দুই জার্মানি জোড়াও লাগেনি) সেই বিশ্বকাপ ফাইনালের রিলে শোনা আর সাতষট্টিতে ইস্টবেঙ্গল – বি এন আর শিল্ড ফাইনালে সশরীরে মাঠে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে দীর্ঘ ফুটবল অভিজ্ঞতায় হাতেখড়ি। বন্ধুরা বলে, হাতীর স্মৃতিশক্তি। নিজে ঠিক জানি না তবে এখনো পর্যন্ত যে নামগুলো বললাম, পুরোটাই স্মৃতি থেকে। তাই আসুন, উপরোক্ত খেলোয়াড়দের আসল নামগুলো ক্রম অনুযায়ী জানিয়ে দিই এখানে। পরে না হয় গুগল সার্চ ক্লিক করে মিলিয়ে নেবেন।

লেভ ইয়াসিন। পৃথিবীর সর্বকালের সেরা গোলরক্ষককে এই নামেই চিনতো ফুটবল জগত। প্রায় সাড়ে ছ’ফুট উচ্চতার অধিকারী সোভিয়েত রাশিয়ান টিমের গোলকিপার, কালো প্যান্ট আর একই রঙের ফুলহাতা জার্সি পড়ে আজানুলম্বিত দুই হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন গোলপোস্টের নীচে। আর এই কারণেই তাঁর নাম হয়ে গেছিল ‘ব্ল্যাক স্পাইডার’।

ইউসেবিও। আফ্রিকার মোজাম্বিক রাষ্ট্রের এক প্রত্যান্ত এবং চরম দারিদ্র অধ্যুষিত গ্রাম থেকে উঠে এসে পৌঁছে গেছিলেন বিশ্ব ফুটবলের রাজদরবারে। বিপুল অংকের অর্থের বিনিময়ে সই করেছিলেন সেই সময় ইওরোপের অন্যতম সেরা পর্তুগিজ ক্লাব বেনিফিকায়। গ্রহণ করেছিলেন পর্তুগালের নাগরিকত্ব। ছেষট্টি বিশ্বকাপে ইউসেবিও, এই নামটা হয়ে উঠেছিল পেলের প্রতিস্পর্ধী। সে বছর বিশ্বকাপ খেলতে আসা ‘এশিয়ার বিস্ময়’ উত্তর কোরিয়ার কাছে ৩ – ০ গোলে পিছিয়ে পড়েও পর্তুগাল ম্যাচটা জিতেছিল ৫ – ৩ গোলে। হ্যাটট্রিক সমেত একাই চার গোল করেছিলেন ইউসেবিও। ফুটবল দুনিয়া জুড়ে নাম হয়ে গেছিল ‘ব্ল্যাক প্যান্হার’। সম্প্রতি প্রয়াণ হয়েছে কিংবদন্তি এই  ফুটবলারের। 

‘ব্যাঙ্কস ফ্লায়েড লাইক আ স্যামন।” পৃথিবীর একাধিক সব ফুটবল বিশেষজ্ঞের মতে, ব্যাঙ্কস সত্যিই ওইদিন স্যামনের মত লাফিয়েছিল। স্যামন। আমেরিকার কয়েকটা অঞ্চলের নদীতে দেখা মেলে এই বিশেষ প্রজাতির মাছের। জল ছেড়ে অনেকটা উঁচুতে লাফিয়ে উঠতে পারে এরা। আর একদম সেই কারণেই ব্যাঙ্কসের সাথে স্যামন মাছের এই তুলনাটা টানা হয়েছিল। ব্যাঙ্কস মানে গর্ডন ব্যাঙ্কস। দাঁড়াতেন বৃটিশ ডিফেন্সের শেষ পাহারাদার হয়ে ইংল্যান্ডের গোলপোস্টের নীচে। ৭০ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিল বনাম ইংল্যান্ডের খেলায় পেলের দুর্দান্ত একটা হেড জমি ছেড়ে উড়ে গিয়ে হাতের টোকায় পোস্টের ওপর দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন মাঠের বাইরে। আর সেই অলৌকিক সেভের পর থেকেই স্যামন মাছের লাফের সঙ্গে তুলনা টানাটা শুরু হয়ে গিয়েছিল। বৃটিশ ফুটবল দুর্গের শেষ প্রহরী বিখ্যাত হয়ে গেছিলেন ‘ফ্লাইং স্যামন’ নামে।  ইয়াসিন না ব্যাঙ্কস, কে সেরা গোলকিপার? এই বিতর্কে আড়াআড়ি ভাগ হয়ে গেছিলেন দুনিয়াট ফুটবল বিশেষজ্ঞরা। ‘ব্ল্যাক স্পাইডার’ আর ‘ফ্লায়িং স্যামন’, এই মর্ত্যলোকের ময়দান ছেড়ে দুজনেই মেঘমুলুকের কোন অলৌকিক মাঠে খেলতে চলে গেছেন অনেকদিন! কিন্তু বিতর্কটা রয়ে গেছে আজও।  

‘ম্যাজিক টো’। সত্যিই তাঁর টোয়ের টোকায় মাঠ মাতাতেন তিনি। নাইটহুড পদবী পেয়েছিলেন সেই ফুটবল খেলেই। অর্ধ শতাব্দীর বেশি সময় ধরে দাপিয়ে খেলেছিলেন প্রথম শ্রেণির ফুটবল, যা কিনা ক্রিশ্চিয়ানো রোনান্দো বা লিওয়েল মেসির কাছেও স্বপ্ন অদ্যাবধি। এই দীর্ঘ ফুটবল জীবনে প্রতিনিধিত্ব করেছেন জাতীয় দল এবং ইংলিশ লীগের (তখনও ই পি এল নামকরণ হয়নি) একাধিক নামী ক্লাবে। এফ এ কাপ সমেত আরো একাধিক ট্রফি জয়ের নায়ক। স্যর স্ট্যানলি ম্যাথুজ। ‘ম্যাজিক টো’ ছাড়াও ‘উইজার্ড অফ ড্রিবলিং’ একইসাথে ‘দ্য ম্যাজিশিয়ান’ নামেও পরিচিত ছিলেন তিনি। ২০০০ সালে প্রয়াত হয়েছেন স্যর স্ট্যানলি। সঙ্গে করে নিয়ে গেছেন অর্ধ শতাব্দীর বেশি সময় ধরে দাপিয়ে ফুটবল খেলার এক অনন্য রেকর্ড। মেসি, রোনাল্দোরা সেই রেকর্ড ভাঙ্গতে, নিদেনপক্ষে এর কাছাকাছি যেতে পারবেন কি? সময়ই তার উত্তর দেবে।

ফুটবল তাঁর কথা শুনতো। পায়ে সেঁটে থাকতো চুম্বকের মতো। বুটের সাথে আঠার মতো লেগে থাকা সেই বল নিয়ে মানুষটা যখন ড্রিবলিং করতে করতে এগিয়ে যেতেন তখন বিপক্ষের ডিফেন্ডারদের মনে হতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একেকটা  রেলওয়ে প্ল্যাটফর্ম যেন। আর যাদের পাশ দিয়ে তিনি বেরিয়ে যাচ্ছেন একটা গ্যালপিং ট্রেনের মতো। এই কারণেই ভক্তদের কাছে নাম হয়ে গেছিল ‘গ্যালপিং মেজর’। ফেরেঙ্ক পুসকাস। হাঙ্গেরির সর্বকালীন সর্বশ্রেষ্ঠ এবং বিশ্বের অন্যতম সর্বকালের সেরা ফুটবলার। খেলতেন সেদেশের বিখ্যাত হনোভেড ক্লাবে। তাঁর নেতৃত্বে ইংল্যান্ড সফরে গিয়ে সেদেশের জাতীয় দলকে ছয় গোলে পর্যদুস্ত করেছিল হাঙ্গেরি। হাঙ্গেরিতে কম্যুনিস্ট শাষণ প্রতিষ্ঠিত হলে স্বদেশ ছেড়ে স্পেনে চলে যান পুসকাস। নাগরিকত্ব নেন সেদেশের। যোগ দেন সেখানকার অন্যতম দুনিয়া সেরা ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদে। তাঁর প্রতিনিধিত্বে তিনবার ইওরোপিয়ান কাপ (অধুনা ইওরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নস লীগ) জিতেছিল রিয়াল মাদ্রিদ। হাঙ্গেরি এবং স্পেন, দু’দেশের হয়ে ছ ছ’বার করে ঘরোয়া লীগ ছাড়াও অসংখ্য ট্রফিতে উপচে পড়েছে তাঁর পুরষ্কার প্রাপ্তির ঝুলি। ১৯৫২ অলিম্পিকে সোনা, ১৯৫৪ বিশ্বকাপে রানার্স, ব্যালন ডিওর…সব মিলিয়ে এহেন খেলোয়াড়টির সাফল্যের কথা বলতে গেলে একটা আলাদা বই হয়ে যাবে। ফলে তাঁর সাফল্যের আরেক বিভাগে আসি। নিজে খেলার বাইরে কোচিং করিয়েছেন ব্রাজিল, গ্রীস, স্পেন , হাঙ্গেরি, সৌদি আরব সহ এশিয়া, ইওরোপ,আফ্রিকার আরো একাধিক দেশে। যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ফল ১৯৭০ সালে গ্রীসের ক্লাব প্যানাথিনাইকোসকে ইওরোপিয়ান কাপের ফাইনালে তোলা। যদিও নেদারল্যান্ডের বিখ্যাত ফুটবল ক্লাব অ্যাজক্স আমস্টারডামের কাছে পরাজিত হয় তারা। দেশে কম্যুনিস্ট শাষণের অবসান হলে হাঙ্গেরিতে ফিরে যান পুসকাস। কোচিং জীবন শেষ হয় একদা ফেলে যাওয়া হাঙ্গেরি জাতীয় দলের প্রশিক্ষক পদ থেকে অবসর নিয়ে। সারা পৃথিবীতে তিনিই সেই সামান্য কিছু ফুটবলারের মধ্যে অন্যতম যিনি স্পেন ও হাঙ্গেরি , দুটি দেশেরই প্রতিনিধিত্ব করেছেন। যে রেকর্ড সারা বিশ্বে আর খুব কম ফুটবলারেরই দখলে আছে। 

এল বুয়েত্রো। বাংলায় যার মানে দাঁড়ায় – শকুন। হ্যাঁ এ নামেই তাকে ডাকতেন স্পেন আর রিয়াল মাদ্রিদের সমর্থকরা। ৮৬-র স্পেন বিশ্বকাপ মাতিয়েছিলেন এই ফুটবলার। নাম, এমিলিও বুত্রেগানো। যদিও সেবার নিজেদের দেশের মাঠে তেমন কোন উল্লেখযোগ্য ফল করতে পারেনি স্প্যানিশ ফুটবলাররা। আর সেবারই প্রথম আমাদের এখানে দুটো সেমিফাইনাল, ফাইনাল আর তৃতীয় স্থান নির্ধারণের সব খেলাগুলো সরাসরি দেখানো হয়েছিল দূরদর্শনের পর্দায়। বাকি অন্য বেশ কয়েকটা ম্যাচও দেখানো হয়েছিল ডিলেড টেলিকাস্টে। আর উদ্বোধনী ম্যাচে সেখানে বুত্রেগানোর করা অসাধারণ গোলটা মনে দাগ কেটে আছে আজও। 

এল ফ্ল্যাকো। মানে, ঢ্যাঙা বা সারস। তবে ‘এল ফ্ল্যাকো’ নামে দুজনকে চিনতো আর্জেন্টিনা। প্রথমজন সিজার লুই মেনেত্তি। ১৯৭৮ সালে বিশ্বজয়ী আর্জেন্টিনা ফুটবল টিমের কোচ। দ্বিতীয়জন জেভিয়ার পাস্তোরে। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে মাঠ কাঁপিয়েছেন ৭০-এর দশকে। খেলেছেন রোমা ,প্যারিস সেন্ট জার্মেইন (পি এস জি), রিয়াল মাদ্রিদের মতো বিশ্বের নামীদামী সব ক্লাবের হয়ে। দুজনের মধ্যে সিজার লুই  মেনেত্তি, প্রয়াত হয়েছেন অতি সম্প্রতি। অন্যদিকে জেভিয়ার। অনেকদিন হলো খেলোয়াড় জীবনে ইতি টানলেও রয়ে গেছেন সেই ফুটবলেই। কাজ করেন পুরোদস্তুর একজন পেশাদার ফুটবল এজেন্ট হিসেবে। সব মিলিয়ে এই হলো দুই ‘সারসের’ সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্ত। 

সিগার, ক্যারেট এ্যান্ড ক্রুয়েফ। এই তিন নিয়ে নেদারল্যান্ডস। এমনটাই বিশ্বাস করেন সেদেশের অধিবাসী ডাচেরা। এই তিন ‘সি’-এর প্রথমটি অর্থাৎ সিগার নিয়ে আলাদাভাবে কিছু বলার নেই। দ্বিতীয় সি অর্থাৎ হীরে ওদেশে ক্যারেট নামেই সর্বাধিক  পরিচিত। অতঃপর তৃতীয় বা শেষ সি মানে ক্রুয়েফ। জোহান ক্রুয়েফ। ১৯৭৪। কোচ রেইনহার্ট মিশেলের আবিস্কৃত ‘টোটাল ফুটবল’ সিস্টেমে ক্রুয়েফের নেতৃত্বে পুরো বিশ্বকাপ জুড়ে এক অলৌকিক, অকল্পনীয় ফুটবল খেলেছিল নেদারল্যান্ডস। তবে এতকিছুর পরেও ডাচ টিম সেবার বিশ্বকাপটা জিততে পারেনি। আয়োজক পশ্চিম জার্মানির কাছে ফাইনালে ২ – ১ পোলে হারতে হয়েছিল তাদের। কিন্তু ক্রুয়েফ সমেত গোটা ডাচ দলের ‘টোটাল ফুটবল’ আজও চর্চার বিষয় হয়ে রয়ে গেছে আপামর বিশ্বের ফুটবলপ্রেমী ও বিশেষজ্ঞদের কাছে। এদিকে ক্রুয়েফ। এই হারটা মেনে নিতে, বলা ভালো বিশ্বাসই করতে পারেননি কিছুতেই। ঠিক যেভাবে ১৯৮২-তে স্পেন বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে ইতালির কাছে ৩ – ২ গোলে হারটা কোনভাবেই মেনে নিতে পারেননি ব্রাজিল অধিনায়ক সক্রেটিস। ফুটবল বিশেষজ্ঞদের অনেকের মতে ‘দো ফুটবল ইজ আ টিম গেম বাট দোজ টু টুক ইট এ্যাবসলিউট পার্সোনালি।” সত্যিই ওই ৭৪-এর হার এতটাই ব্যাথিত করেছিল ক্রুয়েফকে যে ক্ষোভে, দুঃখে অবসরই নিয়ে নিয়েছিলেন জাতীয় দল থেকে। আর একইভাবে খেলা থেকে একটু একটু করে সরে গিয়েছিলেন সক্রেটিসও। কিন্তু ক্রুয়েফ। হাসতে হাসতে যে কোনদিন চলে আসবেন যে কোন বিশ্ব একাদশে, দেশের চির পরিচিত কমলা জার্সির সঙ্গে সমার্থক হিসেবে বড় আদরে ‘অরেঞ্জ প্রিন্স’ নামে যাকে ডাকতেন আপামর ডাচ সমর্থকরা, সেই ‘অরেঞ্জ প্রিন্স’ জোহান ক্রুয়েফ কিন্তু পরবর্তীতে স্বমহিমায় ফিরে এসেছিলেন ফুটবল ময়দানে, তবে এবার কোচ হিসাবে। আজ বার্সেলোনা এফ সি-র যে রমরমা বিশ্ব ক্লাব ফুটবলের আঙিনা জুড়ে দেখা যাচ্ছে তার শুরুয়াতটা কিন্তু হয়েছিল ক্রুয়েফের হাত ধরেই। 

৭৪-এর ওই হারের পর কেটে গেছে অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময়। এরপরেও দু’দুবার ১৯৭৮ আর ২০১০, ফাইনালে উঠেও স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে নেদারল্যান্ডসের। আর এবার তো বিদায় নিতে হলো প্রায় শুরুতেই। তবে কোনদিন যদি তারা ফিফা বিশ্বকাপ, এই ট্রফিটা জেতে তাহলে সেটা যে ‘অরেঞ্জ প্রিন্স’-কেই উৎসর্গ করবে ডাচ দল সমেত গোটা দেশবাসী, সে বিষয়ে অন্তত এই প্রতিবেদকের কোন সন্দেহ নেই।      

মেয়ে তখন অনেক ছোট। গিন্নিকে নিয়ে সপরিবারে গেছি পুরী। আর ওখানে যাওয়া মানেই তো মুখার্জি (নাকি ব্যানার্জি?) ট্র্যাভেলসের বাসে কন্ডাকটেড ট্যুর। সেই চিরাচরিত কোনারক, লিঙ্গরাজ টেম্পল, উদয়গিরি, খণ্ডগিরি, নন্দনকানন…তা সে আগে যতবারই যাওয়া হোক না কেন। বাসে আমাদের পাশেই সহযাত্রী এক মধ্যবয়েসী জার্মান দম্পতি। ওদের ইংরিজির বহরও প্রায় আমাদের মতোই। ফলে টুকটাক আলাপ জমতেই কথায় কথায় ফস করে বলে বসলাম, “তোমরা কি জানো, তোমাদের দেশের বেকেনবাওয়ার আমাদের এখানেও খুব জনপ্রিয়?” জবাবে সামান্য হেসে ভদ্রলোক বললেন, “ওই নামে বাকি দুনিয়া মানে তোমরা ওকে ডাকলেও, আমরা জার্মানরা ওকে কাইজার নামে ডাকি।” ‘কাইজার’ – এই এতটুকু ছোট একটা শব্দ উচ্চারণ করার সময় যে কি বিপুল শ্রদ্ধা ও গর্র ঝরে পড়তে দেখেছিলাম ওই প্রৌঢ় দম্পতির চোখেমুখে, সেটা কল্পনাতীত! জার্মান ভাষায় ‘কাইজার’ শব্দের মানে সম্রাট। এক্ষেত্রে সেই সম্রাট হলেন বেকেনবাওয়ার। ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার। পৃথিবীর সর্বকালের সেরা মিডফিল্ডারদের মধ্যে অন্যতম এক নাম। ১৯৭৪-এ বিশ্বকাপ জয়ী পশ্চিম জার্মানি ফুটবল টিমের অধিনায়ক। আবার ১৯৯০ সালে তার কোচিংয়েই ইতালিতে আবার বিশ্বকাপ ঘরে তুলেছিল জার্মানরা। এর বাইরে খেলোয়াড় এবং কোচ হিসেবে ফুটবল বিশ্বকাপ জেতার রেকর্ড ব্রাজিলের মারিও জাগালো এবং ফ্রান্সের দিদিয়ের দেশঁ ছাড়া আর কারো নেই। তবে ৭৪ সালের আগেই জার্মান সমর্থকদের হৃদয় সম্রাট মানে ‘কাইজার’ হয়ে গেছিলেন মাঝমাঠের এই সেনাপতি। ১৯৬৬-র বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে বিপক্ষ ডিফেন্ডারের সঙ্গে সংঘর্ষে হাত ভেঙে মাঠের বাইরে যেতে হয় বেকনবাওয়ারকে। কিন্তু মনের কি অদম্য জোর আর দুর্জয় সাহস! হাতে প্লাস্টার নিয়েই দুদিন বাদে ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে সেবারের আয়োজক দেশ ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ফাইনালে খেলতে নামেন তিনি। আর ওই ভাঙা হাতেই তার নাছোড় লড়াই দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেছিল ওয়েম্বলির দর্শকরা। আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে ফিফার নিয়মকানুনের কড়াকড়িতে ওরকমটা ভাবাই সম্ভব নয়। তবে ফাইনালে সেদিন জার্মানি জিততে না পারলেও অবিশ্বাস্য হাড় হিম করে দেওয়া সেই লড়াইয়ের পর থেকেই জার্মান জনগনের হৃদয় সিংহাসনে পাকাপাকি বসে পড়েছিলেন ‘কাইজার’ ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার। ওয়েম্বলির ময়দানে হাতে বাঁধা প্লাস্টার নিয়ে জার্মান টিমের সাথে খেলতে নামছেন মিডফিল্ড জেনারেল, এ ছবিটা একটু সার্চ করলেই আজও পেয়ে যাবেন নেটে। 

হ্যারিকেন। আয়েলা বা আমপানের মতই ভয়ঙ্কর এক ঝড়ের নাম। জেয়ার্জিনহো। ৭০-এর দশকে ব্রাজিল টিমের এই দুর্দান্ত  রাইট উইঙ্গারকে তার তীব্র গতির কারনেই তুলনা করা হতো হ্যারিকেন ঝড়ের সাথে। ব্রাজিলের চিরাচরিত হলুদ জার্সির সঙ্গে মিলিয়ে তাকে ‘ইয়েলো হ্যারিকেন’ নামে ডাকতো ভক্তরা। ৬৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পেলের ওই দুরন্ত হেডটা অবিশ্বাস্যভাবে সেভ করেও শেষমেশ জেয়ার্জিনহোর কাছে হার মানতে হয়েছিল ইংল্যান্ড গোলরক্ষক গর্ডন ব্যাঙ্কসকে। উইং ধরে সত্যিই ওই হ্যারিকেন ঝড়ের মতোই ছুটে এসে গোলার মত শটে বল জড়িয়ে দিয়েছিলেন ইংল্যান্ডের জালে। যারা জায়ান্টস অফ ব্রাজিল সিনেমাটা দেখেছেন তাদের নিশ্চয়ই ৭০ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে ওই দুরন্ত গোলের দৃশ্যটা মনে থাকবে। ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে শেষবারের মতো ব্রাজিলের প্রতিনিধিত্ব করে বুটজোড়া বরাবরের মতো তুলে রাখেন ‘ইয়েলো হ্যারিকেন’। 

আসল নামটা বেশ বড়। ম্যানুয়েল ফ্রান্সেসকো ডস স্যান্টোস। তবে ওই নামে তাকে কেউ চিনতো না। চিনতো ‘গারিঞ্চা’ নামে। ওই নামেই তাকে ডাকতো ফুটবল পাগল ব্রাজিল সমর্থকরা। আর ওই নামেই সারা দুনিয়ার ফুটবল প্রেমীদের কাছে বিখ্যাত হয়ে গেছিলেন তিনি। পর্তুগীজ ভাষায় গ্যারিঞ্চা শব্দের অর্থ ছোট পাখি। গ্যারিঞ্চা। খেলতেন রাইট উইং পজিশনে। হাঁটুর নীচ থেকে পা দুটো সামান্য খুঁতো। কিন্তু ওই প্রতিবন্ধকতা নিয়েও আক্ষরিক অর্থেই ছোট পাখির মত উড়ে বেড়াতেন মাঠ জুড়ে। ৫৮ আর ৭০ যদি পেলের বিশ্বকাপ হয় তাহলে ৬২ তো অবশ্যই গারিঞ্চার বিশ্বকাপ। চিলিতে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপে প্রাথমিক গ্রুপ লীগের খেলাতেই গুরুতর চোট পেয়ে মাঠের বাইরে চলে যান পেলে। গোটা প্রতিযোগিতায় আর ফিরতে পারেননি। তারপর থেকে প্রায় একা পায়ে ব্রাজিলকে টেনে গেছিলেন গ্যারিঞ্চা। ছোট্ট পাখির সেই দুরন্ত উড়ান থেমেছিল  ‘সোনার পরীকে’* একদম সোজা ব্রাজিলে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে। সারা পৃথিবীর সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের মধ্য বিবেচিত হতো যার নাম, সেই গ্যারিঞ্চার শেষ পরিণতি ছিল মর্মান্তিক! উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন, অপরিমিত মদ্যপান, জীবনে দাঁড়ি টেনে দিয়েছিল অকালেই। লাতিন আমেরিকা ও ইওরোপের একাধিক নামী ক্লাবে খেলে রোজগার করা অর্থ কিছুই ধরে রাখতে পারেননি। অসংখ্য প্রেম, দু-দুবার বিয়ে, কোনটাই স্থায়ী হয়নি। আর্থিকভাবে দেউলিয়া এবং দেনাগ্রস্থ গ্যারিঞ্চার শেষ জীবনে সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিল সস্তা মদের বোতল। আক্রান্ত হন জটিল সিরোসিস অফ লিভার রোগে। অবশেষে ১৯৮৩ সালে এক ঠান্ডা শীতের রাতে মেঘমুলুকে উড়ান দেন ‘ছোট পাখি’। ছেড়ে যান অসংখ্য খ্যাতির পালক। যা আজও ছড়িয়ে রয়েছে আপামর বিশ্বের ফুটবল প্রেমীর মনে।                

৯৪-এর বিশ্বকাপ মনে আছে? মনে আছে সেই সুবিখ্যাত জুটি রোমারিও-বেবেতোর কথা? এরমধ্যে বেবেতো। অসামান্য স্কিল  সম্পন্ন ফুটবলার। ব্রাজিল ফরোয়ার্ড লাইনের অন্যতম সম্পদ। তবে বিপক্ষ টিমের ডিফেন্ডারদের ফাউলে মাটিতে পড়া এমন ছটফট আর আর্তনাদ করতেন যে সমর্থকরা বেবেতোর নাম রেখেছিলেন ‘ক্রাই বেবি’। যদিও এ নিয়ে ফুটবল বিশেষজ্ঞদের মধ্যে স্পষ্ট মতভেদ আছে। একদল বলতেন ছোটখাটো চোট লাগতে না লাগতেই মাটিতে পড়ে যেসব কান্ড ঘটাতেন তিনি, তা নাটক ছাড়া আর কিছুই নয়। যাতে রেফারির কাছে একটু বেশি সুযোগসুবিধা পাওয়া যায়। আরেকদলের মতে, আসলে বেবেতো একটু বেশিমাত্রায় ‘ইনজুরি প্রোওন’ বা চোটআঘাত প্রবণ ছিলেন। ফলে তার ওই আর্তনাদ বা ছটফটানি আদৌ নকল ছিলো না। তবে ৫৮ আর ৭০ যদি পেলে, ৬২ যদি গ্যারিঞ্চা, ৬৬ যদি ইউসেবিও, ৭৪ যদি বেকেনবাওয়ার আর যোহান ক্রুয়েফ, ৮৬ যদি মারাদোনার বিশ্বকাপ হয় তাহলে ৯৪ নিশ্চিতভাবে রোমারিও-বেবেতোর বিশ্বকাপ, মানতেই হবে কথাটা।  

সবশেষে ‘হোয়াইট পেলে’। কাকে ডাকা হতো এই নামে? জানি, এ প্রশ্নে তো হোঁচট খাবেন অনেকেই। কিন্তু এহেন প্রশ্নের উত্তর যদি হয় – জিকো, তখনি হইহই করে উঠবেন সব্বাই। “আরে, তাকে আবার কে না চেনে!” হ্যাঁ জিকো। ৮২ স্পেন বিশ্বকাপে সক্রেটিস, ফালকাও, এডার, জুনিয়ারদের মতো অসামান্য সব ফুটবলার সমৃদ্ধ ব্রাজিল টিমের অন্যতম সদস্য। অসাধারণ স্কিলের জন্য তুলনা টানা হতো পেলের সঙ্গে আর সে কারণেই উপরোক্ত নাম শিরোপায় ভূষিত হয়েছিলেন আপামর ব্রাজিল সমর্থকদের কাছে। এছাড়াও খেলেছেন ইওরোপ আর লাতিন আমেরিকার একাধিক নামীদামী ক্লাবে। ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার পর কোচ হিসেবে কাজ করেছেন সৌদি আরব, গ্রীস, জাপান সহ একাধিক দেশ আর ক্লাব দলের সঙ্গে। এদেশের আই এস এল টুর্নামেন্টে এফ সি গোয়ার হয়েও কোচ হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন বছরদুয়েক। সব মিলিয়ে মোটামুটি এই হলো ‘ফর্সা পেলের’ জীবনের সংক্ষিপ্ত সালতামামি। 

এছাড়াও দিয়েগো মারাদোনা যে ‘প্রিন্স অফ ফুটবল’, জার্সি নম্বরের কারণে লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো যে যথাক্রমে ‘এল এম টেন’ এবং ‘সি আর সেভেন’ নামে ফুটবল দুনিয়া জুড়ে পরিচিত, এটা তো এখন একটা বাচ্চা ছেলেও জানে। ফলে এ নিয়ে আর দীর্ঘসূত্রীতায় গেলাম না।

তবে এরকম বিশেষ নাম দেশ ও ক্লাব স্তরেও বেশ কিছু রয়েছে। যেমন ব্রাজিল ‘সেলেকাও’, ফ্রান্স ‘লে ব্লুজ’ নামে তাদের দেশের সমর্থকদের কাছে পরিচিত । পাশাপাশি ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড, লেস্টার সিটি, লিভারপুল আর আর্সেনালকে ভালোবেসে যথাক্রমে ‘রেড ডেভিলস’, ‘ফক্স’ ‘এ্যানফিল্ডারস্’ আর ‘গানার্স’ নামে ডাকেন তাদের সমর্থকেরা।  

এই কলকাতা ময়দানেও কিন্তু বহু বিখ্যাত ফুটবলার পরিচিত ছিলেন নানাবিধ সব অন্য নাম, শিরোনাম বা ছদ্মনামে। যেমন মোহনবাগান দলে ডিফেন্সের স্তম্ভ গোষ্ঠ পাল পরিচিত ছিলেন ‘চাইনিজ ওয়াল’ নামে। কারণটা আশাকরি কাউকে বুঝিয়ে বলতে হবে না। ৬০-এর দশকে ওই মোহনবাগানেরই সেন্টার ফরোয়ার্ড অরুময়নৈগমকে সমর্থকরা ডাকতো ‘বেবি ট্যাক্সি’ নামে, তার তীব্র গতির কারণে। ৭০-য়ের দশকে ইস্টবেঙ্গলের রাইট উইঙ্গার স্বপন সেনগুপ্ত বিখ্যাত হয়ে গেছিলেন ‘চিংড়ি’ নামে, গোলবক্সের মধ্যে তার ছটফটানি আর তীব্র গোলক্ষুধার জন্য। এ বাদেও ১৯৬০ থেকে ২০০০, একাধিক ফুটবলার যেমন মহম্মদ হাবিব ‘বড়ে মিয়া’ শ্যাম থাপা ‘গোল্ডেন বয়’, বলাই দে ‘ফ্লাইং বার্ড’, সুব্রত ভট্টাচার্য ‘লগা’, দীপু দাস আর অশোকলাল ব্যানার্জি তাদের দুর্দান্ত হেডিং কুশলতার জন্য ‘হেডমাস্টার’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। এছাড়াও মজিদ বাসকার ‘বাদশা’, চিমা ওকেরি ‘কালো চিতা’, হোসে রামিরেজ ব্যারেটো ‘সবুজ তোতা’ আর বাইচুং ভুটিয়াকে ’পাহাড়ি বিছে’ নামে চিনতো গোটা ময়দান বলা ভালো এই বাংলার ফুটবল সমর্থকরা। এদিকে মোহনবাগান সমর্থকরা ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের ‘লোটা’, ‘জার্মান পার্টি’, ‘আলুওয়ালা পটলওয়ালার ক্লাব’ ইত্যাদি নামে যেমন ডেকে থাকে, ঠিক একইভাবে ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরা মোহনবাগান সমর্থকদের ‘ফুটো ঘটি’, ‘ছারপোকা’, ‘মাচা’ ইত্যাদি নানাবিধ সম্বোধনে আকচার সম্বোধিত করে। তবে এ সবই যে বেশ তীর্যক বা ব্যাঙ্গাত্মক একটা উদ্দেশ্য লুকিয়ে থাকে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। এরকম আরো বেশ কিছু নাম মনে পড়ছে না এইমুহূর্তে। পড়লে জানিয়ে দেবো। ফলে নামমাহাত্ম্যর ঘাট ছেড়ে এবার অন্য ঘাটে তরী ভেড়াই।

 

ব্রাত্যজনের ফুটবল সঙ্গীত 

বিশ্বকাপের ময়দানে তাকে কোনদিন দেখা যায়নি। কারণ তার দেশ কোনদিনই মূলপর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে সক্ষম  হয়নি। এখানে দেশ মানে লাইবেরিয়া। দারিদ্র্য, ক্ষুধা, অনাহার আর বছরের পর ধরে চলতে থাকা ভয়ংকর গৃহযুদ্ধে বিদীর্ণ  একটা রাষ্ট্র, একদা যেখানে শিশুদের ঘুম ভাঙ্গতো মেশিনগান আর গ্রেনেডের শব্দ শুনে। এখানেই জন্ম হয়েছিল জর্জের। জর্জ উইয়া। পশ্চিম আফ্রিকার রক্তস্নাত একটা রাষ্ট্র থেকে তীব্র দারিদ্র্য ঠেলে উঠে এসে সোজা পৌঁছে গিয়েছিলেন বিশ্ব ফুটবলের রাজ দরবারে। তিন তিনবার আফ্রিকান ফুটবলার অফ দ্য ইয়ার নির্বাচিত হয়েছেন, পেয়েছেন পৃথিবীর সেরা ফুটবলারের পুরষ্কার। খেলেছেন মোনাকো, প্যারিস সাঁ জাঁ, এ সি মিলান, ম্যাঞ্চেস্টার সিটি, চেলসির মতো ইওরোপের সব বিখ্যাত ক্লাবে। আফ্রিকান কাপ, উয়েফা কাপ, সিরি-আ…  একাধিক ট্রফি জিতেছেন জাতীয় এবং ক্লাব স্তরে। কিন্তু ওই যে আগেই বলেছি, এতকিছুর পরও ফিফা বিশ্বকাপে খেলা হয়নি উইয়ার, তাঁর দেশ প্রতিযোগিতার মূলপর্বে যেতে পারেনি বলে। তবে উইয়ার দেশ লাইবেরিয়া এই অসাধারণ প্রতিভাধর ফুটবলারকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দিয়েছিল। লাইবেরিয়ায় সে দেশের রাষ্ট্রপতির চেয়েও বেশি সম্মান পেয়েছিলে তিনি। কারণ সেখানে রাষ্ট্রপতির গাড়িরও নম্বর থাকে কিন্তু উইয়ার মার্সিডিজ বেঞ্জে নাম্বারপ্লেটে নম্বরের বদলে শুধু লেখা থাকে – ‘উইয়া’। এখান থেকেই সে দেশে তাঁর সম্মানের জায়গাটা ঠিক কোথায়, স্পষ্ট বোঝা যায় সেটা। এহেন জর্জ উইয়া পরবর্তীতে নিজেই লাইবেরিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান হয়েছেন। তাঁর সর্বজন গ্রাহ্যতা ও বিপুল জনপ্রিয়তার কারণে বন্ধ হয়েছে দশকের পর দশক জুড়ে চলা হিংসাশ্রয়ী গৃহযুদ্ধ। কিন্তু বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন অধরাই থেকে গেছে অসাধারণ এই ফুটবলারের। 

উইয়ার মতোই বিশ্বকাপে খেলা হয়নি ফ্রান্স আর ওয়েলসের অসামান্য দুই ফুটবলার এরিক কাঁতোনা এবং রায়ান গিগসের। মার্সেই, লিডস ইউনাইটেড, ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের মতো খ্যাতনামা সব ক্লাবে বছরের পর বছর ধরে দাপিয়ে খেলেছেন কাঁতোনা। ফ্রেঞ্চ লীগ, এফ এ কাপ, প্রিমিয়ার লীগ, ইউয়েফা কাপ সহ অসংখ্য ট্রফি জিতেছেন। ম্যান ইউ সমর্থকেরা তাকে ভালোবেসে ডাকতেন ‘প্রিন্স এরিক’ নামে।  

অন্যদিকে রায়ান গিগস। ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডে সর্বকালীন অন্যতম সেরা মাঝমাঠের খেলোয়াড়। একইভাবে এফ এ কাপ, ইপবোপিয়ান চ্যাম্পিয়নস লীগ, প্রিমিয়ার লীগ সহ একাধিক ট্রফি নামক সাফল্য যার ঝুলিতে। কাঁতোনার মতই বিশ্বকাপের ময়দানে নামা হয়নি তারও। কাঁতোনার ক্ষেত্রে কারণ বিবিধ। উচ্ছৃঙ্খলতা, কোচের সাথে মনোমালিন্য …ইত্যাদি। গিগসের ক্ষেত্রে কারণ একটিই। তার দেশ ওয়েলসের কোয়ালিফাইং রাউন্ডের গন্ডি টপকাতে না পারা। ফলে ফিফা বিশ্বকাপের আঙিনায় ভাগ্যদেবীর আশীর্বাদ জোটেনি দুজনের কারো কপালেই। এই একইভাবেই বিশ্বকাপের ময়দানে দেখা যায়নি হাইপিয়াকেও। স্যামি হাইপিয়া। ৯০ থেকে ২০০০, দু’দশক ধরে লিভারপুল ডিফেন্সের স্তম্ভ হাইপিয়ার বিশ্বকাপ খেলা হয়নি তার দেশ ফিনল্যান্ড সেখানে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি বলে। সারা পৃথিবী জুড়ে এরকম আরও একাধিক প্রতিভাধর ফুটবলারের নাম বলাই যায় যাদের ফিফা বিশ্বকাপ খেলা হয়নি তাদের দেশের অযোগ্যতা প্রমাণিত হওয়ায়। সে তালিকা বেশ দীর্ঘ হবে, ফলে একজনের কথা উল্লেখ করে এ পর্ব শেষ করি।

গ্যারিঞ্চা ইজ গুড, পেলে ইজ বেটার বাট জর্জ ইজ বেস্ট। হ্যাঁ, জর্জ বেস্ট। এহেন বেস্টকে প্রথম দেখি পার্ক সার্কাস ময়দানে। সে সময় পার্ক সার্কাস পুজো কমিটির উদ্যোক্তারা পুজোর পর যাত্রা, থিয়েটার ইত্যাদি আরও বিভিন্ন ধরনের সব বিচিত্রানুষ্ঠান আয়োজন করতেন। ৮০-র দশকের গোড়ার দিক হবে। বিখ্যাত কোচ (ফুটবলারও) অমল দত্ত সেসময় একটা প্রজেক্টর আর ১৬ মি মি পর্দায় পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সব বিখ্যাত খেলাগুলো দেখিয়ে বেড়াচ্ছেন। সেখানেই বেস্ট দর্শন আমার। ইংলিশ লীগের (তখনো ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগ বা ই পি এল কালের গর্ভে) একটা খেলায় পরপর ছ’জনকে কাটিয়ে হেলায় গোল করছেন বেস্ট আর প্রজেক্টরের পেছন থেকে উচ্ছসিত অমল দত্ত চিৎকার করছেন, “দেখুন! দেখুন!  বেস্ট যেন পাড়ার ফুটবল খেলছে!” 

তখনো ১৯৮৬ আসতে বছরপাঁচেক দেরি। ফুটবলেশ্বর দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা তখনো সাতজনকে কাটিয়ে সেই অলৌকিক গোল করেননি। ফলে ছ-ছ’জনকে কাটিয়েও যে গোল করা যায় এমন ম্যাজিক দর্শন আমার সেই প্রথম। যার মায়া কাজল আজও লেগে রয়েছে চোখে! 

এহেন জর্জ বেস্ট। একমাথা সোনালী চুল। এ্যাপোলোসম রূপবান। ঠিক কোন এক রকস্টারের মতো। রমণীকূল বেস্টের প্রেমে উন্মাদ। দু’পায়ের অলৌকিক স্কিলের কথা তো আগেই বলেছি। আর সেই স্কিলেই দুনিয়া মাতিয়েছেন। দাপিয়ে খেলে বেড়িয়েছেন ইওরোপ আর এশিয়ার বিখ্যাত সব ক্লাবে। তবে তারমধ্যে ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডে ১৯৬৩ – ১৯৭৪, কেরিয়ারের সেরা সময় তাঁর। জিতেছেন ইংলিশ লীগ, ইওরোপিয়ান কাপ, এফ এ কাপ সহ আরো একাধিক সব ট্রফি। ভূষিত হয়েছেন ‘ইওরোপিয়ান ফুটবলার অফ দ্য ইয়ার’ সহ আরো বহু সম্মানে। তবে এই এত সবকিছুর পরও ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপে খেলার স্বপ্নটা অধরাই থেকে গেছে এই অসামান্য ফুটবলারের। কারণ সেই পুরোনো, অর্থাৎ যে দেশটা থেকে ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডে খেলতে এসছিলেন তিনি সেই উত্তর আয়ারল্যান্ড কোনদিনই বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। তারপরেও ‘বিশ্ব সেরা একাদশ’ বাছতে বসে আজও সেই টিমে ফরোয়ার্ড লাইনে জর্জকে বাদ দেওয়ার কথা ভাবতে পারেন না কোন ফুটবল বিশেষজ্ঞই। 

অপরিমিত মদ্যপান, মাদকসেবন, প্রভূত নারীসঙ্গ, উচ্ছৃঙ্খল ও বেপরোয়া জীবনযাপন বারবার তাঁর ব্যক্তিগত একইভাবে ফুটবল জীবনেও অসম্ভন সমস্যা ডেকে এনেছে আর এইসব সমস্যাই এই অলৌকিক প্রতিভাধর খেলোয়াড়ের ফুটবল জীবনকে অনেকটাই সংক্ষিপ্ত করে দিয়েছে। এমনই ধারণা ফুটবল বিশেষজ্ঞ মহলের একাংশের। সব মিলিয়ে উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন এবং তা নিয়ে বিপুল সমস্য ও বিতর্ক কখনোই পিছু ছাড়েনি জর্জের।

অবশেষে ২০০৫। নভেম্বরের এক তীব্র শীতরাতে দুরন্ত ড্রিবল, অলৌকিক স্কিল আর সোনায় বাঁধানো বুটজোড়া নিয়ে মেঘমুলুকের কোন সীমাহীন স্টেডিয়ামে চুপিচুপি খেলতে চলে গেছেন তিনি! পিছনে ছেড়ে গেছেন প্রচুর বিতর্ক। তবুও ‘অল টাইম ওয়ার্ল্ড ইলেভেন’ বাছতে বসে আজো তাকে বাদ দেওয়া সম্ভব হচ্ছেনা কারো পক্ষে। কারণ লোকটার নাম যে ওই জর্জ ‘দ্য’ বেস্ট! 

 

এভাবেও উঠে আসা যায়!

প্রবাসী পাঠককূল ও অপার বাংলার সম্পাদক মণ্ডলী। আমরা এদেশে যখন তাঁর খেলা দেখার জন্য রাত জাগছি, আপনারা তখন সাত সমুদ্দুর তেরো নদীর পারে ওই দেশটায় বসে ফিশ এ্যান্ড চিপস্, বার্গার ও কোক সহযোগে শেষ বিকেল বা একটু সন্ধের দিকে ওই একই খেলা দেখছেন মানে টিভিতে নয়তো বা সশরীরে মাঠে গিয়ে। এখানে তিনি বলতে ওই একজনই। একমেবাদ্বিতীয়ম লিওনেল আন্দ্রেজ মেসি। ঠিক যে মুহূর্তে বসে এ লেখাটা লিখছি, ঠিক সেই মূহুর্তে ৫ নং বিশ্বকাপটায় মাঠে নামা হয়ে গেছে লোকটার, করা হয়ে গেছে আধডজন গোন। সবকটা বিশ্বকাপ মিলিয়ে সংখ্যাটা ২০। আর তাঁর সেই স্বপ্নের দৌড়টা এই বিশ্বকাপে কোথায় গিয়ে থামবে সেটা বলা কখনোই সম্ভব নয় এই অধম প্রতিবেদকের পক্ষে। তবে সারা দুনিয়া জুড়ে কোটি কোটি সমর্থকের ‘তোমাকে অন্তত একবার বিশ্বকাপটা পেতেই হবে’ এই বিপুল চাপের খাঁড়াটা ঘাড় থেকে উঠে যেতেই আরো ঝকঝকে দেখাচ্ছে মেসিকে। প্রতিটি ম্যাচে আগেরটার চাইতে আরো বেশি দুর্দমনীয়, অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছেন তিনি। একের পর এক অলৌকিক সব পাস, ড্রিবলিং আর গোল মণিমাণিক্যের মত ছিটকে বেরোচ্ছে তাঁর পা থেকে ! যার ছটায় ঝলসে যাচ্ছে বিপক্ষের ডিফেন্স, এহেন মেসির আজ এই জায়গায় উঠে আসার পথটা কিন্তু আদপেই অতটা কুসুমাস্তীর্ণ ছিলো না। তবে বল যে তার কথা শোনে এবং সে যে এক বিস্ময় বালক, এ নিয়ে তার জন্মস্থল আর্জেন্টিনার রোসারিও শহরে একজনের মনেও সন্দেহের কোন অবকাশই ছিলো না। রোসারিওর স্থানীয় বিখ্যাত ক্লাব নিউয়েলে মাত্র ন বছর বয়েসে যোগ দেয় সদ্য কিশোর ছেলেটি। তার জাদু মাখা পা-দুটো যখন ক্লাবের হয়ে গোলের ফুলঝুরি ছোটাচ্ছে, ঠিক তখনই ধরা পড়লো সমস্যাটা। জানা গেল শরীরের বাড় বৃদ্ধির জন্য অতি প্রয়োজনীয় এক ধরণের বিশেষ হরমোনের অভাবে ভুগছে বিস্ময় বালকের শরীর। যা তাকে ফুটবলের মাঠ থেকে ছিটকে দিতে পারে অনতিবিলম্বেই। কোটিতে গুটিকের শরীরে দেখা যায় এ রোগ আর এক চিকিৎসাও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ছ বছরব্যাপী এ চিকিৎসায় খরচ হবে আনুমানিক প্রায় ১০,০০০ ডলার প্রতি বছরে। মেসির বাবা-মা, দুজনেই সামান্য চাকুরে। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার। তাদের পক্ষে এই বিপুল ব্যয়ভার বহন করাটা কল্পনারও অতীত। প্রাথমিকভাবে নিউয়েল ক্লাব এই খরচ বহনের প্রতিশ্রুতি দিয়েও কিছুদিনের মধ্যেই অপারগতা প্রকাশ করে। কারণ ৮০-র দশকে ওই টাকার অঙ্কটা পেশাদার একটা ক্লাবের পক্ষেও অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ ছিলো।

সেসময় (আজও) রাষ্ট্রীয় স্তরে আর্জেন্টিনার বিখ্যাত দুই ফুটবল ক্লাব রিভারপ্লেট ও বোকা জুনিয়র্সের মধ্যে রিভারপ্লেট তাদের ক্লাবে মেসিকে সই করাতে এবং তার চিকিৎসার সমস্ত ব্যয়ভার বহন করতে রাজি হয়। কিন্তু তাদের সাথে নিউয়েলের আকচাআকচিতে সে চুক্তি যায় ভেস্তে। মেসির মা-বাবা পড়েন মহা সমস্যায়। কিন্তু হাল না ছেড়ে চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন তাঁরা। এই সময় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয় স্থানীয় স্তরের দুই এজেন্টের। দেশের সেরা প্রতিভাবান ফুটবলারদের ইওরোপের নামী ক্লাবগুলোর সাথে চুক্তিতে সাহায্য করতেন তারা। মেসির ব্যাপারে এ সি মিলান, ইন্টার মিলান, বার্সেলোনা এফ সি-র মতো ইওরোপের নামীদামী সব ক্লাবগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন তারা। ছোট্ট লিওর খেলার ভিডিও ক্যাসেট ক্লাবগুলোয় পাঠিয়ে দেন দুজনে। সেখানে বালক লিওর খেলা দেখে তো বিস্ময়স্তব্ধ ক্লাবকর্তারা! তবে বিস্ময়ের ধাক্কা কাটিয়ে সবার প্রথম আসরে নামে বার্সেলোনা। আর তার সূত্র ধরেই এক শুভ সকালে ওই দুই এজেন্টের সাথে পুত্র লিওকে নিয়ে বার্সেলোনাগামী বিমানে চড়ে বসেন বাবা হর্হে মেসি। 

এর পরবর্তী তথ্যগুলো পাচ্ছি বন্ধু ব্রাত্য বসুর লেখা একটা বই থেকে। ব্রাত্য। নাটক, রাজনীতি…এসবের বাইরে তার অন্য আরেকটা পরিচয় আছে। দেশ এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলের একজন এনসাক্লোপিডিয়া। আর এই পরিচয়টা খুব কম মানুষই জানেন। এহেন ব্রাত্যর বইটির নাম – একটি ‘সাহিত্যিক’ মহাকাব্যের কিস্সা : লিওনেল আন্দ্রেজ মেসি। এ বইয়ের বয়ান অনুযায়ী, বার্সেলোনার এক বিখ্যাত রেস্তোরাঁয় ওই দুই এজেন্ট আর মেসির বাবার সঙ্গে দেখা করতে আসেন ক্লাবের দুই প্রথম সারির কর্মকর্তা। আর সেই আলোচনায় তাঁরা যে প্রস্তাব দেন সেটা মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার। মোটের ওপর সেই চুক্তি মানলে বিস্ময় বালকের চিকিৎসার সমস্ত ব্যয়ভার ক্লাব বহন তো করবেই, একইসঙ্গে পুরো মেসি পরিবারেরও অর্থের অভাব ঘুচে যাবে চিরতরে। কিন্তু কর্মকর্তাদের মুখের কথায় কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না সিনিয়ার মেসি। এমতাবস্থায় উপায়ান্তর না দেখে টেবিলে রাখা গ্লাস থেকে একটা ন্যাপকিন তুলে নিয়ে তাতে পুরো চুক্তির খসড়াটা লিখে সই করে দেন দুই কর্মকর্তা। পাকা চুক্তিপত্র তৈরি হওয়ার আগে পর্যন্ত ওটাই ছিল মেসি পরিবারের হাতে প্রামাণ্য দলিল। সেই ন্যাপকিন অতি সযত্নে আজও রক্ষিত আছে বার্সেলোনা এফ সি-র নিজস্ব মিউজিয়ামে।  

অতঃপর বার্সেলোনা নার্সারিতে দাখিল হয়ে যায় বিস্ময় বালক। বাকিটা তো এই আজ অবধি যা আপনারা দেখছেন আর কি।  

আরেকটা অসাধারণ অজানা তথ্য পেলাম বইটিতে। এই রোসারিও শহরেই জন্মেছিলেন চে গেভারা। মেসি পরিবারের মতোই নিউয়েলের অন্ধ সমর্থক ছিলেন তিনি। কিউবা বিপ্লবের পর স্বদেশে ডেকে নিয়ে এসে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই স্বাধীনতা সংগ্রামীকে সম্বর্ধনা দেয় নিউয়েল ক্লাব। 

রোসারিও। একটাই শহর। দুটো চরিত্র। আর্নেস্তো চে গেভারা লিঞ্চ আর লিওনেল আন্দ্রেজ মেসি। দুটো ভিন্ন ভিন্ন স্বপ্নের সন্ধানে পাড়ি জমিয়েছিলেন দূরে। উদ্দেশ্য ভিন্ন। কিন্তু লক্ষ্য একটাই। স্বপ্নটার নাগাল পাওয়া! ছুঁয়ে দেখা! The rest is history!          

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *